Home কবিতা ওবায়েদ আকাশ >> স্বনির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ

ওবায়েদ আকাশ >> স্বনির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ

প্রকাশঃ June 13, 2018

ওবায়েদ আকাশ >> স্বনির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ
0
0

ওবায়েদ আকাশ >> স্বনির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ

 

[আজ কবি ওবায়েদ আকাশের জন্মদিন। এই জন্মদিন উপলক্ষ্যে তীরন্দাজের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো তার স্বনির্বাচিত কবিতাগুচ্ছ। ওবায়েদ আকাশকে তীরন্দাজের শুভেচ্ছা।]

 

 
প্রকৃতিপুত্র

ভাবতে গেলে তুমিই একদিন
আমাদের হারানো শেকড়, হারানো চুল, বয়সভেদে
ছোট হয়ে আসা পরিত্যক্ত পোশাকের ধরন, ছায়াভিত্তিক
ঘাসের আকৃতি, বুক চিতিয়ে শুয়ে থাকা মাঠÑ
আলের ওপর হাঁটতে হাঁটতে ধানক্ষেতে পড়ে যাবার স্মৃতিÑ
একদিন ডেওয়া ফলের ঘ্রাণের মতো ফিরিয়ে দিতে পারো

যখন সাঁকোর কম্পন দেখে বুঝে নিতাম
মাছেদের হৃৎপিণ্ডের ধ্বনি, স্রোতের প্রবাহ দেখে মনে হতো
ভেসে যাচ্ছে সম্রাট দারায়ুস কিংবা স্কাইলাক্সের অধিকৃত রাজত্বের ধ্বংসাবশেষ
আর যত্রতত্র অশ্বদৌড় দেখে মনে পড়ত
সেই সকল ক্রীতদাস ব্যবস্থার প্রবর্তক, যাদের
ঐসব দুরন্ত অশ্বের লেজে জুড়ে দিয়ে
ঘোরানো হচ্ছে কাঁটাঝোপ, বনবাদাড়, তপ্ত মরুভূমিÑ
একদিন আলোছায়ার নক্ষত্রের মতো
তুমিই তার ভালমন্দ, উঁচুনিচু শিখিয়ে নিতে পারো

যখন মাথার ওপর সুস্নিগ্ধ মেঘের পরিচ্ছদ দেখে
মনে হতো প্রাগৈতিহাসিক কুশলীরাজ কিংবা প্রাচীন গ্রীসীয়
স্থাপত্যপ্রেমিক কোনো রাজরাজড়ার মহান কীর্তির কথাÑ
কিংবা মনে পড়ে যেতÑ গাছে গাছে বিবিধ কূজন আর বর্ণালি ফলের
আস্ফালন দেখে ইবনে বতুতার চোখে অপ্সরী ও গন্ধর্বের পরম সংসার; আর
অতল সুখের এই পলিধৌত সুশীল রাজ্যের মতো স্বর্গীয় মাতৃভূমির কথা

ভাবতে গেলে একদিন তুমিই তার আগাপাছতলা দেখে ফেলেছিলে
আজ আবার পুনরুদ্ধারিত গৌরবের মতো
তারই কিছু গ্রহণ বর্জন সুখ স্মৃতি অনায়াসে তুলে ধরতে পারো, জানি

রূপনগর

রূপনগর আমার হাত থেকে একদিন কেড়ে নিয়ে গেছে চালতার ব্যাগ। আমার প্রিয় চালতাফুল, যাকে বড় হতে দিয়ে একদিন ছ’টাকায় উঠে পড়ি এই নগরের ট্রেনে; সঙ্গে ইলিশ ভাজার ঘ্রাণ, কাগজী লেবু, অথৈ দীর্ঘশ্বাস… এই ফাঁকে মাটির হাঁড়িতে জল, শিং মাছের ঝোল- এই নিয়ে ট্রেনের কামরায় কামরায় কেউ গান ধরে দিলে ঝিলপাড় থেকে ডগাভাঙা দুবলার কষে কেউ কেউ ধুয়ে নেয় হৃদয়ের ক্ষত। আর তাতে বনমরিচ, বুনো বিছুটির মতো টগবগ করে ছুটে যায় ট্রেন উত্তরের দিকে। আর আমি দুধভরা গাভীর ওলান ভেবে দুই হাতে খুঁজে পাই পুরু ফ্রেমের তলে ফোলা ফোলা চোখের অসুখ। বাঁশবাগান, ঘাসফুল, প্রাচীন হালটের ঢালে বাতাবিলেবুর ফুলে এমন আষাঢ়ের দিনে, একদিন মৌমাছি তুলেছিল বৃষ্টির ভাষা; অথৈ সবুজ থেকে নুয়ে পড়া স্নেহের গভীরে বসে চালতাফুল, ক্রমে তারা ফিরে পায় বহুরঙ মানুষের রূপ।… রূপনগর, এই প্রিয় অভিবাস মুখরতা কোলাহলে ছায়াহীন ভালবেসে বসে আছে অজস্র স্টেশন শেষে-

 
সময়

ঘড়ির দিকে তাকালে
কখন যে কোন কাঁটাটি আমার বুকের মধ্যে বিঁধে যায়
এই ভয়ে ঘড়িকে বর্জন করেছি

অথচ রাত্রি হলে হৃৎপিণ্ডের উচ্চারণের চেয়ে
অধিক আপন হয়ে ওঠে ঘড়ির টিকটিক

তখন ব্যবহৃত বাসনকোসন ঘড়ির নিচে পেতে দিয়ে
ডায়াল থেকে টুপ টুপ করে ঝরে পড়া সময় সংগ্রহ করি

ভোর অবধি এত এত সময় আমার সমস্ত ঘর উপচে
জানালা দরজা দিয়ে গড়িয়ে ছড়িয়ে যায়

আর সন্ধে নামার আগেই
সময়ের সাথে পৃথিবীর সম্পর্কের চিতায়
দাউ দাউ আগুন জ্বলে ওঠে

 

 

বাংলাদেশে একদিন ইংলিশ
রোড নামকরণ হলো

আমার নাম দাও শিবপোকা। শিবপোকা মানে, একটি নতুন পোকার নামকরণের ক্ষমতা।… তুমি করো দোয়েলের চাষ। দোয়েল কি পরিযায়ী নাম? ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো সেবার বর্ষায় ছিল সাদারঙ হয়ে। আমি জানি, এ প্রকার জলসাদা ব্যাঙ পৃথিবীতে কখনো ছিল না। এমন ব্যাঙরঙ ধরে যখন ভোর হয়, আবার কৈবর্তপাড়ায় ভেঙে যায় রাজ্যের নিয়ম। কেমন আফিমগন্ধে বাজারের আঁশটের ভেতর আমি শিব শিব করে পোকা হয়ে উড়ি তোমার তালাশে।… তুমি করো দোয়েলের চাষ।… ভাল ছাইরঙ বোঝো।… মেটে কলসি, লাউয়ের খোঁড়লে কী গভীর সুর তুলে আনো। তোমাকে জানাই তাহলে, আমাদের ইংলিশ রোডের কোলাব্যাঙগুলো আমার জিহ্বার তল থেকে একদিন তুলে নিয়ে গেছে সমস্ত লালা। সেই থেকে সুরহারা হয়ে শীতল শস্যের মতো তোমাকে সযত্নে রাখি ঘরের নিভৃত কোণে। তুমি তো জানো, কতটা বেসুরো হলে হাটের গুঞ্জন ওড়ে আকাশে বাতাসে

 

 
মেটামরফসিস : মনিরুজ্জামান

ছিপি খুলে ঘুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো মনিরুজ্জামান

কারা যেন দীর্ঘ ঘুম মুড়ি দিয়ে পড়েছিল চিলেকোঠার খাটে
এবং প্রস্থান কালে ঘুমের মুখে ছিপি এঁটে
পেরিয়ে গেছে প্রমোদ সরণি

আমাদের মনিরুজ্জামান তাতে আটকা পড়ে
কতগুলো পুকুরের চারা এবং অরণ্যের ডিম
সফল প্রজনন হেতু ফেলে এসেছে; এবং পুকুরের গায়ে
জলপাই শ্যাওলার এক প্রকা- চাদর প্রান্ত ধরে টেনে
শরীরে মুড়িয়ে লোকালয়ে ফিরে এসেছে

আজকাল তার সন্তানের প্রতি সিংহের মতো স্নেহ এবং
স্ত্রীর প্রতি ইঁদুরের মতো নিষ্কণ্টক ভালবাসা দেখে
কেউ কেউ তার নাম পাল্টে ফেরারি রেখেছে

গাঁগঞ্জের ফেরারি-মন মানুষেরা উঠতে-বসতে ঘুরতে-ফিরতে
সারাক্ষণ তাকে বন্দি করে রাখে
এবং ব্যক্তি মানুষেরা তার মতো আকস্মিক বদলে যেতে
কেউ বাঘের মতো কেউ ছারপোকার মতো অভিনয় করে
তার মনোযোগ খুঁজতে থাকে

শুধু মনে মনে ভাবে মনিরুজ্জামান :
এক জীবনে আর কতবার বদলালে
একদিন শীতল বৃষ্টির মতো আকাশের করুণা কুড়নো যাবে!

 
অভিনেতা তীর্থঙ্কর

তীর্থঙ্কর মজুমদার আমাদের বাড়ির ছেলে
তার ব্যাকগ্রাউন্ড চেহারাটা দর্জিখানায় সেলাই হচ্ছে
চিবুকের প্রশ্রয় থেকে একগুচ্ছ চুল নাভির ওপর দোল খাচ্ছে

সকাল থেকে একটি কাঠকয়লার বাস এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে আঙিনায়
তাতে বসন্তকাল, কোকিলের ডাক
সারাদিন চড়ে বেড়াচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত

তীর্থঙ্কর, অভিনয়ের প্রাক-ভূমিকায়
তার গোফের ওপর বসিয়ে দিল নার্সারি। তাতে যা লাভ হলো :
ফুটে থাকা দুচারটি ফুলে আবশ্যক পারফিউমের কাজটি অন্তত হয়ে গেল

আর এখন তাতে ফল ধরবে- যা পেড়ে খেতে
তীর্থঙ্করের সস্নেহ আশীর্বাদ প্রয়োজন পড়বে তোমাদের

 
‘প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায়’ সিরিজ থেকে
কবি জীবনানন্দ দাশ প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে ট্রামের লাইনে
চমৎকার চিত্র নির্মাণ করতে পারতেন

কলকাতার প্রেক্ষাগৃহ ঘুরে মধ্যরাতে স্ত্রী লাবণ্য দাশের তৎকালীন নারী জীবনের স্বাধীনতা বিষয়ে অনেক গল্প শোনা যায়। শোনা যায় : বিদূষী লাবণ্য দাশ উনুনের পাশে শুয়েবসে কী করে শীতরাত্রির গল্প ফেঁদে কাঁচামাটির পাত্রের মতো আগুনে পুড়িয়ে নিতে পারতেন। আর পুরোটা জীবনের এ দীর্ঘ অবসরে জীবনানন্দ দাশ কতগুলো সোনার ডিম চুলায় তুলে কিছু তাঁর জীবদ্দশায় আর বাকিগুলো তাঁর মৃত্যুর পর আপামর পাঠকের জন্য পরিবেশন করে যান। আমরা তাঁর কাছে বনলতা সেনের অনেক গল্প শুনি। তবু, কোনো এক মানবীর মনে তাঁর ঠাঁই না হবার অপার বেদনার কথায় এতটুকু বিচলিত কেউ নই; কারণ, একবার সুরঞ্জনা অন্য যুবকের প্রতি আসক্তি বাড়িয়ে বনলতা বিষয়ে এক গভীর জটিলতা তৈরি করে বসেন। আর তাতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, ভাবনার পূর্ব থেকেই তিনি কখনো বনলতাকে একক মানবীর মর্যাদা দিতে পারেননি। কলকে পাড় শাড়িতে জড়িয়ে যে কিশোরী সন্ধে হলে ঘরে ধূপ দিতে যায় প্রতিদিন- বরং তাকে ঘিরেই তাঁর জীবনে নারীপ্রেম সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা করা যায়। এবং ধারণা করা যায় যে, এরই পরিণতিতে তিনি হায় চিল নামের কবিতাটি লিখে থাকতে পারেন, এবং আমার সকল গান তবু তোমারেই লক্ষ্য করে- বলে তাঁর ভালবাসার চূড়ান্ত অভিব্যক্তি ঘটান। আশৈশব তিনি জলসিড়ি বিশালাক্ষীর তীরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন- আমার মতন আর নাই কেহ! আমার পায়ের শব্দ শোনো- নতুন এ- আর সব হারানো- পুরনো। যেহেতু তিনিই কেবল ঘাইহরিণীর প্রতি অপার মমতা হেতু একদিন ক্যাম্পে লিখে গভীর সমালোচিত হন; নির্জন খড়ের মাঠে পৌষ সন্ধ্যায় হেঁটে হেঁটে রচনা করেন বাঙালির পরিভাষা- রূপসী বাংলার কথামালা। সেই হেতু এই মহাপৃথিবীতে যার যেখানে সাধ চলে গেলেও তিনি এই বাংলার ’পরেই আমৃত্যু থেকে যেতে অভিলাষী হন। আবার বছর কুড়ি পরে- হারানো মানুষীর সাথে দেখা হয়ে গেলে- এই কাশ-হোগলার মাঠের ভেতরেই যেন দেখা যায় তারে- অথবা হাওয়ার রাতে- এশিরিয়ায়, মিশরে-বিদিশায় মরে যাওয়া রূপসীরা যখন এই বাংলার আকাশে কাতারে কাতারে নক্ষত্রের সমুজ্জ্বল সংসার রচনা করে- তেমনি তারার তিমিরে। আবার আট বছর আগের একদিন- কল্পনার নক্ষত্রচূড়ায় এক মৃতের গল্প রচনা করে বলেন- তবু জানি- নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ-নয় সবখানি;- অর্থ নয় কীর্তি নয় সচ্ছলতা নয়- আরো এক বিপন্ন বিস্ময়- আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে- খেলা করে;- আমাদের ক্লান্ত করে- ক্লান্ত- ক্লান্ত করে। জীবনানন্দ দাশ নিশিথের অন্ধকারে সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে ঘুরে ঘুরে জীবনের প্রতিটি ক্ষণ বিবেচনা করে বলেন- ভালবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে… ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে… উপেক্ষা সে করেছে আমারে- অথবা জীবনানন্দ দাশ তাঁর সমগ্র অধ্যাপনা ও সম্পাদনা জীবনের প্রগাঢ় বেদনাময় মুহূর্তে নিতান্ত দুঃখভারাক্রান্ত মনে তাঁর কিছু উৎকৃষ্ট রচনার নামকরণ ধূসর পাণ্ডুলিপি করে অনায়াসে পাড়ি দেন বাংলা কবিতার ঊষর উদ্যান। একবার খুঁজতে খুঁজতে নক্ষত্রতিমিরে- জানি না সে এইখানে শুয়ে আছে কিনা- বলে যখন সরোজিনীর অবস্থান নির্ণয়ে একপ্রকার ধোঁয়াশায় পতিত হন- আত্মাভিমানে নিজেও ঝরা পালকের মতো ঝরে যেতে চান শুকনো পাতা ছাওয়া ঘাসে- জামরুল হিজলের বনে- কিংবা নক্ষত্র সকাশে। যেহেতু তাঁর ট্রামের নিচের জীবন এমনই ইশতেহার রচনা করেছে যে, যে জীবন দোয়েলের শালিখের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা- ফলে, কার্তিকের নরম নরম রোদে- এক পায়ে দাঁড়িয়ে এক সাদা বক- এই দৃশ্য দেখে ফেলে যে, আমাদের নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশ- এবার মানুষ নয়, ভোরের ফড়িং তারে দেখা যায়- উড়ে উড়ে খেলা করে বাংলার মুখর আঙিনায়-

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close