Home অনুবাদ ইয়োভনি ভেরা > অন্য প্রাণীদের ভাস্কর্য করো না কেন >> ছোটগল্প >>> অনুবাদ রনক জামান

ইয়োভনি ভেরা > অন্য প্রাণীদের ভাস্কর্য করো না কেন >> ছোটগল্প >>> অনুবাদ রনক জামান

প্রকাশঃ July 27, 2017

ইয়োভনি ভেরা > অন্য প্রাণীদের ভাস্কর্য করো না কেন >> ছোটগল্প >>> অনুবাদ রনক জামান
0
0

অন্য প্রাণীদের ভাস্কর্য করো না কেন

আফ্রিকানদের জন্য এই একমাত্র হাসপাতাল। লোকটি হাসপাতালের গেটের বাইরে বসে আছে আর খেলনা তৈরি করছে কাঠখোদাই করে। হয়ে যাওয়া খেলনাগুলো নিজের চারপাশে বিছানো পুরনো সংবাদপত্রের উপর রেখেছে। ডানপাশে বসে আছে এক চিত্রকর। আঁকা শেষ হওয়া চিত্রগুলো পেছনের হাসপাতালের বেড়ার সাথে ঠেস দিয়ে রাখা। শহরের ব্যস্ত এলাকা, যানবাহনের শব্দ, মানুষের ভিড়, কথাবার্তা মিলেমিশে কোলাহলময়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে অ্যাম্বুলেন্স উপরের কমলা রঙের বাতি জ্বালিয়ে সাইরেন বাজিয়ে সামনের গাড়িগুলোকে শান্তভাবে সতর্ক করে ছুটে চলছে। আর এসবের মধ্যেই ভাস্করটি একমনে কাঠখোদাই করে হাতি আর জিরাফ বানিয়ে বনটাকেই তুলে এনেছে ব্যস্ত শহরে। যদিও তার তৈরি প্রাণীগুলোর ঘাড় বেমানানভাবে খোদাই করা। তার তৈরি প্রাণীগুলো পুরনো সংবাদপত্রের ছাপার হরফের উপর দিয়ে হেঁটে চলছে। লোকটির আফসোস হয়, ওগুলোর মধ্যে প্রাণ নেই। কখনো কখনো রেগে পাশে রাখা বাক্সের ভেতর ছুঁড়ে রাখে প্রাণীগুলোকে। হাসপাতালের গেটের সামনে কোলাহলপূর্ণ জায়গার পাশে এই খেলনাগুলোর প্রাণহীনতা দেখতে ইচ্ছে করে না তার।

“ওই কুমিরটা নেবে? দ্যাখো, কত ভালো একটা কুমির। নেবে তুমি?” হাসপাতালে আসার পর কাঁদতে থাকা একটা বাচ্চা ছেলেকে ভোলানোর জন্য ছেলেটির মা আদুরে ভঙ্গিতে বলছে। ছেলেটার ডানহাতের বাহুতে সাদা ব্যান্ডেজ করা, হাতটিকে ধরে আছে অন্যহাত দিয়ে। মায়ের কথা শুনে তার মনোযোগ চলে আসে খেলনাগুলোর দিকে। মা ওর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে চোখের দিকে তাকায়, অনুনয় করে।

“ইঞ্জেকশন নিতে হয়েছে ওকে। জানেন তো, আজকাল বাচ্চারা কেমন সূচ ভয় পায়,” মহিলা জানায় ভাস্কর লোকটিকে। তারপর কুমিরটা কিনে ছেলের হাতে দিল। লোকটি তাকিয়ে তাকিয়ে নিজের প্রাণীটাকে চলে যেতে দেখল, ছেলেটা ছোট-ছোট আঙুলে কুমিরটাকে ধরে রেখেছে। জন্তুগুলো প্রাণহীন, ভাবতেই আবার রাগ হয় তার, ইচ্ছে হয় সবগুলোকে বাক্সের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলতে। ভেবে আশ্চর্য লাগে তার, এই ছেলেটি কখনো যদি জ্যান্ত কুমির দেখে, এই শহরে, ওর চারপাশ ঘিরে রেখেছে, আর রাস্তাগুলো প্রবহমান নদী।

সাদা কোট পরিহিত এক আগন্তুক এসে একবার হাতিগুলোর দিকে তাকায়, তারপর ভাস্করের দিকে। ভাস্কর কাঠখোদাই করে জিরাফ বানাচ্ছে। আগন্তুক একটা লাল হাতি তুলে নিল হাতে, এর শুঁড় একদম শরীরের সাথে লেপ্টে আছে যাতে হাতিটি শুঁড় না তুলতে পারে। তাই বলে লাল রঙের হাতি? নেড়েচেড়ে দেখে আগন্তুক হতভম্ব হয়ে যায়, একইসাথে আমোদিতও হলো। হাতিটাকে কেনার সিদ্ধান্ত নেয়, যদিও এর খোদাই একদমই ভালো হয়নি,  দাঁত দুটোও অদ্ভুত। এটাকে অফিসের জানালায় রাখবে, ভাবে আগন্তুক, যাতে হাতিটি বাইরের মুক্ত পৃথিবীটা দেখতে পায়। কিন্তু হাতিটার কোনো চোখ নেই কেন? সম্ভবত রঙ করবার সময় ঢেকে ফেলেছে।

ভাস্কর লোকটি আচমকা খিস্তি করে উঠল।

“কী সমস্যা হলো?” পাশের চিত্রকর জিজ্ঞাসা করে।

“জিরাফটার ঘাড় দেখো।”

চিত্রকর জিরাফের ঘাড়ের দিকে তাকায় এবং দুজন সঙ্গে সঙ্গে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, ইতস্তত। ইতস্তত কারণ, হাসপাতালের পাশে- এতো অসুস্থ রোগীর পাশে এভাবে হাসাটা সহজ কাজ নয়। ভাস্কর লোকটি ভাবল, নিজের একটা মডেল বানানো যেতে পারে, কিংবা দাঁড়ানো কোনো লোকের মডেল, যে তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার প্রাণহীন জন্তুগুলোকে দেখছে। পাশের বাক্সটির দিকে তাকায় সে, সিদ্ধান্ত নেয় এটাকে ছায়ায় রাখতে হবে, দৃষ্টিসীমার আড়ালে।

“তুমি অন্যসব প্রাণী বানাচ্ছো না কেন, সিংহ বা শিম্পাঞ্জি?” চিত্রকর জিজ্ঞাসা করে। “সবসময় জিরাফ বানাও। একটামাত্র কুমির বানিয়েছিলে, সেও তো বিক্রি হয়ে গেলো!” চিত্রকরের নিজেরও প্রভাব আছে খেলনাগুলোতে। বানানো প্রাণীগুলোর মুর্তি মাঝে মাঝে সে-ই রঙ করে দেয়। লালরঙা হাতির বুদ্ধিটা তারই ছিল।

“বনগুলো দীর্ঘদিন শাসন করেছে এই হাতি। হাতি হলো বনের চাইতেও বয়স্ক প্রাণী। আবার দ্যাখো, জিরাফ তার লম্বা গলা বাড়িয়ে গাছপালার উপর দিয়ে তাকাতে পারে, যেন পুরো বনের মালিক সে নিজে। সবচেয়ে উঁচুর পাতাগুলো সে খায়, তখন হাতিগুলো কী করে জানো? কাদার ভেতর গড়াগড়ি করে কাটায় সমস্ত দিন। ব্যাপারটা মজার না? হাতি আর জিরাফের লড়াইটা কোথায় দেখেছো, বনের সবচেয়ে উপরের পাতা কে খেতে পারে?” অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজাতে বাজাতে ছুটে চলেছে আফ্রিকানদের জন্য এই একমাত্র হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে।

চিত্রকর সবিস্তারে ভাবে, একই সাথে নিজের ছবিতে ফাইনাল টাচ দিতে থাকে। ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের ছবি এঁকেছে সে। খবরের কাগজে, ম্যাগাজিনে কেবল ছবি দেখেছে, কখনো নিজের চোখে জলপ্রপাত দেখেনি। জলের রঙ অবশ্যই নীল হবে ছবিতে আবেগ ফোটাতে, ভাবে সে। যতদূর শুনেছে, মানচিত্র বা ছবিতে সব সময় জলের রঙ নীলবর্ণ হয়। যেখানে জলের পরিমাণ বেশি, যেমন সমুদ্র, সেখানকার জল একদম আকাশের মতো হয়। খুঁটিনাটি তথ্যগুলো সে চিত্রায়ন করবার সময় যথেষ্ট মনোযোগের সাথে ভেবে নেয়। যার ফলে তার এই ছবিটিতে একটা জঘন্যরকম নীল, ঢেউতোলা জলপ্রপাত প্রায় অপ্রাকৃতিক কৌশলে একটা পাথুরে গিরিখাদের উপর ঝুলে আছে।

“জিরাফ রাজকীয় ভঙ্গিতে গর্বের সঙ্গে হাঁটে। কারণ তার শরীরজুড়ে মৌলিক কারুকার্য রয়েছে যা বহন করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। এটাই তো প্রকৃত সংগ্রাম। অন্যথায় ওরা সবাই সমান, হাতির লম্বা শুঁড় আছে, চাইলেই উঁচু পাতাগুলোর নাগাল পেতে পারে, আবার জিরাফও তার লম্বা ঘাড় ব্যাবহার করতে পারে।”

ছবির এককোণে একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল এঁকে দিল। দুজন দুজনের ধরে আছে, আর চোখ মেলে নীল জলের প্রপাত দেখছে। চিত্রকরের ইচ্ছা, এই জল এবার সুর করে গেয়ে উঠুক প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলের জন্য। তাই ছবির উপরের দিকে একটা পাখি এঁকে দিলো। পাখিটি ডানা মেলে জলপ্রপাতের দিকে যাচ্ছে আর ঠোঁট খোলা, গান করছে। তার মনে হলো, এর চেয়ে একটা পায়রা আঁকলেই ভালো হতো। এই পাখিটা কুচকুচে কালো। কাকের মতো দেখাচ্ছে।

ভাস্করটি সামান্য রঙ ধার করল তার কাছ থেকে। একটা খাটো ঘাড়ওয়ালা জিরাফের গায়ে হলুদ ও কালো রঙের বিন্দু এঁকে দিচ্ছে। অনেক দিনের বোঝাপড়ার পর সে আসলে মেনেই নিয়েছে যে নিখুঁতভাবে জন্তু খোদাই করা তার পক্ষে সম্ভব না। তাই বলে সেগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয় না। তার ধারণা, আফ্রিকানদের জন্য এই একটিমাত্র হাসপাতাল থেকে বেরুবার কালে কেউ না কেউ স্পষ্ট খুঁতওয়ালা হাতি ও জিরাফ দেখে উল্লসিত হয়ে উঠবে। জিরাফটার গায়ে বিন্দু আঁকা যখন শেষ হলো, দেখা গেল, ওটার গা বেয়ে রঙ চুইয়ে পড়ছে। তাতে অনেকটা জেব্রার মতো মনে হচ্ছে।

“কুকুর বা বিড়াল বানাও না কেন তুমি? আরো কিছু জন্তু বানাও যেগুলো শহরের লোকজন আগে দেখেছে। যদি ইঁদুর বানাও, সেও ভালো। শহরে প্রচুর ইঁদুর!” বলেই দুজন হেসে উঠল। চিত্রকরের মনে হলো, জলপ্রপাত থেকে নিশ্চয়ই জল ছিটকে এসে প্রেমিক-প্রেমিকা দুজনকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। তাই সে দুজনের মাথার উপর লাল একটা ছাতা এঁকে দিল। তার মনে হলো ছবিতে কী যেন নেই। সামান্য ভেবে প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলের একটা হাত লম্বা করে, হাতে হলুদ আইসক্রিম এঁকে দিল। এবার ছবিটা জীবন্ত হয়ে উঠল, একদম প্রাণবন্ত।

“একটা কুকুর খোদাই করে বানানোর কোনো মানে আছে? বরং তুমি কেন ছবিতে কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর-এসব আঁকছ না?” বলল ভাস্কর। সে আগে কখনো এতটা সোৎসাহে হাতি বা জিরাফ বানায়নি। এক টুকরো কাঠ বের করল আরেকটি খেলনা বানানোর জন্য।

কাঠের টুকরোটা হাতি হবে, নাকি জিরাফ? এই কাজটাই তার একমাত্র স্বপ্ন।

ইয়োভনি ভেরা

কবিত্বময় আর কঠিন কঠিন বিষয় নিয়ে গল্প-উপন্যাস রচনার জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। জন্ম ১৯৬৪ সালে জিম্বাবুয়েতে। পড়াশোনা করেছেন কানাডায়। ওখানে পড়ার সময়ই ‘অন্য প্রাণীদের ভাস্কর্য করো না কেন নামে তাঁর ছোটগল্পের বইটি প্রকাশিত হয়। জিম্বাবুয়ে থেকে প্রকাশিত হয় উপন্যাস ‘নেহান্ডা’ (১৯৯৫)।  পরের বছর প্রকাশিত ‘আন্ডার দ্য টাং’ উপন্যাসের জন্য ‘কমনওয়েলথ আফ্রিকা পুরস্কার’ অর্জন করেন। তাঁর অন্য উপন্যাসগুলি হচ্ছে ‘বাটারফ্লাই বার্নিং ‘, ‘দ্য স্টোন ভার্জিনস’। পেয়েছিলেন সুইডিশ পেন সাহিত্য এবং ম্যাকমিলান সাহিত্য পুরস্কারও। প্রতিভাবান এই কথাসাহিত্যিক ২০০৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close