Home গদ্যসমগ্র গল্প আশরাফ জুয়েল / কামরুল পাগলা ও অশুভের দেবতা

আশরাফ জুয়েল / কামরুল পাগলা ও অশুভের দেবতা

প্রকাশঃ December 6, 2016

আশরাফ জুয়েল / কামরুল পাগলা ও অশুভের দেবতা
0
12

সম্পাদকীয় নোট : তীরন্দাজে প্রকাশিত হলো আশরাফ জুয়েলের লেখা গল্প ‘কামরুল পাগলা ও অশুভের দেবতা’। জুয়েল খুব বেশি দিন হযনি গল্প লিখছেন, তবে এরই মধ্যে তার প্রকাশিত কয়েকটি গল্প পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। তীরন্দাজের এই গল্পটিও অসাধারণ। পাঠকদের ভালো লাগবে নিঃসন্দেহে। গল্পটি পড়ুন আর আপনাদের মতামত জানান আমাদের।

আশরাফ জুয়েল / কামরুল পাগলা ও অশুভের দেবতা

কুয়াশা (অ)মঙ্গল

মধ্য নভেম্বরের এই শীতাক্রান্ত প্রাকসন্ধ্যায় লক্ষ্মীপুর প্রাইমারি স্কুল মাঠে বেশ কিছু মানুষমূর্তি জড়ো হয়েছে। ঠাণ্ডা-কাতর এই বিরল অনিশ্চিত সন্ধ্যায় সকলের মুখগুলোকে কুঁকড়ে যাওয়া মাঘ মাসের মতো মনে হচ্ছে। জড়সড় মুখের মানুষমূর্তিগুলোকে দেখতে অশুভ জন্তুর মতো লাগছে। মানুষমূর্তিগুলো সকলে মিলে একটা বৃত্ত তৈরি করেছে। এই অশুভ-মানুষ-বৃত্তের মাঝে আরও তিন জন আছে। এদের একজন হলো হরিদাশ জমাদার, তার মেয়ে আলো জমাদার। বাক্যরহিত আলো। আলোর গায়ে একটা চাদর জড়ানো- সেটা কুয়াশা-কামড় থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য নাকি আড়াল খুঁজে নেবার জন্য তা বলা মুশকিল। একটা কাঠের টুলের উপর বসে আছে আলো। কুয়াশার দলার মত বসে আছে সে। কুয়াশার দলার মতো আলোর শরীরের ভেতর থেকে একটা নিশ্চুপ মুণ্ডু বেরিয়ে আছে বৃত্তের দিকে। অন্যজন পাগলা, কামরুল পাগলা। কামরুল পাগলা বসে আছে তার জন্য পেতে রাখা নির্দিষ্ট আসন- মাটিতে, হাঁটু ভাঁজ করা, থুতনিটা ভাঁজ করা হাঁটুর কাছে সঁপে দিয়েছে কামরুল, অযত্নে। পরনে লুঙ্গি এবং গায়ে ময়লা বসে যাওয়া একটা স্যান্ডো গেঞ্জি। বরাবরের মতো তার হাতে একটা দুই টাকার নোট। চেয়ে নেয়া দুই টাকার নোট, নোটটাকে সুতোর মত পাকিয়েছে সে এবং তার নিজস্ব রীতিতে সেটাকে ডান হাতের বুড়ো আঙুল এবং তর্জনীর মাঝে রেখে ঘোরাচ্ছে, আপন মনে ঘোরাচ্ছে, যেন পৃথিবীটাকে দড়ির দলা করে তার দুই আঙুলের মাঝে রেখে পৃথিবীকেই পিষে পিষে কষ্ট দিছে সে। আপন খেয়ালে ঘোরাচ্ছে আর বিড়বিড় করে বলছে, উড়োজাহাজ-উড়োজাহাজ। আলো, এখনও বাক্যরহিত- সময়ের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছে সে- নিশ্চুপ। সময় কিন্তু নিজেকে ঠিক পাল্টাচ্ছে, তাই হয়ত সময় সারাজীবনই উত্তীর্ণ। অথচ আলোর বয়স আঠারো। কামরুল পাগলা হঠাৎ সেই প্রাকসন্ধার অন্তরাল ভেঙে চিৎকার করে উঠল- বলল- চেয়ারম্যান, হামার কিছু কথা ছিল। হামাকে কোইহিতে দ্যাও, বাঁড়ার বাল’ – তার এই শব্দকটা অসভ্য নীরবতার মুখে কয়েকটা কড়া চড়ের মত প্রতিধ্বনিত হলো।

প্রাক-সন্ধ্যাটি ব্যস্তসমস্ত মাঘ দিনের অন্তিম বাঁকে এসে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকাচ্ছে। বাধ্য হয়ে সে ভয় দেখানো অন্ধরাতের দিকে পা বাড়িয়েছে। এখন বিরতি। দিন এবং রাতের মাঝে বিরতি। বিচার এবং বিচারকের ভেতরের বিরতি। মাগরিবের আজান এবং নামাজের সাময়িক বিরতি। মানুষ-বৃত্তটির অনেকেই এক-পা দু-পা করে বড় মসজিদের দিকে এগিয়ে গেল। পেছনে পড়ে থাকল তাদের ছায়ার চ্যুতিরেখা। কেউ কেউ বিড়ি সিগারেট খেতে উঠে গেল। আকণ্ঠ গূঢ়গাঢ় নিমজ্জমান কুয়াশা (অ)মঙ্গলের ভেতর বসে থাকল বাক্যরহিত আলো, কামরুল পাগলা আর হরিদাশ জমাদার। তাদের তিনজনকে ঘিরে রেখেছে অন্ধকারের পেটে বসে থাকা ভবিষ্যতের আর্তচিৎকার।

আর্তচিৎকারের প্রলয়

আলো জমাদার/ হরিদাশ জমাদারের মেয়ে / আঠারো বছর বয়সের আলো / হাসিখুশি আলো / সাহসী আলো / জেগে থাকা আলো / অপরকে জাগিয়ে রাখা আলো / অন্যকে আলো করানো আলো/ নদীর স্রোতের মতো বহমান আলো / অতলান্তিক ঢেউয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য স্বপ্ন ওড়াতে সক্ষম আলো / অন্ধকারের আলো / আলোর অন্ধকার। 

আলোর দেবতা তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল না। কিন্তু কেন? এর উত্তর দেবতা নিজেও দিতে অপারগ। অক্ষম দেবতা। অশুভের দেবতা। আলোর সর্বশেষ কথা তার দেবতার প্রতি – ‘হে দেবতা, তোমার দিকে হেঁটে যেতে গিয়ে কোনো সরলরেখা খুঁজে পাইনি আমি।’ অনভ্যস্ত স্বাক্ষরতার চেতনাজুড়ে দিগভ্রান্ত ছায়ার আস্ফালনে সেদিন দেবতার ছায়া ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিলো, আকাশের অন্তর্লীন মায়া ঢাকা পড়েছিলো প্রলুব্ধ মাঘের রক্তক্ষরণে। আলো নেই- আলো ছিলো না- তাই আলোর দেবতা সেদিন অনুজ্জ্বল ছিলেন, অন্যমনস্ক, ছিলেন নিশ্চুপ।

ইদানীং লক্ষ্মীপুর গ্রামে আলো-আঁধারির ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িঘরগুলো গা ঘেঁষাঘেঁষি অবস্থা থেকে বেরিয়ে পড়ছে। একে অন্যের সঙ্গে মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ করে দিচ্ছে। যারা পূর্বে রাত পাহারা দিতো তারাই আজ রাত চুরি করছে নিয়ম করে। এমনই একরাতে চুরি হয়ে গিয়েছিল আলো। দেবতার উদাসীনতায়, দেবতার ইশারায়, দেবতার দ্বারা চুরি হয়ে গিয়েছিল আলো।

তখন থেকেই বাক্যরহিত আলো। আলোরহিত বাক্য। বাক্যরহিত আলো। আলো-রহিত বাক্য। দেবতারহিত আলো। আলো রহিত দেবতা। দেবতারহিত দেবতা। দেবতারহিত দেবতা।

কামরুল পাগলা আলোর দেবতাকে চেনে। আলো কামরুল পাগলার দেবতাকে চেনে। তারা নিজে নিজেদের দেবতাকে চেনে না। দেবতা আবার তার নিজের দেবতাকে চেনে না। এই দেবতা-দেবতা কনসেপ্টটা খুব গোলমেলে, ভ্রান্তিমূলক।

হাওয়ার পালে তাল দিয়ে বর্ধিষ্ণু হবার আর কোনো সুযোগ নেই এই গ্রামের। এই গ্রাম। লক্ষ্মীপুর গ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বারঘরিয়া ইউনিয়নের অধীনে লক্ষ্মীপুর গ্রামের। কি মানুষে? কি আয়তনে? তাই গ্রাম মাঠ খাওয়া আরম্ভ করেছে। আর গ্রামের তরুণ মানুষগুলোকে খেয়ে ফেলছে কোরিয়া অথবা মালয়েশিয়া! গ্রাম খাচ্ছে মাঠ- বিদেশ খাচ্ছে মানুষÑ আর টাকা আসছে-  টাকা আসছে আর বাতাস কমছে। টাকা আসছে আর বাতাস কমছে বলেই ছোট ছোট অন্যায়ের ভ্রুণনিষিক্ত হয়ে জন্ম দিচ্ছে অন্যায় গাছ। অন্যায় গাছের ছায়াতে নির্বিঘ্নে জিরচ্ছে রঘু-শকুন। রঘু। শকুন।

রোগা একরোখা এলোমেলো গলিপথের হাত ধরে বাড়িগুলোর সদর দরজা পোলিও রোগীর মতো খোঁড়াতে খোঁড়াতে পাকা রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে এবং বিশ্বকৌটিল্যের সাথে নিজেদের একাত্মতা ঘোষণা করার চেষ্টা করছে। তাদের সেই চেষ্টায় রঙ লাগাতে থাকে প্রায় মাতাল- চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্যুতের পিলারগুলো। স্কুলপাড়া। কলাগাছের পচা কাণ্ডের মতো একটা ইটের সোলিং এগিয়ে গেছে স্কুল মাঠের দিকে। মাঠের দিকে। স্কুলের দিকে। স্কুলমাঠ। স্কুল সরে গেছে মাঠের দিকে। মাঠ সরে গেছে বিলের দিকে। বিল সরে গেছে আমনির দিকে। আমনি সরে গেছে ইটভাটার দিকে।

অন্ধ ক্ষেতে জেগে ওঠা অন্ধকার

হরিদাশ জমাদার-কামরুল পাগলা-আলোÑ প্রত্যেকে নিজেদের মাঝে একে অপরকে খুঁজে চলেছে। কিন্তু এ মাড় অন্ধকারে তাদের মুখ-আয়না জ্বলে উঠছে না বলে কেউ কাউকেই খুঁজে পাচ্ছে না। হঠাৎ কামরুল পাগলা বিড়বিড় করে বলে উঠছে –  ‘উড়োজাহাজ- উড়োজাহাজ।’ এই কথা বলেই চুপ মেরে যাচ্ছে সে। না কামরুল পাগলাকে কেউ ডাকেনি এখানে। সত্যিকার অর্থে কামরুল পাগলা এই গ্রামের যে কোনো বাড়িতে যেতে পারে। যেতে পারে যে কোনো অনুষ্ঠানে। বিচার সালিশ এমনকি বোর্ডঘরের মিটিং, স্কুল কমিটির সভা বা বার্ষিক ক্রীড়া অথবা ভোটের বুথ। সে অবাধে যেতে পারে রক্তক্ষরণে বা রক্তদানে। মসজিদ কিংবা পূজো মণ্ডপেও তার এ স্বাধীনতা অক্ষুণœ। সব জায়গায় তার অবাধ যাতায়াত। সত্যি বলতে কি এই গ্রামটাই কামরুল পাগলার। গ্রামের একনিষ্ঠ প্রহরীর মতো সে জেগে থাকে। হেঁটে বেড়ায় গ্রামের এক প্রান্ত থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। কামরুল পাগলা প্রতিদিন কারও না কারও কাছ থেকে একটা দুই টাকার নোট চেয়ে নেয়। টাকাটা নিয়ে ফুঁ দ্যায়, যেন টাকার গাঁয়ে লেগে থাকা সমস্ত পাপগুলোকে বাতাসে উড়িয়ে দেয় সে। নোটটাকে দলা পাকায় আর ডান হাতের বুড়ো আঙুল- তর্জনীর মাঝে নিয়ে ঘোরাতে থাকেÑ যেন পৃথিবীটিকে তার ইচ্ছেমত ঘোরাচ্ছে। মাঝে মাঝে বলে ওঠে উড়োজাহাজ-উড়োজাহাজ। একমাত্র পোশাক লুঙ্গি,  স্যান্ডো গেঞ্জি। বর্ষা-গ্রীষ্ম-শীত-ঈদ-মৃত্যুবাড়ি-বিয়ে অনুষ্ঠান, সবখানেই এই একই পোশাক। কামরুলকে কেন পাগল ডাকা হয় তা অজানা। সে কোনো দিন কাউকে খারাপ কথা বলেনি। কারও দিকে তেড়ে যায়নি। কাউকে গালি দেয়নি। কারো কোনো ক্ষতি করেনি। সমস্যা একটা- শুধু বলে, ‘উড়োজাহাজ-উড়োজাহাজ’ আর খুব ইচ্ছে হলে সামনে যাকেই পায় তার কাছেই এক কাপ চা খাবার আবদার করে। আরেকটা সমস্যা- কোনদিনই সে চেয়ার বা বেঞ্চে বসে না- মাটি তার একমাত্র আসন। খুব রেগে গেলে তার একমাত্র গালি – ‘বাল’।

কুয়াশা (অ)মঙ্গল – পুনশ্চ

অশুভ-মানুষ-বৃত্তটি আবার ফিরে এলো। কুণ্ডুলী পাকিয়ে পূর্ব বিন্যাস অনুযায়ী যে-যার আসনে বসে পড়লো। কান্তু হাগড়া শীত সন্ধ্যার শরীরে ছুরি চালানোর ভঙ্গিতে চিৎকার করে বলল, ‘হরি, তোর বেটি কিন্তুক চালা করছে না, কখন থ্যাক্যা ওর মুখ থ্যাক্যা আসল কথাটা শুন্যার ল্যাগ্যা বস্যা আছে এতো গ্যাল্যা মানুষ। সভাই পুছ কচ্ছে। তোর বেটি মুখ না খুল্লে একটা ড্যাহাটা হয়্যা য্যাবে কহছি। গাঁ ছাড়া হোল্যে কিছু কহিতে পারবি তখন? তুই বুঝা তোর বেটিকে। আসল কথাটা কইহতে কহা।’

হরিদাশ জমাদার একবার চেয়ারম্যানের দিকে তাকায়, একবার আলোর দিকে তাকায়, আরেকবার তাকায় কামরুল পাগলার দিকে। কি বলবে সে? কী-বা বলার আছে তার? শীতের জমাটবাঁধা শীত মুখ চেপে ধরছে তার। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না সে। অবশেষে মুখ নীচু করে মাটির দিকে তাকাতে থাকে হরি ওরফে হরিদাশ জমাদার। আলো বসে আছে। স্থির-অনড়-উদ্বেগহীন-নিশিন্ত। সে একবার তাকাচ্ছে চেয়ারম্যানের দিকে আরেকবার তাকাচ্ছে কামরুল পাগলার দিকে। সতের জন মানুষ, আলো, কামরুলÑ গণনার হিসাবে উনিশ। হঠাৎ কামরুল পাগলা কুয়াশার শরীরে আগুন জ্বালানোর ভঙ্গিতে চিৎকার করে বলল, ‘চেয়ারম্যান হামার কিছু কথা ছিলো, হামাকে কইহিতে দাও। বাড়ার বাল।’

চেয়ারম্যান এতক্ষণ রাগ প্রকাশ করার কোনো সুযোগ পাচ্ছিলো না। এবার পেল। তার বাম পাশে বসে থাকা কামরুল পাগলাকে সজোরে লাথি মারলো সে, ‘কুত্তার বাচ্চা চুপ, চুদির ভাই, কথা কহবি তো ম্যারা ফেলব, শোরের বাচ্চা। দেখছিস না এখ্যানে বিচার বস্যাছে, এর মধে তুই কি বাল কহ্যা উঠছিস। চুপ থাক হারামির বাচ্চা।’

বাস্তবিক অর্থেই কুঁকড়ে যাওয়া কুকুরের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিলো কামরুল, নিজের ভেতরে ঢুকে গেল অনিচ্ছা সত্বেও। কিন্তু ভেতরে ভেতরে জোর প্রস্তুতি নিতে থাকল। কুত্তার বাচ্চা, হারামির বাচ্চা, শোরের বাচ্চাÑ সবকটা গালিকে একসঙ্গে করে চেয়ারম্যানের গলা কামড়ে ধরবে সে। তখন চেয়ারম্যানের গলা দিয়ে কিভাবে এই শব্দগুলো বের হয় তা দেখবে কামরুল। কামরুল নিশ্চিত সেদিন তার কাগজের উড়োজাহাজ উড়বে। এই শীতস্তব্ধ কষ্টকাতর সন্ধ্যাতে সবার অলক্ষ্যেই সে তালি বাজাতে লাগল। সে তালি ছন্দ হয়ে এই গুমোট চক্রের ভেতর ধ্বনিত হতে থাকলো, যদিও এই শব্দ কামরুল এবং আলো ছাড়া আর কেউ শুনতে পেল না।

খেঁকশিয়ালের হুক্কা হুয়া চিৎকারের মতো চেয়ারম্যান আবার চিৎকার করে উঠলো,  ‘হরি তোর বেটিকে সত্য স্বীকার করতে কহা। হামি এই ইউনিয়্যানের চেয়ারম্যান হিস্যাবে হামার একটা দায়িত্ব আছে, হামি মানুষের মুখ কিভাবে বন্ধ করব? এতো বড় অন্যায় তোর বেটি করতে পারল? কত ঝনা বিচার চ্যাহিছে, বিচার তো হামাকে করতেই হব্যে। কি কহ জি তোমরা?’

কান্তু হাগড়া সুযোগের মুখে দেশলাইয়ের কাঠি ঢুকিয়ে বলল, চেয়ারম্যান, হামরা কিন্তু কহছি এগল্যা ম্যানা লিবো না। কি কহিছো জি সামসাদ দফাদার? কিছু কহনা নে কেনে তোমরা? হামি একলাই কহবো? এতো বড় অন্যায়? শালা দ্যাশের বহু-বেটিরা তো নষ্ট হয়্যা যাছে জি। ফুচকি ফুচকি ছ্যাল্যা প্যাল্যা গ্যাল্যাও তো শালা নষ্ট হয়্যা গ্যালো। হরি তোর বেটিকে মুখ খুলতে কহা কোহোছি। সন্ধ্যাবেল্যার আগে থ্যাক্যা ওকে লিয়া বস্যা আছি, উ কিন্তু চালা কর্ছে না।’

হরিদাশ কি বলবে? ও তো খুব ভালো করেই জানে কান্তু হাগড়ার স্বার্থ কি? ওইতো বিচার বসানোর জন্য একপায়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। হরিদাশের ডিহির পাশে কান্তুর ভিটা। কান্তুর ধান্দা তো হরিদাশের ডিহিখানির দিকে। হরিদাশ বলল, ‘হামি কি কহবো? হামার কিছু কহার নাই।’ এই কথা বলে হরিদাশ একবার চেয়ারম্যানের দিকে তাকায়, একবার আলোর দিকে, একবার কামরুল পাগলার দিকে। গ্রামের রাত ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা মানে ভয় বাড়তে থাকা। হরিদাশ জমাদারের ভয় লাগছে। এমন ভয় মুক্তিযুদ্ধের সময়ও লাগেনি, এমন ভয় যুদ্ধের পরের সময়ে যখন হিন্দুরা দলে দলে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছিলো তখনও লাগেনি। অনেকগুলো কুকুরমুখো মূর্তিমানুষের সামনে সে, তার মেয়ে আলো, সাত কাঠা পৈত্রিক জমি, বাকি দুই মেয়ে- খুব অসহায় এবং অনিরাপদ বোধ করছে সে। একমাত্র সাহস কামরুল পাগলা। কিন্তু কামরুল তো পাগলা, ও আর কি করবে? তবুও কেন যেন মনে হচ্ছে কামরুল পাগলাই একমাত্র যে এই বিপদ থেকে তাকে, তাদেরকে বাঁচাতে সক্ষম।

এই জমে যাওয়া মাঘ রাতে স্কুল মাঠের এই বৃত্তটার ভেতর একধরনের অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে। কানাঘুষা, গালিগালাজ চলছে। হঠাৎ দলাবদ্ধ কুয়াশা ভেঙে রঘু তেড়েফুঁড়ে আলোর দিকে এগিয়ে গেলো। রঘু, রঘু হচ্ছে চেয়রাম্যানের চামচা, তার সকল অপকর্মের হোতা। শুয়োরের মতো ঘোঁত ঘোঁত শব্দ তুলে খপ করে চাদরের উপর দিয়েই আলোর চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে লাগলো, বলতে থাকল, ‘ঐ মাগি, কহা কে তোর প্যাট কর‌্যাছে, কার ছ্যাল্যা প্যাটে ধর‌্যাছিস কহা মাগি, এতক্ষণ থ্যাক্যা এতো গ্যালা মানুষ তোকে জিগ্যাস করছে, কহা শালী, পর পুরুষের সঁতে শুতার সময় তোর মনে ছিলো না মাগি যে প্যাট হ্যায়া য্যাতে পারে। হারামি মাগি, চেয়ারম্যান কতো খন থ্যাক্যা বস্যা আছে, এতো গ্যাল্যা মানুষ পুছ করছে, কি রে মাগি এখন কহিতে শরম লাগছে, শুতার সময় এগল্যা মনে ছিলো না চুতমারানি মাগী’ – আলোর চুল ধরে ঝাঁকাতে এবং এতোগুলো কথা একনাগাড়ে বলতে গিয়ে রঘু কাহিল হয়ে গেছে। আলো মুখ খুলছে না। সে মুখ খুলবে না। সে মুখ খুললে তার দেবতা আরও নাখোশ হতে পারে। এতে দুশ্চিন্তায় দড়ির মতো শুকিয়ে যাওয়া তার বাবার আরও ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। শক্ত সুঠামদেহী মূর্তির মতো বসে থাকা আলোর সাথে পেরে উঠছে না রঘু। কিছুতেই পেরে উঠছে না, পেরে ওঠার কথাও না। রঘু এই পরাজয়টা মানতে চাচ্ছে না। আবার আলোর সাথে পেরেও উঠছে না। আলোর উপর যেন দেবী ভর করেছে। তাকে নড়াতে পর্যন্ত পারলো না রঘু, চেয়ারম্যানের পোষা কুকুর রঘু। এবার সে তেড়ে গেল কামরুল পাগলার দিকে, সে হারলে তো চলবে না, তাকে জিততেই হবে, না হলে তো চেয়ারম্যানের কাছে তার কোনো ইজ্জত থাকবে না, সে না জিতলে তো চেয়ারম্যানের হার হয়ে যাবে, চেয়ারম্যান হেরে যাওয়া মানে তো এতোগুলো কুকুরমুখো মানুষমূর্তির হেরে যাওয়া, সে হেরে যাওয়া মানে তো কান্তু হাগড়ার জমি দখল করতে না পারা। অতএব সে তেড়ে গেল কামরুল পাগলার দিকে। সজোরে লাথি মারলো কামরুল পাগলাকে, বলতে থাকল, ‘শোরের বাচ্চা, কি কহিতে চাহাছিলি কহ্যা, কি জানিস তুই, কহা শোরের বাচ্চা; পাগলা চোদা, কহা, কি জানিস। পাগলার সাক্ষী নাকি লিতে হয় না, তাও লিবো তোর সাক্ষী’ – সে একটানা কয়েকটা লাথি মেরে গেলো কামরুল পাগলার পিঠে, বুকে, মুখে।

কামরুল পাগলারও কি যেন হয়েছে আজ, অন্যদিন হলে সে হয় এখান থেকে পালিয়ে যেতো অথবা চুপ মেরে যেত। এতো মার খেয়েও আজ সে স্থির। কিচ্ছু বলছে না। যেন তার গায়ে ব্যথাও লাগছে না। রঘু অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও কামরুল পাগলার মুখ থেকে কিছু বের করতে পারলো না। রঘু বুঝে গেছে আজ তার হারার দিন। কামরুল বলে উঠলো, ‘চেয়ারম্যান, হামার কিছু কথা ছিলো, কহবো?’

আলো বিকট শব্দে হেসে উঠলো, তাঁকে দেখতে এখন কালিপূজার প্রতিমার মতো লাগছে। ভয়ঙ্কর, কালো, অন্ধকার। নিকষ কালো, অন্ধকারের মাঝেও ‘আলো’ যে আলোই তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আলো হাসতেই আছে। আজ তার হাসার দিন, আজ তার বিজয়ের দিন। সে একবার কামরুল পাগলার দিকে তাকাচ্ছে আর নিজের ভেতর ফুলে ওঠা দ্বিতীয় মানুষটার দিকে তাকাচ্ছে। সে হাসছে আর মনে মনে বলছে, ‘দেবতা হেরে গেলেন? হেরে গেলেন আপনি! আমি কিন্তু আমার পেটের ভেতর বেড়ে ওঠা দেবতাকে জন্ম দেবোই। সেই বলবে কে আমাকে চুরি করে নিয়ে গেছিলো? ঠিক আছে দেবতা? ততদিন আপনি কোথাও যাবেন না কিন্তু?’

চেয়ারম্যান হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, বলল, ‘আজক্যার ল্যাগ্যা বিচার মুলতবি; ক্যাল আবার বিচার বসবে। রঘু সভ্যাই কে কোহ্যা দে, ক্যাল সন্ধ্যার পর বিচ্যার বসবে। সভ্যাই য্যানে সময় মতোন চল্যা আসে।’ একথা বলে নিজের হেরে যাওয়া মুখটা মাফলার দিয়ে ঢেকে হনহন করে হোন্ডার দিকে এগিয়ে গেলো, চাবি ঘোরালো, কিন্তু কয়েকবার কিক করার পরও হোন্ডা স্টার্ট নিলো না। সম্ভবত শীতে ইঞ্জিন জমে গেছে অথবা চেয়ারম্যানের বিশ্বস্ত দোসর হোন্ডাও হেরে বসে আছে আজ।

আলোর খুব ভালো লাগছে। হেরে যাওয়া কুকুরমুখোমানুষ মূর্তিগুলো একে একে স্কুল মাঠ থেকে চলে যাচ্ছে যে-যার গন্তব্যে। আলো চুপচাপ বসে আছে। আলো হারবে না, কিছুতেই হারবে না। আলো তার পেটে বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় দেবতাকে হারতে দেবে না। আলো জিতে যাচ্ছে, জিতে যাচ্ছে কামরুল পাগলাও। এক এক করে স্কুলমাঠ থেকে সবাই চলে গেলো। হরিদাশ জমাদার সন্তর্পণে উঠে এসে মেয়ের মাথায় তার জমে যাওয়া হাতের নিথর আঙুলগুলো রাখলোÑ একধরনের উত্তাপ টের পেলো মেয়ের শরীরেÑ  সত্যের উত্তাপÑ  আলোর উত্তাপ- সাহসের উত্তাপ। ধীরে ধীরে সেও পা বাড়াল বাড়ির দিকে। একাকী মাঠে একটা টুলের উপর বসে থাকল তিনজন মানুষÑ মাটিতে কামরুল পাগলা, আলো এবং আলোর ভেতরের দ্বিতীয় দেবতা-মানুষ। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না, কেউ কোনো কথাও বলছে না। বিজয়ের উল্লাসও যে এতো নীরবে উদযাপন করা যায় তা এই মুহূর্তকে না দেখলে বোঝা যাবে না।

অব্যাহত কুয়াশা

সূর্য ওঠার আগেই লক্ষ্মীপুর গ্রামে একটা খবর চাউর হয়ে গেল। খুব খারাপ খবর, হরিদাশ জমাদারের জন্য আরও খারাপ খবর। কারো জন্য হয়তো এটা ভালো খবর হতেও পারে। দামুশের বিলে একটা মরা ভেসে উঠেছে। শরীর ফুলেও উঠেছে। ফজরের আজানের আগেই বিলে মাছ ধরতে গিয়ে মোতাহার মাঝি প্রথম লাশটাকে উপুড় হয়ে ভাসতে দেখে। বস্তা দিয়ে পেঁচানো, শুধু পা দুটো বের হয়ে আছে। মোতাহার মাঝি ভয়ে পালিয়ে আসে সেখান থেকে। বিল নিকটবর্তী বাড়ির কয়েকজনকে ব্যাপারটা জানায়। কিন্তু কেউ সাহস করে লাশটাকে ছুঁয়ে দেখার সাহস পায়নি। সবাই মিলে দৌড়ে গেছিল চেয়ারম্যানের বাড়ির দিকে। ব্যাপারটা চেয়ারম্যানকেই আগে জানানো উচিত। তারা বসে আছে চেয়ারম্যানের বসার ঘরে। চেয়ারম্যান গতরাতে অনেক দেরি করে ঘুমিয়েছে বলে সাহস করে কেউ তাঁকে ডাকেনি। চেয়ারম্যান যখন ঘুম থেকে উঠল ততক্ষণে সূর্য অনেকদূর এগিয়ে গেছে, এগিয়ে গেছে দামুশের বিলের দিকে। চেয়ারম্যান বসার ঘরে আসার পর সিংহাসন মার্কা চেয়ারে বসে মোতাহার মাঝিকে জিজ্ঞেস করলো, ‘মোতাহার? কি হয়্যাছে? কি দেখ্যাছিস কোহাতো?’ মোতাহার মাঝি ত্রস্তব্যস্ত হয়ে বলল, ‘চেয়ারম্যান হামি ফজরোক্তের আগে দামুশের বিলে মাছ ধরার ল্যাগ্যা গেছিনু, নোকা লিয়া বুঝল্যা, যেই একটু আগিয়্যাছি কি দেখনু জানো?’

‘আবে শালা কি দ্যাখ্যাছিস সেটা কহা’- হাই তুলতে তুলতে মোতাহার মাঝিকে জিজ্ঞেস করল চেয়ারম্যান।

‘বুঝল্যা? দেখনু একটা বস্তা ভ্যাস্যা আছে, হামি মনে করনু কিসের বস্তা? আরেকটু আগিয়্যা য্যায়্যা কি দেখনু বুঝল্যা চেয়ারম্যান, একটা মরা মানুষ, জি! হামি তো ভয়ে পালিয়্যা আস্যাছি। তোমাকেই আগে জান্যাতে চাহ্যানু। তুমি হ্যারঘে চেয়ারম্যান লও জ্বি?’

‘দেখ্যাছিস ওট্যা কার লাশ?’- চেয়ারম্যান বলল। উদ্বেগের কোনো লেশমাত্র নেই তার চোখেমুখে।

‘না জ্বি, সাহুস পায়নি হামি’- মোতাহার মাঝি বলল।

চেয়ারম্যান বাড়ির ভেতরে গিয়ে একটা টেট্রন শার্ট, ঢোলা জিন্সের প্যান্ট, একটা হলুদ কেডস পরে বেরিয়ে এলো, এসে বলল, ‘চল, আর কাহুকি জানিয়্যাছিস?’

দামুশ বিলে এসে চেয়ারম্যান দেখল গোটা গ্রাম উঠে এসেছে বিলের ধারে। মানুষে ভরে গেছে গোটা বিল। ছেলে বাচ্চা নারী পুরুষ বৃদ্ধ সবাই সব কাজ ফেলে ছুটে এসেছে দামুশের বিল পাড়ে। মরা ভেসে উঠেছে বিলে। এই দৃশ্য আগে কেউ কোনদিন দেখেনি এই অঞ্চলের মানুষ। সবাই হতবাক, সন্ত্রস্ত। কে মরল? কে বা মেরে ফেলল? এই তীব্র রোদ উপেক্ষা করে মানুষগুলো জড়ো হয়েছে বিলের ধারে। চেয়ারম্যান বিলের ধারে দাঁড়িয়ে খুঁজতে থাকল দুটি মানুষকে- আলো আর কামরুল পাগলা। না, তাদের দুই জনের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। এতক্ষণে পুলিশও এসে গেছে। পুলিশের ওসি চেয়ারম্যানের পাশে দাঁড়িয়ে সেভেন আপ খাচ্ছে। চেয়ারম্যানের কাছের মানুষ রঘু ও তার সহযোগীরা ভাসতে থাকা বস্তাবন্দী লাশটাকে ধারে টেনে আনার দায়িত্ব পেয়েছে। দায়িত্ব পেয়ে তারা নিজেদের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে। চেয়ারম্যান একটু একটু করে ঘামছে, সেটা রোদের তীব্রতায় নাকি অন্য কোনো কারণে বোঝা যাচ্ছে না, চেয়ারম্যান সেটা বুঝতে দিচ্ছে না।

অব্যাহতির মুখোশ

ফুলে ফেঁপে-ওঠা বস্তাবন্দী লাশটাকে টেনে আনতে গিয়ে ঘেমে উঠেছে ছয় সাত জন মানুষ। হাঁপাচ্ছে তারা। বিলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোও ঘেমে উঠেছে। সবার মুখে চাপা উত্তেজনা, উদ্বেগ, অজানা ভয়। কে এই বস্তার ভেতর? পুরুষ না মহিলা তা বোঝা যাচ্ছে না। বস্তাটাকে টেনে উঠানো হলো। পুরো গ্রাম একটা বৃত্ত বানিয়ে ঘিরে ধরেছে বস্তাবন্দী লাশটাকে। সবাই কাপড় দিয়ে নিজেদের মুখ চাপা দিয়েছে, সেটা গন্ধ থেকে নিজেদের নাসারন্ধ্রকে বাঁচাতে নাকি চেহারা লুকোতে কে জানে?

রঘু চিৎকার করে বলতে থাকলো, ‘এই হট, হট, চেয়ারম্যান আসসে, ওসি সাহেব আসসে, হট হট’ বলে ধাক্কা দিতে দিতে মানুষগুলোর জমাট উত্তেজনাকে কয়েক ভাগে ভাগ করল। বস্তাটার কাছে এসে দাঁড়ালো চেয়ারম্যান, দাঁড়ালো ওসি সাহেবও। চেয়ারম্যানের চোখ বস্তার দিকে নয়, চেয়ারম্যানের চোখ অগুনতি মানুষের দিকে; কোথাও আলো বা কামরুল পাগলা কাউকে দেখা যাচ্ছে না তো! না এদের দু’জনের কেউ নেই। রঘুকে বস্তা কাটার হুকুম দিলো ওসি। মানুষের আতঙ্ক চূড়ান্ত পর্যায়েÑ কে এই বস্তার ভেতরে? কে মরল? কাকে মারল? কারাই বা মেরে ফেলল? কেন মেরে ফেলল? এই গাঁয়ে তো এমন ঘটনা ঘটেনি কখনও। এই সময়ে সবচাইতে আগে যার থাকার কথা ছিলো তাকেই দেখতে পাচ্ছে না এই উপচে পড়া আতঙ্কিত ভিড়।

একটা বড় ছুরি দিয়ে চপচপে ভেজা টাইট বস্তা কাটতে গিয়ে রঘু আবারও হেরে যাচ্ছে এটা সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। না, হারা যাবে না, এতো মানুষের সামনে হারলে চেয়ারম্যান তাকে মাটিতে পুঁতে ফেলবে। আস্ত পুঁতে ফেলবে। বস্তাবন্দী লাশের পায়ের দিক থেকে মাথার দিকে খুব শ্লথ গতিতে ঘষঘষ শব্দ তুলে এগিয়ে যাচ্ছে ছুরিটা। খুব পরিচিত শরীরের গন্ধ পাচ্ছে ছুরিটা। হ্যাঁ, গত রাতেও এখানেই ছুরিটাকে চালানো হয়েছিলো একজনের শরীরে। যে হাত গত রাতে ছুরিটা চালিয়েছিল মনে হচ্ছে সেই একই হাত একই শরীরের উপর এখনও চালাচ্ছে ছুরিটা। ভিড়ের মধ্যে আরও কয়েকজন মানুষকে পরিচিত মনে হচ্ছে ছুরিটার, যারা গতরাতে এখানে উপস্থিত ছিল, যারা রঘুকে বলেছিলো মানুষটার উপর ছুরি চালাতে, ছুরিটার ইচ্ছার কোন মূল্য না দিয়েই। আসলে ছুরি তো আর নিজের ইচ্ছেতে কারো উপর চলে না, মানুষই তাকে চালায়। ছুরিটা চলছে। সম্ভবত একই মানুষের শরীরে, পার্থক্য শুধু জীবনের অস্তিত্ব, গতকাল শরীরটাতে প্রাণ ছিলো, এখন নিথর। ছুরির উপর ছুরি চালিয়ে তবে এভাবেই প্রমাণের সব ছাপ মুছে ফেলা হয়?

মানুষের আতঙ্ক ঠেলে কোথা থেকে হঠাৎ দামুশের বিল পাড়ে এসে হাজির হলো আলো এবং তার ভেতরের দ্বিতীয় দেবতা।  আতঙ্কগ্রস্ত ভিড়ের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়ে থাকা চেয়ারম্যানের দিকে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো সেÑ যেন কালিপূজার মণ্ডপ থেকে এইমাত্র দেবী এসে নেমেছে চেয়ারম্যানের সামনে, একধাপ পিছু হটলো চেয়ারম্যান, তার দৃষ্টি শূন্য, সে আলোর দিকে তাকাতে পারছে না। হঠাৎ চেয়ারম্যান আলোর কাছে হাত বাড়িয়ে একটা দু’টাকার নোট চেয়ে বসলÑ ফিসফিস করে আলোকে বলল, ‘উড়োজাহাজ-উড়োজাহাজ’। ভীড়ের ভেতর এই কথাগুলো আলো ছাড়া আর কেউ শুনতে পেল না।

পুরো লক্ষ্মীপুর গাঁয়ের উদগ্রীব মানুষের আতঙ্ক তর সইছে না আর? মানুষবৃত্তের মাথার উপর কয়েকটা শকুন উড়ছে, অনবরত ঘুরছে। বস্তাটা কাটা হওয়া মাত্র পুরো গ্রামের ভিড় সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো, ‘কামরুল, কামরুল পাগলা!’

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(12)

  1. গল্পের উপস্থাপনা আমার কাছে ভীষণ ভাল লেগেছে।তীরন্দাজ ও লেখককে শুভেচ্ছা।

  2. প্রথমে কবি, তারপর গল্পকার! মনে হচ্ছে গল্পেই বেশি যাচ্ছো আশরাফ! একটা গতি সাবলীলভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে গল্পটাকে…গল্পে থাকো, কবিতাতেও…

    1. আপা মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয়, যেদিকে ইচ্ছার পাল্লা ভারি মনে হয় সেদিকেই যাই। ভালো থাকবেন।

  3. গল্পের মাধ্যমে যে বাস্তবতার চিত্রায়ন তা ভালো লেগেছে।

    1. আপনি ঋদ্ধ পাঠক। অল্পতেই বলে দিতে পারেন। ধন্যবাদ

  4. কথা কারিগর গল্পের নির্মাণ, শব্দের বিন্যাস আর উপস্থাপনে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।সামজের নিত্য ঘটমান দৃশ্যও যে ভাষার যথাযথ প্রয়োগে পাঠকের মন ও মননের জায়গাটাতে করাঘাত করতে পারে গল্পটি তারই উজ্জ্বল উদহারণ।এমন আরও গল্প পাঠের আগ্রহ জিইয়ে রাখলাম। ধন্যবাদ কথার কারিগর ও তীরন্দাজকে।

  5. কবি গল্পকার ক্রিটিক নাহিদা আশরাফী যখন বলেন তখন এটা একজন লেখক হিসেব আমার কাছে তা আনন্দের বৈকি। ভালো থাকবেন।

  6. এ গল্পটি ভালো। ঘটনাটি আবহমান বাংলার। চিরন্তন। উপস্থাপনায় নিরীক্ষার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু আমার কাছে যেটা বাংলা গল্পের সংকট মনে হয় তা হলো এখনকার স্নায়ুছেঁড়া ঘটনার প্রকৃত কুশিলবরা আমাদের গল্পে আড়াল হয়ে যাচ্ছে। চেয়ারম্যান মেম্বারদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে অন্য কেউ। তারা গল্পের চরিত্র হয়ে উঠতে পারছে না। বঙ্কিম যে কারণে পারেন নি। আমাদের গল্পকাররাও সে কারণে তাঁদের সমকালকে রক্তমাংসসহ তুলে আনতে পারছেন না।

    1. খুব অল্প কথায় আপনি মূল ছুঁয়েছেন। ক্রিটিকস এর জায়গা থেকে আপনার দেখার দৃষ্টিকে সম্মান জানাতেই হচ্ছে। ভালো লাগা।

  7. গল্পে নতুনত্বের প্রকরণ। আবেগ আছে, অনুভূতি আছে, কলা আছে, রহস্য আছে। ফাঁকি নেই। গতিতে কোথাও সাবলীল কোথায়ও কিছু হোঁচট- যখন কাব্যিক আমেজ, অনুপ্রাস ও উপমা’র মিশ্রণ আছে; চিত্রনাট্যের অবয়ব কিছু আছে! বিভিন্ন রকমের বিন্যাস আছে। চিরন্তন গ্রাম্চত্র। আন্চলিক ভাষার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য অবদান; প্রসংশনীয়। অভিনন্দন। উৎসাহ লেখককে।

  8. সবুর খান স্যার, আপনাকে ধন্যবাদ, গল্পের ভেতরে গিয়ে এমন ঋদ্ধ আলোচনা করার জন্য।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close