Home দর্শন এ. কে. এম. সালাহউদ্দিন / ফুকোর সাহিত্য, চিত্তবৈকল্য, ক্লিনিক ও কিতাব বিশ্লেষণ

এ. কে. এম. সালাহউদ্দিন / ফুকোর সাহিত্য, চিত্তবৈকল্য, ক্লিনিক ও কিতাব বিশ্লেষণ

প্রকাশঃ April 21, 2017

এ. কে. এম. সালাহউদ্দিন / ফুকোর সাহিত্য, চিত্তবৈকল্য, ক্লিনিক ও কিতাব বিশ্লেষণ
0
1

[ সম্পাদকীয় নোট : বিশশতকের প্রভাবশালী দার্শনিক মিশেল ফুকো। ক্ষমতা, জ্ঞানতত্ত্ব, যৌনতা, মানবিক অস্তিত্ত্ব ও ইতিহাস সম্পর্কে তিনি এমন কিছু মৌলিক ভাবনার কথা বলেছিলেন, যার প্রভাবে বিশ্বশতকের ভাবনা-জগৎ আমূল বদলে যায়। শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও এর প্রভাব পড়েছিল। নিচের লেখাটিতে ফুকোর এই মৌলিক ভাবনার কথা পাওয়া যাবে। কয়েক পর্বে লেখাটি তীরন্দাজে প্রকাশিত হবে।]

পর্ব ১

মিশেল ফুকো এমন একজন দার্শনিক ও ঐতিহাসিক যিনি ইউরোপীয় সংস্কৃতির পটভূমিতে মানবতত্ত্বকে গভীরভাবে বুঝে নিতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি আদিতে ছিলেন একজন মনোবিজ্ঞানী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিকাল ও পরীক্ষণমূলক মনোবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন ফুকো এবং এই শাস্ত্রটি অধ্যয়ন করেছেন। লিখেছেন বই-পুস্তক, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। তাঁর বয়স যখন ১১ বছর, বাবাকে বলেছিলেন একজন ইতিহাসের শিক্ষক হতে চান। একটি চিকিৎসক পরিবারে এই ধরনের মানবিক শাস্ত্রের ওপর লেখাপড়া করাটা এমনিতেই বেমানান ছিল, তারপর তিনি আবার চেয়েছিলেন ইতিহাসবেত্তা হতে। চেয়েছিলেন, ফ্রান্সের সবচেয়ে জগৎখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় সোরবনের অধ্যাপক হতে। তাঁর পিত্রদেবও এটাই চেয়েছিলেন, পুত্র সোরবনের শিক্ষক হোক। কিন্তু ফুকো শেষাবধি পৃথিবীর একজন দার্শনিক বলে খ্যাত হয়েছিলেন। বিশ শতকের একজন প্রধান প্রভাবশালী দার্শনিক মনে করা হয় তাঁকে, যাঁর সাহিত্য, চিত্রকলা, যৌনতা, মানবিক সম্পর্ক, জ্ঞানতত্ত্ব ইত্যাদি নানা বিষয় সম্পর্কে মৌলিক ভাবনা ছিল। তিনি চিন্তার জগৎকে প্রভাবিতও করেছিলেন ব্যাপকভাবে।

কুড়ি বছর পর্যন্ত ফুকো লেখাপড়া করেছেন অভিজাতশ্রেণির স্কুল প্যারির ইকোল নরমাল সুপরিয়ারে, যে বিদ্যালয়টি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, বিশেষ করে দর্শন ও মনোবিজ্ঞান সেখানে পড়ানো হতো। ১৯৪৭ সাল থেকে তিনি দার্শনিক মরলো-পঁতির অধীনে ওই স্কুলে প্রথম অভিসন্দর্ভ রচনার পরিকল্পনা (সিনোপসিস) করেন মনোবিজ্ঞানের উৎস সম্বন্ধে এবং ১৯৪৯ সালে সোরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানে ভর্তি হবার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। ১৯৫১ সালে মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে মরলো-পঁতির আসনে নিযুক্ত পেয়েই নিজে ওই ইকোল নরমাল সুপরিয়ারের গাইড হয়েছিলেন এবং ঐ স্কুলে পঁতির স্থানে অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। অচিরেই দেখা গেল অন্যান্য বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান শিক্ষক- পল ভেইন, জাঁক দেরিদা, জেরা জেনেতের মতো তিনিও একজন খ্যাতিমান শিক্ষক হয়ে উঠছেন।

তবে ফুকো সেইঁ আঁ নামের একটা হাসপাতালের পরীক্ষাগারে ‘ইলেক্ট্রোনসেফালোগ্রাম’, ‘ইইজি’ ইত্যাদি পরীক্ষণ কাজে ব্যস্ত থাকতেন। পাশাপাশি কারাগারে নবাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হিসেবে যারা আসতেন, তাদের মানসিক রোগ বা মনোরোগের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৫২ এবং ১৯৫৩ সালে তিনি ‘সাইকোপ্যাথলোজি’ ও ‘এক্সপেরিমেন্টাল সাইকোলজি’র ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তির জন্য আবেদন করেন। পাশাপাশি প্রস্তুত করছিলেন এমন একটি প্রকল্প, যে-প্রকল্পটি ছিল উত্তর-কার্তেসীয়-দর্শন নিয়ে। এরপর তিনি চলে আসেন লিলে। এখানে তিনি লুই আলথুজারের দর্শনে অভিভূত হয়ে পড়েন। আলথুজার ছিলেন রু দো উলমের দর্শনের প্রভাষক এবং প্রকরণবাদী মার্কসবাদের একজন তাত্ত্বিক ব্যক্তিত্ব। ১৯৫০ সালে ফুকো ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। সেই সময়ে তিনি অভিভূত ছিলেন পাবলভের ‘প্রতিবর্তিততত্ত্ব’ (Reflexive Theory) নিয়ে। অংশগ্রহণ করতে থাকেন জাক লাকাঁর বিশ্লেষণী মনোবিজ্ঞানের সেমিনারে এবং সেইঁ আঁ হাসপাতালেও আসা যাওয়া করতেন। পড়াশোনা আরম্ভ করেন হাইদেগার, মার্কস, ফ্রয়েড, বিশেষভাবে নীৎসের রচনাবলীর। ১৯৫৩ সালে তিনি দেখা করেন সুইজারলান্ডের ক্রয়েজলিংগেনের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লুডভিগ বিন্সভাগনারের সঙ্গে এবং যৌথভাবে অনুবাদ করেন জাকুলিন ভেয়ার্দোর প্রবন্ধ ‘স্বপ্ন ও অস্তিত্ব’। এই প্রবন্ধে মানব-অস্তিত্ব সম্পর্কে বিশ্লেষণ আছে। এই ছোট্ট প্রবন্ধটি বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। এই বইটিতে তিনি বিন্সভাগনারের লেখার (টেক্সট) বিষয়আশয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। উল্লসিত হয়েছিলেন হাইদেগারের বইপত্র পড়ে এবং মারলো পঁতির ‘রূপতত্ত্ব’ পড়ে বিমোহিত হয়েছিলেন। এইসময়েই ফুকো মার্কসবাদ থেকে সরে আসেন। লেখেন আর প্রকাশ করেন তাঁর গ্রন্থ Maladie mentale et personalité। এই বইটিরই নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে Maladie mentale et psychologie শিরোনামে। নতুন সংস্করণে তিনি আবার মার্কসবাদী মতাদর্শে ফিরে আসেন, যেখানে তিনি মানসিক রোগীদের সমস্যাকে ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শের আলোকে আলোচনা করেছিলেন। কড়া সমালোচনা করেছিলেন মনোবিজ্ঞানের মানব-অস্তিত্বের সূত্রসমূহকে এবং বলার চেষ্টা করেন যে, পুঁজিবাদসৃষ্ট বিচ্ছিন্নতার জন্যই মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়, যা থেকে মনোবিজ্ঞানই পারে মানুষকে মুক্ত করতে। ফুঁকো তখন কোন গোঁড়াপন্থি নির্বিচারবাদী ছিলেন না। তিনি অনুপ্রাণিত ছিলেন ‘রোরশাক-পরীক্ষা’ (Rorschach-Test) সম্বন্ধে, যা একজন বৃদ্ধাকে নিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছিল। তিনি গভীরভাবে এই পরীক্ষার ফলাফলকে লক্ষ্ করেছিলেন এবং ভদ্রমহিলার চিকিৎসা, সেবা-শুশ্রুষাও করেছিলেন। চিকিৎসার পদ্ধতি হিসেবে তিনি পিয়াজেঁর বিবর্তন-মনোবিজ্ঞানের সাহায্য নিয়েছিলেন। পরে তিনি তাঁর আগের বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেন এই কারণে যে তাঁর অবস্থান এবং চিন্তাভাবনা সম্পর্কে অনেকেই বিরোধিতা করছিলেন। তাঁর ভাবনা ছিল সেই সময়ে কিছুটা নীৎশীয় কমিউনিস্টদের মতো। তবে ফুকো যা বলতেন তা তেমন ব্যবহারিক অর্থপূর্ণ কথাবার্তা ছিল না। ব্যাপারটি হাস্যরসেরও কারণ হয়েছিল।

এভাবে দেখলে বলা যায়, তখন অব্দি ফুকোর পড়াশোনা না-ছিল তাত্ত্বিক মনোবিজ্ঞান সম্বন্ধে তেমন আহামরি গোছের, না-ছিল দ্বান্দ্বিক। বইপত্র ও কর্মজীবন ছিল প্রারম্ভিক বছরগুলোতে একেবারেই সাধারণ গোছের এবং সারাজীবন ধরে তিনি পরিণত জীবনের পড়াশোনার সঙ্গে সেইসব পড়াশোনা ও কর্মের সমন্বয় করে চলছিলেন। তবে বিস্তর বিষয় নিয়ে তিনি ঘাটাঘাটি করেছেন। তাত্ত্বিক চিন্তাভাবনা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন বিস্তর। তবে সত্যি কথা কি, কোন কিছুতেই তাঁর মন বসতো না, তিনি তৃপ্ত হতে পারতেন না। জীবনের প্রথম দিকে তাঁর জ্ঞানচর্চা ছিল ভাসা ভাসা। বেশ চঞ্চল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন ফুকো। ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। কারণ তিনি তাঁর বন্ধুদের স্তালিনীয় স্তুতির মিথ্যা বাগাড়ম্বর সহ্য করতে পারছিলেন না। বন্ধুদের মিথ্যাচারের কারণেই কমিউনিস্টদের উপর তাঁর বিতৃঞ্চা জন্মেছিল আর তাঁর চিন্তাভাবনা কথাবার্তায় নীৎশীয় কমিউনিস্টদের সূত্র ঘুরে বেড়াতো। এসব নিয়ে তাকে যথেষ্ট উত্তেজিত হতেও দেখা গেছে। সেই দিনগুলোকে ফুঁকো এভাবেই স্বতন্ত্র ধারার একজন দার্শনিক হিসেবে আবির্ভুত হন। তাঁর চিন্তাভাবনায় স্বাতন্ত্র্য দেখা দেয়। তাঁর এই ভাবনা ছিল প্রকৃতপক্ষে আপন বৈশিষ্ট্য ও গতিশীল ক্রিয়াশীলতার কারণে অনন্য। এরই প্রতিফলন ঘটে তাঁর Histoire de la folie শীর্ষক প্রকাশিত গ্রন্থে। তিনি নিশ্চিতভাবে বুর্জোয়া বিরোধী ছিলেন এবং মার্কসীয় ভাষায় তার কড়া সমালোচনা করেছিলেন। এই গ্রন্থের মুখবন্ধে লিখেছিলেন, নীৎশীয় অনুসন্ধানগুলো ইতিহাসের দ্বান্দ্বিকতায় ট্রাজেডির নিঃশ্চল প্রকরণ হয়ে উঠেছিল। মুখর হয়েছিল চেপে রাখা দুঃখের প্রকরণ বর্ণনায় আর এটাই ছিল আমাদের সমকালীন সংস্কৃতির সীমারেখা বা সীমাবদ্ধতা। তাঁর কাছে এসবই ছিল প্রবঞ্চনামূলক, উন্মত্ততা, দুর্বৃত্তায়ন আর যৌন-হয়রানি বিশেষ।

সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ এবং মতাদর্শিক দল কমিউনিস্ট পার্টির সময়কালে ফ্রান্সের চতুর্থ প্রজাতন্ত্র ছিল বেশ ঝুকিপূর্ণ। ফুকো তখন তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অশান্ত রূপকে ফ্রান্সে এবং ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সমকামী যৌনতার প্রচারক হয়ে উঠেছিলেন। আলথুজার মনে করেন ফুকো সমকামী ছিলেন। পরে, তাঁর মৃত্যুও হয়েছিল এই সমকামিতার জন্যে। ১৯৫৪ সালে তিনি সুইডেনের উপসুলায় চলে যান যেখানে তিনি রোমীয়-স্টাডিজ (Roman Studies) অনুষদের অধ্যাপক নিযুক্ত হয়েছিলেন। একই সঙ্গে কাজ করতেন ফরাসি দূতাবাসে। অধ্যাপকের ওই পদটি এমন একটি পদ ছিল যা তাঁকে দিয়েছিল ধর্মইতিহাসবেত্তা হোর্হে দুমেসিলের সঙ্গে লেখাপড়া করার, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সুযোগ। দুমেসিলের সঙ্গে তাঁর এরই সূত্রে গড়ে উঠেছিল ব্যক্তিগত নিবিড় সম্পর্ক। ১৯৫৮ সালে তিনি এক বছর করে প্রথমে ওয়ার্শো এবং পরে হামবুর্গে জীবন কাটিয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে ফুকো ফিরে আসেন প্যারিতে। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর অভিসন্দর্ভের পাণ্ডুলিপি, যা তিনি জমা দিয়েছিলেন বিজ্ঞান শাস্ত্রের ঐতিহাসিক হিসেবে খ্যাতিমান হোর্হে গাঙ্গুইলহেমের কাছে আর তখনই সুযোগ আসে ক্লেমোন-ফেরান্ড নামক প্রতিষ্ঠানে মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার।

ফুকোর জীবনে রূপান্তর ও পরিবর্তন ঘটেছিল বিস্তর। ১৯৬০ সালের পরবর্তী পাঁচ বছরে ঘটেছিল অনেক কিছু- ভাল-মন্দ মিশিয়ে। এসব থেকে তিনি মুক্তও হতে পেরেছিলেন। অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছিলেন বিস্তর। লেখাপড়া, পড়াশোনা, অনুসন্ধান, গবেষণার কাজগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন। লেখাপড়ার চর্চাটা হয়ে উঠেছিল আরও গভীর। মানুষের জীবনের বড় বড় সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা ছিল নিরন্তর। একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন তিনি বিদেশে বসে এবং ১৯৬১ সালে সোরবনে সেই ‘মূল সূত্র’টিকে (thèse principale) প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিতাবটি ছাপা হয়েছিল। শিরোনাম ছিল ‘চিরায়ত-ধ্রুপদী সময়কালের চিত্তবৈকল্যের ইতিহাস’ (Histoire de la folie à l’àge classique)। কিতাবটির মূল শিরোনাম ছিল ‘চিত্তবৈকল্য ও প্রজ্ঞাহীনতা’ (Folie et déraison)। এই লেখায় তিনি অনেক বিচিত্র বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। আরম্ভ করেছিলেন সেকালের মানুষ ও সমাজের সমস্যাগুলো নিয়ে, চেষ্টা করেছিলেন নতুন চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটাতে। চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন সবসময়- নিজের চিন্তাধারাকে প্রতিষ্ঠিত করার। ‘চিত্তবৈকল্য ও সমাজ’ গ্রন্থটির পৃষ্ঠাসংখ্যা ৬০০-এর উপরে এবং তিনি এই গ্রন্থে যে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তা অত্যুৎকৃষ্ট পাণ্ডিত্যের জন্য প্রণিধানযোগ্য। এই গ্রন্থে তিনি মনোবিজ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এককথায় ইতিহাসের মধ্যে এসে এর সমাপ্তি টেনেছেন। তিনি এই কিতাবে লিখলেন, আমাদের অকপট সরল মনমানসিকতা এমনভাবে তৈরি করেছি যে, মনস্তাত্ত্বিকভাবেই আমরা গত দেড়শো বছর যাবৎ পৃথিবীর ইতিহাস ভুলভাবে রচনা করে চলেছি। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে ভুল ইতিহাসের  সমাপ্তি ঘটুক এবং ইতিহাসে যা লেখা হয়েছিল তাতে মনোবিজ্ঞানেরই প্রতিফলন ঘটেছিল- এরও অবসান চাই।

চিত্তবৈকল্যের বা উন্মত্ততার বিচিত্র ধরনের ইতিহাস সম্বন্ধে ধারাবাহিকভাবে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া আসলে দুঃসাধ্য কাজ। কারণ, এর ইতিহাস প্রজ্ঞাধর্মী নয়, প্রজ্ঞার বাইরে এর অবস্থান। এই প্রসঙ্গে ফুকোর পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, প্রজ্ঞা মরে গেছে। মনোবিজ্ঞান পারে সঠিক বিজ্ঞান হিসেবে বিভিন্ন বিষয়গুলোকে বর্ণনা করতে। উন্মত্ততা, মানসিক রোগ, মানসিক যন্ত্রণা, যা মানুষের স্বভাব-চরিত্রের বিষয়- এসব বিষয়আশয় মনোবিজ্ঞানই বর্ণনা করতে পারে। চিত্তবৈকল্যের মার্কসীয় তত্ত্ব যা তিনি ১৯৫৪ সালে রচনা করেছিলেন, প্রত্যক্ষবাদের আলোকে অস্তিত্বশীল মানসিক রোগীদের সমস্যার কথা তাতে আলোচনা করেছিলেন। এই আলোচনায় সামাজিক বাধ্যবাধকতাকে উপস্থাপন করেছিলেন তিনি।  সমস্যাগুলোকে ব্যাখ্যা করেছিলেন হেগেলীয় ও মার্কসীয় মতবাদের ধারায় অবিচ্ছিন্নতা ও প্রজ্ঞার ‘homme réele’ অথবা ‘homme luimême’-এর উদাহরণ দিয়ে।

ফুকো বলছেন, ভাববাদ দিয়ে ‘চিত্তবৈকল্য ও প্রজ্ঞাহীনতা’কে (Folie et déraison) সরিয়ে রাখা হয়েছিল। একদিকে মানুষের চেতনা ও প্রজ্ঞাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, অন্যদিকে ঐতিহাসিকতা ও শর্তসমূহকে প্রজ্ঞাহীন মনে করা হয়েছিল। আর এ থেকেই প্রজ্ঞাহীনতা, বিশেষ করে চিত্তবৈকল্যের ধারণাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ফুকো দ্ব্যর্থহীনভাবে চিত্তবৈকল্য ও প্রজ্ঞাহীনতার উপর এ কারণেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন যাতে ‘মানবসত্ত্বা’কে খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর ধারণা হয়েছিল, মানুষের মানবসত্ত্বা বা মনুষ্যত্ব হারিয়ে গেছে। প্রজ্ঞা নিশ্চুপ হয়ে গেছে কিংবা প্রজ্ঞাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। প্রজ্ঞার এই নিশ্চুপ নৈঃশব্দ্য থেকেই চিত্তবৈকল্যের সৃষ্টি। এই চিত্তবৈকল্য বা উন্মত্ততা প্রজ্জ্বলিত বা বিকশিত হয়েছিল ‘মানসিক রোগ’ নামে- আঠারো শতকের শেষভাগে। এটিই ছিল ফুকোর মোদ্দা কথা বা কেন্দ্রীয় মূলসূত্র (thèse principale)। তিনি এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এইভাবে,  নিস্তব্ধতা বা নৈঃশব্দ্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেছে- উন্মত্ততা মানসিক রোগে পরিণত হয়েছে। যখন উন্মত্ততা ও প্রজ্ঞার মাঝে অসম্পূর্ণ ও অসংলগ্ন কথা হয়, তখন তার কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। এর শব্দবিন্যাস সংযত থাকে না, লোকে তখন তোতলামি করে এবং এটিই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নতুন ভাষা যা প্রজ্ঞার স্বগত-উক্তি বা উন্মত্ততা।

অর্থাৎ মনোবিশেষজ্ঞের ভাষা অমার্জিত, অকর্ষিক ও অপ্রতুল; সঠিক অর্থ প্রকাশের উপযোগী নয়। এই যে চিত্তবৈকল্য তা কেবল নিস্তব্ধতা সম্পর্কিত,  চরমভাবে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতামাত্র। এটা কেবল তোতলামির সামিল এবং ভাষায় তা-ই তৈরি করা হয়েছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা মানসিক রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে এই তোতলামির প্রলাপ বিষয়ক প্রেসক্রিপশনই লিখে থাকেন। এরকম অসংলগ্ন ভাষার (সিনট্যাক্স) থাকে না সঠিক বাক্যগঠন-রীতি বা শব্দ বা পদের ব্যাকরণসম্মত ব্যবহার। এটি পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। মানসিক রোগী যেমন একধরনের পাগল, তেমনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞরাও অন্য ধরনের পাগল। ফুকো আরোও বলেছেন, তিনি মানসিক রোগের চিকিৎসার ভাষিক ইতিহাস লেখার চেষ্টা করেননি। বরং এই নিস্তব্ধতার প্রত্নতত্ত্ব  লিখেছিলেন। ফুকোর এই পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা সম্পর্কে জাঁক দেরিদা পরে বলেছিলেন, ফুকো পদ্ধতিগতভাবে ও জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে পৃথিবীর একটি বিশাল ভয়াবহ প্রসঙ্গের সঙ্গে আমাদেরকেও জড়িয়ে ফেলেছেন।

ফুকো মনে করেছিলেন, সময়হীনতার দ্বারা অচিহ্নিত চিত্তবৈকল্য মনোবৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অনৈতিহাসিক দিক। তাই তিনি সুনির্দিষ্টভাবে সবসময় জানতে চাইতেন, কেন চিত্তবৈকল্য হয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধরনগুলি কেমন, বন্দিশিবিরে ও চিকিৎসা-বিজ্ঞানে কেন বদলে বদলে যায়। অথবা সুনির্দিষ্টভাবে বললে দাঁড়ায়, কেন উন্মত্ততা বা চিত্তবৈকল্যকে প্রথমে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, বর্ণনা করা হয় প্রজ্ঞা দিয়ে আর সীমাবদ্ধ জগতের জ্ঞানের রাজ্যেই এর উদ্ভব ঘটে। ফুকো দেখাতে চেয়েছিলেন যে উন্মত্ততা (চিত্তবৈকল্য) সর্বপ্রথম রাজত্ব বিস্তার করেছিল সেকালের তথাকথিত চিরায়ত-ধ্রুপদী সময়কালে, যখন প্রজ্ঞা দিয়ে বিবেচনা করে মানুষকে শাস্তি দেয়া হতো। শুরুর সেই কালটা ছিল চতুর্দশ লুই থেকে ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত। এরপর উনিশ শতকে শুরু হয়েছিল মানসিক রোগের চিকিৎসা ও আরোগ্যবিধান, আর শেষমেষ সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণের দ্বারা তা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল।

ফুকো এখানে দুটো শব্দ ব্যবহার করেছেন- aliéné অথবা alienation, অর্থ বিচ্ছিন্নতা; যা আসলে উন্মত্ততার সমার্থক। ফুকোর মতে, চিত্তবৈকল্য মানুষকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। এই বিচ্ছিন্নতা তখনই সৃষ্টি হয়েছিল যখন মানুষের ভুলে যাওয়া দিনগুলো ছিল অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়নে জর্জরিত। মানুষ প্রজ্ঞা ও প্রজ্ঞাহীনতার মাঝে ব্যবধান তৈরির চর্চা করতো। উন্মমত্তদের বা উন্মাদদের নির্বাসনে পাঠানো হতো বা বন্দি করে রাখা হতো। এটিই ছিল ফুকোর সূত্র বা মূলকথা। মনোবিজ্ঞান ও মনোবিশ্লেষণী শাস্ত্রকে অগ্রাহ্য করে এরকম নতুন থিসিস বা ভাবনারই উদ্ভব ঘটিয়েছিলেন তিনি।

এই লেখার পরবর্তী অংশে সেই ভাবনারই বিস্তৃত বিবরণ উপস্থাপন করবো। দর্শনের বিষয় বলে তা হয়তো তীরন্দাজের পাঠকদের কাছে কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু একটু মনোযোগ দিলেই বিষয়টি আপনাদের কাছে প্রাঞ্জল হবে বলে আমার বিশ্বাস।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. এ সময়ের সবচেয়ে প্রভাব সঞ্চারী দার্শনিক ফুকো। তাঁকে নিয়ে আলোচনা জরুরি ছিলো বলে মনে হয়। লেখককে ধন্যবাদ। সরল গদ্যে ফুকোর জটিল দার্শনিকতাকে ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার জন্যে। পরবর্তী কিস্তিও পড়ার আগ্রহ জেড়ে থাকলো।

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close