Home অনুবাদ এনগুগি ওয়া থিওং’ও > কৃষ্ণ পক্ষী >> ফজল হাসান অনূদিত >>> ছোটগল্প

এনগুগি ওয়া থিওং’ও > কৃষ্ণ পক্ষী >> ফজল হাসান অনূদিত >>> ছোটগল্প

প্রকাশঃ March 25, 2018

এনগুগি ওয়া থিওং’ও > কৃষ্ণ পক্ষী >> ফজল হাসান অনূদিত >>> ছোটগল্প
0
0

এনগুগি ওয়া থিওং’ও > কৃষ্ণ পক্ষী >> ফজল হাসান অনূদিত ছোটগল্প

 
আসলে কেউ তাকে চিনতো না। এমনকি তার হৃদয়ের খুব কাছের মানুষ হিসাবে পরিচিত ওয়ামাইথাও তাকে কখনই বুঝতো না। সে একাকী বাস করতো। তাই তাকে সাহায্য করতে কে যাবে?
তার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমার মনে পড়ে, সে ছিল ঋজু এবং তার হাত-পা ছিল শক্তিশালী। সে লোকজনদের মনে এমন একটা প্রভাব ফেলতে পারঙ্গম ছিল যে, সে কোন মানুষের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে অনায়াসে তাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারবে। তার চোখ ছিল বিশাল এবং জ্বলজ্বলে। তবে বিশেষ কিছু সময়ে তার চোখ দু’টিতে নমনীয়তা ফুটে উঠতো, কিংবা শিশুদের চোখের মতো অসহায়ত্ব দেখা যেত। আমার কাছে এধরনের ধারণা হয়েছিল, অথবা তার প্রতি একধরনের ভয় জন্মেছিল। সে মাঝে মাঝে দেয়ালের দিকে তাকাত। ভাবটা এমন যেন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তাকিয়ে সে প্রতিটি জিনিস থেকে সবটুকু নির্যাস শুষে নিচ্ছে। আমি জানি না, তার সেই চাহনি দৃষ্টিভ্রম ছিল কি না। বাইরে থেকে দেখলে সেই রকম মনে হতো। সে এমন তির্যকভাবে তাকাতো যে, মনে হতো সে যেন কাউকে অদ্ভূত স্বপ্ন কিংবা দুঃস্বপ্ন থেকে জাগিয়ে তুলছে।
তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় স্কুলে। তখন লিমুরুতে একমাত্র স্কুল ছিল ম্যাঙ্গুও। তাই অন্যান্য এলাকা থেকে অনেক ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করতে আসতো। সে স্কুলের কয়েক মাইল দূরের গাথিগি-ইনি রিজ্ থেকে স্কুলে আসতো। স্কুলে আসার পথে তাকে কয়েক জায়গায় পাহাড়, উপত্যকা এবং সমতলভূমি পেরোতে হতো। আমরা স্কুলে তাকে ডাকতাম কুরুমা নামে, যার অর্থ ‘কামড়’। হাস্যকর, কিন্তু এখন আমার মনে নেই কেন তাকে অই নামে ডাকতাম। তবে তার আসল নাম ছিল মাঙ্গারা। সে ছিল দীর্ঘ এবং তার দেহের গড়ন ছিল অনেকটা খেলোয়াড়দের মতো। বলা যায়, সে ছিল সুদর্শন। মেয়েরা তাকে পছন্দ করতো, কিন্তু সে মেয়েদের সাহচার্য্য প্রত্যাখান করতো, যেমন সে অন্য সবাইকে প্রত্যাখান করতো। খেলাধূলায় সে ছিল চৌকষ এবং কঠিন ধরনের খেলা, যেমন দৌঁড়, লাফঝাঁপ এবং মুষ্টিযুদ্ধ, ভীষণ পছন্দ করতো। তবে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতো মুষ্টিযুদ্ধ। সে যে কাউকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে কুন্ঠা বোধ করতো না, এমনকি বড়দের সমীহ করতো না। কখনো যদি সে পরাজিত হতো, তাহলে পুনরায় চেষ্টা করতো। যদিও সে কুড়ি বার পরাজিত হয়েছে, কিন্তু কখনই তার চোখেমুখে ক্ষোভের চিহ্ন ফুটে ওঠেনি। ফুটবল খেলায় তার সমান পারদর্শী কেউ ছিল না এবং প্রায় সবার কাছে সে ছিল আদর্শ পুরুষ।
শুরুতে তার প্রতি আমার কোন আসক্তি ছিল না। হয়তো তা ছিল আমার তরফ থেকে হিংসা। কেননা, আমি কখনই খেলাধূলায় ভালো ছিলাম না। আসলে আমি কোন ক্ষেত্রেই উৎরে যেতে পারিনি, এমনকী ক্লাশের মধ্যেও না। যে মানুষ সবার কাছে সুপরিচিত, শিক্ষক এবং মেয়েদের কাছে প্রিয়, সে-তো অন্যদের কাছে, যারা কম সৌভাগ্যবাণ, হিংসার কারণ হবেই। আমি তাকে রীতিমতো ঘৃণা করতাম। তার একান্ত নিজের হয়ে থাকাটাও আমি ঘৃণার চোখে দেখতাম। আমি ভেবেছিলাম তার মধ্যে অহংবোধ বিরাজ করতো, নতুবা সে বন্ধুত্ব করতে অনিচ্ছুক ছিল।
একসময় আমি তার একাকী থাকার কারণ উদঘাটন করেছি। আমি জানি না, রহস্য উদঘাটন করার বাহন কি ছিল। সে-কী তার চোখ ? হয়তো বা …। আমার মনে পড়ে স্কুলে একদিন সমাবেশের সময় আমি পেছন ফিরে তাকিয়েছিলাম। সে তখন এমন ভঙ্গিতে তাকিয়েছিল যেন গভীর মনোযোগের সঙ্গে আশেপাশের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু আমি তাকে অমনোযোগী দেখেছি। তবে তা ছিল মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য। সে যখন আমাকে দেখেছে, তখন মাথা নামিয়ে নিয়েছিল এবং অন্যদিকে দৃষ্টি মেলে ধরেছিল।
অন্য আরেক দিন আমি আগেভাগে স্কুলে গিয়েছিলাম। তাই গোরস্থানের পথে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ভবঘুরের মতো পায়চারী করছিলাম। মাঙ্গারা আমার আগেই সেখানে উপস্থিত ছিল। সে ছিল একা এবং গভীর চিন্তায় বিভোর। তার সঙ্গে আমি কথা বলিনি।
তার সঙ্গে আমার আসল সাক্ষাত তখনো হয়নি।
আমাদের স্কুলের পাশে ঘন গাছ-গাছালি ঘেরা নিচু জায়গায় কেউ যায়নি। ছেলেদের মাথায় একটা ভয় কাজ করতো যে, সেই জায়গা ছিল ভুতুড়ে। বলা হতো অনেকদিন আগে একজন মহিলাকে তার স্বামী বেদম প্রহার করেছিল এবং মার খেয়ে মহিলা দৌঁড়ে পালিয়ে সেই গহীন বনে পৌঁছার পরপরই মারা যায়।
কে আমাকে সেখানে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল ? মনে হয় সেই সময় আমি একাকীত্বে ভুগছিলাম। যাহোক, সময়টা ছিল লাঞ্চের ফাঁকে। তখন অন্য সব ছেলেরা বাড়িতে গিয়েছিল। কিন্তু আমি সেই গহীন বনের ভেতর দিয়ে আমার পথ খুঁজে নিয়েছিলাম এবং একসময় খোলামেলা বিশাল বনের মাঝখানে গিয়ে উপস্থিত হই। সেখানে মাঙ্গারা একা বসেছিল। আমাকে দেখে প্রথমে চমকে উঠেছিল এবং আমার অনাহূত উপস্থিতির কারণে সে তার চোখেমুখে বিরক্তির চিহ্ন ফুটিয়ে তুলেছিল। সে বাঁকা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমিও একই দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। যতক্ষণ না আমি নীরবতার পর্দা সরিয়ে দিয়েছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মাঝে নিস্তব্ধতা বিরাজ করেছিল।
‘এখানে কী করো ?’
তৎক্ষণাৎ সে জবাব দেয়নি। আমার দিকে তাকিয়ে থেকেছে এবং হালকা ভাবে ভ্রুকুটি করেছে। আমার প্রশ্নটিকে পরখ করে দেখার মতো তার চোখেমুখে ভাব ফুটে উঠেছিল। আমার বিরক্তি লেগেছিল এবং একসময় আমি পুনরায় তাকে জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম, সেই মুহূর্তে সে তার ঠোঁট দু’টি ফাঁক করে।
‘কৃষ্ণ পক্ষী খুঁজছি।’
‘কৃষ্ণ পক্ষী ?’
‘হ্যাঁ,’ সে বললো। তখনও তার দৃষ্টি আমার দিকে স্থির হয়েছিল। আমি মাথা ঘুরিয়ে সে কী খুঁজছিল, তাই খোঁজার চেষ্টা করেছি। আমার চোখে কোন কিছুই ধরা পড়েনি। আমি হতভম্ব। আপনমনে ভেবেছি, তার ব্যবহার হয়তো অদ্ভূত। আচমকা মনে পড়ে, প্রায় মাস খানেক আগে কোন এক সকালে আমি আগেভাগে স্কুলে গিয়েছিলাম এবং সেই সময় গোরস্থানের পথে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।
‘তোমাকে গোরস্থানের দিকে দেখেছি।’
‘ওহ্, তাই !’
‘হ্যাঁ।’
‘আবার কৃষ্ণ পক্ষী খুঁজছো।’
আমি হেসেছি। সে-ও হেসেছে। কিন্তু তারপর সে গম্ভীর হয়ে যায়। আমি ভেবেছি, এসব হয়তো স্কুল জীবনের খামখেঁয়ালি।
‘তুমি কী খুঁজে পেয়েছো ?’
‘না !’
আমি নিজেকে পুনরায় চিন্তা করার সুযোগ দিইনি। যাহোক, তারপর থেকে আমাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব মুছে গিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
আমরা একসঙ্গে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে এসেছি। তবে সে আর কখনই কৃষ্ণ পক্ষীর প্রসঙ্গ তোলেনি। সে ছিল চতুর। যদিও সে পড়াশুনায় খুব বেশি মনোযোগী ছিল না, তবে স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অত্যন্ত ভালো ফলাফল করেছিল। স্কুল পেরিয়ে যারা কলেজে যেতে পেরেছিল, সে ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। তখন থেকে আমাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। আমি লিমুরুর এক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে চাকুরী খুঁজে পেয়েছি।
মেডিকেলের ছাত্র হিসাবে সে ভালো করছিল। তার প্রতি সবার, এমনকি শিক্ষকদেরও, প্রচণ্ড আশা ছিল।
‘কিন্তু তার কী সমস্যা হয়েছিল ?’ নাইরোবীতে একদিন চা পান করার সময় তার এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল।
‘কেন ?’
‘সে সব সময় একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। কী অদ্ভূত …। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, তাই কী ? যেভাবে সে তাকাতো … তুমি হয়তো ভাবছো … ’
ওয়ামাইথার সঙ্গে কলেজে তার পরিচয়। ওয়ামাইথা ছিল গিকোরোরো গ্রামের একজন মহিলা শিক্ষক। তার সঙ্গে সে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে তার সঙ্গে আমার দেখা হতো। তখন সে ওয়ামাইথার সম্পর্কে গল্প করতো। ওয়ামাইথাকে সে বিয়ে করতে চেয়েছিল। সেই সময় মনে হয়েছে একাকীত্ব তাকে নিষ্কৃতি দিয়েছিল এবং সে সুখের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে হতাশার মতো কোথাও একটা গলদ ছিল – অনেকটা ছেলেবেলার দুঃখজনক সুখ এবং ওয়ামাইথার সঙ্গে সম্পর্ক। একত্রে তাদের সঙ্গে আমার এক বা দু’বার দেখা হয়েছে। মহিলা ছিল পাতলা এবং দীর্ঘাঙ্গী। মাথার চুল ছিল চকচকে কালো এবং পরিপাটি করে আঁচড়ানো। সে ছিল ধার্মিক। বাহ্যিক দিক থেকে আমার তাই মনে হয়েছে। এছাড়া সে যখন হাঁটতো, তখন দেখে মনে হতো পবিত্রতার সবটুকু যেন উপচে পড়ছে। এক কথায় সে ছিল অপ্সরী। তার সৌন্দর্য শুধু বাইরের দিকেই ছিল না, বরং ভেতর থেকে উথলে এসে সারা দেহ আলোকিত করতো।
কলেজের চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে একদিন অকস্মাৎ মাঙ্গারা আমাদের বাড়িতে এসেছিল। আমি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। সে-ও আমার দিকে একই দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। এখন তার বয়স হয়েছে এবং সে পরিশ্রান্ত। তার মধ্যে যে উপচে পড়া সুখ ছিল, তা নেই। আমার সন্দেহ হচ্ছিল ওয়ামাইথা হয়তো তাকে ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু আমি ভাবলাম, পরোক্ষভাবে এ প্রসঙ্গ তোলা মোটেও উচিত নয়।
আমাদের বাড়িতে ছোট্ট একটা কক্ষ ছিল। কক্ষটি ছিল আমার খুব প্রিয়। আমরা সেখানে বসে খাবার খেতাম, কিংবা বই পড়তাম, নতুবা গল্পগুজব করতাম। কোন এক সন্ধ্যায় আমরা টেবিলের চারপাশে বসে রাতের খাবার খেয়েছি। আমাদের রীতি অনুযায়ী খাবার শেষ করে সেখানে বসে আমরা গল্প করছিলাম। ঘরের ভেতর প্রজ্জ্বলিত লণ্ঠনটির উপর শয়তান ভর করেছিল এবং লন্ঠনের আলো বেপরোয়াভাবে এদিক-ওদিক দ্রুত আন্দোলিত হয়েছিল। আমাদের সম্মুখ দিয়ে কোন কিছু অতিক্রম করে যায়নি। তখন আমি একটা বই পড়ছিলাম। বইয়ের শিরোনাম মনে নেই। আসলে তখন বই পড়ায় আমি মনোযোগী ছিলাম না। মাঙ্গারা আগের চেয়ে আরো বেশি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
‘তুমি কৃষ্ণ পক্ষীর খবর শোননি,’ আমি প্রায় লাফিয়ে উঠেছিলাম। সেই সময় স্কুল জীবনের কথা মনে পড়ে। ভৌতিক জঙ্গলে আমাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্মৃতি আমার ভেতর পুনরায় ফিরে আসে।
‘স্কুলে তুমি যে পাখি খুঁজেছিলে।’
‘হ্যাঁ।’
‘কথা বলো। তুমি তো রাশভারী নও।’
‘জীবনে আমি কখনই এত বেশি চিন্তিত ছিলাম না,’ বলেই সে থেমেছিল । আমি হাসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুনরায় তার কথা বলা আমাকে পুরোপুরি থামিয়ে দিয়েছিল। তারপর বুকের ভেতর অনেক দিনের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলেছিল, ‘সারা জীবন দুঃস্বপ্ন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে,’ বলেই সে আমার দিকে তাকায়। তারপর একটু সময় চুপ করে থেকে সে পুনরায় বলেছিল, ‘তুমি তো কুসংস্কারাচ্ছন্ন নও। আমি জানি, তুমি বলবে অতিপ্রাকৃত বিষয়ে তোমার কোন বিশ্বাস নেই। তাহলে একজন মেডিকেল ছাত্র কুসংস্কারে বিশ্বাসী হলে নিশ্চয়ই তুমি ভাববে এটা অদ্ভূত, অস্বাভাবিক। কিন্তু আমি তোমাকে বলছি, এটা মোটেও অন্ধ বিশ্বাস নয়। এটা হলো … তুমি কী কখনো ফেলে আসা দিনের কথা ভেবেছ ?’
‘হুম ! খুব বেশি না।’
‘উদাহরণ হিসাবে ধরো, তুমি ভেবে দেখনি প্রতিহিংসায় বশীভূত হয়ে অতীত তোমার পেছন ধাওয়া করে এক পর্যায়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে।’
‘কীভাবে ?’ আমি রীতিমতো হতভম্ব এবং আমার চোখেমুখে ভয়ের চিহ্ন ফুটে উঠে।
‘কথাটা সহজ করে অন্য ভাবে বলছি। তুমি কী বিশ্বাস করো তোমার দাদু কিংবা বাবার জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা তোমার উপর প্রভাব ফেলতে পারে ?’
‘কোন অর্থে ?’
‘সব বিষয়েই … তোমার বাবা অভিশপ্ত এবং সেই অভিশাপ কী তোমার উপর এসে ভর করবে ?’
‘বাপ-দাদার কুকর্মের পাপ তিন বা চার প্রজন্মের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, কী পারে না ?’
‘আলবৎ ঠিক, অবিকল তাই।’
‘কেন, না ! এটা অবিশ্বাস্য।’
সে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। তারপর স্বগোক্তির মতো করে বললো, ‘ওহ্, তোমাকে দোষারোপ করছি না। কিন্তু আমি জানি এখন ওয়ামাইথা বিশ্বাস করবে না।’
‘সেদিন ছিল কোন এক রবিবারের সন্ধ্যা,’ আচানক সে বলতে শুরু করে। ‘আমি দূর-সম্পর্কের দাদিমার বাড়ি থেকে ফিরছিলাম। সেই সময় আমি ছিলাম তরুণ। উদ্দেশ্যহীন ভাবে গিরিপথে ঘুরে বেড়ানোর জন্য চাঁদের স্নিগ্ধ আলো আমাকে প্রলুব্ধ করেছিল। তাই বাড়ি ফিরতে আমার অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। মা জেগে ছিলেন। আমার দু’ভাই অগ্নিচুল্লীর পাশে বিছানায় খেলছিল। তারা সবাই ছিল হাসি-খুশি। বাবা বাড়িতে ছিলেন না। বেশি রাত করে বাইরে থাকা তার জন্য স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। এমনকী বাবা যখন কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রার্থনা পরিচালনা করার জন্য অন্যত্র যেতেন, তখনও তিনি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসতেন। সুতরাং একসময় আমাদের সবার চোখেমুখে উৎকন্ঠার ধূসর ছায়া নেমে আসে।
‘আমার খাওয়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরজায় বজ্রপাতের মতো বিকট আওয়াজ হয়। এক মুহূ্র্তের মধ্যে একটা ভুতুরে কালো অবয়ব এসে দরজার কাছে দাঁড়ায়। সেই কালো অবয়ব ছিল আমার বাবার। তার চোখ দু’টি ছিল রক্তরাঙা। কোন কথা না বলে তিনি কয়েক মুহূর্ত দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন মনে হয়েছিল, তিনি হয়তো ঘরের ভেতরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তারপর হঠাৎ তিনি মেঝের উপর ময়লা জমে থাকা স্তুপের উপর ধপাস করে পড়ে গিয়েছিলেন।
‘আমরা সবাই আর্তনাদ করে উঠেছিলাম। কেননা আমরা ভেবেছিলাম তিনি হয়তো মারা গিয়েছেন।’
‘আসলে তিনি মারা যাননি। মা যখন তার চোখেমুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দেন, তখন তিনি ধীরে ধরে চোখের পাতা খোলেন। চারপাশে আমাদের দেখতে পেয়ে তিনি আশ্চার্য্যান্বিত হন। ভয়ে ভীষণ কাঁপছিলেন। একসময় তিনি ফিসফসিয়ে কিছু বললেন। কিন্তু আমি শুধু দু’টি শব্দ শুনতে পেয়েছি ‘কৃষ্ণ পক্ষী’। আর কিছু না। তিনি ঘুমিয়ে পড়েন এবং পরদিন সকাল না হওয়া পর্যন্ত তার ঘুম ভাঙেনি।
‘সেই প্রথম আমি কৃষ্ণ পক্ষী শুনেছি।’
‘বাবা ধাক্কাটা সামাল দিয়ে সেরে উঠতে পারেননি এবং এক মাস অথবা তার কিছু বেশি দিন পরে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তার অকস্মাৎ মৃত্যু নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। বাবা ছিলেন একজন সফল এবং সার্থক ব্যক্তি। সততা এবং ধর্মকর্মের জন্য তিনি ছিলেন সুপরিচিত।’
‘আমার ছোট দু’ভাই, যারা পরবর্তীতে নিউমোনিয়ায় মারা যায়, বাবার মৃতদেহ গোরস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। আমি মায়ের সঙ্গে ছিলাম। আমাদের যা কিছু ছিল, সব বিক্রি করে আমরা কিয়ামবু থেকে পালিয়ে গাথিগি-ইনি গিয়েছিলাম। তারপর মা আমাকে সম্পূর্ণ ঘটনা, যতটুকু তার স্মরণে ছিল, বলেছেন, অর্থাৎ কৃষ্ণ পক্ষীর কাহিনি।’
মাঙ্গারা থামে এবং একটা দীর্ঘ নিঃশাস ছাড়ে।
‘দেখ, পুরো ঘটনাই মুরাং’আকে ঘিরে। সেখানে ছিল আমাদের আদি বাসস্থান। আমরা অনেক জমি-জমার মালিক ছিলাম। যুবক বয়সে আমার দাদা শেতাঙ্গদের নিয়ে আসা খিস্টান ধর্মে সর্বপ্রথম ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন এবং দাদার মতো নতুন ধর্মান্তরিতদের মধ্যে ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। তাদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছিল যে, তাদের লোকজনের মধ্যে যা কিছু আছে, সবই খারাপ। প্রতিটি আচার-আচরণ ছিল পাপে ভরা। লোকজনের মধ্যে প্রতিটি বিশ্বাস ছিল কুসংস্কার, যা ছিল শয়তানের কাজ। আমাদের ঈশ্বরকে প্রিন্স অব ডার্কনেস, অর্থাৎ অন্ধকার রাজপুত্তুর, সম্বোধন করা হতো।
আমার দাদু এবং তার মতো মন-মানসিকতার লোকজন ঈশ্বরকে পছন্দ করতেন। তারা ভাবতো হারিয়ে যাওয়া সমাজকে পুনরুদ্ধার করার জন্য ঈশ্বর তাদের সৈনিক করে পাঠিয়েছেন। কোন কিছুই তাদের ক্ষতি করতে পারবে না। যিশু ছিলেন তাদের দলে। তাই তারা পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য পবিত্র জায়গায় যেতেন এবং মুগুমুর অধীনে যেসব মাংস এনগাইকে উৎসর্গ করা হতো, তা ফেলে দিত। যিশুর সৈনিকরা শয়তানের সঙ্গে লড়াই করতো।
‘তখন একজন বৃদ্ধ মুন্ডো মুগো ছিলেন। তিনি ভূখণ্ডের সব মানুষের কাছ থেকে সম্মান অর্জণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি অনেক রোগের চিকিৎসা করে ভালো করতে পারতেন। তিনি আরোগি এবং অন্যান্য শয়তানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। বলা হয়, তিনি ভবিষ্যৎও দেখতে পারতেন। তার জাদু ছিল খুবই শক্তিশালী। তিনি সেসব জাদু মানুষের ভালোর জন্য ব্যবহার করতেন, বিশেষ করে যুদ্ধ এবং খরার সময়। আমার বাবা তার কাছে গিয়েছিলেন। অত্যধিক উৎসাহ নিয়ে বাবা বুড়োর সমস্ত কিছু ভেঙেচুরে তছনছ করেছিলেন এবং আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। ঘটনার পরে বাবা তাকে ধর্মের উপর জ্ঞান দেওয়া শুরু করেছিলেন। বুড়ো যা দেখেছিলেন, প্রথমে সে তা বিশ্বাস করেননি। তারপর ভয়ার্ত কন্ঠে আমার দাদুকে বলেছিলেন যে, দাদুর ক্ষোভ নিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন। বৃদ্ধ লোকটি সেখান থেকে চলে গিয়েছিল।
‘কয়েক বছর পরে লোকটি কৃষ্ণ পক্ষী হিসাবে ফিরে আসে। আমার দাদু মারা যায় এবং তার ছেলেমেয়ে ও স্ত্রী একই পথ অনুসরণ করে। শুধু ব্যতিক্রম ছিলেন আমার বাবা। মৃত্যুর আগে সবাই বলেছে যে, তাদের সঙ্গে দেখা করতে কৃষ্ণ পক্ষী এসেছিল। আমার বাবা মুরাঙ্গ’আ থেকে পালিয়ে কিয়ামবুতে গিয়েছিলেন। তুমি তো জানো, পাখি কিন্তু তাকে অনুসরণ করেছিল।’
মাঙ্গারা পুনরায় থামে। ক্লান্ত কণ্ঠস্বরের জন্য আমাকে তার দিকে তাকাতে হয়েছিল। সে বললো, ‘গাথিনি-ইনি আসার পরপরই আমার মা মারা যান। তিনিও কৃষ্ণ পক্ষীর শিকার হয়েছিলেন। আমি গভীর ভাবে বিষয়টি ভেবে দেখেছি। কেন আমার বাবা এবং মা অপকর্মের জন্য মারা যাবে, যা তারা কখনো করেননি? কেন? কেন? তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি কখনই পাখি খুঁজতে যাবো না। আমি প্রার্থনা করেছি। আমার আকুল আকাঙ্ক্ষা ছিল আমি দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবো। কিন্তু সবই ভেস্তে গেছে। তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না, আমার জন্য পাখিটি সত্যি ছিল। স্কুল জীবনের পুরোটা সময় আমি কৃষ্ণ পক্ষী খুঁজেছি। তারপর স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে প্রবেশ করেছি।’
‘ওয়ামাইথার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমি পাখির কথা বেমালুম ভুলে যাই। এবং সেই পুরো সময়ে আমি শুধু ভেবেছি কেমন করে দুনিয়ায় বেঁচে থাকা যায়, যাতে আমি তাকে বিয়ে করতে পারি। আমি কতটা বোকা ছিলাম, ভেবেছিলাম জীবনে সফল হবো। তবে সে-টা ছিল সফলতা, আমি আজও তার পেছনে ছুটে চলেছি। আমি ভেবেছিলাম হয়তো আমার আত্মার শান্তি হবে এবং আমার মনের মধ্যে পাখি কখনই আসবে না। অগত্যা যদি আসে, তাহলে আমি পড়াশুনার মধ্যে আরো বেশি মনোযোগী হয়ে শক্ত হাতে প্রতিহত করবো।’
সে থামে। তারপর দু’হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে এবং পেছনের দিকে হেলে চেয়ারে ঠেস দিয়ে বসে। আমাকে পাশ কাটিয়ে সে দূরের দিকে তাকায়। সে বললো, ‘এখন কৃষ্ণ পক্ষীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।’
আমি উঠে দাঁড়াই এবং ভয়ার্ত চোখে ঘরের চতুর্দিকে খুঁজতে শুরু করি। দেয়ালে মন্দ অবতারের বিশৃঙ্খল ছায়া। আমি পুনরায় বসে পড়ি এবং নিজেকে লজ্জিত ভাবতে থাকি।
‘তা ছিল গত সপ্তাহ। তুমি জানো, আমি সরাসরি এখানে আসিনি। রবিবার ওয়ামাইথার সঙ্গে হাঁটতে গিয়েছিলাম। জীবনে এর চেয়ে বেশি আনন্দ কখনই অনুভব করিনি। সেই প্রথম আমি আমার অতীতের কাছ থেকে নিস্তার পেয়েছিলাম। আমি যেন নতুন জগতের এক নতুন মানুষ, যেখানে ওয়ামাইথা এবং আমি শুধু বাস করি। আমরা কৌতুক এবং হাসি-তামাশায় ছিলাম বিভোর। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। আমরা একটা পাহাড়ে বসেছিলাম এবং বাচ্চাদের মতো খেলছিলাম। ওয়ামাইথা কিছু সময়ের জন্য আমাকে একলা রেখে কোথাও গিয়েছিল। আমি একদিকে কাত হয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছিলাম।’
‘পাখি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমি বর্ণনা করতে পারবো না সেই অপচ্ছায়া আমার উপর কতটুকু প্রভাব ফেলেছিল। আমি কিছুই অনুভব করিনি। এমনকী আমি চিৎকারও করতে পারিনি। আমি শুধু তাকিয়েছিলাম। আমার প্রতি নিজেই আমি কিঞ্চিৎ বিস্মিত ছিলাম। তখন পাখির মুখোমুখি আমি, যার সঙ্গে মোলাকাত করার জন্য প্রার্থনা করেছি। অথচ কিছুই করতে পারিনি। পাখিটি ছিল ময়লা ঝুলের মতো কালো … হয়তো সন্ধ্যার অন্ধকারে তেমন দেখাচ্ছিল। কিন্তু চোখ দু’টি ছিল বড় … এবং … দেখতে মানুষের চোখের মতো। চোখ দু’টি লাল … আহা … না, না। পাখিটি চলে যায় এবং আমি নড়াচড়া করিনি।’
গা ছমছম করা পুরনো ঘটনা মনে পড়ায় মাঙ্গারা ভীষণ কাঁপতে থাকে। আমিও ভয় পেয়েছি। চটজলদি আমি দরজার কাছে ছুটে যাই এবং সবেগে খিল লাগাই। জানালার কাছে যাই এবং অশুভ অন্ধকার ভেতরে ঢুকতে না দেওয়ার জন্য জানালার পাল্লা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিই। তারপর আমি ফিরে আসি।
‘ওয়ামাইথাকে বলেছিলে ?’
‘না, বলিনি। আমি বলেছি আমার ভালো লাগছিল না। সে আমাকে কাঁপতে দেখেছে এবং ভেবেছে আমার হয়তো ঠান্ডা লেগেছে। আমি কেমন করে তাকে ঘটনার মধ্যে টেনে আনবো ? যাহোক, সে আমার কাহিনী বিশ্বাস করবে না। এমনকী তোমাকেও …’
আমি প্রতিবাদ করতে দ্বিধা বোধ করি। কিন্তু বোধহয় মন থেকে দূর্বলতাকে মুছে ফেলার জন্য চেষ্টা করি। আমি ভাবলাম হয়তো এ-টা লজ্জার বিষয় যে, সে একজন মেডিকেলের ছাত্র এবং পশ্চিমা ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে এধরনের অর্থহীন ঘটনা বিশ্বাস করবে।
‘আমি জানি, তুমি বিশ্বাস করো না। তাহলে কি অন্য কেউ আমাকে বলেছে ! আমি তাকে-ও বিশ্বাস করতাম না।’
সেই রাতের শেষ দিকে আমরা যেই বিছানায় যাচ্ছিলাম, তখন সে আমাকে ডেকে বলেছে, ‘তুমি জানো, পবিত্র গাছের নিচের ময়লা পরিস্কার করতে যাওয়ার কথা ছিল আমার দাদার। আমার মা মারা যাওয়ার আগে এধরনের কথা বলেছিলেন।’
সেই রাতে ঘুমের জন্য আমাকে বেগ পেতে হয়েছিল।
শেষ টার্মের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য মাঙ্গারা পুনরায় কলেজে ফিরে যায়। আমি তার থেকে আর কিছু শুনিনি। কোম্পানিতে আমার ভালো চাকুরি এবং অফিস আমাকে ডিপোর দায়িত্ব দিয়ে টাঙ্গানাইকাতে পাঠিয়েছে। আমি আত্মতৃপ্তিতে বিভোর ছিলাম। কেননা আমি ছিলাম একমাত্র আফ্রিকান, যে কিনা কোম্পানীর উচ্চপদে আসীন হয়েছিল।
স্বল্প সময়ের জন্য বাড়ি ফিরে আসার আগে আমি ছয় মাস টাঙ্গানাইকাতে ছিলাম। লিমুরু খুব একটা বদলায়নি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন দালান তৈরি করার জন্য একটা জায়গা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু পুরনো ইন্ডিয়ান বাজার তখনো আছে। আমি বাজার অতিক্রম করে যাই এবং একটা সরু পথে এসে উপস্থিত হই, যা আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাবে। সেখানে ওয়ামাইথার সঙ্গে আমার দেখা হয়। সে বদলে গেছে। অনেক চিকন হয়েছে এবং তার মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে আছে মলিনতা। পড়নের কাপড়চোপড় এক সপ্তাহে ধোওয়া হয়নি। আশ্চর্য। কোথায় তার চেহারার ঔজ্জ্বলতা, পবিত্র চাহনি। মাঙ্গারা কোথায় ?
‘তুমি কেমন আছো ?’ আমি ওয়ামাইথার সরু হাতের সঙ্গে করমর্দন করি।
‘ভালো।’
‘মাঙ্গারা কেমন আছে ?’ আমি আনন্দচিত্তে জিজ্ঞাসা করি।
সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়। আমিও একই ভঙ্গিতে তাকাই। আমার প্রশ্ন হয়তো তার মনে আঘাত দিয়েছে।
‘তুমি কী শোননি ?’
‘কী খবর ?’
‘সে মারা গেছে।’
‘মারা গেছে!’
‘পরীক্ষায় সে অকৃতকার্য হয়েছিল। তাই লোকজন বলাবলি করছিল যে, সে আত্মঘাতী হয়েছে … ওহ! ওহ! কেন সে আমাকে বিশ্বাস করেনি? আমি তাকে আগের মতোই ভালোবাসতাম।’
সে নির্বিবাদে কাঁদতে শুরু করে, যেন মৃত্যুর ঘটনা এখনো তার মনের মধ্যে সতেজ। সেই সময় আমার কী ভাবা উচিৎ ছিল, তা আমি জানিনি। কেমন করে সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে?
এক সপ্তাহ পরে আমি ডা. কে-র সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। ডা. কে-ও একই কলেজ থেকে পাশ করেছে। আমার বুকে ব্যথা ছিল এবং আমি ভীষণ কাশছিলাম। আমার মনে হয়েছিল আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য অসুস্থ হয়েছিলাম। আমরা অনেকক্ষণ কথা বলেছি। একসময় আমাদের আলাপ চলে যায় মাঙ্গারার মৃত্যুতে।
‘লোকজন বলাবলি করে যে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার জন্য সে আত্মহত্যা করেছে। আমি তা বিশ্বাস করি না। সে ছিল অদ্ভূত ধরনের। তবে সে ছিল মেধাবী। তার সঙ্গে আমাদের কারোর তুলনা হয় না। কিন্তু শেষ টার্মে পড়াশুনার প্রতি সে ভীষণ অবহেলা করেছিল। দিন দিন তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। প্রায় বিকেলে তাকে কলেজের ভজনালয়ে দেখা যেত। মনে হতো তার কোন জীবন ছিল না। কিন্তু পরীক্ষার সময় তার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হয়ে উঠতো, যেন সে সুন্দর এবং উত্তেজক কিছু একটা দেখছিল। যখন পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হয়, তখন দেখা যায় সে অকৃতকার্য হয়েছে। ফলাফল জানার সময় আমি তার সঙ্গে ছিলাম। আমি বলতে পারি, সে খুব বেশি মর্মাহত হয়নি। তার মন-মানসিকতা এমন ছিল যেন সে অনেক আগেই জানতে পেরেছিল। এক সপ্তাহ পরে তাকে পবিত্র গাছের নিচে মৃত পাওয়া যায়। তার চোখে ছিল অদ্ভূত ধরনের শান্তির চাহনি। মনে হয়েছিল, সে কোন কঠিন কাজ সম্পন্ন করেছে। সেই ধরণের চাহনি কখনো কখনো পুনরুজ্জীবনের বিশ্বাসীদের মধ্যে দেখা যায়।
বাড়ি পৌঁছে আমি সরাসরি বিছানায় চলে যাই। কিন্তু অনেকক্ষণ ফাঁকা জায়গার দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকি। আমি মনোস্থির করতে পারছিলাম না, বাতি নিভাবো নাকি নিভাবো না।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close