Home চিত্রকলা ইফতেখারুল ইসলাম / ভ্যান গঘ ও তার বিশ্বখ্যাত ছবি পটেটো ইটার্স

ইফতেখারুল ইসলাম / ভ্যান গঘ ও তার বিশ্বখ্যাত ছবি পটেটো ইটার্স

প্রকাশঃ February 16, 2017

ইফতেখারুল ইসলাম / ভ্যান গঘ ও তার বিশ্বখ্যাত ছবি  পটেটো ইটার্স
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : ইফতেখারুল ইসলাম – বিশ্বের প্রখ্যাত বিভিন্ন চিত্রশালা ঘুরে ঘুরে ছবি দেখেন তিনি। শিল্পকলার অসাধারণ সমঝদার। লেখার হাতটিও ভারি মিষ্টি। আর এই প্রথম ওই সব দেখা ছবির খুটিনাটি নিয়ে লেখা শুরু করলেন তীরন্দাজে। আজ তার চাক্ষুষ দেখা ভ্যান গঘের পটেটো ইটার্স নিয়ে প্রকাশিত হল এই সিরিজের প্রথম লেখাটি। এভাবে তার প্রতিটি লেখাই হবে স্বতন্ত্র স্বাদে স্বয়ংসম্পূর্ণ।]

১. প্রান্তিক মানুষ, আলুচাষী এবং পালাবদলের শিল্পী

হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডের আলু এখন যেমন বিখ্যাত আজ থেকে এক বা দুই শতাব্দী আগেও বোধ করি তেমনি ছিল। সেখানকার গ্রামে চাষী-পরিবারগুলোর প্রধান খাবার ছিল আলু। আর তাদের আয়ের অন্যতম উপায় ছিল আলুচাষ। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে নেদারল্যান্ডের গ্রামগুলোতে ক্ষেতে-খামারে পুরুষ ও মহিলারা আলু চাষের সব কাজ করতেন খুব যত্ন নিয়ে। আলু আহরণের সময় হলে দল-বেঁধে তাঁরা সে কাজ করতেন। এইসব পরিশ্রমী ও হতদরিদ্র মানুষের দিকে কেউ তেমন নজর দেয়নি।

6-The-Potato-Eaters-grey-Vincent-van-Gogh
পটেটো ইটার্স, নিউয়েনেন, এপ্রিল ১৮৮৫, ক্যানভাসে তেলরঙ, ৮১.৫ *১১৪.৫ সেমি

শিল্পীরাতো এমনিতেই দূরের মানুষ। এমনকি গ্রামের প্রকৃতির ছবি আঁকার জন্য যখন শিল্পীরা বাইরে, মাঠে-ঘাটে, বন্দরে ও অরণ্যে দিনের আলোয় কাজ করতে শুরু করেন তখনও কৃষক ও শ্রমজীবি মানুষ সেসব দৃশ্যের বাইরে রয়ে গেছেন। এই মানুষগুলোর প্রাত্যহিক কাজের দৃশ্য মন দিয়ে দেখা অথবা এই মানুষদের ছবির বিষয় করে তোলার জন্য প্রয়োজন ছিল কোনো সহৃদয় আর অনুভূতিশীল শিল্পীর। শিল্পকলার নানারকম পালাবদলের দিনে এই দিকটা যখন বেশ উপেক্ষিত তখন ভ্যান গঘ সেই শিল্পীর দায়িত্বটি পালন করেছিলেন।

প্রথম জীবনে অন্য ধরনের পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতে চেষ্টা করেছিলেন ভ্যান গঘ। ধর্মশিক্ষা নিয়েছেন এবং পৌরোহিত্যের কাজ করতে চেয়েছেন। অল্পদিনেই এসব পেশায় ব্যর্থ হয়ে তিনি শুরু করলেন ছবি আঁকার কাজ। শিল্পকলায় সামান্য প্রশিক্ষণ আর অসামান্য হৃদয়াবেগ নিয়ে নিজের অনুভূতিকে সম্বল করে সাতাশ বছর বয়সে তিনি ছবি আঁকার কাজে মন দেন। আর তারপর এমন এক জায়গাতে পৌঁছেছেন যে উনবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব চিত্রকলার কোনো আলোচনাই আর সম্ভব নয় ভ্যান গঘকে বাদ দিয়ে। তাঁর কিছু কিছু ছবি খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছে। শিল্পীর পরিচয়চিহ্ন এবং জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে সেইসব বিখ্যাত ছবি। কিছু ফুল, বিশেষত কয়েকটি সূর্যমুখী, রাতের আকাশে কিছু তারা, হলদে রঙের কাঠের তৈরি একটা অতি সাধারণ খাট আর টেবিল-চেয়ার তারপর কিছু বাঁকাচোরা আত্ম-প্রতিকৃতি। এই ছবিগুলো দিয়ে ভ্যান গঘ শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। তাঁর প্রতীকের মতো এসব ছবি আসলে এঁকেছেন অনেক পরে, ফ্রান্সে বসবাস করার সময়। ইম্প্রেশনিস্টদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করেছেন ছোট ছোট ব্রাশ-স্ট্রোকে। আর তারপর পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পী হিসেবে তুলির আরো ছোট ছোট ফোঁটা দিয়ে ছবি আঁকার বিশেষ রীতি তৈরি করেছেন। পয়েন্টিলিজম নামে পরিচিত এই শিল্পরীতি। কিন্তু এসবের অনেক আগে নিজ দেশে থাকাকালে তাঁর ছবির ধরন অনেকটাই অন্যরকম ছিল।

তাঁর প্রথম পর্বের ছবির বিষয়বস্তু, নিসর্গ আর সাধারণ মানুষ, আমস্টারডামের কাছাকাছি অঞ্চলের গ্রাম থেকে সংগ্রহ করা। ফসলের মাঠে পরিশ্রমী মানুষের এই ছবিগুলো এবং এর আগের কিছুটা অপরিণত এবং পরের কিছুটা পরিশীলিত রূপ আমাদের মতো দেশের মানুষকে বেশি আকৃষ্ট করে। এমনি একটি ছবি পটেটো ইটার্স। অল্প-আলোয় ক্লিষ্ট মানুষের অভিব্যক্তি। আমরা যারা দারিদ্র্য-পীড়িত ও শ্রম-ক্লান্ত মানুষের মুখের রেখায় এবং চোখের দৃষ্টিতে প্রশান্তির চিহ্ন আর বিশ্বাসের ছায়া দেখতে অভ্যস্ত তারা এসব ছবির বাস্তবতাকে অনুভব করি অন্তরে। এদের কিছু বিশেষত্ব আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকে।

আঠারো বছর আগে একদিন আমস্টারডামের রাইখস মিউজিয়াম আর ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে আমি মোহিত হয়েছিলাম। অন্য বহু গুরুত্বপূর্ণ ছবির পাশাপাশি, অথচ তাদের চেয়ে অনেকখানি আলাদা একটি ছবি – পটেটো ইটার্স। পুরনো ধাঁচের হলেও এই ছবি আর এর আনুপূর্বিক ইতিহাস তখনি আমাকে শিহরিত করেছে। পরবর্তীকালে এই অভিঘাত থেকে আমি আর বিচ্ছিন্ন হতে পারিনি। সুযোগ পেলেই আবার ফিরে গেছি সেই ছবির সামনে।

গত পঁয়ত্রিশ বছরে ইউরোপ ও আমেরিকার অনেকগুলো মিউজিয়াম এবং কিছু কিছু বিশেষ প্রদর্শনীতে বেশ কিছু বিখ্যাত ও যুগান্তকারী ছবি দেখার সুযোগ হয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় চিত্রকলা অন্য অনেকের মতো আমাকেও আকৃষ্ট করে। আমস্টারডামে যাবার আগে ভ্যান গঘের অনেকগুলো ছবি দেখেছি প্যারিসের ওরসে মিউজিয়াম আর নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্টে। সেসব ছবির মধ্যে সহজেই সনাক্ত করা যায় ভ্যান গঘ এবং তাঁর বর্নাঢ্য কালপর্বকে। তাদের আবহ ও আস্বাদ সম্পূর্ণ আলাদা। এই বর্ণিল ছবিগুলোর চেয়ে অনেকটা পুরনো, গঠন ও শৈলীর দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি পটেটো ইটার্স অন্যরকম একটি অভিঘাত তৈরি করে। আমার মনের গভীরে এই ছবি আলাদা একটা জায়গা দখল করে নেয়।

Jun-Jul09
ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের সামনে লেখক

 

২. ছবি দেখার অভিজ্ঞতা আর আমার সীমাবদ্ধতা

এখানে একটু ব্যক্তিগত কথা বলে নিলে আমার ছবি দেখার অভিজ্ঞতা আর সীমাবদ্ধতা দুটোই পাঠক কিছুটা বুঝতে পারবেন। কর্মজীবনের পুরো পঁয়ত্রিশ বছর আমাকে বহুবার ইউরোপে যেতে হয়েছে। প্রথম দশ বছর ইংল্যান্ড আর তারপর বাকি সময়কালে বারবার ফ্রান্সে গিয়েছি পেশাগত কাজে। এত দীর্ঘকাল ধরে অসংখ্যবার প্যারিস আর ইউরোপের অন্যান্য শহরে যাওয়ার সুযোগটিকে আমি কাজে লাগিয়েছি সেখানকার ছোট-বড় সব মিউজিয়ামে আমার পছন্দের সময়কাল আর প্রিয় শিল্পীদের ছবি দেখে। এর মধ্যে কোনো মিউজিয়াম বন্ধ হয়েছে, কোনোটা দীর্ঘ সংস্কার কাজের পর আবার খুলেছে। আবার আমি সেখানে হাজির হয়েছি।

শিল্পকলার কোনো প্রশিক্ষণ আমার নেই। আমি শিল্প-সমালোচকও নই। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আব্দুল মান্নান সৈযদ, নজরুল ইসলাম, শোভন সোম, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আর মঈনুদ্দীন খালেদ-এর লেখা পড়েছি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সূচনালগ্নে কয়েকটা ক্লাস করেছি শুধু নিজের বোঝার জন্য। তাতে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অথবা বিশ্লেষক হওয়া যায় না। তখন যামিনী বা এ-ধরনের কোনো পত্রিকা ছিল না। প্রিয় শিল্পীদের বিষয়ে জানতে, তাঁদের বিভিন্ন মতাদর্শ ও শিল্প-আন্দোলন বুঝতে, এবং ছবি দেখে সেই অনুভূতি নিজের মধ্যে সঞ্চারিত করতে বই পড়া ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না। কারণ আমি ইউরোপ-ভ্রমণ আর ছবি-দেখা শুরু করেছি ইন্টারনেট-পূর্ব কাল থেকে। তখন ইমপ্রেশনিজম এবং প্রধান প্রধান ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীর ওপর লেখা বড় আকারের সচিত্র বই সংগ্রহ করেছি। গুগলের সাহায্য ছাড়াই জানতে হয়েছে কোথায়, কোন শিল্পীর, কোন ছবির সংগ্রহ। শিখতে হয়েছে সব মিউজিয়ামের ইতিহাস-ভূগোল।

শিল্পকলা বিষয়ে আমার ফরাসি সহকর্মীদের সহযোগিতা পেয়েছি। অনেক সময় তাঁদের প্রত্যক্ষ সহায়তাও পেয়েছি। কোনো কোনো সময় অফিসের মিটিং শেষে পানাহারের জন্য তাঁরা আমাকে এবং অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমাদের নিয়ে গেছেন কোনো মিউজিয়াম অথবা আর্ট গ্যালারির ভিতরের রেস্তোরায়। সেখানে ছবি দেখেছি অল্প। কিন্তু কিছু আলোচনা শুনেছি। একটি-দুটি বই আর কিছু স্মারক কিনে এনেছি। বাংলাদেশের শিল্প-সমালোচকদের বই যেমন পড়েছি তেমনি পড়েছি এইসব বই। কখনো আমাদের অফিসের কোনো ট্রেইনিং প্রোগ্রামের ফাঁকে, সন্ধ্যায় শিক্ষাসফরের মতো করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে কোনো বড় শিল্পীর পুরনো বাড়ি দেখতে। সেসব বাড়িতে সংগ্রহশালা বানিয়ে সেখানে শিল্পীর চিত্রকর্ম ও অন্যান্য স্মারক সাজিয়ে রাখা থাকে। এভাবেই আমি প্যারিসের অদূরে ভ্যান গঘের বসবাসের ঘরটি দেখি। ছোট্ট একটা ঘরে সেই বিখ্যাত সস্তা হলদে-রঙের কাঠের খাট, টেবিল আর চেয়ার। ছবি এঁকে ভ্যান গঘ যেগুলোকে পৃথিবী-বিখ্যাত করে রেখেছেন। আমাকে দেখানো হয়েছে, ঘরের কোন জানালা দিয়ে শিল্পী কোন দৃশ্যটি দেখতে পেতেন। দিনের কোন সময়ের আলো সেখানে কেমন রঙের খেলা তৈরি করে। আর তার পাশাপাশি দেখানো হয়েছে শিল্পীর আঁকা সেই দৃশ্যের দুই বা তিনটি ছবি। এসব ছোট ছোট বিশেষ ধরনের মিউজিয়ামে অতি-অবশ্যই একটা ভিডিও দেখানোর ব্যবস্থা থাকে। সেই ভিডিওগুলো বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় খুবই যত্ন নিয়ে তৈরি করা। ইংরেজি ধারাবিবরণী থাকে। সুতরাং সেগুলো থেকে শিল্পীর কাল-পটভূমি, শিল্পশৈলী, জীবন ও কর্ম সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাই।

প্রায় প্রত্যেক সফরে এক বা দুটি শিল্প-সংগ্রহ দেখতে চেষ্টা করি। ওরসে, ল’অরেন্জারি, মুজি মোনে মার্মতা, ল্যুভ, মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট, মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট, রাইখস মিউজিয়াম, ভ্যান গঘ মিউজিয়াম, রেনোয়া মিউজিয়াম এসব জায়গার কোন তলায় কোন ঘরে কার কোন ছবি সেটা ফ্লোর প্ল্যান-সহ আমার মুখস্থ ছিল। ক্লদ মোনে, রেনোয়া, এদুয়ার মানে, পল সেজান, ভ্যান গঘ – এঁদের কিছু কিছু ছবি বারবার দেখতে ক্লান্তি লাগে না আমার। কর্মজীবনের শেষ দিকে এটা প্রায় নেশার মতো হয়ে যায়। ইউরোপে কাপড়জামা বা অন্যান্য জিনিসের দাম বেশি। আমার প্রয়োজনও কমে আসছিল। সুতরাং দোকানপাটে ঘুরে সময় কাটানোর দরকার বা ইচ্ছে কোনটাই হয় না। কাজের সময়টুকু ছাড়া যে-কোনো অবসরে আমার একমাত্র আগ্রহ চিত্রকলায়। এই অভিজ্ঞতা আমার নিজের জন্য বিশাল অর্জন। কিন্তু শুধুমাত্র ভালোবাসা আর অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে আজকের পাঠকের জন্য চিত্রকলার মতো একটা বিষয়ে লেখালেখি শুরু করাটা কি ঠিক? চিত্রকলার তত্ত্বীয় জ্ঞান নেই। সাধারণ শিল্প-জ্ঞানেও ঘাটতি আছে আমার। আমি যে সৃজন-কলার সঙ্গে সম্পর্কহীন, ফার্মেসিতে মাস্টার্স করে তারপর এমবিএ করেছি সেটা কোনো গোপন বিষয় নয়। তারপরেও ছবি দেখে মুগ্ধ হই। আমার লেখায় বিবরণ, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন প্রায়ই মিলে-মিশে যায়। এই সীমাবদ্ধতা নিয়েই ছবি সম্পর্কে লিখতে হয় আমাকে। এটা কি অন্তরের তাগিদ নাকি সম্পাদকের অকারণ আগ্রহ-প্রশ্রয়?

দেয়াল ও জানালা জুড়ে ছবিটির স্কেচ

 

৩. যে-জীবন তারাভরা রাতের আকাশ  

মাত্র সাইত্রিশ বছর বেঁচেছেন এ রকম আর কোনো শিল্পী শতবর্ষ পেরিয়ে এত আলোচিত আর এতটা বিখ্যাত হয়েছেন কিনা তা আমার জানা নেই। এদিক থেকে মনে হয় ভ্যান গঘ অদ্বিতীয়। তাঁর শিল্পকর্ম, জীবন, নৈরাশ্য ও সফলতা, সবকিছুই আজ একটা কিংবদন্তির অংশ হয়ে গেছে। তাঁকে নিয়ে সারা পৃথিবীতে যতো গবেষণা, আলোচনা ও লেখালেখি হয়েছে সেসবের পূর্নাঙ্গ রচনাপঞ্জি তৈরি করাও দুঃসাধ্য। অথচ ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ (১৮৫৩-১৮৯০) যখন ছবি আঁকা শুরু করেন তখন অন্য কেউ দূরে থাক তিনি নিজেও ভাবেননি যে তাঁর মধ্যে রয়েছে এমন অসামান্য প্রতিভা আর এত বিস্ময়কর শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিশ্রুতি।

তাঁর বহু ছবি আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। দেশে দেশে শিল্পানুরাগী মানুষের চোখে লেগে থাকে সেই অনন্য চিত্রাবলী। তাঁর ছবিকে নির্ভুলভাবে চিনিয়ে দেয় এই শিল্পীর কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। তাঁর ছবি মানেই নিপুণ তুলির টান আর মৃত্তিকার রঙ থেকে বহুবর্ণে গাঢ ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠা। ক্রমেই উজ্জ্বলতর রঙের ব্যবহার। নেদারল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর ও গ্রামের নিসর্গদৃশ্য তাঁর হাতে অমর হয়ে আছে। বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের মুখাবয়ব যেমন এঁকেছেন তেমনি এঁকেছেন অনেকগুলো আত্ম-প্রতিকৃতি। এঁকেছেন অতি সাধারণ কাঠের চেয়ার-টেবিল-খাট থেকে শুরু করে নানা বর্ণের ফুল আর সূর্যমুখী-শোভিত স্টিল-লাইফ বা স্থির-জীবন। ভ্যান গঘের কথা মনে করতেই আমাদের চোখে ভাসে নক্ষত্রখচিত গাঢ নীল রাত্রি, হলুদ-সবুজ-নীল মেশানো প্রকৃতি, সাইপ্রেস, মুলবেরি আর জলপাই গাছে বাতাসের দোলা, ঢেউ-খেলানো সোনালি শস্যখেত, কাক, চড়ুই, আর আইরিস অথবা সূর্যমুখীর উজ্জ্বল রঙ।

নাতিদীর্ঘ শিল্পীজীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি এঁকেছেন গ্রামজীবন ও নিসর্গের বহু ছবি। প্রাক-ইমপ্রেশনিস্ট রীতির এসব ছবির বিষয়, রঙ এবং সার্বিক শৈলীতে ভ্যান গঘের একধরনের বিশিষ্টতা চোখে পড়ে। তারপর প্যারিতে বসবাসকালে সমকালীন অন্যান্য শিল্পীর সংস্পর্শে আর ইমপ্রেশনিজমের প্রভাবে ক্রমশ বদলে যায় তাঁর ছবির দৃশ্যপট, ছোট-ছোট হয়ে যায় তুলির টান এবং উজ্জ্বলতর হয় রঙ। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ইউরোপীয় চিত্রকলায় নেতৃস্থানীয় ও প্রতিনিধিত্বশীল কয়েকজন শিল্পীর মধ্যে তিনি হয়ে ওঠেন অন্যতম। এর অব্যবহিত পরেই অবশ্য তাঁর শিল্পশৈলী আবার বদলে যেতে থাকে। নিজের অনন্য পদ্ধতি পয়েন্টিলিজমের ধারায় উত্তর-ইমপ্রেশনিস্ট একটি নতুন যুগের সূচনা করেন তিনি।

ভ্যান গঘের এই পরিক্রমণের ইতিহাস অনেকেরই জানা। পৃথিবীর অধিকাংশ বড় মিউজিয়াম বা সংগ্রহশালায় তাঁর কোনো-না-কোনো বিখ্যাত ছবি দেখা যায়। ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার বড় শহরগুলোর মিউজিয়ামে দেখা যাবে এই শিল্পীর অন্তত একটি-দুটি পরিচিত ছবি। কিন্তু নেদারল্যান্ড হচ্ছে তাঁর জন্মভূমি। তাই আমস্টারডামের ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ মিউজিয়ামকে এমন এক সংগ্রহশালা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে এই শিল্পীকে পরিপূর্ণভাবে চেনা যাবে। অনেক উপকরণ একসঙ্গে সঞ্চিত রয়েছে এখানে। আর এটিই সারা বিশ্বে ভ্যান গঘের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ। দুশোর বেশি চিত্রকর্ম, পাঁচশোর বেশি ড্রইং আর সাতশোর মতো চিঠি। সব মিলিয়ে তাঁকে ভালোভাবে চেনার এবং তাঁকে নিয়ে গবেষণা করার অপূর্ব সুযোগ। আসলে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ শিল্পীর নামে একটি একাডেমি তৈরি করে গবেষণা পরিচালনার কাজ করে থাকে। এই মিউজিয়ামেই আছে তাঁর প্রথম পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ ছবি, ১৮৮৫ সালের বসন্তকালে আঁকা দ্য পটেটো ইটার্স

মিউজিয়ামটি পুরনো। শুরু থেকেই শিল্পীর জীবন আর পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই সংগ্রহশালার ইতিহাস। ভ্যান গঘের ভাই থিওডোর ছিলেন ছবির ডিলার। শিল্পী নিজে তাঁর জীবনের একটা বড় সময়ের জন্য এই ভাইয়ের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতেন। ১৮৯০ সালে ভ্যান গঘের মৃত্যুর পর তাঁর অধিকাংশ ছবির মালিকানা বর্তায় থিয়োর ওপর। এর মাত্র ছমাস পরেই থিয়ো নিজেও মারা যান। তখন এসব ছবির মালিকানা ও দায়িত্ব পান প্রথমে থিয়োর বিধবা স্ত্রী জোহানা (১৮৬২-১৯২৫) এবং পরে তার ছেলে ভিনসেন্ট উইলেম ভ্যান গঘ (১৮৯০-১৯৭৮)। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত যেসব ছবি আর চিঠিপত্র পরিবারের সংগ্রহে ছিল তা তখনকার সদ্য-প্রতিষ্ঠিত ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ ফাউন্ডেশন কিনে নেয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় টাকা আর মিউজিয়ামের জন্য বর্তমান ভবনটি তৈরি করে দেয় নেদারল্যান্ড সরকার। ১৯৭৩ সালে ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের যাত্রা শুরু। পরবর্তীকালে আরো বেশ কজন শিল্পীর অনেক শিল্পকর্ম এরা সংগ্রহ করেছে যা ভ্যান গঘ এবং তাঁর সমকালীন ও পরবর্তী যুগের চিত্রকলাকে বুঝতে সাহায্য করে। পটেটো ইটার্স সম্পর্কিত আলোচনায় যাবার আগে সংক্ষেপে আরেকবার ভ্যান গঘের শিল্পীজীবনের দিকে তাকানো দরকার।

৪. যে-জীবন দোয়েলের…

ভ্যান গঘের জীবন সংক্ষিপ্ত কিন্তু ঘটনাবহুল। বাল্যকাল থেকে শুরু করে জীবনাবসান পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায় নাটকীয়তাপূর্ণ। নেদারল্যান্ড এবং ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে তিনি থেকেছেন। জীবনের প্রতিটি কালপর্ব প্রথাবিরোধী মানবিক সম্পর্ক, শিল্পকর্মের বিষয় ও রীতির পালাবদল, এবং ঘটনাবহুল বর্ণময়তার জন্য যুগ যুগ ধরে মানুষের কৌতুহল আর আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাঁর বিষাদ, মানসিক বিপর্যয় এবং মৃত্যু যেমন নাটকীয় তেমনি করুণ। ১৮৫৩ সালের ৩০ মার্চ জন্ম নেওয়া ভ্যান গঘ শেষ বিবেচনায় একজন সার্থক উত্তর-ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পী এবং এক্সপ্রেশনিজমের প্রবর্তক। চিত্রকলায় আপন আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত উত্সারণ তাঁর অনন্য শৈলী। তাঁর আবেগ ছিল বাধাহীন আর জীবন ছিল অস্থির, নিয়ত পরিবর্তনশীল।

সাতাশ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি পর্যায়ক্রমে আর্ট গ্যালারির সেলসম্যান, ধর্মতত্ত্বের ছাত্র, এবং বেলজিয়ান খনি-শ্রমিকদের মধ্যে ভ্রাম্যমান যাজক হিসেবে কাজ করেছেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এর কোনটিতেই তিনি সফল হননি। ধরে নেওয়া যায়, এই সব কাজে তাঁর মনের দিক থেকে কোনো আগ্রহ ছিল না। ১৮৮০ সালে তিনি চিত্রকলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং সূচনাপর্বে নিসর্গদৃশ্য আর মডেলদের প্রতিকৃতি আঁকতে শুরু করেন। ১৮৮১ সালের শেষ দিকে দি হেগ শহরে থাকাকালে তিনি তাঁর আত্মীয় আন্তন মভের কাছে চিত্রকলার শিক্ষা নিতে শুরু করেন। এসময় সিয়েন হুরনিক নামের এক মহিলার সঙ্গে তাঁর প্রণয়সম্পর্ক স্থাপিত হয়। সিয়েন ছিলেন অবিবাহিত কিন্তু ইতোমধ্যেই গর্ভবতী এবং তারও আগে একটি তরুণী মেয়ের জননী। এই সম্পর্কের কারণে ভ্যান গঘের সঙ্গে তাঁর বাবা-মা এবং আত্মীয়-প্রশিক্ষকের দূরত্ব তৈরি হয়।

১৮৮৩ সালে সিয়েনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হবার পর তিনি নেদারল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের এক দূর প্রদেশে চলে যান। এখানে মাত্র তিনমাস ছিলেন। আর এই অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর ছবিতে নতুন একটি বিষয় যুক্ত হয়। নিসর্গের সঙ্গে আসে কৃষিজীবী মানুষের ছবি। একাকিত্ব আর ছবি আঁকার সরঞ্জামের অভাব – এই দুই কারণে তিনি আবার ফিরে আসেন বাবা-মার কাছে। তাঁরা তখন থাকতেন ব্রাবাঁত অঞ্চলের নিউয়েনেন গ্রামে। এখানেই তিনি তাঁতি আর কৃষকদের কর্মজীবনের ছবি আঁকাতে মনোযোগ দেন। জঁ-ফ্রাসোয়া মিলে নামের বিখ্যাত ফরাসি শিল্পীর অনুসরণে তিনি এইসব সরল মানুষের জীবনকে শিল্পের বিষয়বস্তু করে নিলেন। স্থানীয় প্রকৃতিকেও তিনি তুলে আনেন গাঢ, বিষাদময় রঙে। ১৮৮৪-৮৫ সালের শীতকালে ভ্যান গঘ কৃষান-কৃষাণীর মুখাবয়ব নিয়ে চল্লিশটির বেশি স্টাডি আঁকেন। এইসব ছবিতে তিনি ধারণ করতে চেয়েছেন দরিদ্র, সরল ও পরিশ্রমী মানুষের চারিত্রিক এবং অবয়বগত বৈশিষ্ট্যকে। এগুলো আসলে ছিল পরবর্তী মাসগুলোয় আঁকা বিশালতর ছবি পটেটো ইটার্স-এর প্রস্তুতিপর্ব। প্রধান ছবি আর তার সঙ্গে এই স্টাডিগুলো দেখলে শিল্পীর প্রয়াসটি বুঝতে সুবিধে হয়।

ভ্যান গঘ আসলে কৃষিজীবী মানুষের বাস্তবচিত্র আঁকতে চেয়েছিলেন। তাদের জীবনে কোনো মোহিনী রূপ আরোপ করতে চাননি। নিজের সামর্থ্যকে পরিপূর্ণরূপে তুলে ধরার জন্য এই বড় ছবিটিতে তিনি একটি কঠিন কম্পোজিশন বেছে নেন। চেষ্টা করেছেন ছবির প্রতিটি চরিত্রে প্রাণসঞ্চার করতে। প্রতিটি মানুষের অভিব্যক্তি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। ছবির বিষয় নির্বাচনে, গঠনশৈলী নির্ধারণে এবং তাকে ফুটিয়ে তোলার শিল্প-দক্ষতায় তিনি উচ্চাশা নিয়ে কাজ করেছেন। আশা করেছিলেন, এই ছবির মাধ্যমে তিনি সাফল্য আর খ্যাতি পাবেন। দুখের বিষয়, সে আশা পূর্ণ হয়নি। এ ছবির জন্য কাঙ্খিত স্বীকৃতি পাননি, পেয়েছেন অনেক অহেতুক সমালোচনা।

প্রস্তুতিপর্বের এই স্টাডিগুলোর অধিকাংশই এখন আমস্টারডামের ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে রাখা আছে। শুধু মানুষের মুখ নয়। হাত, বাহু, হাতে কাঁটা-চামচ ধরার ভঙ্গি, কফিপট এরকম অনেকগুলো ড্রইং এদের সংগ্রহে আছে। আছে পুরো ঘর, জানালা, টেবিল আর মানুষের বসবার নির্দিষ্ট স্থান ঠিক করে নেওয়ার জন্য বেশ কিছু খসড়া। কিন্তু সেগুলো দেয়ালে সাজানো নেই। বিশেষ কোনো উপলক্ষ্য বা প্রদর্শনী ছাড়া সেগুলো দেখানো হয় না। আমার সৌভাগ্য যে কোনো-একবার আমি যখন ওই মিউজিয়ামে যাই তখন এরকম অনেকগুলো স্টাডি প্রদর্শিত হচ্ছিলো। পরেরবার আর সেগুলোকে দেখিনি। এসব স্টাডি ছাড়াও শিল্পী ওই সময়ে কৃষান-কৃষাণীর অনেক ছবি এঁকেছেন। করেছেন অনেকগুলো ড্রইং। বেশির ভাগ ছবিই আলুক্ষেতে কর্মরত মানুষের।

যা-ই হোক, নানারকম ড্রইং-এর মধ্য দিয়ে পটেটো ইটার্স-এর প্রস্তুতি ভালই চলছিল। কিন্তু ওই ছবিটি আঁকার অল্প কিছুদিন আগে ১৮৮৫ সালে ভ্যান গঘের বাবা মারা যান। বোন আনার সঙ্গে ঝগড়া করে তিনি বাড়ি ছেড়ে নিজের স্টুডিওতে উঠে আসেন এবং তাঁর পরিকল্পিত ছবিটি আঁকার কাজ শুরু করেন। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল, এই ছবিই তাঁকে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা এনে দেবে। অথচ এটি যখন আঁকা হয় তখন তিনি প্রায় সদ্য শিল্পকলার জগতে প্রবেশ করেছেন। নিজের কোনো বৈশিষ্ট্য বা স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তীকালে যে শৈলী তিনি নিজস্ব স্টাইল হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং যে শিল্পরীতি তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছে তা তখনও তাঁর আয়ত্তে আসেনি। এরই মধ্যে ১৮৮৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে ভ্যান গঘ পটেটো ইটার্স আঁকা শেষ করেন, যা এখন তাঁর প্রথম সেরা ছবি হিসেবে স্বীকৃত|

এদিকে সে বছরেরই সেপ্টেম্বর মাসে নিউয়েনেন গ্রামের ক্যাথলিক যাজক গ্রামবাসীদের সবাইকে নিষেধ করে দেন ভ্যান গঘের জন্য মডেলের কাজ করতে। ওই সময়ে তাঁর কোনো একটা ছবির মডেল গ্রাম্য এক তরুণী গর্ভবতী হয়ে পড়লে সেই ঘটনায় ভ্যান গঘকে দায়ী করা হয়। ওই মেয়েটির বেশকিছু ছবি তিনি এঁকেছেন কিন্তু অভিযোগ আসার পরে সেই মেয়ে বা অন্য কোনো মেয়েকে মডেল হিসেবে পাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। পটেটো ইটার্স আঁকা হয়ে যাবার পর মডেল না পাওয়ার কারণে কিছুদিন তাঁকে স্থিরজীবন এবং অন্য ধরনের ছবি আঁকতে হয়েছে। এসময় তিনি বারবার এঁকেছেন আলু, তামার কেটলি, পাখির বাসা, এমনি নানা টুকরো ছবি। এদের অনেক ছবিই আসলে পটেটো ইটার্স-এর ছোট ছোট টুকরো। আমস্টারডামের এই বিখ্যাত মিউজিয়ামে এগুলো রাখা আছে। এখন ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করে ভ্যান গঘ মিউজিয়ামের সংগ্রহ দেখতে চাইলে শিল্পীর প্রধান এবং বিখ্যাত সব ছবি ছাড়াও এরকম টুকরো ছবি আর স্টাডি দেখতে পাবেন যে কেউ।

 

৫. মানুষের সাথে তার দেখা হয়…   

এক প্রতিভাবান এবং অস্থিরচিত্ত নবীন শিল্পীর প্রথম বড় এবং সেরা ছবিটি তৈরি হয়েছে অতি সাধারণ গ্রামীন মানুষকে অবলম্বন করে। এখানে কলাকৌশলের বাহুল্য নেই। কিন্তু একটা নির্মম বাস্তবতার আবহ, রূপ ও ব্যঞ্জনা আছে। এ কারণেই হয়তো তৈরি হয়েছে এর একটা সর্বজনীন আবেদন। এ ছবির সামনে দাঁড়ালে এর চরিত্রগুলোর সঙ্গে এক ধরনের সংযোগ স্থাপিত হয়। তৈরি হয় এক অতীন্দ্রিয় অনুভূতির জগত।

এমনিতে ছবিটি মোটামুটি সরল। ছবির কেন্দ্রভূমে আছে একটি অমসৃণ, ব্যবহার-জীর্ণ কাঠের টেবিল। তার চারপাশ ঘিরে বসে আছে পাঁচজন মানুষ যাদের চারজনই নারী। একজন হাতে ধরে আছে গরম ধোয়া ওঠা আলুর ছোট পাত্র। তাঁর মুখে একটুখানি প্রশ্নের চিহ্ন। উল্টোদিকের মহিলাটি কফির পট থেকে গরম কফি ঢেলে দিচ্ছে কাপে। এই সামান্য আহারের জন্য কৃষক পরিবারের তিনটি প্রজন্ম টেবিলের চারপাশে সমবেত হয়েছে। তাদের বর্ণহীন অনুজ্জ্বল পোশাকে শীতের আভাস। ওপর থেকে একটি বাতি এই দৃশ্যের ওপর ম্লান আলো ফেলেছে। সেই আলোয় অস্পষ্ট দেখা যায় নিরাভরণ ঘরের চারপাশ। সেই মলিন আলো ফুটিয়ে তুলেছে সকলের মুখের সরল দীনতা। একই সঙ্গে দৃশ্যমান করেছে মানুষের নিরভিমান মুখে নীরব কৃতজ্ঞতার অভিব্যক্তি। সকলের মুখের ওপর একই ধরনের, প্রায় সমপরিমাণ আলো ফেলে এই বাতিটি ছবিতে এক ধরনের সামঞ্জস্য ও সংহতি এনে দিয়েছে। প্রত্যেকের অবয়বে এনেছে সমতা ও ভারসাম্য।

ছবিতে ভালোভাবে দেখা যায় চারজন মানুষের মুখ। প্রাত্যহিক শ্রমের ক্লান্তি তাদের চেহারায় খুবই স্পষ্ট। তবু তাদের দৃষ্টিতে আছে বিশ্বাস, নীরব প্রশান্তি আর মিলিতভাবে যাপিত জীবনের সরল পরিতৃপ্তি। পারস্পরিক সম্পর্ক, সহমর্মিতা আর ভালোবাসার স্পন্দনটিও টের পাওয়া যায় তাদের মুখভঙ্গিতে, অঙ্গসন্চালনে এবং চোখের ভাষায়। বাইরের জগতের কোনো আলোড়ন ছায়া ফেলেনি এই শান্ত সমাহিত পারিবারিক সম্মিলন-দৃশ্যে। কারো চোখের দৃষ্টিতে কোনো অভিযোগ নেই, উত্কন্ঠা নেই। টেবিলের ওপর একটি বড় প্লেটে অনেকগুলো আলুর টুকরো। সেদিকে সামান্য প্রসারিত, দুজনেব্র দুটি শীর্ণ, ক্লিষ্ট, একটু দ্বিধান্বিত হাত।

অন্তত তিনজনের তিনটি হাতের ভঙ্গি এবং আঙ্গুলের ডিটেইল কাজ প্রায় একই রকম। পরিশ্রমী হাতের ছবি বলেই হয়তো নারী-পুরুষের পার্থক্য স্পষ্ট নয়। এই ছবির বাইরে আলুচাষ আর মানুষের হাত নিয়ে যে সব স্টাডি এবং ড্রইং তিনি এঁকেছেন সেগুলোর সঙ্গে পরিচয় থাকলে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়ে ভ্যান গঘের চিন্তা এবং তাঁর আঁকার সীমাবদ্ধতাগুলো বোঝা যায়।

সম্মুখভাগের পাঁচজন মানুষের অবয়ব ছাড়িয়ে ছবির পশ্চাত্পটের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। আলো-ছায়ার সজীব পটভূমিটি দর্শককে আকৃষ্ট করে। টেনে নেয় আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণের দিকে। অনুপুঙ্খর দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় ছবির পশ্চাত্পটে অনেকখানি বিস্তার আছে। আছে কোমল রেখায় আঁকা জানালা, অন্ধকার দেয়ালে একটি ছবির ফ্রেম, মাথার ওপর একটা ঘড়ি। এইসব ছোট ছোট বিস্তার এমন এক আবহ তৈরি করে যে এটি এই পাঁচজন মানুষের পারিবারিক আবাস হিসেবে, একত্রে খেতে বসার ঘর হিসেবে অনায়াসে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এদের পারস্পরিক সম্পর্ক আর পরিচয় নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকে না।

অনুভূতিপ্রবণ দর্শক এই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিটি মুখাবযবকে পুনরাবিষ্কার করেন। নিজের ভেতরে অনুভব করেন তাদের দৃষ্টি, তাদের অন্তর্লোক আর তাদের আনন্দ-বিষাদকে। দীর্ঘসময় এই গভীর কালচে রঙের ছবির সামনে দাঁড়ালে, ছবির ভেতর থেকে যেন আলু আর কফির সুবাস ভেসে আসে।

ইতিপূর্বে এই ছবিটির আর একটি মাঝারি আকারের স্টাডি এঁকেছিলেন ভ্যান গঘ। সেই ছবিটিতে ছিল চারজন মানুষ আর অনেকখানি শূন্যতা। সেটিতে আঙ্গিকের বৈচিত্র্য ছিল। তবে পরবর্তীকালে আঁকা মূল পটেটো ইটার্স–এর তুলনায় সেটিকে অসম্পূর্ণ এবং ম্রিয়মান মনে হয়।

এর পরের বছরগুলোতে গঘের ভ্যান গঘ এখানে এবং প্যারিসে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ছবি আঁকেন। তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আর অঙ্কন-শৈলীর বিকাশ ঘটতে শুরু করে। কিন্তু ওই ছবিটি তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। পটেটো ইটার্স আঁকার দুবছর পর প্যারিস থেকে বোনের কাছে লেখা চিঠিতে ভ্যান গঘ লেখেন: আমার মনে হয়, নিউয়েনেনে আমি যে কৃষক পরিবারের আলু খাওয়ার ছবিটি এঁকেছিলাম সেটিই আমার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। অর্থাত, তখন পর্যন্ত তিনি এটিকেই তাঁর সবচেয়ে সফল আর সেরা ছবি মনে করতেন। এটিকেই তিনি গন্য করতেন তাঁর একমাত্র প্রদর্শনযোগ্য কাজ হিসেবে।

অসংখ্য চিঠিতে শিল্পী এই ছবি আঁকার পটভূমি এবং এর প্রতিটি পদক্ষেপ বর্ণনা করেছেন। এসব চিঠিতে ধরে রাখা আছে ভ্যান গঘের দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর সমাজবীক্ষণ, এবং তাঁর সময়ের বিশ্লেষণ। সেখান থেকেও কিছুটা বোঝা যায় শিল্পীর বিষয় নির্বাচন এবং রঙের ব্যবহার। এসব নিয়ে লেখাপড়া বা গবেষণা করলে ভ্যান গঘ সম্পর্কে প্রচলিত নানা গল্প-কাহিনী, সমালোচনা ও ধ্যান-ধারণা পাল্টে যেতে পারে। তাঁকে কখনো কখনো একজন সমাজ-সচেতন ও সংগ্রামী শিল্পী বলেও মনে হবে। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, শিল্পকলা নির্মিত হতে হয় ইচ্ছাশক্তি, আবেগ আর ভালোবাসা দিয়ে। টেকনিক বা কলাকৌশলকে তিনি বাস্তবিকভাবে নিরর্থক বলে মনে করতেন। অনুভূতিশীলতার মধ্য দিয়েই শিল্প তার পারিপার্শ্বিক বিশ্বলোককে স্পর্শ করবে – এই ছিল তাঁর বিশ্বাস। ভ্যান গঘের এই অনুভূতিশীলতা আমার মতো সহস্র দর্শকের অন্তরে সঞ্চারিত হয়েছে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close