Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ একটি টঙ-ঘর ও একজন মজিদ > ছোটগল্প >> মেঘ অদিতি

একটি টঙ-ঘর ও একজন মজিদ > ছোটগল্প >> মেঘ অদিতি

প্রকাশঃ June 24, 2017

একটি টঙ-ঘর ও একজন মজিদ > ছোটগল্প >> মেঘ অদিতি
0
0

একটি টঙ-ঘর ও একজন মজিদ 

 

কাজরি দু’ তিনবার ডেকে গেছে মজিদকে কিন্তু মজিদ ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে কোন ভাবনায় যে ডুবে আছে কোনো কথাই তার কানে ঢুকছে না। কাজরি আবার আসে। আবার ফিরে যায়। আবার আসে অসহিষ্ণু পায়ের চাপে শুকনো পাতাগুলো মাড়িয়ে। কাছে এসে কাচের চুড়িগুলোয় রিমঝিম শব্দ তুলে ও ডাকে, বাজান! এবার মজিদের ঘোর কাটে। কিন্তু কাজরির ডাকে উঠি উঠি করেও শেষে আর উঠতে পারে না। বাতেন দোকানে নেই। সামান্য নুন চিনি কেউ নিতে এলে সে বা বাতেন না থাকলে তাকে ফিরে যেতে হবে। এদিকটায় মাইল তিনেকের মধ্যে সদাইপাতির আর কোনো দোকান নেই। যে কোনো প্রয়োজনে সবাই মজিদের দোকানেই আসে। এখানে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, চিঁড়ে, তেল, নুন, মোমবাতি, দেশলাই, ফাইভ স্টার-ক্যাপটেন সিগারেট, বিড়ি, তেতুলের চাটনি, প্রাণের ডালভাজা, পটেটো ক্র‍্যাকার্স কী নেই! সারাদিন টুকটাক বেচাকেনা লেগেই থাকে। কাজেই দোকান বন্ধ করে খেতে যাওয়া কোনো কাজের কথা নয়। দোকান ছেড়ে সে ওঠে না তাই।  ইতিউতি তাকায় আর ক্যাশবাক্সের পাশে শুয়ে থাকা নিরীহ একটা প্লাস্টিকে মোড়ানো প্যাকেটের গায়ে হাত বোলায়। বাতেন কখন দোকান ছেড়ে বেরুলো মনে করতে না পেরে মাথার শিরা দপদপিয়ে ওঠে রাগে, মনে মনে বলে, হারামজাদা একটা। কাজরি আবারও বাজান বলে ডাকতে গেলে মজিদ প্যাকেটটা সজোরে আঁকড়ে ধরে কষে কাজরিকে ধমক দেয়,  যা তুই এখান থিকা। আজ খাবুনে কয়ে দিচ্ছি। কাজরি বাপের এমন রাগকে ভয় করে না। হাতের কাচের চুড়িতে মিঠে বোল তুলে বলে হাত নেড়ে নেড়ে বলে, খাতি তো হবি না কি! না খালি পর শরীর টিকবেনি! মা ঘরে বইসি আছে, অ বাজান যাও খায়ি নাও। নাহয় আমিই দোকানে কিছুক্ষণ বসি! বাতেন আলি পর চলে যাবুনে।

মজিদ এবার গর্জে ওঠে , না! ঘরে যাতি বলিছি?

কাজরি এবার সরে যায়।

মজিদ বেঞ্চিতে এসে বসে। তার হাতে বাজারের থলের ভেতর প্লাস্টিকে মোড়া সেই প্যাকেট। দোকানের দিকে তাকিয়ে তার বড় একটা দোকানঘরের কথা মনে হয়। এটা আসলে দোকান নয়, টঙঘর কিন্তু মজিদ তাকে দোকান ভাবে। দোকানের ঝাঁপে লাল রঙে সে বাতেনকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে মজিদের দোকান। সামনে দুপাশে বাঁশের বেঞ্চি ফেলে বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গরমকালে যেন রোদের আঁচ খদ্দেরের মুখে না পড়ে সেদিক ভেবে দু দিকের বড় দুটি আম গাছের মাঝখানে সে টঙের দোকান সাজিয়েছে। বাতেন, মজিদের বছর এগারর ছেলে, একমাত্র পুত্রসন্তান। কাজরি বড়। পেট পোছা আরেকটা মেয়েও আছে মজিদের। নাম গোলাপী। বাতেনকে লেখাপড়া শেখাতে চেয়েছিল মজিদ। কিন্তু বাতেন ক্লাস ফাইভের পর স্কুল পালিয়ে বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো ছেলেদের সাথে মিশতে শুরু করলো। টের পেয়ে মজিদ কিছুদিন মারধর করে স্কুলে পাঠাতে চেয়েছে কিন্তু বাতেনের স্বভাবের পরিবর্তন হয়নি আর। শেষে পড়ানোর আশা বাদ দিয়ে মজিদ একরকম জোর করেই তাকে দোকানে বসতে বাধ্য করিয়েছে। প্রথম দিকে বাতেন ঘাড় ত্যাড়ামো করত খুব। সুযোগ পেলেই দোকান ছেড়ে পালাত। এখন সে মজিদের পুরোপুরি বশে এসেছে। কিন্তু আজ আবার তার কী হলো? গেল কোথায় সে হারামজাদা!

হাতের থলে চেপে ধরে সে দোকানের সামনের জায়গাটায় একবার বেঞ্চে বসে একবার উঠে অস্থির হয়ে হাঁটে। দু একজন খদ্দের সদাই নিতে আসে। শুকনো মুখে সে খদ্দের বিদায় করে। গলা শুকিয়ে কাঠ সহসা। কান মাথা ঝাঁঝাঁ করে গরম লাগছে অথচ এটা পৌষ মাস। এ উপসর্গ নতুন দেখা দিয়েছে। সামান্য অস্থির হলেই এমন হচ্ছে। কাল জামালপুর স্টেশনেও হয়েছিল। বাড়ি ফিরতে অনেকটাই দেরী হয়েছিলো মজিদের। এ দোকান ও দোকান করে অন্তত পাঁচটা দোকানে দরাদরি করে শেষ পর্যন্ত ফজলের দোকানে যখন আবার সে ঢোকে তখন বিকেল পাঁচটা। ফজল তৈরিই ছিল। নগদে টাকা বুঝে নিয়ে মজিদের হাতে সে প্যাকেট চালান দিলে মজিদ মাইল তিনেকের রাস্তা পায়ে হেঁটেই স্টেশনের দিকে চলে যায়। পাঁচটার লোকাল লেট করলেও ছেড়ে গেছে তার পৌঁছানোর অল্প কিছু আগে। এরপরের ট্রেন সাড়ে নটায়, যমুনা এক্সপ্রেস। টমটম বা নছিমন-করিমনে সে ভরসা রাখে না। রাতবিরাতে অন্ধকারে একবার উল্টে গেলে আর দেখতে হবে না কাউকে। অগত্যা শিমলাপল্লী যাবার শেষ ভরসা ওই রাত সাড়ে নটার যমুনা। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ বিড়ি টানে। তারপর প্যাকেটটাকে ডান পায়ের তলায় চেপে রেখে বেঞ্চিতে বাম পা তুলে সামান্য আয়েশ করে বসে । ডান পায়ের কাছেই কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে এক নেড়ি কুকুর। অকারণ তার পেটে ডান পা দিয়ে গুঁতো দেয় সে আর কেঁই করে উঠে কুকুরটা সরে যায়। মজিদের খিদে পায়। একবার ভাবে মুড়ি আর চানাচুর খাবে কি না। পরক্ষণে মনে হয় খামোখা দশটা টাকা পানিতে যাবে। মজিদের পাশে একটা পাগলও এসে বসেছে। পাগলের দিকে চোখ পড়তে মজিদ কুঁকড়ে যায়, কেন যে পাগলেরা স্টেশন এত ভালবাসে, যে কোনো স্টেশনেই এদের সাথে দেখা হয় ওর। এসব ভাবতে ভাবতে তার খিদেখিদে লাগে। খিদে থেকে সামান্য ঝিমুনি আসে। ঝিমুনির মধ্যেও ও প্যাকেটটা পায়ের তলে চেপে রাখে। কিন্তু ঘুমালে তো চলবে না। ঘুম ঠেকাতে মজিদ এবার উঠে সামনের চায়ের স্টলে গিয়ে দাঁড়ায়। দোকানির হাত থেকে চা নেয় তারপর হাতে ধরা প্যাকেটটাকে বগলের নিচে চেপে ধরে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক পানওয়ালা তাকে লক্ষ্য করে বলে ওঠে- প্যাকেটটা ওই কোণাত রাখি চা টা আরাম করি খান ত ভাই। কেউ লিবে না। মজিদ তাতে আরও আড়ষ্টবোধ করে। পানবিক্রেতা তার লালচে দাঁত বের করে হাসে, উটাত দামী কিছু আছেনি? বগলছাড়া কইচ্ছেন না যে! মজিদ উত্তর করে না। ঘুরে দাঁড়িয়ে বিরস মুখে চা খায়। তখনই টের পায় তার কান মাথা ঝাঁঝাঁ করতে শুরু করেছে আর ভীষণ গরম লাগছে। পানবিক্রেতা উত্তর না পেয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে চিৎকার করে, এ্যায় পান পান, সিগ্‌রেট.. প্লাটফর্ম ঝমঝম কাঁপিয়ে তখুনি ঢুকে পড়ে যমুনা এক্সপ্রেস।

বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে কাল তার রাত সাড়ে এগার হয়েছিল। বৌটা আধপাগলী। কখনও ভালোই থাকে কখনও ছিট ওঠে মাথায়.. ভালো থাকলে এই দেরীর জন্য তাকে দু কথা শুনতে হত। হতই। সাথে চোখ জুড়ে থাকত হয়ত সন্দেহ। এখন কিছুদিন ছিটিয়াল আছে বলে রক্ষা। বড় মেয়ে কাজলি দাওয়ায় বসে মশার কামড় খেতে খেতে বাপের অপেক্ষা করছে। কাজলির মা দু তিনবার কাজলি কোয়ানে গিলি বলে বলে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। মজিদ কাছে এসে মেয়েকে ডাকে, তন্দ্রায় পাওয়া কাজলি ঘোরচোখে মজিদের দিকে তাকায়, চিনে উঠতে পারে না। মজিদ আবার ডাকে, কাজলিইই! এবার চমকে ঘুমভাঙা বড় বড় চোখে সে বাপকে দেখে সোজা হয়ে বসে। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বড় হাই তোলে, চুল অনাবশ্যক খুলে আবার খোঁপা বাঁধে। ঘাড় কাৎ করে জিগ্যেস করে- আইজ এত দেরী ক্যান বাজান? বলেই আর উত্তরের অপেক্ষা করে না সে। দ্রুত হারিকেন হাতে ঢুকে পড়ে রান্নাঘরে। বাপকে খেতে দিতে হবে। মজিদ এই ফাঁকে ঢুকে যায় খড়ের গাদার পাশে ছোট গোয়ালঘরটায়। আজকাল এখানে আর গরু ছাগল নেই। একটা গরু ছিল। গেল মাসে চুরি হয়ে গেছে। এখন এখানে রাখা হয়েছে রান্নার লাকড়ি, পুরনো ভাঙা হাড়ি কলসি আর একটা পুরনো রঙ জ্বলে যাওয়া টিনের ট্রাঙ্ক। তাতে আবার তালা মারা আছে। মজিদ টর্চ জ্বেলে তালাটায় চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিতেই তালা খুলে যায়, ও ঝটপট প্লাস্টিক মোড়ানো প্যাকেটটা সেখানে চালান দেয়। আর কাজরি সরু গলায় ডেকে ওঠে বাজান! অ বাজান!  কই গেলা! মজিদ দ্রুত কলতলায় চলে যায়। বলে, বালতি কনে? এই আন্ধারে তো চক্ষে দেখিনে কিছু.. কাজরি দ্রুত ঘর থেকে গামছা বের করে হারিকেন হাতে কলতলায় যায়।

সকালের আলো ফোটার আগেই মজিদ উঠে গোয়ালঘরে যায়। ট্রাঙ্ক খুলে প্যাকেটটা বের করে। দোকানে ক্রেতার ভিড় শুরু হবার আগে তাকে টঙঘরের ঝাঁপ তুলতে হবে। হাতমুখ ধুয়ে সে তার দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শীতগ্রীষ্ম সাতসকালেই মাটির উনুনে আঁচ পড়ে তার টঙঘরের সামনে। আজ আবার উত্তুরে হাওয়ার জোর খুব। বাতেন বাপের পুরোনো সোয়েটার পরে উঠে এসে ধোঁয়া সামলে চোঙে ফুঁ দিয়ে আঁচ ধরাচ্ছে। মজিদ দাঁড়িয়ে বাতেনের আঁচ ধরানো দেখে। ধোঁয়া কমলে নিজেই বড় কেৎলি উনুনে বসায়। বিস্কুটের বয়াম দুটোতে গুণে গুণে নোনতা মিষ্টি দু রকমের কুড়িটা করে বিস্কুট রাখে। শীতের সকালে আগুনের তাপে সে তার হাতদুটোকে উষ্ণ করে টঙঘরে উঠে যায়। ক্যাশ বাক্সের পাশে প্যাকেটটাকে রেখে মজিদ আশেপাশে আরেকবার তাকায়, শুকনো ঠোঁটদুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নেয়। হরিপদ জ্যাঠা এসে সামনের বেঞ্চিতে বসে। আজকের দিনের প্রথম কাস্টমার। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বেঞ্চিগুলো ভরতে থাকবে। শীতের সকালে গরম গরম চায়ের লোভে লোকজনের ভিড় বাড়তেই থাকে। হরিপদ বাতেনের হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে বয়ম খুলে নিজেই দুটো নোনতা বিস্কুট তুলে নেয়। মজিদ হরিপদ জ্যাঠা বললেও তার বয়স মেরেকেটে পঞ্চাশ হবে। সশব্দে চা’য়ে চুমুক মেরে এক চোখ সরু করে বাতেনের কাজ দেখতে দেখতে হরিপদ হঠাৎ গলা তোলে, তা মজিদ যে কাজে টাউনে গেছিলে, সিডা হইছে? বাতেন এক মনে পানের বোঁটাগুলো কাঁচি দিয়ে সমান করে কেটে ভিজে লাল সালুর কাপড়ে তাদের ঢেকে রাখছে। ছেলেটার সামনে এমন প্রশ্নে মজিদের কেমন অস্বস্তি হয়। সে সামান্য উশখুশ করে। পরক্ষণে ভাবে হরিপদর মত দু চারজন  আছে বলেই না তার পকেটে দু’টো ডাল ভাত খাবার পয়সা আসে। সে হরিপদর দিকে তাকিয়ে ঘাড় কাৎ করে সায় দেয় তারপর ইশারায় বলে চা শেষ করে দোকানের বাম পাশে এসে দাঁড়াতে। হরিপদর চোখদুটো সহসা চকচক করে ওঠে। চায়ের কাপে অর্ধসমাপ্ত চা রেখে সে তড়িঘড়ি দোকানের বাম দিকে গিয়ে দাঁড়ায়। মজিদের কাছ থেকে একটা মাঝারি ঠোঙা হাতে নেয়। তারপর হনহন করে বাড়ির রাস্তা ধরে। মনে মনে হরিপদকে সে শালা লুইচ্চা বলে গালি দেয়। হরিপদর কীর্তির কথা কে না জানে। তবে কেউ টু শব্দটিও করে না। এরমধ্যে দোকানে চায়ের খরিদ্দার বেড়েছে। মজিদ হাত চালাতে তাড়া লাগায় বাতেনকে। একশো গ্রাম চিনি নিতে আসা রহিমার ম্যাক্সি ছাপিয়ে উঁচু হয়ে থাকা বুকের দিকে তার চোখ যায়। আড়চোখে তাকিয়ে মজিদের হঠাৎ হরিপদ জ্যাঠা হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। পরক্ষণে বাতেনের দিকে চোখ পড়ে। মনে মনে কেন্নোর মত গুটিয়ে নেয় সে নিজেকে।

পরপর আসে নবা ফজলুর দল। উঠতি বয়স। ওরা সব বাংলা সিনেমার কাস্টমার। সিনেমা হলে মুক্তি পাবার আগেই মজিদের কাছ থেকে এরা নতুন সিনেমাগুলো দেখে নেয়। আজকাল হিন্দি সিনেমার সিডিও সে আনে। নতুন বিয়ে হওয়া মেয়েগুলো আর এই ছোঁড়াগুলোর আবার হিন্দি সিনেমার নেশা। যুবক আর বুড়ো দামড়াগুলোর অন্য নেশা। হরিপদর পর আরো দুজন এসেছিল। হাতে হাত দিয়ে বিদায় করতে করতে মজিদ তখনও দেখেছে তাদের চোখের তারায় ফুটে উঠছে যেন কাম। এ ব্যবসায় সে নতুন। এবার নিয়ে তিন দফায় তার নতুন সিনেমার সিডি কিনে আনা। রফিক তাকে বুদ্ধি দিয়েছিল  মুক্তি পাওয়া ছবিগুলো হলে প্রদর্শনের আগেই সিডি করে নগদে ব্যবসা করার। এ ব্যবসা রফিকও করে আসছে বেশ কিছুদিন ধরে। তবে কী করে ছবি হাতবদল হয়ে রফিকের কাছে পৌঁছায় তা মজিদ অতশত বোঝেও না। সে শুধু কপি করে শিমলাপল্লী নিয়ে যায় আর কাস্টমারকে নগদ পয়সার বিনিময়ে ভাড়া দেয়। এবার এসব নতুন ছবির সিডির ফাঁকে সে বয়ে এনেছে নীল ছবির সিডি। হরিপদদের চাহিদা সে রফিককে জানিয়েছিল কেবল তারা ন্যাংটোকালের বন্ধু বলে। এবার তাই নতুন ছবির ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে নতুন আইটেম। এতদিন সে যেসব ছবি এনেছে তা সবই রমরমিয়ে চলেছে। আর ঝমঝম পয়সা এসেছে। রফিক তাকে বলেছে এবারের  নতুন আইটেম না কি খুবই হট (শব্দটা রফিকের বলা) ও একদম নতুন। তাই ডাবল পয়সা। এইসব আইটেম চালাতে পারলে নাকি ছ কি আটমাস, মজিদ তারপর হাফবিল্ডিং দিতে পারবে। মজিদ ভাবে আর মেয়েটা, তারও তো বিয়ের বয়স হলো। এবার একটা বিয়ে দিতে হবে। কাজরির মায়ের তো মাথার দোষ, যা কিছু চিন্তাভাবনা, দায় সবই মজিদের। আমগাছটার নিচে পাতা বাঁশের বেঞ্চিতে বসে বাতেনের অপেক্ষায় সে এইসব সাত পাঁচ ভাবে।

বাতেনকে ঠিক তখুনি বাতাসের চাইতে দ্রুত গতিতে দৌড়ে আসতে দেখা যায়। দূর থেকে সে চিৎকার করে কিছু বলে যা নানা চিন্তায় ডুবে থাকা মজিদের কানে অস্পষ্ট হয়ে বাজে। কাছাকাছি এসে বাতেন আরেকবার চিৎকার করে বাজান.. সম্বিত ফিরে পেয়ে মজিদ দেখে বাতেন দৌড়ে আসছে। বাতেনকে দেখেই তার আবার শিরা দপদপানো শুরু হয়। শুকনো লাকড়ির কাছাকাছি, হাতের নাগালে বাতেনকে পাবার অপেক্ষায় সে  দাঁড়িয়ে থাকে। দৌড়াতে থাকা বাতেনের হাঁফ ধরে গেছে।  কাছাকাছি এসে আরেকবার সে কোনোরকম বাজান বলতে না বলতেই মজিদ উনুনের একটা লাকড়ি  তুলে নিয়ে বাতেনকে মারতে শুরু করে। আইজ তুর একদিন কি আমার..

বাতেন মার খেতে খেতেই বলতে থাকে, অ বাজান… বাজারে তোমার নাম করি ওরা খুঁজতিছে..

ওরা? ওরা কারা? ফির মিছে কথা কস?

বাতেনের পিঠে লাকড়ি সরু আঁশ বিঁধতে থাকে। মার খেতে খেতে সে আবার বলে, বাজান পুলিশ।

পুলিশ? তারে খোঁজে ক্যান!

উত্তরে হাওয়া কি কমে গেল না কি! এই শীতেও তার এত গরম ভাতের ধোঁয়ার মত কান মাথা দিয়া ধোঁয়া বের হয় কেন সে বুঝতে পারে না!

রোগা পা দুটোতে বল পায়না যেন।  সে তো কাউরে খুন করে নাই। পুলিশ ক্যান।

মজিদ কি করবে বুঝতে না পেরে, হাতে ধরে থাকা থলের ভেতর সেই প্যাকেটটা নিয়ে হনহন করে বাড়ির ভেতরে গোয়াল ঘরের চিপায় চলে যায়। ফিরে আসে খালি হাতে। এসেই দোকানের ঝাঁপ ফেলতে শুরু করে। মারের ব্যথা ভুলে বাতেন বাপকে অবাক চোখে দেখে।  বলে, বাজান তুমার কী হইলে? শইল খারাপ লাগেনি?

মজিদ ফের খিঁচিয়ে উঠে বাতেনকে বলে –সর, সর, যা তুই..

মজিদের মাথা ঘুরে কেমন সব অন্ধকার হয়ে আসতে শুরু করে। পুলিশ ততক্ষণে তার টঙ ঘরের সামনে। মোট পাঁচজন। পুলিশ দেখে মজিদের পেটের নাড়িভুঁড়ি প্যাঁচ খেতে থাকে। দাঁড়িওয়ালা কনস্টেবল এগিয়ে এসে জিগ্যেস করে, তুমিই মজিদ?

মজিদ উত্তর করার আগেই বাতেন বলে, স্যার চা খাইবেন? খুব ভালো মশলা চা। আপনেরা বসেন, পাঁচ মিনিটে চা খাওয়ামু। বলে বেঞ্চি মুছতে থাকে লাল গামছা দিয়ে। পুলিশেরা পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করতে করতে নিজেদের ভেতর কিছু বলাবলি করে। তারপর বেঞ্চিতে বসে। মজিদ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই নিশ্চল দাঁড়িয়ে। পা দুটোর আম গাছের মত শিকড় বেরিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরল কি না বুঝতে পারে না সে। বাতেন এক দৌড়ে বাড়িতে ঢুকে শরীফ মেলামাইনের পিরিচ আনে। তাতে  বিস্কুট সাজিয়ে গরম গরম চা পাঁচজনের হাতে দেয়। চা খেতে খেতে একজন আরেকজনকে উদ্দেশ্য করে বলে, চুরি ডাকাতিতেই দ্যাশটা শ্যাষ হয়ি যাবিনে।

মজিদের কানে চুরি শব্দটা এসে আঘাত করে।

কনস্টেবল চায়ের কাপ হাতে বাম দিকে ঘুরে বসে মজিদকে জিগ্যেস করে, কী হে তুমিই মজিদ?

মজিদ কোনোরকম উত্তর করে, জে..

কনস্টেবল আবার বলে, তা মিঞা মূর্তির মত দাঁড়ায়া উয়ানে কী কর? ইদিক আসো।

মজিদের বুকে এবার হাতুড়ি পড়ে দুম দুম। বুকের ধড়াস ধড়াস শব্দ যেন বাতেন শুনতে পায়। সে উঠে বাপের হাত ধরে আস্তে করে আম গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়।

তা মজিদ, এই দোকান তুমার কতদিনের?

পৌষের শীত. অথচ মজিদের শরীরের ঘাম মাথার চুল থেকে পায়ের রোমকূপ ভিজিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। বাতেনের সামনে আল্লাহ তাকে এ কেমন পরীক্ষায় ফেললো! ও খুদা ক্যান আমি রফিকের কথায় এরম ব্যবসা করতি গেলাম। এখন যে মান সম্মান সবই যায়..

বাতেন কথা বলে উঠে, বাজানের শইলডা খুব খারাপ স্যার।

কনস্টেবল বাতেনের দিকে তাকিয়ে বলে, অ, তা তুমার বয়স কত, নাম কী?

বাতেন বলে- আমার নাম বাতেন। বয়স এগার।

মজিদ শরীরের ঘাম নিয়ে অস্থিরতা নিয়ে আম গাছের গায়ের সাথে সেঁটে যেতে যেতে টের পায় পেট থেকে বমি উঠে আসছে। নিজেকে আর সামলাতে পারবে না সে।

শূন্য কাপগুলো রেখে তখন পুলিশ উঠে দাঁড়ায়। কনস্টেবল একটা পান খেতে চায়। বাতেন দ্রুতহাতে তাকে পান বানিয়ে এগিয়ে দিলে কনস্টেবল মজিদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মজিদ মাথা নিচু করে ফেলে। কনস্টেবল জিগ্যেস করে, তা মজিদ মিঞা, হারিস মিঞার বাড়িডা কুনদিকে কও তো!

বাতেন চটপট দেখিয়ে দেয়, পুবদিকের আরো পাঁচটা বাড়ি পরেই হারিস চাচার বাড়ি। কেন স্যার?

কনস্টেবল উত্তর না করে এবার পুবের বাড়িগুলোর দিকে পা বাড়ায়। বাকি চারজনের একজন বলে, তার আর কাজ কি! আবার চুরি করিছে। চুরে চুরেই সব ভরি গ্যাল।

তাকে নয়। হারিসকে ধরতে তাহলে এরা এসেছে। মজিদ একটু একটু করে প্রাণশক্তি ফিরে পেতে পেতে দেখে পুলিশ হারিসের বাড়ির রাস্তা ধরে এগোচ্ছে আর আকারে তারা কেমন ছোট হয়ে আসছে।

তার কানে তখনও বাজছে, চুরি ডাকাতিতে দ্যাশডা শ্যাষ হয়ি যাবিনে। চুরে চুরেই সব ভরি গ্যাল…

কোনো এক গাঁয়ের কোনো এক মজিদ মিয়া। ছোট্ট একটা মুদি কাম চায়ের দোকান তার। স্বপ্ন বড়লোক হবার। ফলে সে অবৈধ পথ ধরে। চলে আসে পুলিশ…পুলিশ অবশ্য মজিদকে নয় ধরতে আসে এক চোরকে। কিন্তু মজিদও তো অবৈধ পথে পয়সা কামাই করতে চায়…শুধু কী ওই চোর, “চুরে চুরেই সব ভরি গ্যাল…।” রুদ্ধশ্বাস এক গল্প, লিখেছেন কবি ও গল্পকার মেঘ অদিতি। পড়ুন ঈদ সংখ্যা তীরন্দাজে।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close