Home অনুবাদ এনগুগি ওয়া থিওং’ও > মধ্যিখানের নদী >> উপন্যাস [আংশিক] >>> জ্যাকি কবীর অনূদিত

এনগুগি ওয়া থিওং’ও > মধ্যিখানের নদী >> উপন্যাস [আংশিক] >>> জ্যাকি কবীর অনূদিত

প্রকাশঃ November 28, 2017

এনগুগি ওয়া থিওং’ও > মধ্যিখানের নদী >> উপন্যাস [আংশিক] >>> জ্যাকি কবীর অনূদিত
0
0

এনগুগি ওয়া থিওং’ও > মধ্যিখানের নদী >> উপন্যাস [আংশিক] >>> জ্যাকি কবীর অনূদিত
দুই প্রস্থ শৈলশিরা পাশাপাশি অবস্থিত। একটির নাম কামেনো অন্যটির মাকুউ। মাঝখানে একটি উপত্যকা। যেটির নাম জীবনের উপত্যকা। কামেনো ও মাকুউর পিছনে আরও অনেক শৈলশিরা ও উপত্যকা রয়েছে। যেন তারা কোনরকম কোন পূর্ব-পরিকল্পনা ছাড়াই এমনিই এমনিই ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল যে তারা ঘুমন্ত সিংহ, কখনও ঘুম থেকে জাগবে না। যেন তারা তাদের সৃষ্টিকর্তার গভীর, নিশ্চিন্ত ঘুম ঘুমিয়ে নিচ্ছিল।
একটি নদী বয়ে গেছে জীবনের উপত্যকার ভিতর দিয়ে। যদি পাহাড়ের ঢালগুলো গাছগাছালি আর জঙ্গল দিয়ে না ঢাকা থাকতো তবে কামেনো বা মাকুউর ওপর দাঁড়ালেই ঐ নদীটিকে দেখা যেত। কিন্তু এখন তোমাকে ওটা দেখার জন্য নীচে নেমে আসতে হবে। তারপরও নদীটি ঠিক কতটা নিরবিগ্নে, কতটা শৄংখলার সাথে সাপের মত এঁকে বেঁকে পাহারের বুক চিরে বয়ে গেছে সেটা অনুধাবন করাটা বেশ কস্ট সাধ্য। নদীটির নাম হনিয়া; যার অর্থ সেরে ওঠা অথবা প্রান ফিরে পাওয়া। হনিয়া নদীটি কখনও শুকায় না। ওর ভেতরে অসম্বব রকমের প্রানশক্তি বিদ্যমান, যেন সে খড়া অথবা বৈরী আবহাওয়া কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আপন মনে বয়ে চলছিল। না তার কখনও কোন তাঁরা ছিল, না ছিল তার কোন দ্বিধা। লোকে তাকে দেখতো আর উদ্বেলিত হতো।
হনিয়া ছিল কামেনো আর মাকুউর আত্মা। ওদের সেতুবন্ধন; এবং মানুষ, গরু ছাগল, জংলি পশু, গাছপালা এদের সবাইকেই হনিয়া একই সুতোয় বেঁধে রেখেছিল। যদিও কেউ ঐ উপত্যকায় দাঁড়িয়ে শৈলশিখার দিকে তাকাতো তখন তাদেরকে এক সুতোয় বাধাঁ বলে মনে হতো না, বরং তাদেরকে একে অপরের বৈ্রী বলেই মনে হতো। এটা সহজেই বোঝা যেত। যদিও তার কোন প্রমান ছিল না, কিন্তু, তারা এমনভাবে মুখোমুখি হয়ে ছিল যে তাদের দেখে মনে হতো যেন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ঐ উপত্যকার অধিকার আদায়ের লড়াইএ যেকোনো মুহূর্তে মারামারিতে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। —
এর কিন্তু শুরু হয়েছিল অনেক বছর আগে। মাকুউতে এক লোক ছিল। সে দাবী করে যে একবার মুখুরু ওয়া গাথানা যাওয়ার পথে গিকুয়ু, মাম্বি আর মুরুঙ্গা ওখানে কিছুদিন বসবাস করে। যার ফলে নেতৃত্ব দেয়ার ভার মাকুউর উপরেই বরতায়। সব লোক ওর কথা বিশ্বাসও করত না। কারন লোকে ফিসফিস করে বলাবলি করত গিকুয়ু আর মাম্বি কি সত্যি সত্যি ওখানে থেকেছিল? ওদের থাকার ফলে কি কামেনোর পশ্চিম দিকের মাটিতে একটু ঢিবি মত তৈরি হয়েছিল? মুরুঙ্গা তাদের বলেছিল,
“মহিলা ও পুরুষ সবাই শোন,এই জায়গাটা আমি তোমাদের দিলাম। এটা তোমাদের, তোমরা এখানে চাষবাস করবে, আধিপত্য বিস্তার করবে। তোমরা এবং তোমাদের উন্নতি এখানেই।”
জমিটা ছিল উর্বর। গিকুউর সীমানা ছিল আকাশের একপ্রান্ত যেটা স্বর্গের প্রাচীর থেকে শুরু করে অন্য প্রান্ত যেটা নাকি মেঘের চাদর ছুঁয়ে যায়, সেই পর্যন্ত। কামেনোতে এই গল্প চালু ছিল। আধ্যাতিক উপরস্থতা এবং নেতৃত্ব উভয়ই এখানে বিদ্য মান ছিল।
কামেনোতে এই রেকর্ড জারি রাখার মত অনেক কিছুর উপস্তিতি ছিল। যেমন, একটি পবিত্র জায়গা যেখানে গিকুয়ু এবং মাম্বি দাড়িয়ে ছিল সেখানে গাছ পালায় ঘেরা একটা সুন্দর বনের মত একটা জায়গা তৈরি হয়েছিল। লোকজন আজ অবধি এখানে সন্মান জানাতে আসে। তাছাড়া হিসাব করলে দেখা যাবে যে এই কামেনো থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমান নায়ক এবং নেতাদের আবির্ভাব হয়েছিল। মুগু ওয়া কিবিরিও, সেই বিখ্যাত গণনাকারীর জন্মও কিন্তু এখানে হয়েছিল। সে এখানকার আলো বাতাসেই বড় হয়েছিল এবং যে যখন ভবিষ্যতের কোন কিছু জানতে চাইত সে সব কিছুই বলে দিতে পারত। কিছু লোক যারা তাকে পছন্দ করত না তারা কিন্তু তাকে মোটেও বিশ্বাস করত না। তারা তাকে ছদ্মবেশী বলে ডাকতো। তারপর এক রাতে সবাই যখন ঘুমাচ্ছিল, সে হঠা’ করেই শৈলশিখা থেকে হারিয়ে গেল।
“কিছুকাল পরে তার কথা শোনা গেল, তাকে দেখা গেছে নেইরি, কিয়াম্বু, মুরাঙ্গা নামের পাশাপাশি গ্রামগুলোতে। প্রকৃতপক্ষে সারা গিকুয়ু প্রদেশের সবত্রই তাকে দেখা গেছে। সে তখনও চিৎকার করে তার কথা প্রচার করতে থাকে :
“প্রজাপতির মতো পোশাক পরা একদল লোক আসবে।”
এরাই ছিল সেই সাদা লোকগুলো।
আবার সেই বড় যাদুকর কামিরির কথাই ধর, যার জাদু দেখে মুরাঙ্গাতে আসা সাদা লোকেরা পর্যন্ত অবাক হয়ে যেত। সাদাদের মিষ্টি হাসি আর উপঢৌকন পাওয়ার অনেক আগেই সে অনেক সুনাম কুড়িয়েছিল। ওর জন্মও কিন্তু কামেনোতেই হয়েছিল, তার আগে যেমন ছিল মুগো। সেও একদিন দূরের জনপদে হারিয়ে যায়। সরু শৈলশিরার জীবন তাকে ধরে রাখতে পারে না।
আরেকজন ছিল ওয়াছিয়ারি, ভীষণ ভাল যোদ্ধা। ওকাবি, মাসাইয়ের বিরুদ্ধে পুরো একটা উপজাতিকে নিয়ে অভিযান করেছিল। অনেক ছোট বয়সেই ও একটা সিংহ শিকার করেছিল, তাও একা একা। তাকে যখন পথভ্রষ্ট সাদারা মেরে ফেলে, তখন তরুণ যোদ্ধাদের কাছে তার অনেক পরিচিতি ছিল। অনেকের কাছেই সে একজন পূজনীয় ব্যক্তি।
শৈলশিখাগুলো জনপদ থেকে একটু দূরেই ছিল। ওখানকার অধিবাসীরা যার যার মতো করে জীবন যাপন করত। বাইরের জগতের কোন কিছুই তাদের ছুঁতে পারত না। স্ত্র্রী-পুরুষ কারোই কোন ভয় ছিল না। উকাবিরা কখনই এখানে আ্সবে না। ওরা পাহাড়ে, শৈ্লশিখায় কিমবা নদীতে পথ হারিয়ে ফেলবে। এমনকি অন্যান্য গিকুউবাসি যারা নায়েরি বা কিয়াম্বুতে থাকতো তারাও পাহাড়ে ঠিক মতো রাস্তা খুঁজে পেত না। আর তাই শৈলশিখাগুলো নির্বিঘ্ন ছিল। বাইরের কোন গণ্ডগোল সেখানে পৌঁছুতে পারত না। এই প্রাচীন পাহাড়গুলোই হলো এই মাটির মনপ্রাণ, আত্মা। এই পাহাড়গুলোই প্রাচীন উপজাতিদের আচার, যাদুমন্ত্র সব কিছুকে জীবিত ও অবিকৃত রেখেছে। তাদের লোকজন আনন্দে জীবনযাপন করত, একে অন্যে আনন্দের রক্ত এবং উষ্ণতা ভাগাভাগি করে নিত। মাঝে মাঝে তারা ঝগড়া-বিবাদও করত । কিন্তু সবকিছুই তাদের নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। বাইরের কেউ এসবে নাক গলাতে পারত না। কোন অপরিচিতের সামনে তাদের মুখ একদম বন্ধ থাকতো। তাদের সকল কর্মকাণ্ডই তারা গোপন রাখত। “কাগুতুই কা মুচিই গাতিহাকাগ আগেনি।” এই ঘরের তৈলচর্ম দিয়ে কোন অপরিচিতের চামড়া ঘষতে হবে না। এ অঞ্চলে যত বড় বড় নেতার আবির্ভাব ঘটেছিল, তাদের প্রায় সবাই এখান থেকেই এসেছে। তার কারণ কিছু লোক এখানে জন্মগ্রহণ করলেও অনেক সময়ই বাইরে চলে যেত। যারা এই মাটির মায়া ত্যাগ করে দূরে থাকার মতো মন তৈরি করতে পারত তারাই কেবল ওখান থেকে বের হতে পারত, সেটা অবশ্য মুরুঙ্গু যাদের বাছাই করত অন্য কোন জনপদের সাহায্য করার জন্য কেবল তারাই, এদের মধ্যে ছিল : ভবিষ্যৎবক্তা মুগু, সাহসী যোদ্ধা ওয়াছিয়ারি এবং শক্তিমান জাদুকর কামিরি।
তারা পাহাড়ের জনপদের কাছে অপরিচিত হয়ে গেল। এরপর ঘরের তৈলচর্মও ওদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেল। ঐটা শুধু যারা ওখানে বসবাস করে তাদের জন্য। এরা হলো সেইসব লোক যাদের রক্ত-মাংস পাহাড়ের সাথে কথা বলত। গাছেরা যাদের কথা শুনত, বাতাসের সাথে তারা কান্না করে চুপ হয়ে যেতো। বনের পশু-পাখিরা ওদের কথা শুনেও চুপ করে থাকতো। মাঝে মধ্যে কেবল তারা জবাব দিত, হয় হেসে হাততালি দিত অথবা রাগ হয়ে চিৎকার করত।

দুই
এখন পাহাড়ের গল্প পেছনে পড়ে আছে। এটা সমতলের কাহিনি। এটা হলো এদেশের একমাত্র সমভূমি। তুমি যদি তোমার দৃষ্টি প্রসারিত কর তবে দূরে ঘোলা ঘোলা উকাবি নামের জায়গাটা দেখতে পাবে। বলা হয়, একসময়, সেও অনেক দিন আগে, ওটা একটা যুদ্ধের ময়দান ছিল। তারও আগে ওটা একটা শান্ত চারণভূমি ছিল; ওখানে কিছু গরু চড়ে বেড়াচ্ছিল আর তারা ঘাস টেনে টেনে খাচ্ছিল। আর অন্য গরুগুলো শুয়ে শুয়ে শূন্যের দিকে তাকিয়ে জাবর কাটছিল।
হঠাৎ দুটি ছেলে জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। তারা মারামারি করা শুরু করল। একজন ছিল লম্বা, তার ঘাঁড় এততাই লম্বা ছিল যে তাকে দেখে অন্য ছেলেটার থেকে অনেক বড় মনে হচ্ছিল। ওর নাম ছিল কামাউ। ওর বাবার নাম ছিল কাবনি, যে নাকি মাকুউর বাসিন্দা ছিল। অন্য জনের নাম ছিল কিনুথিয়া, যে খাটো ছিল কিন্তু ওর শরীর অনেক পেশীবহুল ছিল। তার মসৃণ কপালে ধীর স্থীর বড় বড় চোখ ছিল। সে থাকত তার চাচার সাথে, মাকুউ থেকে দুই শৈলশিখা ওপারের এক গ্রামে। ছোটবেলাই ও ওর বাবাকে হারায়।
প্রথমে ছেলেদুটি লাঠি দিয়ে মারামারি করছিল, যেগুলো ওরা জঙ্গল থেকে যোগাড় করেছিল। সবুজ লাঠিগুলো মাঝ আকাশে কয়েকবার ঠাস ঠাস করে, তারপর ভেঙে যায়। ছেলেগুলো লাঠির টুকরোগুলো ছুঁড়ে ফেলে, একটা লাঠির টুকরো একটা গরুর গায়ে লাগল। গরুটি ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়ালো। সে ছেলে দুটির কাছ থেকে সরে যেতে থাকল, অন্য দুটি গরুকেও ও জাগিয়ে দিল। তারপর গরুটি এমনভাবে অন্য দিকে তাকালো, যেন ওদের মারামারিতে ওর কোন আগ্রহ ছিল না।
এতক্ষণে কামায়ু আর কুনথিয়া কুস্তি করা শুরু করে দিল। তারা একজন আরেকজনকে জড়িয়ে মাঠের মধ্যে ঘুরতে লাগল। কিন্তু কেউ কাউকে কাবু করতে পারল না। কুনথিয়া কামায়ুকে উঁচু করে ডান পা দিয়ে আটকে ফেলতেন চাচ্ছিল। কিন্তু ও সেটা পারল না। কামায়ু প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছিল। যদিও সে খুব বাচাল ছিল না, আজকে সে ভীতি প্রদর্শন করছিল।
“আজকে আমি তোকে বুঝাব, আমি কে!” বলতে বলতে ও ডান পা দিয়ে কুনথিয়ার পেটে লাথি মারতে লাগলো।
“আও!” কুনথিয়া বেথায় কেঁদে উঠল।
“তুই একটা হায়েনা!”
“তুইও!” কুনথিয়া হিস হিস করে বলে উঠল।
কুনথিইয়া কে দেখে মনে হচ্ছিলো, ঘটনা তার আয়ত্তে ছিল। দূর থেকে দেখে যে কেউ মনে করতে পারত যে কুনথিয়াই মারামারিতে জিতে যাবে। কিন্তু হটাৎ করে সে একটা চোখা নূরিতে হোঁচট খেয়ে উপুৎ হয়ে পরে যায়। কামাউ এই সুযোগে কুনথিয়ার হাতদুটি তার মাথার পিছনে ধরে রাখে। ওর মুখাবয়াব শক্ত রেখে কুনথিয়ার মুখের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, যার ফলে ওর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল। কামাউর হাঁটুর নীচে পড়ে ছেলেটি অনেক ব্যথা পাচ্ছিল। সে তার পা দুটি ছড়িয়ে দিয়ে কামাউর গলা পেছিয়ে ধরতে চাইল। ওর উপর ঘুসি পরেই চলছিল আর ও হতভম্ব হয়ে যাচ্ছিল কেননা ও জানত না এর পরে কোথায় ঘুসিটা পড়বে।
যে দুটি গরু অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল তারা এখন মনোযোগ দিয়ে ওদের মারামারি দেখতে লাগল। তারপর তারাও অন্যদের মতো ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে লাগল।
ঠিক তখনি আরেকটা ছেলে দুরের কতগুলো গরুর মধ্যে থেকে দৌড়ে এসে বলল,
“তোমরা মারামারি বন্ধ কর।” ও চিৎকার করে বলল। কামাউ থেমে গেল কিন্তু তখনও কুনথিয়ার উপর বসে ছিল।
“তোমরা কেন মারামারি করছ?”
“ও আমাকে গালিগালাজ করেছে।” কামায়ু বলল।
“ও একটা মিথ্যুক। ও আমাকে নিয়ে হাঁসা হাঁসি করেছিল কারন আমার বাবা গরীব ছিল।”
“ও আমার বাবাকে ‘সাদা লোকদের দালাল বলেছে।”
“সে তো তাই!”
“তুই একটা ফকির!”
“তুই… তুই…”
কামাউ ভীষন রেগে গেল। কুনথিয়াকে ঘুসি মারা শুরু করল। কুনথিয়া ঐ ছেলেটার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাল।
“দয়া করে এটা বন্দ কর। কামায়ু! আমরা কি শপথ নেই নি যে আমরা পাহারের কমরাড?” ও অসহায় বোধ করতে লাগল। মাত্র তিন দিন আগে তারা একে অন্যে্র ভাই হওয়ার শপথ নিয়েছিল।
“যে কমরাড আমার বাবাকে অপমান করে, তার জন্য আমার কি কোন মায়া থাকা উচিত?”
“আমি আবারও ঐ একই কথা বলব।“ কুনথিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল।
“বল তুই!”
“আমি বলব।“
“চেষ্টা করে দেখ!”
কামাউ আর কুনথিয়া আবার মারামারি শুরু করল। অন্য ছেলেটির ভীষণ ইচ্ছা হোল কামাউর উপর চড়াও হওয়ার। ও একটা ঘাসের ডগা তুলে জোরে জোরে চিবাতে লাগল। রাগে দুঃখে ওর চোখ বড় বড় হয়ে যেতে লাগল।
“কামাউ!” সে চীৎকার করে উঠল।
ছেলেটির কাঁপা স্বর কামুউর শরীরে একটা ভীতির সঞ্চার করল। সে চোখ তুলে তার দিকে তাকিয়েই রইল। অনিচ্ছা হলেও কামাউ ছেলেটির আদেশ পালন করল। কিন্তু ত্তর মুখটা আগের চেয়ে অনেক কালো হয়ে গেল। সে একটু লজ্জায় পরে সরে গেল। নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল হাল ছেড়ে দেয়ার জন্য। কুনথিয়া নড়বড় করে উঠে দাঁড়িয়ে ঐ ছেলেটির দিকে কৃতজ্ঞ চিত্তে তাকাল। ছেলেটি কিন্তু একদৃষ্টে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। কামাউর জন্য দুঃখ হতে লাগল এবং হঠাৎ তার ঝগড়া মিটানোর জন্য যে আনন্দ, যে অহং বোধ ছিল তা ফিকে হয়ে গেল। কামাউ যদি হাল না ছেড়ে দিত আর ও যদি তাকে মেরে সেটা ওকে দিয়ে করাত তবে হয়ত ওর এতোটা খারাপ লাগত না।
ছেলেটির নাম ছিল অয়াইয়াকি। চেগের একমাত্র ছেলে। সে অনেক ছোট ছিল। কামায়ু বা কুনথিয়া কেউই ওর বয়সী নয়। সে তখনও তার দ্বিতীয় জন্ম পার করে নাই। অয়াইয়াকি তার বয়সের চেয়ে অনেক বেশি লম্বা হয়ে গিয়েছিল। ওর শরীর স্বাস্থ্যও বেশ ভাল ছিল।অনেকটা ক্রীড়াবিদদের মতো।ওর চুলগুলো ছিল শক্ত ও খড়খড়ে এবং কপালের উপর জট পাকানো ছিল। জটগুলো সুন্দর একটা লাইনে কপালের উপর পরে থাকত। ওর বাঁ চোখের উপর একটা বাঁকানো দাগ ছিল। কোন একসময় একটা বুনো ছাগল ওকে ব্যথা দিয়েছিল। সেবার এক বুনো ছাগল একটা ছেলেকে তাড়া করেছিল, সেটা দেখে অয়াইয়াকি একটা লাঠি নিয়ে চীৎকার করে ঐ ছাগলটাকে তাড়া করছিল। ছাগলটা অয়াইয়াকিকে তার শিং দিয়ে আহত করে। ওর কপালের চামড়া ছিলে হাড্ডি পর্যন্ত বের হয়ে গিয়েছিল। ওর বাবা ঠিক ঐ সময়ে ওখানে এসে উপস্তিত হয়েছিল। তাই ওকে বাঁচাতে পেরেছিল। সেটা ছিল বেশ অনেক দিন আগের ঘটনা। ওর ক্ষতটা শুকিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ওর সমবয়সী ছেলেরা ওকে বীর মনে করা শুরু করল। যদিও ও কিন্তু আনন্দছলে ছাগলটার পিছু নিয়েছিল, শুধুই খেলাচ্ছলে। তবে সেটা কিন্তু ছেলে বুড়ো সবাই ওকে অনুকরণ করার একমাত্র কারণ ছিল না।

ওর বাবা চেগে, কামেনোর একজন নামকরা বয়োজোষ্ঠ ছিল। ওর একজন মাত্র স্ত্রী ছিল, যে অনেক মেয়ের জন্ম দিয়েছিল, সাথে কেবল একটি ছেলে। ওর বাকি দুই স্ত্রী বড় দুর্ভিক্ষের সময়ই মারা গিয়েছেল। তাদের কোন সন্তানাদি হয় নি। দুর্ভিক্ষের আগের বছর খুব ভাল ফসল হয়েছিল। তারপর পঙ্গপাল আর পোকা মাকরের আবির্ভাব হয়েছিল ঠিক খরার আগে যার ফলে অনেক লোক মারা পরেছিল। চেগে সেবার মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিল। এখন ওর মেয়েদের অনেক ভাল ঘরে বিয়ে হয়েছে। একজন ছাড়া, যে অনেক ছোটো বেলায় মারা গিয়েছিল। এলাকার অন্যান্য বয়োজোষ্ঠরা চেগেকে অনেক সন্মান করত। তার কারণ ছিল যে সেই একমাত্র এ প্রদেশের রীতিনীতি, পাহাড়ীদের গোপনীয় বিষয় সম্পর্কে জানত। সেই সমস্ত রীতিনীতি আর গোপন চিহ্নের মানে বলতে পারত। সে জন্যেই চেগে সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা করত।
তাকে নিয়ে অনেক গল্পই চালু ছিল। কেউ কেউ বলত যে, যাদুবিদ্যা জানত। অন্যরা বলত যে সে ভবিষ্যত বক্তা ছিল, আর মুরুঙ্গুর সাথে তার কথা হতো। তাই তারা বলত যে সে মুগু ওয়া কিবিরের মতো ভবিষ্যত বলতে পারত, যে নাকি অনেক দিন আগে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে গিকুউতে সাদা লোকের আবির্ভাব ঘটবে। এবং তারা এদেশ দখল করে নেবে। কেউ কেউ বলত যে, চেগের সাথে মুগুর রক্তের সম্পর্কে ছিল। তবে এটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারত না। চেগে কিন্তু নিজে কিছুই বলত না। যখন থেকে চেগে সিরিয়ানা মিশনারি সেন্টার সম্পর্কে সাবধানবাণী বলা শুরু করে, তখন থেকেই লোকজন তাকে অবিশ্বাস করা শুরু করলো। তারপর থেকে সে কম কথা বলা শুরু করে, এবং নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে। চেগে শৈলশিখার লোকজনদের মুরাঙ্গা, ন্যেরি, কিয়াম্বুর কথা বলে। সে তাদের টুমু টুমু, গিকুউ, লিমুরু আর কিজাবের কথা বলে। তখন লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি কিভাবে জান?”
“ওদের দেখ! ওরা প্রজাপতির মতো।“
“প্রজাপতি? তুমি তো কখনও শৈলশিখার বাইরে যাও নি।“
“ওরা ওখানে আছে, শৈলশিখার ওপারে। বাসা তৈরি করছে, জমি দখল করে নিচ্ছে।”
“তুমি কিভাবে শৈলশিখার ওপারের আলো দেখতে পেলে?”
“বোকা, বোকা, সব বোকা!” চেগে মনের দুঃখে বলতে থাকে।
নাইরোবির এর মধ্যেই অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছিল। সেখানে যেসব জায়গায় শৈলশিখা ছিল না, সেখানে রে্লওয়ে লাইন তৈরি হচ্ছিল। শৈলশিখার খুব বেশি কেউ ওখানে যায় নি ওরা নীচু গলায় একে অপরের সাথে কথা বলত,
“সাদা লোকেরা তো আর পাহাড়ের ভাষা বুঝবে না।“
“এখানকার নিয়ম-নীতিও তো ওরা জানবে না!”
কিন্তু যেইসব সাদা লোকেরা সিরিয়ানা, জশুয়া আর কাবন্যিতে এসে থাকছিল তারা পাহাড়িদের মত করে জীবনযাপন করছিল না। তারা তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করছিল। তারপরও লোকজন এসব কিছুকে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের কাজ করতে লাগলো আর বলাবলি করতে লাগল,
“বাইরে থেকে কে এসে এই পাহাড়ের মধ্যে থাকতে পারবে?”
চেগে তখন অনেক ছোট ছিল। এখন তার বয়স হয়েছে। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে সে একটা জিনিস মনে করতে থাকল, তার চোখে একটা অদ্ভুত আলো জ্বলত। আশার আলো। সে সেটাকে সযতনে লুকিয়ে রাখতো আর অপেক্ষায় ছিল, কাকে এই জ্ঞানটুকু দেয়া যায়।

তিন
দেমি না মাথাতি ছিল ওদের দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। প্রাচীন যুগে তারা এখানে বসবাস করত। তারা গাছ কেটে, জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদ করার জন্য জায়গা তৈরি করে। ওদের অনেক গরু ছাগল ও ভেড়া ছিল এবং মাঝে মাঝেই তারা মুরুঙ্গির উদ্দেশে কুরবানি দিত। তারা বিভিন্ন সময়ে তাদের পূর্বপরুষের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করত। অইয়াকি এই গোত্রের দুই পুরুষের কাহিনি সম্পর্কে জানত এবং এ নিয়ে সে গর্ব বোধ করত। তারা নিশ্চয় অনেক শক্ত সমর্থ ছিল কেননা তারা জঙ্গলের বৈরি পরিবেশেই নিজেদের খাপ খাওয়াতে সক্ষম ছিল।
মাঝে মধ্যে ও আরও কিছু ছেলেপেলেদের সাথে জঙ্গলে দেমি না মাথাতির খেলা খেলত। একদিন কয়নার এক ছেলে অয়াকিকে বলল।
“তুমি দেমি হতে পার না!”
“কেন?” সে জিজ্ঞেস করে, অন্য ছেলেরা সবাই জড়ো হয়।
“তোমার এখনও খৎনা হয় নি। তুমি এখনও প্রস্তুত নও।
অইয়াকি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। এরপর ও ঘুরে অন্য ছেলেগুলোর দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকায়। ওর বড় বড় চোখগুলো পানিতে ভরে যায়। ও যখনই কারো দিকে তাকায় তখনই ওর চোখ দিয়ে একধরনের দ্যুতি বের হতে থাকে। যেটা নাকি যে কারো শরীর ভেদ করে তার অন্তরের অন্তঃস্থল পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। কেউ কিন্তু ওর চোখের ভাষা বুঝতে পারত না এবং সেটা না বুঝেই তাদের তার কথা মানতে হতো। সে দৃষ্টিটা ছিল আকুতিপূর্ণ অথচ ভীষণভাবে দাবি পূরণে সক্ষম। ওর মা-ও মাঝে মাঝে ওর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিত। এর জন্যই বোধ হয় নারীরা এবং যুবতী মেয়েরা তার সামনে লজ্জা পেত। যদিও ছেলেরা মেয়েদের দিকে তাকালে সব সময়ই তারা লজ্জা পায়। আইয়াকি তার নিজের চোখে কখনই কোন খারাপ কিছু দেখত না। শুধু মাঝে মাঝে সে বুঝত যে তার চোখ জ্বলত। এবং চোখ দুটোই তাকে কঠিন কিছু করিয়ে বা বলিয়ে নিত।
এবং সেদিন তার উপর সেই বোধটা কাজ করছিল। তার মনে হয়েছিল, যেন দেমি তার উপর ভর করেছিল। সে বলে উঠল,
“আমিই দেমি।” বলে সে দূরে একটা গাছের দিকে তাকাল, এবং বলল, “আজ আমি ঐ গাছটাকে কেটেই ছাড়ব।” সাথে সাথে সে একটা কুঠার নিয়ে গাছটাতে কোপ মারা শুরু করল, চারিপাশের কোনকিছুই সে খেয়াল করল না। সে তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে গাছটা কাটতে লাগল। একসময় তার কুঠারটার লাঠি ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে গেল। এটা দেখে প্রথমে ছেলেগুলা হাঁসতে লাগল পরে একে একে তারা সবাই একেকটা গাছ কেটে জঙ্গল পরিষ্কার করল চাষাবাদের জন্য। দেমি না মাথাথি ঠিক এই একই কাজ করেছিল।
সেই দিনই অইয়াকি তার মাকে বলেছিল, “আমার দ্বিতীয় জন্ম হওয়া দরকার।“

আজ সেই দিন। সকালের সূর্য যখন আলো দেয়া শুরু করল আর ছাগলেরা দেয়ালের সাথে নিজেকে ঘসতে লাগল ঠিক তখনই অইয়াকি নিজের কুটীরে গিয়ে তার কাধে রোদের আলো পড়তে দিল। সূর্যের তাপ তার শরীরে বেশ উপভোগ্য মনে হোল।
অইয়াকি সুখী হতে চেয়েছিল। সে খুবই সুখী হতে চেয়েছিল। সে তো এ অঞ্চলের সব নিয়ম কানুন শিখতে চেয়েছিল। নয় কি? সে দ্বিতীয় জন্মের সমস্ত আচার আচরণ রপ্ত করে নবরূপে আবির্ভূত হতে চেয়েছিল। সে জানত সে তার বাবার মতো হতে পারবে, যে নাকি বহুদিন আগে আগু এবং আগুর থেকে অনেক জ্ঞান আহরণ করেছিল।
কিন্তু সে ভীষণভাবে হতাশ হয়েছিল। কি যেন তার মাংস ভেদ করে তার ভেতরটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল, সেটা সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। ওর কুন্থিয়া আর কামাউর কথা ভীষণ মনে পড়ছিল আর মনে হচ্ছিল যে ওরা পাশে থাকলে খুব ভাল হতো। যদিও সে এই জিনিসটাই সবচেয়ে বেশি চেয়েছিল। সূর্যের আলো যখন ওর গায়ে পড়ছিল, ও তখন ওর পেশীগুলোকে টান টান করে রেখেছিল, আর ওর চোখ বন্ধ করে ওর অপেক্ষার দিনগুলোতে যেরকম গুরুত্ব পেয়েছিল তা অনুধাবন করার চেষ্টা করছিল। সে অপেক্ষা মধুর ছিল। এখন আর সেটা কোন ব্যাপার বলে তার কাছে মনে হচ্ছিল না। আর একদিন পরে ওর সব অনুষ্ঠানের চেয়ে বড় অনুষ্ঠান, ওর মুসলমানি হয়ে যাবে। এটা হবে তার যৌবনে পৌছানোর সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। তারপর সে তার শৌ্র্য-বীর্য ও সাহস দেখাতে পারবে।
পান করার জন্য অনেক পরিমাণ সুরা তৈ্রি করা হয়েছে এবং অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ এসে উপস্থিত হয়েছেন। দুজন সকাল সকাল এসেই ছাগল জবাই করেছেন। তারা এখন সেটা কাটাকাটিতেই ব্যস্ত। সবাইকে মাংস খেতে দেয়া হবে। মৃত এবং জীবিত সকল আত্মাকেই উপস্তিত থাকার জন্য অনুরোধ করা হবে।
আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে বেশি সময় লাগল না। ওটা এমন কোন কঠিন কাজও ছিল না। ওর মা এমন ভাবে আগুনের পাশে বশে ছিল যেন তার প্রসব বেদনা উঠেছিলো। অয়াইকি তার দুই উরুর মাঝখানে বসে ছিল। ছাগলের একটা চিকন নাড়ি দিয়ে তার মার সাথে তাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। সেটা ছিল প্রতিকী নাড়ি। একজন বৃদ্ধা যাকে দাই বলে মনে হয় সেরকম একজন মহিলা এসে জন্ম-সুতা কাটে। বাচ্চাটা কাঁদতে শুরু করে। যে মহিলারা বাচ্চা হ্ওয়ানোর জন্য এসেছিল তারা আনন্দে গান করতে লাগল।
“আলি ই ই ই!
বুড়ো অইয়াকির জন্ম হয়েছ।
দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে যেন সে আদিম আগুনটা বয়ে নিয়ে যেতে পারে।”
কিছু সময়ের জন্য অইয়াকি নিজেকে ভুলে গিয়েছিল এবং সে নিজেকে দেমী বলে মনে করে। সে যেন জঙ্গল কেঁটে পরিস্কার করছিল। যেন ওদের পুরো গোত্রটাই ওর সাথে কাজ করছিল। কিন্তু ও যখন চোখ খুলে দেখল যে বুড়ো বুড়ো মহিলারা ওকে ঘিরে গান করছে তখন ও ঠিক একটা ছোট্ট বাচ্চার মতো করে কাঁদতে লাগল। ও নিজের ভীতরে ভয় অনুভব করতে লাগল। কিছু সময়ের জন্য সে বেদনাটার ভয়টা অনুভব করতে লাগল। সে তার চোখ দুটোকে বড় বড় করে মেলে ধরার চেষ্টা করল এবং এক মুহূর্তের জন্য তার পাগলের মত মনে হোল যে সে আর কখনই তার চোখ মেলে রাখতে পারবে না। ও তখন ভয়ে কাঁপতে লাগল এবং তার মনে হলো সে ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। এর আগে সে কোনদিন এভাবে কোন কিছু অনুভব করে নাই এবং তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে গড়িয়ে মাটিতে পড়তে লাগল। মহিলারা চিৎকার করতে থাকলেও কোন কিছুই অইয়াকির কানে ঢুকছিল না। সে শব্দটা তার কাছে দুরের কোনো এক গুঞ্জন বলে মনে হলো। ঠিক যেন ওর স্বপ্নে দেখা এক মৌমাছির চাকের গুঞ্জন। ও স্বপ্নে দেখেছিল যে একদল মৌমাছি ওকে আক্রমণ করতে আসছিল। তখন ও আরো অনেক কাঁদতে লাগল। লোকজনের ভয় লাগল, এমন তো হত্তয়ার কথা ছিল না।
বিকেলের দিকে, ওর মা মাঠে গেল। অইয়াকি ওর মার পিছনে পিছনে ছোট্ট বাচ্চার মতো হেঁটে হেঁটে গেল। এর মধ্যেই ত্তর চুলও কাটা হয়েছিল। ওর মা হনিয়া নদীর তীরে গেল, অইয়াকিও গেল। ওর মা ওকে নদীর পানিতে গোসল করাল। ও ঝকঝকে পরিস্কার হয়ে উঠে এল।
ও সেদিন খুব তাড়াতাড়ি ঘুমাতে গেল। ওর পেটের ভেতরটা শূন্য মনে হোল। পুরো ব্যাপারটাই ওর কাছে অদ্ভুত বলে মনে হলো। অনুষ্ঠানটা শেষ হওয়াতে সে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। তারপর অইয়াকির ক্ষীণ একটু গর্ব বোধ হতে লাগল। সে যেন নতুন একটা শুরুর জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।

উৎস : The River in Between উপন্যাসের আংশিক অনুবাদ

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close