Home অগ্রন্থিত একটি অগ্রন্থিত দুর্লভ সাক্ষাৎকার > বিষয় নজরুল-নাসিরউদ্দিন ও সওগাত

একটি অগ্রন্থিত দুর্লভ সাক্ষাৎকার > বিষয় নজরুল-নাসিরউদ্দিন ও সওগাত

প্রকাশঃ May 28, 2017

একটি অগ্রন্থিত দুর্লভ সাক্ষাৎকার > বিষয় নজরুল-নাসিরউদ্দিন ও সওগাত
0
1

বিষয় নজরুল >  একটি অগ্রন্থিত দুর্লভ সাক্ষাৎকার

[সম্পাদকীয় নোট : আমাদের ইচ্ছা ছিল নজরুলের জন্মদিনে নজরুল-নাসিরউদ্দিন-সওগাত-একটি সাক্ষাৎকার এই দুর্লভ অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করার। কিন্তু নানা কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। তীরন্দাজের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে আজ সেটি প্রকাশিত হলো। উল্লেখ্য, এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল সরদার জয়েনউদদীন সম্পাদিত বই পত্রিকার পঞ্চম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা, জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৬, জুন ১৯৬৯ সালে। বানানসহ মূল লেখার সবকিছুই এখানে অবিকৃত রাখা হয়েছে। লেখাটির সঙ্গে যে আলোকচিত্র ব্যবহৃত হয়েছিল সেই ছবিটি এই লেখার কভার ডিজাইনে দেখতে পাবেন পাঠক। ওই ছবির শিরোনাম ছিল : ‘১৯২৯ সালে নজরুল সম্বর্ধনার সময়ে নাসিরউদ্দিন সাহেবের ছবি।’]

নজরুল-নাসিরউদ্দিন-সওগাত-একটি সাক্ষাৎকার

নজরুল এলেন, জয় করলেন, স্তিমিত হয়ে গেলেন। এখনও কলকাতায় গেলে সেই ‘বিদ্রোহী’ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দেখা যায় জীবন্ত; অথচ তিনি নীরব, নিশ্চল ও অভিব্যক্তিহীন। তাঁর সাহিত্য এখনও বাংলা সাহিত্যে ‘বিদ্রোহী’ হয়েই রইলো, কিন্তু ‘বিদ্রোহী’র স্রষ্টার মধ্যে এখন আর কোন বিদ্রোহই নেই।

যাঁরা নজরুলের সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিশেছেন, তাঁদের অনেকেই নজরুলের অসুস্থতার নানা কারণ ব্যাখ্যা করে থাকেন, কিন্তু ‘সওগাত’ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সাহেব বলেন, নজরুলের অসুস্থতার একমাত্র কারণ তার অত্যধিক কাজের চাপ। একজন মানুষের শরীর টিকিয়ে রাখার জন্যে যে খাদ্য ও বিশ্রাম প্রয়োজন, নজরুলের তার কোনোটাই ছিল না। রাত্রি জাগরণ ও স্রেফ চা ও পান খেয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার ফলে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

নাসিরউদ্দিন সাহেবকে জিগগেস করেছিলাম, আপনি সেটা বুঝতে পেরেছিলেন কবে?

তিনি জবাব দিলেন, ফজলুল হক সাহেব ‘নবযুগ’ নামে একটি পত্রিকা বের করবেন এবং তাঁর ইচ্ছে নজরুল হবেন তার সম্পাদক। হক সাহেবের সঙ্গে আমার হৃদ্যতা ছিল, আমার ওপরই দায়িত্ব পড়লো নজরুলকে হক সাহেবের কাছে নিয়ে যাবার। হক সাহেব কথা বলে চলেছেন, কিন্তু নজরুল সম্পূর্ণ নিরুত্তর। হঠাৎ কথার মাঝখানে নজরুল বলে উঠলেন, ‘আপনার জন্য বাণী আসবে।’ সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং অর্থহীন কথা।

আমি ও হক সাহেব কেউই বুঝতে পারলাম না এই অসংলগ্ন উক্তি। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হলো নজরুল স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। পরে অনুমান সত্য বলে প্রমাণিত হলো।

কিন্তু নজরুল তো নবযুগ পত্রিকা সম্পাদনার ভার নিয়েছিলেন?

হ্যাঁ, নিয়েছিলেন। তবে তিনি বেশিদিন কাজ করেননি। আর নজরুল নবযুগের কয়েকটি সম্পাদকীয় কবিতায় লিখেছিলেন।

যে সমস্ত সাহিত্যিক ও সাহিত্যসেবীদের একান্ত সংস্পর্শে নজরুল এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে নাসিরউদ্দিন সাহেব নিঃসন্দেহে অন্যতম। বহু সময়, নজরুলের সুখে দুঃখে যিনি অকৃপণ হস্ত প্রসারিত করেছেন, আজ সওগাত সম্পাদক অতি বৃদ্ধ; ১৮৮৯ সালে তাঁর জন্ম; ভালোভাবে পড়তে পারেন না বলে ম্যাগনিফাইয়িং গ্লাসের সাহায্য সব সময়ই নিতে হয় এবং অতীত সম্পর্কে বলতে গেলেই তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে আসে, যেন স্মৃতির অতল থেকে তিনি কথা সংগ্রহ করে আনছেন।

জিজ্ঞেস করলাম, নজরুলের সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয় কবে হয়?

নাসিরউদ্দিন সাহেব হেসে জবাব দিলেন, নজরুলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের আগে তাঁর লেখার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল।

কীভাবে?

নজরুল করাচির বাঙালি পল্টন থেকে লেখা পাঠাতেন। এখন ভাবতে আমার আনন্দ লাগছে, নজরুলের প্রথম প্রকাশিত রচনা ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’ আমার সওগাতেই (সওগাত, জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬) প্রকাশিত হয়।

নাসিরউদ্দিন সাহেবের মুখে এই কথা শোনার পর আমার মনে হলো, আমি যেন একটি জীবন্ত ইতিহাসের সামনে বসে আছি। যে নজরুলকে নিয়ে আজ দেশব্যাপী জাগরণ, তার মূলে যাঁরা উৎসাহ জুগিয়েছেন, নাসিরউদ্দিন সাহেব তাঁদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ। প্রশ্ন করলাম,

এরপর থেকেই সওগাতে নজরুলের লেখা নিয়মিত প্রকাশ পেতে থাকে?

না।

কেন?

নজরুল প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বাণ্ডিল বাণ্ডিল লেখা পাঠাতে থাকেন। কিন্তু আমি লক্ষ করে দেখেছি, তার সেকালের লেখার প্রায় সবই ছিল আবেগ আর উচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ। আমি সেজন্যে ছাপতে চাইনি।

না ছাপানোর জন্যে নজরুল অভিযোগ করতেন না?

করেছিলেন একবার, তবে সেও কবিতা দিয়ে। কবিতাটির নাম ‘কবিতা সমাধি’। কবিতাটি উদ্ধৃত করছি :

পরিশ্রমে গলদঘর্ম,- সারা নিশি জেগে

ভাবশিরে মুহুর্মুহু লাঠ্যাঘাতি রেগে,

সে কি লেখা লিখিলাম মহা মহা পদ্য!

অক্ষর একুন করি যোজিলাম চৌদ্দ।

মৃচ্ছকটিক আর শব্দসার ভ্রমি’

আনিলাম কাব্য এক শব্দকল্পদ্রুমি!

রচিলাম কি বিকট শব্দ বাছি বাছি,

জাহাজে বেঁধেছে যেন শত শক্ত কাছি!

কবিদের ভাব সব না-বলিয়া নিয়া

সাহিত্য আসরে এনু গুম্ফ আস্ফালিয়া!

এ লেখা কি ব্যর্থ হয়?- তবে নামই মিছে!

‘বাহ্ ভাই।’ বন্ধুরা কয় দন্ত সঙ্ঘ খিঁচে!

চাটুবাক্যে লুব্ধ হয়ে কবিতারাশিকে

পাঠালাম ছোট বড় সকল মাসিকে।

সম্পাদক অভদ্র সে দেয় না উত্তর,

বিষম রুখিয়া শেষে লিখিনু, ‘দুত্তোর!

টিকিট খেয়েছ মম- যেতে দাও,- এবে

হে ভদ্র, কবিতাগুলি ফিরায়ে কি দেবে?’

শেষে সে সহস্র পত্র লেখার দরুণ

‘রিপ্লাই’ আসিল ওহো, ভীষণ- করুণ!

‘অবশ্য, কিছুও তার পাই যদি ঘেঁটে-

‘কবিতা সমাধিপূত পেপার বাস্কেটে!’

– হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম

এটি ছিল একটি হাসির ও ব্যঙ্গ কবিতা। ছাপা হয় ১৩২৬ সালের আশ্বিন মাসে।

‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’ ও ‘কবিতা সমাধি’র মাঝে আর কোনো লেখা ছাপেননি?

হ্যাঁ, ১৩২৬ সালেই তাঁর ‘স্বামী ছাড়া’ নামে একটি গল্প ছাপা হয়েছিল।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, যে নজরুলের নামের সঙ্গে আমরা ‘কবি’ শব্দটি অবিচ্ছেদ্যভাবে যোগ করছি, সেই নজরুলের সাহিত্যচর্চা শুরু হয় গল্প দিয়ে। আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য, নজরুলের বাল্যবন্ধু কথাশিল্পী শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যচর্চা শুরু হয় কবিতা দিয়ে। নজরুল-নাসিরউদ্দিন সাক্ষাৎ তখনও হয়নি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। সৈনিকেরা একে একে দেশে ফিরছে। নজরুল ফিরলেন, তবে আত্মীয় স্বজনের বুকে নয়- কলকাতায়, এবং হাওড়ায় নেমে প্র্রথমেই সওগাত অফিসে।

মিলিটারি পোশাক পরা। আমিতো প্রথমে ভয় পেয়ে গেলাম। নাসিরউদ্দিন সাহেব বললেন।

আমি কাজী নজরুল ইসলাম।

নজরুলের তরফ থেকেই প্রথম পরিচয় এলো। নাসিরউদ্দিন সাহেব বলে যেতে লাগলেন।

নজরুলকে বসালাম, চা পানি খাওয়ালাম। অনেক গল্পগুজব হলো। ওখানেই আলাপ প্রসঙ্গে নজরুল বললেন, যুদ্ধ তো শেষ হয়ে গেছে, এখন আমি লেখায় মনোযোগ দেবো।

যুদ্ধ ফেরৎ নজরুল তরুণ সামজের মধ্যমণি। অতি অল্প দিনে সমগ্র বাঙ্গালী হৃদয় জয় করার এমন দুর্বার ক্ষমতা কোন সাহিত্যিকের ইতিপূর্বে হয়নি। ইতিমধ্যে নজরুলের প্রথম প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ (সওগাত ১ম বর্ষ, ১২শ সংখ্যা, কার্তিক ১৩২৬) ও প্রথম গান ‘উদ্বোধন’ (সওগাত ২য় বর্ষ, বৈশাখ ১৩২৬) ছাপা হয়েছে।

নজরুল লিখে চলেছেন দু’হাতে। ইতিমধ্যে নজরুল মাসিক ‘নওরোজে’ চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু নওরোজ পাঁচ সংখ্যা বেরুনোর পর বন্ধ হয়ে যায়।

নাসিরউদ্দিন সাহেব বললেন,

নজরুলকে আমি সওগাতে নিয়ে এলাম। আমি আমন্ত্রণ জানালাম তাঁকে, মুসলিম সমাজকে লেখার মাধ্যমে জাগাতে হবে। নজরুল রাজি হলেন। তার সঙ্গে শর্ত হলো- সওগাতের জন্যে প্রতি সংখ্যায় গল্প, কবিতা, গান ইত্যাদি চাই।

নজরুল সওগাতে যোগ দেন কোন সময়?

১৩৩৪ সালের অগ্রহায়ণ মাসে।

সওগাতে যোগ দেয়ার পর নজরুলের প্রথম লেখা কোনটি? ঐ মাসেই প্রকাশিত ‘অগ্রপথিক’ কবিতা। সওগাতে নজরুলের লেখার হিসাব দেওয়া সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। অজস্র লেখা ছাপা হয়েছে সওগাতে, যার জন্যে নাসিরউদ্দিন সাহেবকে ‘মাসিক সওগাত’ ছাড়াও ‘সাপ্তাহিক সওগাত’ প্রকাশ করতে হয়েছিল। সওগাতে নজরুল কয়েক বছর ছিলেন।

নজরুলের লেখার যে উদ্দামতা, তা তাঁর ব্যক্তিজীবনেও অত্যন্ত প্রকট। স্থিতিহীন নজরুল বাংলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, কলকাতার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, এ অনুষ্ঠান থেকে সে অনুষ্ঠান, ফুটবলের মাঠে, সর্বত্র- নাসিরউদ্দিন সাহেবকে হিমসিম খেতে হয় সওগাত বের করতে। সওগাতের প্রুফ দেখতেন হাবিবুল্লাহ বাহার ও কবি মঈনুদ্দিন। দুজনের ওপরে দায়িত্ব থাকতো- ধরে নিয়ে এসো নজরুলকে। আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে নাসিরউদ্দিন সাহেব বললেন।

নজরুলকে বহুদিন খেলার মাঠ থেকে ধরে আনতে হয়েছে।

তিনি আরও বললেন, একবার তো তাঁকে তালা দিয়ে রেখেছিলাম।

তালা দিয়ে!

হ্যাঁ, সওগাতে ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের প্রথম কিস্তি ছাপা হয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তির সময় নজরুলের দেখা নেই। শেষ পর্য়ন্ত তাঁকে পাওয়া গেল, তখন ঘরে তালা দিয়ে বললাম, লিখুন।

কাগজ কলম চা পান দিন।

দিলাম। প্রথম কিস্তি কি লিখেছি মনে নেই। একটা পত্রিকা চাই।

দিলাম।

খানিকপর নজরুল চীৎকার শুরু করলেন, আমি বাইরে যাবো, কাজ আছে আমার।

বললাম, উপন্যাস লিখে তবে ছাড়া পাবেন।

নজরুল লিখলেন। কিন্তু আপনারা একটি বিষয় লক্ষ্য করে থাকবেন, ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস অনেকটা পারম্পর্য়হীন মনে হয়। তিনি নানাকাজে এত ব্যস্ত থাকতেন যে, ধারাবাহিক উপন্যাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারতেন না।

আজ নজরুল জীবন্মৃত হয়ে আছেন। কিন্তু নাসিরউদ্দিন সাহেব এখনো আমাদের মধ্যে বর্তমান। তিনি যেন একটি জীবন্ত ইতিহাস।

আজ সওগাতের গর্বের বিষয়- ১৯২৯ সালের ১৫ই ডিসেম্বর তারিখে তরুণ নজরুলকে সংবর্ধনা দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি যে সম্মান দেখানো হয়েছিল, তার তুলনা নেই। অনেকেই- হিন্দু ও মুসলমান- প্রতিবাদ করেছিলেন, কিন্তু নাসিরউদ্দিন সাহেবের অকৃত্রিম প্রচেষ্টায়, বৈজ্ঞানিক প্রফুল্লচন্দ্র রায়, নেতাজী সুভাষ বসু ও ব্যারিস্টা্র এস. ওয়াজেদ আলীর মতো ব্যক্তিত্বের আগমনে সেদিন কারো প্রতিবাদ টেকেনি।

১৩২৫ সালের অগ্রহায়ণ মাসে যে প্রগতিশীল সচিত্র মাসিক সওগাতের জন্ম, তা বলা যায়, একদিক থেকে নজরুলের স্মৃতি পত্র হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে রইবে।

[বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে]

 

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. বাহ! অসাধারণ! প্রিয়কবি নজরুল সম্পর্কে না-জানা অনেক কিছুই জানতে পারলাম। বিশেষ করে “মৃত্যুক্ষুধা” উপন্যাসটি সম্পর্কে যে-তথ্য পেলাম, তা আগে কখনো পাই নি।
    শ্রদ্ধেয় ড. মাসুদুজ্জামান স্যারের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। আর তীরন্দাজের জন্য অফুরন্ত শুভ কামনা!

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close