Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ‘অনুর পাঠশালা’ : সময়ের আর্তনাদ >> প্রবন্ধ

ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ‘অনুর পাঠশালা’ : সময়ের আর্তনাদ >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ July 21, 2018

ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ‘অনুর পাঠশালা’ : সময়ের আর্তনাদ >> প্রবন্ধ
0
0

ইলিয়াছ কামাল রিসাত > অনুর পাঠশালা : সময়ের আর্তনাদ >> প্রবন্ধ

 

[সম্পাদকীয় নোট : মাহমুদুল হক বাংলা কথাসাহিত্যের কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব। ২০০৮ সালের ২২ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। গত বছর তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘অনুর পাঠশালা’ রচনার পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। ১৯৬৭ সালের জুলাই মাসে তিনি এটি রচনা করেন। অভিনব আঙ্গিক, গঠনশৈলী ও নতুন চিত্রকল্পময় ভাষাবিন্যাসের কারণে ‘অনুর পাঠশালা’ উপন্যাসটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে এনে দেয় গদ্যশিল্পীর মহিমা। জুলাইয়ের কোনো এক অগ্নিহাওয়ার দিনে মাহমুদুল হক স্ত্রী কাজলকে বলেছিলেন বাবার বাড়ি যেতে, বাড়িটার মধ্যে সারাদিন একা থাকতে চেয়েছিলেন এবং একদিন ও একরাতের মধ্যে উপন্যাসটি লেখা শেষ করেছিলেন। ইতিপূর্বে আমরা অনুর পাঠশালার উপর দুটো লেখা প্রকাশ করেছি। আজ তাঁর মৃত্যুদিনটিকে স্মরণ করে প্রকাশিত হলো এই বিশেষ সংখ্যার আরও একটি লেখা। – অতিথি সম্পাদক]

 

অনুর বাবার উদাসীনতা, বহির্মুখিতা ও মায়ের দাম্পত্য-জীবনের হতাশা- এই দুইয়ের সংঘর্ষে অনু পালাতে চায় নতুন এই নাগরিক দেয়াল থেকে। উপন্যাসের শেষের দিকে অনুর মধ্যে স্বগতোক্তির মতো উচ্চারিত হয়, ‘ঘর তো নয় একটা একোরিয়াম, ফুলে ঢোল একটা মরা মাছের মতো পড়ে আছি তার ভেতর’।

আধুনিকতার ট্রেন ধরতে হবে, তা না হলে আমরা তৃতীয়-বিশ্ব কিংবা অনুন্নত কিংবা হালের ডাকনাম ‘উন্নয়নশীল’ দেশ হয়েই পড়ে থাকব। আধুনিক আর হতে পারব না। কথা হচ্ছে, এই যে সরলরৈখিক ও প্রগতিমুখী আধুনিকতার কথা আমরা বলছি, সেই আধুনিকতা যখন ইউটোপিয়া আকারে হাজির হয় তখন নিজের কৃষ্টি কিংবা জীবনাচার মুখ্য না হয়ে আমরা কী হতে চাই, তা-ই হয়ে ওঠে আরাধ্য- হোক সে অর্থনীতি কিংবা সাহিত্যচর্চায়। বাংলাদেশের উপন্যাস কিংবা মোটাদাগে কথাসাহিত্যে ইউটোপিয়াকেন্দ্রিক কথাসাহিত্য রচনা করতে গিয়ে প্রায়শই অনুচ্চারিত থেকে গেছে চর্চিত সমাজের চিত্র। মাঝে-মাঝে শুধু সমাজটাই হয়ে উঠেছে কেন্দ্র, ব্যক্তি পড়েছিল প্রান্তে। এমন এক কথাসাহিত্যের ডেরায় বাংলাদেশের বাংলা ভাষা আসলে কী নিয়ে সাধনা করছে, তার বিশ্লেষণ করলে মাহমুদুল হকের প্রতিফলন যেন মরীচিকার মতো। তাঁর উপন্যাসের অঙ্গ ও ভাষার দিকে সাধারণ দৃষ্টিতে তাকালে মাঝে-মাঝে মনে হয় এই বুঝি ধরলাম, এই বুঝি পেলাম, কিন্তু পেলাম না। অর্থাৎ একটা সময়ের ভাঙাগড়া খুব উজ্জ্বলভাবে ফুটে ওঠে তাঁর কথাসাহিত্যে।
তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘অনুর পাঠশালা’ (১৯৬৭) পড়ার পর সেই ভাবনা হাজির হয় যেখানে নব্য-নগর কিংবা ১৯৭০ দশকের ঢাকা শহরের উঠতি সমাজের সামষ্টিক চেহারাই শুধু স্পষ্ট হয়না, বরং সমাজের নানা শ্রেণি এখানে কীভাবে সহাবস্থান করে, তার একটা দলিলও পাওয়া যায়।
মোটাদাগে ব্যাখ্যা করলে ‘অনুর পাঠশালা’ উপন্যাসের কিছু দিক নিয়ে সংক্ষিপ্ত একটা পাঠ-প্রতিক্রিয়া পেশ করতে চাই। তার আগে এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ও কাহিনিবিস্তার সম্পর্কে আলোকপাত করে নেই।
উপন্যাসের মূল চরিত্র কিশোর অনু। মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চমধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। মা গৃহিনী, বাবা পেশাদার আইনজীবী। অনুর কোন ভাইবোন নেই। বাবা প্রতিদিন তার পেশার কাজে খুবই ব্যস্ত থাকে। এবং তার মা তাকে আগে অনেক সময় দিত কিন্তু ইদানিং এক ইংরেজি শিক্ষকের কাছ থেকে ইংরেজি শেখেন একটা চাকরি যোগাড়ের জন্য। এই বিশাল ঘরে অনু মূলত একাকী। এমন এক অবস্থায় অনু নিজের একাকীত্ব ঘোচানোর জন্য প্রতিবেশী বস্তির ছেলেমেয়েদের সাথে মেলামেশা শুরু করে। উপন্যাসের কাহিনির বিস্তার এখান থেকেই।
মাহমুদুল হকের ভাষায় বরাবরের মতই কাব্য-গদ্যের সংশ্লেষ থাকে। অনুর পাঠশালা তাঁর প্রথম বই, এই বইয়ে সেই সংশ্লেষ আরো শক্তিশালীরূপে হাজির। মা যখন অনুর কাছ থেকে ইংরেজি শেখার দরুণ দূরে সরে যাচ্ছিল, তখন মাহমুদুল হক আমাদের এমন ভাষার মুখোমুখি করেন :

“এইভাবে দীর্ঘ অসতর্ক মুহূর্তে নিজের অগোচরে তার ভেতরের যাবতীয় বোবা ইচ্ছেগুলো ধীরে ধীরে ফ্রিজের ঠাণ্ডা বোতলের মতো যখন ঘেমে ওঠে, এবং খাঁখাঁ দুপুরের হাঘরে ছেলেদের মতো ধুলোবালি মাখা হাওয়ার গরগরে শরীর জানালা টপকে এইসব ভিজে ইচ্ছের ওপর নাক ঘষে পরক্ষণেই আবার উধাও হয়ে যায়, তখন অকারণেই সমস্ত আকুলতার ভেতরে মাকে পাবার অদম্য আগ্রহ চিলের আর্তনাদের থরে-বিথরে পালকের মতো ভেসে বেড়ায়।”

‘বোবা ইচ্ছে’ ‘চিলের আর্তনাদ’ এসকল মেটাফোর মাহমুদুল হকের কাব্যানুরাগী ভাষার দৃষ্টান্ত। এই ভাষার দৃষ্টান্ত কোত্থেকে আসে? বিশ্বসাহিত্যের স্বল্পপাঠের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অস্তিত্বের সংকট কিংবা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস-জনিত লেখায় কাব্যিক শব্দের আনাগোনা চলতে থাকে। সমস্যা হচ্ছে, কিছু লেখক এসব কাব্যিক শব্দের আনাগোনাকে ট্রাফিক জ্যাম বানিয়ে ফেলেন। কিন্তু মাহমুদুল হক এই জায়গায় একেবারে সচেতন। কাব্য ও প্রমিত ভাষার মিশেল ও পরম্পরায় পাঠের অভিজ্ঞতা পাঠককে ভারাক্রান্ত করেনা। মাহমুদুল হক যেন খঞ্জনি বাজান এসব শব্দ দিয়ে।
মাত্র ৯১ পৃষ্ঠার পরিসরে আরো যে-দিকটি দেখার বিষয় তা হলো : সমাজের উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত অংশের মধ্যেকার সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া। আরেকটু পরিষ্কার করে বলতে গেলে ব্যাপারটা এমন- অনু যখন বস্তির ফকিরা, টোকানি, গেনদু, মিয়াচাঁন এদের সাথে মেশা শুরু করে, তখন তাদের জীবনাচারের ও ভাবনার বিস্তর পার্থক্য যেমন ফুটে ওঠে, আবার বস্তির ভাষা ও অনুর ব্যবহার করা উচ্চবিত্তের ভাষা- এই দুইয়ের সহাবস্থানও লক্ষ্য করার মতো। অনুর সাথে তাদের নানা সংলাপে মার্বেল খেলা, ব্যবহারিক জীবনে গেনদুরা কত কী জানে, অনুর পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগতকে না জানার ইঙ্গিত সব স্পষ্ট হয়ে আসে। যেমন :

“গল্প শেষ হলে গেনদুর মুখের দিকে তাকিয়ে অনু সবিস্ময়ে বলল- ‘এমন হয়?’
‘অইবো না কেল্লা? গেনদু বললে, ‘তুই এলায় অক্করে ম্যানথামারা পোলা, তরে লয়া চলে না’।
অনু বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলল, ‘ওঝা মন্ত্র শোনালে কি হবে সাপ তো আর কানে শোনে না’।
‘কান দিয়া না হুনুক জিব্বা দিয়া হোনে’।

এসব গেল ভাষা কিংবা আঙ্গিকের কথা। মূলত মাহমুদুল হকের এই উপন্যাস এক কিশোরের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের গল্প। নানা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ধার ধরে বলা যায়, উপন্যাসে অনু রবীন্দ্রনাথের ১৩-১৪ বছরের বলাইয়ের মতো সময় পার করছে। এর মধ্যে আধুনিক পরিবার-কাঠামো প্রবেশ করেছে নব্য-নগর ঢাকা’তে। যৌথ পরিবার ভেঙে সদ্য প্রবেশ করল একক পরিবারে। অর্থবিত্ত সেই সময়ে ধীরে-ধীরে সমাজের সকল উচ্চবিত্তের পণ্য-প্রদর্শনের মাধ্যম হচ্ছিল মাত্র। অনুর মায়ের সাথে খালাদের আলাপে যখন অলংকারের দাম নিয়ে কথাবার্তা হয় তখন মাহমুদুল হক নতুন এক ধরনের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের ইঙ্গিত দেন।
অনুর বাবার উদাসীনতা, বহির্মুখিতা ও মায়ের দাম্পত্য-জীবনের হতাশা- এই দুইয়ের সংঘর্ষে অনু পালাতে চায় নতুন এই নাগরিক দেয়াল থেকে। উপন্যাসের শেষের দিকে অনুর মধ্যে স্বগতোক্তির মতো উচ্চারিত হয়, ‘ঘর তো নয় একটা একোরিয়াম, ফুলে ঢোল একটা মরা মাছের মতো পড়ে আছি তার ভেতর’।
অনুর এই সামাজিক পাঠশালায় অনু না পারে ফকিরাদের সাথে ব্রিং খেলায় মেতে উঠতে, না পারে দমবন্ধ লোকদেখানো চার দেয়ালের মাঝে জীবিত লাশ হয়ে পড়ে থাকতে। এমন অবস্থায় পাঠক আবিষ্কার করে এক অন্য মাহমুদুল হককে। পরাবাস্তব এক আবহে অনুর জীবনে কল্পনার আশ্রয় হয়ে আসে ‘সরুদাসী’র মতো জীবন্ত খঞ্জনা বালিকা। বাবা-মায়ের তুমুল এক ঝগড়ার পরে এক দুর্ঘটনায় অনু আহত হয়। সুস্থ হয়ে সেই একোরিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে অনু খুঁজতে থাকে সরুদাসী নামের ভাবনার প্রেমিকাকে। উপন্যাসের মাঝামাঝি যে সরুদাসীকে আমরা রক্তমাংসে আবিষ্কার করি, সেই বালিকাকে উপন্যাসের শেষে দেখি অনুর উপর মাংসবৃষ্টি, রক্তবৃষ্টি, অগ্নিবৃষ্টি ঝরাচ্ছে! পাখোয়াজের উদ্ধত ধ্বনিতে অনু অবচেতনে চলে যায়। অনু নিজেকে কোথাও স্থান দিতে পারেনা।

“পেছনে কয়েক পা সরে এসে বিভ্রান্ত অনু বলল, ‘চলো এখান থেকে, এ তুমি কোথায় নিয়ে এলে! এখানে অন্য সরুদাসী! এখানে অন্য সরুদাসী!
ঊর্ধ্বশ্বাসে ফিরে যাবার পথে বারবার অনুর মনে হলো, জারজ নিনাদে উন্নীত পাখোয়াজের উত্তরোত্তর দ্রুততর উত্তাল ফেনিল তরঙ্গমালা পিছন থেকে পরাক্রান্ত ঘাতকের মতো তেড়ে আসছে তার দিকে।”

‘অনুর পাঠশালা’ সাহিত্যিক অবয়বে কোন নির্দিষ্ট মূল্যবোধের অভিলাষে পৌঁছায়না, বরং মিলান কুন্ডেরা কথিত ‘novel is the explorer of self’-এর লক্ষ্য ছোঁয়ার চেষ্টা করে। আধুনিক-উত্তরাধুনিক বলয় অতিক্রম করে এই উপন্যাস একটা চরিত্রের ভাঙা-গড়া-বিকাশকেই উন্মোচিত করতে থাকে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close