Home কবিতা ওবায়েদ আকাশ / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ

ওবায়েদ আকাশ / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশঃ January 30, 2017

ওবায়েদ আকাশ / পাণ্ডুলিপির কবিতাগুচ্ছ
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : মৌলিক পৃষ্ঠায় হেঁয়ালি নামে কলকাতা বইমেলায় ওবায়েদ আকাশের একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বইটির প্রকাশক কলকাতার ছোটকাগজ ‘ঐহিক’। পাওয়া যাচ্ছে কলকাতা বইমেলার লিটিল ম্যাগ কর্ণারে, টেবিল নম্বর ১০৬।]

 

অভিনেতা তীর্থঙ্কর

তীর্থঙ্কর মজুমদার আমাদের বাড়ির ছেলে
তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেহারাটা দর্জিখানায় সেলাই হচ্ছে
চিবুকের প্রশ্রয় থেকে একগুচ্ছ চুল নাভির ওপর দোল খাচ্ছে

সকাল থেকে একটি কাঠকয়লার বাস এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে আঙিনায়
তাতে বসন্তকাল, কোকিলের ডাক
সারাদিন চড়ে বেড়াচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত

তীর্থঙ্কর, অভিনয়ের প্রাক-ভূমিকায়
তার গোফের ওপর বসিয়ে দিল নার্সারি। তাতে যা লাভ হলো :
ফুটে থাকা দুচারটি ফুলে আবশ্যক পারফিউমের কাজটি অন্তত হয়ে গেল

আর এখন তাতে ফল ধরবে- যা পেড়ে খেতে
তীর্থঙ্করের সস্নেহ আশীর্বাদ প্রয়োজন পড়বে তোমাদের

 
কৃষককন্যার কাব্যচর্চা

এক কৃষকের মেয়ে- কিশোরী সে- স্কুলে যায়- লোকজন বলে- প্রতিটি সকালে- না যদি সূর্য ওঠে- একমুঠো কাঠের আগুনে- পৃথিবী কি আলোকিত হয়?

প্রতিবেশী আমি- এমনই কিশোরী সে- রাত করে ছড়া-পদ্য লেখে- কেবলই আমাকে চেনে- আর ভাবে মনে মনে- একদিন তুমিও কিশোর- প্রেমপদ্য লিখে শেষে- ছুড়েছো আগুনে- আমি তার পদ্য ঘেঁটে পাই- রূপের আগুনে তার- পতঙ্গেরা পুড়ে পুড়ে- কত হলো ছাই- আরো লেখে মেয়ে- অন্যত্র তুষের আগুন- কৃষক পিতাকে তার- আজন্ম জ্বালিয়েছে- তারো চে’ দ্বিগুণ- আমি তাকে বলি- রূপের সীমানা যদি- খেয়ে যায় ঘুণে- ছড়া-পদ্য লিখে মেয়ে- তুমিও ছুড়বে আগুনে-

আমার রচনাবলি- চারিদিকে বারুদের ঘ্রাণে- একদিন জেনো তারা- গড়াবে ধুলায়- আর তুমি কৃষককন্যা- একমুঠো কাঠের আগুন- প্রতিদিন দেখা হবে- তারায় তারায়

 
হালখাতা

সুদীর্ঘ বর্ষায় দেখো
তোমার মাথার নিচে গজিয়েছে শামুকের চারা
তারা সব ঝুলে ঝুলে
বেবাক নিয়েছে বুঝে চুলের ব্যাপার

আমি এক মৃত নগরের শব
কাঁধে করে নিয়ে যাই পারস্য নগরে
যেতে যেতে কেউ দেখে, হালখাতা এসে গেছে
আমারও রয়েছে কিছু কারবারি দেনা
শবখানা নড়েচড়ে দেখে
পারস্য নগরে কিছু গজিয়েছে মাঠ
কেউ তার বোঝে না ব্যাপার

তোমার মাথার নিচে ছোটবড় শামুকের চারা
তারা সব প্রাচীন শহরে এসে
খুলে খুলে জলে নেমে যায়

হালখাতা এসে গেছে, এমন বিস্তৃত মাঠে
শবখানা ভাসাও ডোবাও

গগণ ঠাকুর : গণিতজ্ঞ

গগণ ঠাকুর গণিতজ্ঞ ছিলেন
লিটল ম্যাগাজিনের দুর্মূল্য খাঁচায় তার নাম
যাদুঘরের প্রহরী-বেষ্টিত উজ্জ্বল হয়ে আছে

জীবনে প্রথম তিনি ভাষাবিজ্ঞান থেকে নেমে
লোকসংস্কৃতির দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন রিক্সার চাকা
তারপর নাটক সরণির মুখোশের কেনাবেচায়
গণিত বিষয়ে সবিশেষ আগ্রহী হয়ে ওঠেন

এবং যে কোনো বাহাস কিংবা প্রথম প্রথম কবিতার খাতায়
ব্যাকরণ থেকে জ-ফলা কিংবা নৈতিকতা থেকে ঐ-ফলা ছিঁড়ে
বাতাসে উড়িয়ে দিতেন বলে
একদা এ্যান্টি এশটাবলিশমেন্টের কয়েকজন তরুণ কর্মী
তাকে গভীর উৎসাহে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়

বলে, যে কোনো স্কুলিংয়ের নির্জনতায় জনসভার উত্তেজনা
কিংবা কফি হাউসের ছায়াতলে সরাইখানার পরাপাঠ
রটিয়ে দিতে পারলেই তবে মুক্তি

কোনোদিন মুক্তি নেননি গগণ ঠাকুর
বরং দীর্ঘ কারাবাস কালে তিনি এ্যালজ্যাবরার প্লাসগুলো একদিকে
এবং বন্দিজীবনের নিঃসঙ্গতা ও অপ্রাপ্তিগুলো একদিকে রেখে
প্রতিদিন ঘুমোতে অভ্যস্ত ছিলেন

একদিন যোগের সঙ্গে ভাগ এবং নিঃসঙ্গতা ও অপ্রাপ্তির সঙ্গে
গুণীতকের গভীর সখ্যের দরুন ওরা মধ্যরাতে হাত ধরে পালিয়ে চলে গেল

অথচ তিনি প্লাসের সঙ্গে মরালিটি এবং
মাইনাস ও একাকিত্বের সঙ্গে হিউম্যানিটির সমন্বয়গুলো
গভীর কাছ থেকে ভেবে এসেছিলেন-

গগণ ঠাকুর গণিতজ্ঞ ছিলেন। এ-মতো গাণিতিক সমস্যা
জীবনে এটাই প্রথম বলে তার মীমাংসা হেতু
নতুন কোনো লিটল ম্যাগাজিনের খাঁচার দিকে তাকিয়ে আছেন

 

একটি সাম্প্রতিক কবিতার খসড়া

গত শরতের দিকে
যথার্থই ভাল লোক বলে তোমাদের নিমন্ত্রণ পেলাম
হাঁড়ি-কলসির নিদ্রিত সাজানো ফটকে
তোমাদের অভ্যর্থনা পায়ে পড়ে গেল
বলা হলো-
জাহাজ ছুটছে
ঢোল বাজছে
রুটিতেই আপনার প্রচণ্ড আসক্তি, তাই তো?
বললাম, ‘না’
তাহলে ভেতরে ঢুকুন
জানেন তো, কেরোসিনের ফলন ভাল
এ নিয়েই দুটো কথা বলা হোক

দেখছ যে, সিঁদুর রাঙানো ষাঁড়
ও থেকে আমরা রোজ কেরোসিন দুহাই
কেরোসিন খাই…

ট্রেন এসে যাচ্ছে, আমার শ্যাম্পুর পাতা?
এ সবই মায়ের জন্য উপহার
মা বলেন, ‘খ্যাতি নেই খাদ্য নেই
পারফিউমের গন্ধে আমার
উঁট্কি আসে বাবা’

যা দিনকাল, আপনারা সরুন তো
সুঘ্রাণ আসছে
সুঘ্রাণের জন্মদিন ছিল
আমার নেমন্তন্ন ছিল
সংবর্ধনা পায়ে পড়েছিল…

খাতায় মার্জিন টানুন… আমাদের ছবির মাপ নিন
আমার মায়ের নাম : কেওড়াজল
বাবা : গন্ধবণিক
পেশা : দিগ্বিজয়
– এভাবে ক্যাপশন দিন

…চলুন কাস্টমসের দিকে
সঙ্গে হোমিওপ্যাথ
বাবা ডাক্তার ছিলেন
ভাল মেয়ে দেখতে পারেন

স্যার, আমার ফাইলপত্রে
এক ডজন সুন্দরী বেড়াতে এসেছেন
গায়ে ডেটলের ঘ্রাণ, লাইকলি ইমিগ্রান্ট
ভাগ্যটা খুলে নিন স্যার

দ্রুত ফিরে চলুন, বাংলার টিচার
রোল-কল হবে
নো লেট-মার্ক
– টিচার, আপনার ছাত্রীদের ডাকে ধর্মঘট
কাল আসবো না
বাসায় বেড়াতে যাবো, থাকবেন টিচার?
সঙ্গে সংবর্ধনা
সুঘ্রাণ
বাবা-মা থাকবেন

আফিমের ঘ্রাণ পাচ্ছ?
দোতলার ছাদে আফিমের চাষ হয় খুব
ডবলডেকারে ওঠে
স্কুলে যায়
ভাল শিস্ দেয় মিনি স্কাট
ছাদে রোদ এলে পত্ পত্ ওড়ে পাজামার ফিতে

আর মনে পড়ে পঙ্কজ উদাস
হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া
জলতরঙ্গ…
বিটোফেন…
মোৎসার্ট…
‘বেলা বোস তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?’
ডব্লিউ ডব্লিউ ডট অঞ্জন দত্ত ডট…
আহা প্রতুল-দা আলু ছোলা বেচে উজাড় করেছেন

কফি হাউসের রোদে
ফোলা ফোলা গাল বসে থাকে
মরুভূমির নাভি
ধারী ধারী পাছা

কাল আপনাকে দেবদাস ছবিতে দেখেছি
সংবর্ধনাকে ভাল চিনবার কথা আপনার
‘ইয়েস অনলি শি ইজ!’
চলুন মা’র কাছ থেকে ছুটি নিয়ে আসি

এত হাসি হাসি কথা কী করে বলেন?
আপনার বোগলের ঘ্রাণে বমি বমি লাগে
– কোলে তুলে নিন, ওজনে পাতলা
ভাল স্বাস্থ্য
একহারা
পছন্দ : এ্যাশ টি শার্ট
ব্ল্যাক জিন্স
হানড্রেড পাইপারস
প্রিন্স ইগোর
এ্যাবস্যুলুট
হোয়াইট মিশ্চেল
জ্যাক ড্যানিয়েল…
আর
টোল পড়া গাল

একটি রং নাম্বার ডায়াল, হাসপাতাল!
রিয়েলি লোনলি ডাক্তার
পেইন কিলার, প্লিজ…

– সিস্টার [নার্স] আপনার ফ্রকের হুঁকগুলো খুলে যাচ্ছে কেন?
– ম্যাডাম [ডাক্তার] আপনার এ্যাপ্রোনটি ভীষণ উড়ছে বাতাসে
আমার চশমাটা খুলুন
মাইনাস থ্রী পয়েন্ট ফাইভ [-৩.৫]
পূর্বপুরুষের ছিল
চশমাটা ভেঙে দিন, আপনার শুশ্রুষা
বড় প্রয়োজন
আরও শীঘ্র ভাল করে দিন
মা বকবেন
তিনি তো অফিস যান না কতদিন

সকাল সকাল শেভ হয়ে যাচ্ছে
ধোঁয়া উঠছে চায়ে
(মধ্য দুপুর… জলপাই-রং জীপ… হ্যান্ডকাপ…)
অভিযোগ : ক. রঙধনু দেখা
খ. দেদার গঙ্গার প্রবাহ অঙ্কন
গ. শীতবস্ত্রহীন
ঘ. বুকপকেটে প্রেমিকার চুম্বনের ছাপ
ঙ. প্রেসক্রিপশন
চ. শালপাতার বিড়ি

আমাকে গেট অব্দি পৌঁছে দিন
যাবজ্জীবন, সশ্রম…

প্রিয় শোক : ১. জীবনানন্দ দাশ
২. সমুদ্র ভ্রমণের দিনগুলি

বালাগাল উলাবে কামালিহি…
আপনাকে খুব সুফি সুফি লাগে
আপনি হারামির মতো মুখ ভার করে হাসেন
আপনি খুব পর্নো পড়েন
কিছুটা ঘুমিয়ে নিন
আপনার কিছু ঘুমের প্রয়োজন আছে
ঘুমের মধ্যে আপনি খুব মন খারাপ করেন

কেউ ফুটপাত ধরে হাঁটছে
যাবজ্জীবন ঘুমের কথা আপনার মনে পড়ছে না তো!

 

 

কাগজ থেকে বেরিয়ে

চলো কাগজ থেকে বেরিয়ে পড়ি
স্টেশনে যাই, ট্রেনের ছাদে উঠে ফুটবল খেলি

প্রতিদিন কাগজে থেকে, ব্যাপক পৃথিবীটা
কেমন অচেনা হয়ে উঠছে
সমুদ্রটা অজানাই থেকে গেল

অথচ বেরিয়ে পড়লে কত কিছু করা যায়
রুটির মতো উল্টেপাল্টে দেখা যায় চাঁদ
তারাগুলো কর্জ করে মার্বেল খেলা যায়

চলো কাগজের এই ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র পাতা ছেড়ে
বরং সমুদ্রে চড়ে বসি, তার অতলে ডুবে যাই
বিস্তৃত প্রাণিজগতের বাসিন্দা মনে হবে তাতে

তাছাড়া কাগুজে সংসারে থেকে প্রতিদিন পলায়নের চেয়ে
ডুবুরির মতো সমুদ্রতলে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো যাবে

ভাবতে ভাবতে পাড়াগাঁয়ের সমস্ত মাঠ এসে
চড়ে বসল আমার কাগজের পাতায়-
গরু চড়াল, মলন ছড়াল
রাত ভরে শুরু হলো বীর গাজির গান

আর ভোরবেলা যখন লাঙল চড়াতে যাবে
তখন তার পিছু পিছু এই কাগজ থেকে বেরিয়ে পড়ব ঠিক

ইতোমধ্যে এই ব্যবহৃত কাগজের প্রতি মায়া
আর একবার সমুদ্র আর একবার শৈশবের
মাঠের জন্য মায়া- আজকাল কে যেন আমাকে
দ্বিধান্বিত পৃথিবীর দিকে ইশারা করে যায়-

 
বাংলাদেশে একদিন ইংলিশ রোড নামকরণ হলো

আমার নাম দাও শিবপোকা। শিবপোকা মানে, একটি নতুন পোকার নামকরণের ক্ষমতা।… তুমি করো দোয়েলের চাষ। দোয়েল কি পরিযায়ী নাম? ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো সেবার বর্ষায় ছিলো সাদারঙ হয়ে। আমি জানি, এ প্রকার জলসাদা ব্যাঙ পৃথিবীতে কখনো ছিলো না। এমন ব্যাঙরঙ ধরে যখন ভোর হয়, আবার কৈবর্তপাড়ায় ভেঙে যায় রাজ্যের নিয়ম। কেমন আফিমগন্ধে বাজারের আঁশটের ভেতর আমি শিব শিব করে পোকা হয়ে উড়ি তোমার তালাশে।… তুমি করো দোয়েলের চাষ।… ভালো ছাইরঙ বোঝো।… মেটে কলসি, লাউয়ের খোঁড়লে কী গভীর সুর তুলে আনো। তোমাকে জানাই তাহলে, আমাদের ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো আমার জিহ্বার তল থেকে একদিন তুলে নিয়ে গেছে সমস্ত লালা। সেই থেকে সুরহারা হয়ে শীতল শস্যের মতো তোমাকে সযতেœ রাখি ঘরের নিভৃত কোণে। তুমি তো জানো, কতোটা বেসুরো হলে হাটের গুঞ্জন ওড়ে আকাশে বাতাসে

 

 

প্রাক বৈবাহিক

একবার আমাকে একটি বিবাহ-উপযুক্ত মেয়ের হস্তাক্ষর পাঠিয়ে বলা হলো, এই মেয়ে এতোদিন জলেই বসবাস করেছেন; আর তার সাম্প্রতিক স্যাঁতসেঁতে প্রকাণ্ড শরীর রৌদ্রে শুকোতে দেয়া আছে। তার হস্তাক্ষরে এই যে কোথাও মাত্রা পড়েছে বা পড়েনি, আর এই যে যতিচিহ্নের কোথাও ভুল বা কোথাও সঠিক ব্যবহার- এসব কিছুই নাকি মেয়েটির যথার্থ যোগ্যতা বা দোষগুণ যেটাই ধারণা করা হোক। মেয়েটির উচ্চতা আমাদের মাঠভর্তি জলের সমান, অর্থাৎ এটা আমার আন্দাজ করে নেয়ার কথা। যা হোক, আমি মায়ের কাছ থেকে পত্রমারফত এ সংবাদ জেনেই কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্নপত্র তৈরি করেছি। আর ভাবছি, মীন রাজ্যের অধ্যয়ন পর্বে মেয়েটির দীর্ঘ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসব প্রশ্ন খুব একটা কমন পড়ার কথা নয়। আর তাহলে এভাবে হস্তাক্ষর পাঠিয়ে এক জননীর কোনো অনাথ যুবকের এ মতো মন ভোলানোর কোনো মানেই হয় না। ভেবে দেখছি, আমার অপেক্ষার দিনগুলো কী উৎকণ্ঠার! শীত কিংবা বর্ষাই আমার প্রিয় ঋতু হলেও ভাবছি, তাকে ভেজা জবুথুবু নাকি শীতে কোঁকড়ানো দেখতেই বেশি আনন্দদায়ক হবে। আজ এই মুখর বর্ষণে ছাতা হাতে বৃষ্টি বাঁচিয়ে এমনতর ভাবনাগুলোই পোস্টাপিস অবধি পৌঁছে দিয়ে এলাম। আর তখনই আমার হঠাৎ মনে এলোÑ তাকে শেষ প্রশ্নটি করাই হয়নি যে, অবশিষ্ট জীবনে তিনি মীন ধর্মেই ফিরে যেতে আগ্রহী কিনা…

 
ধীরেন্দ্র আর ভুশার নস্টালজিয়া

‘ধিরে, সুখ নাই।’
[ভুশার একমাত্র ঘোড়াটি গতরাতে চুরি হয়ে গেছে। কিংবা ধারণা করা যায়, এ মুষল বৃষ্টিতে ঘোড়াটির দুরন্ত শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়।]

‘কেন?’ -বলল ধীরেন্দ্র।
আবার ধীরেন্দ্র কয়, ‘তোর থেকে ত্রি-দন্ত চতুর কেউ একজন ঘোড়াটির আজকাল খোঁজখবর নেয়।’

‘ধিরে, এখন কী করি?’
‘যত দূর জানা আছে, তার কিছু তথ্য বের করি।’
[তথ্যে বেরিয়ে পড়ে, এ ভরা শ্রাবণে, তিনিও ঘোড়ায় চেপে হঠাৎই ছুটছেন নাকি সোমত্ত কৈশোরের দিনে।]

‘মাঝি, কোন ঘাটে ভিড়বে তোমার তরী?’
[নদীতীরে ধীরেন্দ্র আর ভুশা, তাদেরও শৈশবের দু’টি টিকিট যদি মেলে!]
মাঝি বলে, ‘আপনারা ব্যাটা নাকি ছেলে?’
এ ওর দিকে চায়, তারপর ধীরেন্দ্র বলে- ‘মুশকিলে পড়িলে ভুশা, মাঝিও মনের কথা রঙ ধরিয়ে বলে।’

 

 

শিশুপুত্রের অভিলাষ

টেবিল থেকে লাফিয়ে নামছে কবিতার খাতা

আমার শিশুপুত্র কবি হতে চেয়ে বায়না ধরেছে এবছর

খাতাটি লাফিয়ে নামছে মাটিতে আর
ছেলেটি তার নিচ দিয়ে অনায়াসে ঢুকতে পেরে
এক অসামান্য খেলায় মেতে উঠেছে

পড়ে যাওয়া খাতার শরীরে হাত দিয়ে দেখি
তপ্ত জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা
ছেলেটি মা মা করে কাঁদছে
আর বাবার সংগ্রহ থেকে
একটি একটি ঘুমের পিল বিরামহীন খাইয়ে চলেছেন মা

এবং ভোর হতে না হতেই স্নানঘরে ঢুকে
প্রতিটি কবিতার গায়ে অঝর ধারায় জল ঢেলে দিচ্ছে

পঙ্ক্তিগুলো আরো জল আরো জল বলে
শরীর থেকে সমস্ত বসন খুলে
নিজেদের গা ছেড়ে দিল অমৃত ধারায়

এই এক শিশুপুত্র প্রতিদিন একটি-দুটি শব্দ
সারারাত জলে ভিজিয়ে রেখে ভোরবেলা
বাবার হাতে তুলে দিয়ে ভীষণ তৃপ্ত হচ্ছে আজকাল

আমার ঘরভর্তি জ্বরতপ্ত খাতা আর শিশুপুত্রের
ভেজা কোমল শব্দগুলোর ভেতর একপ্রকার
যোগসূত্র নির্ণয় করতে চেয়েছি

বিপরীতে আজকাল তারা আমার নিঝুম উঠোনের
শরীরের উত্তাপ নিয়ে গবেষণাগার ভারি করে তুলছে-

 

 

হাসপাতাল থেকে ফিরে

আমি যখন পাগল হয়ে ফিরে এলাম
দেখি, কেউ আমার চেনা নয় আর

স্ত্রীকে বলি- ভাবি, তোমার মতো মেয়ে, যারা
সারারাত্রি স্বাস্থ্যসেবা করে
তারা কেউ নয় আমার স্ত্রীর মতো পরিচর্যারত

আমি তাদের চুমু খেয়ে, গন্ধ শুঁকে
মুখ ভরে ঢেলে দিই বাংলা মদের ঝাঁঝ
তারা বলে- তাদের ঘরে রাত্রিযাপন
নির্বিঘ্ন হরিণ শিকারই

ভাবি বলে বাপু- ‘তোমার সন্তানগুলো
তারা তো ঘুমিয়ে পড়েছে
আমাকে খুঁজতে এসেছে মধ্যরাতের মাঝি’
আমি দারোয়ান সমেত কাউকে বেরিয়ে যেতে দেখি

দেখি, ডাক্তার এসে আমার পালস দেখছে, গাল টিপছে
আমার হাড় কব্জি ঘষে-ছেনে তার দীর্ঘ কালো চুলে
ঢেকে দিচ্ছে মুখ
আমার নিঃশ্বাস বাড়ছে, আর
সে তার কম্পিত ঠোঁটে রাক্ষস হয়ে চেটে খাচ্ছে রোগ

 
প্রকৃতিপুত্র

ভাবতে গেলে তুমিই একদিন
আমাদের হারানো শেকড়, হারানো চুল, বয়সভেদে
ছোট হয়ে আসা পরিত্যক্ত পোশাকের ধরন, ছায়াভিত্তিক
ঘাসের আকৃতি, বুক চিতিয়ে শুয়ে থাকা মাঠ-
আলের ওপর হাঁটতে হাঁটতে ধানক্ষেতে পড়ে যাবার স্মৃতি-
একদিন ডেওয়া ফলের ঘ্রাণের মতো ফিরিয়ে দিতে পারো

যখন সাঁকোর কম্পন দেখে বুঝে নিতাম
মাছেদের হৃৎপিণ্ডের ধ্বনি, স্রোতের প্রবাহ দেখে মনে হতো
ভেসে যাচ্ছে সম্রাট দারায়ুস কিংবা স্কাইলাক্সের অধিকৃত রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ
আর যত্রতত্র অশ্বদৌড় দেখে মনে পড়ত
সেই সকল ক্রীতদাস ব্যবস্থার প্রবর্তক, যাদের
ঐসব দুরন্ত অশ্বের লেজে জুড়ে দিয়ে
ঘোরানো হচ্ছে কাঁটাঝোপ, বনবাদাড়, তপ্ত মরুভূমি-
একদিন আলোছায়ার নক্ষত্রের মতো
তুমিই তার ভালমন্দ, উঁচুনিচু শিখিয়ে নিতে পারো

যখন মাথার ওপর সুস্নিগ্ধ মেঘের পরিচ্ছদ দেখে
মনে হতো প্রাগৈতিহাসিক কুশলীরাজ কিংবা প্রাচীন গ্রীসীয়
স্থাপত্যপ্রেমিক কোনো রাজরাজড়ার মহান কীর্তির কথা-
কিংবা মনে পড়ে যেত- গাছে গাছে বিবিধ কূজন আর বর্ণালি ফলের
আস্ফালন দেখে ইবনে বতুতার চোখে অপ্সরী ও গন্ধর্বের পরম সংসার; আর
অতল সুখের এই পলিধৌত সুশীল রাজ্যের মতো স্বর্গীয় মাতৃভূমির কথা

ভাবতে গেলে একদিন তুমিই তার আগাপাছতলা দেখে ফেলেছিলে
আজ আবার পুনরুদ্ধারিত গৌরবের মতো
তারই কিছু গ্রহণ বর্জন সুখ স্মৃতি অনায়াসে তুলে ধরতে পারো জানি

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close