Home চলচ্চিত্র ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ‘ঘোল’ : ‘গণতন্ত্র’কে ব্রান্ডিং করা হচ্ছে নাকি নতুন ‘আইডিয়া’ আমদানি করা হচ্ছে? >> টিভি সিরিয়াল

ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ‘ঘোল’ : ‘গণতন্ত্র’কে ব্রান্ডিং করা হচ্ছে নাকি নতুন ‘আইডিয়া’ আমদানি করা হচ্ছে? >> টিভি সিরিয়াল

প্রকাশঃ August 28, 2018

ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ‘ঘোল’  : ‘গণতন্ত্র’কে ব্রান্ডিং করা হচ্ছে নাকি নতুন ‘আইডিয়া’ আমদানি করা হচ্ছে? >> টিভি সিরিয়াল
0
0

ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ঘোল  : ‘গণতন্ত্র’কে ব্রান্ডিং করা হচ্ছে নাকি নতুন ‘আইডিয়া’ আমদানি করা হচ্ছে? >> টিভি সিরিয়াল

 

‘সন্ত্রাস’ মানেই ‘মুসলমান’, এই ধারণাকে পরোক্ষভাবে চ্যালেঞ্জ করাতে ঘোল সিরিজ কিংবা হালের সেলিব্রিটি আরেক টিভি সিরিজ ‘স্যাক্রেড গেম্‌স (সাম্প্রদায়িক ইস্যু নিয়ে তৈরি) দেখে ভালো লাগে যে, আমাদের পাশের দেশ ভারত কত সুন্দর গণতন্ত্রের চর্চা করছে! কিন্তু না, এমনটা ঠিক পুরাপুরি ভাবতে পারছি না। কারণ, সময়টা ব্র্যান্ডিংয়ের, বাহারি পণ্যের। পণ্য বলতে শুধুই স্নো-পাউডার কিংবা ফেয়ার এন্ড লাভলি বোঝাচ্ছি না। এক-একটা আইডিয়াও অনেক বড় পণ্য হয়ে উঠছে এখন। 

‘ঘোল’ (Ghoul) শব্দটার অর্থই কোনো অশুভ শক্তির বিনাশী, ধ্বংসাত্মক বা বিপর্য়কে নির্দেশ করে। ভারতীয় এই অনলাইন টিভি সিরিজের গল্পটা এমনই। নিদা রহিম (রাধিকা আপ্তে) আর্মড ফোর্সের একজন প্রমিজিং অফিসার যে ইনটেলিজেন্সে কাজ করে। তার বাবা শাহনেওয়াজ রহিম অ্যান্টি-ন্যাশন্যাল মন্ত্র আউড়ে বেড়ান তার শিষ্যদের কানে। ফোর্সের প্রশিক্ষণ গ্রহণের সময় নিদাকে শেখানো হল যে, সন্ত্রাসী বাহিরের হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, সন্ত্রাসী নিজেদের মধ্যেই থাকে। দেশদ্রোহী নিজের পরিবারেই থাকতে পারে, সুতরাং তাদের প্রথম ঈমানি দায়িত্ব হলো নিজের পরিবারের অপরাধী সদস্যকে আইনের হাতে তুলে দেয়া। সদ্য ট্রেনিংপ্রাপ্ত নিদা তার বাবাকে এই ভেবে আইনের হাতে তুলে দিল যে, কিছুদিন পরে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিদার তাকে মুক্ত করে দেয়া যাবে। গল্পের মূল শুরুটা এখানেই। বাকিটুকু না বলাই ভাল।
নিদা চরিত্রের ক্রাইসিসটা দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। সে মুসলিম, কিন্তু দেশদ্রোহী না, এটা প্রমাণের জন্য নিরন্তর যুদ্ধ করতে হচ্ছে, রাষ্ট্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ এজেন্সির অংশ হওয়া সত্বেও। নিদার চরিত্রটা ‘শাটার আইল্যান্ড’ সিনেমার টেডির মতো কিংবা বলিউডের আরেক আন্ডাররেটেড সিনেমা ‘শহিদ’-এর শহীদ চরিত্রের মতো। তারা ভিক্টিম আবার একই সাথে এক্সিকিউটরও। তারা তাদের আইডেন্টিটির জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে ধোঁয়াশাপূর্ণ অস্পষ্ট চরিত্র। বিদ্যমান রাষ্ট্র শত নজির থাকা সত্বেও তাদের উপর নির্ভর করতে পারেনা। কেন পারেনা তার কারণটা সিরিজের প্রথমেই স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে। “আমাদের নিজেদের মধ্যেই আমাদের শত্রু আছে, তাদের চিহ্নিত করে বিশুদ্ধ জাতিসত্ত্বা গড়ে তুলতে হবে।”
উপনিবেশবাদের পরের সময়ে কিংবা ৯/১১ পরবর্তী যুগে সন্ত্রাসের সংজ্ঞা অনেক পালটে গেছে। নিজের প্রজারাই নিজেদের শত্রু। বহিঃশক্তির দিকে নজর দেয়ার চেয়ে সিটিজেনশিপের একটা মানদণ্ড বা ফর্মুলা দাঁড় করিয়ে, তাকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ধরে নিয়ে নাগরিকদের ব্রেইন ওয়াশ করা হবে। তাই তো এই সিরিজের প্রথম দিকে দেখি রাষ্ট্রীয় সিলেবাসের বাইরের সকল পাঠ্যপুস্তক পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। ঠিক ব্র্যাডবেরির উপন্যাস ফারেনহাইট ৪৫১ কিংবা একই উপন্যাস থেকে একই নামে বানানো ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর কালজয়ী সিনেমার মতো।
যে-কোন দেশেই, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেসব দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেসব দেশের মাইনরিটি গ্রুপের মেজরিটির ধর্ম কিংবা ভাষা নিয়ে একটা বাঁকা দৃষ্টি কিংবা সন্দেহ থাকে। যদি রাজনৈতিক ‘পলিটি’র দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, অর্থাৎ একটা রাষ্ট্রের নির্মাণপ্রক্রিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করি, তাহলে ব্যাপারটাকে অনেক বেশি ম্যাকিয়াভিলিয়ান মনে হবে। রাষ্ট্র যতই হেগেলীয় স্বর্গ হোক না কেন, রাষ্ট্রের জন্ম কিন্তু ভায়োলেন্সের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। সেই ভায়োলেন্সের একটা প্রধান পক্ষ থাকে, থাকে আরেকটা নীরব পক্ষ, থাকে সুবিধাবাদীপক্ষ, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- অর্থাৎ থাকে বিরোধীপক্ষ। যে ভায়োলেন্সের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের জন্ম হয়, সেই ভায়োলেন্সে এসব পক্ষ-বিপক্ষ শুধু ইতিহাসের ওই সময়েই উপস্থিত থাকেনা, বরং স্বাধীনতা পরবর্তীকালের রাষ্ট্রগঠনের সবচেয়ে জরুরি নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। তৎকালীন রাজনৈতিক সরকার এসব স্টেকহোল্ডারদের কীভাবে একছাতার নিচে নিয়ে আসছেন, সেটাই হলো দেখার। এই বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি আমাদের কাছে দারুণ চিত্তাকর্ষক হয়ে দাঁড়ায়। এই রাজনৈতিক সৃষ্টিশীল সময়কালকে পর্যবেক্ষণ করলে পরিষ্কার হয়ে যায়, সেই রাষ্ট্রের বর্তমান হালহকিকত। ঘোল সিরিজে ইসলাম ধর্মের জনগোষ্ঠীকে কীভাবে প্রো-ন্যাশনাল আর অ্যান্টি-ন্যাশনাল বানানো হলো, তার কিছুটা নজির পাওয়া যায়।
এই সিরিজের উল্লেযোগ্য বিষয় হলো এর সুপারনেচারাল উপস্থাপনার দিকটি। পুরোপুরি পলিটিক্যাল ঘরানার এই সাস্পেন্স থ্রিলারের জ্যঁর (রচনারীতি) হলো হরর ধরনের। ব্যাপারটা খেয়াল করার মতো।
‘ফারেনহাইট ৪৫১’-এর চেয়ে এই সিরিজের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যাবে ‘মিথলজিক্যাল টেকনিকে’। ঘোলে মুসলিম থিওলজিক্যাল ফিলসফির জিনতত্ত্বকে দেখানো হয়েছে। যখন সরাসরি কোনো বার্তা দেয়াটা সমাজ কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হয়ে যায়, তখন নাটক, উপন্যাস কিংবা সিনেমায় এমন সুপারন্যাচারাল এলিমেন্ট হাজির হয়। শিল্প করতে চাওয়ার এটাই মহত্ত্ব (নাকি অন্য কিছু তা পরে বলা আছে)। সাদাসিধে কথা না বলতে পারার দিনগুলোতে কীভাবে কথা বলতে হয়, তা শিখিয়ে দেয় শিল্প। ‘Creative expression of dissent against repressive authority’- অনেকটা এইরকম ঘটে।
‘সন্ত্রাস’ মানেই ‘মুসলমান’, এই ধারণাকে পরোক্ষভাবে চ্যালেঞ্জ করাতে ঘোল সিরিজ কিংবা হালের সেলিব্রিটি আরেক টিভি সিরিজ ‘স্যাক্রেড গেম্‌স (সাম্প্রদায়িক ইস্যু নিয়ে তৈরি) দেখে ভালো লাগে যে, আমাদের পাশের দেশ ভারত কত সুন্দর গণতন্ত্রের চর্চা করছে!
কিন্তু না, এমনটা ঠিক পুরাপুরি ভাবতে পারছি না। কারণ, সময়টা ব্র্যান্ডিংয়ের, বাহারি পণ্যের। পণ্য বলতে শুধুই স্নো-পাউডার কিংবা ফেয়ার এন্ড লাভলি বোঝাচ্ছি না। এক-একটা আইডিয়াও অনেক বড় পণ্য হয়ে উঠছে এখন। নেটফ্লিক্সের বদৌলতে ভারতের পরিচালকেরা ‘গণতন্ত্রে’র ব্র্যান্ডিংটা ভালই সেরে নিচ্ছেন। সারা বিশ্বে আমেরিকা ছিল বাকস্বাধীনতা মানেই গণতন্ত্র, এই ধারণার ধ্বজাধারী। এখন ধীরে ধীরে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার ‘গণতন্ত্রান্ত্রিক’ মডেলে রূপান্তরিত হয়েছে। আগে ছিল নির্বাচন ব্যবস্থা, এখন বাকস্বাধীনতা কিংবা বিরোধী মত প্রদর্শন গণতন্ত্রের মাপকাঠি হয়ে উঠছে।
এই ব্রান্ডিংয়ের ধান্দাগিরি ভালো না খারাপ এ ধরণের জাজমেন্টে যেতে চাইনা। তবে এটা ঠিক, প্রতিবেশী ভারতের দুটি সাংস্কৃতিক উপাদান আছে যা রাষ্ট্রের নাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগানো হচ্ছে। এ দুটি হলো ক্রিকেট ও বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। এই দুইয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রে এক ধরণের উইশফুল ঐক্য ও সেই সাথে নানান বৈষম্যকেও চেপে রাখা হয়। ভারতের সেভেন সিস্টার্সের দারিদ্র্য থেকে শুরু করে নানান বৈষম্য কৌশলে পাশে ফেলে রাখা হয়। এটা তাদের রাজনৈতিক ব্যাপার। সিরিজের কথায় চলে আসি আবার।
আগের পরিচ্ছেদে যা লিখলাম সেটা আমার একটা ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব (conspiracy theory)! সিনেমা কিংবা টিভি সিরিজের মতো এমন বিস্তর টাকা-পয়সা লগ্নির কারবারের মধ্যে অনেকেই মুক্তি-সংগ্রাম কিংবা শিল্পের উৎকর্ষ খুঁজে পান, কিন্তু আমি পাইনা। এখানেও ধান্দা আছে, তাই ধান্দা বোঝার চেষ্টা করছি আমি। ঘোল টিভি সিরিজটা অনেক ভালো লেগেছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার যে বাস্তবতা, সবকিছু চিন্তা করলেম ভাবনাটা আরো গভীরে চলে যায়। এই সিরিজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মানব কাউল ও মাহেশ বলরাজ। সিরিজটির পরিচালক প্যাট্রিক গ্রাহাম। সবার অভিনয় মনে রাখার মতো, বিশেষ করে ইন্টারোগেশন সেলের অন্য কয়েদিদের চরিত্র যদিও ছোট স্কেলের, অর্থাৎ স্বল্প উপস্থিতি তাদের, কিন্তু এরপরেও তাদের অভিনয় মনে ছাপ ফেলার জন্য যথেষ্ট। তবে রাধিকা আপ্তের সেরা কাজ এটা- অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে।
পুনশ্চ : বোদ্ধারা আবার আমাকে অশিক্ষিত বলতে পারেন এই ভেবে যে, তাহলে তারকোভস্কি, ডেভিড লিঞ্চ, বার্গম্যান, ফেলিনি, এরা শিল্পী নন? কিন্তু তাঁরা আসলে হ্যালির ধুমকেতুর মতো, অনেক বছর পর পর আসমানে দেখা দেন। তাই সব কিছুকেই শিল্প বলে মনে করার কোন অর্থ খুঁজে পাইনা। অন্য ধান্দাও থাকে।

Ghoul সিরিয়ালের ট্রেইলার দেখুন https://www.youtube.com/watch?v=zg0N4L4mwFk

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close