Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ উদ্যানের ধারাবাহিকতা > অনূদিত ছোটগল্প >> হুলিও কোর্তাসার >>> অনুবাদ : তানভীর আকন্দ

উদ্যানের ধারাবাহিকতা > অনূদিত ছোটগল্প >> হুলিও কোর্তাসার >>> অনুবাদ : তানভীর আকন্দ

প্রকাশঃ June 28, 2017

উদ্যানের ধারাবাহিকতা > অনূদিত ছোটগল্প >> হুলিও কোর্তাসার >>> অনুবাদ : তানভীর আকন্দ
0
0

উদ্যানের ধারাবাহিকতা

গল্পকার কোর্তাসারের কথা

আর্হেন্তীয় লেখক হুলিও কোর্তাসারের সাথে আমরা হয়তো একেবারেই অপরিচিত নই, তবে লাতিন আমেরিকার অন্য অনেক লেখক যেমন মার্কেস, বোর্হেস বা ফুয়েন্তেসের মতো কোর্তাসার এতোটা পরিচিত বা পঠিতও নয়। বিশেষ করে তার রচনাগুলোর তেমন কোনো অনুবাদ চোখে পড়ে না। তবে কোর্তাসার সম্পর্কে যারা অবগত, তারা জানে বিশ্বসাহিত্যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়ে দাঁড়াতে পারে কোর্তাসারের লেখাগুলো। ষাট ও সত্তরের দশকে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের যে অভ্যুত্থান, যাকে বলা হয় লাতিন আমেরিকান বুম, তার অন্যতম পুরোধাব্যক্তিত্ব হুলিও কোর্তাসারের জন্ম ১৯১৪ সালের ২৬ আগস্টে। সে সময় তার পিতামাতা থাকতেন বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে। কোর্তাসারের জন্ম সেখানেই। কিন্তু জার্মান বাহিনী বেলজিয়াম দখল করে নেয়ায় তারা চলে যান সুইজারল্যান্ডে, এরপর স্পেন হয়ে আর্হেন্তিনায় এসে থিতু হন। কোর্তাসারের যখন ছয় বছর বয়স, তখন তাদের ছেড়ে যান চলে যান তার বাবা। কোর্তাসার মা ও বোনের সাথে বুয়েনস এইরেসে বসবাস করতে থাকেন। ছোটবেলা থেকেই কোর্তাসার ছিলেন রোগা, বেশিরভাগ সময়ই থাকতে হত শয্যাশায়ী। ফলে সময় কাটতো বই পড়ে। হয়তো সে সময়টাই তাকে একজন ভবিষ্যৎ লেখক হিসেবে গড়ে তুলেছে। কোর্তাসারের মা-ও ছিলেন বইপাগল এবং একাধিক ভাষায় দক্ষ। কোর্তাসার বিভিন্ন সময় বলেছেন তার জীবনের এই সময়টার কথা, যেটা ছিল বইয়ে পড়া কল্পজগৎ আর বাস্তবের মিশেলে রোমাঞ্চিত এক শৈশব। বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দর্শন ও ভাষাতত্ত্বের উপর পড়তে যান কিন্তু আর্থাভাবে সে পাঠ সম্পন্ন করতে পারেন নি। পেশাজীবনে স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন বেশ কিছুদিন। আর্হেন্তিনার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন ফরাসি সাহিত্যে অধ্যাপনাও করেছেন। অনুবাদক হিসেবেও চাকরি করেছিলেন কিছুদিন একটি সংগঠনে। ১৯৫১ সালে ফ্রান্সে চলে যান এবং আমৃত্যু সেখানেই বসবাস করেন। ১৯৫২ সাল থেকে মাঝে মাঝেই তিনি ইউনেসকোতে দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য বেশিরভাগ লেখাই ফ্রান্সে বসে লিখেছেন। লাতিন আমেরিকার সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর প্রবল সমর্থক ছিলেন কোর্তাসার। ১৯৮৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন তিনি, তবে কেউ কেউ তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে এইডসের কথাও বলে থাকেন।

গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই কোর্তাসারের সাহিত্যিক অবদান রয়েছে। শুধু লাতিন আমেরিকায়ই নয় সমগ্র হিস্পানি সাহিত্যেই কোর্তাসারের প্রভাব লক্ষ করা যায়। মার্কেস, এমনকি বোর্হেসও কোর্তাসারের লেখার ভক্ত ছিলেন। তার রচনাগুলোয় রহস্যঘন এক জাদুবাস্তব আবহ দেখতে পাই আমরা। তার গল্পগুলোয় যেমন গল্পের কাঠামো ও বিন্যাসে, ঘটনার পরম্পরা নির্মাণে এমন এক অভিনবত্ব দেখা যায়, যাতে কোর্তাসারের বিশেষত্ব ও মৌলিকত্ব দুটোই আলাদাভাবে চোখে পড়ে। পাঠকের মন ও বুদ্ধিতে চমক লাগিয়ে সৃষ্টি করেন এমন এক মোহজাল যা পাঠককে দ্বিতীয়বার ভাবাতে বাধ্য করে। প্রতিটি লেখাই বিষয় ও কাঠামোর দিক থেকে স্বতন্ত্র। বাস্তবতার সাথে কল্পনার অদ্ভুত জগৎ এমনভাবে মিলে-মিশে যায়, যাতে করে সেগুলো পাঠককে দেয় এক ভিন্নতর অভিযানের অভিজ্ঞতা। আর পাঠকও আবিষ্কার করেন প্রথাগত রচনাশৈলীর বাইরে কোর্তাসারের বৈপ্লবিক স্বাতন্ত্র্য।

‘উদ্যানের ধারাবাহিকতা’ গল্পটি কোর্তাসার-এর গল্পসংকলন Blow-up and Other Stories থেকে নেয়া Continuity of Parks গল্পের অনুবাদ। এখানে Paul Blackburn ও David Page এর ভিন্ন দুটি ইংরেজি অনুবাদের সাহায্য নেয়া হয়েছে। আয়তনের দিক থেকে গল্পটি অতি ক্ষুদ্র হলেও কাঠামো ও বিন্যাসের দিক থেকে গল্পটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, যেখানে বইয়ের ভেতরের বাস্তবতা ও বহির্জগতের বাস্তবতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, আর কোর্তাসারের বয়ান-বিন্যাসে আমরাও প্রথমে বিভ্রান্ত হই- বাস্তব-অবাস্তবের পৃথকীকরণে, আর পরক্ষণেই আবার বুঝতে পারি, বুঝতে পেরে চমকিত হই। এছাড়া গল্পটির বর্ণনায় আমরা দেখতে পাই এডগার এলান পো’র গল্পের মতোই সাসপেন্স। কোর্তাসার এলান পো’র দ্বারা যে প্রবাভিত হয়েছিলেন তা সহজেই অনুমেয়, এমনকি পো’র সমগ্র গদ্য রচনার অনুবাদও করেছিলেন তিনি হিস্পানি ভাষায়। সামগ্রিক বিচারে গল্পটি কোর্তাসারের সাহিত্য-বৈশিষ্ট্যের প্রতিনিধিত্বকারী একটা রচনা হতে পারে। আশা করি, ধীরে ধীরে কোর্তাসারের অন্যান্য লেখাও বাঙালি পাঠকের হাতে এসে পৌঁছাবে।

উদ্যানের ধারাবাহিকতা

হুলিও কোর্তাসার

বেশ কিছুদিন আগেই উপন্যাসটি পড়া শুরু করেছে সে। জরুরি কিছু ব্যবসায়িক আলোচনার জন্যে বইটি নামিয়ে রাখতে হয়েছে তাকে। এস্টেটে ফিরে আসবার পথে ট্রেনে বসে আবার বইটি খুলে বসল, ধীরে ধীরে গল্পের কাহিনি ও চরিত্রের মাঝে নিজেকে ডুবে যাবার অনুমতি দিল সে। সেদিন বিকেলে, একটি চিঠি লিখে এস্টেটের ম্যানেজারকে পাওয়ার অফ এটর্নি প্রদান করে এবং যৌথ-মালিকানা সংক্রান্ত আলোচনা সেড়ে নিয়ে পড়ার ঘরের শান্ত পরিবেশে আবার সে বইয়ে মনোযোগ দিল। পড়ার ঘর থেকে ওক গাছে ঘেরা উদ্যানটি চোখে পড়ে। প্রিয় আরামকেদারায় গা এলিয়ে দিয়ে বইটির কথা ভাবল সে। তার চেয়ারটি দরজার দিকে পেছন ফিরিয়ে রাখা, কেননা ঘরে, এমনকি হুট করে কারও ঢুকে পড়ার চিন্তাটিও তার বিরক্তি উৎপাদন করে। সবুজ মখমলের গদিতে অনবরত বাম হাতটি বুলাতে বুলাতে শেষ অধ্যায়গুলো পড়ায় মনোনিবেশ করল সে। সাথে সাথেই মনে ভেসে উঠল চরিত্রগুলোর নাম আর তার মানস-কল্পনায় তৈরি হওয়া প্রতিটি দৃশ্য, আর তখন উপন্যাসটিও তার মনের ভেতরে মোহজাল বিস্তার করতে শুরু করল। প্রতিটি লাইনের সাথে সাথে চারপাশের পরিবেশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেবার, আর একই সাথে সবুজ মখমলে মোড়া চেয়ারটির পেছনের উঁচু প্রান্তে মাথা হেলান দিয়ে রাখার অনুভূতি, হাতের নাগালের মধ্যে পড়ে আছে সিগারেট- এই ভাবনা, এবং বড় বড় জানালাগুলির বাইরে উদ্যানের ভেতর ওক গাছের তলে নেচে বেড়াচ্ছে অপরাহ্ণের মাতাল হাওয়া। এসব বিষয়ই তাকে দুর্বৃত্ত এক পুলকের স্বাদ দিল। শব্দের পর শব্দে পাত্র-পাত্রীর হীন সংকট শুষে নিচ্ছে তাকে, নিমগ্ন করছে এমন এক বিন্দুতে, যেখানে ছবিগুলো স্থায়ী হয়ে যায় আর ধারণ করে রং আর গতিশীলতা। আর সেই পাহাড়ি কেবিনের মাঝে চূড়ান্ত সংঘাতের সাক্ষী হয়ে উঠল সে।

প্রথমে ঢুকল মেয়েটি, চেহারায় তার উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে; এরপরই তার প্রেমিকের প্রবেশ, গাছের ডালে লেগে মুখের চামড়া কেটে গেছে তার। পরম সোহাগে চুমু দিয়ে ক্ষতস্থানের রক্তপড়া বন্ধ করতে গেল মেয়েটি, কিন্তু ছেলেটি তার এই আদর প্রত্যাখ্যান করল। ঠিক সেই মুহূর্তে জঙ্গলের ভেতরে শুকনো পাতা আর লুকানো পথের আশ্রয়ে আবারও সে কোনো গোপন অভিসার সম্পন্ন করতে আসে নি। বুকের সাথে চেপে থাকা ছুরিটির উষ্ণতা অনুভব করল সে, আর তার নীচেই চাপা পড়ে আছে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা, লাফ দিয়ে বের হয়ে আসার জন্যে প্রস্তুত। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ধরে সরীসৃপের স্রোতের মতন নেমে যাচ্ছিল এমনই মোহনীয় আর রুদ্ধশ্বাস এক কথোপকথন, যেন-বা কারও মনে হতে পারে এইসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হচ্ছে অবিনশ্বর কোনও এক জগৎ থেকে, এমনকি প্রেমিকের দেহের চারপাশে মোচড় দিয়ে ওঠা চুম্বনগুলোও, যেন তাকে সেখানেই বেঁধে রাখতে চাইছে, চাইছে নিরস্ত্র করতে। অনভ্যস্ত হাতে তারা এঁকে নিয়েছিল অন্য দেহটির কাঠামো, আগে সেটাকে নষ্ট করতে হবে। পরিকল্পনায় কোনও খুৎ ছিল না তাদের: এলিবাই দাঁড় করানো, অনাকাঙ্ক্ষিত বিপত্তির কথা ভেবে রাখা আর সম্ভাব্য ভুলগুলো খতিয়ে দেখা। ঠিক সেই সময় থেকে প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিটি মুহূর্তই সাবধানতার সাথে কাজে লাগানো হয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায় প্রতিটি খুঁটিনাটি পরপর দুইবার খতিয়ে দেখা হয়েছে, একটি হাত শুধু একটি গাল ছুঁয়ে আদর করতে পারবে—এই আশায়। তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। কেউ কারও দিকে না চেয়ে, যে যার কাজ ঠিক করে নিল, যে কাজগুলোকে তারা অপেক্ষমান রেখেছে এতক্ষণ। কেবিন দরজার সামনে গিয়ে আলাদা হয়ে গেল তারা। উত্তরের দিকে চলে যাওয়া পথ ধরে মেয়েটিকে যেতে হবে। তার ঠিক উল্টো দিকের পথে ছেলেটিকে। একমুহূর্ত ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌঁড়ে চলে যাওয়া মেয়েটির দিকে তাকাল সে, খোলা চুলগুলো তার বাতাসে উড়ছিল। পরক্ষণেই উল্টো ঘুরে দৌড়াতে শুরু করল ছেলেটিও। গাছপালা আর বেড়ার ফাঁকে ফাঁকে নিজেকে লুকিয়ে রেখে দৌঁড়াতে থাকল সে, যতক্ষণ না গোধূলীর হলদে কুয়াশার মাঝে গাছে ঢাকা পথটি দৃষ্টিগোচর হয়। পথটা সোজা চলে গেছে বাড়িটির দিকে। কুকুরগুলোর ডেকে উঠবার কথা নয়, ডাকেও নি তারা। আর সেই সময়ে এস্টেট ম্যানেজারেরও থাকার কথা নয় সেখানে, এবং সে ছিলও না। বারান্দার তিনটি সিঁড়ি ভেঙে বাড়িতে ঢুকে পড়ল ছেলেটি। কানের ভেতরে রক্তস্পন্দনের ধপধপ আওয়াজ ছাপিয়ে মেয়েটির কথা ভেসে এল তার কাছে : প্রথমে নীল একটি কামড়া, তারপর একটি হলঘর, এর পর কার্পেটে-মোড়া সিঁড়ি। একেবারে উপরতলায় দুটি দরজা। প্রথম ঘরটিতে কেউ নেই, দ্বিতীয় ঘরটিতেও না। আর তারপরই বৈঠকখানার দরজা, আর তারপর—হাতে উঠে এল ছুরি, বিশাল জানালা গলে ঢুকে পড়া আলো, সবুজ মখমলে মোড়া আরামকেদারার পেছনের উঁচু প্রান্ত আর উপন্যাসের বইয়ে মগ্ন চেয়ারে বসে থাকা সেই মানুষটির মাথা।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close