Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ এনামুল রেজা / ইসমাইল কাদারে ও মৃতের সঙ্গে বসবাস

এনামুল রেজা / ইসমাইল কাদারে ও মৃতের সঙ্গে বসবাস

প্রকাশঃ March 24, 2017

এনামুল রেজা / ইসমাইল কাদারে ও মৃতের সঙ্গে বসবাস
0
0

“আমি রাজনৈতিক লেখক নই। যত দূর বুঝি, আসলে কেউ-ই রাজনৈতিক লেখক নন।” এই মুহূর্তে বিশ্বখ্যাত আলবেনীয় ঔপন্যাসিক ইসমাইল কাদারেকে বুঝতে হলে ‍সুইজ্যারল্যান্ডের সুইস প্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর সাক্ষাৎকারের এই কথাগুলি খুবই জরুরি। যদিও এই নিবন্ধটি লেখা হয়েছে কাদারের সাম্প্রতিক উপন্যাস – আ গার্ল ইন এক্সাইল নিয়ে, তবু লেখক হিসেবে তাঁর দিকে তাকাতে হলে প্রয়োজন কাদারের রাজনৈতিক অবস্থানটি স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া, যা সম্ভবত কিছুটা জটিল। বিশ্বসাহিত্যের অন্য যে কোন লেখকের তুলনায় তাকে বোঝা আসলে এতটা সহজ নয়।

১৯৭০ থেকে ১৯৮২, প্রথমত তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট আলবেনিয়ার একজন পার্লামেন্ট সদস্য। এই সময়ে দেশে-বিদেশে লেখা প্রকাশের অনুমতি ছিল তাঁর। রাজনৈতিক অসঙ্গতি নিয়ে ১৯৭৫ সনে তিনি একটি বিদ্রুপাত্মক কবিতা লেখেন, ফলে রীতিমত তীব্র সমালোচনার শিকার হন আর দেশের বাইরে তার রচনা প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সবচেয়ে ভয়ানক অঘটনটি ঘটে ১৯৮২ সনে। আলবেনিয়ার কমিউনিস্ট লেখক-শিল্পী গোষ্ঠি থেকে অভিযোগ আনা হয়- কাদারের উপন্যাসে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ ও উদ্দীপনার চাইতে ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির প্রভাব বেশি। এটা একধরনের অভিযোগ, সমাজতন্ত্রীরা যা প্রায়শই করে থাকে। দ্বন্দ্বের সূত্রপাত মূলত এখান থেকেই। সে সময় সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী কাদারে অনুধাবন করতে থাকেন যে সমাজতন্ত্র তাঁর শৈল্পিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। দেশে থেকে লেখালেখি করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে, দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেন তিনি আর ১৯৯০ সালে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে প্যারি চলে আসেন। সমালোচকদের রীতিমত ধাঁধায় ফেলে দেন। কাদারে কী আদতেই গণতান্ত্রিক মতবাদে বদলে নিলেন নিজেকে নাকি অন্তরালে এখনও বহাল তার পূর্বের মতাদর্শ?

প্রকৃত লেখকের কাজ কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার করা নয় বরং নিজের দেশ, মানুষ ও মাটির নিগূঢ় কথাগুলো পাঠকদের সামনে উন্মোচিত করা। ইসমাইল কাদারের সমস্ত উপন্যাস আমাদের এরকম কথাই বলে। তিনি বলতে চান যে, কখনই একজন লেখক রাজনৈতিক হন না। সাহিত্যে রাজনীতি বড় জোর একধরনের উপকরণ হতে পারে।

ফিরে আসি আগার্ল ইন এক্সাইল-এর কথায়। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট আনোয়ার হোজ্জা-শাসিত ১৯৮০ সনের সমাজতান্ত্রিক আলবেনিয়া। মূল চরিত্র রুদিয়ান স্তেফা একজন নাট্যকার, যে আত্মমগ্ন একজন মানুষ, মোটেই নায়োকোচিত নন। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে তাকে কাদারের অন্য কাহিনিগুলির মানুষের মতই উশৃঙ্খল, জটিল এবং অপছন্দের একটা চরিত্র বলে বর্ণনা করা যেতে পারে। নিজের বান্ধবী থাকা স্বত্ত্বেও সে মিজেনা নামের আরেকটি মেয়ের সাথে প্রেম করে। ঘটনাক্রমে একদিন ঝগড়ার সময় মিজেনাকে সে ধাক্কা দেয়, কাছের একটা বুকশেলফের সঙ্গে মাথায় আঘাত পেয়ে মেয়েটি আহত হয়।

কিছুদিন পরেই পার্টির একটা কমিটি তাকে তলব করে অজ্ঞাত কিছু প্রসঙ্গ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। রুদিয়ান ভাবে, হয়তো মিজেনা অভিযোগ করে থাকবে নির্যাতনের, অথবা  তার সদ্য লেখা নাটকটি মঞ্চস্থ হবার আগে হয়তো প্রয়োজনীয় কাটছাঁট করার নির্দেশ দেয়া হবে। অথবা মঞ্চায়নে হয়তো সরকারি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে রুদিয়ান তো অবাক, কারণ তাকে ডাকা হয়েছে লিন্ডা বি নামের এক নারীর আত্মহত্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। মৃতার হাতে রুদিয়ানের লেখা একটি নাট্যগ্রন্থের কপি পাওয়া গেছে, উপরন্তু বইটি যাকে উৎসর্গ করা হয়েছিল সে ওই সদ্য মৃতা নারীকেই। এ ব্যাপারে কোন তথ্যই উপন্যাসের নায়ক রুদিয়ান দিতে পারেনা।

ধীরে ধীরে আবিষ্কৃত হয় লিন্ডা বি রাজনৈতিক কারণে নির্বাসিত একটা পরিবারের সন্তান। রাজনৈতিক কারণে আনোয়ার হোজ্জা প্রশাসন যাদের নিজের শহর থেকে বহুদূরের অন্য এক শহরে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাসন দিয়েছিল। কিন্তু এই পাঁচ বছর আর কখনও ফুরায় না। নিয়মিতভাবে মেয়াদ বাড়াতে থাকে। পারিবারিক এই সংকটের মাঝেই রীতিমত মানসিক সংকটে পড়ে আর তার এক বান্ধবীর মাধ্যমে রুদিয়ান স্তেফার খোঁজ পায়, যাকে সে কয়েকবার দেখেছে টিভিতে, তার বই পড়েছে এবং ওই বান্ধবীর মুখে শুনেছে গল্প। এভাবেই সে স্তেফার প্রেমে পড়ে যায়। মূলত এইসময় থেকেই পাঠক জানতে পারে, লিন্ডার এই বান্ধবীটি হল রুদিয়ানের বর্তমান প্রেমিকা মিজেনা। মিজেনা যে রুদিয়ানের সঙ্গে প্রণয়ে লিপ্ত, এই তথ্য জানবার পরেই কী লিন্ডার স্বপ্ন ভেঙে যায় আর সে আত্মহত্যা করে? আসলেই কি এমন সমান্তরালভাবে ঘটেছিল কিছু?

উপন্যাসের কাহিনি এগোয় রুদিয়ান স্তেফার মৃতা এবং প্রায় অজ্ঞাত প্রেমিকা লিন্ডা বি-র রহস্যময় অতীত ও বর্তমানকে জানবার উৎকণ্ঠায়। আলবেনিয়ার প্রায় ভৌতিক রুদ্ধ পরিবেশ ও শিল্পীর স্বাধীনতায় সরকারের অস্ত্রোপচারের নানান কাটাছেঁড়ার বর্ণনার মধ্য দিয়ে উপন্যাসটির কাহিনি এগোতে থাকে। যোগ হয় তাঁর সদ্য লেখা নাটকটির নানান উদ্ধৃতি, যেখানে একটি ভুতের চরিত্র আছে, যদিও ভুত বলে কোন কিছু থাকতে পারে না কমিউনিজমে, এটা মেনে নেয়া হয় না তার রাষ্ট্রে। কিছু জান্তব স্বপ্নদৃশ্য মূলত মানুষের নির্মম বেঁচে থাকার যাপিত দুঃস্বপ্নকে তুলে ধরেছে। রুদ্ধশ্বাস নাটকীয় পরিবেশ বলতে যা বোঝায়, আ গার্ল ইন এক্সাইলের আবহ ঠিক সেরকমই। কাদারের প্রধান যে অস্ত্র, লোকায়ত মিথকে আধুনিক জনজীবনের সাথে সংযুক্ত করা- যেমনটি দেখা যায় তার সুবিখ্যাত ব্রোকেন এপ্রিল কিংবা প্রথম উপন্যাস জেনারেল অব দা ডেড আর্মি-তে। এই উপন্যাসেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। চলে এসেছে অরফিউস আর ইউরিপিডাইসের পৌরাণিক প্রেমের ট্র্যাজিক গাথা। এই উপন্যাসে কী রুদিয়ানের প্রকৃত প্রেম লিন্ডা, যাদের সম্পর্কই শুরু হয় একজনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে? এরকম একটা সংশয়ে পাঠক উপন্যাসটির কাহিনির প্রতি আকর্ষণ ধরে থাকে।

আশি বছর বয়সে এসে এক নির্বাসিত রমণীর যে আখ্যান ইসমাইল কাদারে লিখলেন, তাকে হয়তো তার সামগ্রিক জীবন দর্শনের প্রতিফলন বলা যায়। এই উপন্যাস দিয়েই তিনি মূলত নিজের ভাবনার চুড়ান্ত ব্যাখ্যা দিয়েছেন এইভাবে যে, রাজনৈতিক পৃথিবী কখনই একজন লেখকের জগতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন লেখকদের কাছে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর প্রকৃত লেখক কখনই নিজের স্বাধীন চিন্তাকে শেকলে আবদ্ধ রাখতে রাজি হতে পারেন না। এভাবেই কাদারে বলতে পেরেছেন, আমি মনে করি আমার লেখাগুলো রাজনৈতিক নয় বরং প্রাচীন গ্রীক নাটকের মতো। যে রাজনৈতিক প্রতিবেশে লেখক হিসেবে বেড়ে উঠি না কেন, আজ যেমন আছি, আমি চিরদিন এমন একজন লেখকই হয়ে উঠতাম, হয়ে থাকবো।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close