Home গদ্যসমগ্র গল্প ইশরাত তানিয়া / তারা ও মীন রাশির জাতক

ইশরাত তানিয়া / তারা ও মীন রাশির জাতক

প্রকাশঃ January 18, 2017

ইশরাত তানিয়া / তারা ও মীন রাশির জাতক
0
0

সম্পাদকীয় নোট

বিশ্বসাহিত্যে ছোটগল্পের রূপরেখার একটা ধারণা পাওয়া যায় ইতালিয়ান লেখক বোক্কাচিও-র ‘ডেকামেরন’-এর কাহিনিগুলোতে। এর অনেক পরে ইংল্যান্ডের চসার ‘ক্যান্টারবেরি টেলস’-এ ইংরেজি ছোটগল্পের প্রাথমিক ধারণা দেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু সার্থক ছোটগল্প সম্পর্কে প্রায় সম্পূর্ণ ধারণা দেন মোপাসাঁ। বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের প্রবেশ সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় অনেক পরে। সেই অর্থে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘যুগলাঙ্গুরীয়’ বা ‘রাধারাণী’ গ্রন্থে প্রথম ছোটগল্পের ধারণা দেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে স্বর্ণকুমারী দেবী তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘নবকাহিনি’-র মাধ্যমে কিছু ছোটগল্প লেখার প্রয়াস পেয়েছিলেন, তিনি ছিলেন একজন সচেতন ছোটগল্পকার। সবকিছুকে ছাপিয়ে পরবর্তী কালে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে ছোটগল্প উৎকর্ষ লাভ করার দিকে এগিয়ে যায়। তিনিই প্রথম বাংলা ছোটগল্প লিখেছিলেন বলে মনে করা হয়।

এই আলোচনার উদ্দেশ্য ছোটগল্পের অতীত নিয়ে, বর্তমান নিয়েও নয়- বরং ভবিষ্যতের ছোটগল্পের ভবিষ্যৎ কী, কোন পথে চলেছে বাংলাদেশের ছোটগল্প তার একটা ধারণা নেয়া। ‘তীরন্দাজ’ বর্তমানের ছোটগল্পকারদের গল্পভাবনা এবং প্রকাশ নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশে সচেষ্ট। এই ক্ষেত্রে যারা ছোটগল্প লিখছেন, ভবিষ্যতে যারা ভালো গল্প লিখবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা, তাদের কয়েকটি গল্পকে প্রকাশের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে আট নারী গল্পকারের গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে এই পর্ব : আখ্যানের শিলালিপি গল্পের ফলকে নারীমুখ। প্রতিষ্ঠিত গল্পকার নয়, বরং নতুন কিংবা কিছুদিন ধরে গল্প লিখছেন সেইসব গল্পকারের গল্প পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হল। পরে, আরও নতুন বিশেষ আয়োজন নিয়ে প্রকাশিত হবে অন্যদের গল্প।

এবার যে আটজন গল্পকারের গল্প বেছে নেওয়া হয়েছে সেগুলি একে একে সামান্য বিরতি দিয়ে প্রকাশিত হবে, আশা করি এই গল্পগুলো আপনাদের ভালো লাগবে। গল্পগুলি প্রকাশের পর সবগুলি গল্প নিয়ে একটি মূল্যায়নধর্মী লেখা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করার ইচ্ছাও আছে।

ছোটগল্পের নতুন ধারার লেখকদের মাধ্যমে বাংলা ছোটগল্প অন্য মাত্রা পাক এই আশাবাদ রইলো।

পাঠক, আয়োজনটি আপনাদের কেমন লাগলো, আমাদের জানাবেন।

আশরাফ জুয়েল / অতিথি সম্পাদক

ইশরাত তানিয়া / তারা ও মীন রাশির জাতক

[১]

মাঝ খালে নাও উল্টে যাবার আগে একবার দেখা যায় তার ঘোলাটে, নিশ্চল দুটো চোখ। সবুজাভ, প্রাণহীন। ঠিকরে আসা তীক্ষ্ণ নাক আর প্রাগৈতিহাসিক চোয়াল। পাথর কোঁদা ফ্যাকাশে নীল শরীরের পিচ্ছিল চামড়ায় ধূসর মিহি রেখা। ধোঁয়া ধোঁয়া বৃষ্টি আর প্রায় থুপ থুপ অন্ধকার। সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতের নিষ্প্রাণ চোখের দিকে তাকিয়ে, হাড় হিম হয়ে আসে আকবর আলীর।

মওসুমী হাওয়া উদযাপনের জন্য ভোররাতে তারা দাঁড়িয়ে, রূপসার খাল পাড়ে। খাল নামেই শুধু খাল,  দেখতে শুনতে এক্কেবারে দরিয়া। আষাঢ়-শাওনে যেন খালের দিক দিশা নাই। কূল কিনারা দেখা যায় না। তখনও বাঁশের বনে কাক ডাকে না। আকাশে একটা দুটো তারা টিমটিমিয়ে জ্বলে। বাঁশের চিকন পাতার ফাঁকে আসমানের দিকে তাকালে, ইশারায় ধোঁয়াশা মেঘগুলো সরে যায়। বাতাস এসে গাছের গা ভরা থোকা থোকা লটকন আর জামের রসে ঢুকে পড়ে। এতেই পাতার আড়ালে মায়াময় হয়ে ওঠে জাম। লটকন লাবন্যকান্তি। এদের রূপ দুচোখ ভরে দেখে তারা। টুপটাপ জাম পড়ে খালের পানিতে। ঢেউ চক্রাকারে কিছুদূর অব্দি গিয়ে কি ভেবে আবার পানির পেটে মিশে যায়। শোল কিংবা গজার, জাম কিংবা লটকন ঠেলে ডুব দেয়। আন্ধার খালে এত বোঝা যায় না।

তারার মন প্রসন্ন। এবার লটকন আর জামের স্বাদ হবে বেহেশতী। অলস দুটো হাত ধীরে ধীরে মাথার দুপাশে তুলে দেয় সে। শোঁ শোঁ হাওয়ার সে কি গজরানি! ঘূর্ণি তুলে তারাকে চোখ রাঙায়।  তারা হাত দুটো নামায় না। মাথার ওপর এক হাতের আঙুল দিয়ে আরেক হাতের কবজী মুঠো করে ধরে। ঘূর্নাবর্তের কেন্দ্রবিন্দুতে সে দাঁড়িয়ে। ক্লান্ত হলে সচরাচর তারাকে এমন ভঙ্গীতে দেখা যায়। খালে তখন পানি বাড়ে। কত যে রূপসার ছলাকলা, দুপাশের হেলেঞ্চার ঝোপ, ঢোলকলমীর কুঞ্জ, আর কোঁচড় ভরা জাম-লটকন নিয়ে, সে কই ধাইছে, কোন নদীর পানে, সে হদিশ জানে শুধু তারা। রূপসা কোন গভীরে মীন সন্তান লুকিয়ে রেখেছে সব তার জানা। একই ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে থাকে তারা।ধীরে ধীরে হাওয়ার তড়পানি কমে আসে।

আকবর আলী প্রায়ই ভোরে তারার পিছু নিয়ে খাল পাড়ে আসে। মাছ মারতে। পয়মন্ত তারা এলে মাছ জুটে ম্যালা। এক নৌকা মাছ নিয়ে আকবর আলী পৌঁছে যায় ইলিয়টচর মাছের পাইকার বাজারে। বেনবেলা রোদ মেলবার আগেই। আকবর আলীর নৌকার অনেক কদর। বাজারের ঘাটে নৌকা ভিড়লেই বেপারীদের ডাকাডাকি। অমন নানান পদের তাজা মাছ আর কেউ দিতে পারে না। হাঁকডাকের মধ্যে দরদস্তুর বনলে রঙ জ্বলা পিরানের পকেট টাকায় ভরা। কখনও রাত হয়ে গেলে, আকবর আলী হাটবাজারে দালালদের সাথে নেশাপানি করে। অন্ধকার ঘাটে বসে থাকে দিলদরিয়া। চুপ মেরে কী সব ভাবে আবোলতাবোল। একের পর এক নৌকা আসে যায়। আকবর আলী মনের ভিতর কী সব তালাশ করে।

সেই সব দিন মনে পড়ে, আকবর আলীর বাবার বাবা মানে দাদাজানের হাতের আঙুলে তসবী ঘোরে। আঙুলের নখ তসবীর দানার মতোই সাদা। সাদার ওপর গোলাপি আভা। তসবীর ঘূর্নি দেখতে দেখতে ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়ে কিশোর আকবর আলী। তার কানে ফিসফিসিয়ে মাছের গুপ্তমন্ত্র দেন দাদাজান।

“শ্মাশানের মাটি লই হাতেতে করিয়া,

বিসমিল্লা কইরা দেই পানিত পালাইয়া।

যেখানে আছে মাছ, আনহো ডাকিয়া,

মাটি পালাহ মাটীশ্বর আছেইন বসিয়া।”

 

আগুনে লোহা পুড়িয়ে বড়শী তৈরির সময় কোন মন্ত্র পড়তে হবে জানে আকবর আলী। মাছ বড়শীতে বিঁধানোর মন্ত্রও জানে। বড় শীতে কেঁচো জড়িয়ে, থুথু ছিটিয়ে মন্ত্রপড়ে পানিতে ছিপ ফেলতে হয়। তখন দুনিয়ার মাছ এসে ধরা দেয়। এইসব গুপ্তমন্ত্রের সাধন অন্যের কাছে সহজে প্রকাশ করতে হয় না, বলেছিলেন দাদাজান আর জানিয়ে ছিলেন বাদারের তেঁতুল গাছের কথা।

সেই বৃক্ষ মাটি থেকে জন্মায় নাই। বহু বহু বছর আগে উড়ে এসেছিল দক্ষিণ-পশ্চিম আসমানের উপর দিয়ে। রাতে জ্যোৎস্না ফকফকা। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে ভোর রাতে উঠেছিল তাঁরও বাবার বাবা। কিংবা সে বাবারও বাবা। তিনি কামেল মানুষ। দেখেন মাথার উপর শোঁ শোঁ শব্দ। কোনো জাঁহাবাজ জ্বীন ভেবে কলমা পড়ে বুকে থুথু দেন। আচমকা গায়ের মধ্যে চিরিচিরি পাতা ঝরে। মাঝ উঠানে পাতা পড়ে কোত্থেকে? মাথা তুলে দেখেন, বিরাট তেঁতুল গাছ উড়ে যায়। চাঁদনীর সবটুকু আলো শুষে কি পুষ্ট! সে রাতে মাটি ওজুর পানি শুষে নেয় না। পানি গড়িয়ে রূপসায় মেশে। কেয়ামতের আলামত দেখে নামাজের মাদুরে বসে তাঁর চোখ ভিজে যায়। সাদা দাঁড়ি বাতাসে কাঁপে। পরে খবর হয়। খাল পাড়ে এক তেঁতুল গাছ দেখা যায়। গাছের শিকড় তখনও মাটির গভীরে ডুবছে। কখন ভেঙে পড়ে মড়াৎ। ভয়ে কেউ ধারে কাছে ঘেঁষে না। না জানি কোন জ্বীনের ঘুম নষ্ট করে জান খোয়ায়। তেঁতুল গাছে থেকে দূরেই এখন আকবর আলী। আট আঙুল সমান কাঠি মন্ত্রপূত করে খালের পানিতে পুঁতে রাখে। সমস্ত মাছ এসে এখানে লুকাবে।

[২]

নৌকার পাটাতনে বসে আধো অন্ধকারে তেঁতুল গাছটাকে জীবন্ত প্রাণী মনে হয়। মাথার ওপর রাজ্যের কুয়াশা জড়ো করে ঝিম ধরে আছে বুড়ো তেঁতুল গাছ। নিশাচর পাখির ডাকে আরও ঘোলাটে হয় কুয়াশা। ছড়িয়ে যেতে থাকে রূপসার উপর। পানির নিচে লতাগুল্ম এদিক ওদিক করে। মাছের চলাচল  লতাপাতার ফাঁকে। আকবর আলী গাল ভরা ধোঁয়া ছাড়ে। বিড়ির গোড়া পানিতে ছুঁড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ায়। শ্মশানের মাটি মন্ত্রপূত করে মাছ ধরার জায়গায় ছড়িয়ে দেয়। কিছু পরে,হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি গুটিয়ে নাইলনের জাল ফেলে। জাল টানতেই খলবল করে রূপালি জলজ শস্যরা। জাল থেকে বেছে বেছে ডুলায় তোলে- টাকি কিংবা ট্যাংরা। আর একটা কালি বাউস। ভাবে সে, বাড়ি ফিরে নবীতনকে বলবে, টক বায়গুন, গোল আলু আর পাঁচ মিশালী মাছের সালুন রানতে। ঝাল ঝাল সুরুয়া দিয়ে গরম ভাত খাবে। সাথে ধইন্যা পাতা। লম্বা শ্বাস নিলে আঁশটে গন্ধ ছাপিয়ে তরকারীর তাজা বাস পাওয়া যায়। খিদেটা মাথা থেকে গলাবেয়ে পেটের চ্ছলাৎ পানিতে পৌঁছে ডুব দেয়। শ্বাস ছাড়লে ভুস ভুস করে মাথা তুলে খিদেটা। জানান দিয়ে যায় পুরো পেট জুড়ে।

কুদরতি গুণ তারা পেয়েছিলো খালের পাড়েই। গেল ভাদ্র মাসে তাল কুড়াতে এসে দেখে এক ফুটফুটে মেয়ে কাঁদছে। সে কি আর জানতো এ হলো পরীর বাচ্চা। আগুনের জীব। ঘরে এনে খোয়াব দেখে এই বাচ্চা ফেরত না দিলে চুবানি খালের পানিতে। এই ঘোর বিপদে ফকির মুনশী বলে- ফেরত দিয়া আয়। খাল পাড়ে বাচ্চা রেখে তারা কিন্তু আর ফেরে না। দুদিন দুরাত গেলে পর, তারা তালগাছের মাথায়। গাঁয়ের লোক মই বেয়ে অচেতন আলুথালু তারাকে পেড়ে আনে গাছ থেকে। সেই থেকে পূর্নিমায় তারার মাথা গড়বড়। ফিনিক দিয়ে জোছনার বান নামে মগজ থেকে। সারা গা ছড়িয়ে আভা বেরোয় আর রাতবিরেতে খালের পানিতে তলিয়ে যায় তারা। মাছের দেশে অপ্রত্যাশিত দেখে ভিনরাজ্যের ফলমূল আর সোনার চেরাগ। গ্রামের মহিলাদের সে তাবিজ মাদুলী দেয় না। ঝাড়, ফুঁক করে না। কবিরাজীও না। শুধু মাঝে মাঝে উধাও হয়ে যায় আর তাকে পাওয়া যায় গাছের মগডালে। মাঝে মধ্যে ক্ষেতের আলে।

তারার ছেলেপুলে নেই। এক মেয়ে হয়েমরেগেছেসেই তুফানের বছর। সেও তো প্রায় চার বছর আগের কথা। পরিণতই ছিল বাচ্চাটাতবু জন্মেই চলে গেল। পেট ঝাড়ফুঁক করে দিয়েছিল বেদেনীরা। তখনও তারার হাতে তাবিজ বাঁধা। কোন কুক্ষনে দড়ি ছেঁড়া বাছুরটা খুঁজতে গিয়ে আক্কাস গেল তেঁতুল গাছের তলায়। বালা মসিবত শুধু বাড়লই তারপর। মেয়ে তো আঁতুড়েই গেল। এক চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সেদিন। ধূলা উড়ে শুকনো লু হাওয়ায়। গাঁয়ের পূব দিকের মাটির রাস্তা ধরে হাঁটছে আক্কাস।সে বর্গা চাষী। জমি পত্তনের পাকা কথা নিয়ে বাড়ি ফিরছে। কড়কড়ে রোদের তেজ কমে আসলেও হাওয়া তীব্র গরমটুকু ধরে রাখে। কাঁধে ভাঁজ করে রাখা গামছা খুলে, মুখের ধূলা ভরা ঘাম মুছে সে। রাস্তা থেকে নামে, খালের পাড় ধরে হাঁটে কিছুক্ষণ। পাড়ের ভেজা নরম মাটির পাশে থির হয়ে আছে পানি। যেন চৈতালী বিকালে একটু জিরিয়ে নেয় রূপসা।

পা ডুবিয়ে আক্কাস টের পায় হাওয়ার মতো খালের পানিও গরম। এক পায়ের পাতা দিয়ে আরেক পা ঘষে পরিষ্কার করে। ডান পা তুলে জমিনে ফেলতেই গোড়ালিতে দাঁত ফুটালো সাপ। ঘোলাটে চোখে অবশ পড়ে রইল আক্কাস। কী সাপ কেউ দেখলো না। আক্কাসও না। তবে সেটি যে নির্বিষ ঢোঁড়া ছিল না, পরে সেটা মালুম হয়। তারা যদি জানত চম্পাই নগরের ধারে কোথায় সেই সাঁতালী পাহাড়! তবে হয়তো বিষ ঝাড়ার একটা উপায় করা যেত। দেবলোকে লক্ষ্মীন্দরকে জীবিত করেছিল স্বয়ং মনসা দেবী। বেহুলা কোথায় ভেলা ভাসিয়েছিল, তারার জানা নাই।

সম্পন্ন গৃহস্থের ঢেঁকিতে পাড় দেয় তারা, ধান ভানার কাজ করে। গৃহস্বামী চিকন কালো পাড়ের গোলাপি শাড়ি এনে দেয়। তবু মন লাগে না। কী এক বৈরাগ্যের একতারা টুনটুন করে সারাদিন। অবসরে মাটির দাওয়ায় বসে হাওয়া, রোদ্দুর কিংবা ঝড়বাদলের হিসাব করে। উঠানে মাছ কাটে জেঠিআম্মা। বটির ধারাল রূপালি পাত থেকে রক্তের চিকন ধারা গড়িয়ে পড়লে তারা নিজেকে পায় খাল পাড়ে। কবোষ্ণ পানিতে টুপটুপ ডুব দেয় পানকৌড়ি। তারা কচি হেলেঞ্চা শাক তুলে নইলে তেঁতুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে হদিশ করে জলপরীদের। যদি সওয়ালের কোনো জবাব পাওয়া যায়।

মন ভালো থাকলে তারার  ঠোঁটের কোণে হাসির আভাস। জাম গাছটা জড়িয়ে ধরে চিবুক ঘষে দেয় গাছের কাণ্ডে। দীঘল কালো চুলে জাম গাছ পাতা ঝরায়। রূপসার ঢেউগুলো উদভ্রান্তের মতো ছুটে আসে তারার কাছে। এ দৃশ্য কয়েকবার দেখেছে আকবর আলী। স্বাদযুক্ত বাতাস ছাড়াও আকবর আলীর আরেক গুহ্য ব্যাপার আছে। সে লুকিয়ে দেখে তারার রকমারি তেলেসমাতি। গাছ ধরে এত আহ্লাদের কারণ সে বোঝে না। চিবুক দিয়ে গাছ স্পর্শ করা ব্যাখ্যাহীন হয়ে থাকে। খোনকারি জানা মেয়ে, আজ কেমন চোখের পলকে হাওয়া শাসন করল। তারাকে দেখতে দেখতে তার শরীরটাও টানটান হয়ে যায়। শত আড়ালেও তারা আকবর আলীর উপস্থিতি ঠিক বুঝে যায়। এক দিন ফেরার পথে তাকে দেখে তারা থমকে দাঁড়ায়।

হেসে বলে- একটা শুলক ভাঙো দেহি?

– শুলকের সময় নাই, তুই বাড়িত যা।

– কালো গরু কালশিরে, দুধ দেয় সাত সের/ যখন গরু মনে করে, সাতশ’ নদী এক করে। এইবার কও কী সেইডা?

– ত্যাক্ত করিস না। জেডিরে কইস কাইল মাছ দিয়া যামু।

– হাইল্যার পোলা হইল জাইল্যা। হাসে তারা। মুখের ওপর লুটিয়ে পড়ছে কেশগুচ্ছ। দুহাত দিয়ে ঠেলে খোঁপা বাঁধে সে। বলে- আমার শুলুকের জবাব দিলা না?

অতশত কি আর বোঝে আকবর আলী? আজীবন তারার বুদ্ধির কাছে সে পরাস্ত। আচানক ভীষণ রাগ লাগে তার। ধুপধাপ পা ফেলে এগিয়ে যায়। হাতের লাঠির বাড়ি পড়ে লটকন গাছে। একেবারে বিনা কারণে, তেমন বলা যায় না।

 

[৩]

যে রাতে বাড়ি ফেরে না, বাজারের ঘাটলায় বসে কত কী দেখে আকবর আলী। কতদিনকার ছেড়ে আসা নৌকা ঘাটে লাগে কিংবা মাঝি গলুই ঠেলে উজানে নৌকা ভাসায়। নদীর ওপর থেকে ভেসে আসে মৌসুমী বাতাসে। ওড়ে পেঁয়াজ রসুনের শুকনা খোসা আর ঘানিতে ভাঙানো ভালা তেলের গন্ধ। হেগে আসা ছেলের পাছা ধুয়ে দেয় বাপ। ছেলের খড়ি ওঠা গাল, ফুলে ওঠা পেটের নীচে কালো কাইতন কিংবা নাকের নিচে শুকিয়ে যাওয়া সর্দি আকবর আলী দেখতে পায় না।সে বেশ দূরেই বসে। গনগনে চুলার ওপর কড়াইয়ে মুচমুচে জিলাপী ভাজে হাকিম চাচা। চিনির শিরায় ডুবায়। আগুন তাপ ছড়ায়।সে তাপ আকবর আলীর ঠাণ্ডা দুহাত আর পায়ের তলা উষ্ণ করে।

একটা জর্দা ঠাসা পান মুখে দিলে, হিমঠাণ্ডা নদীর ঢেউ নরম হয়। সন্ধ্যা যত মিশে যায় পানির রঙ তত গাঢ়। নদীর শরীরে সন্ধ্যা নামলে, ঘাসপাতার নরম মাটির ওপর আক্কাসের প্রাণশূন্য দেহের কথা মনে পড়ে। কিন্তু আকবর আলী বিচলিত হয় না। মৃত্যু স্বাভাবিক ব্যাপার। আক্কাস হাভাতে জীবন ছেড়ে গেছে। ভালোই হয়েছে। একটা আস্ত জীবন নিয়ে আকবর আলী কী করবে, তার সংকীর্ণ বুদ্ধিতে ধরা পড়ে না। শুধু তারার মুখটা কেন জানি ভাসে পানিতে। মাথার ভেতর শুলকের শব্দ ঘুরপাক খায়। আকবর আলী শুলকের উত্তর খোঁজে। আচমকা ঠরঠর করে শ্যালো ইঞ্জিন চালু হলে সে মুখ শত রকমে ভেঙে হাসতে থাকে আর নদীর পানি অন্ধকারে ঝিকমিক করে। মুখাবয়ব জুড়ে আবার ভাঙে।

গুম ধরে থাকা বাতাস ধীরে ধীরে কালোবর্ণা হয়ে যায় আর বিচ্ছিন্ন বিন্দু বিন্দু আলোর ফোঁটা জ্বলে বেদে নৌকায়। বহর থেকে খানিকটা দূরে মিটমিট করে হারিকেন জ্বলে। নৌকাগুলো জলবেশ্যাদের। আলো জমে জমে, মাঝরাতে হারিকেনের ভেতর ঢুকে পড়েছে আগুন হয়ে। বাক্স বোঝাই সাপের দঙ্গলে মোহিনী বেদেনীর নৌকায় রাত কাটে। ঝাঁপির মুখ খুললেই হিশহিশ। তবু ডরায় না আকবর আলী। বিশ্বাস করে, গায়ের আঁশটে গন্ধে সাপ পালায়। শুধু লোভীর মতো এগিয়ে আসে মেছোপেত্নীরা। তাই লুঙ্গির খুটে রসুন না হলে ম্যাচের কাঠি থাকবেই। তাজ্জব মানে আকবর আলী। সাপখোপের মধ্যেও শরীরের নীলাভ বিষ ক্ষরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সে যখন তলিয়ে যেতে থাকে নাগলোকে তারা সাঁতারে আসে বিষহরীর বেশে। ডুবে ডুবে কাছে চলে এলে নাকের রূপালী নথে নিঃশব্দে আলো ঠিকরায়। অজস্র সাপ জলকেলী করে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরে। শ্বাসরুদ্ধ আকবর আলী বোঝে এবাররুহ কবজ হবে।

 

যে সময় বাঁশমুড়ার ওপর থেকে সবে চাঁদ এসেছে টিনের ঘরের পেছনে। আকবর আলী শোনায় ছেলেবেলায় দাদাজান যা বলে গিয়েছিল। কিছু জোছনা তখন টিনের চালে পিছলে, বেড়ার ফাঁক ফোঁকরে, অপরাজিতার লতানো নরম ডালপাতায় আটকা পড়ে। ছেলে কোলে ঘোমটার নতুন বউটি যেন নবীতন। বুঁদ হয়ে গল্প শোনে।

-তোর জানডা নিয়া চিন্তায় আছি। চতুর্দিকে খালি পানি। পানিতে তোর বিপদ।

দাদাজানের কথায় ডরায় না আকবর আলী। কৌতূহলে জিজ্ঞেস করে- ক্যান?

-তুমি কী রঙ ভালো পাও? লাল না নীল।

-নীল।

-হের লাইগ্যাই তোমার মাথার পিছনে কালা আন্ধাইর থমথম করে।

আকবর আলী পিছনে তাকায়। অন্ধকার দেখতে পায় না। শুধু গরু দুটা ভুস করে মুখ ডুবায় নুনমাড়ের নাইন্দায়। তারও পিছনে গরুর পেটের তলা দিয়ে দেখা যায় ছেলের দলবসে আছে। কাঠি দিয়ে কুলা বাজায়।ছড়া কেটে আমোদ করে।

-এইসব তুমি বুঝতা না। এই আন্ধাইর দেখন যায় না।

দাদাজানের কথা শুনে ফের ঘাড় ফিরিয়ে সামনে তাকায় আকবর আলী।

বিচিত্র ভয়ে নবীতন শিউরে ওঠে। লা-ইলাহা পড়ে।

আকবর আলী তাড়া দেয়- আ-গো বেডি, ডরাও ক্যান? ভাত দেও। পেডো ভুখ লাগছে।

নবীতনের কোলে মাই টেনে টেনে ভরা পেটে ততক্ষণে ঘুমিয়েছে ছেলে। নবীতনের হুঁশ হয়। গল্পের অজ্ঞাত রহস্য থেকে টেনে নিয়ে আসে নিজেকে। মাই থেকে ছেলের মুখ সরায়। আলোগোছে কাপড় টেনে ঠিক করে। তারপর ব্যস্ত পায়ে ছেলে কোলে উঠে যায়।

দাদাজানের কথাটা ভাবতে গিয়েই খিদেটা আবার জানান দেয়। পেট থেকে আলজিব অব্দি। সূর্য ভুলেই গেছে, সকালে পৃথিবীর দিকে তার যাওয়ার কথা। যত বেলা বাড়ে, অন্ধকার জাঁকিয়ে বসে। মৃদু নড়ে ওঠে কোষা নাও। গা গুলিয়ে ওঠে আকবর আলীর। মাথায় একটু ঘূর্নি। মাঝ খালে গেলে নৌকা আর নড়ে না। বড় একটা ঘটে না এমন ঘটনা। বৈঠায় শক্ত কিছু বাড়ি খায়।

সতর্ক হয় আকবর আলী। কিন্তু কিছু করার থাকে না। অতিকায় এক দানব যেন কামড়ে ধরেছে নাওয়ের পেট। তলা ছেড়ে তারপর সরু গলুইয়ে দাঁত বসায়। আচমকা ঠাহর করা যায় না, মাছ না শুশুক? বানের পানিতে কত জীব ভেসে আসে রূপসার খালে। এক ঝলক দেখে আকবর আলী। টের পায়, এ হলো ইউনুস নবীর মাছের বংশধর। একবার দেখা যায় তার ঘোলাটে, নিশ্চল দুটো চোখ। সবুজাভ, প্রাণহীন। ঠিকরে আসা তীক্ষ্ণ নাক আর প্রাগৈতিহাসিক চোয়াল। নৌকা উল্টে পড়ার সময় আকবর আলী দোয়া ইউনুস পড়ার চেষ্টা করে কিন্তু কিছু মনে পড়ে না।

ময়ূরপঙ্খী হয়ে পানির শিঙ্গি শূন্যে উড়াল দেয়। মেঘকুয়াশা ঘনায় তেঁতুল গাছের ওপর আর বাতাস ভারী হয় জাম গাছের মাথায়। তারা মেঘ তাড়ানোর মন্ত্র পড়ে না। নেশা চিরচির করে ঢুকে পড়ে ওর শরীরে আর কুয়াশায় অস্বস্তির ছায়া পড়ে রূপসার জলে। মেঘপুরুষের বিশাল ধূসর বক্ষপুট দেখেই যেন রূপসা পাগল হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়।খালের পানিআকাশে মেঘ স্পর্শ করে।তারপর ভেঙে পড়ে দিকদিগন্তে। রূপসার উন্মত্ততায় প্রায় উড়ে যায় তারা। জাম গাছ আঁকড়ে ধরে না। ফল ভরা লটকন গাছ পেছনে ফেলে সম্মোহিতের মতো এগিয়ে যায়। থৈ থৈ রূপসা ভাসিয়ে নেয় তারাকে। শাপলার লতা মহাসমাহারে তারার শরীরে জড়িয়ে যায়। আকবর আলী ডুবে যেতে যেতে দেখে ভাসমান আঁচল।

জলের স্তম্ভ কিংবা জলজ প্রাণী হলে, শুশুক কিংবা মাছ, ডুব দেয় রূপসার গভীরতম অঞ্চলে। সে জগতের খোঁজ মনুষ্য জাতি জানে না। ভুতুড়ে জীব ফিরে যায় আদিমতম স্রোতের গভীরে। জলজলতাপাতা নিয়ে তলিয়ে যায়খালের গহীনে।লুকিয়ে পড়ে দক্ষিণ কিংবা উত্তর গোলার্ধের কোনো মহাসাগরের নির্জন অতলে।একটি অপূর্ব তেলচিত্র হয়ে শাপলার ছেঁড়াখোঁড়া গোলাপিপাপড়ি শান্তহয়ে ভাসে খালের পানিতে।

হিম শীতল নীলাভ রূপসা মৃদু বাতাসে তিরতির কাঁপে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close