Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ ইরানের নারী লেখক এবং নারীবাদী গল্প > প্রবন্ধ >> ফজল হাসান

ইরানের নারী লেখক এবং নারীবাদী গল্প > প্রবন্ধ >> ফজল হাসান

প্রকাশঃ June 26, 2017

ইরানের নারী লেখক এবং নারীবাদী গল্প > প্রবন্ধ >> ফজল হাসান
0
0

ইরানের নারী লেখক এবং নারীবাদী গল্প 

এক. সূচনা

ইরানি লেখিকাদের নারীবাদী সাহিত্যের, বিশেষ করে ছোটগল্পের, উৎস থেকে উত্তরণ এবং তাঁদের সাহিত্য কর্মের পরিচয় তুলে ধরার আগে ইরানের নারী-জাগরণ বা নারীবাদ প্রসঙ্গে সামান্য আলোকপাত করা প্রয়োজন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীন পারস্যে (বর্তমানে ইরান) নারীর অধিকারের সূত্রপাত হয়েছিল আড়াই হাজার বছরেরও আগে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। তখন মানুষের ধর্ম ছিল জরোথ্রুসীয়, অর্থাৎ অগ্নি উপাসনা। সেই প্রাচীন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ইসলাম কিংবা নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের পক্ষে জোরালো সংগ্রাম বা আন্দোলনের কোন সুযোগ ছিল না। স্বাভাবিক কারণেই তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক মঞ্চে নারীরা নেত্রী ছিল, এমনকি নেতৃত্ব দিয়েছে সামরিক বাহিনীতে। এছাড়া তখন নারী-পুরুষের বেতনের মধ্যে কোন ফারাক ছিল না। কিন্তু পরবর্তী চৌদ্দ শ’ বছরে ক্রমশ সেই ধারা বদলে যেতে থাকে। বলা বাহুল্য, সপ্তম শতাব্দীতে আরববিশ্বে পরিবর্তনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল। তখন মুসলমানদের আগমনে ইরানে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটেছিল এবং ইসলামের বিধি-নিষেধের জন্য নারীর অধিকার লংঘিত হয়েছিল। পরবর্তীতে এই ধারা প্রায় বারো শ’ বছর চলে। সেই দীর্ঘ সময়ে ইরানে একাধিকবার নারী-জাগরণের প্রচেষ্টা হয়েছিল।

অনেক চড়াই-উৎরাই পেরোনোর পরে অবশেষে ১৯২৫ সালে রেজা শাহ্ পাহলভীর ক্ষমতা দখল করে এবং তখন থেকেই ইরানে নারী-পুরুষের বৈষম্যের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। রেজা শাহ্ পাহলভী এবং তার ছেলে মোহাম্মদ রেজা পাহলভী চুয়ান্ন বছরের (১৯২৫-১৯৭৯) শাসনামলে নারীর স্বাধীনতা এবং সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এগুলোর মধ্যে পশ্চিমা শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা, আধুনিক পোশাক-পরিচ্ছদ এবং মেয়েদের নূন্যতম বিয়ের বয়স (তের বছর বয়স থেকে বাড়িয়ে আঠারো বছর) নির্ধারণ করা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। অবশ্য আইন করে ১৯৩৫ সালে অস্থায়ীভাবে মহিলাদের পর্দা করার নিয়ম বাতিল করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে মোহাম্মদ রেজা পাহলভী পর্দা করার কঠোর নিয়ম শিথীল করেন এবং সেই কারণে মহিলারা পর্দা করা এবং না-করার জন্য নিজেরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বলা হয়, সেই সময়ে ইরানে নারীশিক্ষা ব্যবস্থারও ব্যাপক প্রসার ঘটে। বলা বাহুল্য, ছেলেমেয়েদের কো-এডুকেশনের লক্ষ্যে ১৯৩৬ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালের যাত্রা শুরু হয়। মেয়ে ও মহিলারা উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শুরু করে, এমনকি তারা পথে-ঘাটে জনগণের সামনে পশ্চিমা ধাঁচের খাটো পোশাক (মিনি স্কার্ট) পড়তেও কোন কসুর করেনি। এছাড়া তখন নারী বিষয়ক বিভিন্ন ম্যাগাজিনের প্রকাশনা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে মহিলাদের ভোট দেওয়ার নিয়ম চালু হয় এবং ইরানি সংসদে নির্বাচন করার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, সব মেয়ে কিংবা মহিলা, বিশেষ করে সনাতন চিন্তাধারার পরিবারের নারীরা, সেই আমূল পরিবর্তনে সাড়া দিয়ে উন্নয়নের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেয়নি। এসব পরিবাবের বাবারা পর্দা ছাড়া বাড়ির বাইরে গিয়ে মেয়েদের লেখাপড়া করার অনুমতি দেননি। যার ফলে নারী শিক্ষা অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিল। অনেক সমালোচকের মতে পাহলভী খুব স্বল্প সময়ে সমাজে আমূল পরিবর্তন এনে একটা বিশাল কিছু করতে চেয়েছিলেন। তারা মনে করেন পাহলভীর উচিত ছিল আরো বেশি সময় নিয়ে মানসিক ভাবে সমাজকে তৈরি করা এবং মানুষের মনকে উন্মুক্ত করা।

যাহোক, ১৯৭৯ সালে রেজা পাহলভীকে গনঅভ্যুথ্থানের মাধ্যমে উৎখাত করে আয়াতুল্লাহ খোমেনী ক্ষমতা দখল করেন এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র গঠন করে কঠোর আইন চালু করেন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, পর্দা ছাড়া কোন মেয়ে বা মহিলা জনসম্মুখে যেতে পারবে না এবং আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করতে হবে। এছাড়া স্বামী বা বাবা-ভাই, অর্থাৎ মাহরাম, ছাড়া বিদেশে যাতায়াত করা যাবে না, এমনকি স্বামীরা যদি মনে করে যে তাদের পরিবারের সম্মানহানি ঘটবে, সেই পরিস্থিতিতে ইচ্ছে হলে তারা স্ত্রীদের বাইরে চাকুরি করা বন্ধ করে দিতে পারে। এসব নিগূঢ় নিয়ম-কানুনের জন্য ইরানিদের, বিশেষ করে মহিলাদের, মাঝে নারীবাদের ভাবনা-চিন্তা নতুন করে দানা বাঁধে। জনশ্রুতি আছে, পুরুষ শাসিত সমাজে ইরানি মহিলারা শোষিত এবং সব সময়ই তাঁরা তাই ছিলেন।

একথা সত্যি যে, নারীবাদ বলতে সাধারণত পুরুষপ্রধান সমাজ এবং সংসারে নারীর অধিকার লাভ করাকেই বোঝায়, কিন্তু পুরুষদের ছাপিয়ে যাওয়াকে বোঝায় না। অন্যভাবে বলা যায়, নারীবাদের বিশেষ উদ্দেশ্য হলো গোষ্ঠী বা দল হিসাবে নারীদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এ প্রসঙ্গে ইংরেজ লেখিকা, দার্শনিক এবং নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম বলিষ্ট কন্ঠস্বর মেরী ওলস্টোনক্রাফট্ (১৭৫৯-১৭৯৭)-এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সমাজ এবং সংসারে নারীর অধিকার সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আমি আশা করি না তারা পুরুষের চেয়ে অধিক ক্ষমতা লাভ করুক, বরং তারা নিজেদের সীমানা অতিক্রম করুক।’

এই প্রবন্ধ মোট ছয়টি আলাদা অনুচ্ছেদে ভাগ করা হয়েছে। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ইরানের কথাসাহিত্যের, বিশেষ করে গল্পসাহিত্য, উৎস থেকে হাল-আমল পর্য্যন্ত উত্তরণের ওপর সংক্ষিপ্ত আকারে আলোকপাত করা হয়েছে। অন্যদিকে তৃতীয় পরিচ্ছেদে রয়েছে উত্তর-আধুনিক ফারসি সাহিত্যের উত্তরণের পেছনে ইরানি লেখিকাদের ভূমিকা ও অবদান এবং চতুর্থ অনুচ্ছেদে রয়েছে অভিবাসী ইরানি নারী লেখকদের এবং তাঁদের সাহিত্য নিয়ে বিশদ আলোচনা। এছাড়া পঞ্চম অনুচ্ছেদে ইরানি লেখিকাদের নির্বাচিত নারীবাদী এবং নারী বিষয়ক গল্প ও সারকথা তুলে  ধরা হয়েছে। সবশেষে রয়েছে উপসংহার।

দুই. ইরানের গল্প সাহিত্য : উৎস থেকে উত্তরণ

ইরানের ফারসি কবিতার জন্ম প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। অথচ কথাসাহিত্যের, বিশেষ করে ছোটগল্পের, জন্ম বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে, অর্থাৎ যার বয়স মাত্র এক শত বছরের মতো। ফারসি ছোটগল্পের উৎপত্তির আগে, বিশেষ করে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সাহিত্যের মূল বিষয় ছিল চিরায়ত লোক-কাহিনী, রূপকথা, শিক্ষণীয় ও নীতিমূলক গল্প, বাচনিক কল্পকথা এবং কোন ঐতিহাসিক ঘটনা বা শৈর্য্য-বীর্যের অমর কাহিনী।

উৎপত্তির পর থেকে শুরু করে ইরানি ছোটগল্পকে বর্তমানের পূর্ণতায় পৌঁছুতে তিনটি পৃথক স্তর অতিক্রম করে আসতে হয়েছে। এগুলো হলো: স্থাপনা ও গঠনমূলক স্তর, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন স্তর এবং বৈচিত্র্যতার স্তর। সময়কাল এবং উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রীয় ঘটনার উপর ভিত্তি করে এ তিনটি স্তরকে মোটামুটি ভাবে ‘সাংবিধানিক বিপ্লব’ (১৯০৬-১৯১১), ‘রেজা শাহ পাহলবীর রাজত্বকাল’ (১৯২৫-১৯৭৯) এবং ‘ইসলামিক গণজাগরণ ও অভ্যুথ্থান’ (১৯৭৯ এবং পরবর্তী সময়) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

শুরুর দিকে, বিশেষ করে সাংবিধানিক বিপ্লবের সময়ে, পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে ইরানি লেখকদের পরিচয় না থাকার জন্য প্রথম কয়েক দশক ইরানের ছোটগল্প তেমন উৎকর্ষতা লাভ করতে পারেনি। তবে সংবাদপত্র আবির্ভাবের পরপরই পাশ্চাত্য ভাবধারার সঙ্গে দেশীয় শিল্প-সাহিত্যের একধরনের ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি হয় এবং কবি, কথাসাহিত্যিক, এমনকি উৎসাহী পাঠকেরা পশ্চিমা সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তখন গুটি কয়েক উদীয়মান লেখক, যারা মাতৃভাষা ছাড়াও বিদেশি অন্য ভাষায় দক্ষ ছিলেন, পাশ্চাত্য সাহিত্যকে ফারসি ভাষায় অনুবাদ করে ইরানি সাহিত্যকে ক্রমাগত উৎকর্ষ সাধন করতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের মধ্যে ইরানের আধুনিক সাহিত্যের জনক এবং স্বনামধন্য ছোটগল্প লেখক মোহাম্মদ আলী জামালজাদেহ্ (১৮৯২-১৯৯৭) অন্যতম। জার্মানীর বার্লিনে ইরানি দূতাবাসে চাকুরী করার সময় ১৯২১ সালে ফারসি ভাষায় ছয়টি ছোটগল্প নিয়ে তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম’ প্রকাশিত হয়। আঞ্চলিক শব্দ এবং ভাষার বিশেষ প্রকাশভঙ্গি ব্যবহার করে তিনি এসব গল্পের মাধ্যমে মাতৃভূমি ইরানের সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশ, বিশেষ করে শিয়া ইমামদের, তীব্র সমালোচনা করেন। তেহরানে তার বিরুদ্ধে ইমাম সম্প্রদায় এবং ধর্মীয় নেতারা ক্ষুব্ধ হলে তিনি প্রায় দশ বছর কিছুই লেখেননি। কিন্তু ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি অসংখ্য উপন্যাস এবং ছোটগল্প রচনা করেন। সমালোচকদের মতে জামালজাদের গল্পে শুধু মুসাবিদা এবং ঘটনা প্রবাহ বিদ্যমান ছিল, কিন্তু তাতে কোন ভাব কিংবা চরিত্রের বিস্তার ছিল না। তাই তার গল্পগুলো অনেকটা মোঁপাঁসা এবং ও’ হেনরীর গল্পের মতোই। তবে পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, জামালজাদের গল্পের শুরু হয়েছে কোন এক আনন্দদায়ক ঘটনা দিয়ে এবং যা প্রায়ই শেষ হয়েছে অবাক হওয়ার মতো কোন অলৌকিক ঘটনায়। যেহেতু জামালজাদের গল্পের ভাষা ছিল ধ্রুপদী এবং লোক-কাহিনী নির্ভর, তাই তাঁর লেখার আঙ্গিক এবং কলা-কৌশল পরবর্তী প্রজন্মের তরুণ লেখকদের মোটেও আকৃষ্ট করতে পারেনি।

রেজা শাহ্ পাহলভীর রাজত্বকালে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈরী পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও ইরানি গল্পসাহিত্যের ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ইরানি ছোটগল্পের প্রাথমিক স্তর পেরোনোর পরে, অর্থাৎ ১৯৩১ সালের পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকজন প্রতিশ্রুতিশীল কথাসাহিত্যকের আবির্ভাব ঘটে। এসব লেখকদের সাহিত্য কর্মে ইরানের জনগণের আশা-আকাঙ্খা, আনন্দ-দুঃখ এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থা তুলে ধরা হয়। তাঁদের মধ্যে ইরানের আধুনিক ছোটগল্পের জনক সাদেক হেদায়াত (১৯০৩-১৯৫১), প্রতিবাদী লেখক বোজোর্গ অ্যালাউই (১৯০৪-১৯৯৭), স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিক সাদেক চুবাক (১৯১৬-১৯৯৮), গোলাম হোসেইন সা’য়েদি (১৯৩৫-১৯৮৫), মাহমুদ দৌলতাবাদি (১৯৪০-) এবং প্রথিতযশা নারী লেখক সিমিন দানেশ্বর (১৯২১-২০১২) উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য, তাঁদের সবার উপন্যাস বা গল্পের মূল বিষয় ছিল সমাজ, মানুষ এবং পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপট।

যাহোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ফলে ইরানি কথাসাহিত্যের আঙ্গিক এবং কলা-কৌশলেরও একধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তখন থেকেই ইরানের ফারসি গদ্যসাহিত্যের আঙ্গিক দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। অনেক লেখক, যেমন সাদেক চুবাক এবং জালাল আল-এ আহমদ (১৯২৩-১৯৬৯) প্রমুখেরা তাদের লেখায় সাধারণ কথ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন। অন্যদিকে অনেক লেখক, যেমন মোহাম্মদ এ’তেমাদজাদা বেহ’আজিন (১৯১৫-?) এবং এব্রাহীম গোলেস্তান (১৯২২-?) প্রমুখেরা তাদের লেখায় মার্জিত, রুচিশীল এবং কাব্যিক ভাষা প্রয়োগ করে ফারসি গদ্যসাহিত্যের ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছেন।

ইসলামিক গণজাগরণ ও অভ্যুথ্থানের ফলে ১৯৭৯ সালে রেজা শাহ পাহলভী উৎখাত হন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ্ খোমেনী। রাজনৈতিক এই ওলোটপালটের সময়কেই তৃতীয় সময়কাল হিসেবে গণ্য করা হয়। ক্ষমতা লাভের পরপরই খোমেনী এবং তাঁর সরকার ইউরোপীয় ভাবধারাকে সমূলে উৎপাটন এবং পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানকে বর্জন করে পুনরায় সামন্ততান্ত্রিক ধর্মীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অত্যাচার এবং নির্যাতন শুরু করে, যা শাহ্ আমলের ইতিহাসকে ছাড়িয়ে যায়। এ সময় ইসলামী শরিয়তের দোহাই দিয়ে নারী স্বাধীনতাকে হরণ করা হয়। এছাড়া মানুষের মুক্ত কন্ঠে খোলামেলা কথা বলার মৌলিক অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়, এমনকি লেখকদের ধারালো কলমকে খর্ব করা হয় এবং প্রতিবাদী লেখকদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। শুধু তাই নয়। কোন গ্রন্থ প্রকাশনার আগে সরকারের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক অনুমতি নিতে হতো। এসব প্রতিকূল পরিবেশের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠিত এবং তরুণ বিপ্লবী লেখক প্রাণের ভয়ে স্বেচ্ছায় কিংবা জোরপূর্বক দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়েছেন। বলাবাহূল্য, সাম্প্রতিক কালে ইরানের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, যেমন দীর্ঘ মেয়াদী ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮) এবং ইরানে আমেরিকান হোস্টেজ ক্রাইসিস (নভেম্বর ১৯৭৯-জানুয়ারী ১৯৮১), এমনকি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনার জন্য অনেক ইরানি লেখক-সাহিত্যিক দেশ ত্যাগ করে পশ্চিমা দেশে স্বেচ্ছায় আশ্রয় গ্রহণ করেন কিংবা অনিচ্ছায় বাধ্য হন।

বিভিন্ন সময়ে সমস্ত ইরান জুড়ে স্বৈরাচারী দুঃশাসন, সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী গণআন্দোলন, গুপ্তপুলিশ এবং গোয়েন্দাবাহিনীর তৎপরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অরাজকতা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের মতো নেতিবাচক ঘটনা বিদ্যমান ছিল। যদিও উৎস থেকে উত্তরণের পথে ছোটগল্প, তথা কথাসাহিত্য, বারবার হোঁচট খেয়েছে, তবে চলার পথ আটকে থাকেনি। বরং গত শতকের বিভিন্ন দশকে দুঃসাহসী লেখকদের লেখনীর মাধ্যমে ফারসি কথাসাহিত্যের, বিশেষ করে ছোটগল্পের ধারা বহমান পাহাড়ী শুকনো নদীর মতো নিরন্তর বয়ে চলেছে। বলা যায়, ইরানের ফারসি সাহিত্যের ভান্ডার সমৃদ্ধ এবং ইতিহাস প্রসিদ্ধ। এ কথা সত্যি যে, আধুনিক কালে নারী লেখকের সরব উপস্থিতি ইরানের সমকালীন সাহিত্যকে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, বিগত এক শ’ বছর চলার পথে ইরানের ছোটগল্পকে ধর্মের কঠিন নিগড়ে বাঁধা সমাজ ব্যবস্থা, স্বৈরাচারী দুঃশাসন, সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ প্রভাব, মুক্তিকামী জনগণের প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মতো বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হয়ে বর্তমানে এসে পৌঁছেছে।

তিন. ইরানের নারী লেখক এবং তাঁদের সাহিত্য

এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে, কোন দেশ বা সমাজ ব্যবস্থার ভেতর বাস করা নারীরা পুরুষদের মতোই সেই দেশ বা সমাজের অবিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্রীয়ভাবে সমান অধিকার থাকলেও পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে আছে এবং তারা রীতিমত বৈষম্যের শিকার। তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীদের জন্য অলিখিত আলাদা সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রথা বা নিয়ম-কানুন তৈরি করা। দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই এই ধরনের মন-মানসিকতা দেখতে পাওয়া যায়। তবে অনেক দেশে অত্যন্ত প্রবল এবং কঠিন। ইসলামিক গণজাগরণ এবং অভ্যুথ্থানের পরবর্তী সময় থেকে বর্তমানের ইরান তার উজ্জ্বল উদাহরণ।

সমালোচকদের মতে ইরানের আধুনিক ফারসি সাহিত্যে নারী লেখকরা কাহিনীর উপস্থাপনা, ঘটনার নিখুঁত বর্ণনা, লেখার স্টাইল এবং কলা-কৌশলের দিক থেকে কোন অংশে পুরুষ লেখকের তুলনায় পিছিয়ে নেই, বরং অনেক সময় ছাপিয়ে গেছে। এ কথা সত্যি যে, সামাজিক দিক থেকে পুরুষ লেখকদের তুলনায় নারী লেখকদের প্রতিবন্ধকতা বেশি এবং লেখালেখির প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ নিতান্তই কম থাকে। কিন্তু নিজেকে একজন লেখক হিসাবে তৈরি করার জন্য যে সমস্ত উপাদান বা উপকরণের প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে প্রেম-ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, রাগ-অনুরাগ, মান-অভিমান, ক্রোধ-দ্রোহ এবং বিরহ-যাতনা, পুরুষের মতো নারীদের মধ্যে সেসব গুণাবলীর উপস্থিতির কমতি নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে নারীদের ভাব এবং আবেগ পুরুষের চেয়ে ঢের বেশি। এছাড়া পুরুষ লেখকদের তুলনায় নারী লেখকরা সাহিত্যকর্মে লেখার স্টাইল এবং বিষয়বস্তুর মধ্যে বৈচিত্র্যতা আনতে পারঙ্গম। ইরানি নারী লেখকদের লেখায় নারীবাদী কন্ঠস্বর এবং লেখার ভেতর বিভিন্ন ঘটনা বা কাহিনীর বিস্তারিত বর্ণনা থাকে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বিবি খানম আশতারাবাদি (১৮৫৮-১৯২১) নামে মাত্র একজন লেখিকার নাম পাওয়া যায়। একাধারে তিনি ছিলেন লেখক, কবি এবং নারী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রপথিক। তবে তিনি যে গ্রন্থ রচনার জন্য ফারসি সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন, তা আসলে একখানি বিদ্রুপাত্মক গ্রন্থ। ‘দ্য ভাইসেস অফ মেন’ শিরোনামে গ্রন্থটি তিনি ১৮৮৭ সালে রচনা করেন। গ্রন্থটি ছিল জনৈক ইমামের লেখা তৎকালীন জনপ্রিয় এবং বহুল প্রচারিত পুস্তক ‘দ্য এডুকেশন অফ উ্যইমেন’-এর পাল্টা জবাব। পরবর্তীতে ‘দ্য ভাইসেস অফ মেন’ গ্রন্থটি ইরানের আধুনিক নারী অধিকার আন্দোলনের ঘোষনা এবং সূচনা হিসাবে গন্য করা হয়।

সাংবিধানিক বিপ্লবের সময়ে (১৯০৬-১৯১১) ইরানে উল্লেখযোগ্য কোন নারী লেখকের উপস্থিতি ছিল না। তবে গত শতকের কুড়ির দশকের শেষ প্রান্তে রাজকুমারি তাজ-ওস সুলতানেহ্ ইরানের নারী লেখিকাদের মধ্যে সর্বপ্রথম বর্ণনামূলক কথাসাহিত্য রচনা করে। বাদশা নাসের উদ্-দীন শাহের কন্যা হওয়ার সুবাদে তিনি ইউরোপে পড়াশুনা করার সুযোগ পান এবং সেখানে থাকার সময় তিনি প্রতিবাদী হয়ে উঠেন। তাঁর লেখার মূল বিষয় ছিল সমাজের ঘেরাটোপে আটকে থাকা অবস্থা থেকে নারীমুক্তি, সামাজিক পরিবেশের পরিবর্তন এবং দূর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা।

পরবর্তীতে রেজা শাহ পাহলবীর রাজত্বকালের শুরুর দিকে, বিশেষ করে তিরিশের দশকে হাতে গোণা কয়েকজন নারী লেখকের আবির্ভাব ঘটে। কেননা সেই সময় নারীরা চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলা এবং পথ চলার সুযোগ লাভ করে।

তিরিশের দশকে মাত্র তিনজন নারী কথাসাহিত্যিকের হদিস পাওয়া যায়। এঁরা হলেন পারভিন এ’তেশামি (১৯০৭-১৯৪১), ইরানদোখত্ নামি এবং জাহরা খানলারি (১৯১৩-১৯৯০)। ইরানদোখত্ নামি ১৯৩১ সালে ‘আনলাকি গার্লস্’ রচনা করেন। অন্যদিকে জাহরা খানলারির দু’টি উপন্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এগুলো হলো: ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত ‘পারভিন অ্যান্ড পারভিজ’ এবং ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত ‘জালেহ্’ বা ‘গার্লস্ লিডার’। এছাড়া মৃত্যুর দু’বছর আগে, অর্থাৎ ১৯৮৮ সালে, তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসটি ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন।

চল্লিশের দশকে ইরানের সাহিত্যাঙ্গণে যেসব নারী লেখকের উপস্থিতিতে ফারসি সাহিত্য আধুনিকতার স্পর্শ লাভ করেছে, তাদের মধ্যে প্রথিতযশা নারী লেখক সিমিন দানেশ্বর উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি নারীবাদী এবং প্রথাবিরোধী রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তাঁর সাহিত্য কর্মে রূপকথার ঘুমপাড়ানী কোন কাহিনী নেই, আছে বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য। তাঁর লেখায় সমাজের নিচুশ্রেনীর মানুষের, বিশেষ করে বয়স্ক মহিলাদের, জীবনের করুণ কাহিনী, ধনী ও গরীবের বৈষম্য এবং ভালো-মন্দের সংঘাত সহজিয়া ভাষায় ফুটে উঠেছে। তার প্রথম ছোটগল্প সংকলন (‘দ্য ক্যোয়েনশড্ ফায়্যার’) ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হয়, যা কোন ইরানি নারী লেখকের সর্বপ্রথম গল্প সংকলন। তবে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় গল্প সংকলনে (‘এ সিটি লাইক প্যারাডাইস’) নারী মুক্তির জন্য তার প্রত্যক্ষ সমর্থন এবং সোচ্চার কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকে উপজীব্য করে আধুনিক ইরানের সামাজিক পরিস্থিতি নির্ভর তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সাউশুন’ (১৯৬৯) ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বহুল প্রচারিত এবং বিক্রিত উপন্যাসের মর্যাদা লাভ করেছে। উল্লেখ্য, ‘সাউশুন’ উপন্যাস কোন নারী লেখকের সর্বপ্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। যাহোক, রেজা শাহ পাহলভীর শাসনামলে, অর্থাৎ ইসলামিক বিপ্লবের আগে, তিনি মূলতঃ রাজনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যা নিয়ে গল্প-উপন্যা লিখেছেন। কিন্তু ইসলামিক বিপ্লবের পরে তিনি লেখার বিষয়বস্তু আমূল পাল্টে ফেলেন। তখন তিনি নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর জীবনের নানা কাহিনী রচনা করেন। এসব সাহিত্য সৃষ্টির মূল বিষয় ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের অবস্থান, তাদের সঙ্গে দূর্ব্যবহার করার প্রবনতা এবং মেয়েদের অ্যারেঞ্জড্ বিয়ে।

পঞ্চাশের দশকে মাত্র আটজন নারী লেখকের নাম পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মালেকেহ্ বাকাই কারমানি (১৯১৪-?) ছিলেন নারী অধিকার আদায়ের অন্যতম বলিষ্ট কন্ঠস্বর। ইরানের মহিলাদের বিভিন্ন সমস্যা  নিয়ে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত ‘হোয়াট ডু উইমেন সেই’ বা ‘বিটার কিস’ অন্যতম। এছাড়া ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় তার ছোটগল্প সংকলন ‘ব্রোকেন উইংস্’। এই গল্প সংকলনের একাধিক গল্পে তিনি একজন সংবেদনশীল নারীর দৃষ্টিতে নারীদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। অন্যান্য নারী লেখকদের মধ্য মারিয়াম স্যাবুজি (জন্ম ১৯১৯), বেহিন দখত্ দারাই (জন্ম ১৯২১), মাহিন তাভালি (জন্ম ১৯৩০) এবং কেইভান দখত্ কিভানি (জন্ম ১৯৩৪) উল্লেখযোগ্য। মারিয়াম স্যাবুজি ছিলেন একজন স্বনামধন্য অ্যাটর্নী। ‘দ্য গার্লস্ অ্যান্ড দ্য অ্যাঞ্জেল’ তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম। এছাড়া তিনি ১৯৫৬ সালে সর্বপ্রথম নারী অধিকার বিষয়টি রেডিওতে উথ্থাপন করেন। অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে মাহিন তাভালি ছিলেন ইরানের বিখ্যাত কবি ফেরেদুন তাভালির সহধর্মিনী। মূলত: তিনি ছিলেন গল্পলেখক। ‘পার্লি পিন’ এবং ‘ব্রোকেন ফিডল্’ তার অন্যতম ছোটগল্প সংকলন।

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের পর থেকে ইরানি কথাসাহিত্যের, বিশেষ করে ছোটগল্প এবং উপন্যাসের, বিস্তর প্রসার ঘটেছে এবং উৎকর্ষতা লাভ করেছে। তখন থেকেই পুরুষ লেখকদের সঙ্গে রীতিমত পাল্লা দিয়ে বেশ কয়েকজন নারী লেখকের আবির্ভাব ঘটে। অনেকের মতে সেই সময়ের আইন-কানুনের শিথীলতা, সামাজিক রীতি-নীতি এবং ঐতিহ্যের পরিবর্তন অনেক নারী লেখককে সামনে আসার জন্য অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। এছাড়া সেই সময়ে নারীরা অনেক সহজ ভাবে শিক্ষা-দীক্ষা এবং চাকুরীর বাজারে অনুপ্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছে। ফলে নারী লেখকরা তাদের দুঃখ-দুর্দশা, হতাশা এবং কষ্টের কাহিনী লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করার জন্য সাহসী হয়ে ওঠে এবং তাদের মধ্যে আটকে রাখা লেখালেখির অলৌকিক প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে। সেই সময় নারী লেখকের ছোটগল্প বিভিন্ন জনপ্রিয় ম্যাগাজিনে হরদম প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, ষাটের দশকেই নারী লেখকরা ছোটগল্প এবং উপন্যাসে একধরনের আলাদা প্রকাশ ভঙ্গির সূচনা করেন। এঁদের মধ্যে সিমিন দানেশ্বর অন্যতম। অনেকের মতে, ষাটের দশকেই নারী লেখকদের বেশ কিছু ভালো এবং উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হয়েছে।

যাহোক, ষাটের দশকে যেসব নারী লেখকদের উপস্থিতিতে সাহিত্যাঙ্গণ রীতিমত মুখরিত হয়ে উঠেছিল, তাদের মধ্যে গোলি তারাকী (জন্ম ১৯৩৯), মাহশীদ আমিরশাহী (জন্ম ১৯৪০), শোকুহ্ মির্জাদাগী (জন্ম ১৯৪৪), নাসিম খাকসার (জন্ম ১৯৪৪), শাহরনূর পার্শিপুর (জন্ম ১৯৪৬), জয়া পিরজাদ (জন্ম ১৯৫২), সোহেইলা বেসকি (জন্ম ১৯৫৩) এবং মনিরু রাভানিপুর (জন্ম ১৯৫৪) উল্লেখযোগ্য। এসব লেখিকাদের লেখায় পুরুষ শাসিত সমাজে নিজেদের আত্মপরিচয়, অবস্থান এবং যাপিত জীবনের নানান দিকগুলো অত্যন্ত সহজিয়া ভঙিতে ফুটে উঠেছে। এছাড়া তাঁদের লেখায় ভাষা, বর্ণনা এবং উপস্থাপনায় মননশীল চিন্তা ও চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে।

গোলি তারাকীর ছোটগল্প মূলত স্মৃতিবিজরিত শৈশবের আনন্দ-বেদনার বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং অভিবাসী জীবনের দুর্দশা, দুঃখ-কষ্ট, হাসি-কান্না এবং সংসারের টানাপোড়েনের কাহিনী নির্ভর। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প সংকলন ‘আই টু অ্যাম চে গুয়েভারা’ ইরানে ভূয়সী প্রসংসা লাভ করে। তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠগল্প ‘দ্য গ্রেট লেডি অফ মাই সৌল্’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে, যা তাকে আন্তর্জাতিক পুরস্কার এনে দিয়েছে। এছাড়া ইংরেজিতে তাঁর উপন্যাস ‘উইন্টার স্লীপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে।

সমকালীন ইরানের জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক মাহশীদ আমীরশাহীর লেখার মূল বিষয় ইরানের পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজে নারী জগরণ এবং নারীর পূর্ণ অধিকার, মমতা, ভালোবাসা, যন্ত্রণা, ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং বিদ্রোহ। এসব মানবিক অনুভূতিগুলোকে নতুন আঙ্গিকে নতুন উপলব্ধির মাধ্যমে পাঠকের সামনে তিনি বিভিন্ন গল্প এবং উপন্যাসের মধ্যে তুলে ধরেছেন। একসময় তিনি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইসলামিক রাষ্ট্র পরিচালনার বিরুদ্ধে তিনি একাধিক লেখা লেখেন। ফলে তাঁকে ফ্রান্সে নির্বাসিত হতে হয়। তাঁর প্রথম গল্প সংকলন (‘দ্য ব্লাইন্ড অ্যালি’) প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। এছাড়া ‘বিবি খানমস্ স্টার্লিং’ (১৯৬৮), ‘আফটার দ্য লাস্ট ডে’ (১৯৬৯) এবং ‘ইন দ্য ফার্স্ট পার্সন সিঙ্গুলার’ (১৯৭১)তাঁর উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প সংকলন। এসব সংকলনের গল্পগুলো এক দিকে ব্যাঙ্গ-কৌতুকপূর্ণ, অন্যদিকে মহিলাদের সামাজিক ও পারিবারিক ভয়-ভীতি এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার  মতো বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। এছাড়া ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ (‘অ্যাট হোম’) এবং ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস (‘ইন এ জার্নি’)।

সমকালীন ইরানি কথাসাহিত্যের অন্যতম নারী লেখক শোকুহ্ মির্জাদাগী। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, গল্পকার, কবি, নাট্যকার, শিশু সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং এক্টিভিষ্ট। তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘পার্মানেন্ট রেস্টলেসনেস্’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। পরবর্তী সময়ে তাঁর আরো দু’টি ছোটগল্প সংকলন (‘দ্য সেকেন্ড বিগিনিং’ এবং ‘গোল্ডেন আর্ক’) প্রকাশিত হয়। ফারসি ভাষায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘এ স্ট্রেঞ্জার উইদিন মী’ বা ‘অ্যান এলিয়েন ইন মী’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। এই উপন্যাসে তিনি ইসলামিক গণজাগরণ ও অভ্যুথ্থানের পরবরতী সময়ে বিদেশের মাটিতে পৃথকীকরণ অনুভূতি এবং নির্বাসিত জীবনের করুণ চিত্র এঁকেছেন। তাঁর সাহিত্য কর্ম ফরাসী, জার্মান এবং জাপানীজ ভাষায় অনূদিত হয়। একসময় তিনি ‘তালাশ’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে শোকুহ্ মির্জাদাগী রাজনৈতিক কারণে কারাভোগ করেন। পরে তিনি দেশান্তরী হতে বাধ্য হন। বর্তমানে তিনি স্থায়ীভাবে আমেরিকার বাসিন্দা।

ইরানের সমকালীন প্রখ্যাত নারী উপন্যাসিক এবং গল্পকার শাহরনূর পার্শিপুর মাত্র ষোল বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করেন। কিশোর-কিশোরীদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলন (‘দ্য লিটল রেড বল’) প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। ‘ক্রিসটাল পেনডেন্টস্’ (১৯৭৪) এবং ‘টী সেরিমনি ইন দ্য প্রেজেন্স অফ এ উলফ্’ (১৯৯৩) তাঁর উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প সংকলন। ফারসি ভাষায় তাঁর বহুল বিতর্কিত, আলোচিত এবং আলোড়িত উপন্যাস ‘উ্যইমেন উ্যইথ্আউট মেন’ ১৯৯০ সালে (২০১২ সালে ইংরেজিতে) প্রকাশিত হয়, যা ইরান সরকার বাজেয়াপ্ত করে। কেননা এই উপন্যাসের প্রতিটি নারী চরিত্রের মাধ্যমে তিনি যৌনতা, কুমারীত্ব এবং পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থাকে কঠোর ভাবে কটাক্ষ করেছেন। এছাড়া এই উপন্যাসে তিনি জাদুবাস্তবতার কলা-কৌশল প্রয়োগ করে ইরানের প্রক্ষাপটে নারী-পুরুষের সনাতন পার্থক্যের চিত্র তুলে ধরেছেন। উল্লেখ্য, পরবর্তীতে এই উপন্যাস মালয়াম, ফরাসী এবং স্পেনিশ ভাষায় অনূদিত হয়। এছাড়া এই নভেলার কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে ২০০৯ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। শাহরনূর পার্শিপুরের অন্যান্য উপন্যাসগুলো ‘দ্য ডগ এন্ড দ্য লং উইন্টার’ (১৯৭৪), ‘তৌবা এন্ড মিনিং অফ নাইট’ (১৯৮৯), ‘দ্য ব্লু রিজন্’ (১৯৯৪) এবং ‘অন দ্য উইংস্ অফ উইন্ড’ (২০০২)। রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সরকার বিরোধী লেখালেখির জন্য তাঁর সমস্ত প্রকাশিত গ্রন্থ ইরানে বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং সরকারের রোষানলে পড়ে বিভিন্ন সময়ে তিনি কারাভোগ করেন। কারাভোগের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ১৯৯৬ সালে প্রকাশ করেন ‘প্রিজন্ মেম্যোআ(র)’।

দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সাবলীল ভাষায় ছোটগল্প লেখায় জয়া পিরজাদ (জন্ম ১৯৫২) একজন সফল লেখিকা। তাঁর ছোটগল্প এবং উপন্যাসে পশ্চিমা দেশের সাহিত্যের সঙ্গে প্রাচ্যের সাহিত্যের একধরনের মিশ্রণ দেখা যায়। তাই তাঁর গল্প-উপন্যাসে ইরানিদের জীবন-কাহিনী থাকলে সেগুলো সার্বজনীন। ‘লাইক অল দ্য ইভিনিংস্’, ‘ওয়ান ডে বিফোর ঈস্টার’ এবং ‘দ্য বিটার টেইস্ট অব পারসিমন’ তাঁর প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন। ‘দ্য বিটার টেইস্ট অব পারসিমন’ গল্প সংকলনের জন্য তিনি ফ্রান্সের ‘বেষ্ট ফরেইন বুক অফ ২০০৯’ পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আই টার্ন অফ দ্য লাইট’ ইরানে একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এ উপন্যাসের জন্য তিনি ইরানের সম্মানিত ‘হোশাং গলশিরি’ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ইংরেজিতে অনূদিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘থিঙ্কস উই লেফট আনসেইড’ প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। ইতিমধ্যে তাঁর বিভিন্ন উপন্যাস এবং ছোটগল্প সংকলন জার্মান, ইটালিয়ান, তুর্কী এবং গ্রীক ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

সোহেইলা বেসকি একাধারে উপন্যাসিক, গল্পকার, অনুবাদক, সাংবাদিক এবং ম্যাগাজিনের মালিক ও প্রধান সম্পাদক। তিনি দু’টি ছোটগল্প সংকলনের (‘স্মল পীস’ এবং ‘দ্য কুইন অফ স্পেইডস্’) রচয়িতা। ‘স্মল পীস’ গল্প সংকলনের জন্য তিনি সাহিত্য পুরস্কার অর্জণ করেন। অনেক বছর সরকারের অনুমতির অপেক্ষার পর সম্প্রতি তাঁর চারটি উপন্যাস (‘দেয়ার ইজ এ পাস্ট দ্যাট ডাজ নট পাস’, ‘ইন্টারলুনার’, ‘দ্য টেইল অফ বিল্ডিং টয়লেটস্ ইন ব্যাম’ এবং ‘পার্টিক্যাল’) প্রকাশিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন নারী লেখক মনিরু রভানিপুর ইরানের আধুনিক কথাসাহিত্যের অন্যতম দিকপাল। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য পিউপিল অফ ঘার্ক’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। এই উপন্যাস প্রকাশের পরপরই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে স্বদেশের সাহিত্য মহলের সীমানা পেরিয়ে বহির্বিশ্বের পাঠক মহলে। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর অসম অবস্থান, বিভাজন এবং নির্যাতন তাঁর লেখার মূল বিষয়।

বিষয়বস্তুর দিক থেকে বিবেচনা করলে গত শতাব্দীর নব্বই দশকের শুরুতে ইরানের গদ্য সাহিত্যকে মোটামুটি চার ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো: রেজা শাহ্ পাহলীর শাসনামলের সামাজিক জীবন কাঠামোর আলোচনা-সমালোচনা, রেজা শাহ্ পাহলীর পতন এবং ইসলামিক গণজাগরণ ও অভ্যুথ্থান, দেশাত্ববোধ ও জাতীয়তাবাদ, এবং নিরীহ মানুষের দৈনন্দিন সাদামাটা জীবনযাত্রা। তবে দেশাত্ববোধ ও জাতীয়তাবাদের ভেতর আবার দু’টি প্রবাহ আছে, যেমন ইরাক-ইরান যুদ্ধে সাধারণ ইরানিদের বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে সমাজে যুদ্ধের প্রতিফলন।

যদিও ইসলামিক গণজাগরণ ও অভ্যুথ্থানের পরবর্তী সময়ে, অর্থাৎ ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরে, প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং লেখিকারা ফারসি সাহিত্যকে চলমান রাখে, তবে পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে এক ঝাঁক তরুণ লেখক/লেখিকার আবির্ভাব ঘটে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নারী লেখকরা হলেন জয়া পিরজাদ (জন্ম ১৯৫৩), ফেরেশতেহ্ মোরাভি (জন্ম ১৯৫৩), ফেরেশতেহ্ সারি (জন্ম ১৯৫৫), ফারকোন্দেহ আঘাই (জন্ম ১৯৫৬), নাহিদ তাবাতাবাই (জন্ম ১৯৫৮) এবং তাহেরেহ্ আলাভি (জন্ম ১৯৫৯)। এসব নারী লেখকদের মধ্যে গল্প বলার ঢং ও কলা-কৌশল এবং শৈল্পিক গুণাবলীর মধ্যে বিস্তর ব্যবধান থাকার পরও তাদের লেখায় স্পষ্ট করে ফুটে উঠেছে নারী বিষয়ক নানা ধরনের সমস্যা এবং নারী-পুরুষের বৈষম্য ও বিভাজন। ফলে মহিলাদের অনেক গোপনীয় এবং ব্যক্তিগত বিষয় জনসম্মুখে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁদের সেই সময়ের লেখা একধরনের প্রতিবাদ হিসাবে গণ্য করা হয়। উল্লেখ্য, তখন ইরানি লেখক/লেখিকাদের মধ্যে দু’টি আলাদা ধারার সাহিত্য প্রকাশ পায়। একদল বিপ্লবের সমর্থনে কলম ধরেছেন, অন্যদিকে আরেক দল বিপ্লবের ভয়াবহতা পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন এবং পরবর্তী সময়ের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেন। তাই অনেকেই প্রাণের ভয়ে মাতৃভূমি ছেড়ে পালিয়ে যান।

এছাড়া ইসলামিক গণজাগরণ ও অভ্যুথ্থানের পরে ইরানি নারী লেখকদের মাঝে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস বা স্মৃতিগদ্য লেখার দারুণ প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। নিজেদের সমূহ বিপদ এবং সরকারের রোষানলে পড়ার ভয় এবং ফারসি ভাষা ও ইরানি সাহিত্যকে বেরী পরিবেশের মাঝে টিকিয়ে রাখার জন্য অনেকে ছোটগল্প এবং উপন্যাস লেখার পরিবর্তে আত্মজীবনী বা স্মৃতিগদ্য লেখায় মনোনিবেশ করেন। তবে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস বা স্মৃতিগদ্য লেখার আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল এবং তাহো লেখিকাদের নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে অতীত ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। ফারাহ্ পাহলভীর ‘অ্যান ইনডিউয়্যারিং লভ’, আশরাফ পাহলভীর ‘ফেসেস ইন দ্য মিরর্’, সোরায়া এসফানদিয়ারির ‘দ্য লোনলি প্যালেস’ এবং সাতারেহ্ ফারম্যন ফরমাইয়ানের ‘ড্যট্যার্ অফ পার্সিয়া’ উল্লেখযোগ্য আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস এবং স্মৃতিগদ্য। বলা বাহূল্য, এসব লেখা শুধু ফারসি ভাষায় স্বদেশে প্রকাশিত হয়নি, বরং বিদেশে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে এবং আনতর্জাতিক পাঠক মহলে সমাদৃত এবং নন্দিত হয়েছে।

তবে নব্বইয়ের দশকের শেষে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইরানের লেখক/লেখিকারা গল্পের কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। এই সময়ে গল্পের বিষয়বস্তু এবং উপস্থাপনা বিশেষ ভাবে লক্ষ্যনীয়। অনেকেরই গল্প আয়তনে ছোট, কিন্তু বক্তব্যে অসাধারণ। এই সময়ের জনপ্রিয় অন্যতম ঔপন্যাসিকা ফাতানেহ্ হাজ সেয়েদ জাভাদি (জন্ম ১৯৪৫)। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘ড্রানকার্ড মর্নিং’ উপন্যাস সর্ব সংখ্যক বিক্রীত উপন্যাসের শিরোপা অর্জণ করে। ১৯৪০ সালের পটূমিতে রচিত এই উপন্যাসের মূল কাহিনী ছিল পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ের সঙ্গে নিচু বংশের কাঠমিস্ত্রীর অসম বিয়ে। পরবর্তীতৈ সেই নারী বিয়ে ভেঙে দিয়ে অন্য আরেক পুরুষের ঘরণী হয়। সেই সময়ে এ ধরনের ঘটনা ইরানি সমাজে মোটেও প্রচলিত ছিল না।

যাহোক, বিগত দুই দশকে ইরানি লেখিকাদের সাহিত্য কর্মে অনেক বিষয় স্থান পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে আত্ম-পরিচিতি, পুরুষ শাসিত সমাজের প্রতি যুদ্বং দেহী মনোভাবের পরিবর্তে নমনীয়তা, পরিবার ও মাতৃত্ব, আধুনিক নাগরিক জীবন, নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যতা এবং বাক-স্বাধীনতা অন্যতম। এছাড়া অনেকের লেখায় উঠে এসেছে বিশ্বায়ন, নগরায়ন, এমনকি আবহাওয়া পরিবর্তের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয় ও সমস্যা। বলা হয়, উত্তর-আধুনিক ফারসি সাহিত্যের উত্তরণের পেছনে ইরানি নারী লেখকদের অবদান প্রশংসনীয় এবং সর্বজনবিদিত। হয়তো তাই ইরানের প্রথম নারী ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্প লেখক সিমিন দানেশ্বর (১৯২১-২০১২) বলেছেন, ‘আমার ইচ্ছে হয় নারীরাই বিশ্বকে পরিচালনা করুক। কেননা যেসব নারী সন্তান পয়দা করেছেন, তারাই জানেন তাদের সৃষ্টির মূল্য।’

চার. অভিবাসী ইরানি নারী লেখক এবং তাঁদের সাহিত্য

ইসলামিক গণজাগরণ ও অভ্যুথ্থানের পরবর্তী সময়ে ইরানের অনেক কবি এবং সাহিত্যিক স্বেচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় মাতৃভূমি ত্যাগ করে বিদেশে অভিবাসী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে অনেকেই, বিশেষ করে নারী লেখক, মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু বৈরী রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মীয় অনুশাসন এবং প্রতিকূল পরিবেশ তাদের ফেরার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। সেই সব অভিবাসী লেখকেরা স্বদেশ ছেড়ে অচিন দেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং নিজের দেশে মাতৃভাষায় তাদের সাহিত্যকর্ম প্রকাশ না করে বিদেশ থেকে বিজাতীয় ভাষায় প্রকাশ করেন।

সাধারণত ইরানি অভিবাসী লেখকদের সাহিত্যকর্মে দু’টি বিপরীত ধারা লক্ষ্য করা যায়। অনেকের লেখার মূল বিষয় হলো শৈশব ও কৈশোরের টালমাটাল জীবন, ইসলামিক গণজাগরণ ও অভ্যুথ্থানে সরাসরি অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ের ইরানের আর্থ-সামাজিক পরিবেশের বিচিত্র কাহিনী। এসব সাহিত্য কর্মের বিষয়বস্তু চারপাশের সামাজিক,অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে সংগৃহীত। অন্যদিকে অনেকের লেখার বিষয়বস্তু অভিবাসী জীবনের কঠিন সংগ্রামের করুণ কাহিনী। তাঁদের লেখায় অভিবাসী দেশের কথার চেয়ে স্বদেশকে বিদেশীদের সামনে ইতিবাচক ভাবে তুলে ধরার কাহিনী স্থান পেয়েছে। কেননা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেকেই আছেন, যারা ইরানের অভ্যন্তরে নারীদের জীবনযাত্রা, চাল-চলন, বাক-স্বাধীনতা এবং তাদের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে দারুণ আগ্রহী এবং কৌতূহলী। এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে, এসব আগ্রহ এবং কৌতূহল পুষিয়ে নেওয়ার জন্য অভিবাসী ইরানি নারী লেখকদের বিভিন্ন ধরনের লেখা, বিশেষ করে গল্প-উপন্যাস, নন-ফিকশন এবং আত্মজীবনী বা স্মৃতিগদ্য, বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত আমেরিকা প্রবাসী লেখিকা আজার নাফিসীর ‘রিডিং লোলিটা ইন ইরান’, আজাদেহ্ মোয়ভেনির ‘লিপস্টিক জিহাদ’ এবং পারদিস মাহদেবির ‘আপরাইজিং’ উপন্যাসগুলো অন্যতম। এসব লেখায় লেখিকারা ইরানের অভ্যন্তরে বেড়ে ওঠা নারী সমাজের বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুশাসন এবং যৌনতাসহ জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, যা পশ্চিমা দেশের পাঠকদের কাছে দারুণ ভাবে সমাদৃত হয়েছে।

ইরানের অভিবাসী নারী লেখিকারা কারাগারের বন্দি জীবন নিয়ে বেশ কিছু সংখ্যক উপন্যাস রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস প্রবাসী লেখিকা ফারনুশ মাশিরির ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য বাথহাউজ’ এবং ২০০৭ সালে প্রকাশিত অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখিকা জারাহ্ ঘারাহরামানির আত্মজৈবনিক ঢঙে লেখা উপন্যাস ‘মাই লাইফ অ্যাজ এ ট্রেইটর’ উল্লেখযোগ্য। ‘দ্য বাথহাউজ’ উপন্যাসে লেখিকা কারাগারের অভ্যন্তরের একদল বন্দি নারীর সোচ্চার প্রতিবাদের কাহিনী তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ‘মাই লাইফ অ্যাজ এ ট্রেইটর’ উপন্যাসে লেখিকা ইরানের কুখ্যাত এলভিন কারাগারে নিজের এবং অন্যান্য বন্দিনীদের দুঃসহ জীবন-কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তবে এ কথা সত্যি যে, পশ্চিমা দেশের শিক্ষা-দীক্ষায় সুশিক্ষিত অভিবাসী অনেকের লেখায় সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব অত্যন্ত প্রখর।

পাঁচ. ইরানি লেখিকাদের নারীবাদী ও নারী বিষয়ক গল্পের উদাহরণ

একথা সত্যি যে, নারীবাদী গল্প বা উপন্যাস লেখার জন্য নারী বা পুরুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। উভয়ই নারীর অধিকার বা নারী-জাগরণের বিষয় নিয়ে নিজেদের ভাবনা-চিন্তা এবং মনের মাধুরী মিশিয়ে সাহিত্য রচনা করতে পারেন। যদিও পুরুষ লেখকদের লেখায় মহিলাদের বিভিন্ন সমস্যা, মানসিক অশান্তি কিংবা দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েনের অনেক ছোটগল্প এবং উপন্যাস প্রকাশ পেয়েছে, তবে এই প্রবন্ধে শুধু ইরানি নারী লেখকদের ছোটগল্প নির্বাচন করা হয়েছে। আলোচনার প্রতিটি গল্পই নারীদের নিয়ে, কিন্তু প্রেক্ষাপট এবং বিষয়বস্তু আলাদা। তবে প্রতিটি গল্প দীর্ঘ আলোচনা না করে গল্পগুলোর সারকথা বা মূল বিষয় এবং অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের কথা অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করা হয়েছে।

‘পরিযায়ী পাখি’ সিমিন দানেশ্বরের একটি বিখ্যাত গল্প। এই গল্পে লেখিকা কট্টর ইসলামিক পরিবেশে বুদ্ধিমতী এক কিশোরীর জীবন ও মৃত্যু নিয়ে ভাবনার অলৌকিক কাহিনী তুলে ধরেছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক অনুশাসনের ফলে যে শারীরিক অত্যাচার কিংবা মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়, তারই এক ভয়ংকর ও মর্মস্পর্শী কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে মাহশীদ আমীরশাহীর ‘ভয়’ গল্পটিতে। এছাড়া ‘গণনা’ গল্পটিতে লেখিকা তাহেরেহ্ আলাভি ইরানের পুরুষ শাসিত কঠিন নিয়মের সংসারে স্বামীর অবহেলা এবং মানসিক নির্যাতন যে একজন অল্প বয়সী বিবাহিতা নারীর জীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে, তারই চিত্র নিপূণ ভাবে তুলে ধরেছেন। গল্পটিতে মাথার চুল পড়ে যাওয়ার ঘটনা নারী মনের ক্ষণিকের ভাবনা এবং দীর্য সময়ের দুঃশ্চিন্তার প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পুরুষদের ভোগ্যপণ্যের শিকার হওয়ার করুণ কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে মনিরু রাভানিপুরের ‘অভিনয়’ এবং পাক্সিমা মোজাভেজির ‘আটচল্লিশটা সিঁড়ি’ গল্পে।

নস্টালজিয়া এবং স্মৃতিমাখা অতীতের সোনালি দিন ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে একাধিক গল্পে। যেমন ‘বিবর্ণ হলুদ কাগজে নীল কালির লেখা’ গল্পটিতে লেখিকা শোকুহ্ মির্জাদাগী বার্ধক্য জীবনে এক মহিলার ফেলে আসা জীবনের না-পাওয়ার বেদনার কথা তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার বংশভূত একজন অভিবাসী ইরানি বৃদ্ধ মহিলার স্মৃতিমাখা জিনিস আঁকড়ে ধরে রাখার যে আকুলি-বিকুলি, তাঁর করুণ চিত্র সোহেইলা বেসকি সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর ‘আয়না’ গল্পে। এছাড়া ‘দুর্নিবার আকর্ষণ’ গল্পটিতে লেখিকা নাহিদ রাশলিন আমেরিকা প্রবাসী এক ইরানি ডাক্তারের মাতৃভূমিতে ফিরে আসার তীব্র বাসনা এবং নষ্টালজিয়ার কাহিনী সাবলীল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

প্রিয়জনের কাছ থেকে দূরে থাকার সময় একাকিত্বের দূঃসহ যন্ত্রণা যে কত গভীর, কিংবা প্রিয়জনকে কাছে না-পাওয়ার যে তীব্র জ্বালা, তার উজ্জ্বল উদাহরণ শাহরনূর পার্শিপুরের গল্প ‘বৃষ্টি’। একই সুরে গাঁথা ফারাহনাজ আব্বাসীর ‘আয়না’ গল্পটি। দূরের জায়গায় কর্মরত স্বামীর ফিরে আসার জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং অবশেষ সেই প্রতীক্ষার অবসানের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে ‘আয়না’ গল্পে। অন্যদিকে একজন নারী লেখকের সাহিত্য জীবন এবং সার্থক গৃহিণীর দৈনন্দিন জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের চিত্র ফুটে উঠেছে জয়া পিরজাদের ‘খরগোশ এবং টমেটোর গল্প’-এ।

যদিও আজিন আরেফীর ‘প্রত্যাবর্তন’ গল্পটি শাশুড়ি-বউয়ের সম্পর্ক নিয়ে লেখা, কিন্তু শাশুড়ি-বউয়ের চিরায়ত ধারার তিক্ত সম্পর্কের পরিবর্তে এ গল্পে সুখী সংসারে বউদের, অর্থাৎ নারীদের, সনাতন ভূমিকার কথা ঈঙ্গিত করা হয়েছে।

ফারজানেহ্ কারামপুরের ‘শরণার্থী’ গল্পটিতে যুদ্ধের কারণে বাধ্য হয়ে একজন নারীর দেশান্তরী হওয়ার কঠিন অভিজ্ঞতার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে একজন যুবতী মনের ভেতর দুঃখ জমা রেখে ছবি তোলার সময় জোর করে হাসতে চেয়েও পারেনি, তারই কাহিনী অত্যন্ত সুন্দর ভাবে প্রকাশ পেয়েছে ফরিদেহ্ খেরাদমান্দের ‘নীরব হাসি’ গল্পে।

‘তাঁতি’ গল্পে লেখিকা সৌদাবেহ আশরাফি কার্পেট তৈরির কারখানায় নারী কর্মীদের কঠোর পরিশ্রম, এমনকি নিজেদের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা বঞ্চনার করুণ চিত্র অত্যন্ত নিপূণ ভাবে তুলে ধরেছেন। ‘শুক্রবারের দিনগুলি’ গল্পটিতে শিবা আরাসতুই কর্মজীবী নারী এবং গোটা পরিবারের শিশু সদস্যদের দৈনন্দিন জীবনের চাওয়া-পাওয়া এবং সুখ-দুঃখের কাহিনী অত্যন্ত প্রাণবন্ত ভাষায় তুলে ধরেছেন। এছাড়া লেখিকা প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসাবে রাজনীতিকে ব্যবহার করেছেন।

‘আমার মা, কাঁচের আড়ালে’ গল্পটিতে ফারিবা ভাফি এক কিশোরী অধিবক্তার মাধ্যমে গরীব ঘরের এক অল্প বয়সী মেয়ের জোরপূর্বক এক বৃদ্ধ লোকের দ্বিতীয় স্ত্রীর হওয়ার দুঃসহ কাহিনী তুলে ধরেছেন। একসময় মেয়েটি বৃদ্ধ স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার নামক বন্দি জীবন থেকে মুক্তি লাভ করে স্বল্প সময়ের জন্য মুক্ত জীবন উপভোগ করে। কিন্তু নিয়তির অমোঘ নিয়মে অবশেষে সে আসল কারাগারে বন্দি হয়।

‘দেয়াল’ গল্পটিতে লেখিকা শাহলা শাফিক ইসলামিক বিপ্লবের সপক্ষে আয়োজিত জনসভায় অপরপক্ষের উত্তেজিত সমর্থকদের আক্রমণে উপস্থিত দু’জন বামপন্থী নারী সমর্থকের কোনঠাসা হওয়ার আতঙ্কিত অভিজ্ঞতার কাহিনী তুলে ধরেছেন। এছাড়া বিপ্লবের পক্ষ এবং বিপক্ষ দলের কাছে বিপ্লবের সংজ্ঞা যে আলাদা, তারই চিত্র প্রকাশ পেয়েছে এই গল্পে।

ছয়. উপসংহার

উৎস থেকে উত্তরণের দূর্গম আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে বর্তমানে পৌঁছুতে ইরানি ছোটগল্পকে এক শ’ বছর পেরোতে হয়েছে। এই সময়ে বিভিন্ন পর্বে সমস্ত ইরান জুড়ে স্বৈরাচারী দুঃশাসন, সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী গণআন্দোলন, গুপ্তপুলিশ এবং গোয়েন্দাবাহিনীর তৎপরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অরাজকতা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের মতো নেতিবাচক ঘটনা বিদ্যমান ছিল। ফলে ছোটগল্প, তথা কথাসাহিত্য, অগ্রগতির পথে বারবার হোঁচট খেয়েছে, কিন্তু চলার পথ আটকে থাকেনি। বরং গত শতকের বিভিন্ন দশকে দুঃসাহসী লেখকদের লেখনীর মাধ্যমে ফারসি কথাসাহিত্যের, বিশেষ করে ছোটগল্পের, ধারা বহমান পাহাড়ী শুকনো নদীর মতো নিরন্তর বয়ে চলেছে। তবে আশা করা যায়, ইরানি ছোটগল্পের উত্তরোত্তর উন্নতির উজ্জ্বল আলো এবং বহমান ধারা একদিন ইরানের ভূখন্ড পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়বে বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গণে, যেভাবে হাজার বছর আগে ইরানের ফারসি কবিতার রোশনাই ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বব্যাপী।

নিঃসন্দেহে একথা বলা যায় যে, উত্তর-আধুনিক ফারসি সাহিত্যের উত্তরণের পেছনে ইরানি নারী লেখকদের অবদান প্রশংসনীয় এবং সর্বজনবিদিত। এ প্রসঙ্গে ইরানের বিখ্যাত সাহিত্য ও শিল্প বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘হাফ্ট’–এর সম্পাদক মজিদ এসলামির মূল্যবান কথার উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি। তিনি বলেছেন, ‘নারী লেখকরা শুধু ফারসি সাহিত্যের প্রগতিশীলতার প্রতীক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেননি, বরং লেখিকা হিসাবে নিজেদের প্রতি সমাজের দৃষ্টি ভঙ্গিও পাল্টে দিয়েছেন।’

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close