Home ঈদ সংখ্যা ২০১৭ একটি বাড়ির মৃত্যু > ছোটগল্প >> বিমল লামা

একটি বাড়ির মৃত্যু > ছোটগল্প >> বিমল লামা

প্রকাশঃ June 23, 2017

একটি বাড়ির মৃত্যু > ছোটগল্প >> বিমল লামা
0
0

ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনে এলেই লোকটার মন খারাপ হয়ে যায়। ভাবে, আবার ফিরতে হবে একঘেয়ে সেই বাড়িটায়। যে বাড়িটায় সে জন্মেছিল, মানে আক্ষরিক অর্থেই। হাসপাতালে নয়, বাড়িটাতেই। তখন বাড়িটার বাইরে পলেস্তারা ছিল না। ভেতরে ভর্তি লোক। বাবা মা তিন ভাই তিন বোন। অবিবাহিত এক কাকা এক পিসি। আর দাদু ঠাকুমা। মানে বাবার বাবা মা। তাহলে হল গিয়ে বারো জন লোক। রোজ বারো থালা ভাত। সঙ্গে ডাল তরকারি যা হবে বারো ভাগে ভাগ। রাতে অন্তত বারো গুণিত পাঁচ, মানে ষাট খানা রুটি। বারো ভাগে তরকারি ডাল। এমন কি সঙ্গে কাঁচা পিঁয়াজ খেলেও গুনে গুনে বারো টুকরো। অভাবের সংসারে ভাগের পাওনা কেও ছাড়েনা। দাদু নাতি হাতি—কেও না।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এর পরেও তার বাবা এই বাড়িটা করেছিল। ছোট হলেও চার চারটে ঘর। পায়খানা বাথরুম রান্নাঘর। বাইরেটা না পারলেও ভেতরটা পুরো প্লাস্টার। গলির রাস্তার ধারে, সামনে এক চিলতে বাগান। বাগানে তুলসি টগর জবা গন্ধরাজ। কানা ভাঙ্গা বিবর্ণ ক’টা টব। পাঁচিলের গায়ে দাঁড় করান সংসারের ভাঙা বাতিল জিনিস—কাটা টিউব ফাটা বালতি ভাঙা পায়া। আর এই সমস্ত কিছু আগলে রংচটা গ্রিলের চারফুট গেট যা আজও সমানে আগলে যাচ্ছে বাড়িটাকে পাড়ার কুকুর ছাগল আর বখাটে ছেলেদের হাত থেকে। ফুল চোর মেয়েদের কাছ থেকে। গেটের তালাটাও তার পৈত্রিক। কত বছর যে হল তালার বয়স সে নিজেও জানে না। নিজের  বয়স তার পঞ্চাশ সে জানে। কারণ তা ছাপা আছে তার কাগজপত্রে। মানে বাড়িটার বয়স তার চেয়েও বেশি। বেটা বুড়ো হল বাড়িটাও। অর্থাৎ গত অর্ধশত বছর ধরে প্রতিদিন সে  ফিরেছে এই বাড়িটাতে। মানে দিন হিসাব করলে তিনশ’ পঁয়ষট্টি ইন্টু ফিফটি, কোথায় গেল মোবাইলটা—হ্যাঁ, উমম্—আঠেরো হাজার দু ’শ পঞ্চাশ। এতবার সে রোজ ফিরেছে এই বাড়িতে। ভাবলে অবাক লাগে। এতবার সেই একই গেট খুলে একই বাগান পেরিয়ে একই সিঁড়ির তিনটে ধাপ উঠে…।  একই দরজা…, ওঃ অবিশ্বাস্য!

অবশ্য এতগুলো দিন সত্যিই সে ফেরেনি। অন্য কোথাও তো রাত কাটিয়েছে। বেড়াতে গিয়ে, আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে। সে সব যোগ করলে গোটা জীবনে হয়ত একশ’টা দিন বাদ যাবে। বসে বসে লোকটা ভাবতে লাগল কবে কোথায় সে বাড়ির বাইরে রাত কাটিয়েছে। সেই ছোটবেলা থেকে শুরু করে। যখন সে মায়ের কোলে চড়েই যেত যেখানেই যেত। তখন থেকে শুরু করে। আর সে অবাক হল দেখে যে সে একশ’ করতে পারল না। অনেক ভেবেও সে এমন রাতের যোগফল একশ’ করতে পারল না যা সে বাড়ির বাইরে কাটিয়েছে।

মানে যে-কোন মূল্যেই সে আঠেরো হাজার বারের বেশি ওই বাড়িতে ফিরেছে। কখনো বা একই দিনে বহুবার ফিরেছে নানা সময়ে নানা প্রয়োজনে বেরিয়ে। সে সব ধরলে আঠার কেন ছত্রিশ কি চুয়ান্ন হাজারেরও বেশি বার সে ফিরেছে এই বাড়িতে। সেই একই গ্রিলের গেট পেরিয়ে, একই বাগান…।

এর পর যদি তার একঘেয়ে লাগে বাড়ি ফিরতে খুব কি দোষ দেওয়া যায় তাকে! বিশেষ করে বাড়িটা যখন আর আগের মত নেই। মানে বাড়ির ভেতরটা। ভেতরের সেই লোকেরা একে একে সবাই ছেড়ে চলে গেছে বাড়িটাকে। তার চোখের সামনে একে একে মরেই গেছে চার চার জন। আসলে পাঁচ জন। কারণ সিলিং ফ্যান থেকে দড়ি কেটে যখন হাসপাতালে নেওয়া হল পিসিকে, তখন সে অন্তসত্ত্বা। সেটা জানা গেছিল তার পোস্টমরটেম রিপোর্টে। কিন্তু তার জন্য দায়ী কে তা কোনও দিনও জানা যায়নি। কারণ গোটা পাড়ায় সন্দেহ করার মতো কেও ছিল না। আসলে পিসি তো মিশতই না কারও সঙ্গে। তার কোনও বন্ধু তো কি বান্ধবীও ছিল না। তার পরও এইসব হল। পাড়ার লোক হাসাহাসি করে বলত, সবই নিজেদের মধ্যে ব্যাপার।

 [২]

এই ঘটনার পর মেজদা এত ভেঙে পড়েছিল যেন আসলে সে-ই দায়ি। সে তখন এমএ পড়ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। যাওয়া আসা করত বাড়ি থেকে। ফিরতে রাত হত। বারোটা একটা। পিসি-ই জেগে বসে থাকত তার খাবার নিয়ে। বাইরে গ্রিলের গেটে দেওয়া থাকত সেই তালা। তার একটা চাবি থাকত মেজদার কাছে। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে ঝুলিয়ে রাখত গলায়। নিজেই তালা খুলে ঢুকত বাগানে। বেল বাজাত না। যাতে অন্যের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। দরজা খুলে দিত পিসি। চুপিসাড়ে।

পিসি মারা যাওয়ার পর মাসখানেক সে আর বাড়ি থেকে বেরয়নি। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় যাচ্ছি বলে মেজদা বেরলো। সেই যে বেরলো আর ফিরে আসেনি। অত রাতে কে আর তাকে দরজা খুলে দেবে, এই ভয়েই কিনা কে জানে!

মেজদা নিরুদ্দেশ হতেই যেন হারিয়ে গেল তার নিজের কায়াটাই। রয়ে গেল একটা ছায়ামানুষ।  কারণ সে আর মেজদা জমজ না হয়েও ছিল জমজের মত। অন্তরে বাইরে একরকম। মুখোমুখি দাঁড়ালে মনে হত আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে। অকারণে অবাক হয়ে সে খেলার ছলে বলত, ‘মেজদা, তুমি!’

এর পর বাবাও আর বেশি দিন বাঁচেনি। রিটায়ারমেন্টের আগেই…। বাবার চাকরিটা পায় বড়দা। তিন দিদিকে অবশ্য বাবাই বাড়িছাড়া করে গেছিল। মানে বিয়ে দিয়ে গেছিল সৎপাত্রে। সৎপাত্র পেতেও কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল বিস্তর। কারণ ততদিনে বদনাম রটে গেছে বাড়িটার। তাই বাধ্য হয়ে পাত্রের খোঁজ করতে হয়েছিল দূরে দূরে। যেতে পেরে দিদিরাও যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। খুব কম আসত বাপের বাড়ি। তারপর বছরে দু’বছরে একবার। শেষ আট বছরে এই গতমাসেই আবার এসেছিল। সবাই একসঙ্গে। তিন দিদি তিন জামাই বাবু আর তাদের দুটো করে ঠিক ছ’টা বাচ্চা। তিনটে ছেলে তিনটে মেয়ে। প্রত্যেকের একসেট করে। যেন একেবারে অর্ডার দিয়ে বানানো। অবশ্য তারা কেউ বাচ্চা নেই আর। প্রত্যেকেই যুবক-যুবতী।

এসেছিল বড়দাও তার পরিবার নিয়ে। যে বাবার চাকরিটা নেওয়ার সময় তাকে বলেছিল, ‘তুই বাড়িটা নে। মেজ ফিরে এলে তাকে অর্ধেকটা দিস।’ তারপর চলে গেছিল বাড়ি ছেড়ে। মাকে একা তার জিম্মায় ফেলে রেখে।

[৩]

সে আর বিয়ে করেনি। মা আর বাড়ি আগলে বসে আছে কুড়ি বছর হল। চাকরিও জুটিয়েছে, হাফ দেশি একটা কোম্পানিতে। কলকাতায় অফিস। রোজ যাওয়া আসা করে লোকাল ট্রেনে। ফিরতে রাত হয়। বুড়ো মা জেগে বসে থাকে তার খাবার নিয়ে। তাই সে রোজ বাড়ি ফেরে। যতই তার একঘেয়ে লাগুক, সে বাড়ি ফেরে রোজ। সেই একই পাড়ার আজন্ম চেনা গলিপথে একই আবর্জনা ডিঙিয়ে টপকে। চেনা জানলা দিয়ে চেনা একঘেয়ে শব্দ শুনতে শুনতে। একঘেয়ে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে। সেই চার ফুট গ্রিলের গেট পেরিয়ে…। সেই একই তালা হাত গলিয়ে খুলে…। গত কুড়ি বছরে সে একটা রাতও বাইরে কাটায়নি। কারণ তার বুড়ো মা জেগে বসে আছে তার খাবার নিয়ে। একটাই মাত্র থালায় একভাগ মাত্র খাবার নিয়ে। মা রাতে কিছু খায় না। তাই তার থালা টেবিলে উপুড় করা। বাকি দশটা থালা রান্নাঘরে পড়ে আছে ধুলোয় মুখ ঢেকে। আজ কুড়ি বছর হল। নৈঃশব্দ্য আর নির্জনতা বাড়িটাকে ঢেকে থাকে বারমাস। পাশ দিয়ে কেউ গেলে শব্দ পায় না কোন। গন্ধও না। এমনকি কারও মুখও দেখা যায়না খোলা জানলায় কি বাগানে। বন্ধ দরজাটা বন্ধ থাকে সারাদিন। পাশে কলিং বেলের সাদা সুইচ কালো হয়ে গেছে। কারণ দিনে মাত্র একবার সেই সুইচে চাপ দেয় একটাই মাত্র আঙুল। তার নিজের আঙুল। যখন সে অনেক রাতে বাড়ি ফেরে অফিস থেকে। একবার মাত্র বেল বাজায়। আর তার বুড়ো মা ধীরে ধীরে স্খলিত পায়ে এগিয়ে আসে দরজার দিকে। সে তার হালকা পায়ের শব্দ পায় বাইরে থেকে। ছিটকিনির দিকে উঠে যাওয়া তার শীর্ণহাত সে দেখতে পায় কাঠের দরজা ভেদ করে। তারপর একটাই মাত্র একমাত্রিক শব্দ, লোহায় লোহা লেগে—খুট। যেন মায়ের নির্মোহ কণ্ঠ-আয়।

দীর্ঘ কুড়ি বছরের নৈঃশব্দ্য হঠাৎ একদিন ভেঙে পড়ে অনেক রাতে। সংযম হারিয়ে মানুষের আর্ত বিহ্বল কণ্ঠ শোনা যায় বাড়ির ভেতর থেকে। এতটাই অসংযমের যে পাড়ার লোক ছুটে আসে। ভিড় করে জানলায় দরজায়। বাগানের সীমিত পরিসরে। এমনকি সেই গ্রিলের গেট উপচে লোক জমে থাকে বিহ্বল হয়ে।

সকাল হতে না হতে লোকজন ছুটে আসে দূর-দূরান্ত থেকে। সেই কবেকার বাড়িভর্তি লোকগুলো যেন আবার ফিরে আসে নতুন অবতারে। দীর্ঘ কুড়ি বছর পর আবার কিছু ঘটেছে এই বাড়িতে। যাকে উপলক্ষ্য করে আবার সরগরম নিস্তব্ধ নির্জন বাড়িটা।

আসলে আরও একধাপ এগিয়ে গেছে বাড়িটা চরম নৈঃশব্দ্যের দিকে। শেষ দু’জনের একজন বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে চিরদিনের মতো। মারা গেছে তার মা।

[৪]

সপ্তাহ দুয়েক পরে আবার সে অফিস এসেছে আজ। এর মধ্যে শ্রাদ্ধ-শান্তি সাঙ্গ করে সবাই ফিরে গেছে যে যার জীবনে। ফিরিয়ে দিয়ে গেছে তাকে তার নিঃসঙ্গ জীবন। আর তার নির্জন বাড়ি।

সেই বাড়িতে ফিরবে বলে আবার সে ট্রেন ধরতে এসেছে স্টেশনে। দীর্ঘ কুড়ি বছরের একঘেয়েমি যেন আজ চরম আকারে পেয়ে বসেছে তাকে। যে অজুহাতে এতদিন সে কাটিয়ে উঠত তার একঘেয়েমির বাধা, আজ সেই অজুহাতও তার হাতছাড়া। কেউ আর জেগে বসে নেই তার খাবার নিয়ে। অপেক্ষা করে বসে নেই কলিং বেলটা বেজে ওঠার প্রত্যাশায়।

তাই শহরতলির ট্রেনগুলো একের পর এক বেরিয়ে যায় তার চোখের সামনে দিয়ে। তবু সে একা গোঁ ধরে বসে থাকে স্টেশনে।

আজ আবার সেই পুরনো খেলাটা তার খেলতে ইচ্ছে করে। যে খেলাটা সে একা-একা খেলত যখন তার হাতে অঢেল সময় ছিল। পড়াশোনা শেষ করে বসে আছে। চাকরি পায়নি। সময় কাটত না কিছুতেই। বাড়িও তখন নির্জন হয়নি পুরোপুরি। সময় কাটানোর এক আজব উপায় সে বার করে ছিল। অনুসরণ। যে কোন একজনকে বেছে নিয়ে সে অনুসরণ করত তাকে। নিরাপদ দূরত্ব থেকে। হেঁটে যেত তার পিছন পিছন। আর সে বাসে উঠলে বাসে, লঞ্চে উঠলে লঞ্চে।  ট্রেনে তো ট্রেনে। কোথায় কোথায় চলে যেত অনুসরণ করে। তারপর শিকার তার গন্তব্যে পৌঁছে গেলে সে ফিরে আসত ওখানকার কোন দোকানে চা বিস্কুট খেয়ে। খেলাটা তেমন রোমাঞ্চকর ছিল না। বেশির ভাগেই বাড়ি যেত। কি দোকান বাজার অফিস।

তারপর সে শুরু করে চেনা লোককে অনুসরণ করা। সেটায় ঝুঁকি ছিল। কিন্তু মজাও হত খুব। কারণ সে অনুমান করতে পারত তার শিকার কোথায় যেতে পারে। আর যেত হয়ত কোন অপ্রত্যাশিত জায়গায়।

এভাবেই সে জেনেছিল তার প্রতিবেশী সত্য কাকা সুযোগ পেলেই বেশ্যাবাড়ি যায়। সর্বজনমান্য সৎ সাত্বিক মনোরঞ্জনবাবু লুকিয়ে-চুরিয়ে বাংলা মদের ঠেকে যায়। শম্পা বউদি দাদা বেরিয়ে গেলেই একটা অচেনা লোকের ফ্ল্যাটে গিয়ে ওঠে। এইরকম আরও কত কি। পাড়ার কোন মেয়ে কার সঙ্গে প্রেম করে। কবে কে কোথায় কার সঙ্গে সিনেমা গেল। কে কার সঙ্গে হোটেলে গিয়ে উঠল। সব সে জানত।

[৫]

খেলাটা তাকে নেশার মত পেয়ে বসেছিল। টিউশানির সব পয়সা তার ওতেই বেরিয়ে যেত। হঠাৎ চাকরি পেয়ে গেল। তারপর চাকরির পিছনে এত সময় গেল যে খেলা আর চালানো গেল না। কারণ তাকে নির্দিষ্ট সময়ে অফিস পৌঁছতেই হত। ফিরতেও হত মায়ের কথা ভেবে।

কিন্তু আজ আর মা বসে নেই তার পথ চেয়ে। আর বাড়ি ফেরার একঘেয়েমি পেয়ে বসেছে চরম আকারে। তাহলে একবার সেই খেলেটা আবার…।

রাত তখন ন’টা বাজে। বর্ধমান লোকাল এসে দাঁড়ায়। শান্ত পায়ে হেঁটে সে ট্রেনে ওঠে। দাঁড়িয়ে থাকে ভিড়ের ভেতর। খান দশেক স্টেশন পার হতেই ট্রেন প্রায় খালি হয়ে যায়। অবশিষ্টদের মধ্য থেকে সে একজনকে তার শিকার বেছে নেয়। তার অজান্তেই।

খুব স্বাভাবিক বাছাই। কারণ এই আবহাওয়ায় চাদর মুড়ি দিলে চোখ তো টানবেই। লোকে গায়ে জামা রাখতে পারছে না। তার ওপর আবার চোখমুখ ঢেকে। আত্মগোপনের একটা চেষ্টা আছে মনে হয়। এর কোন না কোন রহস্য তো থাকবেই। জবুথবু, বুড়োটে। কিন্তু সন্দেহজনক। মনে মনে একেই শিকার বেছে নেয় সে।

আরও ঘণ্টাখানেক যাওয়ার পর লোকটা ট্রেন থেকে নামলো। আর নামলো সেই…। অবাক না হয়ে সে পারলো না। যে স্টেশনে সে গত কুড়ি বছর ধরে…। মানে তার একঘেয়েমি পিছু ছাড়ল না। যেন সে-ও তাকেই শিকার বেছেছে। আর পিছু নিয়েছে একরোখা গোঁ ধরে। যতদিন না তার মৃত্যু হচ্ছে ছাড়বে না। আসলে যেন সে নিজেই এক বিকট অনুসরণের শিকার। নিজের ছায়ার মত এক অনুসরণকারী সর্বদা লেগে রয়েছে তার পিছনে।

স্টেশনের বাইরে ট্রেকার দাঁড়িয়ে। শেষ ট্রেকার। তো তার শিকার গিয়ে উঠল সেই ট্রেকারেই। সে তো রোজই ওঠে ওই ট্রেকারে। অগত্যা সে-ও আগের সেই বহু হাজার বারের মতো…। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল লোকটা নামলোও সেই স্টপেজে যে স্টপেজে তার নামার কথা। বড় রাস্তা ধরে ট্রেকারটা চলে যেতেই দেখা গেল সে আর লোকটা ছাড়া আর মাত্র একজন নেমেছে সেখানে।

অনেক রাত হয়েছে। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। কোনও লোকজন দেখা যাচ্ছে না। দু’একটা পান-বিড়ির  দোকান তখনও খোলা। ইতি উতি সাইকেল কি মোটর বাইক যাচ্ছে। একটা মাতাল, ক’টা কুকুর।

[৬]

চাদর মোড়া লোকটা নেমেই হাঁটা দিয়েছে গলির দিকে। যে-গলি ধরে সে গত পঞ্চাশ বছর…। নিজের চোখকে সে বিশ্বাস করতে পারে না। আর যেন লোকটাও তার মতোই বহু বছর ধরে হাঁটছে এই গলিপথে। অচিরেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল আধো অন্ধকার গলির ভেতর। ওদের পাড়ার শেষপ্রান্তে একটা আশ্রম আছে। সেখানে নানা রকম উৎপটাং লোকের আনাগোনা। নিশ্চিত ওটাই তার গন্তব্য।

নিশিন্ত হয়ে ওখানেই খেলা শেষ করে সে। গলির মুখে পানের দোকানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরায়। ধীরে সুস্থে আয়েশ করে শেষ করে সিগারেট। তারপর হাঁটা দেয় বাড়ির দিকে।

গলিতে পা দিতেই বিকট এক নিঃসঙ্গতায় চুপসে যায় তার বুকটা। শূন্যবাড়ি বসে আছে তার জন্য। ভেতরে কেউ বসে নেই তার খাবার নিয়ে। আজ আর বন্ধ দরজা খুলবে না ভেতর থেকে। তাকে নিজেই চাবি ঘুরিয়ে…।

তই তো! চাবিটা! সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা এটা। কখনও দরজার তালা খুলে বাড়ি ঢুকেছে এমনটা তার মনে পড়ে না। তালা থাকত গ্রিলের গেটে।

পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে সে পৌঁছে গেল তার গ্রিল গেটের সামনে। আর পৌঁছেই চমকে গেল দেখে যে, গেটে তালা ঝুলছে। সেই কবেকার পুরনো পৈত্রিক তালা, সেটাই ঝুলছে গেটে। কিন্তু তালাটা তো সে দরজায় দিয়েছিল! খোলাই ছিল গেট!

ভেতর থেকে দেওয়া তালাটা সে গ্রিলে হাত গলিয়ে খুলে ফেলে। তারপর তালাটা হাতে নিয়েই ধীর পায়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে। চোখ তার দরজার কড়ায়।

নাহ্, কোনও তালা তো নেই দরজায়। রোজকার মতোই দরজা বন্ধ। বেশ কিছুক্ষণ সে চেয়ে থাকে দরজার দিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে দেখে। সত্য কাকাদের জানলা খোলা, আলো জ্বলছে। জেগে আছে কাজলরাও। জীবনযাপনের টুকটাক শব্দ আসছে কানে।

ফিরে আবার সে তাকায় দরজার দিকে। যেন দরজাটাও পালটা চেয়ে আছে তার দিকে। সমান অবাক সে-ও।

[৭]

তিন সিঁড়ির দুই ধাপ সে ওঠে। হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করে দরজাটা। তারপর ঠেলা দেয়, আলতো। খুব আলতো। দরজা খোলে না। জোর বাড়ায় হাতে। খোলে না। এবার সে বেশ জোরে ঠেলে, দরজা তবু খোলে না। সে বুঝতে পারে, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।

কেমন যেন অনুভূতি হয় তার। ঠিক ভয় যে করে তা নয়। তবু দুরু দুরু করে বুক। বিভ্রান্ত হয়ে সে দাঁড়িয়ে থাকে দরজায়। সশব্দে একটা মোটর বাইক চলে যায় গলি দিয়ে। খানিক সাহস দিয়ে যায় তাকে। সেই সাহসে ভর করে সে আঙুল বাড়ায়। আঙুল বাড়ায় কলিং বেলের সুইচের দিকে। সুইচে আঙুল ঠেকতেই যেন পালটা এক শিহরণ ছুটে আসে তার হাত বেয়ে, বুকের দিকে। তবু সে আঙুল সরায় না। তারপর সাহস জুগিয়ে চাপ দেয় সুইচে।

ভেতরে শব্দ হয় টুং টাং…। যেমন হয় রোজ রাতে। তার পরের ঘটনার জন্য সে অপেক্ষা করে থাকে। কান পেতে থাকে দরজায়। আর স্পষ্ট শুনতে পায় হালকা পায়ের শব্দ। স্খলিত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে দরজার দিকে। কাঠের দরজা ভেদ করে যেন সে দেখতে পায় একটা দুর্বল হাত উঠে যাচ্ছে ছিটকিনির দিকে। আর পরক্ষণেই কানে আসে চির চেনা সেই একমাত্রিক ধাতব শব্দ। খুট করে যেন ছিটকিনি বলছে, তার মায়ের মতো নির্মোহ স্বরে, আয়।

নিজের অজান্তেই সে দুধাপ নেমে আসে দরজা থেকে। শক্ত করে ধরে হাতের তালাটা। কী জানি কিসের জন্য, যেন প্রস্তুত করে নিজেকে। আর তারপরই দরজা খুলে যায়। দুটো পাল্লা দুদিকে সরে গিয়ে যেন প্রকট হয়—চাপা আর্তনাদ সে রোধ করতে পারে না। হয়তো দৌড় দিত উলটো মুখে। তার আগেই কানে আসে এক নির্মোহ স্বর—‘আয়!’

দরজায় সেই চাদর মোড়া লোকটা।

বহুদিনের চেনা এক স্বর। বহু বছরের অভ্যাসে যা মরমে গেঁথে আছে। সেই স্বরই তাকে থামিয়ে দেয়। সে চোখ তুলে তাকায়। আর অবাক হয়ে দেখে সে দাঁড়িয়ে আছে নিজেরই মুখোমুখি। যেন পুরনো এক আয়নার সামনে, যার পারদে ক্ষয় ধরেছে।

[৮]

কানে আসে আবার সেই কণ্ঠ, ‘আয় ছোট, ভেতরে আয়!’

তার ঠোঁট আপনিই ফাঁক হয়ে যায়। বহু বছর পর আকুল স্বরে আবার সে বলে, ‘মেজদা, তুমি!’

তার আয়না ততক্ষণে পিছন ফিরেছে। জীর্ণ চাদরে ঢাকা তার ক্ষয়। স্খলিত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্যাসেজের দিকে। সেখানে পাতা পুরনো এক ডাইনিং টেবিল। এই প্রথম কারও খাবার ঢেকে রাখা নেই সেখানে। এমনকি একটা জলের গ্লাসও নেই। ধূ ধূ টেবিলটার মাঝখানে পড়ে আছে একটা কালচে লোহার চাবি। কবেকার কালো কারে প্রাচীন গিঁটে বাঁধা।

মেজদা চাবিটা তুলে নেয়। দেয়ালে ঝোলানো মায়ের নতুন বাঁধানো ছবি। সেই ছবিতে চাবিটা মালার মতো পরিয়ে দেয় সে। বিড় বিড় করে বলে, ‘শেষ দেখা হল না মা, শেষ দেখা…।’

দু’জনে দু’ঘরে ঘুমোয় সে রাতে। বাড়িটার প্রতিষ্ঠিত নিরবতা একটুও না ভেঙে। এমনকি এত বয়সে নাকও ডাকে না কেউ।

চুপিসাড়ে রাত কখন ভোর হয়ে যায়। তারপর পাড়া ঘরের কোলাহল ঢুকে আসে জানলা দরজা দিয়ে। লোকটা উঠে চা করে। রোজকার মত দু’কাপ। তারপর মেজদার ঘরে গিয়ে দেখে ঘর ফাঁকা। বাগানে বাথরুমে খোঁজে। কোথাও নেই মেজদা।

একা চাবিটা ঝুলছে মায়ের ফটোয়। ফ্রেমের কাঁচে তার ছায়া পড়েছে। যেন বিষণ্ণ এক প্রেতছায়া! আসন্ন অশুভের ভয়ে, নিরব সে-ও।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close