Home অনূদিত ছোটগল্প আয়ান ম্যাকডোনাল্ড > প্রথম হওয়ার লক্ষ্যে >> অনূদিত ছোটগল্প >>> ভাষান্তর : বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

আয়ান ম্যাকডোনাল্ড > প্রথম হওয়ার লক্ষ্যে >> অনূদিত ছোটগল্প >>> ভাষান্তর : বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

প্রকাশঃ May 31, 2018

আয়ান ম্যাকডোনাল্ড > প্রথম হওয়ার লক্ষ্যে >> অনূদিত ছোটগল্প >>> ভাষান্তর : বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
0
0

আয়ান ম্যাকডোনাল্ড > প্রথম হওয়ার লক্ষ্যে >> অনূদিত ছোটগল্প >>> ভাষান্তর : বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

 

আমিই প্রথম এসেছি এখানে, তাই এই জানলার দিকটা আমার।
প্রায় জোর করে হুইল চেয়ারটা সেখানে নিয়ে গেল বেনজি। বিপাতও ছেড়ে দেবার পাত্রী নয়। অধিকার রক্ষার লড়াই। অন্যকে সুযোগ দেওয়া মানে নিজের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়া।
দুজনেই তো একসাথে এলাম, একইদিনে, একই সময়ে। তোর মনে নেই? আলতো করে জিজ্ঞাসা ভাসিয়ে দিল বিপাত।
একসাথে এলেও আমি তোর তোর চেয়ে কয়েক সেকেন্ড আগে এখানে আসি। বেনজি তার যুক্তিকে ধারালো, তীক্ষ্ণ করে তোলে।
এসব ছিল ওদের ভালোবাসার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নমুনা। এই ছোট ছোট উদাহরণগুলি একসময় ঝগড়ার আকার নিত। যেকোন বিষয় নিয়েই তর্কে মেতে উঠত তারা। তর্ক একসময় পায়ে পা লাগিয়ে কলহে রূপান্তরিত হত। তখন চারপাশে যারা রয়েছে তাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করত দুজনে।
মার্সি হাসপাতাল ছিল বড় অদ্ভুত জায়গা। চিকিৎসার জন্য যারা এখানে আসত তারা তাদের দীর্ঘদিন ধরে পুষে রাখা রোগের উপশম তো পেতই না, বরং আরও কাহিল হয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়ি ফিরত। মরণাপন্ন রোগীরা তাই পারতপক্ষে এখানে আসত না। বাইরের জীবন্ত পৃথিবী থেকে বুকভর্তি চঞ্চলতা নিয়ে এখানে সুস্থতার আশ্বাস সন্ধান করতে এসে বেশিরভাগ রোগীই অনন্তযাত্রার পথে পা বাড়াত অমৃতলোকে।
বেনজি এবং বিপাত যখন থেকে মার্সি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তখন থেকে প্রতিমুহূর্তে মনে হত এই রোগীনিকেতন যেন জীবনে এবং কোলাহলে মুখরিত। ঘুমের জন্য বরাদ্দটুকু বাদ দিলে জেগে থাকার প্রতিটি পল অনুপল সময়ও তারা ব্যয় করত বিতর্কে ঝগড়ায়। রাজনীতি নিয়ে, ধর্ম নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে খেলাধুলা নিয়ে এমনকি প্রেম নিয়েও তারা ভাগ হয়ে যেত দুটো শিবিরে। তারপর হাসপাতালের যত নার্স রোগী, ওয়ার্ড বয়, আয়া আছে তাদের সবাইকে ভাগ করে ফেলত দুটো অংশে।
প্রথমদিকে মুখোমুখি ছিল তাদের বেড। জানলার ধার ঘেঁষে স্নিগ্ধ বাতাস আসত বিছানায়। সকালবেলায় সূর্যের আলোর ছটা ভরিয়ে দিত সারাঘর। ক্রমাগত কলহ তাদের অবস্থান বদলে দিল কিছুদিনের মধ্যেই। দুজনের বেড দুটোর মধ্যে দুরত্ব বাড়িয়ে দেওয়া হল ডাক্তারের নির্দেশে। তবুও নিস্তার নেই। যখনই তারা মুখোমুখি হত তখনই শুরু হত নতুন উৎপাত। ক্রিকেট নিয়ে তাদের ঝগড়াটা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠত। তর্কের মাঝপথে দুজনেই কোন না কোন একসময় বলে ফেলত, আগামীদিনের ক্রিকেটে কানহাইয়ার জুড়ি নেই। দুটো বিপরীত পক্ষ এই একটা জায়গায় এসে সেমসাইড করে ফেলত। অল্পক্ষণের মধ্যে দুজনে তা বুঝতে পেরে সরে যেত অন্য প্রসঙ্গে। নিজের পছন্দের খেলোয়াড়দের নিয়ে একটা তালিকা বানাত বেনজি। বিপাতের পছন্দের তালিকার সাথে তা ম্যাচ করত না কোনোভাবেই। কোন একটি নামও পাওয়া যেত না যা দুজনেরই পছন্দ।
– আমার তালিকাটাই কিন্তু সেরা। বেনজি বলে উঠত একসময়।
– অসম্ভব আমার লিস্টে কত কত কৃতি খেলোয়াড়। তোর ওই রদ্দি লোকগুলো কখনোই সেরা হতে পারেনা। বিপাত পাল্টা যুক্তি হাজির করত।
– আমার চয়েস বিচ্ছিরি।
– বিচ্ছিরিই তো।
– ডাক্তারবাবুকে ডেকে জিজ্ঞেস কর, কার পছন্দ এক নম্বর? আমার না তোর?
সেসব জিজ্ঞেস করা আর হয়ে উঠত না। মনের ভেতর থেকে অল্পক্ষণ পরেই মিলিয়ে যেত সেই দাগ। আসলে এসব শুধু ঝগড়ার জন্যই ঝগড়া। বেঁচে আছি, এক অস্তিত্ব নিয়ে ভিন্নতা নিয়ে। জীবনের জাড্যে যেন সেই বক্তব্যকেই প্রতিষ্ঠা করতে চাইত দুজনে।
এই হাসপাতালের সেরা রোগী কে? এই নিয়েও তাদের ঝগড়া হত। সেরা রোগী নির্ণয়ের এক নিজস্ব পদ্ধতি এবং বিজ্ঞানও তারা স্থির করে ফেলল কিছুদিনের মধ্যেই। না, নার্স আয়া বা রোগীদের পছন্দ অনুয়ায়ী তা নির্ধারিত হবে না।
– তাহলে? তাহলে কীভাবে হবে? বিপাত কৌতুহলী হয়ে তাকাল বেনজির দিকে।
– ভিজিটিং আওয়ারে যার যত বেশি আত্মীয় পরিজন বন্ধুবান্ধব আসবে। সে হবে সেরা রোগী, সে হবে প্রথম।
বিপাত সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেল এই প্রস্তাবে। এবং তার পরদিনই তার ওয়ার্ডের সামনে একজন আত্মীয় পাঁচজন ভাইপো ভাইঝি নিয়ে হাজির হল। বিপাতের বড়দা এবং বৌদিও এসে উপস্থিত হয়েছে। আটজন মানুষ তার বেডের চারপাশে। বেনজি বুঝতে পারেনি খেলাটা এত দ্রুত শুরু হয়ে যাবে। তার মুখ বিষণ্ণ ও গম্ভীর লাগছিল। তবু কোনরকমে দুজন মানুষ এসেছিল তাকে দেখতে। এই ঘটনায় উৎফুল্ল বিপাত হাতছাড়া করতে চায়নি জয়ের আনন্দ। বেনজিকে শুনিয়ে শুনিয়ে সে বলে যাচ্ছিল – কিছু মানুষ আছে যারা একদম বাজে লোক। তাদের কোন আত্মীয় নেই, স্বজন নেই। আত্মকেন্দ্রিক এই মানুষগুলো নিজেকে ছাড়া দুনিয়ায় আর কাউকে চেনে না। ফলে কেউ তাদের ভালোবাসে না। অন্যদিকে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের বন্ধুবান্ধব পরিজন প্রচুর। গোটা পৃথিবীকে মনে করে নিজের পরিবার। তাই এরা অসুস্থ হলে মমতার টানে ভালোবাসার আবেশে মানুষ অস্থির হয়ে যায়। ছুটে আসে হাসপাতাল অবধি।
প্রতিদিনই বিপাতের আত্মীয় স্বজন আসতে লাগল বেশি বেশি করে। গড়ে রোজ দশ-বারো জন মানুষ। বেনজির ক্ষেত্রে সংখ্যাটা মেরে কেটে চার, তার বেশি নয় কোনমতেই। ভীষণ গর্বিত বিপাত। কিছুটা অহংকারীও। সে প্রতিদিনই নিয়ম করে শোনাতে লাগল তার সাফল্যের গল্প। এই কথাগুলোই আঁতে ঘা দিল। উত্যক্ত করে তুলল বেনজিরকে। সে এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল একসময়। একটা আস্ত বাসই পাঠিয়ে দিল আত্মীয়স্বজনদের ধরে আনতে। সেদিন সত্যিই প্রচুর লোক এল বেনজিকে দেখতে। আর এই ফলাফল দেখে সে নির্বাচনী কর্মকর্তার মতো বিজয়ী ঘোষণা করে ফেলল। হ্যাঁ, নিজেকেই সে বিজয়ী বলে চিহ্নিত করল। সারা ওয়ার্ড জুড়ে তুমুল চীৎকার। উত্তপ্ত আবহাওয়া। এমনিতেই ভিজিটিং আওয়ারে লোকজন সামলানো কষ্টকর ব্যাপার। তার উপর এই উটকো ঝামেলা। ফলে, কর্তৃপক্ষ কড়াহাতে একদিন দমন করল তাদের এই লড়াই। বেনজি হাসল- ওস্তাদের মার শেষ রাতে।
এই খেলাও বিপাত জিততে পারল না দেখে সে অনুসন্ধান করতে লাগল নতুন কোন প্রতিযোগিতা। কিছুদিন পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়ে রইল মার্সি অয়ার্ড। যারা প্রতিদিন এসবের ভেতর আনন্দ খুঁজে পেত তারাও কেমন চুপচাপ বিমর্ষ হয়ে গেল। আসলে মার্সি ওয়ার্ড ছিল এমন এক জায়গা যেখানে হতাশা আর মর্মবেদনার পাশে আনন্দের কোন শিহরণ নেই। খাঁ খাঁ এক শূন্যতার মাঝে জীবনের লক্ষ্য, দিশা এবং অভিমুখ অন্ধকারে নিস্প্রভ। জীবনকে ধরে রাখার চুমু খাওয়ার শক্তিটুকু হারিয়ে মৃত্যুর জন্য ক্রমাগত অপেক্ষা করে থাকা। সেই অপেক্ষার ভেতর ওরা দুজন অন্তত বুঝিয়ে দিতে পেরেছিল দ্যুতিময় বিকল্পের অনুসন্ধান। হতে পারে তারা জর্জরিত জীবন যাদের বাতিল করে দিয়েছে তুচ্ছ করে দিয়েছে বৃহত্তর প্রবাহের ভেতর থেকে। কিন্তু কোথাও কোন একবিন্দুতে এসে তারা প্রাণ আর উন্মাদনার স্বাক্ষর রেখে যায়।
ওরা পরস্পরকে দেখত। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করত ধ্বংসচিহ্ন, ক্ষয়বিন্দু সমেত পুরো মানুষটিকে। মার্সি ওয়ার্ডে এসে বেনজি এবং বিপাত দুজনের স্বাস্থ্যই দিন দিন খারাপ হচ্ছিল। জ্বরে প্রলাপ উচ্চারণের ভেতর বিপাত ডেকে উঠত – বেনজি। বেনজি বুঝতে পারত বিপাদ আর বেশিদিন থাকবে না। সে তখন নিজের শরীরের ক্ষয়বিন্দুগুলো দেখত। মনে হত তার ফুসফুস ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। কাশি শুরু হত সারা শরীর কাঁপিয়ে। দেখাদেখি প্রবল জ্বরের ভেতর জ্ঞানশূন্য অবস্থায় কাশি শুরু করে দিত বিপাত। যেন সে এই লড়াই কোনমতেই জিততে দেবে না বেনজিকে।
দিন দিন শরীর ভেঙে যেতে লাগল দুজনেরই। তবু ওরা নিজের স্বাস্থ্যের দিকে না তাকিয়ে অন্যের দিকে চেয়ে থাকত। বিপাত বোধ হয় আর বেশিদিন নয়। ওর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জুড়ে এক শীতল ছায়া নেমে আসছে। সারা শরীরে সেই ছায়াপথের আভাস লক্ষ্য করত বেনজি। দু-দুটো অপারেশনের পরও বিপাত টিকে রইল। ওর কঙ্কালসার শরীরে দাঁত খিঁচিয়ে থাকা হাড় ছাড়া আর কিছু নেই। তবু এই রুগ্ন মৃতপ্রায় শরীরে ধুকপুক করে জেগে রইল প্রাণকণা। যমের মুখে থুতু ছুঁড়ে দিয়ে কীকরে যে ফিরে এল বিপাত তা বিস্ময়ের।
বেনজি নিজেও ভালো নেই। স্যালাইন নিয়মিতই চলছে। তার সাথে মাঝে মাঝেই তার দরকার হচ্ছে রক্তের। এখন সে আর নড়াচড়া করতে পারে না। বেচারা বেনজিকে দেখাচ্ছিল মরা মাছের মতো। মনে হচ্ছিল যেন অন্তিম যাত্রাপথে হেটে চলেছে তার শ্বাসবায়ু।
তবু এর মধ্যেই বেনজি একদিন হেসে উঠল – জীবন কত আরামদায়ক বলো। কতকিছু জড়িয়ে থাকে জীবনের সাথে। মায়া। মায়া। স্যালাইনের নলের সাথে কী গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে আমার। কেউই কাউকে ছাড়তে চাই না আমরা।
বেনজিরের সুগার বাড়তে লাগল লাফিয়ে লাফিয়ে। তার মনে হত রোজ হালকা ব্যায়াম করতে পারলে সে আরও অনেকদিন বাঁচতে পারত। কিন্তু এতে কোন লাভ নেই। তার ভাঙা শরীর তাকে এ ব্যাপারে আদৌ সহায়তা করবে না। আর এতে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। বিপাত সেই সুযোগ নিয়ে নেবে অনায়াসে। দ্রুত অবনতি হতে লাগল বেনজিরের। পা দুটোর অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে উঠল যে ডাক্তার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন তা শরীর থেকে বিযুক্ত করতে। পা দুটো কেটে বাদ দিতে হল। বাকি শরীরটা এতে রক্ষা পাবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তও কার্যকর হল না। এরপরও লাগামহীনভাবে বাড়তে লাগল তার অসুখ। চতুর্থবার অপারেশনের পর কাহিল হয়ে গেল বেনজির শরীর। তবু সে বেঁচে রইল মৃত্যুর প্রতীক্ষায়।
বিপাত তখনও স্বপ্নের মধ্যে ঘোরের মধ্যে একটা প্রদীপ জ্বালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল। আলো জ্বালতে পারলেই চারদিক ভরে উঠবে এক আশ্চর্য গন্ধে। জীবনের অনাবিল গন্ধ। যে গন্ধের ভেতর প্রাণ আসে শরীরে। বেঁচে থাকবার এক সুঘ্রাণ সারাজীবন মানুষ বয়ে বেড়ায় তার প্রতিটি সজীব কোষে। পারল না বিপাত। একসময় থেমে গেল তার হৃৎস্পন্দন। ঘুমের মধ্যে এক অদ্ভুত জগতে চলে গেল সে। যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না। বেনজি আরও ঘণ্টাখানেক বেঁচে ছিল। সেই এক ঘণ্টা সময় তার দ্বিতীয় হওয়ার যন্ত্রণা নয়। পরাজয়ের যন্ত্রণা নয়। জীবন আর মৃত্যুর মাঝামাঝি সেতু থেকে দেখা এক জলছবি। যেখানে কোন রঙ নেই, সমস্ত দাগই জলের।

[মূল গল্পের শিরোনাম Mercy Ward]
গল্পকারের পরিচিতি
আয়ান ম্যাকডোনাল্ডের জন্ম ১৮ এপ্রিল ১৯৩৩। ত্রিনিদাদের অগাস্টাইনে। পোর্ট অফ স্পেনের কুইন্স রয়্যাল কলেজে পড়াশোনা। একজন প্রথমসারির কথাশিল্পী। উপন্যাস এবং ছোটগল্পে নিজস্ব ভাবনা সঞ্চারিত করেছেন। কবিতাও লিখেছেন পাশাপাশি। কিক ওভার অল নামে একটি পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন দীর্ঘদিন। প্রকাশিত গ্রন্থ : The Tramping Man, Between Silence and Silence, The Humming Bird Tree, Mercy Ward; পুরস্কার ও সম্মাননা : Fellow of The Royal Society of Literature (1970), Golden Arrow Achievement (1986), Wordsworth McAndrew Award (2004) ইত্যাদি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close