Home অনুবাদ ইমরে কার্তেজ > নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিককে নিয়ে বিশেষ আয়োজন >> উপন্যাস ও দুটি সাক্ষাৎকারের অনুবাদ >>> অনুবাদ করেছেন রনক জামান ও মাইনুল ইসলাম মানিক

ইমরে কার্তেজ > নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিককে নিয়ে বিশেষ আয়োজন >> উপন্যাস ও দুটি সাক্ষাৎকারের অনুবাদ >>> অনুবাদ করেছেন রনক জামান ও মাইনুল ইসলাম মানিক

প্রকাশঃ March 31, 2018

ইমরে কার্তেজ > নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিককে নিয়ে বিশেষ আয়োজন >> উপন্যাস ও দুটি সাক্ষাৎকারের অনুবাদ >>> অনুবাদ করেছেন রনক জামান ও মাইনুল ইসলাম মানিক
0
0

ইমরে কার্তেজ > নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিককে নিয়ে বিশেষ আয়োজন >> উপন্যাস ও দুটি সাক্ষাৎকারের অনুবাদ >>> অনুবাদ করেছেন রনক জামান ও মাইনুল ইসলাম মানিক

 

উপন্যাস

ফেইটলেসনেস (হলোকাস্ট সিরিজ) >> রনক জামান অনূদিত

 

[সম্পাদকীয় নোট : আজ নোবেল পুরস্কারজয়ী (২০০২) হাঙ্গেরীয় ঔপন্যাসিক ইমরে কার্তেজের (১৯২৯-২০১৬) দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলাদেশে তিনি খুব পরিচিত একজন লেখক নন। কিন্তু তিনি যে উপন্যাসটির জন্য মূলত সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন বলে মনে করা হয়, সেটি একটা বিখ্যাত উপন্যাস, নাম “ফেইটলেসনেস”। ইমরে কার্তেজের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস এটি। ভাগ্যনির্ভর একটা চমৎকার গল্প বলা হয়েছে এই উপন্যাসটিতে। ইংরেজিতে অনূদিত ২৬৭ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের সূচনা অংশটির অনুবাদ তীরন্দাজের পাঠকদের জন্য এখানে প্রকাশ করা হলো, যাতে কিছুটা হলেও তাঁর লেখার স্বাদ পাঠকেরা পেতে পারেন। অনুবাদ করেছেন কৃতী তরুণ কবি-অনুবাদক রনক জামান। তবে বলাই বাহুল্য, এ হবে সমুদ্রের বিশাল জলরাশির একবিন্দু জল মাত্র। সেই সঙ্গে এখানে কার্তেজের দুটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হলো। প্রথম সাক্ষাৎকারটি সম্ভবত তাঁর শেষ সাক্ষাৎকার ছিল। দ্বিতীয়টি প্রকাশিত হয়েছিল প্যারি রিভিউতে। দুটি সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে, কার্তেজ আসলে কী ধরনের লেখক বা ঔপন্যাসিক ছিলেন। সাক্ষাৎকার দুটি অনুবাদ করেছেন যথাক্রমে আরেক কৃতী অনুবাদক-কবি মাইনুল ইসলাম মানিক ও রনক জামান।

আশা করি এই আয়োজনটি তীরন্দাজের পাঠকদের ভালো লাগবে।]

 

ফেইটলেসনেস 

প্রথম অধ্যায়

আজ স্কুলে যাইনি। যাইনি বললে ভুল হবে, গিয়েছিলাম—তবে ক্লাস টিচারের কাছে ছুটি চাইতে। একটা দরখাস্ত এগিয়ে দিলাম স্যারের দিকে, তাতে অজুহাত হিসেবে লেখা ছিল, ‘পারিবারিক কারণ’। বাবা অনুরোধ করেছেন যেন আজকে আমাকে ছুটি দেয়া হয়। স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, কী ধরনের পারিবারিক কারণ? বললাম, বাবাকে ‘শ্রমিক ক্যাম্পে’ ডাকা হয়েছে। এরপর স্যার আর কোনো কথা বাড়াননি। আমাকে ছুটি দিয়ে দিলেন।

বাসায় না গিয়ে প্রথমে আমাদের দোকানে যেতে হলো। বাবা বলেছিলেন আমার জন্য সেখানে তিনি অপেক্ষা করবেন। তাই যত দ্রুত সম্ভব ফিরতে বলেছেন, আমাকে তাঁর দরকার হতে পারে। আসলে, দরকার বলেই আজ স্কুল থেকে ছুটি নিতে বলেছেন তিনি। কিংবা বাড়ি থেকে অনেকদিনের জন্য আলাদা হতে যাচ্ছেন বলে যাবার আগে আমাকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন। কথাটা সরাসরি আমাকে বলেননি, বলেছিলেন আমার মায়ের কাছে। সকালে মাকে ফোন করে কথাগুলো বলছিল বাবা, আমি তখন শুনেছি। আজ বৃহস্পতিবার। মাকে এও বলেছেন, ‘আজ হয়ত জুরিকে আমার সঙ্গে রাখব’। সকালবেলা আমার ঘুম পাচ্ছিল যদিও। গতরাতে রেইড করে ওয়ার্নিং দেয়া হয়েছে যার কারণে ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। ওয়ার্নিং এ কী বলেছে তাও মনে করতে পারছি না।

মায়ের সাথে আমিও কথা বলেছিলাম সামান্য, ঘুমকাতুরে অবস্থায় কী বলেছি তাও মনে নেই। আমার মনে হয় মা আমার উপর সামান্য রেগে আছে। বাবার ব্যাপার নিয়ে একটু রাগারাগি করেছিলাম। তবে বাবার ইচ্ছাটাকেই বিবেচনা করতে হলো। সকালে বাসা থেকে যখন বেরুচ্ছিলাম, আমার সৎমা আমাকে ডেকে কিছু কথা বলল। বলল যে এরকম দুঃসময়ে আমি যেন আচরণ সংযত রাখি, কথামতো চলি। বুঝতে পারছিলাম না এর জবাবে কী বলা যায়, তাই কিছু আর জবাব দেয়া হলো না তাকে। আমার নীরবতাকে সম্ভবত সে ভুল অর্থ দাঁড় করল—তাই আবার কথাগুলো জোর দিয়ে বলল আমাকে। তার কোনো সন্দেহ নেই যে, আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি, পনেরো বছর বয়সী একটা বালক নিশ্চয়ই পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ ঠিক রাখতে পারবে। আমি মাথা নাড়লাম। আমার দিকে হাত বাড়াল সৎমা। ভয় হচ্ছিল, আমাকে সম্ভবত জড়িয়ে ধরবে এবার। পরে হাত নামিয়ে নিল অবশ্য। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুধু। তার ভেজা চোখ লক্ষ করলাম। ব্যাপারটা অস্বস্তিকর।

হেঁটে স্কুলে গেলাম, স্কুল থেকে দোকানে এলাম পায়ে হেঁটে। পরিষ্কার আবহাওয়ার এক সকাল। বসন্তের শুরুর দিক। আমাদের কাঠের দোকানটি কাছেই, রাস্তার পাশে। অফিসঘরে বাবা ও সৎমাকে দেখতে পেলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠে উপরতলায় একপাশে কাঁচে-মোড়া অফিসঘর—একুরিয়ামের মতো দেখতে। তাদের সাথে মিস্টার সুইতো ছিলেন। ভদ্রলোককে আমাদের দোকানে বুককিপার হিসেবে কাজ করতে দেখে এসেছি সেই ছোট থেকে। বাবার অনুপস্থিতিতে তিনিই এখন থেকে আমাদের দোকান দেখাশোনা করবেন। তাই এর মাঝে দোকান থেকে আমাদের আয় থেমে থাকবে না।

হয়ত এ কারণেই সেদিন তাঁকে অন্যান্য দিনের চাইতে অন্যভাবে সালাম দিলাম। এখন থেকে তিনিই দোকানের মালিক প্রায়। যদিও সারাক্ষণ বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করলেন আর আমার সৎমাকে ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করছিলেন। যেন কিছুই বদলায়নি, কিছুই ঘটতে যাচ্ছে না। আমাকে ঢুকতে দেখে প্রতিদিনকার মতো ভরাট গলায় স্বাগতম জানালেন। দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইলাম, প্রথমে বুঝতে পারিনি তারা কী নিয়ে কথা বলছিল। সম্ভবত আমার উপস্থিতি তাদের কথার মাঝে ব্যাঘাত ঘটায়। এরপর তারা আবার নিজেদের মাঝে কথায় ডুবে গেল। তাদের কথা শুনতে পেলাম সামান্য, ‘জিনিসগুলো,’ ‘এটাই সবচেয়ে ভালো জিনিসগুলোর জন্য’ এরকম কয়েকটা খণ্ডবাক্য। বাবা যখন ড্রয়ার থেকে কাপড় পেঁচানো একটা বাক্স বের করলেন, তখন আমার বোধগম্য হলো তারা কী নিয়ে কথা বলছে। বুঝতে পারলাম, বাক্সটিতে অনেক দামী গহনা আছে। মিস্টার সুইতো সেটাকে তাঁর ব্রিফকেসের মধ্যে ঢোকালেন। এরপর কাগজপত্র বের করলেন তিনি জামানতের প্রমাণ হিসেবে। যদিও বাবা বলছিলেন, ‘ছেলেমানুষি করছেন। আমাদের দুজনের মাঝে এসব প্রমাণাদির কোনো প্রয়োজন নেই’। লক্ষ্য করলাম, মিস্টার সুইতো এতে আরো বিনয়ী হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘আমি জানি, বস, আপনি আমাকে কতটা বিশ্বাস করেন। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এরকম কাজের জন্য এটাই সবচেয়ে সঠিক পদ্ধতি,’ সৎমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাই নয় কি, ডিয়ার লেডি?’ সৎমা শুধু মুচকি হেসে তাদের মধ্যেই ব্যাপারটা ছেড়ে দিলেন।

পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে বোরিং লাগছিল। বাবা কাগজে সই করে দিলেন। মিস্টার সুইতোকে বাবা নির্দেশ দিলেন যেন ব্যবসায়িক হিসাব নিকাশ এবং মুনাফা সৎমাকে নিয়মিত বুঝিয়ে দেয়া হয়। মিস্টার সুইতো জানালেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো চিন্তা করবেন না, ম্যাম। আমরা প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রাখব, নিয়মিত হিসাব নিকাশ বুঝিয়ে দেয়া হবে।’ এরপর বাবার সাথে করমর্দন করলেন, সৎমার হাতে চুমু খেয়ে বিনয়ের সাথে জানালেন, ‘এরকম সময় এসব নিয়ে আর ভাবতে হবে না আপনার। আশা করি জলদিই আবার দেখা হবে, বস।’ বাবা মুচকি হেসে বললেন, ‘মিস্টার সুইতো, তাই আশা করি।’ এসময় সৎমা তার হাতব্যাগ খুলে রুমাল বের করে চোখ মুছতে শুরু করল। গলা থেকে অদ্ভুত ঘোঁত ঘোঁত আওয়াজ বেরুচ্ছে। পরিস্থিতিটা সত্যিই অস্বস্তিকর। পুরো দৃশ্যটিও আমার কাছে ধাক্কার মতো ছিল, কারণ অতটা আবেগ আমাকে ছোঁয়নি এ পরিস্থিতি। মিস্টার সুইতো শুধু বললেন, ‘ম্যাম, কাঁদবেন না, প্লিজ!’ এরপর দুজনের সামনে মাথা নুইয়ে বেরিয়ে গেলেন। আমার কাছ থেকে বিদায় নিলেন না। সিঁড়িতে তার পায়ের শব্দ ক্রমশ মিলিয়ে গেল।

আমি ভেতরে ঢুকে বসলাম। বাবা কাগজপত্র সৎমার কাছে তুলে দিলেন। বললেন, ‘অন্য কাজগুলো সেরে ফেলা যাক। আমাদের সব সোনাদানা এই কাগজের সমমূল্যের হয়ে গেল,’ সৎমা একটু চুপ করে রইল। তারপর বাবার কথায় সায় দিয়ে জানালো, জিনিসগুলো তবু নিরাপদে থাকবে। বাবা ব্যবসায়িক একাউন্ট সৎমার নামে করে, সব বুঝিয়ে দেবার কাজগুলোতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, যাতে শ্রমিক ক্যাম্পে থাকাকালে এদিককার ব্যবসা থেমে না থাকে। এর মাঝে বাবা আমার সাথেও দুই একটি কথা বললেন। তারপর আমাকে বসতে বলে দোকানের বইগুলোর কাজে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। এর মাঝে আমি উঠে একগ্লাস পানি খেলাম, একবার প্রস্রাব করতে গেলাম। এরপর স্কুলের টিফিন খুলে খেয়ে নিলাম, আবার পানি খেলাম, হাত ধুয়ে নিলাম। করার মতো আর কোনো কাজ ছিল না, তাই অধৈর্য হয়ে পড়ছিলাম যখন, বাবা এবং সৎমা বললেন, এবার যাওয়া যাক।

ভেবেছিলাম, বাড়িতে যাচ্ছি। কিন্তু না, বাবার হাতে একটা লম্বা ফর্দ। শ্রমিক ক্যাম্পে যা যা লাগবে তার তালিকা। জিনিসগুলো কিনতে আমরা মার্কেটের দিকে এগুতে লাগলাম। দোকানের চাবি সৎমার হাতে তুলে দিলেন বাবা। আপাতত এ চাবিগুলো প্রয়োজন নেই বাবার। সৎমা আবার ব্যাগ খুলতে শুরু করল। আর আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম, এই রে, আবার রুমাল বের করে ঘোঁত ঘোঁত করে কান্না জুড়ে দেবে। কিন্তু না, চাবিগুলো শুধু ঢুকিয়ে রাখল এ দফায়। মার্কেটে যেতে আমার ভালো লাগে, আপন মনে ঘোরাঘুরি করা যায়। কিন্তু এখন তিনজন আমরা, তিনজনেরই বুকে হলুদ তারকা লাগানো। খেয়ালমতো ঘোরাফেরা করবার অনুমতি নেই এখন।

একটা দোকানে ঢুকলাম আমরা। দোকানি বয়স্ক এক লোক, হলদেটে চামড়া, মুখে নকল দাঁত। পাশে তার বয়স্ক স্ত্রীও কাজ করছে। বাবার তালিকা অনুযায়ী সবগুলো জিনিস এনে কাউন্টারে হাজির করল তারা। লক্ষ্য করলাম, বয়স্ক দোকানী তার স্ত্রীকে ‘লাভলি’ বলে সম্বোধন করছে। এই দোকানটা আমি চিনি। বাসার কাছেই। আগে কখনো ভেতরে ঢুকিনি। মূলত খেলার সরঞ্জাম বিক্রি করে থাকে, তবে পাশাপাশি অন্য অনেককিছুই পাওয়া যায়।

দোকানি জিজ্ঞাসা করল, জিনিসগুলো কী কাজে লাগবে আমাদের! সৎমা জানালো, এগুলো শ্রমিক ক্যাম্পে ব্যবহৃত হবে। দোকানি তখন বিনয়ের সাথে আরো কিছু জিনিস এনে দিলেন, জানালেন, ‘যেখানে যাচ্ছেন, ওখানে এগুলো খুব দরকার হবে।’ লক্ষ্ করলাম, তিনি ‘শ্রমিক ক্যাম্প’ শব্দটি এড়িয়ে যাচ্ছেন। এর মাঝে কথা বলতে বলতে সৎমার আবার কান্না পেল। জিজ্ঞাসা করল, দোকানে রুমাল আছে কিনা। দোকানি জানালো, ‘আপনার জন্য, অবশ্যই আছে!’ নিজের বয়স্ক স্ত্রীকে রুমাল নিয়ে আসতে বলল। রুমাল তৎক্ষণাৎ হাজির হলো। আমার সৎমা একটা পেন নাইফ কিনে দিলো বাবাকে। এরপর জিনিসপত্রের দাম চুকিয়ে আমরা শেষমেশ বাড়ির দিকে রওনা হলাম।

বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছুতেই সৎমার মনে পড়ল, কুপন ভাঙিয়ে রুটি আনা হয়নি এখনো। অগত্যা আমাকেই বেকারিতে ছুটতে হলো। বেকারিটা আমাদের বাসা থেকে দূরে নয়। দোকানের ভেতরে যে লোকটি কুপন কেটে রুটি বণ্টন করে, সে আমাকে চেনে। তার সম্পর্কে যতটুকু জানি, ইহুদীদের খুব সম্মান করে সে। আমি সালাম দিলাম। আমার সালাম সে আন্তরিকভাবে নিল। এরপর দাড়িপাল্লায় মেপে রুটির বেশ ভালো অংশটিই আমার হাতে ধরিয়ে দিল।

এক দৌড়ে বাসায় ফিরলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলাম, তখন উপর থেকে এনামেরি ডাকল। একইতলায় থাকি আমরা। ও পাশের ফ্ল্যাটে স্টেইনারদের সাথে থাকে। আমরা প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা একসাথে খেলাধুলা করি, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প করি। কথা প্রসঙ্গে একদিন জানলাম, স্টেইনার দম্পতি সম্পর্কে ওর চাচা-চাচী হয়। ওর বাবা মা’র মধ্যে ডিভোর্স হবে কিছুদিনের মধ্যে, ততদিন বাবা বা মায়ের কাছে না থেকে এখানেই থাকছে সে। আইনগতভাবে সব সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হলে এরপর বাবা কিংবা মায়ের কাছে চলে যাবে। এর আগে ও বোর্ডিং স্কুলে ছিল আমার মতো। ওর বয়সও প্রায় আমার কাছাকাছি, চৌদ্দ। ওর লম্বা ঘাড়, বুকের কাছে হলুদ তারকার পেছনে গোলাকার হয়ে, উঁচু হতে শুরু করেছে বুকটা। সিঁড়িতে পেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, আজ বিকেলবেলা আমরা চারজন মিলে রামি খেলতে আসব কিনা। বাকি দুজন হলো আমাদের উপরতলায় দুই বোন। এনামেরির সাথে ওদের বন্ধুত্ব আছে, তবে আমি শুধু ওদেরকে দূর থেকেই দেখেছি। ছোট বোনটির বয়স এগারো কি বারো হবে, বড়টির বয়স এনামেরির সমান হয়ত। ওদের দুই বোনের সাথে আগে কখনো কথা হয়নি আমার। শুধু কয়েকবার রাস্তায় মুখোমুখি দেখা হয়েছে। বিকেলে খেলতে এলে আজ পরিচিত হওয়া যাবে, ভাবলাম। কিন্তু পরমুহূর্তে বাবার কথা মনে পড়ল। এনামেরিকে জানালাম, আজ খেলতে আসব না, শ্রমিক ক্যাম্পে বাবার ডাক পড়েছে। আজ বাবার সাথে সময় কাটাব।

বাবার দোকান সম্পর্কে এনামেরি জানত। ‘আচ্ছা, ঠিক আছে,’ বলল সে, তারপর এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘তাহলে কালকে?’ আমি বললাম, ‘পরশু,’ অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বললাম, ‘হয়ত।’

বাসায় ঢুকলাম। বাবা আর সৎমা টেবিলের সামনে আগে থেকেই বসে আছে। সৎমা জিজ্ঞাসা করল, আমি ক্ষুধার্ত কিনা। ‘পেটে রাক্ষস দৌড়াচ্ছে,’ কিছু না ভেবেই বলে বসলাম। সৎমা ব্যস্ত ভঙ্গিতে আমার প্লেটে খাবার তুলে দিল। কিন্তু লক্ষ্ করলাম সে কিছু খাচ্ছে না। ব্যাপারটা বাবাও লক্ষ্ করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, খাচ্ছে না কেন! সৎমা জবাব দিল, ‘এই অবস্থায় আমার মুখে খাবার তুলতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’ টের পেলাম, ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। বাবা বললেন, ‘এসময় তুমি খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো না করলে শরীর খারাপ করবে। এখন সুস্থ থাকতে হবে, অনেক দায় দায়িত্ব এখন তোমার উপর। অসুস্থ হলে সামলাবে কী করে?’ নীরবতা নেমে এলো খাবার টেবিলে। একটু পর ঘোঁত ঘোঁত আওয়াজটা শুনতে পেলাম। সৎমা আবার ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করেছে। নাকে, চোখে রুমাল চেপে আছে। পরিস্থিতি আবারও অস্বস্তিকর হয়ে উঠল। কোনদিক না তাকিয়ে খাবারের প্লেটে মনোযোগ দেবার চেষ্টা করলাম। আড়চোখে দেখলাম, বাবা আলতো করে সৎমায়ের হাতটা কাছে টেনে নিচ্ছেন।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর আবার যখন তাকালাম, দেখি তারা পরস্পর হাত ধরে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে; যেভাবে একজন পুরুষ ও মহিলা একে অপরের দিকে তাকায় সচরাচর। যদিও এসব আমি কখনোই পাত্তা দিই না। কিন্তু এইবার পরিস্থিতি আমার জন্য বিব্রতকর মনে হলো। ব্যাপারটা যদিও সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, তবু আমি এসব পছন্দ করি না, জানি না কেন। তবে পরিস্থিতি সহজ হয়ে এলো যখন তারা মিস্টার সুইতো এবং গহনার বাক্সের ব্যাপারে আলাপ জুড়ে দিল। বাবা নিশ্চয়তাসূচক ভঙ্গিতে বললেন, ‘ওগুলো নিরাপদ হাতেই থাকবে।’  বাবা আরো বোঝালেন, পৃথিবীতে কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই। মাকে আরো শক্ত হতে হবে, একা কিভাবে সামলাবে এ সময়টা, তা নিয়ে বাবা চিন্তিত হলেন। আমার সৎমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল যে, এভাবে বলতে নেই, সে একা কোথায়, এখন থেকে আমি ও সৎমা মিলেমিশে সব সামলাতে পারব। আমি সম্মতিসূচক মুচকি হাসলাম। বাবা আমার দিকে স্নেহের দৃষ্টিতে তাকালেন একবার।

আমি খাবার প্লেটটা সামনে ঠেলে দিয়ে বললাম, ‘ক্ষুধা নেই আমার।’ বাবার চোখে মুখে সন্তুষ্টির উজ্জ্বলতা ফুটে উঠল তখন। আমার মাথায় হাত রাখলেন। দীর্ঘদিন আমাদের মাঝে বাবা থাকবেন না—একথা ভাবতেই আমার গলায় একটা ঢোক আটকে এলো। খুব দ্বিধান্বিত আর দিশেহারা মনে হলো নিজেকে। একবার মনে হলো কেঁদেই ফেলব বুঝি। কিন্তু সে সময়টা পেলাম না আমি। মেহমান এসে পড়ল বাসায়।

 

ইমরে কার্তেজের দুটি সাক্ষাৎকার

 

সাক্ষাৎকার-১

 

সর্বশেষ সাক্ষাৎকার >>

“কিন্তু গণতন্ত্রে যা হয়, একটা প্রচলিত বাজার খুঁজে নিতে হয়, যেখানে আগে দেখা হয়, উপন্যাসটি যথেষ্ট আগ্রহ উদ্দীপক বা মনোরঞ্জক কিনা”

রনক জামান অনূদিত

 

ভূমিকা

ইমরে কার্তেজ, দশকের পর দশক ধরে নিজ দেশ হাঙ্গেরিতেই ছিলেন অপরিচিত একজন লেখক। ১৯৭৫ সালে প্রকাশ করেন আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘ফেইটলেস’ যা ২০০২ সাল পর্যন্ত থেকে যায় চোখের আড়ালে। এরপর ২০০২ সালে নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন এই বইটির জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন ইহুদী বালক হিসেবে। এটিই হলোকাস্টের উপর প্রথম হাঙ্গেরীয় বই যাকে সর্বোচ্চ স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানিত করা হয় নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করে। পুরষ্কার গ্রহণের পর সাপ্তাহিক নিউজউইক তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে, যা তাঁর সর্বশেষ সাক্ষাৎকার হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

প্রশ্ন : আপনি বলেছেন, নাৎসি ক্যাম্পে বন্দি থাকাটা আপনার জন্য সৌভাগ্যজনক ছিল। মাফ করবেন, কথাটা আমাকে চমকে দিয়েছে।

কার্তেজ : আমি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আমার অধিকাংশ অভিজ্ঞতা লাভ করি। আনন্দ কী জিনিস তা এখানেই উপলব্ধি করি আমি। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না, অমানুষিক পরিশ্রমের মাঝে দশ মিনিটের বিরতির কী সুখ, বা ক্যাম্পের হাসপাতালের বিছানায় শোবার অনুমতি পাওয়াটা। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি অবস্থান করাটাও একপ্রকার সুখ। স্রেফ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হয়ে ওঠে তখন।

আপনার লেখনি হলোকাস্টকেন্দ্রিক, যাকে আপনি বলছেন পুরো ইউরোপের জন্য এক উত্তরাধিকার।

হলোকাস্ট ছিল ইউরোপীয় ইতিহাসের আমূল পরিবর্তিত একটি ঘটনা, টোটালিটারিয়ান (সর্বগ্রাসী) একনায়কতন্ত্র। ইউরোপের বিংশ শতকের টোটালিটারিনিজম (ফ্যাসিজম ও কম্যুনিজম) একদম নতুন ধরনের মানব-জাতি তৈরি করে ফেলেছে। তারা আমাদেরকে এমনভাবে বাধ্য করত যা আগে কখনো করা হতো না, হয় আপনাকে শিকার হতে হবে, নয়ত নিজেই অপরাধী হতে হবে। আপনি যদি আপনার পরিবারের জন্য একটু বড় আকারের রুটি নিয়েও আসতে চান, তবু অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এই যে বাধ্যবাধকতা, লক্ষ লক্ষ ইউরোপীয়কে আমূল বদলে দিয়েছে।

কিন্তু ইউরোপের টোটালিটারিয়ানিজম তো ১৯৮৯ সালে শেষ হয়েছে?

১৯৮৯ এর পর কেউই স্বীকার করেনি যে তারা এ কাজে সহযোগিতা করেছে। রাতারাতি তারা ভিন্নমতালম্বী হয়ে গেছে। একটি মিথ্যা ঢাকতে গিয়ে আরেকটি মিথ্যা আমদানি করেছে। এটাই মূলত সমস্যা, পূর্ব ইউরোপকে এখনো এর সাথে বোঝাপড়া করতে হচ্ছে।

আপনিই প্রথম হাঙ্গেরীয় যিনি সাহিত্য নোবেল পুরষ্কার জিতেছেন। এইভাবে একজন বীরকে স্বাগতম জানানোটা কিভাবে দেখছেন?

খুবই আশ্চর্যজনক আমার জন্য, কারণ আমি কোনো বীর নই। নিজের লেখালেখিকে সব সময় ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসেবে দেখে এসেছি। দশকের পর দশক ধরে আমার কোনো ভক্ত ছিল না, সমাজের এক কোণে পড়ে ছিলাম।

আপনি বলেছেন, গণতন্ত্রের চাইতে একনায়কতন্ত্রের অধীনে সাহিত্য করাটা বেশি সহজ।

কথাটা মূল অর্থ থেকে কিছুটা সরে গেছে, তবু কিছু সত্যতা আছে এর মাঝে। কারণ কম্যুনিস্ট সরকার যেভাবে চান সেভাবে আমি লিখতে চাইনি। আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি এবং নিজের লেখাটা লিখি। আমি কখনো ভাবিওনি যে আমার লেখা প্রকাশিত হবে। তাই আমার যা খুশি লিখবার স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু গণতন্ত্রে যা হয়, একটা প্রচলিত বাজার খুঁজে নিতে হয়, যেখানে আগে দেখা হয়, উপন্যাসটি যথেষ্ট আগ্রহ উদ্দীপক বা মনোরঞ্জক কিনা। এই ব্যাপারটা এক কঠিনতম সেন্সরশীপ বলতে পারেন।

 

সাক্ষাৎকার-২

আমি আমার চরমতম দুঃসময়ে আত্মহত্যা করতে চাইনি, কিন্তু তখন আমি বড় লেখকও হতে চাইনি”

মাইনুল ইসলাম মানিক অনূদিত

 

ভূমিকা

হাঙ্গেরির ঔপন্যাসিক ইমরে কার্তেজ । তিনি ১৯২৯ সালে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে জন্মগ্রহণ করেন। নাৎসিবাহিনী কর্তৃক মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী হন। বন্দী জীবনে যে নির্মমতা তিনি প্রত্যক্ষ করেন, তাঁর উপন্যাসগুলো তার-ই প্রতিভাষ্য। লিখেছেন ফেটলেসনেস, ফিয়াস্কো, কদ্দিশ ফর আনবর্ন চাইল্ড, লিকুইডেশন, দসিয়ের কে-র মতো অসাধারণ ও নন্দিত উপন্যাস। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ২০০২ সালে। দীর্ঘ সময় ধরে জটিল পারকিনসন্সে আক্রান্ত কার্তেজ  ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ এই পৃথিবী ছেড়ে যান। প্যারি রিভিউর এক সাক্ষাৎকারে জানা যায় তাঁর শৈশব হতে লেখক হয়ে ওঠার গল্প, লেখালেখি নিয়ে তাঁর অভিমত এবং জানা-অজানা আরো অনেক তথ্য। কান টোগে নামে কার্তেজের এক দোভাষী বন্ধুর সহযোগিতায় সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন লুইসা জিলিনস্কি। সাক্ষাৎকারটি বাংলায় ভাষান্তর করেছেন মাইনুল ইসলাম মানিক

 

সাহিত্যে আপনার শুরুটা হয়েছিল কী দিয়ে, মানে কীভাবে লেখালেখি শুরু করলেন? আপনার পরিবারের কেউ কি লেখালেখি করতেন?

আমার পরিবারের কেউ লিখতেন না। আর আমার সত্যিকারের শুরুটাও সেখানে হয়নি। মনে পড়ে যখন আমার বয়স সাত কী আট, আমার সবকিছুতে কিছুটা তালগোল পাকিয়ে যেত। আমাকে একবার পরিবার থেকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমি কী উপহার চাই। আমি কিছু না বুঝেই প্রত্যুত্তর করেছিলাম, আমার একটি সাময়িকী চাই। আমাকে একটা চমৎকার সাময়িকী দেয়া হয়েছিল। সাময়িকীটি এতই চমৎকার ছিল যে, আমি সেটা নষ্ট করতে চাইনি। তারপর সময় এগুতে থাকে, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমি লিখতে চেষ্টা করি।  অনেকটা বিরক্তিকর মনে হলেও আমি সব লেখা কাগজে লিখে শেষ করি। যা-কিছু কাগজে লেখা হতো, সেগুলোকে আরো মানসম্মত করার জন্য বার বার চেষ্টা করতাম। আমি মনে করি, একজন মানুষ তার লেখা বার বার সংশোধনের মধ্য দিয়েই লেখক হয়ে ওঠে। আর এভাবে যেতে যেতেই আচমকা উপলব্ধি করি, আমি বাস্তবিক অর্থেই একজন লেখক হয়ে উঠেছি।

 

লেখক হয়ে ওঠার এই উপলব্ধি আপনার প্রথম কখন হয়েছিল, মানে আপনি কখন লেখক হয়ে ওঠার বিষয়টি অনুভব করেছিলেন?

তখন আমার বয়স চব্বিশ বছর। রাস্তাঘাটে বা অন্য কোথাও যখনই আমাকে কোনো বিষয় তাড়িত করত, আমি সাথে সাথে তা লিখে রাখতাম। আর এভাবে আমি বহুবারই লিখেছিলাম।

 

এটা কি সে সময়টা যখন আপনি ‘দ্য ইউনিয়ন জ্যাক’ লিখেছেন?

হ্যাঁ, এটা সে সময়েরই অনুভূতি। ‘ফিয়াস্কো’ লেখার সময়েও এই অনুভূতি হয়েছিল। কিন্তু সিরিয়াস অর্থে লেখালেখি শুরু করার ক্ষেত্রে এটা তেমন কোনো বোধ তৈরি করেনি। কারণ একজন লেখক হওয়ার মতো অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আমার ছিল না। এমনকি আমার একটা কলম পর্যন্ত ছিল না।

 

তাহলে ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কোন জিনিসটি আপনাকে লেখালেখির জীবনে নিয়ে আসে?

এ বিষয়টি নিয়ে বলতে চাইলে আমি আমার সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারি, এমনকি অসংখ্য বইও লিখতে পারি। কিন্তু এই গল্পগুলোর মধ্যে আমরা আমাদের নিজেদের হারিয়ে ফেলি। প্রকৃতপক্ষে, আমরা লেখকরা কাউকে এ গল্পগুলো বলা উচিৎ নয়। আমাদের কাজ করে যাওয়া উচিৎ নিরবে, নিভৃতে। এর কারণ হচ্ছে আমরা লেখকরা এই গল্পগুলোর উপর ভিত্তি করেই একটি নিজস্ব পথ উপলব্ধি করি। এই অন্তরালের গল্প সংক্রান্ত লেখালেখিই আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। গল্পগুলোর একটি অস্তিত্বগত মাত্রা আছে এবং তা সকল লেখকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। প্রত্যেক শিল্পীরই একটি মুহূর্ত থাকে জাগরণের, কোনো একটি ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার, যা আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে, আপনি একজন চিত্রকর নাকি লেখক তা বিবেচ্য বিষয় নয়। আমার জীবনের পরিবর্তনটা পেশাদারিত্বে নয়, এটা ছিল গভীর জাগরণের মধ্য দিয়ে।

আমি আউশভিতজে একবছর অন্তরীণ ছিলাম। ফেরার সময় কয়েকটা হাস্যরসধর্মী গল্প ছাড়া আর কিছুই সঙ্গে নিয়ে আসতে পারিনি। আমার এই দীনতা আমাকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল। তাছাড়া আমি বুঝতেও পারতাম না এই আনকোরা অভিজ্ঞতা দিয়ে কী করা যেতে পারে। কারণ এই অভিজ্ঞতায় না সাহিত্যের জাগরণ ছিল,  না পেশাদারিত্বের ছোঁয়া ছিল, না ছিল শৈল্পিক অন্তরদৃষ্টি। আমি যা চাচ্ছিলাম সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা ছিল না। তাই আমার গল্পগুলো বের করে আনাটাই একটা সংগ্রাম ছিল। লেখালেখি তখনও আমার পেশা হয়ে ওঠেনি। তাই অন্তরালের গল্পগুলোর পাশাপাশি আমি লেখালেখির নিয়মকানুনের ক্ষেত্রেও নিজেকে যথেষ্ট সময় দিয়েছিলাম।

 

আপনার প্রথম উপন্যাসটি লিখতে তেরো বছর সময় নিয়েছিলেন

হ্যাঁ, এটা সত্য। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমি প্রতিদিনই এজন্যে কঠিন পরিশ্রম করেছি। অবশ্য আমি কখনো আমার উপন্যাস হতে দূরে ছিলাম না। ঐ দিনগুলোতে আমার জীবন ছিল দুঃসহ।  কমিউনিস্টদের শাসনের বছরগুলোতে আমাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল। তাছাড়া আমি যা জানতে চেয়েছিলাম, তা জানতে আমার অনেক সময় লেগেছিল, সময় লেগেছিল উপন্যাসের প্রথম বাক্যটি লিখতেও।

কিন্তু আমি প্রথম থেকেই জানতাম, আমি একটি উপন্যাস লিখতে চাচ্ছি। আমি জানতাম আমি শব্দের নৈপুণ্য আনতে চাচ্ছি। আমার বসবাস ছিল এক সর্বগ্রাসী প্রক্রিয়ার মধ্যে যা আমাকে অন্য সকল কিছুর চাইতে লেখালেখির প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। ঐ সময়ের বাস্তবতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

 

ফেটলেসনেস’ উপন্যাসটি ষাট সত্তরের দশকের মাঝামাঝি লেখাএটি গণহত্যা সম্পর্কিতকোন ঐতিহাসিক ঘটনাটি উপন্যাসটিকে জীবনঘনিষ্ট হতে প্রভাবিত করেছে?

হ্যাঁ, আমি সম্পূর্ণ উপন্যাসটি কম্যুনিস্ট শাসনকালে লিখেছি। শুরুতে আমার কোনো ধারণা ছিল না এটি কোন বিষয়ে লিখব। আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল একটি নিজস্ব ভাষা ও ধারা তৈরি করা এবং পরিশেষে একটি বিষয়বস্তু বিনির্মাণ। আমি কিছু বিশেষ বিষয়-আশয় পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলাম। আমি পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলাম  শৈল্পিক প্রক্রিয়ায় জীবনঘনিষ্ট অভিজ্ঞতাকে। আমার কাছে মোটেও স্পষ্ট ছিল না কিভাবে আমি সে রচনাশৈলীর মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে পারি। আমি দৈনন্দিনের ভাষা বিনির্মাণ করতে চাইলাম। প্রাত্যহিক এই ভাষা ছিল শক্তিশালী এবং সংক্ষিপ্তও। আমি বিষয়বস্তুর চারপাশে অনর্থক মেদ বাড়াতে চাইনি। আর যাই হোক আমি এটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি, যারা সর্বগ্রাসী সময়ের মধ্যে বাস করে গেছেন, সফল ও মর্যাদাবান লেখক হওয়াটা তাদের জন্যে কঠিন ছিল।

 

সেইসব দিনগুলোতে জীবিকার জন্যে আপনি কী করেছিলেন?

এক বন্ধু আমাকে ক্ষুদ্র গীতিনাট্য লিখতে বলেছিল। আর আমি তা-ই করেছিলাম। সে ছিল বড় মাপের সফল  লেখক। কিন্তু তার দৃষ্টান্ত অনুসরণের কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না। বন্ধুটি আমার এই অনীহার ব্যাপারটি লক্ষ্য করেছিল। আমার সে দিনগুলোর অবস্থা বুঝতে হলে আপনার একটি বিষয় অনুধাবন করা দরকার, আমি ২৮ বর্গমিটারের একটি ফ্ল্যাটে সস্ত্রীক  বসবাস করতাম। আমাদের জীবনটা কতটা কষ্টকর ছিল তা এই বন্ধুটি দেখতে পেত। একদিন আমাকে সে জিজ্ঞেস করল, আমি অনাহারে মারা যেতে চাই কী না। অবশ্যই আমি তা চাইনি। সুতরাং সে আমাকে গীতিনাট্য লিখতে পরামর্শ দিল। আমি গীতিনাট্যের বিষয়ে তেমন কিছু জানতাম না। তবে সংলাপ লিখতে জানতাম। তাই আমরা পরস্পর একসাথে চিত্রনাট্য তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি তার নির্দেশনায় সংলাপ লিখতাম। আমি তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতাম কারণ একাজে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না আমার। আমি ভাগ্যবান যে, রচনাশৈলীর ক্ষেত্রে আমি নির্ভার ছিলাম। সেজন্যে আমার উপর প্রদত্ত কাজ সহজেই সম্পন্ন করতে পারতাম। অপরদিকে, আমার সে বন্ধুটি ছিল স্বীয় প্রবৃত্তির দাস।

 

আপনিতো সেই সময়টাতে ‘ফেটলেসনেস’ লিখছিলেনবিপরীতধর্মী দুটি সৃষ্টিকর্মের সমন্বয় ঘটালেন কীভাবে?

আমি বন্ধুর বাসায় সন্ধ্যা কাটাতাম, গীতিনাট্য নিয়ে কথা বলতাম এবং বিষয়বস্তুর চরিত্র নিয়েও। কিন্তু হঠাৎ আমি আমার উপন্যাস নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। সেই দিনগুলোতে প্রায়ই একটা বাক্য আমার কাছে ধরা দিত। আমি এই বাক্যটি সম্পর্কে বলতে সমর্থ ছিলাম না। আসলে কেউই মনের কোণে ধরা দেওয়া এসব বাক্য খুব একটা সহজে বলতে সমর্থ নয়। আমার মনের কোণে ধরা দেয়া বাক্যটি সেখানেই অনড় থাকতো। বাক্যটি অনেকটা এ ধরনের, ‘আমি গাজরের চেয়ে শালগম বেশি পছন্দ করি।’ আমি বাক্যটি ঠিকভাবে বাইরে প্রকাশ করতে পারিনি। কিন্তু আমার মধ্যে একটি বিষয়ের অবতারণা হয়েছিল যে, এটাই আমার উপন্যাস রচনার প্রক্রিয়া হতে যাচ্ছে। অনুল্লেখযোগ্য এই একটি লাইনই সম্ভবত এই উপন্যাসটির মৌলিক বিষয়গুলোকে আলোকিত করে, এমনকি আমার নিজস্ব ভাষাশৈলী তৈরিতেও। এটি একটি মজার বিষয় যে, একটিমাত্র বাক্যও সকল কর্মযজ্ঞসহ আপনাকে জীবনের কাছে টেনে আনতে পারে।

আমার কাছে তিনটি বিষয় বিবেচ্য ছিল- ভাষা, শৈলী ও বিষয়বস্তু। এই তিনটি বিষয়ই আমাকে আলোকিত হওয়ার শক্তি যুগিয়েছে। আমি অবগত ছিলাম, আমি এমন একটি উপন্যাস শুরু করতে যাচ্ছি যা সহজেই কান্নার উদ্রেক করতে পারে। এটি শুধু এই কারণেই নয় যে, একটি বালক উপন্যাসের নায়ক চরিত্রে ছিল। এর পেছনের মূল কারণ ছিল, আমি বালকটিকে অবিকল আবিষ্কার করেছি। মূলত স্বৈরশাসনে মানুষকে শিশুসুলভ অজ্ঞতা ও অন্ধকারের জগতে রাখা হয়। তাই মানুষকে চূড়ান্ত রকমের নাড়া দেয়ার জন্যে আমাকে শুধুমাত্র বিশেষ রীতি ও শৈলীই তৈরি করতে হয়নি, এমনকি সময়গতির প্রতিও নিবিড় মনোযোগ দিতে হয়েছে।

 

আপনার নোবেল বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘প্রতিদিন সকালে আমি যে ঘৃণা আর হতাশা নিয়ে জেগে উঠি তা আমাকে তাড়িত করে নিয়ে যায় আমি যা বর্ণনা করতে চাই সে জগতে।’ লেখালেখি কি আপনার সে অবস্থাকে প্রশমিত করতে সমর্থ হয়?

 

আমাকে এমন একটা পৃথিবীতে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল যা আমার কাছে ছিল একেবারেই অচেনা এক ভীনদেশ, যেখানে আমার প্রতিটি দিনই শুরু হতো অসম্ভব রকমের হতাশা নিয়ে যা থেকে মুক্তির কোনো উপায় ছিল না। এই দমবন্ধ পরিস্থিতি স্টালিনের হাঙ্গেরির জন্যে যতটা সত্য ছিল তারও চেয়ে বেশি সত্য ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিকদের অধীনে। নাৎসিরা সবকিছু গলাধঃকরণ করেছিল। সার্বিক পরিস্থিতিটা এতটাই যান্ত্রিক হয়ে উঠেছিল যে, লোকজন যেসব ঘটনার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছিল সেসবও তাদের বুঝে ওঠার সুযোগ ছিল না।

সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে আমার এই সময়ের সাহিত্যে তিনটি ধাপ লক্ষ করা যাবে। প্রথম ধাপটি, গীতিনাট্য শুরুর আগে। এইসময়টুকু ছিল দুঃসহ কিন্তু এই সময়টুকু যে-কেউ যেনতেনভাবে কাটিয়ে দিতে পারবেন। দ্বিতীয় ধাপটি হচ্ছে প্রিমো লেভি’র মতো লেখকগণের বর্ণনাকালীন সময়। এই সময়টা হলো ঘটনাসমূহের মাঝামাঝি কাল। এই সময়টা এমন ছিল যেন ভেতর থেকে সবকিছু প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল ঘটনার সকল বিস্ময়কর আর আতঙ্কজনক সাক্ষ্য নিয়ে।  লেভির মতো লেখকরা এমন কিছু বর্ণনা করতেন, যা যে-কোন মানুষকে উন্মাদনার পথে ধাবিত করত, বিশেষত যারা প্রাচীন মূল্যবোধ ধারণ করে। তৃতীয় ধাপটি ছিল জাতীয় সমাজবাদের পতন পরবর্তীতে স্বরূপ লাভ করা সাহিত্যকর্মের সাথে সংশ্লিষ্টতা, যা মূলত পর্যবেক্ষণ করেছিল প্রাচীন মূল্যবোধকে। যাই হোক, সেসব সৃষ্টিকর্ম আমাদের কাছে সাহিত্যের মৌলিক ঐতিহ্যের দলিল হয়ে আছে।

 

আপনি কি আপনার নিজের সাহিত্যকর্মগুলোকে এই মৌলিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন?

হ্যাঁ, আমি সেরকমই বিবেচনা করি। তাছাড়া আমি নিশ্চিত নই, আমার লেখা নাকি আমার অসুস্থতা আমাকে হত্যা করতে যাচ্ছে। হ্যাঁ, আমার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব, অন্তত ততটুকু করতে চেষ্টা করেছি। সুতরাং ইতিহাসের সান্নিধ্যে আসার ব্যাপারে আমি বিবেচনার বাইরে নই, বিস্মৃত বা মৃত নই। বাস্তবতা হচ্ছে, ইতিহাসে মৃত না হলেও আমি মারাত্মক ধরণের পারকিনসন্সে মৃতপ্রায়।

 

লেখালেখি কি কারো বেঁচে থাকার জন্যে যথার্থ অর্থপূর্ণ হতে পারে?

একটি সর্বগ্রাসী নিষ্ঠুরতার মধ্যেও মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকতে পারে তা নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আমি আমার নিজের জীবনকে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছি। আমি আমার চরমতম দুঃসময়ে আত্মহত্যা করতে চাইনি, কিন্তু তখন আমি বড় লেখকও হতে চাইনি। লেখক হওয়ার ভাবনাটিকে আমি দীর্ঘসময় ধরে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। কিন্তু তারপর একটা সময়ে এসে আমি উপলব্ধি করলাম, আমাকে লিখতে হবে; লিখতে হবে বিস্ময়কর আর হতাশাজনক বিষয়আশয় নিয়ে।

 

লেখালেখির প্রতি কি লেখকের একটা দায়বদ্ধতা  থাকে ?

কারো কারো থাকে না।

 

আপনার থাকে?

১৯৫৪‘তে যখন আমি প্রথম উপলব্ধি করলাম এক ভয়ঙ্কর পৃথিবীতে আমার বসবাস, আমি খুব হতবাকই হয়েছিলাম। এ ধরনের পৃথিবীতে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। আমি বেঁচে থাকলেও আমার কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি, সুরক্ষিত থাকেনি। কিছু চুটকি, কিছু মজার গল্প, আর কৌতুক ছাড়া। আমি বিমোহিত হলাম যখন আমি প্রথম অনুভব করলাম, আমার হাতে অসাধারণ কিছু বিষয় আছে যা দিয়ে আমি কাজ শুরু করতে পারি। সুতরাং আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। আমাকে ভাবতে হয়েছিল, আমি  নিজেকে এমন ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করব কী না যে স্বৈরতন্ত্র ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করেছে; নাকি আমি  আমার জীবন থেকে এই ঘটনাগুলোকে উপড়ে ফেলব। যদি আমি মানুষের সাথে কথোপকথনের প্রয়োজনে সেই মুহূর্তগুলোকে আটকে রাখতে না পারতাম, তবে এই গল্পগুলোকে আমি ভুলে যেতাম। আমার সেসব দিনের গল্পগুলো হারিয়ে যেত যখন  আমি দুর্ভাগ্যের শিকার ছিলাম এবং আউশভিতজেতে নির্বাসিত ছিলাম। কেউ কেউ আমাকে সাহায্য করেছিল, কেউ কেউ করেনি। আমাকে রাখা হল টুকিটাকি সবকিছুর সাথে যা আবর্জনার ঝুড়ির জন্য প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু সেসব আবর্জনা ছিল না। আমি আমার নিজের জীবনকে এই গল্পগুলো লেখার নিমিত্তে নিবেদন করেছি। আমার অভিজ্ঞতার মূল্যে আমি লেখালেখিতে প্রবেশ করেছি। আমি যে-কোন উপায়ে সেই সত্যকে গল্প বলার ছলে তুলে আনতে চেয়েছি, যে-সত্য বলা যায় না।

 

সেইসব দিনে আপনি কি পাঠকের চেয়েও বেশিকিছু ছিলেন?

আমি সক্রিয়ভাবে বিশ্বসাহিত্যে মগ্ন ছিলাম। হ্যাঁ, আমি স্কুলে থাকাকালেই ধ্রুপদী সাহিত্য পড়েছি কিন্তু লাইব্রেরিতে ঐ বইগুলো পাওয়া কঠিন ছিল। পরবর্তীতে হাঙ্গেরিয়ান সরকার এই জাতীয় বই প্রকাশের মাধ্যমে নিজেদের  বৈধতা অর্জনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তাতে আধুনিক গল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সুতরাং আমার জগৎ আমার নিজেকেই তৈরি করতে হয়েছে। আমি বছরের পর বছর সময় ব্যয় করেছি আমার প্রথম উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায়ে যা আমি বলে বোঝাতে পারব না। কেউ কখনো সবটুকু বলতে সক্ষম হয় না।

 

এটা সত্য, আপনি বলে বোঝাতে  পারবেন না- কিন্তু এই গল্পগুলো পড়লে মনে হয় যেন এটা আর অন্য কোনোভাবে লেখা অসম্ভব ছিল

আমি এজন্যে আনন্দিত। আমার মনে পড়ে জার্মানিতে যখন ‘ফেটলেসনেস’ প্রকাশিত হয়েছিল, আমি ব্যাগভর্তি চিঠি পেতাম। সেসব চিঠিতেও বেশকিছু উল্লেখযোগ্য উপকরণ ছিল, যেগুলো আমি পরবর্তীতে গীতিনাট্যের ভাষায় সংযোজন করেছি। যেমন ধরুন, একজন পাঠক আমাকে লিখল, আমি তার একটা জানালা খুলে দিয়েছি। আসলে, আমি সেসব পাঠকের চোখ খুলে দিয়েছি; অথচ তাদের বাবা ও মায়েরা এক্ষেত্রে নির্বিকার ছিলেন। তারা কথা বলতে অস্বীকার করতেন কারণ তারা ইতিহাসের মুখোমুখি হতে চাইতেন না। আর সেটা  নিশ্চিতভাবে কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু এই কাজটা তাদের করা উচিত।

 

 আপনার ছোট কক্ষটিতে কোন জিনিসগুলো আপনার জন্যে আনন্দ কিংবা  চিত্তবিনোদনের বিষয় হয়ে আসে?

সেগুলো খুবই একান্ত কিছু গল্প যা আমি বলতে পছন্দ করি না। আমি তেমন কিছু করি না।  গীতিনাট্য লিখি।

 

আর সেটা আপনাকে আনন্দ দেয়?

না।

 

এছাড়া আর কী করেন?

শুধু লেখালেখি। আমি জানি এটা একটা ভালো প্রশ্ন- কী আমাকে আনন্দ দেয়। আর যদি আমার উত্তর হয় ‘শুধু লেখালেখি’ তখন অবশ্যই এই উত্তরটি সত্য হবে না যেহেতু আমার কাজই লেখালেখি করা। যখনই আমি লিখতে বসতাম, দুর্ভাগ্যের মতো বাজে রকমের কিছু একটা অনুভূত হতে। এই অনুভূতিটা আমাকে সহ্য করতে হতো। লেখালেখিতে আমার একমাত্র আনন্দই হচ্ছে অতীত-দর্শন। একবার স্টুটগার্টে একটি পঠন অনুষ্ঠান শেষে এক ভদ্রমহিলার সাথে রাতের খাবার খেয়েছিলাম। যে দুঃসহ অতীত আমাকে অতিক্রম করতে হয়েছিল তার জন্যে তিনি আমার প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছিলেন। স্টুটগার্টের ঐ মুহূর্তটি ছিল আমার প্রথম উপন্যাস লেখার ত্রিশ বছর পরের ঘটনা। তখন আমি অনুভব করেছিলাম, ঐ দিনগুলোতে আমি ভীষণ সুখী ছিলাম।

 

আপনার উপন্যাস লেখাকালীন সময়ের কথা বলছেন?

অবশ্যই, আমি দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আমার এক একটি কাজ শেষ করতে সমর্থ হয়েছি। আর ঘটনাচক্রে স্টুটগার্টের ঐ ভদ্রমহিলা খুব দারুণভাবে সহমর্মী হয়ে উঠেছিলেন। তার শব্দগুলো আমার কাছে সাফল্যের একটি তকমা ছিল। আমি অনুধাবন করতে পেরেছিলাম, আমি একটি জীবনমুখী কাজ করতে সফল হয়েছি। আমি যতটা উপলব্ধি করতে পারি, এটা আমার জীবনে এক সীমাহীন সুখময় মুহূর্ত।

 

আপনি কি ফেটলেসনেস, ফিয়াস্কো, কদ্দিস ফর আনবর্ন চাইল্ড লিকুইডিয়ান’কে আপনার জীবনের সেরা চারটি কাজ মনে করেন?

না, এটি একজন হাঙ্গেরিয়ান মূক সাংবাদিকের কাজ যে টেট্রালজির এই ধারণা নিয়ে এসেছিল। এর আগে যখন শুধু আমার ফেটলেসনেস, ফিয়াস্কো ও কদ্দিস ফর আনবর্ন চাইল্ড প্রকাশিত হয়েছিল, সে বলেছিল, আমি ট্রিলজির কৃতিত্ব অর্জন করেছি।  সে আসলে আমার কাজ সম্পর্কে কিছুই জানতো না।

 

আপনি ‘দসিয়ের’-বলেছেন, আপনার স্থান ইতিহাসে নয়, আপনার ডেস্কে

আমি ডেস্কে খুব কমই লিখেছি। কিন্তু ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা না বলাই ভালো।

 

আচ্ছা,  ডেস্কের রঙ নিশ্চয়ই কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়

তা অবশ্য  ঠিক, আমার ডেস্ক হলদেটে ছিল।

 

সেই দিনগুলোতে আপনি কিভাবে লিখতেন?

এটি একটি কৌশলগত ব্যাপার। আমি দীর্ঘসময় ধরে কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারতাম না। না, আমি হাতেও লিখতে পারতাম। কিন্তু আমি সব উপকরণই হাতের কাছে পেয়ে যেতাম। আর সেসব আমি আমার সারা জীবনভর অর্জন করেছি। যেমন ধরুন, আমার ডায়েরি, আমার রিপোর্টগুলো আর লিকুইডেশন। যা কিছু গল্প  গোছানো ছিল, আমাকে তার বেশিকিছু নতুন করে লিখতে হয়নি। আমি শুধু আমার কাজ যথাযথভাবে শেষ করেছি।

 

আপনার শেষ উপন্যাস ‘লিকুইডেশন’ সম্পর্কে বলুনউপন্যাসটি লেখার ক্ষেত্রে কোন জিনিসটি প্রাথমিকভাবে আপনাকে প্রেরণা দিয়েছিল?

আমি মূলত একটি নাটক লিখতে চেয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, উপন্যাসতো লিখেছি। আমি মূলত ১৯৯০ সাল পরিবর্তী শাসনকাল সম্পর্কে লিখতে চেয়েছি। এই সময়টা আমার কাছে নাটকীয় বলে অনুভূত হয়েছিল। তারপর এটা আমাকে এতই তাড়িত করে যে, আমি বিভ্রমে পড়ে যাই। কারণ আমি না একজন নাট্যকার ছিলাম, না মঞ্চের ব্যাপারে আমার বিশেষ কোনো  আগ্রহ ছিল। মঞ্চ আমার কাছে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা আর কিছুই ছিল না। তাছাড়া এখানে একটা সৃষ্টির প্রতিকূল পরিবেশও ছিল। এ জন্যে আমি এই উপলব্ধি থেকে নাটকের পাণ্ডুলিপি তুলে রাখলাম এই কারণে যে, এটি একটি সেরা উপন্যাসের ছোট প্রতিকৃতি হয়ে উঠেছে মাত্র।

 

ফুকোয়ামা’র ‘এন্ড অব দ্য হিস্ট্রি’ সম্ভবত গতানুগতিক ধারার কিছু একটা হয়ে উঠেছিলকিন্তু আমি ভেবে অবাক হই  ‘লিকুইডেশন’ লেখার সময় এই বিষয়টি আপনার মনে ছিল কি?

আমি এভাবে কখনো ভাবিনি। আপনি হলে এ উপন্যাসটির ক্ষেত্রে কী করতেন?

 

আমার কাছে মনে হয় আপনার উপন্যাসটিতে ‘এন্ড অব দ্য হিস্ট্রি ’অনুরূপ কিছু একটা আছেএটি লেখা হয়েছিল ২০০০ সালের প্রথম দিকের কোনো এক সময়ে, কিন্তু তা ৯০’কম্যুনিজমের সময়কে ধরে রাখে।  বিশশতকের ইতিহাসের জন্যে এটি এমন একটি মুহূর্ত যা সমকালের নানান বিষয়কে ধারণ করেছে, নাড়া দিয়েছে এবং একটি স্বচ্ছ সন্ধিক্ষণ বিনির্মাণ করেছে; আর সম্ভবত তা ‘লিকুইডেশন’ ভালোভাবেই উপস্থাপন করতে পেরেছে

আসলে আপনার কথার সবটাই সঠিক। এটা অনেকটা সেরকমই। ‘লিকুইডেশন’-এ আমরা এমন একজন ব্যক্তিকে পেয়েছি যিনি আউশভিতজেতে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তারপর জুডিথে কোনো এক নারী তার মধ্য দিয়ে আউশভিতজ প্রত্যক্ষ করেছেন। আর এই প্রত্যক্ষণের মধ্য দিয়ে চেষ্টা করেছেন তার নিজের ইতিহাস সম্পন্ন করতে। এরপর ঐ নারী  সেই পৃথিবী থেকে পালিয়ে যান এবং এমন একজনকে বিয়ে করেন স্বৈরতন্ত্র যাকে কখনো স্পর্শ করেনি। একটা সময়ে এসে তিনি সন্তানলাভের ইচ্ছা পোষণ করলেন। আর এভাবেই জীবনের প্রতি আজ্ঞাবহ হলেন। এটা ছিল গোপন কিছু, একটি ইঙ্গিত। মূলত সন্তান ধারণ করা চলমান জীবনের সম্ভাব্যতার ইঙ্গিত। জীবন ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে কেউ জীবনকেই বেছে নেয়। ঠিক আছে, এ পর্যন্তই থাক। এটাই আমার শেষ সাক্ষাৎকার।

আজকের জন্যে?

চিরতরে। এখন এটা শেষ হোক।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close