Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ আহমেদ লিপু / শহিদুল আলমের ঘুণপোকার সিংহাসন কিংবা আধুনিক শিল্পনিরীক্ষার প্রয়াস

আহমেদ লিপু / শহিদুল আলমের ঘুণপোকার সিংহাসন কিংবা আধুনিক শিল্পনিরীক্ষার প্রয়াস

প্রকাশঃ January 16, 2017

আহমেদ লিপু / শহিদুল আলমের ঘুণপোকার সিংহাসন কিংবা আধুনিক শিল্পনিরীক্ষার প্রয়াস
0
0

 

ছোটগল্প হচ্ছে প্রতীতি-(impression) জাত একটি সংক্ষিপ্ত গদ্যকাহিনী যার একতম বক্তব্য কোনো ঘটনা বা কোনো পরিবেশ বা কোনো মানসিকতাকে অবলম্বন করে ঐক্য-সংকটের মধ্য দিয়ে সমগ্রতা লাভ করে।…সে একাঘ্নী বাণ। স্থির লক্ষ্যে, বিদ্যুৎগতিতে, একটি ভাবপরিমাণকে মর্মঘাতীরূপে বিদ্ধ করতে পারলেই তার কর্তব্য শেষ- তার গঠনের ইতরবিশেষ খুব বেশি কিছু আসে-যায় না।

[নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় / সাহিত্যে ছোটগল্প]

রূপান্তরিত কাল আর বিবর্তিত জীবনের উত্তাপ নিয়ে শিল্পের নতুন নতুন রূপ আমাদের সম্মুখে হাজির হয়। কৃষিনির্ভর সভ্যতা আর সমাজের যৌথ জীবনাবেগ মহাকাব্য সৃষ্টির পটভূমি তৈরি করেছে, আবার যুদ্ধোত্তর সমাজে ব্যক্তির স্বতন্ত্র জিজ্ঞাসার প্রতিক্রিয়ায় জন্ম হয়েছে গীতিকবিতার। আর আধুনিক জীবনের যন্ত্রণা থেকে সাহিত্যের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছোটগল্পের সৃষ্টি ও বিকাশ। বিশ্বাসের অপমৃত্যু, পুরনো মূল্যবোধগুলোর অকার্যকারিতা, ব্যক্তিচেতনার সঙ্গে সমাজচেতনার সামঞ্জস্যহীনতা উনিশ শতকের আত্মসচেতন মানুষকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এই প্রশ্নশীলতা থেকেই জন্ম নেয় অবিশ্বাস ও বিদ্রোহের। তাই এ শতকের মানব-চৈতন্য বিদ্রোহপ্রবণ, সংশয়াকুল। এই যুগমানসই ছোটগল্পের ভাবসত্যকে জন্ম দিয়েছে আর সংবাদপত্র নির্মাণ করেছে তার কায়ারূপ।

সাহিত্যে উনিশ শতকের একটি অভিনব উদ্ভাবন ছোটগল্প। ‘এ নভেলও নয়, রোমান্সও নয়। এ কবিতার মতো ঐক্যভাবাশ্রয়ীÑ অথচ কল্পনামুখ্য নয়, জীবননির্ভর। আবার সেই জীবনের সামগ্রিকতার প্রতিচ্ছবিও এতে নেই- এতে (রয়েছে) খণ্ডতার ব্যবহার।’

কেন ঘুণপোকার সিংহাসন

বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ছোটকাগজ আন্দোলন এখনও আদর্শ হিসেবে না হলেও প্রকল্প হিসেবে বিদ্যমান। এর কুশীলবদের অনেকেরই মেইন স্ট্রিমের বড়সড় মাঠে খেলবার মতো দম, স্ট্যামিনা, স্কিল ও কোয়ালিটি আছে কিনা তা অপরীক্ষিত। শহিদুল আলমকে ছোটকাগজ অ্যারেনার বিশ্বস্ত গল্পকারই বলা চলে। যদিও আমরা জানি, সাহিত্যে ছোটগল্পের বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা অনেকখানি। ঘুণপোকার সিংহাসন দিয়েই তিনি ছোটগল্পের জগতে পদার্পণ করেছেন। পরবর্তীতে লালমোরগের ঝুঁটি ও বোবা চিৎকার-এর মধ্য দিয়ে  তিনি এই পদযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। পাঠকদের উপহার দিয়েছেন ‘জলের উল্লাস’, ‘লালমোরগের ঝুঁটি’ ও ‘বাজি’র মতো ছোটগল্প। তাঁর উন্মেষকালীন শিল্পবাজির নিরীক্ষা প্রচেষ্টাই আমাদের অদ্যকার এই নির্বাচনের হেতু।

ছোটকাগজ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার মোটিফ (motive) থেকেই সম্ভবত ‘ঘুণপোকার সিংহাসন’ প্রত্যয়টির আবির্ভাব, যেখানে ঘুণপোকারা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ভেতর থেকে বিনাশ সাধনে সক্রিয়ভাবে উদ্যত। প্রায় প্রত্যেক কবি-মনোভাবাপন্ন সৃজনশীল ব্যক্তিই যৌবনের প্রারম্ভে প্রতিষ্ঠানের বিনাশ সাধন বা অপনোদনের কথা ভাবেন কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রের কোনো বিকল্পও তারা সার্থকরূপে প্রস্তাব করেন না। তাদের যৌবনের স্থায়িত্বের সঙ্গেই এ ভাবনা স্থায়িত্ব ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।

উত্তরাধিকার সূত্র

ছোটগল্পের উন্মেষের প্রেক্ষাপট আমরা পূর্বেই সংক্ষেপে আলাপ করেছি। আর তিনি তার গল্পের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমি হিসেবে পেয়েছেন স্বাধীনতা-পরবর্তী স্বপ্নভঙ্গের আশাহত বেদনাকে। শিল্পের ক্ষেত্রে পশ্চিম ইউরোপ হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে বাহিত প্রকরণ- নির্ভর হতাশ নেতিবাদী বোদলেয়ারীয় আধুনিকতাকে তিনি ও তার বন্ধুরা নিয়েছিলেন শিল্প-উন্মাদনা হিসেবে। এই আধুনিকতার স্বরূপ তারা সম্যকরূপে অনুধাবনে সক্ষম ছিলেন এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ফলে অনেকটা তাদের অগোচরেই এটি তাদের স্টাইলে একটি স্থায়ী ছাপ ফেলেছে।

গ্রন্থটির উৎসর্গপত্রে তিনি আমাদের জানাচ্ছেন, অনিন্দ্য, সংবেদ, গাণ্ডীব এই তিন তিনটি আকাশের নিচে তার মন যেন আলো হয়ে উঠেছিল। আমরা জানি, এই তিনটি ম্যাগাজিনের চরিত্র তিন রকমের- অনিন্দ্যের প্রথম দিকে হুমায়ুন আহমেদ,  জাফর ইকবালদের লেখা প্রকাশিত হলেও পরে সে তার একান্তই নিজের নিরীক্ষাধর্মী চরিত্র খুঁজে নেওয়ার প্রয়াস পায়; সংবেদ ছিল মূলত ছোটগল্পের কাগজ, এর চরিত্র ছিল সমন্বয়ধর্মী। শহিদুল আলম নিজেও ছিলেন এর অন্যতম সম্পাদক। আর গাণ্ডীব মুখ্যত কবিতার কাগজ যার চরিত্র অনেকটাই র‌্যাডিক্যাল। চুপি চুপি বলি, শহিদুল আলম তাঁর যৌবনের প্রারম্ভে কিছুদিন কাব্যচর্চাও করেছিলেন। সে যাই হোক, এই তিন ধরনের চরিত্রের সঙ্গে মানসিকভাবে একাত্মতা পোষণ করতে পারা স্থূল বাস্তবতাজনোচিত হলেও শিল্পীমননের সাপেক্ষে কিছুটা পিকিউলিয়ার বৈকি! এর ফলে কোনো রূঢ় সমালোচক মন্তব্য করতে পারেনÑ তার বিকল্প চর্চা আদর্শ নয়, প্রকল্পমাত্র।

কিছু বিবেচ্য উপাত্ত

শহিদুল আলমের গল্পে শিল্পচেতনা-সক্ষমতার বিবেচনায় আমরা তার কাজকে ছোটগল্পের কিছু শিল্প-মানদণ্ডের নিরিখে বিবেচনা করব এবং এসব উপাত্তগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ও সমন্বিত আলোচনার মধ্য দিয়ে এই বিবেচনাকে পূর্ণাঙ্গ করে তুলতে সচেষ্ট হব। বিবেচ্য উপাত্তগুলো হচ্ছে ক. গল্পের মাঝে একটি (মাত্র) চরমক্ষণ/মহামুহূর্ত (climax) সৃষ্টি হয়েছে কিনা; গল্পটি ঘটনাশ্রয়ী বা বিশেষ কোনো ভাবের পরিবাহক কিংবা কোনো চরিত্রের প্রকাশমূলক যা-ই হোক না কেন- সেটি উপযুক্ত তীব্রতা বা গভীরতা লাভ করেছে কি-না, খ. ভাবের একমুখিনতা রক্ষিত হয়েছে কি-না; আখ্যায়িকা (tale) ও বৃত্তান্তের (anecdote) প্রবণতা দৃশ্যমান কি-না গ. বিবৃতিমূলকতার চেয়ে পরোক্ষ ইঙ্গিতধর্মিতা প্রাধান্য লাভ করেছে কি-না ঘ. বিষয়বস্তুর সঙ্গে গল্পের ভাষা কতটুকু সাযুজ্যপূর্ণ; প্রকাশ-প্রতীকের (expressive symbol) নির্বাচন ও ব্যবহারে লেখক কতটুকু সফল ঙ. গল্পে দেশ-কাল ও জীবনদর্শন দ্বারা গঠিত লেখকের ব্যক্তিত্ব কতটুকু প্রতিফলিত/প্রস্ফুটিত হয়েছে চ. সর্বতোভাবে প্রতীতির সমগ্রতা (Unity of Expression) রক্ষিত হয়েছে কি-না ছ. গল্পের ব্যাপ্তির মাঝে বৃহতের সত্য প্রতিফলিত হয়েছে কি-না জ. সমাপ্তির ধরন ও নামকরণের যৌক্তিকতা রয়েছে কি-না ইত্যাদি।

অনুপ্রবেশ

‘রাজেনবৃত্তান্ত’ গল্পটি বাইরের উপকরণকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করে স্বতন্ত্ররূপে তার জন্মান্তর ঘটানোর জন্য লেখক রচনা করেননি বরং বস্তুভূমিটিই লেখককে আকর্ষণ করেছে, তাকেই প্রধানভাবে প্রকট করার জন্য তিনি একটা গল্প তাতে মিশিয়ে দিয়েছেন। এখানে বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা, তত্ত্বÑ সবই আছে। এমনকি গল্পপাঠ সাঙ্গ করে অন্তরে তেমন অতৃপ্তি থাকে না, মনে হয় না ‘শেষ হইয়া হইল না শেষ’। বরং ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণ, জীবনানন্দের কবিতা ও মিশিমার (জাপানি গল্পকার) গল্পরস আস্বাদনে সক্ষম একটি লেখক-ব্যক্তিত্ব এখানে বেশ স্পষ্টরূপে ফুটে ওঠে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ছোটগল্প যে গল্পকারের Perfect opportunity to project himself- একথা তিনি বেশ স্পষ্টরূপে মনে রেখেছেন। গল্পের শুরুতেই তিনি একটি কৌতূহলকে পাঠকের সম্মুখে অনেকটাই দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। এরপর কিঞ্চিত অলস মন্থর গতিতে রাজেনের মনস্তত্ত্বের উন্মোচন করেছেন। এই উন্মোচনের প্রক্রিয়ায় তেমন সার্থক climax বা চরমক্ষণের উপস্থিতি আমরা টের পাই না। বরং আমরা পাই মিশিমার রেফারেন্স, ফ্রয়েডের তত্ত্বের আলাপ ও জীবনানন্দের  ‘মেয়ে’ কবিতার ১১টি চরণের উদ্ধৃতি। সার্থক ছোটগল্পের জন্য এগুলো তেমন সহায়ক কিছু না। এ প্রসঙ্গে আমরা চেকভের স্মরণ নিতে পারি; চেকভ তার বন্ধুর রচিত একটি গল্পে জ্যোৎস্নারাত্রির বর্ণনায় প্রচুর পরিমাণ কবিত্বের বৃষ্টি ঝরা দেখে তাঁকে লিখেছিলেনÑ ‘উঁহু এ নয়Ñ এতে হবে না। যদি সত্যিই তুমি চাঁদের আলোর বর্ণনা করতে চাও, তাহলে কেবল দেখিয়ে দাওÑ কারখানার পাশের জলাটার ধারে একটা পুরনো ভাঙা বোতলের গায়ে জ্যোৎস্না কিভাবে ঝিকমিক করে জ্বলছে।’ বিষয়বস্তুর সঙ্গে তাঁর ব্যবহৃত ভাষা [দু-একটি আঞ্চলিক শব্দের (ভিজে, তিনটে ইত্যাদি) ব্যবহার বাদে] সাযুজ্যপূর্ণ, প্রকাশ-প্রতীক হিসেবে শিশু-দানবটির নির্বাচন ও ব্যবহারেও লেখক মোটামুটি সফল। যদি তিনি গল্পে ভাবের একমুখিনতা রক্ষা ও গল্পের স্বল্পতম ব্যাপ্তির মাঝে বৃহত্তর সত্যকে ইঙ্গিতময়তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে অধিক সচেষ্ট হতেন তাহলে আমরা কাহিনির ধূপ নিভে যেতে দেখলেও ভাবের সৌরভটিকে মোহ বিস্তার করতে দেখতাম, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তা ব্যাহত হয়েছে।

‘রুকু, ডাইনী চাঁদ অথবা পোড়ো মন্দিরের গল্প’ ঘটনাশ্রয়ী গল্প। স্বপ্নগ্রস্তের স্বপ্নের পেছনে ছুটে তার নাগাল না পেয়ে নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে ‘অনুভব ও জৈবিক জগতের বোধগম্যহীন চিন্তাশূন্যতার অচৈতন্যে’ উপনীত হওয়াই এর উপজীব্য। সর্বজ্ঞ গল্পকার এখানে উত্তমপুরুষে নিজেকে গল্পে সংশ্লিষ্ট করেন নাই, যা অত্র গল্পগ্রন্থের অধিকাংশ গল্পে ঘটেছে। তবে গল্পের ভেতর দিয়ে লেখকের যে ব্যক্তিত্ব প্রস্ফুটিত হয়েছে তা মর্বিডিটি আক্রান্ত। তাঁর উপস্থাপিত ভাষ্যে যথেষ্ট ডিটেইলিং থাকলেও প্রকাশ-প্রতীক নির্বাচনে তাঁর ব্যক্তিত্বের গভীর ছাপ পড়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে, লেখকের ব্যক্তিত্ব, তার সমাজ-পরিবেশ এবং সর্বোপরি তাঁর শিল্পবোধের প্রভাবেই প্রকাশ প্রতীক গড়ে উঠে। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখি, একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সমারসেট মম উত্তর মেরুতে যাত্রা করেন আবার আন্তন চেকভ হয়তো একটি দীন-দরিদ্র কেরানির জীবনেই তা খুঁজে পান। শিলার হয়তো একটি গ্রাম পোড়ান আর শেক্সপিয়ার একখানি রুমাল ফেলে দিয়েই কাজটি সারেন। আর আমাদের লেখক তো ধর্ষণ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছেন। অবশ্য অত্র গল্পটিসহ গ্রন্থভুক্ত প্রায় সব গল্পেই তরুণ লেখকের ব্যক্তিত্বে নারীকে নিয়ে একধরনের ফ্যান্টাসি দেখা যায়। যেমন এর পরবর্তী গল্পটিতে তিনি ‘সম্পূর্ণ উলঙ্গ শরীরে’ বারোটা সশস্ত্র চোখের সম্মুখে নারীনৃত্যেরও এন্তেজাম করেছেন। এমনকি সর্বজ্ঞ লেখক বলছেন, ‘শরীরে কিঞ্চিত আবরণ সমেত একই ধরনের নাচ আমি বাংলা কিংবা হিন্দি বই-য়ে দেখেছি।’ পৃ. ৫২

সে যা-ই হোক, গল্পের প্রত্যেকটি চরিত্রের আচরণের ব্যাখ্যা কাহিনির মধ্যে নিহিত নেই বলেই প্রতীয়মান (কেন্দ্রীয় চরিত্রটি এর ব্যতিক্রম)। ফলত, কাহিনি ও চরিত্রের মধ্যে যে অনিবার্যতা ও সম্ভাব্যতার কথা আমরা সচরাচর শুনি, যেখানে কাহিনির প্রত্যেকটি ঘটনা ও চরিত্রের প্রত্যেকটি আচরণ কাহিনির ভেতর থেকেই উদ্ভূত হবে, বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে নাÑ রক্ষিত হয়নি। যদি রক্ষিত হতো তবে আমরা বলতে পারতাম, কাহিনি পূর্ণতা পেয়েছে। চরিত্র, অভিপ্রায় ও ভাষার মধ্য দিয়ে, সবমিলিয়ে যা গড়ে উঠেছে তা-ই কাহিনি। কাহিনি একটি বিশেষ ক্রিয়ার সংগঠক। রস-গ্রাহক [পাঠক] আর চরিত্র সেই ক্রিয়ার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত, বিবর্তিতÑ আর সেই সমস্ত সংগঠন, সমস্ত বিবর্তনকে ধরে আছে কাহিনি। অবশ্য গল্পের সমাপ্তিতে তিনি দিনের শেষে যেমন ধীরে ধীরে বিকেলের ছায়া বিকীর্ণ হয়ে পড়ে সেই ধীর স্বাভাবিক পরিণামকেই তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছেন, অপ্রত্যাশিত চমক দিয়ে পাঠককে স্তম্ভিত করে ডযরংঢ়বৎধপশ বহফরহম-এর কোনো চেষ্টাই তিনি করেননি; যেটা ‘ম্যাগাজিনিস্ট’ লেখকরা সচরাচর করে থাকেন।

‘পাতাল ভ্রমণ’ গল্পটি আমরা প্রচলিত অর্থে যাকে আন্ডারগ্রাউন্ড বলে জানি সেখানকার এক মধ্যম গোছের হর্তাকর্তার জন্য বড়ো  ‘অবিবেচনার রাতে’-র কর্মকাণ্ড নিয়ে রচিত। অবশ্য একে গল্প না বলে টেল বা আখ্যায়িকা বলাই শ্রেয়। একাধিক অনুত্তীর্ণ ক্লাইমেক্স, ঘটনার বিস্তার মিলে একে আখ্যায়িকার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এর আরম্ভ কিংবা শেষও ঠিক ছোটগল্পসুলভ নয়। অথচ এর কাহিনিতে দুটি খুন ও একটি উলঙ্গ নারী-নৃত্যের অবতারণা ঘটেছে বেশ ডিটেলস সহযোগে। যেখানে ‘নগ্ন নারী, সে যে-ই হোক না কেন,…কাম-গন্ধ-স্পর্শহীন শূন্য হয়ে ওঠে।’ কাহিনির বয়ানেও দু-এক জায়গায় গড়-বড় রয়েছে। যেমন : সন্ত্রাসীদের আস্তানায় প্রবেশের সময় লেখকের বন্ধু তাকে বলছে তার এক সহযোগীর কথা যে অন্য এক গ্রুপের গুলিতে ইহজগতের মায়া ত্যাগ করেছে। কিন্তু কাহিনির প্রায় শেষের দিকে এসে আমরা দেখছি সে কাদের জাহিদ যে-ই হোক তার ঠিক গুলিতে মারা যাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। বিশেষত জাহিদ হলে তো একেবারেই না। যদিও গ্রন্থের শিরোনামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘুণপোকার প্রসঙ্গের অবতারণা তিনি এই ‘পাতাল ভ্রমণে’ই করেছেন। অনুমিত হয় ছোট কাগজ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার প্রত্যয় থেকেই এর উন্মেষ। তাঁর সময় ও প্রতিপার্শ্ব সম্পর্কে পর্যবেক্ষণও তিনি এখানেই উপস্থাপন করেছেন : ‘আমার সময়, আমার নিজস্ব মানুষ সম্পর্কে আমার সংশয় আজকের নয়। মাঝে মাঝে উদভ্রান্ততায় আমারও ইচ্ছে হয়Ñঘৃণা করি, সবকিছু উচ্ছন্নে দিই। পৈশাচিক ঢঙে নিধন করি কয়েক লক্ষ দ্বিপদী কুকুর একরাত্রে।’ পৃ. ৪৬

আধুনিক সমালোচনার মানদণ্ডে ‘গোধূলি মুখ’ একটি বৃত্তান্ত-প্রাণ গল্প, যা লেখক-ব্যক্তিত্বের প্যাটার্ন রচনামাত্র। এখানে ঘটনার (incident) ভার, তার প্লান-প্যাটার্ন ছোটগল্পের ইঙ্গিতমূলকতা নষ্ট করেছে, বৃহত্তর ব্যঞ্জনাধর্মিতার সৌন্দর্যকে আহত-ব্যাহত করেছে; যেন কাহিনিগত পরাকাষ্ঠাই এর সব। একটিমাত্র ভাবের একমুখী গতি, বিবৃতিমূলকতার চাইতে অধিক ইঙ্গিতমূলকতা ও একটিমাত্র চরম মুহূর্ত এখানে অনুপস্থিত, যা থেকে আমরা সার্থক ছোটগল্পকে চিনে নিতে পারি। তাছাড়া এখানে Subtle comments on human nature বা জীবনতত্ত্বের ওপর কোনো বিচিত্র আলোকপাতও নেই যে, একে আমরা উত্তীর্ণ ছোটগল্প বলব।

‘কালো বিড়াল’ একটি আধুনিক নিরীক্ষাধর্মী কাজ। বিশেষত এডগার অ্যালান পো’র সেই ভয়ঙ্কর ‘কালো বেড়ালে’র পরই একই শিরোনামে সৃজনপ্রয়াস শৈল্পিক সাহসিকতার পরিচায়ক। রাত্রির অন্ধকার এখানে ‘ঘুটঘুটে কালো বিড়াল’, আর মানুষের মধ্যে লেখক যে মিথ্যা ‘আমি’ সেজে থাকেন তার থেকে ভিন্ন কিছু হচ্ছে আমি’র পাঁচটা সম্পন্ন ইঁদুর হয়ে ‘কালো বিড়ালে’র সম্মুখে চিঁ চিঁ শব্দ জুড়ে দেওয়া, যাতে বিড়ালটা মাথা দুলিয়ে সায় দেয়Ñ ‘চমৎকার’ এভাবে রচনাটির রূপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু যার ওপর এই রূপারোপÑসে/তা কী? তা-হলো প্রবহমান জীবন থেকে গৃহীত একটি প্রতীতি, স্নায়ুচক্রের সাহায্যে যাকে আমরা আহরণ ও সঞ্চয় করি। আমাদের অনুভূতি ও জীবনবোধ দ্বারা একটি বিশেষ রূপ দিয়ে আমরা তাকে নতুনভাবে প্রকাশ করি। কখনোবা বা প্রতীতিটি অবচেতনে আশ্রয় নেয়, তখন তার অভিব্যক্তি ঘটে পরোক্ষে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আলোচ্য ‘Unity of Impression’ ও ভাবের একমুখিনতা অনেকটাই রক্ষিত হয়েছে।

‘সত্যপুরাণ’ গল্পটিও লেখকের প্রবহমান (বাস্তব/ব্যবহারিক) জীবন থেকে উঠে আসা একটি প্রতীতির শৈল্পিক উপস্থাপনের প্রয়াস। এখানে জীবনের বিস্তৃত বিশালতা থেকে লেখক একটি মাত্র ঘটনা বা মানসিকতাকেই নির্বাচন করেছেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে, এর আরম্ভও নেই, শেষও নেই। মুহূর্তজীবী বিদ্যুদ্বিকাশেই এর ক্ষণ-বক্তব্য শেষ অথচ এই চকিত বিদ্যুৎ-আলোকেই আমাদের দৃষ্টির সম্মুখে দিগদিগন্ত অনেকটাই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। উপরন্তু এতে চরমক্ষণের বা ক্লাইমেক্সের সার্থক অবতারণা ঘটেছে বলে প্রতীয়মান হয়। যদিও কাহিনিটির আইডিয়া সম্পর্কে ‘সার্সি’ দেবীর আখ্যান থেকে আমরা পূর্বাহ্নেই অবগত।

‘জাগুয়ার জোনাকি’ গল্পটি আধুনিক শিল্পকলার চারিত্র ব্যাখ্যা করে হিস্পানি সমালোচক অর্তেগা-ই-গাসেতের লেখা ‘শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ’ প্রবন্ধটির কথা অনেকটাই স্মরণ করিয়ে দেয়। লেখক এখানে  বাস্তবকে ভেঙেছেন অনেকটাই সার্থকতার সঙ্গে। এর রস আস্বাদনের জন্য মানবিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে সঙ্গে খাঁটি শৈল্পিক সংবেদনশীলতারও প্রয়োজন। বাস্তবতার প্রথাগত ভাষ্যের প্রতি বিরূপতা থেকে লেখক এখানে প্রতীতির মূলবস্তুর স্বাভাবিক স্বভাব অক্ষুণœ রেখে মূল্যবিন্যাস ও প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছেন। দিয়েছেন অনেকটা সাফল্যের সঙ্গে। ফলে এখানে যতটুকু জীবনের প্রাবল্য সৃষ্টি হয়েছে শিল্প সৃষ্টি হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। লেখক বেশ সাহসিকতার সঙ্গেই মধ্যবিত্ত বাঙালির ‘মনের দাদ’ অর্থাৎ সুখ দুঃখকে না-চুলকে,  ভাবালুতাকে শিল্পকলা বলে চালিয়ে না দিতে সচেষ্ট থেকেছেন।

‘কাফকার স্বপ্ন’ একটি নির্দিষ্ট স্টেট অফ মাইন্ডের চিত্রভিত্তিক শৈল্পিক উপস্থাপনের প্রয়াস। উপস্থাপিত চিত্রকল্পগুলোর মধ্যে ন্যূনতম একটির সম্পর্কে আমরা পূর্বাহ্নেই অবগত। প্রকৃত প্রস্তাবে ‘প্রথম বাক্য থেকেই সুনিশ্চিত লক্ষ্যের দিকে ছোটগল্পের যাত্রা, প্রতিটি অক্ষর সেই লক্ষ্য ভেদ করবার প্রয়োজনে সুমিত।’ আলোচ্য গল্পটির অবয়বের দিকে তাকালে এ কথা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দৃষ্টান্তের সহায়তায় বিষয়টি একটু পরিষ্কার হওয়া যাক; প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর ‘বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে’ গল্পটি শুরু করেছেন এভাবে :

ঘরের দরজায় থাকার সঙ্গে বাড়িউলির কর্কশ গলা শোনা গেল, ‘ভরা সন্ধ্যেয় দরজা বন্ধ কেন লা বেগুন? খোল না, কতক্ষণ দাঁড়াব?’

প্রদীপের অস্পষ্ট আলোকে একটি বিগতযৌবনা রোগা লম্বা স্ত্রীলোক সিল্কের একটা শাড়ি সেলাই করছিল।

Ñকত অল্প রসদে কত বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি করা যায় উপর্যুক্ত বাক্য দুটি তার প্রমাণ। ‘ঘরের দরজায় ধাক্কা’ এবং ‘কর্কশগলা’য় বাড়িউলির স্বাভাবিক অভিব্যক্তি ও ‘সন্ধ্যাবেলার দরজা বন্ধ’ থাকার মধ্যে সূচনাতেই একটা অসামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে। রোগা লম্বা বিগত-যৌবনা বেগুনের অস্পষ্ট আলোকে সিল্কের শাড়ি সেলাই করার মধ্য দিয়ে যে ভাব ও যে ব্যঞ্জনা ফুটে ওঠে তা পরিণত মনস্তত্ত্বের কোনো পাঠকের পক্ষে অনুধাবন করা তেমন কষ্টকর নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যেন বাঁশি প্রস্তুতই ছিল, ফু দিতেই সুর বেজে উঠল। এই গল্পটির মতো না হোক, অন্তত দ্রুত সূচনা, সংক্ষিপ্ত কয়েকটিমাত্র কথার মাধ্যমে মূলবক্তব্যের অবতারণা ও মিতবাক ইঙ্গিতপূর্ণ সমাপ্তি আমরা ছোটগল্পে প্রত্যাশা করতেই পারি। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশার অল্প অংশই গল্পটি পূরণ করতে পেরেছে।

যবনিকার পূর্বে

সমালোচকেরা প্রায়ই  ‘It is an accidental year when a great short story is produced’। মহান যে কোনো সৃষ্টিই সাধারণ ধর্মের ব্যতিক্রম, কোটিতে গুটিকয়। তাই আমরা ‘সু-গল্প’ পেলেই খুশি হব, মন্দ নয়, গল্পেও অরুচি অনুচিত। কিন্তু অভিজ্ঞতায় আমাদের এই প্রত্যাশা কতটুকুই বা মেটে।

যবনিকা

কোনো সংজ্ঞা বা অবিচল অপরিবর্তনীয় মানদণ্ড জীবিত গতিদৃপ্ত কোনো শিল্পকে সম্পূর্ণ বোধ দেওয়া যায় না। কালের সঙ্গে সঙ্গে অনিবার্যভাবেই সে রূপান্তরিত-বিবর্তিত হতে বাধ্য। তাই আমরা প্রায় প্রতিদিনই দেখি তার নব নব অভিব্যক্তি, নতুন নতুন নিরীক্ষা। তাছাড়া প্রত্যেকটি (মৌলিক) স্রষ্টাই সচেতনভাবে পূর্বসূরিদের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে পরম্পরাশ্রয়ী অনুবৃত্তির বাইরে বেরিয়ে আসতে সচেষ্ট। এভাবেই যুগের প্রয়োজনে ভাবের বিবর্তন ঘটে, শিল্পীর সজ্ঞান প্রয়াসে ঘটে রূপের পরিবর্তন; তৈরি হয় রেফারেন্স সিস্টেম। এজন্যই আজকের সংজ্ঞা-আইন-কানুন আগামীকালের সৃষ্টিকে পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। তবে অঙ্গে-অন্তরে, বিষয়ে-অবয়বে যতই পরিবর্তন ঘটুক না কেন শিল্পসাহিত্য চিরদিনই মহৎ জীবনের অভিযাত্রী। এই অভিযাত্রাতেই আজ পাড়ি দেয় আগামীকালে, আগামীকাল মহাকালে।

…………………………………………………………………………………..

ঘুণপোকার সিংহাসন, শহিদুল আলম, সংবর্ত প্রকাশনা, ঢাকা ১৯৯০।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close