Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ আয়শা ঝর্না > জীবনানন্দ দাশ ও তার সম্মোহিত কবিতারাশি >> প্রবন্ধ

আয়শা ঝর্না > জীবনানন্দ দাশ ও তার সম্মোহিত কবিতারাশি >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ January 6, 2018

আয়শা ঝর্না > জীবনানন্দ দাশ ও তার সম্মোহিত কবিতারাশি >> প্রবন্ধ
0
0

আয়শা ঝর্না > জীবনানন্দ দাশ ও তার সম্মোহিত কবিতারাশি
যখন রবীন্দ্রনাথের তেজোদীপ্ত কবিতার রশ্মি চারপাশে বিকরণ ছড়াচ্ছে, সেই রশ্মির বিপরীতে কয়েকজন কবি লিখতে শুরু করলেন একেবারে বিপরীতধর্মী কবিতা। যে-কবিতায় শুধু লালিত্য কিংবা সুন্দরের জয়গান নয় রয়েছে পোড় খাওয়া বাস্তবতা আর জীবনের ছোঁয়া। যে-জীবন কবি যাপন করে চলেছেন। তাদের কবিতায় উঠে আসতে থাকল চারপাশ রক্তমাংসের মানবী, জীবনের আকাঙ্ক্ষা, ক্ষয়ে আসা সময় সবকিছু কবিতায় স্থান করে নিল। যেখানে রবীন্দ্রনাথ শুধু লিখে চলেছেন নান্দনিক কবিতা। আর এই বিদ্রোহী পাঁচ কবি হলেন বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী। এই পঞ্চকবি এসে পাল্টে দিলেন কবিতার গতিপথ। পাঠকের রুচিরও বদল ঘটল। কারণ তখন ইউরোপেও শুরু হয়ে গেছে রেনেসাঁ পরবর্তী কবিতা-আন্দোলন। র‌্যাঁবো, বোদলেয়্যার, ভের্লেন, টি.এস. এলিয়ট সবাই তখন লিখছেন ক্ষয়ে আসা সময়ের কবিতা যেখানে রোমান্টিসিজমের সমাপ্তি হয়ে গেছে। এদিকে বাংলা কবিতাতেও লেগেছে সেই পরিবর্তনের হাওয়া। বাংলা কবিতার নতুন পথের দিশারী পঞ্চকবিদের একজন জীবনানন্দ দাশ। যিনি একাকী নিমগ্ন হয়ে লিখছিলেন তার নিজের মেজাজের কবিতা, বরিশোলের বিএম কলেজের অধ্যাপনার পাশাপাশি নীরবে নিভৃতে লিখছিলেন তার কবিতা। ছিলেন ইংরেজীর অধ্যাপক। তাই সে সময়ে ইংরেজী কবিতা তথা ইউরোপেও যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ধাক্কা কবিতায়ও এসেছিল তার অজানা ছিল না। তিনি পড়ছিলেন আর তাকে নিজের কবিতার সাথে আত্তীকরণ করছিলেন কোলকাতা শহর থেকে দূরে, নিভৃতে।
এদিকে বাকি চার কবি বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, তারা কোলকাতা শহরে বসে একেক জন একেক কবিতা পত্রিকাকেন্দ্রিক আড্ডা আলোচনায় মুখরিত থেকে লিখে চলছিলেন নুতন নুতন কবিতা। তাদেরকে ঘিরে তৈরী হয়েছিল কবিতাবলয়। অন্যদিকে কবি জীবনানন্দ দাশ একাকী নীরবে, নিভৃতে কোলাহল থেকে দূরে বসে লিখে চলেছেন প্রকৃতির আর আত্মবেদনার কবিতা, যেখানে কবি হাজার বছর ধরে হাঁটছেন, সিংহল সমুদ্র থেকে দূরে আরও বহুদূরে মালয় সাগরে যে সভ্যতা লীন হয়ে গেছে, যে নারীর মুখ কথনো তিনি দেখেছেন বলে মনে হয়নি যেন তিনি শিল্পী লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির মোনালিসার মতো কবিতার শব্দে আঁকলেন সে মানবীর মুখ ‘বনলতা সেন’। যার চোখে ক্লান্ত এ কবি আশ্রয় ও শান্তি খুঁজে পেয়েছেন, যে তাকে সেই ক্ষয়ে আসা সময়ে দিয়েছিল দু’দণ্ড শান্তি।
‘বনলতা সেন’ কবিতায় তিনি লিখলেন-

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেদ
আমারে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারকার্য, অতিদূরে সমুদ্রের পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
..
সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী- ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন,
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

এই যে কবির নিরন্তর ক্লান্তিকর পথচলা তা যেন কবিতারই অন্বেষণ। তিনি খুঁজে চলেছেন সেই কবিতাকে যা তিনি তখনো পাননি। তবে এ কবিতায় যেন তার খেদ ঘুঁচে গেছে। এখানে এসে তিনি যেন দু’দণ্ড জিরোতে চান জীবনের সব ব্যর্থতা, গ্লানিকে মুছে দিয়ে কবিতার মুখোমুখি বসেছেন যেখানে সব নদী, সব পাখি ঘরে ফিরে গেছে, কবির জীবনের সব লেনদেনও ঘুঁচে গেছে।
তার কবিতার উপমা, উৎপ্রেক্ষা, যতিচিহ্নের ব্যবহার তখনকার সব কবি থেকে আলাদা। তাঁকে চিনেছিলেন ঠিকই তার সমসায়িক কবি বুদ্ধদেব বসু। তিনি এই মুখচোরা, সবার থেকে পালিয়ে থাকা নিভৃত কবিকে প্রদীপের আলোয় নিয়ে আসেন ‘কবিতা’ পত্রিকায় এক দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে। অবশ্য তারও আগে তার কিছু তরুণ-ভক্ত জুটে গিয়েছিল। কবির কবিতাকে তারা আলাদা করে চিনেছিল জেনেছিল। কবি বুদ্ধদেব বসু তার কবিতাকে নিয়ে আলোচনার পর জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়ে নতুন করে একটা হইচই পড়ে গেল কবিতাপ্রাঙ্গনে। বলা যায় কলকাতাতে কবি জীবনানন্দ দাশ প্রতিষ্ঠা পেলেন। তার ‘কুড়ি বছর পরে’ ‘হাওয়ার রাত’ ‘হায় চিল’ পাঠক হৃদয়ে চিরকালের জন্য স্থান পেয়ে গেল। এমন কোন বাঙালি নেই যে জীবনানন্দ দাশের কবিতার দু’ একটা চরণ জানে না। সেই সময়ের সব কবিকে ছাপিয়ে একটি নাম উঠে এলো তিনি হলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। অথচ তখন আরও কত কবি লিখে চলছিলেন কবিতা। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাকেও ছাপিয়ে বাংলা কবিতাকে অন্য এক মাত্রা দিলেন। তাঁর কবিতায় ঘাস, শিশির, কমলালেবু, বুনো হাঁস, শঙ্খচিল, ধূসর পেঁচা, ভেজা মেঘের দুপুর, শঙ্খমালা, হরিণেরা, অন্ধকার-অতি পরিচিত শব্দগুচ্ছ নতুন আলোয় দিল ধরা। দীর্ঘ দীর্ঘ পঙক্তিতে তিনি কবিতাকে সাজিয়েছেন বর্ণে, গন্ধে, ছন্দে, উপমায়, প্রকৃতির অতি নিকটবর্তী হয়ে। শহুরে কবিতা থেকে কবিতাকে পৃথিবীর প্রকৃতির কাছে নিয়ে এলেন, দিলেন গ্রাম-বাংলার বুনো স্বাদ অথবা অন্ধকারের সান্নিধ্য; পাঠক দেখেন যেখানে মশা তার সঙ্ঘারামে বেঁচে থাকে।
বাংলার প্রতিটি ঋতুই তার কবিতাতে স্থান পেয়েছে তবে হেমন্ত আর শীত এ দু’টো ঋতু তাকে বেশ আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। গ্রামবাংলার প্রকৃতি সেইসাথে ইংরেজী কবিতার পঠন তার কবিতাকে করেছিল সমৃদ্ধ। এখনও পাঠক তার কবিতা পড়ে রোমাঞ্চিত হন। তার কবিতার সাথে আত্মস্থতা অনুভব করেন। এই যে এতগুলো বছর ধরে তার কবিতা পাঠকের হৃদয়কে মুগ্ধ করে রেখেছে তা ক’জন কবিই বা পারেন!
তবে তার কবিতাতে কিছু রিপিটেশন আছে, আছে বিষন্নতা। অনেক শব্দ, উপমা বারবার ঘুরেফিরে আসে যা কিনা এই সময়ে কিছুটা হলেও কানে বাজে। জীবনানন্দ দাশের কবিতা বেশীদিন পড়লে একধরনের অবসাদ ভর করে পাঠকের মনে। কেননা তিনি নিজেই ছিলেন বিষন্ন এবং অবসাদগ্রস্ত কবি- জীবনের ভেতর আনন্দ খুঁজে পাননি তাই প্রকৃতিকে নিয়েছিলেন আপন করে। তবু তাকে টেনে নিয়েছিল লাশকাটা ঘর। বরিশাল থেকে যেয়ে কলকাতা শহরের ঐ ঘিঞ্জি বাস্তবতায় তিনি বেঁচে থাকার প্রেরণা হারিয়ে ফেলেছিলেন, চলে গেলেন ট্রামের নীচে। মাত্র চল্লিশ বছরে ঘটেছিল তার জীবনাবসান। তার কাব্যগ্রন্থ সমূহ- বনলতা সেন, রূপসী বাংলা, ধূসর পাণ্ডুলিপি, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, বেলা অবেলা, ঝরা পালক এবং অন্যান্য কবিতা। মৃত্যুর পরেও বেরিয়েছিল একটি অগ্র্রন্থিত উপন্যাস এবং অসংখ্য কবিতা।
‘ঝরাপালক’ কাব্রগ্রন্থের প্রথম কবিতায় তিনি লেখেন-

আমি কবি-সেই কবি
আমি কবি,- সেই কবি-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি’ হেরি ঝরা পালকের ছবি!
আনমনা আমি চেয়ে তাকি দূর হিঙুল-মেঘের পানে!
মৌন নীলের ইশারায় কোন কামনা জাগিছে প্রাণে!

আমার প্রিয়ের গজল-গানের রেওয়াজ বুঝি বা বাজে!
প’ড়ে আছে হেথা ছিন্ন নীবার, পাখির নষ্ট নীড়!
হেথায় বেদনা মা-হারা শিশুর, শুধু বিধবার ভিড়!
কোন এক সুদূর আকাশ গোধূলিলোকের তীর
কাজের বেলায় ডাকিছে আমারে, ডাকে কাজের মাঝে!

এছাড়াও কোথাও চলিয়া যাব, যে শালিখ মরে যায়, কুড়ি বছর পরে, দু’জন, কমলালেবু, সুচেতনা, অশ্বখ্থের শাখা’ এই কবিতাগুলোতে কবির ডিপ্রেশন সুস্পষ্ট।
যেমন ‘কমলালেবু’ কবিতায় দেখি-

একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব
আবার কি ফিরে আসিব না আমি পৃথিবীতে?
আবার যেন ফিরে আসি
কোন এক শীতের রাতে
একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে
কোন এক পরিচিত মূমূর্ষুর বিছানার কিনারে।

কি অদ্ভুত উপমা কমলালেবুর করুণ মাংস! একেবারেই সম্পূর্ণ মানবিক আকাঙ্ক্ষা তিনি একটি কমলালেবুর ভেতর প্রকাশ করেছেন, সেইসাথে এও বলা যায় তার মর্বিডিজম তার পিছু ছাড়ছে না।
‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতায় তো তিনি মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনি বাজিয়ে গেলেন, নিজেকে খুঁজে পেলেন লাশকাটা ঘরে-

শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে
কাল রাতে-ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হল তার সাধ।

এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি!
রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাঁড় গুঁজি
আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার:
কোনদিন জাগিবে না আর।

কবি তবু জীবনের সাথে যুঝতে চেয়েছিলেন। শিশুটির হাত, বিকীর্ণ জীবন, ঘনিষ্ঠ আকাশ যদিও তাকে পিছু ডাকে তবু সে পেছনে ফেরে না আর-

চাঁদ ডুবে গেলে পর প্রধান আঁধারে তুমি অশ্বথ্থের কাছে
এক গাছা দড়ি হাতে গিয়েছিলে তবু একা;
যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের-মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা
এই জেনে।
‘আমরা অশ্বথ্থের শাখা’ কবিতায় দেখতে পাই-
মর্গে কি হৃদয় জুড়ালো
মর্গে-গুমোটে
থ্যাতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে!
শোনো
তবু এ মৃতের গল্প-কোন
নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখেনি কোন খাদ,

লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের প’রে।

এ প্রগাঢ় পিতামহী আজও চমৎকার?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হব-বুড়ি চাঁদটারে আমি করে দেব বেনো জলে পার;
আমরা দু’জনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।

এই যে তো এত শব্দসম্ভার, এত উপমা-উৎপ্রেক্ষা, প্রাণভরা প্রকৃতি, অবারিত হেমন্তের নক্ষত্রভরা আকাশ, বনলতা সেন কিংবা সুচতেনা, সুরঞ্জনরা তাকে আটকাতে পারেনি। তার জীবনে শিশু ছিল, স্ত্রী ছিল তবু জীবন তার হয়ে উঠেছিল ক্ষয়িষ্ণু, বিপন্ন। যে কবি বরিশালের মায়ামাখা সবুজ প্রান্তরে প্রাণ পেতেন সে কবি কলকাতার শহুরে শব্দময় জঞ্জালে, শব্দে-চাকায়-ঘর্ষণে নিজের প্র্রাণটা নিয়ে যেন হয়ে পড়েছিলেন অসহিষ্ণু। নাগরিক জীবনের ব্যর্থতা, গ্লানি, সবার মাঝে থেকেও দূরবর্তী কোন অচেনা স্বরের টানে এ কবি ট্রামের নীচে প্রাণ দেন। আমরা হারাই আমাদের প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশকে। তবু তিনি কবিদের হৃদয়ে বিরাজিত দোর্দণ্ড প্রতাপে। আজও তিনি ফিরি ফিরে আসেন এই বাংলায় হয়তো শঙ্খচিল, শালিখের বেশে, হয়তো ভোরের কাক হয়ে কার্তিকের নবান্নের দেশে, কাঁঠালচাপায়, খইয়ের ধান যেখানে ছড়ায় শিশু, ডিঙা বায় কোন কিশোর, রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে-সেই বাংলায় তিনি ফিরে ফিরে আসেন।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close