Home চিত্রকলা ইফতেখারুল  ইসলাম / ক্লদ মোনের  শহর প্যারি আর নানান মিউজিয়ামে

ইফতেখারুল  ইসলাম / ক্লদ মোনের  শহর প্যারি আর নানান মিউজিয়ামে

প্রকাশঃ March 28, 2017

ইফতেখারুল  ইসলাম / ক্লদ মোনের  শহর প্যারি আর নানান মিউজিয়ামে
0
0

ছবি-রাজ্যের  সম্রাটের  সঙ্গে  পরিচয়      

শিল্পের দেশ হিসেবে ফ্রান্সের খ্যাতি বহুকাল ধরে। সাহিত্যের পাঠকের সঙ্গে ছবির দেশ, কবিতার দেশ হিসেবে ফ্রান্সকে পরে আবারও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সুনীলের সেই ভ্রমণ কাহিনী অনেককেই পড়তে দেখেছি প্যারি ভ্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে। দেশটির সবচেয়ে বড় গৌরব তার শিল্পকলার ঐতিহ্য। ইমপ্রেশনিস্ট যুগের চিত্রকলা এনে দিয়েছে শিল্পরীতির অভূতপূর্ব পালাবদল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই শিল্প-আন্দোলন প্যারিতে শুরু হয়ে সারা পৃথিবীকে চমকে দিয়েছে। ইমপ্রেশনিজম আর তার ঠিক আগের অথবা পরের কালপর্ব এবং শিল্প-আন্দোলন সম্পর্কে এখন সহজেই পড়াশোনা করা যায় ইন্টারনেট-সুবিধার কারণে। তবুও ওই যুগটিকে পুরোপুরি বুঝতে হলে ছবিগুলো দেখা এবং প্যারি ভ্রমণের কোনো বিকল্প নেই।

2

সে-যুগের বেশকিছু ছবি নিউ ইযর্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্ট, মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট এবং ইউরোপ ও আমেরিকার অন্য বহু শহরের অসংখ্য নামী গ্যালারিতে ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু এখনো উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথম পঁচিশ বছর পর্যন্ত আঁকা ছবির সবচেয়ে বড় সংগ্রহ প্যারি শহরেই। সেসব সংগ্রহশালার কিছু ছবি ইন্টারনেটে দেখা যায়। পড়া যায় অনেক রচনা। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থেকে অনেকখানি সময় নিয়ে ওই মূল ছবিগুলো দেখার অভিজ্ঞতার কোনো তুলনা হয় না।

যাঁরা পাঁচ-সাত দিনের জন্য প্যারিতে বেড়াতে যান তাঁরা দুঃখ করে বলেন যে এত অল্প সময়ে কিছুই ঠিকভাবে দেখা হয়নি তাঁদের। বিশেষত ছবির গ্যালারি বা মিউজিয়াম দেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমি এতে একটু অবাক হই। কারণ, প্যারিতে আমার বেশির ভাগ ভ্রমণ এর চেয়েও সংক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তার মধ্যে থাকে অফিসের নানা কাজের চাপ। তবু, তারই ভেতর থেকে একটু একটু সময় বের করে আমি দেখে নিয়েছি আমার প্রিয় স্থানগুলো। কখনো কখনো ভ্রমণের শেষ দিনে ফিরতি প্লেন ধরার আগে কয়েক ঘন্টায় দেখে এসেছি ছোট কোনো মিউজিয়াম। এভাবে ইমপ্রেশনিজমের পূর্ণ অভিজ্ঞান অর্জন করার উদ্দেশ্যে আমি তৈরি করে নিয়েছি কয়েকটা রুট ম্যাপ। কোনটা বিশ্বব্যাপী ধারণা অর্জনের জন্য তৈরি বড় ম্যাপ, যাতে ইউরোপের বেশকিছু শহর ও আমেরিকার কয়েকটি মিউজিয়াম অন্তর্ভুক্ত। আর একটা রুট খুব ছোট। শুধু প্যারি আর কাছের দু-একটা জায়গা নিয়ে তৈরি। সেই নিজস্ব মানচিত্র অনুযায়ী বেশ কিছু জায়গায় আমি গিয়েছি বারবার। কতটুকু সময় হাতে আছে তার উপর নির্ভর করে আমি গন্তব্য স্থির করে নিয়েছি। অনেক মিউজিয়ামের সব বিভাগ আমার দেখা হয়নি। পুরো সময়টা কাটিয়েছি মিউজিয়ামের একটা বা দুটো ঘরে। আর বেশির ভাগ জায়গাতে গিয়েছি বারবার।

আগেই বলেছি, চিত্রকলা বিষয়ে আমার লেখাপড়া সীমিত। ফরাসি ভাষাটাও শেখা হয়নি। তাই প্রথম দিকে বাড়তি টাকা দিয়ে এয়ারফোনে ইংরেজি ধারাভাষ্যের সাহায্য নিয়েছি। কোনো কোনো বিশেষ প্রদর্শনী দেখার সময় নোট নিয়েছি প্রত্যেকটি ছবির ওপর। শিল্পী, তাঁর কোনো বিশেষ ছবি এবং সেই ছবির কাল-পটভূমি বিষয়ে যেটুকু তথ্য পেয়েছি তা লিখে রেখেছি। পরে সেই ছবি দেখতে গিয়েছি আবার। এর ফলে এখন বই অথবা ওয়েবের সাহায্য খুব বেশি লাগে না। ইংরেজি ধারাবিবরণীর ইয়ারফোন কানে না লাগিয়েও একটা মিউজিয়াম বা প্রদর্শনী দেখে শেষ করতে পারি। এমনকি অল্প অভিজ্ঞ ভ্রমণ-সঙ্গীদের নিয়ে গিয়ে ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকলার গাইড হিসেবে প্রত্যেকটি মিউজিয়াম ও ছবি দেখিয়ে আনতে পারি। মূল কথা হলো, সত্যিকারের আগ্রহ থাকলে আর একটু চেষ্টা যোগ করলে যে-কোনো যুগের যে-কোনো শিল্প-আন্দোলন বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা অর্জন করা সম্ভব। এইভাবে ওই সময়ের চিত্রকলার রস আস্বাদন করতে কোনো অসুবিধে হয় না।

প্যারির মিউজিয়ামগুলো সম্পর্কে আমাদের বেশিরভাগ মানুষের ধারণা আমার সঙ্গে ঠিক মেলে না। ল্যুভ একটা বিখ্যাত মিউজিয়াম। চিত্রকলার অতীত বিবর্তনগুলো বুঝতে হলে এবং বিভিন্ন যুগ ও ভৌগলিক অঞ্চলের শিল্পকলা বিষয়ে ধারণা পেতে চাইলে বারবার ল্যুভে যেতে হবে। অনেকগুলো দিন এই মিউজিয়ামে কাটাতে হবে। কিন্তু গত দেড়শ বছরের শিল্পকলা বা সাধারণভাবে আধুনিক এবং সমকালীন চিত্রকলা দেখার জন্য একটা দিন পেলে সেটা ল্যুভে কাটানোর মানে হয় না। শুধু মোনালিসা দেখার জন্য টিকেট কিনে লাইনে দাঁড়িয়ে ল্যুভে ঢোকাটা কতোটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়েও সন্দেহ আছে। তারপরেও এ বিষয়ে পর্যটকরা আকৃষ্ট হন।

একটা জিনিস প্যারির ল্যুভ মিউজিয়ামে না গেলে বোঝা যায় না। সেটা হলো ওই মিউজিয়ামের বিশালতা। ওদের সংগ্রহ পুরোপুরি দেখতে হলে, একদম না থেমে শুধুই হেঁটে দেখা শেষ করতেও তিন থেকে চার দিন সময় লাগবে। আর এই সংগ্রহের এমন ব্যাপ্তি যে একবারের ভ্রমণে কয়েকদিন ধরে এটা সম্পূর্ণ দেখে ফেললেও সবকিছু মনে রাখা ও আস্বাদন করা একদমই অসম্ভব। তাই ওখানে যেতে হলে আগে থেকে পড়াশোনা সেরে নিজের পছন্দ অনুযায়ী একটি বা দুটি ছোট সংগ্রহের এলাকা ঠিক করে নেওয়া দরকার। সেটুকু জায়গা হয়তো একদিনে দেখে আসা সম্ভব। প্রাচীন মিশরের শিল্প নিদর্শন, এশিয়ার কারুশিল্প, পূর্ব-এশিয়ার শিল্পকলা এরকম এক-একটি বিভাগ রীতিমত বিশাল। ল্যুভ মিউজিয়ামেও ইমপ্রেশনিস্ট যুগের বেশকিছু ছবি আছে। কিন্তু আমার সংক্ষিপ্ত রুট ম্যাপ থেকে আমি ল্যুভকে বাদ রেখেছি। বাদ শুধু এই কারণে যে আমার মতো কাজে অথবা বেড়াতে প্যারিতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশী এতটা সময় দিতে পারি না।

এখানকার মেট্রো স্টেশনটি শিল্পকলার কিছু নিদর্শন দিয়ে খুবই রুচিস্নিগ্ধভাবে সাজানো। ল্যুভ প্রাসাদের সৌন্দর্য বাইরে থেকে দেখতেও খুব ভালো লাগে। পাশের রাস্তাগুলো দৃষ্টিনন্দন। টিকেট ছাড়াই প্রাসাদে ঢুকে মাঝখানের চত্বরটায় দাঁড়ানো যায়। চারদিক খোলামেলা। খোলা চত্বরে কাঁচের তৈরি পিরামিড। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন অসংখ্য মানুষ। ছবি তুললে সেটা সুন্দর হয়। ফেইসবুকে পোস্ট করাও যায়। তারপরেও বেশিরভাগ পর্যটক মোনালিসাকে দেখার জন্য যেভাবে লাইন দেন তাতে এই ছবিটিকে প্রায় সপ্তমাশ্চর্যের মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। অথচ দা ভিঞ্চির অন্য অনেক ছবির ব্যাপারে দর্শনার্থীদের উৎসাহ বেশ কম বলে মনে হয়।

 

ওরসে – মুজি মোনে মারমোতাঁ –  জিভার্নি – ল’রেঞ্জারি

ওরসে

ইমপ্রেশনিস্ট ছবি দেখা এবং ওই কালপর্বের চিত্রকলাকে মোটামুটিভাবে বোঝার জন্য আমার যাত্রা শুরু হয় মুজি দ’ ওরসে বা ওরসে মিউজিয়াম থেকে। এই পর্বের ছবির জন্য এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালা। সলফেরিনো বা রু দু বাখ মেট্রো স্টেশন থেকে সামান্য হাঁটা পথ। সেই পথের দুপাশে বেশ কিছু সুভেনিরের দোকান আর কয়েকটা চমৎকার পেস্ট্রি শপ আছে। পেস্ট্রি শপ আমাকে খুবই উতলা করে তোলে, কিন্তু মিউজিয়ামে যেতে হলে অন্যদিকে মন বা সময় কোনটাই দেওয়া যায় না।

5

পুরনো একটা রেলস্টেশনকে নতুনভাবে সাজিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই সুসংগঠিত মিউজিয়াম। এখানে ইম্প্রেশনিস্ট-পূর্ব যুগের বেশকিছু ছবি আছে। আছে ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের প্রথম জীবনে আঁকা ছবি। এগুলোকে এখন বলা হয় প্রাক-ইমপ্রেশনিস্ট পর্যায়ের কাজ। সেই ছবিগুলো কালানুক্রমিকভাবে দেখতে থাকলে এই শিল্পীদের চিন্তা ও কাজের ক্রম-অগ্রগতি বা বিবর্তনটুকু সহজেই ধরা পড়ে। কীভাবে তাঁরা চলে গিয়েছেন স্টুডিওর বাইরে, খোলা জায়গায়। কীভাবে প্রকৃতি, আলোছায়া, ও অপসৃয়মান সময় তাঁদের ছবিতে ধরা দিতে শুরু করলো। তুলুজ লোত্রেক, কামিল পিসারো, রেনোয়া, ক্লদ মোনে, এদুয়ার মানে, এডগার দেগা, পল সেজান, পল গঁগ্যা থেকে ভ্যান গঘ অথবা জর্জ সোইয়া পর্যন্ত সকল শিল্পীর অতি বিখ্যাত এবং প্রতিনিধিত্বশীল সব ছবির সংগ্রহ এখানে আছে। কয়েকটা ঘর জুড়ে একের পর এক সাজানো সেগুলো। পল সেজান ও গঁগ্যাকে অবশ্য এখন পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট বলেই গণ্য করা হয়। তবু ওই সময়ের শিল্পী হিসেবে এঁদের সবার ছবি একত্রে দেখার দরকার আছে। কিছুটা সময় নিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ওই সময় প্রথাবিরোধী ছবি আঁকা কীভাবে শুরু হয়েছিল। চোখে পড়ে, এঁদের সকলের মিলটা কোথায়। কেন এঁরা একত্রিত হলেন, কোন বৈশিষ্ট্য তাঁদের আলাদা করেছে আর পরবর্তীকালে এঁদের পার্থক্যগুলো কোনখান থেকে সূচিত হলো।

ওরসে মিউজিয়ামে ঢুকলে নিচতলায় প্রথমেই চোখে পড়বে বেশ কিছু ভাস্কর্য। প্রত্যেকটি ভাস্কর্য সুন্দর। এদের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। সুতরাং এগুলো মন দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করবেই। মিউজিয়ামটির সংগ্রহ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণার জন্য এই ভাস্কর্যগুলোর গুরুত্ব আছে। অন্য ছবিও আছে অনেক। আছে চীন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু সংগ্রহ, অন্য ধারার এবং অন্য যুগের ছবি ও শিল্পবস্তু। এগুলো বাদ দিয়ে শুধু ইমপ্রেশনিস্ট ছবি দেখার উদ্দেশ্যে একদিনে এই মিউজিয়ামটি সম্পূর্ণ দেখে ফেলা যায়। এখানে ঘুরতে ঘুরতেই আগ্রহ তৈরি হবে ওই যুগের বিখ্যাত কিছু শিল্পীকে আরো নিবিড়ভাবে জানবার। রেনোয়ার ছবি আরো ভালোভাবে দেখতে ও বুঝতে হলে যেতেই হবে অন্য কয়েকটি মিউজিয়ামে। এমনকি ফ্রান্সের দক্ষিণে, ভুমধ্যসাগরের তীরে কান শহরের কাছে রেনোয়ার বাড়ি ও মিউজিয়াম দেখতে হবে। ভ্যান গঘের ছবির ভালো সংগ্রহ আছে নিউ ইয়র্কসহ অন্য বেশ কয়েকটি জায়গায়। তার মধ্যে অন্যতম বড় সংগ্রহটি আছে আমস্টারডামে শিল্পীর নামে তৈরি মিউজিয়ামে। আর ইমপ্রেশনিজমের প্রবর্তক হিসেবে যে শিল্পী সবচেয়ে বেশি পরিচিত, যার ইমপ্রেশন ‘সানরাইজ’ ছবি থেকেই এই আন্দোলনের নামকরণ, তিনি হলেন ক্লদ মোনে। তাঁর প্রায় সারাজীবনের কাজের একটা বড় অংশ প্যারিতেই থেকেই দেখে নেওয়া সম্ভব।

ওরসে মিউজিয়ামে মোনের অনেকগুলো ছবি আছে। এর মধ্যে দু-তিনটি ছবি ইমপ্রেশনিস্ট যুগের আগেকার সময়ে আঁকা। খুবই বাস্তবধর্মী এই ছবিগুলোর শিল্পরীতি, মানুষের অবয়ব, রঙের ব্যবহার সবকিছুই আলাদা। অল্প কিছু কাল পরে আঁকা তাঁর অন্যান্য ছবির চেয়ে এগুলি এতই অন্যরকম যে পার্থক্য কোথায়, কাউকে দেখিয়ে দিতে হয় না। এখানেই আছে ইমপ্রেশনিস্ট রীতিতে আঁকা ক্লদ মোনের বেশকিছু ছবি। ঝাপসা রঙে আঁকা ক্যাথিড্রাল থেকে শুরু করে ছাতা মাথায় তরুণীর বিখ্যাত ছবি। আর আছে সবুজ রঙের কাঠের সাঁকোর দু-খানি ছবির মাঝখানে নীল জলপদ্মের একটা বড় মাপের ছবি। কিন্তু মোনের সবচেয়ে বিখ্যাত কয়েকটি ছবি আছে অন্যখানে। তাই আমার পরের গন্তব্য মুজি মোনে মারমোতাঁ।

মুজি মোনে মারমোতাঁ

প্যারি শহরেরই আরেক প্রান্তে একটা বড় ভবনের ভেতরে মুজি মোনে মারমোতাঁ নামের এই মিউজিয়াম। সহজেই মেট্রো রেল ধরে, এবং খানিকটা পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছে যাওয়া যায়। আশ্চর্য, যে-শিল্পীর ছবি দেখার জন্য প্যারির বিভিন্ন মিউজিয়ামে এত ভিড়, সেই শিল্পীর সবচেয়ে বড় সংগ্রহটি দেখার জন্য তেমন কোনো লম্বা লাইন নেই। সহজেই টিকেট করে ঢুকে পড়া যায়। এখানেও অন্য যুগের অন্য শিল্পীদের কিছু ছবির সংগ্রহ আছে। মাঝে-মাঝেই অন্য কালপর্বের ভিন্ন কোনো দেশের ছবির বিশেষ প্রদর্শনী চলতে থাকে। কিন্তু সেসবকে পাশ কাটিয়ে আমি চলে যাই নিচতলার সেই হলঘরে যেখানে ক্লদ মোনের ছবির প্রধানতম সংগ্রহ।

তিনটি ঘর জুড়ে এই প্রদর্শনী। এখানেই আছে তুলনামূলকভাবে ছোট, কিন্তু ছবির জগতে আলোড়ন তৈরি করা সেই ঐতিহাসিক ছবি। ইমপ্রেশন সানরাইজ বা সুর্যোদয়ের মনোছাপ। এছাড়া এখানে ক্যাথিড্রাল, লন্ডনের দৃশ্য, খড়ের স্তূপ, এরকম কিছু বিখ্যাত চিত্রমালা আছে। এসব চিত্রমালায় একই দৃশ্য বারবার এঁকেছেন শিল্পী। দ্রুত অপসৃয়মান আলো-ছায়ার গতিবিভঙ্গে দৃশ্যের রূপ বদলে যায়। আলো আর রঙের তারতম্যে সেই ভিন্ন ভিন্ন রূপকে ধারণ করে রেখেছেন শিল্পী। এই ঘরটির সব শেষে আছে মোনের আঁকা পদ্মপুকুরের বিশাল কয়েকটি ছবি। পদ্মপুকুর, জলপদ্ম, কাঠের সবুজ সাঁকো, এসবের ছবি অনেকবার এঁকেছেন ক্লদ মোনে। নানা ঋতুতে, দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়, নানা ধরনের আলো-ছায়াতে আঁকা এই বিশাল ছবিগুলোর প্রথম পর্যায়ে পুকুর, পদ্মপাতা, পানি-ছোঁয়া উইলোর পাতা, বাগান, নানা রঙের ফুল, এরকম প্রত্যেকটা জিনিসকে আলাদা করে চেনা যায়। এর পরের কয়েক বছরে ক্রমেই বদলে গেছে শিল্পীর স্টাইল এবং চিত্রশৈলী। এই মিউজিয়ামের পরের কিছু ছবিতে সেই পরিবর্তন স্পষ্ট দেখা যায়। ক্রমশ হারিয়ে যায় ফর্ম, মুছে যায় অবয়ব। পাতা, ফুল, পানি আর আকাশ আলাদা করে চেনা যায় না। জেগে থাকে শুধু কিছু রং। আলাদা করে এই ছবিগুলোকে দেখলে মনে হবে, পুরোপুরি বিমূর্ত। শুধুই রঙের কম্পোজিশন। কিন্তু আগের ছবিগুলো দেখে এলে বোঝা যায় এখানেও আছে সেই জলাশয়, সেই জলপদ্ম, অন্যান্য সবুজ গাছ আর বহুবর্ণ ফুলের সমাহার। শুধু তাদের নির্দিষ্ট রূপ, রেখা আর সীমানা মুছে গেছে।

 

জিভার্নি

যে-পুকুরের ছবি তিনি বারবার এঁকেছেন, ক্লদ মোনের নিজের তৈরি করা সেই পদ্মপুকুর আজো আছে জিভার্নি গ্রামে। ১৮৮৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে ওখানে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেন ক্লদ মোনে। সেখানেই তিনি নিজের পরিকল্পনা-মাফিক বাড়ি ও স্টুডিও সাজিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন বাগান আর পদ্মপুকুর। সেসব জিনিস অতি যত্নে সংরক্ষণ করছে ক্লদ মোনে ফাউন্ডেশন। প্যারি থেকে সেটা খুব দুরে নয়। তাই আমার তৃতীয় গন্তব্য হলো জিভার্নি।

 

প্যারির চারটি বড় রেল স্টেশনের একটি হলো সাঁ লাজার। জিভার্নি যাবার জন্য সেখান থেকে টিকেট করে ট্রেনে উঠতে হয়। দেড় ঘণ্টার মধ্যে ট্রেন পৌঁছে যায় শহর থেকে একটু দূরে, ভার্নো স্টেশনে। স্টেশন থেকে বের হয়েই বাস স্টপ। এই ট্রেন থেকে যেসব যাত্রী ভার্নো স্টেশনে নামেন তাদের প্রায় সকলেই জিভার্নির যাত্রী। সবাই এখান থেকেই বাস ধরবেন। আধ ঘণ্টার মধ্যে সেই বাস পৌঁছে যায় ক্লদ মোনের বাড়ির কাছে। সেখানে নেমে রু ক্লদ মোনে নামের রাস্তা ধরে খানিকটা হাঁটতে হয়। বাম দিকে গাড়ি পার্ক করার জন্য অনেকটা খোলা জায়গা। ডানদিকে টিকেট ঘর। টিকেট কিনে ঢুকতে হয় মোনের বাড়িতে।

দোতলা বাড়িটির ভেতরে বিভিন্ন ঘরে রয়েছে শিল্পীর ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী। মোনের সংগ্রহ করা অন্য শিল্পীদের ছবি আছে কোনো কোনো ঘরে। আছে বেশকিছু জাপানি শিল্পীর নানা ধরনের কাজ। ডাইনিং রুমে আছে কারুকাজ করা জাপানি তৈজসপত্র। জীবনের এই পর্যায়ে জাপানি চিত্রকলা ও জীবনশৈলীর ব্যাপারে মোনের প্রবল আগ্রহ জন্মেছিলো। সমসাময়িক জাপানি শিল্পকলা ও শৈলী কীভাবে তাঁকে আকৃষ্ট করেছে আর কীভাবে তাঁর নিজের ছবিকে প্রভাবিত করেছে, তার অনেকখানি স্পষ্ট হয় এখানে এলে। আর স্পষ্ট হয় কেন গ্রীষ্ম ও শরতকালের প্রত্যেকটি দিন দলে দলে জাপানি পর্যটক মোনের এই বাড়ি দেখতে আসেন। সেই রহস্যময় যোগসূত্রটি হলো মোনের জাপানি প্রভাবের কালপর্ব।

মূল দোতলা বাড়ির সবগুলো ঘর দেখে ভেতরের দিকের দরজা দিয়ে বের হয়ে এলে চোখে পড়ে ফুলের বাগান। পুরোপুরি ফরাসি শৈলীতে তৈরি। এক-এক ধরনের ফুলগাছের জন্য আলাদা আলাদা ব্লক। তাদের ফাঁকে ফাঁকে হাঁটার জায়গা। সারিবদ্ধভাবে লাগানো গাছে বিভিন্ন রঙের সমাহার এখনো আগের মতোই আছে। সেখানে হেঁটে বেড়ানো শেষ করে তারপর যেতে হয় মূল রাস্তার অপর পাশে।

ওপাশে যাওয়ার জন্য বড় রাস্তার নিচ দিয়ে টানেল তৈরি করা আছে। কিছুদিন জিভার্নির বাড়িতে থাকার পর মোনে রাস্তার অন্য পাশে আলাদা জমি কিনে এই পদ্মপুকুরের কাজ শুরু করেন। জাপানি বাগানের আদলে নিজের পরিকল্পনা ও ডিজাইন অনুযায়ী শিল্পী তৈরি করেছিলেন পদ্মপুকুর আর জল-বাগান। সেই পদ্মপুকুরের একটা অংশে আছে সবুজ রঙের কাঠের সাঁকো। এই বাগান, পদ্মপুকুর বা লিলিপন্ড শিল্পী তৈরি করেছেন জিভার্নি গ্রামের নিরিবিলি প্রকৃতির ভেতর, আর তার বর্ণ-গন্ধ ও অনুভুতিকে ধারণ করেছেন নিজের মনোজগতে। তারপর তিনি মনোজগতে তৈরি হওয়া এই দৃশ্যগুলোকে নিজস্ব ভঙ্গিতে পুনরায় সৃজন করেছেন তাঁর ক্যানভাসে। বিভিন্ন ঋতুতে, বৃষ্টিতে অথবা উজ্জ্বল দিনে, দিনের নানা সময়ের বদলে যাওয়া আলোয় বারবার এঁকেছেন এখানকার দৃশ্যগুলো। প্রথমে ফুলবাগান। নানা প্রজাতির, নানা রঙের ফুল। শিল্পীর তুলিতে ক্রমশ সেইসব ফুল ও পাতার আকৃতি ঘুচে গেছে। শেষ পর্যন্ত রয়ে গেছে শুধু রঙের ইমপ্রেশন। এছাড়া আলো আর পানির সুক্ষ্ণ লুকোচুরি খেলা এবং ভাসমান পদ্মপাতার ওপর আলো-ছায়ার কারুকাজ নিয়ে পদ্মপুকুর ও জলপদ্মের অসংখ্য ছবি তিনি এঁকেছেন। অধিকাংশই বড় ক্যানভাসে। শেষ পর্যায়ে গিয়ে তিনি এঁকেছেন জলপদ্ম ও পুকুরের বিশাল প্যানেলগুলো।

4

‘জলপদ্মের ডেকোরেশন’ শীর্ষক এই ছবিগুলো আঁকার জন্য ১৯১৬ সালে এখানে তৈরি করতে হয়েছিলো বিশালায়তন ওয়াটার লিলি স্টুডিও। এখান থেকেই শুরু হয়েছে পোস্টইমপ্রেশনিস্ট ভাবনা আর রঙের নতুন শৈলী। বিমূর্ত শিল্পরীতি। জলপদ্মের ডেকোরেশন নামের এই ছবিগুলো শিল্পী দেশকে উৎসর্গ করেছেন। অর্থাৎ, সম্পূর্ণভাবে দান করেছেন। ছবিগুলো এত বড় আর এত বিশিষ্ট যে তাদেরকে সাজানো ও প্রদর্শনের জন্য তৈরি করতে হয়েছে বিশেষ একটি গ্যালারি। একটা সম্পূর্ণ আলাদা মিউজিয়াম।

ক্লদ মোনের শিল্পভুবনকে পরিপূর্ণভাবে জানা আর ইমপ্রেশনিজমের শেষ পর্বটিকে বোঝার জন্য আমার চতুর্থ গন্তব্য হচ্ছে এই বিশেষ মিউজিয়াম। ছোট এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর নাম ল’রেঞ্জারি।

 

ল’রেঞ্জারি, প্যারি

ক্লদ মোনের চিত্রকলা, তাঁর নিজের আবাস এবং পরিণত বয়সের কাজের জায়গাগুলো দেখে জিভার্নি থেকে প্যারিতে ফিরে আসার পর খানিকটা আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে হয়। শিল্পকলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পালাবদল এনেছে এই আন্দোলন। আর সেই পালাবদলের দিনে, একেবারে সামনের সারিতে থেকে ক্লদ মোনে যে অবদান রেখেছেন এটা উপলব্ধি করা একটা বিরল অভিজ্ঞতা। ছবিগুলোর সামনে গিয়েও বিশ্বাস হয় না যে এই বিখ্যাত ছবির সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। সেই পদ্মপুকুর আর জলপদ্মের কাছাকাছি গিয়ে সবাই যখন ক্যামেরায় ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, নিজের কাছেই এই দৃশ্যকে স্বপ্নের মতো মনে হয়। এই মগ্নতা কাটিয়ে ওঠার আগেই দেখে নেওয়া দরকার ল’অরেন্জারি মিউজিয়ামে রাখা জলপদ্ম ও পদ্মপুকুরের ছবিগুলো। এগুলোই হচ্ছে মোনের সর্বশেষ সিরিজ ছবি।

ফিরে আসি প্যারিতে। ল্যুভ মিউজিয়ামের পশ্চিমে বিশাল বাগান। সেই বাগানের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একসময় কমলার বাগান ছিলো। পরে সেখানেই গড়ে উঠেছে ল’অরেন্জারি। মোনের দেওয়া আটটি বিশাল প্যানেল ছবি নিয়ে ১৯২৭ সালে এই মিউজিয়ামের যাত্রা শুরু। কয়েকবার পুনর্নির্মাণ করার পর ২০০৬ সালে এটা বর্তমান রূপ লাভ করে। আমি যখন প্যারির অন্য সব মিউজিয়াম দেখা শেষ করে এই মিউজিয়ামটিতে যাবার জন্য চেষ্টা করছি তখন এটা বন্ধ। পনের–বিশ বছর আগে প্যারিতে যাওয়া-আসার সময় প্রায়ই খোঁজ নিয়েছি। কিন্তু এটা খোলার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর এখানকার ছবিগুলোর এমনই আকার আকৃতি যে এই মিউজিয়াম না খুললে সেগুলো অন্য কোথাও নিয়ে প্রদর্শন করা সম্ভব নয়। অবশেষে ২০০৬ সালে আমার অপেক্ষার দিন শেষ হয়। আবার খুলে দেওয়া হয় এই মিউজিয়াম। সবচেয়ে বড় ছবির ছোট্ট একটি সংগ্রহ। অল্প সময়ে দেখে ফেলা যায়। প্যারিতে এটাই সম্ভবত একমাত্র মিউজিয়াম যেখানে এখনো ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া এবং ছবি তোলার অনুমতি আছে। অবশ্যই ফ্ল্যাশ লাইট ছাড়া।

এখানে দুটো বিশাল ওভাল বা ডিম্বাকৃতি ঘর বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে মোনের ছবিগুলোকে সাজানোর জন্য। আটটি ছবির প্রত্যেকটি দুই মিটার উঁচু। দৈর্ঘ্যে একটু কম-বেশি থাকলেও সবমিলিয়ে এদের দৈর্ঘ্য ১০০ মিটারের মতো। প্রধানত জিভার্নির পদ্মপুকুরের দৃশ্যই এখানকার ছবির বিষয়। কিন্তু দিনের বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ধরনের আলোয়, শিল্পীর দেখার ভঙ্গিতে বদলে গেছে সেইসব দৃশ্য আর রং। পুকুরের পানিতে আকাশের প্রতিফলন, গাছের ওপর থেকে পানি পর্যন্ত নেমে আসা ডালপালা, পদ্মপাতা, আর দু একটি জলপদ্ম। কখনো বিকেলের প্রজ্জ্বলিত রোদ্দুর যেন আগুন জ্বালিয়ে দেয় পুকুরপারের ঝোপঝাড়ে। কখনো নির্জন ও নিঃশব্দ বিকেলে পানির শান্ত রূপ, মৃদু তরঙ্গ আর তার অস্ফুট ধ্বনি মিশে থাকে শিল্পীর অনুভুতির মধ্যে।

মিউজিয়ামের নিচের তলায় অন্য কিছু ছবি আছে। সেগুলো মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেখানে দেখা যায় কয়েকটি রেনোয়া এবং পল সেজান। সেজান শুধু আপেলের ছবি এঁকেই পৃথিবীজুড়ে সাড়া জাগাতে চেয়েছিলেন। তাঁর সেই আপেলের স্থিরজীবন আছে এখানে। নিচের তলায় আর একটা বড় আকর্ষণ হচ্ছে ক্লদ মোনে ও তাঁর পদ্মপুকুরের ছবির ওপর তৈরি করা তথ্যচিত্র। এখানকার একটা ঘরে সেই তথ্যচিত্রটি সারাদিনে অনেকবার দেখানো হয়। জিভার্নির পদ্মপুকুর আর মোনের ছবিগুলো নিয়ে পরবর্তীকালে কতরকম বিশ্লেষণ ও গবেষণা হয়েছে তার একটা আভাস পাওয়া যায় এই তথ্যচিত্র থেকে। অন্যান্য মিউজিয়ামে প্রদর্শিত মোনের ছবি আর জিভার্নি গ্রামের যে-সব জায়গা আমি দেখে এসেছি ল’অরেন্জারিতে রাখা শিল্পীর শেষজীবনের এই ছবিগুলো দেখে সেই ভ্রমণ পূর্ণতা পায়। প্রত্যেকটি ছবি যেন শিল্পীর পুরো জীবনের বার্তা। সেসব ছবির আলো আর রং আমাদের মোহাবিষ্ট করে রাখে। চোখ ফেরানো যায়না।

ইমপ্রেশনিজম আর ক্লদ মোনের ছবি ও জীবন সম্পর্কে জানার জন্য প্যারির বিভিন্ন মিউজিয়ামকে ঘিরে যে যাত্রা শুরু  হয়েছিল, তার একটা পর্ব এখানেই শেষ হয়। আমার নিজের স্মৃতিতে এই দেখার সঙ্গে মিশে আছে ক্লদ মোনের সমগ্র চিত্রকর্মের একটি অসাধারণ প্রদর্শনী দেখার অভিজ্ঞতা। সেই গল্পটা আলাদা করেই বলতে হবে তীরন্দাজের পাঠকদের জন্য, পরে অন্য কোনো সময়ে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close