Home বিশ্বসাহিত্য ওরহান পামুক-এর সাক্ষাৎকার / “আমার মাথার কোনো একটি স্ক্রু ঢিলা ছিলো…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

ওরহান পামুক-এর সাক্ষাৎকার / “আমার মাথার কোনো একটি স্ক্রু ঢিলা ছিলো…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

প্রকাশঃ March 16, 2017

ওরহান পামুক-এর সাক্ষাৎকার / “আমার মাথার কোনো একটি স্ক্রু ঢিলা ছিলো…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম
0
0

পর্ব-২

 

তরুণ বয়সে আপনি চিত্রকর হতে চেয়েছিলেন। চিত্রশিল্পের ভালোবাসা কখন লেখালেখিতে পরিবর্তিত হলো?

বাইশ বছর বয়সে। আমি সাত বছর বয়স থেকে চিত্রশিল্পী হতে চাইতাম। আমার পরিবারও তাতে সমর্থন দিয়েছিলো। তারা সবাই ভেবেছিলো, আমি একজন বিখ্যাত চিত্রকর হবো। তারপর হঠাৎ কী যেন ঘটলো আমার মাথার ভেতর। আমার মনে হলো, আমার মাথার কোনো একটি স্ক্রু ঢিলা ছিলো। আমি আমার ছবি আঁকা বন্ধ করে দিলাম এবং প্রথম উপন্যাস লেখা শুরু করে দিলাম।

 

স্ক্রু ঢিলা ছিলো?

এমনটা করার পেছনে কী কারণ ছিলো আমি বলতে পারবো না। সম্প্রতি ইস্তাম্বুল নামে আমার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর অর্ধেকটা জুড়ে আমার আত্মজীবনী এবং বাকি অর্ধেকটা ইস্তাম্বুলের বর্ণনা; অথবা আরো সংক্ষেপে বলা যায়, ইস্তাম্বুল নিয়ে একটি শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি মনে হয় এতে প্রকাশিত হয়েছে। এটি ছিলো নানান দৃশ্য আর নানান জায়গার বা ভূদৃশ্য আর একটি শহরের মিথস্ক্রিয়াধর্মী ভাবনার সংমিশ্রণ। এটি একটি শিশুর আত্মজীবনী, একটি শহর সম্পর্কে শিশুর ভাবনা। শেষ বাক্যটি ছিলো এরকম : আমি বললাম, আমি চিত্রশিল্পী হতে চাই না। আমি একজন লেখক হতে চাই। এই বিষয়টি আর ব্যাখ্যা করা হয়নি। যদিও পুরো বইটি পড়লে কিছু ব্যাখ্যা হয়তো পাওয়া যেতে পারে।

 

এই সিদ্ধান্তে আপনার পরিবার খুশি হয়েছিলো?

আমার মা হতাশ হলেন। আমার বাবা বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন, কারণ তরুণ বয়সে তিনি কবি হতে চেয়েছিলেন এবং ভ্যালেরির কবিতা তুর্কী ভাষায় অনুবাদও করেছিলেন। অবশ্য পরে যখন তার চারপাশের অভিজাত শ্রেণির মানুষেরা এ নিয়ে উপহাস করেছিলেন, তখন তিনি লেখালেখিটা ছেড়ে দেন।

 

চিত্রকর হওয়ার বিষয়ে সমর্থন থাকলেও ঔপন্যাসিক হওয়ার বিষয়ে সমর্থন ছিলো না?

হ্যাঁ। কারণ তারা আমাকে ফুল-টাইম চিত্রকর হিসেবে ভাবেননি। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়াটাই ছিলো আমাদের পারিবারিক রীতি। আমার দাদা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এবং তিনি রেলওয়ে সড়ক নির্মাণ করে অনেক উপার্জনও করেছিলেন। আমার বাবা ও চাচা একই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (ইস্তাম্বুল টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি) পড়েছিলেন, যদিও তারা দাদার টাকাপয়সা ধরে রাখতে পারেননি। সেখানে আমাকেও পাঠানোর প্রত্যাশা ছিলো, এবং আমি বলেওছিলাম,  আমি যাবো। কিন্তু আমি যেহেতু পরিবারের চিত্রশিল্পী ছিলাম, সবার এই ধারণা ছিলো যে, আমাদের একজনের আর্কিটেক্ট হওয়া উচিৎ। এটাই সবার জন্যে একটি সন্তোষজনক সমাধান ছিলো। সুতরাং আমি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম এবং পড়াশোনা করার মাঝামাঝি সময়ে আমি আঁকাআঁকি ছেড়ে দিলাম। শুরু করলাম উপন্যাস লেখা।

 

আপনি যখন আঁকাআঁকি ছেড়ে দিলেন, তখন কী আপনার মাথায় প্রথম উপন্যাসটি লেখার ভাবনা কাজ করছিল? এজন্যই কি আঁকাআঁকি ছেড়ে দিয়েছিলেন?

আমার যতদূর মনে পড়ে, আমি কী লিখবো তা ভাবার আগেই ঔপন্যাসিক হতে চেয়েছিলাম। মূলত, আমি যখন লেখা শুরু করেছিলাম, তখন দু-তিনটি খসড়া করেছিলাম। এখনো আমার কাছে নোটবুকটা রয়ে গেছে। এর মাস ছয়েক পরেই আমি একটা উপন্যাসের প্রকল্প হাতে নিলাম। এই বইটিই পরবর্তীকালে ‘সেভডেট অ্যান্ড হিজ সন্স’ নামে প্রকাশিত হয়।

 

সেটি কি ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছিল?

এর গল্পটা ছিলো পারিবারিক একটা কাহিনি। অনেকটা Forsyte Saga অথবা থমাস মানের Buddenbroo এর মতো। শেষ করার পর খুব দ্রুতই আমি খুব আত্মপীড়ন অনুভব করলাম এই ভেবে যে, আমি ঊনিশ শতকের আদলে খুব সেকেলে একটা কিছু লিখে ফেলেছি। এভাবে লিখে আমি খুবই অনুতপ্ত অনুভব করলাম, কারণ আমি পঁচিশ বা ছাব্বিশ বছর বয়স থেকে নিজেই এই ধারণা লালন করতে থাকি যে, আমাকে একজন আধুনিক লেখক হতে হবে। এর মাঝেই ওই উপন্যাসটি চুড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়ে যায়। আমার বয়স যখন ত্রিশ, তখন আমার লেখা আরও অনেক বেশি নিরীক্ষাধর্মী হয়ে ওঠে।

 

আপনি বলেছেন, আপনি আরো আধুনিক ও নিরীক্ষাধর্মী লেখক হতে চান। এজন্য আপনি কাউকে আদর্শ হিসেবে মানেন কি?

ওই সময়ে, তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, স্তাঁদাল, বা থমাস মানের মতো বড় লেখকরা খুব বেশি দিন আমার আদর্শ হয়ে থাকেননি। আমার আদর্শ ছিলেন ভার্জিনিয়া উলফ ও ফকনার। এই তালিকায় এখন যোগ হয়েছেন প্রুস্ত ও নবোকভ।

 

আমি আপনার ‘দ্য নিউ লাইফ’ বইটা পড়লাম এবং আমার সম্পূর্ণ জীবন বদলে গেল। এরকম কোনো বইয়ের প্রভাব কি আপনার উপর কখনো পড়েছিল?

আমার বয়স যখন একুশ কী বাইশ, তখন ‘দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি’ বইটি আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। আমি এর পেঙ্গুইন সংস্করণের একটি কপি কিনেছিলাম। বইটা খুবই দুর্বোধ্য ছিলো, বিশেষ করে আমার দুর্বল ইংরেজির কারণে এর অনেক কথাই বুঝতে পারিনি। কিন্তু তুর্কী ভাষায় বইটির দারুণ একটি অনুবাদ ছিলো। আমি বই দুটিকে পাশাপাশি রেখে একটা বইয়ের অর্ধেক প্যারা পড়ে অন্যটিতে চলে যেতাম। এইভাবে এ-বই ও-বই করে বইটার মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করেছিলাম। বইটি আমার মনে প্রচণ্ড দাগ কেটেছিলো। এই বইটির প্রভাবে আমার নিজের লেখার স্বর গড়ে উঠলো। এর পরপরই আমি উত্তম পুরুষে লিখতে শুরু করি। আমি আসলে নাম-পুরুষে লেখার চাইতে অন্য চরিত্র হয়ে লিখতে পছন্দ করি।

 

আপনি বলেছিলেন, আপনার প্রথম উপন্যাস প্রকাশ পেতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগে যায়?

আমার বিশ বছর বয়স পর্য়ন্ত ইস্তাম্বুলে আমার কোনো সাহিত্যিক বন্ধু ছিলো না, এমনকি আমি কোনো সাহিত্য সংগঠনের সাথেও জড়িত ছিলাম না। আমার প্রথম বই প্রকাশের একমাত্র উপায় ছিলো তুর্কি কোনো সাহিত্য  প্রতিযোগিতায় পাণ্ডলিপি জমা দিয়ে বই বের করার পদক্ষেপ নেওয়া। আমি সেটাই করেছিলাম এবং পুরস্কারও পেয়েছিলাম। পুরস্কারপ্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিটা বড় একটি ভালো প্রকাশনা সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিলো। ওই সময় তুরস্কের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিলো। প্রকাশনা সংস্থাটি বলেছিল, তারা আমার সাথে চুক্তি করবে। কিন্তু তারা বইটা প্রকাশ করতে দেরি করে ফেলে।

 

আপনার দ্বিতীয় উপন্যাসটি কি আরো সহজে, আরো দ্রুত প্রকাশিত হয়েছিলো?

পরের বইটা ছিলো একটি রাজনৈতিক বই। তবে এতে কোনো প্রোপাগান্ডা ছিলো না। যখন আমার প্রথম বইটি প্রকাশের অপেক্ষায়, তখন আমি এটি লিখেছিলাম। আমি বইটি লেখার জন্যে আড়াই বছর সময় নিই। হঠাৎ এক রাতে মিলিটারি ক্যু হলো, এটি ছিলো ১৯৮০ সালের কথা। যে প্রকাশনী থেকে ‘সেভডেট বে’ বইটি প্রকাশের কথা ছিলো, ক্যুর পরে জানানো হল, চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বইটি তারা প্রকাশ করবে না। আমি বুঝতে পারি, যদিও আমি দ্বিতীয় বইটি লেখার কাজ শেষ করেছি, পরবর্তী পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে এই বইটিও প্রকাশিত হবে না। কারণ, বইটি ছিলো রাজনৈতিক এবং সেনাশাসিত সরকার এটি কখনও প্রকাশের অনুমতি দেবে না। সুতরাং আমার মধ্যে এই ভাবনাটাই ভর করলো যে বাইশ বছর বয়সে মনে করেছিলাম ঔপন্যাসিক হতে চলেছি, সাত বছর ধরে তুর্কি ভাষায় বই প্রকাশের আশায় লিখে গেলাম, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। ওই সময়ে আমার বয়স ত্রিশের কোঠায় এবং দেখলাম কিছু প্রকাশের আর সম্ভাবনা নেই। বরং দুশো পঞ্চাশ পৃষ্ঠার একটি রাজনৈতিক উপন্যাস আমার ড্রয়ারে পড়ে আছে। কিন্তু এরকম অবস্থাতেও আমি হতাশ হতে চাইনি, তাই মিলিটারি ক্যুর পরপরই আমি আমার তৃতীয় বইটি লেখার কাজ শুরু করলাম। এই বইটিই ‘দ্য সাইলেন্ট হাউজ’ নামে আপনাদের হাতে এসেছে। ১৯৮২ সালে বইটি লেখার সময়ই আমার প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়। সেভডেট খুব ভালোভাবেই সাড়া ফেলেছিলো, এবং তখনই আমি আমার যে বইটি লিখছিলাম, সেটি প্রকাশিত হয়। এই অর্থে আমার লেখা তৃতীয় বইটি প্রকাশকালের দিক থেকে দ্বিতীয় ছিলো।

 

সামরিক শাসনকালে আপনার বই প্রকাশের বেলায় কী ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছিল?

চরিত্রগুলো ছিল অভিজাত শ্রেণির মার্কসবাদী তরুণ। তাদের বাবা-মায়েরা গ্রীষ্মকালীন অবকাশে চলে যায়, তারা সুবিশাল ফাঁকা বাড়ি পেয়ে মার্কসবাদী হওয়াটা উপভোগ করতে থাকে। যদিও তারা পরস্পরকে ঈর্ষা করতো, লড়াই করতো, সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের ষড়যন্ত্র করতো।

 

এরা কি সংঘবদ্ধ বিপ্লবী ছিলো?

অভিজাত জীবনযাপনে অভ্যস্ত তরুণরা প্রগতিশীলতার ভান করতো। আমি তাদেরকে নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করে উপস্থাপন করিনি। আমি বরং এর মধ্য দিয়ে তারুণ্যের ভাবালুতায় নিমগ্ন হয়েছি। প্রধানমন্ত্রীকে বোমা মারার যে ধারণার কথা বইটাতে ছিল, তাতেই আমার বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তাই আমি লেখাটআ শেষ করিনি। মনে রাখবেন, কেউ যখন বই লেখে, তখন প্রয়োজনে তাকে রদবদল করতে হয়। আপনি বারবার একই চরিত্রের অবতারণা করতে পারবেন না। আপনি একইভাবে লিখে যাবেন, তা হবে না। একজন লেখক তার লেখার উন্নতির সাথে সাথে একেকটি বিশেষ সময়কে তুলে ধরেন। লেখকের লেখাগুলোকে তাই তার আত্ম-আকাঙ্ক্ষার ক্রমোন্নতির মাইলফলক হিসেবে দেখা যেতে পারে। ফলে আপনার পেছনে ফেরার কোনো উপায় থাকবে না। একবার গল্পের প্রবাহমানতা হারিয়ে গেলে আপনি সেটিকে আর গতি দিতে পারবেন না।

 

আপনি যখন কোনো ধারণার উপর নিরীক্ষা চালান, তখন আপনার উপন্যাসের ফর্মটা কিভাবে বেছে নেন? প্রথম বাক্যটি কি আপনি কোনো দৃশ্যকল্প দিয়ে শুরু করেন?

এর কোনো স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম নাই। কিন্তু আমি একটি কাজ করি, আমার দুটি উপন্যাস একই মেজারের যেন না হয়। আমি সবকিছুতেই পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করি। এজন্যই আমার অনেক পাঠক বলে থাকেন, আমি আপনার অমুক বইটির খুব ভক্ত, কিন্তু যখন বলা হয় আপনি ওই বইটার মতো আর কোনো বই লেখেননি, তখন ব্যাপারটা লজ্জাজনক হয়ে দাঁড়ায়। অথবা এমনটা যখন বলা হয়, আপনার অমুক বইটি পড়ার আগ পর্যন্ত আমি আপনার অন্য কোনো বই উপভোগ করতে পারিনি। এরকম কথা আমি ‘দ্য ব্ল্যাক বুকে’র ক্ষেত্রেই বেশি শুনেছি। বস্তুত, এরকম কথা শুনতে খুবই অপছন্দ করি আমি। একই সাথে প্রকরণ ও এর বিন্যাস, ভাষা, চরিত্র ও আবহের সঙ্গে বইয়ের ভিন্নতা রক্ষা করে নিরীক্ষা চালানোটাও বেশ মজার এবং চ্যালেঞ্জিংও বটে। একটি বইয়ের বিষয়বস্তু আমার কাছে উঠে আসতে পারে বিভিন্ন উৎস থেকে। ‘মাই নেম ইজ রেড’ উপন্যাসটি আমি আমার চিত্রকর হওয়ার বাসনা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। এর শুরুটা ছিলো কল্পিত। আমি একজন চিত্রশিল্পীকে দিয়ে একটা চিত্রশিল্পের বই লিখবে- এভাবে কাহিনিটা দাঁড় করাতে চাইলাম। এরপর আমি আমার ভাবনাকে একজন চিত্রকর থেকে চিত্রশালায় কাজ করা আরও অনেক চিত্রকরের মধ্যে প্রোথিত করলাম। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটলো, কারণ সেখানে আরো চিত্রকর কথা ছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম, একজন সমকালীন চিত্রকরকে নিয়ে কাহিনিটা দাঁড় করাবো, কিন্তু পরে মনে হলো এই চিত্রকর পাশ্চাত্যের দ্বারা প্রভাবিত কেউ হতে পারেন, যার মৌলিক কোনো কাজ নেই। তাই আমি তখনই ফিরে গেলাম আরো নবিস চিত্রশিল্পীদের দিকে। আর এভাবেই আমি আমার বিষয়বস্তু পেয়ে গেলাম। কিছু বিষয়বস্তু আছে যেগুলো সুনিশ্চিতভাবে গল্প বলার কৌশল বা নিয়মমাফিক উদ্ভাবনাকে অপরিহার্য করে তোলে। উদাহরণ স্বরূপ, মাঝে-মধ্যে আপনি কিছু দেখলেন, কিছু পড়লেন, অথবা একটি মুভি দেখলেন, অথবা পত্রিকার নিবন্ধ পড়লেন, এবং এরপর হয়তো ভাবলেন, একটি আলুকে দিয়ে, অথবা একটি কুকুরকে দিয়ে কিংবা একটি গাছকে দিয়ে কথা বলাবেন। একবার আপনি বোধটা পেয়ে গেলে উপন্যাসের অঙ্গসৌষ্ঠব ও ধারাবাহিকতা নিয়ে ভাবতে পারবেন। তখনই আপনার মনে হবে, দারুণ তো, এমনটা আগ কেউ ভাবেনি। এভাবেই লেখার বিষয় নিয়ে আমি বছরের পর বছর চিন্তা করি। হয়তো একটা কিছু আমার মাথায় এলো, আমি কাছের বন্ধুদের সঙ্গে সেটা শেয়ার করি। আমি যেসব উপন্যাস লিখবো, সে-সবের জন্যে পর্যাপ্ত নোট রাখি। মাঝে-মাঝে যা নিয়ে লেখা হয় না আমি নোটবুক খুলে সেই নোটগুলা দেখি এবং সেগুলো এমনভাবে টুকতে শুরু করি যেন আমি তা দিয়েই উপন্যাস লিখে উঠতে পারি। সুতরাং আমি যখন একটা উপন্যাস শেষ করি আমার আত্মাটা পড়ে থাকে সেই নোটের মধ্যে এবং একটি উপন্যাস শেষ হবার দুই মাসের মধ্যে আরেকটি উপন্যাস লেখা শুরু করে দিই।

 

অনেক ঔপন্যাসিক তাদের উপন্যাসের অগ্রগতি নিয়ে কথা বলেন না। আপনিও কি এটি গোপন রাখতে চান?

গল্পটা আমি কখনোই আলোচনা করি না। আনুষ্ঠানিক মুহূর্তগুলোতে যখন লোকজন জানতে চায় কী লিখছি, আমার একটি তৈরি করা বাধা বুলি আছে : সমকালীন তুরস্ক সম্পর্কে লিখছি। আমি খুব কম লোকের কাছেই সেসব বলি এবং তখনই বলি যখন আমি বুঝতে পারি তারা আমাকে আঘাত করবে না। আমি যা করি তা হচ্ছে, আমি তাদের সাথে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে মনভোলানো গল্প (গিমিক) করি, যেমন ধরুন, আমি এক টুকরো কথা-বলা মেঘ তৈরি করতে যাচ্ছি। আমি দেখতে চাই লোকেরা সেগুলোর প্রতি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়। ইস্তাম্বুল লেখার সময় আমি এমনটা বহুবার করেছি। আমার মন অনেকটা সেই ক্রীড়ারত ছোট্ট শিশুর মতো যে তার বাবাকে দেখাতে চেষ্টা করে সে কতোটা বুদ্ধিমান।

 

গিমিক শব্দটির একটি নেতিবাচক অর্থ রয়েছে।

আপনি গিমিক দিয়ে শুরু করবেন, কিন্তু যদি আপনি এর সাহিত্য ও নৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বাসী হন তাহলে তা গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক উদ্ভাবন হয়ে উঠতে পারে।

 

সমালোচকরা সবসময়ই আপনার উপন্যাসকে উত্তরাধুনিক হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। যাই হোক, আমার কাছে মনে হয়, বর্ণনার প্রাথমিক কৌশল আপনি ঐতিহ্যগত উৎস থেকেই গ্রহণ করেন। উদাহরণ স্বরূপ, আপনি থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান নাইটস এবং প্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী অন্যান্য ক্লাসিকস থেকে উদ্ধৃত করেন।

এর শুরু হয় ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’ দিয়ে। যদিও আমি আগেই বোর্হেস ও ক্যালভিনো পড়েছিলাম। আমি আমার স্ত্রীর সাথে ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। তখনই প্রথম আমি আমেরিকান সংস্কৃতির অপরিমেয় বিশালতা ও প্রাচুর্য সম্পর্কে অবহিত হই। মধ্যপ্রাচ্য আর তুরস্ক থেকে আসা একজন মানুষ হিসেবে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে গিয়ে বিচলিতবোধ করি। সুতরাং আমি আমার শেকড়ে প্রত্যাবর্তন করি। আমি উপলব্ধি করি, আমার প্রজন্মকে তুরস্কের একটি আধুনিক জাতীয় সাহিত্য ধরনের কিছু উদ্ভাবন করতে হবে। বোর্হেস ও কালভিনো আমাকে এই ধারণা থেকে মুক্তি দেয়। ইসলামিক সংস্কৃতি ছিলো এতো বেশি প্রতিক্রিয়াশীল, এতো বেশি রাজনৈতিক এবং রক্ষণশীলদের দ্বারা এতো বেশি সেকেলে, নির্বোধ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত, সেসব উপাদান দিয়ে কিছু করার কথা আমি ভাবিনি। কিন্তু একবার আমি যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় উপলব্ধি করলাম যে, আমাকে সেইসব উপাদানের কাছেই ফিরে যেতে হবে আর ব্যবহার করতে হবে বোর্হেসীয় ও ক্যালভিনীয় মানসিক কাঠামো দিয়ে। এ জন্যে আমাকে ধর্মীয় আর সাহিত্য সম্বন্ধীয় ভাবার্থগুলোকে আলাদা করে নিতে হয়েছে, যাতে আমি উপকরণের প্রাচুর্য, গিমিক আর প্যারাবলগুলোকে যথাযথ করে তুলতে পারি। বিশুদ্ধতম আলঙ্কারিক সাহিত্যের খুব উঁচুদরের ঐতিহ্য তুরস্কের ছিল। কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে যারা লিখছিলেন, তারা এই উদ্ভাবনী বিষয়টাকে শূন্য করে ফেলেছিল।

আামদের অনেক রূপক রয়েছে যেগুলো চীন, ভারত এবং পারস্যে মুখে মুখে প্রচলিত গল্পের ঐতিহ্যে পুনরাবৃত্ত হয়। আমি সেগুলোকেই ব্যবহার করতে চেয়েছি এবং সমকালীন ইস্তাম্বুলে সেই গল্পগুলোকে প্রতিস্থাপন করেছি। এটা ছিল একধরনের নিরীক্ষা – দাদাবাদীদের মতো সবকিছু মিশেয়েই লেখা যায়। দ্য ব্ল্যাক বুকের এটাই বিশিষ্টতা। কিন্তু এর উৎস ছিলো মার্কিন সংস্কৃতি এবং আমার গভীরতম নিরীক্ষাধর্মী একজন লেখক হবার বাসনা। আমি তুরস্কের সমস্যা নিয়ে সামাজিক বর্ণনা উপস্থাপন করতে পারিনি – এ নিয়ে আমি ভীত ছিলাম।  সুতরাং আমাকে অন্যরকম কিছু চেষ্টা করতে হয়েছে।

[চলবে]

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close