Home চিত্রকলা ইফতেখারুল  ইসলাম / নিজের  শহরে  ক্লদ  মোনের  রাজসিক  ফিরে  আসা 

ইফতেখারুল  ইসলাম / নিজের  শহরে  ক্লদ  মোনের  রাজসিক  ফিরে  আসা 

প্রকাশঃ May 12, 2017

ইফতেখারুল  ইসলাম / নিজের  শহরে  ক্লদ  মোনের  রাজসিক  ফিরে  আসা 
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : বিশ্বখ্যাত ফরাসি ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পী ক্লদ মোনে। ইতিপূর্বে তাঁর শিল্পকর্ম নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন শিল্প-সমালোচক লেখক ইফতেখারুল ইসলাম। এবার প্রকাশিত হলো ওই লেখার দ্বিতীয় পর্ব। এতে মোনের সর্ববৃহৎ ঐতিহাসিক প্রদর্শনী দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন তিনি।]

“প্রদর্শনী উদ্বোধন হবার আগেই তিরাশি হাজার টিকেট অগ্রিম বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো| আর তারপর প্রতিদিন যে পরিমাণ টিকেট বিক্রি হয়েছে, যে সংখ্যায় দর্শনার্থী ভিড় করেছেন তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য| ক্লদ মোনের এই বিশাল প্রদর্শনী শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের সর্বকালের সর্ববৃহৎ প্রদর্শনীতে রূপ নেয়| দর্শনার্থীর সংখ্যা অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করে| চার মাসে এখানে আসেন প্রায় দশ লক্ষ শিল্পানুরাগী| জানুয়ারির ২৪ তারিখ ছিল প্রদর্শনীর শেষ দিন| মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি| কিন্তু তার তিনদিন আগেই কর্তৃপক্ষকে ঘোষণা করতে হয় যে শেষ দিনগুলোতে প্রদর্শনী খোলা থাকবে সারাদিন-সারারাত| দিন-রাত ২৪ ঘন্টা করে টানা ৭২ ঘণ্টা।”

112

গ্র্যান্ড প্যালেসে বিশেষ প্রদর্শনী

নিউ ইযর্ক টাইমস-এর আন্তর্জাতিক সংস্করণটি বহু যুগ ধরে ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন নামে পরিচিত ছিল| এখন এর নাম দ্য ইন্টারন্যাশনাল নিউ ইযর্ক টাইমস| খুব রক্ষণশীল ধরনের দৈনিক পত্রিকা যার দৃষ্টিভঙ্গি এবং  মতাদর্শ আমার পছন্দ হয় না| ভিন্নমত বিষয়ে সহনশীলতার চর্চা করে আমি দীর্ঘদিন এই কাগজটির পাঠক ছিলাম| যতদূর মনে পড়ে ২০০৫ সালে এই পত্রিকাটি ঢাকা থেকে মুদ্রিত হতে শুরু করে| প্রতিদিন কাগজটি দেখি| দেখি রক্ষণশীলরা পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহকে কোন দৃষ্টিতে দেখে| খবরের চেয়ে অন্যান্য গল্প-কাহিনী পড়তে বেশি পছন্দ করি| আসলে আন্তর্জাতিক সংবাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, অর্থনীতি, এগুলোর চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষর্ণীয় হচ্ছে এই পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত কিছু কিছু অপ-এড নিবন্ধ, শেষ পৃষ্ঠায় সপ্তাহে একদিন ছাপানো ভ্রমণ-সহায়ক রচনা আর চিত্রকলা বিষয়ক নানা খবরাখবর ও প্রতিবেদন| ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরের এক সংখ্যায় প্রথম পাতায় বেশ বড় করে খবর ছাপা হলো যে কয়েক দিনের মধ্যে প্যারির গ্র্যান্ড প্যালেসে শুরু হতে যাচ্ছে ক্লদ মোনের একটি বিশাল চিত্র-প্রদর্শনী| তাঁর সারা জীবনের চিত্রকর্ম নিয়ে আয়োজিত হবে এই প্রদর্শনী|

এ ধরনের প্রদর্শনী বিরল| প্যারিতে ছোট-বড় যতো মিউজিয়াম আছে তাদের নিজস্ব ছবির সংগ্রহ কম নয়| এরা আবার মাঝেমধ্যে আয়োজন করে ছোট কোনো বিশেষ প্রদর্শনী| সীমিত সময়ের মধ্যে সেই প্রদর্শনী ভালোভাবে দেখে শেষ করা রীতিমত কঠিন| এসব স্থায়ী এবং বিশেষ প্রদর্শনীর বাইরেও খ্যাতনামা শিল্পীদের নিয়ে বড় গ্যালারিতে বিশাল আয়োজন করা হয়| তিরিশ, চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছরে একবার করা হয় এরকম আয়োজন| কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে করা এই বিশেষ প্রদর্শনীতে আসে নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা বিশেষ কোনো শিল্পীর ছবি| নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সারা পৃথিবীর নামি প্রতিষ্ঠান থেকে ছবি ধার করে আনা হয়| বিশেষ প্রদর্শনী চলে বেশ কয়েক মাস ধরে| ধারণা করা হয় দেশ-বিদেশ থেকে বহু মানুষ এই প্রদর্শনী দেখতে আসবেন|

যাই হোক, হেরাল্ড ট্রিবিউনের রিপোর্ট থেকে জানা গেল যে ক্লদ মোনের সারা জীবনের শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজন করা এক অভূতপূর্ব প্রদর্শনী প্যারিতে শুরু হতে যাচ্ছে| শুরুর আগে সংবাদ-সম্মেলন হয়েছে| সেই সম্মেলন থেকে ফিরে এসে ওই প্রতিবেদক বিশাল এক রচনা তৈরি করেছেন| তিনি জানাচ্ছেন, এই প্রদর্শনীতে লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, শিকাগো, সিডনি, এমন বহু শহর থেকে মোনের অনেকগুলো ছবি আনা হচ্ছে| সব মিলিয়ে মোনের ছবির অভূতপূর্ব এক সমাবেশ| কিন্তু তা সত্বেও রয়ে যাচ্ছে কিছু অপূর্ণতা| আর সেটা নিয়ে প্রতিবেদক রীতিমতো গবেষণা চালিয়েছেন| অনেক নিউজিয়ামের প্রধান এবং বেশ কজন শিল্প-বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছেন| অনুসন্ধিৎসু প্রতিবেদন তৈরি করে ছাপিয়ে দিয়েছেন|

মূল কথা এই যে, এত ছবি এলেও শেষ পর্যন্ত ক্লদ মোনের কিছু প্রধান ছবি বাদ পড়ে যাচ্ছে| আকার-আকৃতির কারণে প্রদর্শনীর কেন্দ্র থেকে অল্প দূরে থাকা ল’অরেন্জারি মিউজিয়ামের ছবিগুলো আনা যায়নি| সেটা খুবই স্বাভাবিক| কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো কারণে সহযোগিতা করতে রাজি হয়নি মুজি মোনে মার্মতা| ফলে এই প্যারিতেই রয়ে গেল শিল্পীর দুটি বড় সংগ্রহ| আর তাদের বাদ দিয়েই ক্লদ মোনের সারা জীবনের সমগ্র চিত্রকর্মের একটা বিশাল প্রদর্শনী প্যারিস শহরে চললো চার মাস ধরে|

এই শিল্পীর ছবি প্যারির ছোট-বড় চারটি মিউজিয়ামে আর নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট আর মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্টে অনেকেই দেখেছেন| তারপরেও তাঁর সমগ্র কাজের ওই প্রদর্শনী দেখতে পারাটা এক বিরল সৌভাগ্য| ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়া আগ্রহ-জাগানিয়া এবং অতি-সুলিখিত দীর্ঘ লেখাটি  পড়ার পর আমার মনে হয় এই প্রদশনী না দেখলে আমার জীবন আর এতদিনের প্যারি যাতায়াত – সবই বিফল হয়ে যাবে|

আমার সৌভাগ্য, এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি| বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি প্যারি থেকে একটা সভায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেতে| অল্পদিন পরেই অফিসের কাজে আমি প্যারি হাজির হই| সেখানকার তিনদিনের কাজ সেরে অন্য একটা কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য আমার যাবার কথা মিলানে| দুই কাজের মাঝখানে একটি দিন আমি বের করে নিতে সক্ষম হই| পেয়ে যাই একজন বড় শিল্পীকে ফিরে-দেখা আর পরিপূর্ণভাবে জানার সুযোগ| দুচোখ ভরে দেখি বিরল সব ছবি আর নিজের জীবন সত্যিই সার্থক মনে হয়| প্রদর্শনীতে ছবি তোলা পুরোপুরি নিষেধ| তাই বেশিরভাগ ছবি সম্পর্কে শিরোনামের সঙ্গে কিছু কিছু নোট লিখে রাখি| বিশেষ ভালো লাগা ছবিগুলো দেখার জন্য সময় দিই বেশি| কিছুটা ঘুরে এসে আবার অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি| এভাবে হয়তো বেশিদিন ছবিটার কথা মনে থাকবে| হয়তো তৈরি হয় একটা স্থায়ী অভিঘাত|

একদা যে দেশে ক্লদ মোনের চিত্রকলাকে বাড়ির ওয়ালপেপার হিসেবে ব্যবহারের অনুপযুক্ত বলে তাচ্ছিল্য করা হয়েছিল, সেখানেই তাঁর রাজসিক প্রত্যাবর্তন| তাঁকে ঘিরে বিশাল উত্সব ও উদযাপন| প্রথম জীবনে যতই অবহেলা করা হোক, সারা পৃথিবীতে গত একশো বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাঁর অনন্য মর্যাদা| এই অসাধারণ মর্যাদা, শিল্পরসিকদের অশেষ আগ্রহ, সাধারণ দর্শকের মুগ্ধ মনোযোগ- এগুলোকে অবলম্বন করেই ২০১০ সালে প্যারির বিশেষ প্রদর্শনী|

প্যারিতে জন্ম নেয়া শিল্পগুরু ক্লদ মোনে প্রথম জীবনে বহু অবজ্ঞা ও অবহেলা সয়েও ক্রমাগত ছবি এঁকেছেন আর সৃজন করেছেন বিশ্ব-চিত্রকলার নতুন নতুন ধারা| ১৯২৬ সালে ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করার আগে শেষ করেছেন আড়াই হাজারেরও বেশি ছবি আর ড্রইং| তাঁর বিভিন্ন কালপর্বের অসাধারণ সব ছবি আনা হয়েছে| আনা হয়েছে একই ছবির বেশ কটি ভিন্ন রূপ যা মোনে এঁকেছেন বিভিন্ন সময়ে| ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রকলার সর্ববৃহৎ সংগ্রহশালা ওরসে মিউজিয়াম এর প্রধান আয়োজক| প্রদর্শনীটির আয়োজন করা হয়েছে শহরের কেন্দ্রে, সাঁজেলিজের পাশে গ্র্যান্ড প্যালেসের গ্যালারিতে| স্থান, কাল এবং বিষয়ের বিবেচনায় যে কোনো শিল্পানুরাগীর জন্য এ এক অনন্য সাধারণ আয়োজন|

অক্টোবরের শুরুর দিকে প্যারি পৌঁছাচ্ছি বলে সহজেই আমার পক্ষে প্রদর্শনীটি দেখা সম্ভব| কিন্তু প্রদর্শনী দেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে চাইলে বাইরের লাইনে সময় নষ্ট করা যাবে না| একবার টিকিটের জন্য এবং আর একবার গেট দিয়ে ঢোকার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ব্যয় করার মতো বাড়তি সময় কোথায়? তখনই ওয়েবসাইট ঘেঁটে জানা গেল আমার মতো আরো অনেক দর্শনার্থীর জন্যই সারাদিনের পরে, প্রতিদিন রাত প্রায় দশটা অবধি খোলা রাখা হচ্ছে এই প্রদর্শনী| আর টিকেট কেনার জন্য লাইনে দাঁড়াতে না চাইলে অনলাইনে অথবা প্যারিসে কোনো কোনো হোটেলের কন্সিয়ার্জ থেকে কেনা যাবে প্রদর্শনীর টিকেট| তাতে কিছুটা সময় বেঁচে যাবে|

আন্তর্জাতিক সংগ্রহ নিয়ে ক্লদ মোনের শিল্পকর্মের এত বড় প্রদর্শনী গত তিরিশ বছরের মধ্যে কখনো হয়নি| আগামী তিরিশ অথবা পঞ্চাশ বছরেও কোথাও হবে কিনা সেটা অনিশ্চিত| সুতরাং এই দুর্লভ সুযোগ হাতছাড়া করার মানে হয়না| ইতোমধ্যে ক্লদ মোনের ছবির প্রধান সংগ্রহ বলে পরিচিত প্যারিসের তিনটি মিউজিয়াম এবং শহর থেকে বেশ কিছুটা দুরে জিভার্নিতে মোনের বাড়ি, বাগান আর পদ্মপুকুর দেখার জন্য বেশ কয়েকবার গিয়েছি বলে আমাদের সহকর্মীদের কেউ কেউ আমাকে কিছুটা নেশাচ্ছন্ন ভাবে| সেই অপবাদের প্রতি সুবিচার করার জন্য প্যারিসের সহকর্মীদের বিদায় জানিয়ে যথাসময়ে এই বিশাল প্রদর্শনীতে উপস্থিত হই|

এই প্রদর্শনীকে উপলক্ষ করে সারা পৃথিবীর আগ্রহী দর্শক যেমন চারমাস ধরে আসা যাওয়া করেছেন প্যারিতে, তেমনি দুটি ফরাসী মিউজিয়াম জড়িয়ে পড়েছে তুমুল তর্ক ও সংঘাতে| বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে সেই ঝগড়া-ঝাঁটির গল্প শুনতে বেশ আগ্রহ আছে আমার| তাই প্রদর্শনী দেখার এক পর্যায়ে তাদের এক কর্মকর্তার সঙ্গে নানারকম গল্প করে বিষয়টা বুঝতে চেষ্টা করি|

বিশেষ প্রদর্শনীর সমান্তরাল অন্য মিউজিয়ামে অনন্য ক্লদ মোনে  

আগেই বলেছি, গত তিরিশ বছরের মধ্যে এটিই ক্লদ মোনের ছবির বিশালতম প্রদর্শনী| সারা পৃথিবীর ৭০টি মিউজিয়াম থেকে আনা প্রায় ২০০টি ছবি স্থান পেয়েছে এখানে| এর মধ্যে ২৭টি ছবি আসে আমেরিকা থেকে যেখানে মোনে স্বীকৃতি ও প্রশংসা পেয়েছেন সবচেয়ে দ্রুত – এমনকি ফ্রান্সে সমাদৃত হবার আগেই| এই প্রদর্শনীতে ক্লদ মোনের কর্মজীবনের ৬০ বছরের ফসল একত্রিত করা হয়| ফলে দর্শকের কাছে তুলে ধরা গেছে তাঁর চিত্রকলার ক্রমবিবর্তন| ক্রমশ বদলে যাওয়া বিষয়, দৃষ্টিভঙ্গি, রং ও রেখার ব্যবহার – প্রতিটি কালপর্বের ছোট ছোট পরিবর্তন| বাতাস-দোলানো প্রকৃতি, মাঠ, ঘাস ও খড়ের স্তুপ থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরতীরের জুয়া লেপ্যা ও আন্তিবের প্রাকৃতিক দৃশ্য, লন্ডনের পার্লামেন্ট হাউসের বিষন্ন, কুয়াশা-আচ্ছাদিত সিলুএট| ভেনিসের নীল, আলোকোজ্জ্বল প্রাসাদ, বরফ ঢাকা সেইন নদীর এলোমেলো দৃশ্য থেকে কামিল মোনের মৃত্যুশয্যা, জিভার্নির ফুলবাগান, জলপদ্ম আর জলের ওপর সবুজ বাগান ও নীল আকাশের উজ্জ্বল অথবা বিষাদময় প্রতিফলন – এই হলো ক্লদ মোনের বিশাল সংগ্রহের সংক্ষিপ্ত রূপ|

মোনের দীর্ঘ কর্মজীবনকে উপস্থাপন করতে গিয়ে যে কয়েকটি ছবির অভাব প্রদর্শনীটিকে অপূর্ণ করে তুলেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো সূর্যোদয়ের ইম্প্রেশন : ১৮৭৩ সালে আঁকা যে-ছবি এক নতুন শিল্পরীতি ও আন্দোলনের সূচনা করেছিলো আর ইম্প্রেশনিজমকে দিয়েছিলো তার নাম ও পরিচয়| লো হাভ্রে সূর্যোদয়ের দৃশ্যের এই ছোটখাটো ছবিটি তার অসামান্য প্রভাব ও খ্যাতি নিয়ে গৌরবের সঙ্গে প্রদর্শিত হয় মুজি মোনে মারমোতাঁ নামের অন্য একটি সংগ্রহশালায়| শিল্পীর ছেলে মিশেল মোনে জিভার্নির বাড়ি থেকে এই মিউজিয়ামে দিয়েছেন অসংখ্য ছবি, ড্রইং, নোটবুক, স্কেচ, আর অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন| আর আছে জলপদ্ম ও ফুলবাগানের বিশালাকৃতি কিছু চিত্র| এরকম ১৩০টি ছবি নিয়ে অক্টোবরের ৬ তারিখ থেকে মুজি মোনে মারমোতাঁ আয়োজন করেছে তাদের নিজস্ব বিশেষ প্রদর্শনী| আন্তর্জাতিক সংগ্রহ নিয়ে এত বড় একটা বিশেষ প্রদর্শনী চলাকালেই অন্য মিউজিয়ামে ওই শিল্পীর আর একটি বিশেষ প্রদর্শনী কেন? এই মিউজিয়ামের কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলেন যে এটিকে তাঁরা মূল প্রদর্শনীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করাতে চাননি| তাঁরা শুধু বলেছেন যে গ্র্যান্ড প্যালেসে আয়োজিত বিশাল আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীটির সম্পূরক একটি চিত্রমালা এখানে উপস্থাপিত হলো| এর ফলে প্যারিতে মোনের বিশেষ প্রদর্শনী দেখতে আসা অগনিত দর্শক এই মিউজিয়ামের পৃথক প্রদর্শনীতেও আসতে পারেন| এভাবে সবাই পৃথিবী-বিখ্যাত এই শিল্পীর জীবন ও শিল্পকর্মের পূর্ণাঙ্গ চিত্রটি পেতে পারেন|

কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো এই যে সারা পৃথিবীর প্রতিটি বড় বড় মিউজিয়াম মোনের গ্র্যান্ড প্যালেসের প্রদর্শনী কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিলেও মারমোতাঁ একে প্রতিহত করেছে জোরালোভাবে| আয়োজক হিসেবে ওরসে মিউজিয়াম দিয়েছে তার প্রায় সব ছবি| এছাড়া নিউ ইযর্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অব আর্ট, মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট, সেন্ট পিটার্সবার্গের হার্মিটেজ, প্যারির ল্যুভ থেকে শুরু করে ফিলাডেলফিয়া, নিউ অর্লীয়নস, ওহায়ো, সান ফ্রান্সিসকো, শিকাগো, ইন্ডিয়ানাপলিস, ওয়াশিংটন ডিসি, বস্টন, ফ্লোরিডা, টরন্টো, অটোয়া, লন্ডন, কেমব্রিজ, আমস্টারডাম, স্টকহোম, জুরিখ, সেন্ট গ্যালেন, মন্টে কার্লো, ভেনিস, মেলবোর্ন, ক্যানবেরা, এরকম প্রায় প্রত্যেকটি প্রধান শহরের মিউজিয়াম থেকে এসেছে মোনের ছবি| এমনকি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় আর্ট গ্যালারি থেকেও ছবি চেয়ে আনা হয়েছে প্যারির গ্র্যান্ড প্যালেসের বিশেষ প্রদর্শনীর জন্য|

এই প্রদর্শনীর প্রধান পরিকল্পনাকারী এবং অন্যান্য কর্তাব্যক্তি তাঁদের প্রতিষ্ঠানের শক্তি এবং নিজেদের ব্যক্তি-উদ্যম কাজে লাগিয়ে সারা বিশ্বের প্রতিটি মিউজিয়াম থেকে মোনের ভালো ভালো ছবি সংগ্রহ করেছেন| ব্যক্তিগত আবেদন নিবেদন, চিঠি এবং ক্রমাগত ফলোআপের মধ্য দিয়ে সফল হয়েছে এই সংগ্রহ অভিযান| কিন্তু এই প্রদর্শনী থেকে মাত্র একটুখানিক, মেট্রো রেলের কয়েক স্টেশন দুরত্বে থাকা মুজি মোনে মারমোতাঁকে তাঁরা বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করাতে পারেননি| মারমোতাঁর পরিচালক জাক তাদেই খুবই বিনয়ের সঙ্গে তাঁর মিউজিয়ামটিকে একটি ছোট প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছেন যে তাঁরা গ্র্যান্ড প্যালেস বা অন্য বড় মিউজিয়ামের মতো সরকারি অর্থানুকুল্য পান না| তাই এর সংস্কার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে এর ভেতরকার মহামূল্যবান ছবিগুলোকে সম্বল করেই তাঁরা দর্শক টানতে চাইছেন| আর দর্শনীর মাধ্যমে উপার্জন বাড়াতে চেষ্টা করে চলেছেন| ন্যাটেক্সিস নামের একটি ফরাসি বিনিযোগ ব্যাংক অবশ্য গ্র্যান্ড প্যালেসের বড় প্রদর্শনী আর মুজি মোনে মারমোতাঁর সংস্কার কাজ দুইযের জন্যই অর্থ-সহায়তা দিয়েছে|

এগুলো ছাড়াও প্যারিতে লঅরেন্জেরি নামে আর একটি মিউজিয়াম আছে ল্যুভের অদূরে, বিশাল বাগানের অপর প্রান্তে| সেই মিউজিয়ামটিকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো হয়েছে ক্লদ মোনের আটটি বিশালায়তন প্যানেল ছবি দিয়ে| এই প্যানেলগুলো হচ্ছে মোনের বিখ্যাত জলপদ্ম সিরিজের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বড় চিত্রকর্ম| ১৯১৮ সালে ক্লদ মোনে এগুলো ফরাসি রাষ্ট্রকে দান করেন| আকার-আকৃতির কারণেই এগুলোকে ধার হিসেবে এনে গ্র্যান্ড প্যালেসের প্রদর্শনীতে দেখানো সম্ভব নয়| আর মারমোতাঁ মিউজিয়াম তার অনন্য সাধারণ ছবিগুলো দিতে রাজিই হয়নি| উদ্যোক্তারা তাই প্রথমে একটি সম্মিলিত প্রদর্শনীর প্রস্তাব করেন যাতে একটি গ্রুপ টিকেটের মাধ্যমে গ্র্যান্ড প্যালেসের বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, লঅরেন্জারি আর মারমোতাঁ – তিনটিই দেখা যাবে|

কিন্তু জাক তাদেই বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রদর্শনীর উদ্যোক্তারা মারমোতাঁ থেকে অন্তত ছটি খ্যাতিসম্পন্ন ছবি গ্র্যান্ড প্যালেসে নিয়ে যেতে চাইছেন| আর তাদের অন্যতম হচ্ছে সূর্যোদয়ের ইম্প্রেশন যা এই মুজি মোনে মারমোতাঁর নিজস্ব প্রদর্শনীর ক্যাটালগের প্রচ্ছদচিত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে| এমনকি তাঁদের প্রতিদিনের নিয়মিত প্রবেশ টিকেটের উপরেও এই ছবিটি ছাপা আছে| এই ছবি এতই বিখ্যাত আর এর ইতিহাস এতই বিচিত্র যে মারমোতাঁ কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই তা হাতছাড়া করতে রাজি নয়| এই ছবির বিতর্ক-উদ্দীপক ইতিহাস শুরু হয়েছে এর জন্মলগ্ন ১৮৭৪ সাল থেকেই| উনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসি চিত্র-সমালোচক লুই লেরয় এই ছবিটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলেছিলেন, যেকোনো ওয়ালপেপার প্যাটার্নের প্রাথমিক ড্রইংকেও এই সমুদ্র-দৃশ্যটির চেয়ে বেশি সুচারু বা সম্পূর্ণ বলে মনে হয়| তিনিই এর বর্ণনা দিতে গিয়ে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ইম্প্রেশনিস্ট শব্দটি ব্যবহার করেন|

এই ঘটনার এক শতাব্দীরও বেশি পার হয়ে যাবার পর ১৯৮৫ সালে ফ্রান্সের সবচেয়ে কুখ্যাত ও দুর্ধর্ষ শিল্প-চুরির ঘটনায় দিনেদুপুরে সশস্ত্র ডাকাতির মাধ্যমে মারমোতাঁ মিউজিয়াম থেকে চুরি হয়ে যায় এই ছবিটি সহ মোট নয়টি চিত্রকর্ম| ফরাসি চোর ও জাপানি গ্যাংস্টার মিলেমিশে এই ডাকাতি করেছিলো| ১৯৯১ সালে করসিকার একটি বাড়ি থেকে সূর্যোদয়ের ইম্প্রেশন নামের এই পৃথিবীবিখ্যাত, নতুন-যুগের-সূচনা-করা ছবিটি পুনরুদ্ধার করা হয়| এসব কারণেই জাক তাদেই তাঁর এই অমূল্য সংগ্রহ প্রাণপনে আগলে রাখতে চান| এই ছবিগুলোর উপর নির্ভর করেই দর্শনার্থী টেনে টিকেট বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় সংকুলান করতে হয় তাঁকে| এজন্যই অতি আকর্ষণীয় ছবিগুলো না দিয়ে তিনি শর্তহীনভাবে শুধু যুগ্ম টিকেটের মাধ্যমে গ্র্যান্ড প্যালেসের প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত হতে চান| কিন্তু শেষ পর্যন্ত মারমোতাঁ আলাদাই থেকে গেলো| গ্র্যান্ড প্যালেস শুধু লঅরেন্জারির সঙ্গে যুগ্ম প্রদর্শনীর টিকেট বিক্রি করেছে ১৮ ইউরোতে যা তখন প্রায় ১৮০০ টাকা|

আলোছায়ার গতি-বিভঙ্গে স্বপ্ন আর মনোজগতের ছবি

অন্য দুটি মিউজিয়াম কয়েকবার দেখা হয়ে গেছে| তাই এবার আমি শুধু গ্র্যান্ড প্যালেসের প্রদর্শনীর টিকেটই কিনেছি| তাও হোটেলের কন্সিয়ার্জ থেকে একটু বেশি দাম দিয়ে| এতে করে টিকেট কেনার লাইনে না দাঁড়িয়ে সরাসরি প্রদর্শনীতে ঢুকে যাওয়া যায়| আমার কাছে এটা অবিশ্বাস্য মনে হয় যে চার মাস ধরে প্রদর্শনী চলাকালে প্রায় প্রতিদিন একই রকম ভিড়| দিনের যে কোনো সময়ে টিকেট কিনতে এবং মূল দরজায় পৌঁছাতে প্রায় দুঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে সকলকেই| প্রদর্শনী উদ্বোধন হবার আগেই তিরাশি হাজার টিকেট অগ্রিম বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো| আর তারপর প্রতিদিন যে পরিমাণ টিকেট বিক্রি হয়েছে, যে সংখ্যায় দর্শনার্থী ভিড় করেছেন তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য| ক্লদ মোনের এই বিশাল প্রদর্শনী শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের সর্বকালের সর্ববৃহৎ প্রদর্শনীতে রূপ নেয়| দর্শনার্থীর সংখ্যা অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করে| চার মাসে এখানে আসেন প্রায় দশ লক্ষ শিল্পানুরাগী| জানুয়ারির ২৪ তারিখ ছিল প্রদর্শনীর শেষ দিন| মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি| কিন্তু তার তিনদিন আগেই কর্তৃপক্ষকে ঘোষণা করতে হয় যে শেষ দিনগুলোতে প্রদর্শনী খোলা থাকবে সারাদিন-সারারাত| দিন-রাত ২৪ ঘন্টা করে টানা ৭২ ঘন্টা|

প্যারিতে জানুয়ারির তীব্র শীতে, হিমাঙ্কের চেয়েও কম তাপমাত্রায় খোলা আকাশের নিচে, সহস্রাধিক দর্শনার্থীকে সারাদিন, সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে| ভারী কোট পরা, গলা ও মাথায় স্কার্ফ জড়ানো মানুষেরা ঐ শীতে অন্তত তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন উনবিংশ শতাব্দীর এক শিল্পগুরুর ২০০ ছবির এই অনন্যসাধারণ প্রদর্শনীটি দেখার জন্য| শেষ তিনটি রাতে চল্লিশ হাজারেরও বেশি দর্শক এখানে এসেছেন| শেষ রাতের লাইনে দাঁড়ানো কোনো কোনো স্থানীয় দর্শক বলেছেন তাঁরা ইতোমধ্যেই প্রদর্শনীটি দেখেছেন, কিন্তু আরেকবার এখানে আসার ইচ্ছে দমন করতে পারেননি| এছাড়া ছিলেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটক, শিল্পী, চিত্র-তারকাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বহু বিখ্যাত মানুষ|

আগেই বলেছি, অন্যান্য দেশের মিউজিয়াম থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া পেয়েছেন এই প্রদর্শনীর আয়োজকগণ| শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে মোনের ৩৩টি চিত্রকলা রয়েছে| সেখান থেকে বাছাই করা সেরা চারটি ছবি তারা দিয়েছে প্যারির গ্র্যান্ড প্যালেসের প্রদর্শনীর জন্য| ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অব আর্ট অনুরূপ সহযোগিতা করেছে: তাদের কাছে আছে মোনের ২১টি ছবি| মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অব আর্ট মোনের একটি বিখ্যাত ছবি দিয়েছে যার জন্য তাদের প্রয়োজন হয়েছে পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ অনুমতি| মস্কোর পুশকিন মিউজিয়াম মোনের বিখ্যাত স্টাডি ঘাসের উপর মধ্যাহ্ন ভোজ ছবিটি এখানে পাঠিয়েছে| এই স্টাডিটি এদুয়ার মানের বিখ্যাত ছবির অনুপ্রেরণায় আঁকা| সান ফ্রান্সিসকোর ফাইন আর্টস মিউজিয়াম দিয়েছে দুটি ছবি| এখানকার পরিচালক বলেছেন যে তাঁর সমগ্র পেশাজীবনে এটিই হচ্ছে মোনের সর্ববৃহত এবং সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী|

বিশাল এই প্রদর্শনীতে ছবিগুলো সাজানো হয়েছে মোনের জীবনের বিভিন্ন কালপর্বের ভিত্তিতে| প্রথমেই আছে ফন্তেনব্লো শহরের পর্যায়– ১৮৬৩ থেকে ১৮৭০| লো হাভ্রের সমুদ্র-প্রকৃতির দৃশ্য, বন্দর, ছাতামাথায় তরুণী, ট্রেন, এইসব ছবি| এরপর ১৮৭১ থেকে ১৮৭৬ পর্যন্ত আঁকা আর্জনত্যই ও প্যারিসের আশেপাশের আধা-গ্রামীন দৃশ্যাবলী| ১৮৭৩ সালের ল পন্ত দু শেম্য দে ফের আলোছায়ার দৃশ্য নিয়ে দুটো আলাদা ছবি এখানে দেখানো হয়| এর একটি এসেছে ফিলাডেলফিয়া থেকে আর অন্যটি প্যারিসের ওরসে মিউজিয়াম থেকে| তেমনি আর্জনত্যই বেসিনের দুটো ছবি – একটি এসেছে রোড আইল্যান্ডের প্রভিডেন্স থেকে অন্যটি ওরসে থেকে| দিনের বিভিন্ন সময়ে আলোছায়ার পরিবর্তনে একই দৃশ্যের ভিন্ন ভিন্ন রূপ ক্লদ মোনে ধারণ করেছেন তাঁর বিভিন্ন ক্যানভাসে| শিল্পকর্মগুলো নানা দেশে ছড়িয়ে গেছে বলে এরকম একাধিক ছবি একসাথে দেখতে পাওয়া এক বিরল সৌভাগ্য| ১৮৭৭ সালে তিনি প্রায় একডজন ছবি এঁকেছেন প্যারির সা লাজার রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে| দিনের বিভিন্ন সময়ে বদলে যাওয়া আলো-ছায়া আর ধোয়াঁর কুণ্ডলীতে কখনো স্থির, কখনো উদাস, গতিময় এইসব চিত্র| এরপরের পর্ব ১৮৭৮-৮১, ভেতোই| এই সময়ের অনেকগুলো ছবি স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে| এগুলোর মধ্যে আছে শীতের সময় বরফ ঢাকা সেইন নদীর দৃশ্য| বেশ কটি ছবিতে জমাট বাধা নদী, কোনো কোনো ছবিতে বিসদৃশভাবে সেই বরফের চাঙড় ভাঙছে| এখানে সাদা রঙের প্রাধান্য, কিন্তু বরফের উপর রোদের তীব্র, ঝলসানো প্রতিফলন যেন এখনো চোখে এসে লাগে|

১৮৮০ থেকে ১৮৮৬ পর্যন্ত সময়টি হচ্ছে মোনের নর্ম্যান্ডি প্রত্যাবর্তনের কাল| এই পর্বের ছবিগুলো এসেছে দূর-দূরান্তের বিখ্যাত সব মিউজিয়াম যেমন ইওরোপের লিও, কোপেনহেগেন, মাদ্রিদ, স্টকহোম, এবং জুরিখ, আমেরিকার শিকাগো, নিউ ইয়র্ক এবং ফিলাডেলফিয়া আর অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে| এই সময়ের ছবিতে আলোর প্রভাব আরো বেড়েছে, তাই মোনে তখন এলিস ওশদেকে (পরবর্তীকালে স্ত্রী) লেখেন : সূর্যই আমার প্রধান বিষয়|

১৮৮৪ থেকে ১৮৮৮ কালপর্বে ভুমধ্যসাগরতীরের বিভিন্ন স্থানের ছবি এঁকেছেন মোনে| জুয়া লেপ্যা আর আন্তিব অঞ্চলের অনেকগুলো ছবি সাগরতীরের প্রকৃতি আর সমুদ্রের দৃশ্যকে ধারণ করে আছে| এরই মধ্যে প্রদর্শিত হয়েছে বেশকিছু ফিগার এবং প্রতিকৃতি| কামিল মোনের মৃত্যুশয্যা ছবিটিও এই পর্বে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে| ১৮৮০-র দশকে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলের দৃশ্য আঁকার সময়েই ক্লদ মোনের ছবিতে তাঁর স্বকীয়তা পরিপূর্ণভাবে দেখা দেয়| তারপর ১৮৯০ সাল থেকে পরবর্তী দশ বছর হচ্ছে মোনের সিরিজ ছবির দশক| জিভার্নিতে বসবাসকালের অধিকাংশ ছবি আছে এই পর্যায়ে| খড়ের স্তূপ, পপলার, ক্যাথিড্রাল এই প্রতিটি দৃশ্যের নানারূপ তিনি এঁকেছেন বিভিন্ন ধরনের আলো আর ছায়াতে, উজ্জ্বলতা আর অনুপুন্খের তারতম্যে| এসব ছবিতে প্রকৃতিকে তিনি সৃজন করেছেন নিজের মনের ভিতরে, নিজস্ব বর্ণে, আবহে| নিঃসন্দেহে তিনি প্রকৃতিরই ছবি এঁকেছেন| কিন্তু সেই প্রকৃতিকে তিনি দেখেছেন দিনের বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ঋতুতে, নিয়ত পরিবর্তনশীল আলোছায়ার গতিবিভঙ্গে, বিচিত্র বর্ণচ্ছটায়|

তারপরের পর্ব হচ্ছে লন্ডনে প্রত্যাবর্তন – ১৯০০-১৯০১ সালে আঁকা লন্ডনের নানা দৃশ্য, টেমস নদীর উপর কুয়াশার অস্পষ্ট আচ্ছন্নতা| আর শেষ পর্বে ১৯১৪-১৯১৭ সালের শিল্পকর্ম – যেসময় তিনি জলপদ্ম, জিভার্নির বাগান, ফুল আর জলাশয় এসবের অসংখ্য ছবি এঁকেছেন| বেশির ভাগই বিশাল আকৃতির ছবি| সবচেয়ে বড় আর বিখ্যাত প্যানেলগুলো এখানে আনা সম্ভব হয়নি| সেগুলো রয়ে গেল প্যারিরই অন্য মিউজিয়ামগুলোতে|

ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকলা, আর এই আধুনিক শিল্পরীতির প্রবর্তনায় ক্লদ মোনের অবদান সম্পর্কে এবং মোনের ছবি সম্পর্কে এত বিপুল পরিমাণে লেখা হয়েছে যে তাতে নতুন কিছু যোগ করার জন্য শুধু ছবি দেখাই যথেষ্ট নয়| প্রয়োজন হবে নতুন, সৃজনশীল অন্তর্দৃষ্টি আর গভীর গবেষণা| বলা বাহুল্য সারা পৃথিবীর অসংখ্য শিল্পকলা-বিশেষজ্ঞ প্রতিনিয়ত এ কাজে ব্যাপৃত রয়েছেন| তিনি একজন বড় এবং যুগ-প্রবর্তক শিল্পী হিসেবে গণ্য হলেন শুধু চিত্রকলার বিষয় ও শিল্পকৌশলের অভিনবত্বের জন্য নয়, তাঁর নিজস্ব শিল্পরীতি ও মনোজগতের অভূতপূর্ব সংশ্লেষের জন্য| দীর্ঘ সত্তর বছর ধরে অসামান্য ব্যস্ততায় তিনি বহু ছবি এঁকেছেন| ইমপ্রেশনিজমের বিশুদ্ধ রূপটি ধারণ করেছেন তাঁর অধিকাংশ ছবিতে| বিংশ শতাব্দীর আধুনিক চিত্রকলা এবং নতুন শিল্পরীতির সূচনা ও দৃঢ় ভিত্তিভূমিটি রচনা করেছেন নিজের তুলিতে| গ্র্যান্ড প্যালেসের এই প্রদর্শনী তাঁর সমৃদ্ধ শিল্পীজীবনের সমগ্র যাত্রাপথটিকে উপস্থাপন করেছে| বিষয় এবং কালানুক্রম – এই দুইয়ের সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে ছবিগুলোকে যাতে করে তাঁর শিল্পীজীবনের পথপরিক্রমণটি স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে| নবীন শিল্পী হিসেবে আঁকা ১৮৬০ দশকের কাজ থেকে শুরু করে এই সংগ্রহ মোনের জীবনের শেষ পর্বের জলপদ্ম সিরিজের কাজ পর্যন্ত পৌঁছে দেয় দর্শককে| এই পরিভ্রমণে সহজেই চোখে পড়ে, সাযুজ্যবিধান আর পুনরাবৃত্তি তিনি করেছেন তাঁর সমগ্র কর্মজীবন ধরে| কিন্তু এই প্রদর্শনীতে একই ছবির বিভিন্ন রূপ বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে দেখানো হয়েছে কীভাবে তিনি আপাতদৃষ্টিতে একইরকম প্রত্যেকটি ছবির মধ্যে পার্থক্য রচনা করেছেন| তিনি শুধু রোদ, বৃষ্টি আর তুষারের ছবি আঁকেননি| প্রকৃতিকে তিনি তাঁর মনোজগতের গভীরে নিয়ে গিয়ে পুনরায় তাকে সৃজন করেছেন তাঁর ক্যানভাসে| তিনি তাঁর মনোভূমি থেকে এঁকেছেন, স্বপ্ন এঁকেছেন| পুরনো দিনের স্মৃতি থেকেও এঁকেছেন প্রকৃতিকে| তিনি মনের বিচিত্র অবস্থাকে এঁকেছেন, ভাবনা আর প্রতিফলনের ছবি এঁকেছেন| এভাবেই স্বপ্নকে তিনি অবয়ব দিয়েছেন তাঁর ছবিতে|

স্বাভাবিকভাবেই মোনের চিত্রকলায় সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ও আবিষ্ট দর্শক এই প্রদর্শনী থেকে বের হয়েছেন পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে|  তারপরেও খুব সহজেই কাছাকাছি আরো দুটি মিউজিয়াম দেখে এই প্রিয় ও বিখ্যাত শিল্পীর অবিস্মরণীয় জীবন ও কর্মের পূর্ণাঙ্গ সন্ধান পেয়ে যান তাঁরা| মহান শিল্পীর সমগ্র জীবনকে ফিরে দেখা আর তাঁর চিত্রকলার গভীরে অবগাহনের এমন সুযোগ জীবনে বারবার আসেনা|

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close