Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ ইমতিয়ার শামীম > শত বছরের নিঃসঙ্গতা >> জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

ইমতিয়ার শামীম > শত বছরের নিঃসঙ্গতা >> জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশঃ March 7, 2018

ইমতিয়ার  শামীম > শত বছরের নিঃসঙ্গতা >> জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
0
0

ইমতিয়ার  শামীম > শত বছরের নিঃসঙ্গতা >> জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

[সম্পাদকীয় নোট : গতকাল ৬ মার্চ ছিল লাতিন আমেরিকার ভুবনবিখ্যাত কথাসাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ৯১তম জন্মদিন। এই উপলক্ষে প্রকাশিত হলো আমাদের একজন প্রধান কথাসাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীমের আত্মগত কিছু কথা নিয়ে লেখা এই প্রবন্ধটি। উল্লেখ্য, এই লেখাটি মার্কেসের ‘নিঃসঙ্গতার একশো বছর’ উপন্যাসের প্রকাশনার পঞ্চাশ বছর শীর্ষক একটি প্রকাশিতব্য গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে]

 

‘বাংলাদেশের সাহিত্য’ নিয়ে যারা খুবই ভাবিত, তারা পশ্চিম বঙ্গের বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকেই ঢাকাকে বাংলা ভাষার রাজধানী ভেবে থাকেন। আর এইভাবে বাংলা ভাষাকে আমরা রাজধানী, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক সমিতিগুলোর মতো জোটবদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারি বটে, কিন্তু ভাষাসাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে তা তেমন কোনো সুফল নিয়ে আসে না বা আসবে না।

 

উপন্যাসই বলি বটে, কিন্তু শুধু তাতেই কি আটকে থাকে ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’? গল্পের পরিধি ছাড়িয়ে এতে পুনর্নিমাণ ঘটে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের, পুনর্নিমাণ ঘটে সেখানকার ইতিহাসেরও। এমনকি এতে নিজেকেও পুনর্নির্মাণ করেন মার্কেজ, নিজস্ব মিথ তৈরির মধ্যে দিয়ে। চার বছর ১১ মাস দুইদিন ধরে চলা টানা বৃষ্টিপাতেরও আগে, সত্যি কথা বলতে গেলে গল্পের একেবারে শুরুতেই আমরা সেই মিথকে জেগে উঠতে দেখি। যার সূত্রপাত মূলত মার্কেজের শৈশবের আরাকাটাকায়। তখন একবার কর্নেল মার্কেজ সার্কাসের কুঁজওয়ালা দ্রুতগামী উট দেখানোর পর বালক মার্কেজ একদিন কথায় কথায় বলে, কখনও বরফ দেখেনি সে। কর্নেল তাই তাকে নিয়ে যান বানানা কোম্পানিতে। সেখানকার লোকজনের কাছ থেকে জমাটবাঁধা এক খণ্ড বরফ নিয়ে শিশু মার্কেজকে বলেন তিনি, ওর মধ্যে হাত রাখতে। শৈশবে প্রথম বরফ দেখার আর তার স্পর্শ পাওয়ার এ দৃশ্যকল্পই মার্কেজ আমাদের ফিরিয়ে দেন ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ বা ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচ্যুড’-এর শুরুতে। ততদিনে সেই বরফ জমাট বেঁধেছে আরও অথবা গলতে গলতে বইতে শুরু করেছে বিরাট এক নদী হয়ে। অথবা মার্কেজের এ বই পড়তে পড়তে আমাদের এ-ও কি মনে হয় না, আরও অনেক আগে থেকেই জমাট বাঁধছে কিংবা ক্রমাগত গলে যাচ্ছে ধবল বরফ?

লৌকিক রহস্যময়তার মধ্যে দিয়ে মার্কেজ প্রকৃতির সত্যকে উদ্ঘাটন করেন; মানবপ্রজাতি নিজের অজান্তেই যেসব রহস্যময়তার সন্ধান দেয়, সেগুলোর পরতে পরতে মিশিয়ে দেন রাজনৈতিক অভিসন্ধি। একটি জনবসতির, একটি পরিবারের কয়েক প্রজন্মের মধ্যে দিয়ে আমরা কেবল নিঃসঙ্গতার উজ্জ্বলতা আর বিবর্ণতাই দেখি না; আরও দেখি নিঃসঙ্গতা ধূসর হয়ে মিথস্ক্রিয়া তৈরির মধ্যে দিয়ে কী করে রাজনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে আসে আর তার পর কেবলই কী করে মানবিক বিপর্যয়ের ঝড় বয়ে যেতে থাকে আর ফের নিঃসঙ্গতাই প্রকট হয়ে ওঠে। বিচ্ছিন্ন একটি জনপদ ও একটি পরিবারের গল্প হয়ে ওঠে মূলত একটি জাতির ইতিহাস, একটি দেশের ইতিহাস, একটি জনগোষ্ঠীর সুখদুঃখ, হাসিকান্না, প্রতিবাদ-বিপ্লবের ইতিহাস, প্রকৃতির কাছে তাদের নিরুপায়তার ইতিহাস।

মাকোন্দো- যে জনপদে মাঝেমধ্যে জিপসীর দল আসে,- বাকি পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক বলতে এটুকুই এ কাহিনীর। কিন্তু গ্রিক নাটক ইডিপাসে যেমন যৌনতার নৈতিকতা লঙ্ঘন করার অমোঘ নিয়তি ঘোরতর অন্ধকার নিয়ে আসে, তেমনি মাকোন্দোর মানুষের সঙ্গ-নিঃসঙ্গতাও প্রবলভাবে নিয়তিতাড়িত হতে থাকে। মাকোন্দোর একটিমাত্রই পরিবার কাল থেকে কালান্তরে যাত্রার মধ্যে দিয়ে সেই নিয়তির রূপরেখা তৈরি করে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া আর উরসুলা আপন ভাইবোন নয় বটে, কিন্তু রক্তসম্পর্কিত যে কোনও ভাইবোনের বিয়ে হলে লেজবিশিষ্ট উত্তরাধিকার আসবে এমন এক অতিপ্রাকৃত সংস্কারের কারণে তারা উন্মূল হয় নিজেদের জনপদ থেকে। নতুন বসতির জন্য যাত্রা শুরু করে তারা, বার বার তাদের বসতির পরিবর্তন ঘটে। শেষ পর্যন্ত দুর্গম এক এলাকায় এসে থিতু হয় তারা, যেখানে তাদের পরিচয় অনুসন্ধান করার মতো কেউ কেউ, যেখানে সন্তান-সন্ততি নিয়ে একসময় বিরাট এক জনপদ গড়ে তোলে তারা, যেখানে জিপসীরা এলেও তাদের জন্মবংশ পরিচয় কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হয় না।

প্রশ্নবিদ্ধ হয় না বটে, কিন্তু নিঃসঙ্গতাও ফুরায় না এ গল্পে। এর পুরো পরিভ্রমণই আসলে নিঃসঙ্গতার। অসংখ্য চরিত্রের সমাবেশ ঘটার পরও একাকিত্বের। আর তার আস্বাদ আমরা পাই উপন্যাসের একেবারে শুরুতেই। ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড়িয়ে কর্নেল গুলির জন্য অপেক্ষা করছেন, মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ পেতে চলেছেন, একা-একা এক অনন্তের পাখি হতে চলেছেন তিনি; এমন এক সময়ে তার মনে হয়, অনেক-অনেক বছর আগে বাবার সঙ্গে প্রথম বরফ দেখার কথা। শুরুর একটিমাত্র বাক্যেই মার্কেজ তিন-তিনটি কালের সন্নিবেশ ঘটান এবং নিঃসঙ্গতার ত্রিকালে আমাদের নিক্ষেপিত করেন। তিনি নিঃসঙ্গতার জন্মকথা শোনান, নিঃসঙ্গতার অমরত্বও দেখান আর ইঙ্গিত দেন এক নিঃসঙ্গতার জগত পেরিয়ে আরেক নিঃসঙ্গতার বিবরে পরিভ্রমণের ইঙ্গিত। মার্কেজ এইভাবে আমাদের গল্প ও গল্পচিন্তার আস্বাদে ডুবে যেতে সাহায্য করেন এবং গল্পের প্রান্তর থেকে সরে এসে আমরা এমন অনেক বিষয়ের মুখোমুখি হই, আপাতদৃষ্টিতে গল্পের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু গভীরভাবে তা গল্পেরই অন্তর্গত।

মার্কেজ অসংখ্য বৈপরীত্যের সন্নিবেশ ঘটনা এ গল্পে, ফলে ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ হয়ে ওঠে বিশাল এক প্যারাডক্স। মাকান্দোর সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর সম্পর্ক নেই বটে, কিন্তু এখানে জিপসীরা আসে, আসে হোসে বুয়েন্দিয়ার প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চার নানা উপকরণ নিয়ে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, যিনি এই বসতির পত্তনি ঘটিয়েছেন, প্রকৃতির রহস্যময়তা জানতে কত পরীক্ষানিরীক্ষা যে করে চলেন তিনি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই; কিন্তু এক কথায় এভাবেই নিজেকে তিনি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন নিজের জনগোষ্ঠী থেকে। পিতৃতান্ত্রিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি, যেমন মাতৃতান্ত্রিকতার উজ্জল উদাহরণ উরসুলা। হোসে আর্কাদিওর প্রচণ্ড যে নিঃসঙ্গতা বার বার মাকান্দোর জনগোষ্ঠীকে ছত্রখান করে ফেলতে চায়, একখান থেকে নিয়ে যায় অন্যখানে, ধ্বস্ত-বিধ্বস্ত করে যৌনতাকে, তেমন সব নিঃসঙ্গতাকে দুই হাতে সরিয়ে পরিবারের পত্তন ও সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার মধ্যে দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের অবিচ্ছিন্নতাকে সুস্পষ্ট করেন তিনি। এসব বৈপরীত্যময়তার মধ্যে দিয়ে মাকোন্দো বিচ্ছিন্নতার বোধকে পরাস্ত করতে থাকে, কিন্তু বিপরীতে সরলতাও হারাতে থাকে, যদিও আরও অনেক নগর-শহরের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। ফলে সা¤্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিকতার আগ্রাসনও দেখি আমরা সেখানে কলা-উপনিবেশ গড়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে। দেখি বিক্ষোভ, রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধ। এইসব যজ্ঞের মধ্যে দিয়ে মাকোন্দো ক্রমশ এগিয়ে চলে পূর্বনির্ধারিত ভবিষ্যতের দিকে।

তাই শুধু নিঃসঙ্গতা তো শুধু নয়- এ বইয়ে দেখি, নিঃসঙ্গতা জমতে জমতে সমস্ত অনুযোগ, ক্ষোভ ও ক্রোধ হারিয়ে পরিণত হচ্ছে নির্জনতায়। আমরা শেষ পর্যন্ত উপনীত হই থিতু হয়ে পড়া সুখদুঃখ, হাসিকান্না ও আনন্দবেদনার ওপর ভাসতে থাকা অনুযোগ ও ক্রোধহীন নিঃস্তরঙ্গ প্রশান্তিময় নির্জনতায়। এই বোধের সমর্থনও পাই অনেক পরে মার্কেজেরই বলা এক কথা থেকে, যেখানে তিনি বলেছেন, সারাজীবন আসলে তিনি একটি কাহিনীই লিখে গেছেন। আর তা হলো একাকীত্বের কাহিনী। যে একাকিত্বের বয়ান মার্কেজের স্মৃতি আর সৃজন থেকে উঠে এসেছে তার উৎস বুয়েন্দিয়া পরিবার। মার্কেজ বলেছেন, মানুষের এমন একাকীত্ব আসে কেবল ভালবাসাহীনতা থেকে। বুয়েন্দিয়া পরিবারে একাকীত্ব ছিল, কেননা সেখানে ছিল ভালোবাসাহীনতা। পুরো বইয়ে, মার্কেজ বলেছেন, গোটা একশ বছরের নিঃসঙ্গতার আখ্যানে একমাত্র বুয়েন্দিয়া হলেন টিকিদার অরেলিয়ানো, যার মধ্যে ভালোবাসার রূপ-রস খুঁজে পাওয়া যায়।

তা হলে, আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার, মার্কেজ আসলে আমাদের বলতে থাকেন নিঃসঙ্গতাকে উজিয়ে ভালোবাসার জন্মকথা, মানুষের বাসভূমি পত্তনের ইতিকথা, ভালোবাসা ও যৌনতার ক্ষমতা-অক্ষমতার কথা। কিন্তু এসবের মূল স্রােত উঠে আসে গভীর এক ইতিহাসবোধ থেকে, গভীর এক রাজনৈতিকতা থেকে। বরফের সংস্পর্শে যাওয়ার কথা মনে হওয়ার পর আমাদের আরও জানা হয়ে যায়, কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বাবা হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ছিলেন প্রচ- উদ্যমী আর অভিযানপ্রিয় মানুষ, বার বার বিজ্ঞানের সুযোগ-সুবিধাগুলো ভোগ করার প্রয়াসে তিনি মানুষজনকে নিয়ে বার বার বসতি স্থাপন করেন বিভিন্ন এলাকাতে। মানবপ্রজাতির এই শুরুর বিন্দু যে তাকে কী ভয়ানকভাবে অভিবাসনমনস্ক করে রেখেছে, তা কি আমরা এখনও টের পাই না? কিন্তু হোসে আর্কাদিওর স্ত্রী উরসুলা একসময় তার এই গোপন স্বভাব বুঝে ফেলেন। গোত্রের সবাইকে, মানুষজনকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেন কারও ঠাঁইনড়ানো মতিগতিকে প্রশ্রয় না দিতে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া চান, থিতু না হয়ে আবারও উজানের টানে বেরিয়ে পড়তে, অন্য কোথাও গিয়ে পত্তনি বসাতে। অথচ মানুষজনের কাছ থেকে আর সাড়া  পান না। শেষমেষ হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া কর্কশ কণ্ঠে ঘোষণা করেন, তা হলে শুধু তারাই (মানে শুধু তারা দুইজনে) যাবে অন্য কোনওখানে। উরসুলা তার জন্ম নেয়া ছেলেটির কথা স্মরণ করিয়ে দিলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া জানিয়ে দেন, তাদের কোনও আত্মীয়স্বজন এখনও এখানে মারা যায়নি এবং মাটির তলায় আপনজনদের কেউ ঠাঁই না নেয়া পর্যন্ত ওই জায়গার মাটির ওপর কারও অধিকার জন্মায় না। তখন ধীর-স্থির কণ্ঠে উরসুলা জানিয়ে দেন, তা হলে তিনি নিজেই মরতে রাজি, তাদের বাদবাকি সবার থিতু হওয়ার স্বার্থে।

রাজ্য ও রাষ্ট্রের উৎপত্তির পেছনে, সৃষ্টি ও বিভাজনের পেছনে নিশ্চয়ই অনেক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কারণ আছে। কিন্তু মানুষের এমন অভিজ্ঞান অর্জনে, মানে স্বদেশ আর মৃত্তিকায় মমত্ব নিয়ে থিতু হওয়ার পেছনে উরসুলার মতো মানুষের এমন মৃত্যু-আকাক্সক্ষাও বোধ করি একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। মার্কেজ আমাদের এই বোধের একটি শৈল্পিক ও মানবিক উৎসের সন্ধান দিয়েছেন ‘নিঃসঙ্গতার শত বর্ষে’। লাতিন আমেরিকার উপন্যাস এত বিশ্বপ্রিয়তার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে মার্কেজকেও আমরা স্বীকার করতে দেখি, তাদের উপন্যাসের জাতীয়তাবাদী মেজাজই এই গন্তব্যে পৌঁছার পরিপ্রেক্ষিত সৃষ্টি করেছে। মার্কেজের শৈশব সম্পর্কে কোনও ধারণা ছাড়াই আমরা এ বই একটানে পড়ে যেতে পারি বটে, কিন্তু তার শৈশবের স্মৃতিগুলো জানা থাকলে আমাদের পাঠের অভিজ্ঞান চিত্রিত হতে পারে আরও বিচিত্র বিভাতে।

‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ আমি দুইবার পড়েছি। নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে আবারও পড়ব। কিন্তু কেন পড়ব? তা ভাবতে গিয়ে অবশ্য উদ্ভট এক ঘটনার কথাই মনে আসছে। ছোটবেলায় গ্রামএলাকায় আমার এমন একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পুরো ‘দেবদাস’ যিনি মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। এই নিয়ে আমরা কয়েকজন আড়ালে-আবডালে হাসাহাসি করতাম। কিন্তু এ-তো সত্যি যে, নিজস্ব অভিরুচি অনুযায়ী বারবার পড়া যায় এমন বই সবার চোখেই কম; ওই পাঠকও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। ঘুরেফিরে ‘দেবদাস’ই পড়তেন তিনি, দেবদাসকে আবিষ্কার-পুনরাবিষ্কার করতেন নিজের ভাবনার আলো জ্বেলে। ‘দেবদাস’ আমি হয়তো আর কোনোদিনই পড়ব না, পড়ার প্রয়োজন অনুভবও করব না। কিন্তু ‘নিঃসঙ্গতার শত বছর’ নিশ্চয়ই আবারও পড়তে চাইব। রাজনৈতিকতার, নৈতিকতার যে জগতে আমাদের বসবাস করতে হয়, তা আমাকে প্রতিনিয়ত অসহিষ্ণু করে তোলে, কিন্তু এ বই কিংবা এ বইয়ের মতো আরও সব আমাকে নিঃসঙ্গতা পেরিয়ে নির্জনতায় পৌঁছতে সাহায্য করে। আর এমন সব চিন্তাও জাগে, যেসবের সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে এ বইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই; কিন্তু গভীরতর দিক থেকে নিশ্চয়ই আছে।

যেমন, চিন্তা করি, এমন ভাষায়, এমন কথনভঙ্গি ব্যবহার করতে আর মিথের পর মিথ জন্ম দিতে মার্কেজকে কি শুধু তার নানীই উদ্বুদ্ধ করেছিলেন? মার্কেজের আত্মজীবনী কিংবা বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে সেরকম সিদ্ধান্ত নিতে প্রলুব্ধ করে বটে, কিন্তু তার নোবেল পুরস্কার ভাষণ থেকে মনে হয়, আরও একজনের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে নেহাৎ কম নয়। তিনি ওই বক্তৃতা শুরুই করেছিলেন ফ্লোরেন্সের নাবিক আন্তনিও পিগাফেত্তির কথা দিয়ে। যিনি প্রথম বিশ্বভ্রমণের সময় ম্যাগিলানের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন। নিজের নোটবুকে তিনি আমেরিকা মহাদেশের দক্ষিণাঞ্চল সম্পর্কে যা লিখেছিলেন, মার্কেজ বা লাতিন আমেরিকানদের কাছে তা নিশ্চয়ই নিরেট বাস্তব। পিগাফেত্তি দেখেছিলেন, এমন এক শূকর, যাদের দেহের পশ্চাদ্দেশে রয়েছে নাভী; দেখেছিলেন নখরবিহীন পাখি, এমন সব পাখি যাদের নারী সঙ্গীরা ডিম দেয় পুরুষসঙ্গীর পিঠে চড়ে। পিগাফেত্তি এমন এক স্থানীয় বাসিন্দার কথাও বলেছিলেন, বিশালদেহী যে মানুষটি কি না আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। এসব জানিয়ে মার্কেজ বলেছিলেন, এই ছোট এবং মোহময়ী পুস্তিকাটিতেই লুকিয়ে আছে আমাদের সমসময়ের উপন্যাসের বীজ। এত অনায়াস স্বীকৃতি দিয়েও তিনি ফের বলেছেন, তবে এটি ঠিক ওই সময়ের বাস্তব চিত্রের সুবিন্যস্ত বর্ণনা নয়। এরকম বিবিধ স্বীকৃতি ও কার্যকারণের মধ্যে দিয়েও মার্কেজ আসলে এ উপন্যাসের কিংবা তার লেখার বৈপরীত্যময়তাগুলোর মধ্যে কীভাবে সংহতি তৈরি হয়েছে, ভাষা ও কাহিনীর গাঁথুনি কীভাবে আটোসাটো হয়েছে তা ভাবতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেন। যতবার পড়া যায়, ততবারই এর নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হয়, পুরানো অনেক দিক হয়তো নাকচও হয়ে যায়।

এইখানে বলে নেওয়া ভালো; মার্কেজের লেখার ভাষার (স্প্যানিশ) সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্রও পরিচয় নেই। এ বইয়ের আস্বাদ নেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে অংশত ইংরেজিতে এবং প্রধানত বাংলায় জি এইচ হাবিবের অনুবাদের কল্যাণে। অবশ্য একটি অনলাইনে মূল স্প্যানিশ থেকে আনিসুজ্জামানের করা অনুবাদের কয়েকটি পর্বও পড়েছি আমি। যদি স্প্যানিশ ভাষায় স্প্যানিশ সাহিত্যে দক্ষ হতাম, তা হলে হয়তো এককথায় বলা সম্ভব হতো এই অনুবাদগুলো কতটুকু বিশ্বস্ত, কতটুকু নির্ভরশীল। তা নই বলে এটাও বলতে হবে, যে-মার্কেজকে, যে ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’কে আমি ধারণ করছি, সেই মার্কেজ ও তার গ্রন্থটি আসলে আমারই ভাষার। ভাষাশৈলীর কথা যদি বলতে হয়, জাদু-বাস্তবতার অনুষঙ্গসমূহের প্রকাশভঙ্গিমার কথা যদি বলতে হয়, শিল্পগুণের কথা যদি বলতে হয়, তা হলে আমার ‘নিঃসঙ্গতার শত বছর’ ও এর মধ্যে দিয়ে উন্মোচিত মার্কেজ মূলত জিএইচ হাবিবের সৃষ্টি। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চয়ই আছে-যাকে শাদামাটা কথায় বলা হয় ‘শরীরী ভাষা’, বলা হয় সেটিই পৃথিবীর প্রধানতম সার্বজনীন ভাষা, কারণ বলার ভাষা না মিললেও মানুষ শরীরী ভঙ্গিমা ও ইঙ্গিতের মাধ্যমেই অনেক জটিল বিষয়ে ভাবের আদানপ্রদান করতে পারে- আমি মনে করি, মার্কেজের বিশেষত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছরে’ এই শৈলী এত প্রবল যে, এই গ্রন্থ সারা পৃথিবীতে, বিভিন্ন ভাষাতে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আর এটি তাই বাংলা ভাষার জন্যেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বোধকরি, শেক্সপিয়রের পর অন্য কোনো সাহিত্যিকের কোনো বই-ই এত জনপ্রিয়তা পায়নি। বইটির অনুবাদকর্মও যখন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন শুধু বইটি নয়, অনুবাদের ভাষা, এই ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাও পায় এ গ্রন্থ রচনার মূল ভাষা স্প্যানিশ কিংবা এটি অনুবাদের প্রধানতম ভাষা ইংরেজির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিমত্তা ও স্মিত ঋজুতা। ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছরের’ বাংলা অনুবাদ বাংলাভাষাকে সে সুযোগ এনে দিয়েছে। আমার মনে হয়, জি এইচ হাবিব এ সুযোগকে কাজেও লাগিয়েছেন।

এই সুযোগে আরও একটি কথা বলি- ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ ভাষার রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতি নিয়ে ভাবতেও উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের দেশে যখন অনেকে ‘বাংলা ভাষার রাজধানী ঢাকা’ জাতীয় জাতীয়তাবাদী চেতনায় ভয়ানক মারমুখো, সেখানে মার্কেজের বক্তব্যটি একেবারে অন্যরকম। তিনি এবং ফুয়েন্তেস দুজনেই বলেছেন, ‘লাতিন আমেরিকায় আমরা একটাই উপন্যাস লিখছি। এর কোলোম্বিয়ান অধ্যায়টা লিখছেন হুলিও কোরতাসার, ক্যুবান অধ্যায়টা লিখেছেন কারপেন্তিয়ার, আরহেন্তাইন্ অধ্যায়টা লিখছেন হুলিও কোরতাসার ইত্যাদি।’ তারা বলেছেন, ‘এইভাবে নিরন্তর একটা ইন্টারটেক্সচ্যুয়ালিটির ব্যাপার ঘটে চলেছে, যা লাতিন আমেরিকার সাহিত্য-প্রকৃতির ইঙ্গিতবহ।’ লেখাই বাহুল্য, লাতিন আমেরিকার লেখকরা মূলত এভাবেই চিন্তা করে থাকেন। কিন্তু আমরা বাংলাদেশে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বোধহয় এরকম ইন্টারটেক্সচ্যুয়ালিটির চিন্তা থেকে ক্রমশই সরে আসছি, যার প্রকাশ ঘটছে বাংলা ভাষার সাহিত্যের চেয়ে বাংলাদেশের সাহিত্যের ওপর গুরুত্বারোপ করার মধ্যে দিয়ে। বাংলাদেশে অবশ্য বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় সাহিত্যচর্চা এখনও তেমন নেই বললেই চলে; যদিও আমরা আশাবাদী, উপনিবেশিক শাসনের জের টানা ইংরেজি ভাষায়ই শুধু নয়, এ দেশে প্রচলিত অন্য সব ভাষায়ও এখানে সাহিত্য রচিত হবে। তবে আমার মনে হয়, এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, ‘বাংলাদেশের সাহিত্য’ নিয়ে যারা খুবই ভাবিত, তারা পশ্চিম বঙ্গের বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকেই ঢাকাকে বাংলা ভাষার রাজধানী ভেবে থাকেন। আর এইভাবে বাংলা ভাষাকে আমরা রাজধানী, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক সমিতিগুলোর মতো জোটবদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারি বটে, কিন্তু ভাষাসাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে তা তেমন কোনো সুফল নিয়ে আসে না বা আসবে না। সচেতন পাঠকরা জানেন, পূর্ব বাংলার কৃষকদের নিয়ে প্রধানতম গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসটি বোধকরি ‘গড় শ্রীখণ্ড’; সুদূর জলপাইগুড়িতে বসে লিখলেও অমিয়ভূষণ মজুমদারকে তারা তাই ঠিকই খুঁজে নিয়েছেন। ঠিক তেমনি বাংলা ভাষার সাহিত্যের দিকে তাকিয়ে যদি কেউ লিখে থাকেন, তা হলে কি বাংলাদেশে, কি অ্যান্টার্টিকা, যেখানে বসেই লিখুন না কেন, শত শত বছরের নিঃসঙ্গতা ভেঙে হলেও একদিন তিনি পাঠকের কাছে চলে আসবেন।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close