Home চিত্রকলা ইফতেখারুল ইসলাম > বস্টন এমএফএ ও পল সেজানের আপেল >> চিত্রকলা

ইফতেখারুল ইসলাম > বস্টন এমএফএ ও পল সেজানের আপেল >> চিত্রকলা

প্রকাশঃ November 8, 2017

ইফতেখারুল ইসলাম > বস্টন এমএফএ ও পল সেজানের আপেল >> চিত্রকলা
0
0

ইফতেখারুল ইসলাম >> বস্টন এমএফএ ও পল সেজানের আপেল >> চিত্রকলা 

বস্টন মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টসে ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকলার সংগ্রহটি খুবই উল্লেখযোগ্য।  যে-কোনো মিউজিয়ামে কোনো বিশেষ ধরনের ছবির সংগ্রহ পূর্ণ করে তোলা এবং তা সাজানোর সময় একটা বিষয়ে অনেক গুরুত্ব দিতে হয়।  সেটা হলো, সেই সংগ্রহ দেখে ওই শিল্প-আন্দোলন ও তার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের অবদান সম্পর্কে একটা পূর্নাঙ্গ ধারণা পাওয়া যায় কি-না। ঠিকভাবে চেনা যায় কি-না চিত্রকলার কোনো নির্দিষ্ট কালপরিধির বৈশিষ্ট্য এবং যুগ পরিবর্তনের কোণ-মোড়-বাঁকগুলো।  সেদিক থেকে বিবেচনা করলে এখানকার ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকলার সংগ্রহটি সার্থক।  ইউরোপীয় ও বিশ্ব-চিত্রকলার সেই যুগান্তর অথবা পালাবদলের বিশেষ দিক এবং চিহ্নগুলো বস্টন এমএফএ-র সংগ্রহ দেখে ঠিকভাবে সনাক্ত করা যায়।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীরা চিত্রকলার ক্ষেত্রে একটা পালাবদল ঘটিয়েছিলেন।  তাঁদের সময়কালে সারা পৃথিবীর মানুষ সমাজজীবনে কতগুলো পরিবর্তন দেখেছে।  দেখেছে নগরসমূহের মধ্যে শিল্পায়নের অনুপ্রবেশ, প্রভাব ও বিকাশ।  সে-যুগের মানুষ কৃষির প্রাধান্য ও সামন্তযুগের অবসান প্রত্যক্ষ করেছে।  মধ্যবিত্ত অথবা শ্রমজীবি যে-কোনো শ্রেণীর ভিতর থেকে নাগরিক জীবনের আনন্দ-উদ্বেলতায় যারা অংশ নিয়েছে তারা সকলেই ওই উনবিংশ শতাব্দীতে অবলোকন করেছে আধুনিক জগত ও জীবনের জন্ম।  সফল উত্থান ও সংগ্রাম-চিহ্নিত ওই যুগের মধ্য দিয়ে যারা অগ্রসর হয়েছে তারা সবাই নিজেদেরকে আর একবার ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের আঁকা দৃশ্যপট ও প্রকৃতির ভিতরে প্রতিফলিত দেখতে পেয়ে আনন্দিত হয়েছে।  তখনও তাদের মনে এমন কোনো প্রশ্ন উঁকি দেয়নি যে এই সব ছবি কোনো নতুন চিত্র-বিপ্লবের প্রতিনিধিত্ব করে কি-না।  প্রকৃতপক্ষে তা নিশ্চিতভাবেই ছিল চিত্রকলার ক্ষেত্রে একটা নতুন বিপ্লবের সূচনা।

জনপ্রিয় ধারণা এই যে ইমপ্রেশনিজম একটি নতুন শিল্পরীতি।  আলো-ছায়ার বিষয়ে একটি নতুন পন্থা।  অথবা সেজানের ভাষায় ফর্মের জ্যামিতিক ভাংচুর-বিষয়ে গভীর চিন্তা-প্রসূত ফলাফল।  এখন মাঝে মাঝে প্রশ্ন তোলা হয় এটা আসলেই কোনো গভীর চিন্তা-প্রসূত শিল্প-আন্দোলন কি-না।  প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল চিত্রকলায় নতুন বিষয়ের নির্বাচন।  চেনা পৃথিবীর পুনর্নির্মাণ, এবং একটি যুগসত্যকে কোনো বিশেষ জোর বা প্রবণতার প্রভাব ছাড়াই ধারণ ও চিত্রায়ন করা।  অথবা শুধু ইতিহাস ও একটি পৃথিবীকে সরলতম অনুপুন্খের মাধ্যমে অবলোকন ও ধারণ করা।  আলোছায়ার গতিবিভঙ্গে তুলির ছোট ছোট টান দিয়ে ধারণ করা অপস্রিয়মান সময়ের ছবি।

ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীরা শৈল্পিক সম্পর্কের একটি নতুন ও নিরীক্ষাধর্মী রীতি উদ্ভাবন করলেন।  তাঁদের সময়ের দৈনন্দিন জীবন থেকে আহরণ করা পরিচিত সব উপাদানকে শিল্পে স্থান দিয়েছেন তাঁরা।  এভাবে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রচলিত পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, এবং অলংকার-শোভিত চিত্রকলারীতি থেকে তাঁরা নিশ্চিতভাবে বেরিয়ে এলেন।  অন্যভাবে বলতে গেলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ-পরবর্তী শিল্পকলা যেভাবে অগ্রসর হচ্ছিলো তার মৌলিক রীতি-পদ্ধতিকেই সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য ও বর্জন করলেন তাঁরা।  এমনকি ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বের পার্থক্য ও স্বাতন্ত্র্য ছাড়াও তাঁদের নিজ নিজ কাজের মধ্য দিয়ে শিল্পকলা হয়ে উঠলো দৃঢ়ভাবে প্রাতিস্বিক ও ব্যক্তিতাবাদী।  এভাবেই তাঁরা প্রত্যেকে নিজস্ব পন্থা, স্বতন্ত্র বিকাশ এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণেও সচেষ্ট ছিলেন।  ইতোমধ্যেই সেকালের শিল্পের সামাজিক পটভূমি ও পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে।  তাই এটা মোটেই বিস্ময়কর ছিল না যে খ্যাতি যখন এই শিল্পীদের কাছে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে তাঁরা তখন ধীরে ধীরে তাঁদের সাময়িক গোষ্ঠিবদ্ধতা থেকে সরে এসেছেন।  এই গোষ্ঠিবদ্ধতায় তাঁরা সক্রিয়ভাবে শামিল ছিলেন প্রকৃতপক্ষে নিজেদের স্বতন্ত্র নির্জন পথের অনুসন্ধান ও সাধনার জন্যই।

বস্টন এমএফএ-তে সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে ক্লদ মোনের ছবির সংগ্রহটি বড়।  এর পাশাপাশি এখানে ইমপ্রেশনিজম-এর উত্থান ও পালাবদলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অন্য সব শিল্পীর ছবি স্থান পেয়েছে।  আছে এদুয়ার মানে, পিয়ের-অগুস্ত রেনোয়া, পল সেজান, পল গগ্যা ও ভ্যান গগের ছবি।  আছে এডগার দেগার ছোট্ট একটি ভাস্কর্য।  তাঁর অতি বিখ্যাত নাচের মেয়েদের ছবি ও ভাস্কর্য, মেয়েটির পা-বাড়ানোর ভঙ্গি আর মুখের আদলটি দূর থেকে দেখেই চেনা যায়।  পল গগ্যার এমন একটি ছবি এখানে আছে যা দেখার জন্য দিতে হয় অনেকখানি সময় আর মনোযোগ।  দীর্ঘ শিরোনাম-যুক্ত এ ছবিটি সম্পর্কে আলাদাভাবে লেখা উচিত।  গগ্যার ছোট-বড় কয়েকটি বিখ্যাত ছবি এখানে আছে।  আছে পল সেজানের আঁকা ‘লাল চেয়ারে বসা’ তাঁর স্ত্রীর ছবি।  আর আছে অসাধারণ কয়েকটি স্থিরজীবন।

পল সেজান (১৮৩৯-১৯০৬) এমন একজন ফরাসি শিল্পী যাঁকে অনেক সময় আধুনিক চিত্রকলার পিতৃপুরুষ হিসেবে গন্য করা হয়।  সহজাত উপস্থাপনা, ব্যক্তিগত শিল্প-অভিব্যক্তি এবং বিমূর্ত চিত্রবিন্যাসের একটি আদর্শ সমন্বয় ঘটাতে চেষ্টা করেছেন তিনি।  তাঁকে যদি অসামান্য সৃজনশীল ও প্রতিভাবান শিল্পী বলি তাহলে তা রোমান্টিক অর্থে নিশ্চয়ই নয়।  শিল্প-জীবনের শুরু থেকেই তিনি একটি আদর্শিক ভিত্তি নির্ণয় ও নির্ধারণ করে সারাজীবন সে-পথে সাধনা করেছেন।  এই ভিত্তি হচ্ছে অগাধ পান্ডিত্য ও বিশাল অন্তর্গত অনুপ্রেরণার মিথস্ক্রিয়াজাত আদর্শ।  তাঁর সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে সম্ভবত সেজানই বিংশ শতাব্দীর চিত্রকলায় সবচেয়ে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছেন।  ফরাসি শিল্পী আঁরি মাতিস আর স্প্যানিশ শিল্পী পাবলো পিকাসোর ওপর এককভাবে সেজানের প্রভাবই সর্বাধিক।  মাতিস সেজানের রঙ-ব্যবহারে মোহিত হয়েছিলেন।  আর সেজানের কম্পোজিশনের গঠনকে কিউবিস্ট রীতিতে গড়ে তুলেছিলেন পিকাসো।

অবশ্য নিজের জীবনের অধিকাংশ সময় সেজান ছিলেন অবহেলিত।  বিচ্ছিন্ন ও একাকী থেকেই তিনি নিজ শিল্পকর্মের সাধনা সম্পন্ন করেছেন।  প্রথম জীবনে পারবারিক কলহ ছিল।  সমালোচকদের অবিশ্বাস করেছেন।  খুব বেশি বন্ধু খুঁজে পাননি কখনোই।  পরের দিকে পরিবার ও প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছেন।  মাধ্যমিক স্কুলের সহপাঠি এবং দীর্ঘদিনের বন্ধু এমিল জোলার সঙ্গেও সম্পর্কচ্ছেদ হয়।  বন্ধু হিসেবে এমিল জোলা ছিলেন সেজানের একটা নির্ভরতার জায়গা।  পরিণত বয়সে এসে সেখানেও চিড় ধরে।  জোলার একটি উপন্যাসে ক্লদ লাতিয়ের নামে একটি চরিত্র ছিল।  এই ব্যর্থ শিল্পীর চরিত্রের মধ্যে সেজান নিজের আদল খুঁজে পান এবং খুবই ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করেন।  ১৮৮৬ সালের এই মর্মান্তিক বন্ধু-বিচ্ছেদের আগে জোলা হয়ত বুঝতেই পারেননি, কত তীব্র হতে পারে একজন শিল্পীর আবেগানুভূতি।  যাই হোক, ওই একই বছরে ৪৭ বছর বয়সে সেজান পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে আর্থিকভাবে স্বাধীন হয়ে ওঠেন।  এর পরেও সামাজিকভাবে তিনি হয়ে রইলেন বিচ্ছিন্ন ও একাকী।

বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব আর উদ্দেশ্যর একাগ্রতা এবং মনোসংযোগ থেকেই ১৮৮০ ও ১৮৯০-এর দুই দশকে শিল্পকলার ক্ষেত্রে সেজান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেন।  এই কালপর্বটিতে তিনি আপেল এবং অন্যান্য ফলের স্থিরজীবন যেমন আঁকেন, তেমনি অব্যাহত রাখেন নিসর্গ-দৃশ্য আঁকা।  ব্যবহার করেছেন ইমপ্রেশনিস্ট রীতির উজ্জ্বল রঙ।  তবে রঙের প্রয়োগে তিনি ক্রমান্বয়ে সারল্য নিয়ে আসেন।  বিশুদ্ধ রঙের তুলির টান পাশাপাশি বসিয়ে তিনি ফর্মের আয়তন নির্দেশ করেছেন।  শিল্প আলোচকেরা তখন বলেছেন যে, এক রঙের ব্যবহারের মধ্য দিয়েই তিনি প্রকৃতির আলো এবং ফর্মকে চিত্রায়িত করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।

পল সেজানের আঁকা স্থিরজীবন নিয়ে একটু আলোচনা করতেই হয়।  ছবি আঁকার কাজে তিনি ছিলেন খুবই ধীর।  সময় বেশি লাগতো বলেই তাঁর অনেক ছবিতে নিজের স্ত্রী মডেল হিসেবে কাজ করেছেন।  ধৈর্য্য ধরে আর কে এতটা সময় দেবে ? বস্টন এমএফএ-র সংগ্রহে এরকম একটি ছবি আছে।

এ ছাড়া অনেক ধরনের স্টিললাইফ বা স্থিরজীবনের ছবি তিনি এঁকেছেন।  কিন্তু ছবি আঁকতে বড় বেশি সময় লাগতো বলেই ফুলের ছবি আঁকতে পারেননি।  কারণ তাঁর আঁকা শেষ হবার আগেই ফুলগুলো নেতিয়ে পড়ে।  তাই ফল ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়।  ধীরগতিতে ছবি আঁকার জন্য ফলকে তিনি একটু বেশি বিশ্বস্ত বলে মনে করেছেন।  এই বাস্তব সুবিধের কারণেও তিনি ফলের ছবি এঁকেছেন বেশি।  বিশেষ করে আপেল তিনি পছন্দ করেছেন তাদের ফর্ম, গঠন আর রঙের বৈচিত্র্যের জন্য।  বস্টনের এই মিউজিয়ামে আছে তাঁর বিখ্যাত ছবি টেবিলের ওপর ফল ও কাচের জগ।  বিভ্রান্তিকরভাবে সরল এই ছবিগুলো পল সেজানের সবচেয়ে বিখ্যাত ও আইকনিক ছবি হিসেবে পরিচিত।  এগুলোকে পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট ছবি হিসেবেই চিহ্নিত করা আছে।

যে আপেলের ছবি এঁকে তিনি সারা পৃথিবীকে চমকে দিতে চেয়েছিলেন সেই আপেল এখানেও দেখতে পাই।  তিনি বলেছিলেন, আই ওয়ান্ট টু এস্টনিশ প্যারী উইথ এন এপেল।  মুগ্ধ হয়ে দেখি ছোট আকারের বিস্ময়-জাগানো ছবি।  ১৮৯০ থেকে ৯৪ সালের মধ্যে আঁকা ক্যানভাসে তেলরঙ।  আপেল আঁকতে কেন পছন্দ করেন তার উত্তর প্রায় কবিতার মতো করে দিয়েছেন সেজান।  “ওরা ওদের পোর্টরেইট করাতে পছন্দ করে।  ওরা ওদের অপরিবর্তিত রঙ আর চেহারা নিয়ে বসে থাকে দীর্ঘসময়।  ওরা ওদের নিজস্ব সৌরভ নিয়ে আসে, আর বলে সেই মাঠের কথা যেখান থেকে ওরা এসেছে।  বলে সেই বৃষ্টির কথা যা ওদের পুষ্টি দিয়েছে।  আর বলে ওদের দেখা সূর্যোদয়গুলোর কথা। ”

স্থিরজীবন বা স্টিল লাইফকে চিত্রকলার খুবই প্রাথমিক স্তরের একটা ধরন বলে মনে করা হয়।  ছাত্র-ছাত্রী আর নবীন শিল্পীরা শিক্ষার অংশ হিসেবে এ ধরনের ছবির চর্চা করে বেশি।   সেই ধরনের ছবিতে যেভাবে এই শিল্পী আলো ও আয়তা বা স্পেইসকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন তা বিস্ময়কর লাগে।  সেজান নিজে এক জায়গায় বলেছিলেন, প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকা মানে ওই বিষয়বস্তুটির হুবহু অনুকৃতি বা কপি করা নয়।  এটা আসলে একজনের অনুভূতিকে ছবিতে ধারণ করা।  এসব ছবিতে তিনি ফর্মের জ্যামিতিক ভাংচুর করে দেখতে চেয়েছেন।  প্লেট অথবা বাটির ওপর রাখা আপেলের প্রান্তগুলোকে অনেক সময় তিনি রেখা দিয়ে সুনির্দিষ্ট করে দেননি।  তাই এদের প্রান্তসীমা প্রতিনিয়ত সরে সরে যায়।  টেবিলের এপাশ-ওপাশ দেখলে বোঝা যায় অনেক সময়ই তিনি ভেঙেছেন পারস্পেক্টিভের নিয়ম-কানুন।  কিন্তু সব মিলিয়ে এই স্থিরজীবনের ছবিগুলো যেন প্রাণময় হয়ে উঠেছে।  সেই প্রাণ সঞ্চার করার সময় তিনি আরো বিশেষভাবে দেখেছেন বৈচিত্র্যের দিকটি।  আপেল আর তার সঙ্গে কখনো কমলা আর কখনো লেবু।  কিন্তু এই ফলগুলোর সঙ্গে ছবির কোনো-না-কোনো অংশে জুড়ে দিয়েছেন সাদা অথবা রঙিন কোনো প্লেটের একটু অংশ, একটা কাচের জগ অথবা স্টিলের ছোট্ট ফুলদানি।  তার রঙ আর আকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা।  আপেলের ছবিতে এসব জিনিস আলাদা একটা বৈচিত্র্য নিয়ে আসে।

প্রথম পর্যায়ের অনেক ছবিতে সেজান গাঢ় আভার বর্ণ-সমন্বয় ব্যবহার করেছেন।  এটা তাঁর পূর্ববর্তী প্রজন্মের রোমান্টিক এক্সপ্রেশনিজমের ধারণারই সম্প্রসারণ।  তিনি চেয়েছিলেন তাঁর চিত্রকলায় এমন কিছু ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী কর্মকুশলতা রেখে যেতে যা তখনকার মিউজিয়াম ও অন্যান্য প্রদর্শনীর শিল্পকর্মে দেখা যেত।  পরবর্তীকালে তার লেখক বন্ধুরা যেমন আগ্রহী হয়েছিলেন বাস্তবানুগ উপন্যাস রচনায়, সেজানও তেমনি ক্রমান্বয়ে গড়ে তোলেন সমকালীন বাস্তব জীবনকে চিত্রকলায় তুলে ধরার অঙ্গীকার।  এভাবে তিনি চিত্রবিষয়কে আদর্শায়িত না করে এবং শিল্পরীতি ও কৃত্রিম কলা-কৌশল আরোপ না করে নিজের দেখা পৃথিবীর চেনা রূপটিকেই চিত্রায়িত করতে শুরু করেন।  পরিণত হয়ে ওঠার সূচনালগ্নে সেজানেব্র ছবিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিলেন কামিল পিসারো।

বস্টন এমএফএর দেয়ালে সেজানের আপেলের ছবির ঠিক ওপরে দ্য পন্ড নাম একটি জলাশয়ের ছবি আছে।  এটা ১৮৭৭-৭৯ সালের মধ্যে আঁকা।  পানির কাছে ঘাসের ওপর কয়েকজন মানুষ।  তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা যায় না।  স্থান-কাল-বিষয়ক ব্যাখ্যার চেয়ে রঙ ও ফর্মের কম্পোজিশনটাই যেন মুখ্য হয়ে উঠেছে।  ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষগুলোর মাপের অসঙ্গতি ছবির কাহিনীটিকে করে তুলেছে আরো জটিল।

এরকম প্রত্যেকটি ছবি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা যায়।  কিন্তু সেই লেখায় আমার মুগ্ধতার অনুভূতি সঞ্চারিত করতে পারি না।  অথচ পল সেজান চিত্রকলায় তাঁর অনুভূতিকেই সঞ্চারিত করেছেন কত সহজ আর সাবলীলভাবে।

বস্টনে আপেলের ছবি দেখে যতই মোহিত হই এটা কোনমতেই পল সেজানের স্টিললাইফ ছবির পূর্নাঙ্গ ধারণা দেয় না।  প্যারীর ওরসে মিউজিয়ামের বাইরে পল সেজানের আপেল ভালোভাবে দেখতে হলে মোমা আর মেট-এ যেতেই হবে।  প্যারীর আর একটি মিউজিয়ামে আমি একবার সেজানের আপেল দেখে খানিকটা বিস্মিত হয়েছি।  সেটা হচ্ছে লো’অরেন্জারি মিউজিয়াম।  এই মিউজিয়ামটি সম্পূর্ণ অন্য কারণে বিখ্যাত।  সেখানে আছে ক্লদ মোনের বিখ্যাত পদ্মপুকুর সিরিজের বিশালাকার প্যানেলচিত্রগুলো।  কিন্তু সেই মিউজিয়ামের নিচের তলায় যেখানে মোনে ও লিলিপন্ড বিষয়ে ভিডিও-চিত্র দেখানো হয় তার বাইরে একটুখানি খোলা জায়গাতে আছে রেনোয়া আর পল সেজানের অল্প কটি ছবি।  সেখানেই পাই সেজানের বিখ্যাত আপেল।  ওরসের বাইরে সেটাই প্রথম আমার সেজান-দর্শন।  সেখানে একটা ছবি তুলতে চেয়েছিলাম।  এটা সেলফি-যুগের অনেক আগের কথা।  তখন আমার সাধারণ নোকিয়া সেলফোনে একটি ছবি তুলে দিয়েছিলেন অপরিচিত কোনো দর্শনার্থী।  এভাবেই সেজানের শিল্পকর্মের সঙ্গে আমার ছবিটি স্মরণীয় হয়ে আছে।  আজকের এই লেখা বস্টন এমএফএ-র পটভূমিতে হলেও পল সেজান আর তার আপেলের ছবির আলোচনায় ওই পুরনো ছবিটি এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close