Home দর্শন এ. কে. এম. সালাহউদ্দিন / ফুকোর সাহিত্য, চিত্তবৈকল্য, ক্লিনিক ও কিতাব বিশ্লেষণ [দ্বিতীয় পর্ব]

এ. কে. এম. সালাহউদ্দিন / ফুকোর সাহিত্য, চিত্তবৈকল্য, ক্লিনিক ও কিতাব বিশ্লেষণ [দ্বিতীয় পর্ব]

প্রকাশঃ May 2, 2017

এ. কে. এম. সালাহউদ্দিন / ফুকোর সাহিত্য, চিত্তবৈকল্য, ক্লিনিক ও কিতাব বিশ্লেষণ [দ্বিতীয় পর্ব]
0
1

বিশশতকের প্রভাবশালী দার্শনিক মিশেল ফুকো। ক্ষমতা, জ্ঞানতত্ত্ব, যৌনতা, মানবিক অস্তিত্ত্ব ও ইতিহাস সম্পর্কে তিনি এমন কিছু মৌলিক ভাবনার কথা বলেছিলেন, যার প্রভাবে বিশশতকের ভাবনা-জগৎ আমূল বদলে যায়। শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও এর প্রভাব পড়ে। নিচের লেখাটিতে ফুকোর এই মৌলিক ভাবনার কথা পাওয়া যাবে।

দ্বিতীয় পর্ব

“চিত্তবৈকল্য প্রজ্ঞা থেকে পৃথক। চিত্তবৈকল্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা ভাষার পদবিন্যাসকে অস্বীকার করে এবং বুদ্ধি দিয়ে কথা বলাকে খণ্ডন করে। লাকাঁ ও ফুকো দু’জন একইভাবে বিশ্বাস করতেন যে, চিত্তবৈকল্যের মাত্রা এত বেশি হয় যে এটি মানসিক রোগের জগৎ ও মানসিক রোগীর ওঠাবসাকে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেয়। এভাবেই পাগলের প্রলাপ তৈরি হয়।”

ফুকোর ভাবনা মানবিক ভাবনার ছক, জ্ঞান এবং বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে পাঠযোগ্য করেছে। এ থেকেই সূচনা ঘটে প্রাকরণিক তাত্ত্বিক (স্ট্রাকচারালিজম) কাঠামোর। মানবজাতিতাত্ত্বিক লেভি-স্ত্রস এবং মনোবিশ্লেষক জাক লাকাঁর চিন্তাধারায় এই প্রাকরণিক কাঠামোর দেখা মেলে, কিন্তু তা ভাষাতাত্ত্বিক প্রাককল্পতে (paradigm) নির্দেশিত ছিল না, এমনকি হোর্হে ডুমেসিলের প্রাকরণীয় ধর্ম ও মরমী বিশ্লেষণেও এই ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায় না। ফুকো, বলা বাহুল্য, এর অল্প কিছুকাল পরে পরিবর্তিত এই সময়কালটিকে নিখুঁতভাবে নির্ণয় করতে পেরেছিলেন। ওই সময়টি ছিল ১৯৫০ সাল, যখন সামাজিক প্রকরণ ও ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্ব সম্বন্ধে মার্কসবাদ ও রূপতত্ত্ব আলোচনা শুরু করেছিল। তাত্ত্বিকেরা তখন চিত্তবৈকল্য, উন্মত্ততা ও উন্মাদ অবস্থা সম্বন্ধে নানা ধরনের গবেষণা করেছেন। যেমন ডানিয়েল দেফার্ত ও ফ্রঁসে এভালদ লিখেছিলেন কীভাবে আমাদের সব প্রজন্মের মধ্যে একধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল, যা শুরুতে ছিল অর্থহীন এক প্রয়াস। এই ধরনের সৃষ্টি ছিল ছোটখাট অসন্তোষের ফল, যা ছিল মূলত জন্মান্তরের সূচনাকাল। প্রবণতাটি ছিল মূলত বুর্জোয়া ধরনের, যার তাৎপর্য ও অর্থ বুঝতে পেরেছিলেন। অন্যভাবে বললে দাঁড়ায় যে, আমরা হুসের্লের চিন্তাভাবনাকে পরীক্ষা করেছি, দেখেছি যে, কোথায় এটি অর্থ দেয় এবং দেখেছি যে সব জায়গায় এর অর্থ প্রসারিত আছে। আমরা চোখ খুললেই দেখি এবং মুখ থেকে প্রথম যে শব্দটি বের করি তা সেই জন্মান্তর, অর্থাৎ প্রজন্মের নিরন্তর রূপান্তর ও পরিবর্তন। আমাদের প্রজন্মে জন্মান্তরের অর্থটি ভিন্ন রকমের। আমাদের কাছে এর কোন অর্থ নেই, বরং এর যে অর্থ আছে তা শর্তাধীন যা বহুরূপী। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে যখন ফুকো প্যারিতে অবস্থান করছিলেন তখন পরিচিত হয়েছিলেন প্রকরণবাদী সাহিত্য-সমালোচক রোলান্ড বার্তেসের সঙ্গে। সেই ১৯৫৫ সাল থেকেই আমরা কেবল বহুত্ববাদী অর্থকেই ঘুরে-ফিলে আউড়ে চলেছি। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

অর্থের বহুরূপী ও প্রাকরণিক শর্তগুলোকে পৃথিবীর চিহ্নিত জিনিসের মাঝে দেখা যায়, বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক বস্তুজগতে, যেমন জ্ঞানতাত্ত্বিক উদ্দেশ্য, অভিপ্রায় ও প্রবর্তনাগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রজন্মের পরে স্বাভাবিক হয়েছিল এবং এরা ইকোল নরমাল সুপ্যরিয়রের শিক্ষার্থী ছিল। এসব ছাত্র-ছাত্রী রূপতত্ত্ব, অস্তিত্ববাদ ও সার্ত্রেকে তেমন একটা পড়তো না। ফুকো তার ওই সময়ের ভাবনাকে কেবল বহুরূপী প্রকরণ নামেই চিহ্নিত করেননি এবং তিনি এগুলোকে সময়কালহীন গতিশীল সত্তা নামে আখ্যায়িত না করে প্রকরণের ঐতিহাসিক উৎপত্তি বলেছেন।

ফুকো তাঁর ‘চিত্তবৈকল্যে ইতিহাস’ গ্রন্থে আলোচিত প্রকরণ ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনাকে পরিব্যাপ্ত করেছিলেন পরবর্তী ‘বংশ সংক্রান্ত শাস্ত্রের প্রত্নতত্ত্বে’। এ দুটো বিষয়কে তিনি কী অর্থে প্রাকরণিক ঐতিহাসিক শর্তে আবদ্ধ করছেন তা নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও আলোচনা করেছেন। আলোচনা ও অনুসন্ধান করেছেন বৈজ্ঞানিক বিষয়বস্তু হিসেবে। ফুকো তার কিছু সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘চিত্তবৈকল্যের ইতিহাস’ বা Madness of Civilization (Histoire de la folie)-এর ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন যে তিনি উন্মত্ততার বিষয়টি পরাবাস্তবাদী সাহিত্যের সাম্প্রতিক কালের চর্চা, গঠনসৌষ্ঠব ও লাকাঁর মনোবিশ্লেষণের সাহায্য নিয়ে ধরতে পেরেছিলেন। এছাড়া, ডুমেসিলের প্রকরণ চিন্তাধারাও তাঁকে উৎসাহ যুগিয়েছিল। ডুমেসিল প্রকরণকে পৌরাণিক কাহিনিতে দেখেছিলেন। এগুলো অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে বিভিন্ন রূপান্তরে ও বিভিন্ন স্তরে। এককথায় প্রকরণ হলো সামাজিক ব্যবধানের প্রকরণ ও বিচ্ছেদের প্রকরণ।

লাকাঁর সঙ্গে ফুঁকোর যোগযোগটি জটিল ছিল। ফুঁকো জানতেন যে, লাকাঁর অবস্থা নিঃসন্দেহে ভাল। ১৯৫৩ সালে রোমে মনোবিশ্লেষকদের কংগেসে লাকাঁ মনোবিশ্লেষণের কর্মসূচি সম্বন্ধে একটা বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। লাকাঁ ওই বক্তৃতায় চিত্তবৈকল্যকে ‘কথাবলা’র একটি গঠনসৌষ্ঠব হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বোধগম্য ভাষা দু’জন বিষয়ীর মাঝে অনুষ্ঠিত হয়, যেমন ঘটে পিতা ও পুত্রের মাঝে। লাকাঁ ফরাসি ভাষায় এর নাম দিয়েছেন ‘nom-du-père’ যার অর্থ হচ্ছে ‘পিতার নাম’। পিতার নাম যখন নাকচ করা হয় তখন সন্তান আকৃষ্ট হয় মাতার প্রতি, অর্থাৎ প্রথম যে ব্যক্তির নাম বলা হলো তাঁকেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ী বলা হয়। লাকাঁ বলছেন, প্রথম যিনি গুরুত্বপূর্ণ তাকেই বিষয়ী হিসেবে প্রকাশ করা হয়, যাতে ভাষায় ও সমাজে, বিশেষ করে  মানুষের ভেতরে প্রজ্ঞার অনুপ্রবেশ ঘটে। এটি একটি ‘নির্বাচন’ যা বিষয়ীকে মোকাবিলা করে এবং লাকাঁর মতে সবসময় এবং সব জায়গায় এটিই কাজ করে; কারণ সবসময় ও সব জায়গায় মানুষের ভাষা সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে। এটিই চিত্তবৈকল্যের বুদ্ধিহীন গঠনসৌষ্ঠব বা অবকাঠামোকে অর্থ দেয়। এ সম্পর্কে লাকাঁ প্রায়ই বলেছেন, এটি উপকারি নয়, তবে সামাজিক অবস্থাকে জানান দেয়। মানুষের সংস্কৃতি সামাজিক ক্রিয়াশীলতাকে তুলে ধরেছে এবং মানুষকে জানিয়ে দিয়েছে যে সমাজে চিত্তবৈকল্য, উন্মাদ, উন্মত্ত বিষয়ী বা পাগল আছে। সংস্কৃতির সঙ্গে ভাষাও এই পাগলামির সঙ্গে জড়িত। লাকাঁ বলেন, এর একটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আছে যার সঙ্গে সংস্কৃতি ও সমাজ যুক্ত এবং এরা একসঙ্গে কাজ করে। এখানে সভ্যতার জটিল সাংগঠনিক ব্যাপারটি ক্রিয়াশীল ছিল না। লাকাঁর এই ধরনের ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ অনুভব করেননি, বরং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিষয়ীকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেখেছেন কীভাবে বিষয় তার সত্যকে আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা, অভিপ্রায় ও অচেতন সত্তা দিয়ে চিনে নেয় (তুলনীয়, জাঁক লাকাঁ, কর্মকাণ্ড ও কথাবলার জগৎ। মনোবিশ্লেষণে ভাষা, কংগ্রেস বক্তৃতা, রোম ১৯৫৩)। ফুকো এভাবেই বিষয়ীকে এক সত্যিকরের কথোপকথন হিসেবে দেখেছেন। তাঁর কাছে বিষয়ী হচ্ছে সেই জিনিস যা ঐতিহাসিক গঠনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ঐতিহাসিক অবকাঠামো বাধ্য করে বিষয়ীকে সত্যের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে। ফুকো এর ত্রিশ বছর পরে লাকাঁর যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য ১৮৮২ সালে লিখেছিলেন ‘বিষয়ীর ভাষ্যবিদ্যা’ শীর্ষক গ্রন্থ।

চিত্তবৈকল্য প্রজ্ঞা থেকে পৃথক। চিত্তবৈকল্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা ভাষার পদবিন্যাসকে অস্বীকার করে এবং বুদ্ধি দিয়ে কথা বলাকে খণ্ডন করে। লাকাঁ ও ফুকো দু’জন একইভাবে বিশ্বাস করতেন যে, চিত্তবৈকল্যের মাত্রা এত বেশি হয় যে এটি মানসিক রোগের জগৎ ও মানসিক রোগীর ওঠাবসাকে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেয়। এভাবেই পাগলের প্রলাপ তৈরি হয়। উনিশ শতকের মানসিক রোগ-বিশেষজ্ঞের আশ্রয়ে রোগীদের মধ্যে স্বাধীনতা আবার ফিরে আসে। তবে এই স্বাধীনতা ছিল বিভ্রান্তিকর। আর এই স্বাধীনতায় উন্মত্ততা ও চিত্তবৈকল্য সুদৃঢ় ছিল না, বরং ছিল ধৈর্যশীল, ঝগড়া-বিবাদ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা, অলসতা ইত্যাদি কাঠামোতে অনুষ্ঠিত হতো, যা ছিল ভয়ঙ্কর এক ক্রীড়াশীল স্বাধীনতার খেলা। এগুলোই আধুনিক মানসিক রোগের চিকিৎসা ও আরোগ্যবিধানে বিভিন্ন শর্ত নিয়ে কাজ করতো। ফুকোর যুক্তি ছিল পরিস্কার। তিনি বলেছিলেন যে, বিষয়ীর স্বাধীন নির্বাচন বা স্বাধীন পছন্দের একটি ইতিহাস আছে। একই কথা লাকাঁও বলেছিলেন, ইতিহাসে স্বাধীন বিচরণক্ষেত্র ছিল যার পরিণতি ঘটে নীৎশের ভাষায় পতনের মধ্য দিয়ে। নীৎশে যেমন বলেছিলেন ‘ট্রাজেডির গঠনসৌষ্ঠব’ বিষয়টি ইতিহাস নয়। একইকথা ফুঁকো তাঁর ‘চিত্তবৈকল্য ও সমাজ’ গ্রন্থে ঘুরে-ফিরে লিখে গেছেন।

প্রথমত, ফুকো দেখাতে চেয়েছিলেন যে, চিত্তবৈকল্য ইউরোপীয় বা পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক সীমারেখাকে বর্ণনা করে। এই সীমারেখাগুলো নির্দেশ করে সংস্কৃতির উৎপত্তি এবং তার ইতিহাসের জন্মকে। আর এই সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে বুঝতে হলে জানার দরকার আছে ইতিহাসের এই সীমারেখার। ফুঁকো তাঁর ‘সংলাপ’ গ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেছেন, আলজেরীয় যুদ্ধ নির্দেশ করেছিল নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা আর সংস্কৃতির সীমারেখা, যা আদি সীমাবদ্ধতাকেই নির্দেশ করে। এটিই অবকাঠামোগতভাবে আলাদা এবং সঠিক সত্যকে বিকশিত করেছে। এই ভাঙনের চিহ্নই প্রাচ্যকে বর্ণনা করে। এই পৃথকীকরণকে কেন্দ্র করেই মানুষ উৎস সম্পর্কে জানতে পারে। মানুষ যখন এই উৎসের সন্ধান করে, তখন মানুষের মাথা ঘোরে, অস্থির লাগে, গৃহকাতর হয়, গৃহে ফিরে যেতে উদগ্রীব হয় এবং শেষমেষ বাড়ি ফিরে যায়। প্রাচ্য, যা ইউরোপের ঔপনিবেশিক প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরি হয়েছিল, তা এখনও বলবৎ আছে। এর কোনো শেষ নেই, কিন্তু আছে সীমারেখা, আছে সীমানা, আছে সীমবদ্ধতা।

দ্বিতীয়ত, মানুষের স্বপ্ন আছে। মানুষ স্বপ্নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। স্বপ্নের অর্থকে হাস্যকৌতুককর বলে ভাবে- একথার অর্থ হলো আনন্দকে পুরোপুরিভাবে অস্বীকার করা হয় এবং স্বপ্নকে ‘অচেতনের রাজপথ’ নামে আখ্যায়িত করে মানুষ অগ্রাহ্য করে।

তৃতীয়ত, যৌনতার নিষেধাক্ষার ইতিহাস, যা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির নির্যাতনমূলক কর্মকাণ্ডেকে অনবরত সচল ও অতিরিক্ত কঠোরতার গঠনরূপ দিয়েছে যার ইতিহাস লেখা দরকার এটি দেখাবার জন্য যে, ইউরোপীয় পাশ্চাত্য পৃথিবীর সমীরেখা, তার নৈতিকতার উৎস। কিন্তু মানুষের জন্মের পর থেকে আনন্দ-উপভোগের সৌভাগ্যের পৃথিবীর সীমানা টেনে দেয়া হয়েছে।

চতুর্থত, মানুষের দরকার শেষমেষ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে চিত্তকৈবল্য সম্পর্কে কথা বলা, যে পথ দীর্ঘ সময় ধরে ফুঁকো নীৎশের চিন্তাধারাকে অনুসরণ করে বুঝতে চেয়েছিলেন, অনুসন্ধান করেছিলেন।

চিত্তবৈকল্যের ইতিহাসের মূল বিষয়বস্তু হলো পৃথিকীকরণ। ফুকোর মতে এই আলাদাকরণটির তিনটি ধারা আছে- প্রতিষ্ঠা, আদিরূপ ও বিধিবিধান। এই ধারাগুলি চিত্তবৈকল্যকে আলাদা করে ফেলে। একটি ধারা চিত্তবৈকল্য ও প্রজ্ঞাকে পাশাপাশি উপস্থাপন করে এবং এদের মাঝে নিস্তব্ধতা তৈরি হয়, যেখানে উন্মত্ততা ও প্রজ্ঞা মৃত বলে গণ্য হয়ে থাকে। ফুকোর প্রচেষ্টা ছিল চিত্তবৈকল্যের ইতিহাসকে খুঁজে বের করা এবং সেটিকে শূন্যমাত্রায় নিমজ্জিত করা যাকে ফরাসি ভাষায় degré zéro বলা হয়। ইউরোপের ইতিহাসে রোলান্ড বার্তেসের প্রারম্ভিক জীবনের একটি বইয়ের সৌজন্যে ১৯৫৩ সালে ‘শূন্যমাত্রা ও সাহিত্য’ (Le degré zero de la literature) কথাটি ব্যবহৃত হতে থাকে। এতে ভাষার তোতলামির ব্যাখ্যা আছে। বলা হয়, যারা তোতলায় তারা একাই কথা বলে অন্য কোনো বিষয়ী ছাড়া। বিপরীত কোনো অংশগ্রহণকারী তাদের প্রয়োজন হয় না। এখানে ভাষার অর্থ ও অর্থহীনতা আলাদা কিছু নয়।

ফুকো তাঁর সমস্ত রচনা- আরম্ভ থেকে মৃত্যু অব্দি- আবেগ দিয়েই লিখে গেছেন। অভিজ্ঞতাকেই তিনি সবসময় তাঁর মতবাদের কেন্দ্রবিন্দু বলে মনে করতেন। তাঁর সমস্ত কিছুরই আরম্ভ ছিল শূন্যমাত্রা থেকে। এই শূন্যমাত্রা কোন পৃথকীকরণে বিশ্বাস করেনা। এই ধারাতেই ভাষার ব্যবহার ও প্রচলন ঘটে, যাকে তিনি সামাজিক ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করেছেন। ফুকোর ছাত্র দেরিদা একই ইকোল নরমাল সুপিরিয়ারির জন্য একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন মানুষের স্বপ্নের বিরুদ্ধে। বলেছিলেন, ‘নিস্তব্ধতার প্রত্নতত্ত্ব’র কথা। তাঁর মতে সব ভাষাই উন্মত্ত নয়। প্রজ্ঞার ভাষা বলেও কিছু আছে। প্রজ্ঞার ভাষার ব্যাপারে ফুকো কিছু বলেননি। তিনি বলেছেন ভাষার পৃথকীকরণ সম্বন্ধে, প্রজ্ঞা ও চিত্তবৈকল্যের মাঝে ব্যবধান তৈরির কথা। এই পৃথকীকরণের বিষয়টি ঘটনা হিসেবে অথবা প্রকরণ হিসেবে আদিতে অভিন্ন ছিল, ছিল সচল কার্যকর, নির্মিতব্য এবং অধিবিদ্যা এই ভাষার ভিতকে শক্তিশালী করেছিল। অন্য কথায়, চিত্তবৈকল্যের আদি ও অবিভাজ্য অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত বক্তব্য আজকের হারিয়ে যাওয়া সাম্প্রতিক অবস্থা অথবা বাস্তবতা। এই বিভাজন অধিবিদ্যাকে মর্যাদা প্রদান করেছিল এবং এই অধিবিদ্যা সবসময় সমস্ত আদি পূর্ণসত্তায় বিরাজমান ছিল। ফুকোর এসব পরিস্কার জানা ছিল। তবে তিনি চিত্তবৈকল্যের নিস্তব্ধতার কারণটি প্রকাশ করে যাননি, একে ব্যাখ্যা করেছিলেন রূপক অর্থে।

ফুকোর ছাত্র হিসেবে দেরিদা কড়া ভাষায় গুরুদেবের সমালোচনা করেছেন যখন দেকার্তের ‘অনুধ্যান’ (Meditation) গ্রন্থের সমীক্ষা লিখেছিলেন। এতে ফুকো বেশ মর্মাহত হয়েছিলেন এবং এর জবাব দিয়েছিলেন ১৯৭২ সালে তাঁর ‘চিত্তবৈকল্যের ইতিহাস’ গ্রন্থের নতুন করে লেখা শেষকথায়। পরর্তীতে তিনি দেরিদার বক্তব্যকে ‘করুণা’ হিসেবে সমর্থন করে সনদ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁর ওই বইটি চিত্তবৈকল্য সম্বন্ধে একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলবার ব্যাপারে সহায়তা করবে। এখানে বিপথগামী মানুষগুলোকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক করা হবে, বিভ্রান্তিগুলো বিলীন হয়ে যাবে, মানসিক চিকিৎসা ও আরোগ্যবিধানের প্রতিষ্ঠানকে আরও উন্নতর করা হবে এবং সম্ভব হলে মানসিক রোগের চিকিৎসা ও আরোগ্যবিধান সম্পর্কিত বইপুস্তক সত্যতা নিশ্চিত করবে। অভিজ্ঞতা এতে শক্তিশালীভাবে কাজ করবে ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য। সত্যি বলতে কী, ‘চিত্তবৈকল্য ও সমাজ’ গ্রন্থে ফুঁকো উন্মত্ততা বা চিত্তবৈকল্যকে একটি চিন্তাধারা হিসেবে সেভাবে স্পষ্ট করে খোলাখুলিভাবে ব্যাখ্যা করেননি, করেছেন শুধু প্রজ্ঞার ভাষার অপার্থিব জগৎ নিয়ে, যে-ভাষা এখনও অস্তিত্বশীল। এই গ্রন্থের উপসংহারে চিত্তবৈকল্যকে যারা প্রজ্ঞাহীন বলেছেন- কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকগণ; যেমন হেল্ডারলিন, নার্ভাল, নীৎশে অথবা আরতোউত প্রমুখের উল্লেখ পাওয়া যায়। এঁরা সবাই ছিলেন চিত্তবৈকল্যের কবি ও দার্শনিক। এঁদের দিকেই ফুকোর মোহ ও টান বেশি ছিল আগাগোড়া সব সময়ের জন্য।

‘শূন্যমাত্রা’ থেকে আরম্ভ হয়েছিল আদি অভিজ্ঞতা ও ধারণা যা পরবর্তী কালে বিভাজিত হয়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণে এই ধারাকে বিচার করা হয়েছিল এজন্য যে, প্রজ্ঞা ও চিত্তবৈকল্য ইতিহাস বহির্ভূত হয়ে গিয়েছিল। সংশয় তৈরি হয়েছিল, কারণ ইতিহাস নিজে চিত্তবৈকল্যের ইতিহাস রচনা ও প্রণয়ন করেনি, প্রণয়ন করেছে মানোবিজ্ঞান ও মনোরোগ চিকিৎসা ও আরোগ্যবিধান। এরাই প্রথম চিত্তবৈকল্যের ইতিহাস বর্ণনা করেছে। প্রজ্ঞার ইতিহাসও সরাসরি সুচারুভাবে লেখা ও বর্ণনা করা হয়নি। বরং ‘করুণা’র কথা পাই। এই করুণাই সমালোচনা করেছে জ্ঞানব্যাপ্তীর যুগকে, কারণ ওই সময়কালেও চিত্তবৈকল্য আর সমাজ ছিল। তবে প্রজ্ঞা অস্বীকার করতে আরম্ভ করেছিল প্রকরণকে। প্রকরণের এই অস্বীকৃতি একটি ঝটপট তড়িৎ সিদ্ধান্ত ছিল। এই সিদ্ধান্তে চিত্তবৈকল্যকে বিষয়ী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছিল ইউরোপীয় পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিষয়ী হিসেবে। তখন এটি ছিল প্রজ্ঞা, জয় করেছিল চিত্তবৈকল্যকে। এই প্রজ্ঞার বৈশিষ্ট্য ছিল স্নায়ু-শীতল, ঠাণ্ডা-মাথা, অভিভুত করা, বিপর্যস্ত করা এবং সীমিত। এই প্রজ্ঞা ছিল মৌলিকভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির, কারণ এটির ব্যবহারেই বোঝা যেত যে, চিত্তবৈকল্য হঠাৎ করেই তৈরি হয়নি। এ প্রসঙ্গে ফুঁকো বলেছেন যে, উল্লিখিত প্রজ্ঞাতে সর্বপ্রথম চিত্তবৈকল্য সম্বন্ধে absence d’æuvre ছিল; অর্থাৎ পুস্তক-ঘাটতি ছিল, বইয়ের অভাব ছিল। লোকের বইপত্র যেমন ছিল না, তেমনি এই বিষয় সম্পর্কে পড়াশোনার চলও তেমন ছিল না। এরকম অবস্থায় কোনো বুর্জোয়া গড় অনুপাত ছিল না। ব্যক্তিমানুষ সম্বন্ধে নামকরা কোনো বইপত্র ছিল না। দেরিদা ব্যাখ্যা করেছেন যে, চিত্তবৈকল্য সহায়ক, চেতনশীল, অস্বীকৃত- এরকম কিছুই ছিল না। এটি ছিল মূলত সাধারণ কথাবলার প্রজ্ঞাদীপ্তরূপ।

যাই হোক, আদিতে প্রজ্ঞা ও চিত্তবৈকল্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। সম্ভবত তখন এটি ভগবানতুল্য ছিল। ফুকোর প্রচেষ্টা ছিল এই ব্যবধানকে পুনর্নির্মাণ করবার ও সবার সামনে উপস্থাপন করবার। এটি ছিল একটি দার্শনিক চিন্তাধারা, ঐতিহাসিক পর্যালোচনার শিরোনামে। উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায় ছিল ঐতিহাসিক সমগ্রতার একটি প্রকরণের অনুসন্ধান প্রস্তুত করা, যেখানে অভিমত, প্রতিষ্ঠান, বিচারিক কর্মকাণ্ড, পুলিশ, বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ইত্যাদি চিত্তবৈকল্যে আবদ্ধ করে রেখেছিল এবং তা যে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে ছিল, কোনদিনই আর গোছানো সম্ভব ছিল না।

ফুকোর ঐতিহাসিক বর্ণনার আরম্ভটা ছিল মধ্যযুগের শেষভাগ। অন্যদিকে, দেরিদা মনে করেন যে, এই প্রজ্ঞা ও চিত্তবৈকল্য প্রাচীনকালেও জানা ছিলনা। ফুকো ও দেরিদা দু’রকম কথা বলেছেন, যা দ্বিকোটিক চিন্তাভাবনার তুল্য। লোকেরা বিভ্রান্তিগুলোকে, অর্থাৎ মানসিকরোগীদের (পাগলদের) পাগলা-গারদে আবদ্ধ করছিল অথবা পাঠিয়ে দিচ্ছিল জাহাজে করে ভিনদেশে, যারা আর কোনদিন ফিরে আসেনি অথবা বলা হয়ে থাকে যে, তাদেরকে হাসপাতালে অথবা সমাজের মাঝেই বাস করতে দিয়েছিল।

সীমারেখা তৈরি করবার ব্যাপারটি পরিস্কার ছিল। যুগ-বিবর্তনের আরম্ভকাল ছিল পনেরো শতকের মধ্যভাগ, যখন চিত্তবৈকল্যের পরিধি অনেক বেশি ব্যাপ্তি পেয়েছিল। নিজস্ব সংস্কৃতি অশান্ত হয়ে পড়েছিল। ভয়ঙ্কর ধরনের অসুবিধে দেখা দিয়েছিল যে-কথা বোশ ও ব্রুইঘেলের অথবা সেবাস্তিয়ান ব্রান্তের ১৪৯২ সালে রচিত গ্রন্থ ‘পাগলদের সমুদ্র-জাহাজ’-এ খুঁজে পাওয়া গেছে।

উন্মাদ ব্যক্তির দুটো বৈশিষ্ট্য এই সময়ে চোখে পড়ে। এর নির্মিতি ঘটেছিল আনুমানিক মধ্যযুগের শেষভাগে। মধ্যযুগে মানুষের উন্মত্ততা, পাগলামো, উন্মাদনা, চিত্তবৈকল্যের যেন শেষ ছিল না। মানুষের মধ্যে হুঙ্কার, ঝগড়াঝাটি, অট্টহাসি, প্রতারণা, জুয়াচুরি ইত্যাদি প্রাধান্য পাচ্ছিল। পৃথিবীতে প্রজ্ঞাহীনতা এবং মানুষের অর্থহীন হাসিঠাট্টার জয়জয়কার দেখা গিয়েছিল। রেনেসাঁর সংস্কৃতিতে ‘রাজা লীয়র’, বিশেষ করে ডন কিহোতোর চিত্তবৈকল্যের স্বর ও কথা শোনা গিয়েছিল। দেকার্তের ১৬৪১ সালে রচিত ‘অনুধ্যান’ গ্রন্থটির মাধ্যমে ইউরোপীয় প্রজ্ঞার পুনরুত্থান ঘটলে চিত্তবৈকল্য আর উন্মত্ততার বিষয়টি বন্ধ হয়েছিল। দেকার্ত লিখেছিলেন, প্রজ্ঞাদীপ্তদের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা ছিল না। চিত্তবৈকল্যদের সম্বন্ধে বলা হয়, এগুলো ইন্দ্রিয় থেকেই প্রস্তুত হয় এবং যদি আমি এদেরকে স্বীকৃতি দিই তাহলে আমিও চিত্তবৈকল্যের অধিকারী হবো, অর্থাৎ আমি নিজেই পাগল ছাড়া আর কিছু নই।

ফুকো নিজের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চিরায়ত ধ্রুপদী সময়কালের চিত্তবৈকল্যকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন আর দেরিদা দেকার্তকে সম্পূর্ণভাবে তাঁর জ্ঞানের সংশয়ের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে এরকম সবকিছুর অবস্থান ছিল চিত্তবৈকল্যের বাইরে। ফুকোর মতে, দেকার্ত দিয়েই একটি বিভাজনের দাগ টানা হয়েছিল এবং তাঁর কাছে এটা আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল না যে ১৬৫৬ সালের ঐতিহাসিক মুহূর্তে প্যারিতে একটি ‘গণআশ্রয়কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা ছিল সর্বপ্রথম নির্মিত সাধারণ মানুষের জন্য নির্মিত প্রতিষ্ঠান। এটি স্থাপন করা হয়েছিল ভিক্ষুকদের নিরাময় আর আশ্রয়ের জন্য। আর অন্যদিকে অসুস্থ রোগী, দুর্বৃত্ত, স্বাধীন লম্পট, চিত্তবিকারগ্রস্ত উন্মাদ মানুষদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল আরেক ধরনের আশ্রয়কেন্দ্রে, যেখানে তাদের আটক রাখা হতো। সতেরো শতকের মধ্যভাগ থেকে চিত্তবিকারগ্রস্ত মানুষদেরকে নিরাময় আশ্রয় অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী কালে এই সমস্ত মানুষকে জেলখানায় নিয়ে যাওয়া হতো, যা ছিল প্রাকৃতিক অবস্থানের বাইরে। এভাবেই ওই ধরনের মানুষের জীবন বাঁধা ছিল। শুধু চিত্তবিকারগ্রস্তরাই নয়, প্যারির শতকরা ১ ভাগ সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত একটা সময়ের জন্য ওই ‘গণআশ্রয়কেন্দ্রে’ বন্দি রাখা হতো। ফুকোর মূল সূত্রই ছিল এই বিশাল বন্দিশিবির সম্বন্ধে। এই বন্দিশিবিরে অবস্থান করতো চিত্তবিকারগ্রস্ত, উন্মাদ, পাগল, অলস শ্রমিক, চরমপন্থী আর স্বাধীন লম্পটেরা। ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্কুস দো সাদ এই সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দুর্ভাগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, এই ব্যবস্থা ছিল প্রজ্ঞাহীন, বিশেষ করে অসভ্যতার সামিল। এখানে প্রজ্ঞার নতুন ধরনের নৈতিকতাসহ সামাজিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। রাজাদের প্রয়োজনে বন্ধ ও অন্ধকার কারাগারে নিক্ষেপ করা হতো। চিত্তবৈকল্যের বন্দিদশা ও পায়ে বেড়ি পড়িয়ে ফুর্তিবাজদের মতো ঘুড়ে বেড়ানোর বর্ণালী দৃর্শ্য দেখা যায় এবং প্রবল উত্তেজনা, প্রলাপ বা মস্তিষ্কের বিকৃতিতে এমন এক সত্য ধরা পড়ে যার আসলে ষোলো আনা প্রজ্ঞাধর্মী ছিল না। এরপরই দেখা গেল প্রথম জ্ঞানব্যাপ্তির প্রজ্ঞা এবং ছোটখাট কিছু জীবনকথায় লেখা হয়েছিল ধৈর্য্যহীনতা ও অসহিঞ্চুতার কথা। প্রজ্ঞা যেন হয়ে উঠেছিল অসহনীয় বিষয়।

ফুকোর কথা হলো, প্রজ্ঞার ইতিহাস রচনা করা ইতিহাসবেত্তার কাজ নয়, যাঁরা মূলত ঐতিহ্যের ইতিহাস লেখেন। বরং এটি রচনা করবার কাজটি একজন দার্শনিকের কাজ, যাঁর হাতে ঐতিহাসিক তথ্য মওজুদ আছে। এই প্রসঙ্গে একটি আদর্শবাদী কথা বলা যায়, আর সেটা হলো জ্ঞানব্যাপ্তিজাত প্রজ্ঞা শেষাবধি চিত্তবৈকল্যকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। ঐতিহাসিক অনুসন্ধানকে ফুকো সমর্থন করে বলেছেন যে সতেরো শো শতকের দ্বিতীয় ভাগে বিশাল বিশাল বন্দিশালা নির্মাণ করা হয়েছিল যাকে বলতে গেলে বহুলাংশে পৌরাণিক যুগে ফিরে যাওয়াকে বোঝায়। পাশাপাশি, মানসিক রোগের চিকিৎসা ও আরোগ্যবিধানের ইতিহাস রচনার বিষয়টি ১৯৮০ সাল থেকে ভিন্নভাবে গড়ে উঠেছে। এই সময়ে ফুকোর চিন্তাধারা, যেমন প্রজ্ঞা ও চিত্তবৈকল্যের বিভাজন, জ্ঞানবিদ্যা ও মানসিক রোগের চিকিৎসা ও আরোগ্যবিধানের ক্ষমতা বা শক্তি নতুন ধারার প্রবর্তন করে। এতে জোর দেয়া হয়েছে অনুসন্ধান ও গবেষণাকে। এই অনুসন্ধান ও গবেষণা আদতে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানেরই নামান্তর। মানসিক রোগের চিকিৎসা ও আরোগ্যবিধানসহ ক্লিনিকগুলো আর আগের মতো মানবিক ও প্রগতিশীল ভাবনা ও কাজের দ্বারা সমৃদ্ধ ছিল না। বরং খুব বেশি বলপ্রয়োগ করে চিকিৎসার চর্চা বেশি হতো, যা আধুনিক জ্ঞানবিদ্যা দিয়ে সাজানো হয়েছিল।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. লেখাটির প্রথম পর্বে শ্রদ্ধেয় লেখক: এ. কে. এম. সালাহউদ্দিন বলেছিলেন: “দর্শনের বিষয় বলে তা হয়তো তীরন্দাজের পাঠকদের কাছে কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু একটু মনোযোগ দিলেই বিষয়টি আপনাদের কাছে প্রাঞ্জল হবে বলে আমার বিশ্বাস।” আমার মতো পাঠকের জন্য কথাটি পুরোপুরি সত্য। দর্শনশাস্ত্র সম্পর্কে আমার জানার বেশ আগ্রহ থাকলেও, বোধশক্তিটা বেশ কম। কেমন জানি কঠিন কঠিন মনে হয়। তবে হ্যাঁ, লেখকের প্রাঞ্জল ভাষার আকর্ষণে এ-পর্যন্ত পড়ে অন্তত এটা বুঝলাম: দর্শনশাস্ত্র সম্পর্কে জানার আগ্রহটা আমার দমে যায় নি।
    ঝরঝরে প্রাঞ্জল ভাষায় দর্শনের কঠিন বিষয়গুলো সহজ করে তুলে ধরার জন্য আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি শ্রদ্ধেয় লেখকের প্রতি। আর বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি শ্রদ্ধেয় ড. মাসুদুজ্জামান স্যারের প্রতি, যিনি আমাকে জ্ঞান-সৌন্দর্যের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে কৃতজ্ঞ করেছেন। তীরন্দাজের জন্য অশেষ শুভ কামনা!

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close