Home পঠন-পাঠন আশরাফ জুয়েল / সব্যসাচীর তুলিতে মাইকেল অ্যাঞ্জেলো

আশরাফ জুয়েল / সব্যসাচীর তুলিতে মাইকেল অ্যাঞ্জেলো

প্রকাশঃ February 11, 2017

আশরাফ জুয়েল / সব্যসাচীর তুলিতে মাইকেল অ্যাঞ্জেলো
0
0

একজন স্থপতি স্থাপত্যশিল্প নির্মাণ করছেন তাঁর পূর্বতন আরেকজন স্থপতিকে নিয়ে। একজন সাহিত্যের স্থপতি অন্যজন শিল্পের; পরে শিল্পের স্থপতেই আবার হয়ে উঠেছেন কবিতারও স্থপতি। একজন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ, অন্যজন ইতালিয়ান তথা ইউরোপীয় রেনেসাঁর অন্যতম পুরোধা পুরুষ। এই ক্ষেত্রে দু-জনই স্রষ্টা। নিপুণ স্রষ্টা। প্রথমজন সব্যসাচী- সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক, দ্বিতীয় জন অ্যাঞ্জেলো- মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, যিনি একাধারে স্থপতি, চিত্রকর, ভাস্কর। তাঁর জগদ্বিখ্যাত সৃষ্টি- ‘ডেভিড’ আর ‘সিস্টিন চ্যাপেল- ছাদে আঁকা চিত্রবিশ্ব’। সাতান্ন বছর বয়সে খ্যাতির চূড়ায় এসে অ্যাঞ্জেলো কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করেন। তিনি প্রায় তিনশো সনেট এবং কণ্ঠসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। যদিও এই লেখাগুলো দীর্ঘদিন অপ্রকাশিতই থেকে গেছে। পরে এগুলো প্রকাশে সচেষ্ট হন মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর দৌহিত্র। তিনিই ১৬২৩ সালে মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কবিতাগুলো প্রকাশ করেন, যদিও কবিতাগুলো মূলরূপ থেকে কিছুটা ভিন্নতর ছিল। পরবর্তীতে জন আ্যডিংটন সাইমণ্ডস ১৮৭৮ সালে কবিতাগুলোকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং এর আদিতম রূপে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেন।

51ZyPRndmQL._SX320_BO1,204,203,200_ f93b64b450be2f22b857857e278d1827-22

একজন স্রষ্টা যখন আরেকজন স্রষ্টার সৃষ্টি নিয়ে তাকে আরও সুক্ষ্ণ ভাবে পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা করেন তখন সেটার সৌন্দর্য কতোটা অপরূপ হতে পারে, তা কল্পনায় নয়- বরং বাস্তবে না দেখলে বা না পড়লে বোঝা প্রায় অসম্ভব। এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কবিতা নয় বরং সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক কর্তৃক মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কবিতার অনুবাদ এবং এর পাঠ-প্রয়াস।

অতিপ্রজ মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো ডি লোডোভিকো বুওনারিটি সিমোনি, ইতালির ক্যাপ্রেসের তুস্কান গ্রামে ৬ মার্চ, ১৪৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন, ৮৮ বছর বয়সে ১৫৬৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মাইকেল অ্যাঞ্জেলো অবিবাহিতই ছিলেন, কিন্তু তিনি ভিক্টোরিয়া কোলোনা নামক এক মধ্যবয়স্ক ধার্মিক বিধবার প্রতি অনুরক্ত হয়েছিলেন। পরে টমাসো দ্যা কাভালিয়েরি নামক এক যুবকের সঙ্গে ছিলো তাঁর প্রেম। কিন্তু দেহসঙ্গ কি তাঁকে কবিতা লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো? বরং তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল বিমূর্ত সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার অনুধ্যান।

বাংলা ভাষার প্রধানতম কবি যখন তাঁর জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে অন্য ভাষার আরেক কবির কবিতা-কারুকৃতির প্রেমে পড়েন এবং সেগুলো অনুবাদ করেন নিজের ভালোলাগা থেকে, তখন সেগুলো কতটা সুখপাঠ্য হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সব্যসাচী সৈয়দ হক মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কবিতাগুলো পাঠ করতে গিয়ে অপার আনন্দে মেতে ওঠেন, অনুবাদ করেন যত্ন সহকারে, নিখাদ ভালোবাসা থেকে। কোন একটা কাজ ভালবাসা থেকে করলে সেটা কতোটা হৃদয়গ্রাহী হয় তা এই কবিতাগুলোর ভেতর দিয়ে গেলে সহজেই বোঝা যায়।

মাইকেল আ্যঞ্জেলো : তাঁর কবিতা, ‘পাথরে ও শূন্যপটে স্বর্গের দীপন’ নামের এই অনুবাদ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় এপ্রিল ২০১৩ সালে প্রথমা থেকে। সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক ২০০৯ সালে এই কবিতাগুলোর প্রাথমিক খসড়া করেন এবং ২০১২ সালের শেষ দিকে লন্ডনে থাকাকালে কবিতাগুলো পূনর্পাঠপূর্বক অনুবাদ করেন।

সব্যসাচীর অনুবাদে আমরা মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কবিতা এবং তাঁর কবিতার অন্তর্গত ভাবনার কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করব। এই অনুবাদ গ্রন্থে মোট ৪৯টি কবিতা আছে। কবিতাগুলো শিরোনামহীন। যদিও সূচিতে প্রত্যেকটি কবিতার প্রথম পঙতিটি কবিতার শিরোনাম হিসেবে সাজানো হয়েছে। প্রতিটি কবিতার সঙ্গে কিছু চিত্রকর্ম ব্যবহার করা হয়েছে; এগুলো মাইকেল আ্যঞ্জেলোর বিখ্যাত শিল্পকর্ম থেকে বাছাই করে নেয়া। মূলত মাইকেল আ্যঞ্জেলোর প্রেমের কবিতাগুলো এবং এর সঙ্গে কিছু ধর্মবোধের কবিতাও স্থান পেয়েছে এই সংকলনে। এই অনুবাদ সম্পর্কে সব্যসাচী সৈয়দ হক  ভূমিকাতে বলছেন, ‘কবিতার অনুবাদ অসম্ভব- অগত্যা তাঁর বার্তাই হয় ভিন-ভাষায় একমাত্র প্রাপনীয়; এবং ভিন-ভাষায় সেই বার্তা যদি কবিতা না হোক পদ্যও হয়ে ওঠে, তা-ই বা মন্দ কি?’ কবিতার একজন পাঠক হয়ে সব্যসাচীকে ধন্যবাদ দেয়া যেতেই পারে, যিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই সু-অনুদিত কবিতাগুলোকে আমাদের সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন।

মূল টেক্সট বা এর সঙ্গে কোন তুলনামূলক আলোচনা করার উদ্দেশ্যে এই লেখা নয়, কারণ আমরা সবাই জানি একটি কবিতা যখন অনুবাদ করা হয় তখন মূলত সেটি অনুবাদকের নিজস্ব কাব্যভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায়, হয়ে যায় তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি।

আমাকে ঘুমাতে দাও, পাথরের মতো ঘুম দাও।

কী আছে ঘুমের চেয়ে রমণীয় আর-

লজ্জা আর অপমানে নির্যাতনে ভরে আছে যখন সংসার।

দেখছি না শুনছি না, বুঁজে আছি দুচোখ আমার।

কথা আস্তে! চুপ! আমি ঘুমে আছি – কেন হে জাগাও?

(আমাকে ঘুমাতে দাও, পাথরের মতো ঘুম দাও)

এই কবিতাটি যেন সব্যসাচীর নিজেরই ভাবনা-রূপ, যেন তিনি নিজেকেই সৃষ্টি করেছেন। আসলে সৃষ্টিশীলতার অনুভবই কবিতা। যুগে যুগে এক-এক জন কবি একেকভাবে একেক ভাষায় তা প্রকাশ করে গেছেন। কিন্তু মূলভাব বা তার গূঢ়-গাঢ় রহস্য প্রায় একই। প্রায় পাঁচশো বছর পূর্বে ইতালি নিবাসী এক ভাস্কর কথাগুলো বলে গেছিলেন, এতোদিন তাঁরই অনুসারী কি চমৎকার ব্যঞ্জনায় সেগুলোকে বাংলাভাষায় রূপান্তর করলেন, এককথায় তা বিস্ময়করই বটে। ‘আমাকে ঘুম দাও, পাথরের মতো ঘুম দাও’ বা ‘কথা আস্তে! চুপ! আমি ঘুমিয়ে আছি- কেন হে জাগাও?’ এক চিরন্তন সত্যকে আমাদের সম্মুখে কতো সহজে উপস্থাপন করেছেন। এই ঘুম হতে পারে সাময়িক, হতে পারে স্থায়ী, আসলে ঘুম মানেই শান্তি, সেটা ক্ষণিকের হোক বা চিরদিনের জন্যই হোক। ঘুমাতে আমাদের হবেই, এটা চিরসত্য হয়ে ধরা দিয়েছে সৈয়দ হকের অনুবাদে; অ্যাঞ্জেলোর কবিতায়।

আমি- যে প্রার্থনা করি, হতোই গৃহীত

যদি তুমি দিতে প্রাণে বিনতির বল;

কেননা আমার মাটি এতটা পতিত-

সাধ্য কি ধরে কোনো ফল!

বিশুদ্ধ সুন্দর মূলে বীজ তোমারই তো-

যেখানে রোপণ করো সেখানেই বৃক্ষ হয়ে ওঠে।

সাধ্য কি মানুষ যদি তোমাতেই ভরসা না করে

পথের পথিক হয়- গন্তব্যে সে মোটে

পৌছুতে পারে না, পারে যদি তুমি থাকো হাত ধর।

(আমি- যে প্রার্থনা করি, হতোই গৃহীত)

মহান স্রষ্টার প্রতি গভীর আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে এই কবিতায়। বিধাতার প্রতি নতজানু হয়ে কবি বলছেন, ‘আমি- যে প্রার্থনা করি, হতোই গৃহীত, যদি তুমি দিতে প্রাণে বিনতির বল;’ সত্যিই তো এমন কী কোন শক্তি আছে যা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু তৈরি করতে পারে? আবার পরক্ষণেই তিনি বলছেন, বিশুদ্ধ সুন্দর মূলে বীজ তোমারই তো- যেখানে রোপণ করো সেখানেই বৃক্ষ হয়ে ওঠে’ সত্যিকারেই কতো অর্থপূর্ণ এই পঙতি দুটি। আমাদের কি এমন সাধ্য যে আমরা নতুন কিছু সৃষ্টি করব? অথচ বিধাতা ইচ্ছা করলেই যেখানে সেখানে যখন তখন সৃষ্টি করতে সক্ষম- সেটা মানুষ হোক বা গাছ-পালা অথবা প্রকৃতি বা পাহাড়। পরের কবিতাতেই তিনি আবার বলছেন : প্রভু, সেই দোয়া দাও, যেদিকেই চাই /  তোমাকেই যেন আমি দৃষ্টিপথে পাই। অথবা একই কবিতার শেষাংশে সৈয়দ হক বলছেন :

তুমি শক্তি, তুমি ইচ্ছা, হৃদয় গভীরে

বন্দী হয়ে পড়ে আছি খোসার শরীরে।

তুমি ছাড়া পতিতকে করে কে উদ্ধার!

তুমিই কারক শক্তি বদলে দেবার।।

(প্রভু,সেই দোয়া দাও,যেদিকেই চাই)

পঙতিগুলোকে শুধুমাত্র মাইকেল আ্যঞ্জেলোর কবিতার অনুবাদ বলা ভুল হবে। সব্যসাচীর হৃদয়ে যদি সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস না থাকত তবে কি তিনি এভাবে লিখতেন? আমার মনে হয় না, তাঁর অনড় ব্যক্তিত্বের যে সন্ধান তাঁর যাপিত জীবনে আমরা পেয়েছি, তাতে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সৃষ্টিকর্তা প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস না থাকলে তিনি এ ধরনের পঙতি রচনার দিকে অগ্রসর হতে পারতেন না। তিনি বলছেন, ‘প্রভু, সেই দোয়া দাও, যে দিকেই চাই, তোমাকেই যেন আমি দৃষ্টিপথে পাই’ প্রভুর সক্ষমতাকে নিবিড়ভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন।

মাইকেল এঞ্জেলোর কবিতা নির্মাণে আমরা কি দেখতে পাই? বাক্যগঠনে নিয়ম না-মানা বা বক্তব্য প্রকাশের ঝোঁক। সৈয়দ হক এক্ষেত্রে ছন্দ-স্তবক মেনে কবিতার মূল ভাবকে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। নিম্নোক্ত কবিতার পঙতিগুলোর দিকে যদি তাকাই-

তোমাকে দেখেই যদি ভাব এসে যায়,
একই সাথে মৃত্যু এসে সমুখে দাঁড়ায় –
তখন সৃজন আর শিল্প গলে যায়।

লোকে বলে মৃতেরাও ফিরে জন্ম পায়,
তাই যদি – শিল্প যদি তখনও শিরায় –
আবার হাতুড়ি তুলি তোমারই সেবায়।

(তোমাকে দেখেই যদি ভাব এসে যায়)

উপরোক্ত কবিতায় সব্যসাচী মূল কবিতায় মাইকেল মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর বক্তব্যকে প্রাধান্য দেবার সঙ্গে সঙ্গে নিবিড়ভাবে মনযোগী হয়েছেন ছন্দের দিকে। ‘লোকেরা বলে মৃতেরাও ফিরে জন্ম পায়’ এখানে ব্যক্যস্থিত ভাবের প্রতি গুরুত্ব দেবার সাথে সাথে ছন্দের দিকটাও সূক্ষ্ণভাবে ফুটে উঠেছে। ‘তাই যদি – শিল্প যদি তখনও শিরায়-‘ এই পঙতিতে পূর্নাঙ্গ বাক্য গঠন হয়তো ব্যাহত হয়েছে কিন্তু কবিতার মূল ভাব-ভাবনার জায়গা অটুট আছে।

তোমার প্রেমের দীপ্তি! কেটে যেতে থাকে মৃত্যুভয়;

আমিও অমর তবে হতে পারি- ক্ষীণ আশা হয়।

কিন্তু এ বৃক্ষের ফল কবে শুষ্ক, কবেই পতিত;

একদা রসালো ছিলো, মুখে নিলে এখন কি তিত!

ঘরবন্দী পড়ে আছি, তুমি বড্ড দেরি করে এলে;

এমন উত্তাল প্রেম- কী জানি কী হতো আগে পেলে

এখন বেদনা শুধু, বেদনাই সুখ ঠেলে ওঠে;

তবুও কৃতজ্ঞ আমি- এইটুকুই কার ভাগ্যে জোটে!

এখন মৃত্যুই যদি, অন্ধকার নেমে আসে ওই;

আমি তো প্রেমের নয়- উদ্বেগের ফাঁসে নিহতই।

(তোমার প্রেমের দীপ্তি)

উপরের কবিতায় মাইকেল অ্যাঞ্জেলো প্রেমিককে প্রেম এবং বিরহের তফাতমূলক জগতে প্রবেশ করতে বাধ্য করান। তাঁর এই কবিতার সুখপাঠ্য অনুবাদ করে বাংলা ভাষার পাঠকদের এক অনাবিল আনন্দে ভাসিয়েছেন সব্যসাচী সৈয়দ হক। তিনি অসাধারণ কিছু পঙক্তি অনুবাদের মাধ্যমে পাঠককে উদ্বেল করে তুলেছেন, অনুবাদ করছেন, ‘তোমার প্রেমের দীপ্তি! কেটে যেতে থাকে মৃত্যুভয়; আমিও অমর তবে হতে পারি- ক্ষীণ আশা হয়’- প্রেমিকার প্রেমের দীপ্তিতে মৃত্যুভয় পর্যন্ত কেটে যেতে থাকে, অমরত্ব লাভের ক্ষীণ আশায় প্রেমিক একধরণের দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। আবার একেবারে শেষ এসে তিনি অনুবাদ করছেন, ‘এখন মৃত্যুই যদি, অন্ধকার নেমে আসে ওই; আমি তো প্রেমের নয়- উদ্বেগের ফাঁসে নিহতই’- প্রেমিক শত চেষ্টা করেও বুঝে যায় সে হয়তো সে প্রেয়সীকে পাবে না, তখনই আক্ষেপে-শোকে বলে ওঠে, প্রেমের ফাঁসে যেহেতু মরতে পারল না, উদ্বেগের ফাঁসেই মরবে।

কী হবে আর এসব ভেবে, দুই মৃত্যু যখন সমুখে?

একটি নিশ্চিত আর একটি তো পথের বাঁকেই-

ভাবনার অন্ত নেই, হৃৎপিণ্ড চলে ধুঁকে ধুঁকে।

মর্মর পাথর আর চিত্রপটে ভরসা তো নেই!

এক মৃত্যুই মানুষের সমস্ত গতিশীলতাকে স্তব্ধ করে দিতে পারে, সেখানে কবি বলছেন দুই মৃত্যুর কথা। এক মৃত্যু নিশ্চিত আরেক মৃত্যু সম্মুখে, সেইখানে ভাবনার কোন অন্ত নেই। হৃৎপিণ্ড যেখানে চলছে ভয়ে ভয়ে, সেখানে কি হবে চিত্রপটে ভরসা রেখে।

মাইকেল অ্যাঞ্জেলো চিত্রকর, ভাস্কর, স্থাপত্যবিদ এবং কবি। পৃথিবীর সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে তাঁর কবিতাগুলো আলাদা স্থান দখল করে আছে। তাঁর কবিতা পড়লে মনে হতে পারে যেন তিনি প্রতিটি কবিতাকে হাতুড়ির ছেনি দিয়ে খুব যত্ন সহকারে ধীরে ধীরে নির্মাণ করেছেন। কবিতার শরীরে ঢেলে দিয়েছেন এক নতুনতর ব্যঞ্জনা। উনিশ বছর বয়সে তিনি নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন হিসেবে দেয়ালচিত্র আঁকেন, ঊনচল্লিশ বছর বয়সে হয়ে ওঠেন খ্যাতিমান স্থাপত্যবিদ, সৃষ্টি করেন বিষ্ময়জাগানিয়া শিল্পকর্ম- যেগুলো দেখলে যে কেউ মনে করতে পারেন যে এসব শিল্পকর্ম হয়তো মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর হাত ধরে সরাসরি স্বর্গ থেকে মর্তে নেমে এসেছে। আবার দেখা যায় সাতান্ন বছর বয়সে সেই তিনিই কবিতা নির্মাণে উঠেপড়ে লাগেন, মাত্র পনের বছর চর্চার মাধ্যমে তিনি সাহিত্যজগতেও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে জাজ্বল্যমান হতে থাকেন। শেষ বয়সে এসে আবার মননিবেশ করেন স্থাপত্য নির্মাণে।

অন্যদিকে কবিতাগুলোর অনুবাদক সৈয়দ শামসুল হক নিজেও বাংলা ভাষার এমন কোন মাধ্যম নেই যেখানে তাঁর সৃষ্টিস্পর্শে মুখরিত হয়নি। তিনি যে কত বড় অনুবাদক তা এই অনুবাদগ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে পাঠকের কাছে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। এই অনুবাদ কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা পাঠকের মনে অনন্য দ্যোতনা সৃষ্টি করবে, অন্তত, আমার তাই হয়েছে। সৈয়দ শামসুল হক একেবারেই তাঁর নিজস্ব কাব্যশৈলীকে ব্যবহার করে মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কাব্য-ভাবনার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে গিয়ে কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন এবং বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের সঙ্গে মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কাব্যজগতের সাথে নিবিড় আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করে দিতে সক্ষম হয়েছেন। অনুবাদক হিসেবে এখানেই তিনি দারুণভাবে সফল, আর পাঠক হিসেবে এর রসাস্বাদন করতে পেরেছি আমরা- বাংলা কবিতার পাঠকেরা।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close