Home বিশ্বসাহিত্য ওরহান পামুক-এর সাক্ষাৎকার [চতুর্থ ও শেষ পর্ব] / “স্বপ্নময় কর্ম সম্পাদন, অর্থাৎ লেখালেখির জন্য আমার প্রয়োজন বেদনাদায়ক একাকীত্ব…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

ওরহান পামুক-এর সাক্ষাৎকার [চতুর্থ ও শেষ পর্ব] / “স্বপ্নময় কর্ম সম্পাদন, অর্থাৎ লেখালেখির জন্য আমার প্রয়োজন বেদনাদায়ক একাকীত্ব…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

প্রকাশঃ April 22, 2017

ওরহান পামুক-এর সাক্ষাৎকার [চতুর্থ ও শেষ পর্ব] / “স্বপ্নময় কর্ম সম্পাদন, অর্থাৎ লেখালেখির জন্য আমার প্রয়োজন বেদনাদায়ক একাকীত্ব…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম
0
0

শেষ পর্ব

“আমি বিশ্বাস করি, লেখকদের স্থায়িত্ব খুব কম। দুশো বছর আগের লেখা বই এখন আমরা খুব একটা পড়ি না। সবকিছু এতো দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে যে, আজকের লেখা বই সম্ভবত একশো বছর পর হারিয়ে যাবে। পড়া হবে খুব কম। হয়তো দেখা যাবে দুশো বছর পর আজকের লেখা পাঁচটি বই বেঁচে থাকবে। আমি কি নিশ্চিত হতে পারি যে আমি সেরকম পাঁচটি বইয়ের একটাও লিখেছি?”

 

তো ‘স্নো’ উপন্যাসটি প্রকাশের পর কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো?

তুরস্কের রক্ষণশীল ও পলিটিক্যাল ইসলামিস্টরা এমনকি সেক্যুলাররাও হতাশ হয়েছিলো। তারা হতাশ হয়ে বইটি সম্পর্কে লিখেছিলো। তবে বইটি নিষিদ্ধ করা কিংবা আমাকে আঘাত করার উদ্দেশ্য তাদের ছিলো না। সেক্যুলাররা ক্ষুব্ধ হয়েছিলো কারণ, আমি লিখেছিলাম – তুরস্কে সেক্যুলার হতে চাইলে আপনাকে ভুলে যেতে হয় যে গণতন্ত্রপন্থী হতে পারবেন না। তুরস্কে সেক্যুলাররা ক্ষমতা পেয়েছেন সেনাবাহিনীর কাছ থেকে। এটা তুরস্কের গণতন্ত্র ও সংস্কৃতির সহনশীলতাকে ধ্বংস করেছে। একবার যদি আপনি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে ফেলেন, সাধারণ মানুষ তাদের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে এবং তাদের সব সমস্যা সমাধানের জন্য সেনাবাহিনীর উপর নির্ভর করবে। সাধারণ মানুষ সচারচর বলে থাকে, দেশ এবং অর্থনীতি জঞ্জালে ভরে গেছে, সুতরাং সেনাবাহিনী ডেকে এনে এসব জঞ্জাল দূর করা হোক। কিন্তু সেনাবাহিনি যেমন জঞ্জাল দূর করেছে, তেমনি রাজনৈতিক সহনশীলতাও বিনষ্ট করে দিয়েছে। অসংখ্য সন্ধেহভাজন মানুষ অত্যাচারের শিকার হয়েছেন, লক্ষাধিক লোক জেল খেটেছেন। এভাবে আবার নতুন সেনা অভ্যুত্থানের পথ তৈরি করেছে। প্রায় প্রতি দশ বছরে অন্ততপক্ষে  একটি নতুন সেনা অভ্যুত্থান হয়েছে। এ কারণেই আমি সেক্যুলারিস্টদের সমালোচক ছিলাম। আমি ইসলামপন্থীদের মানুষ হিসেবে দেখেছি, এটাও পছন্দ করেননি তারা। রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরাও বইটি পছন্দ করেননি, কারণ আমি এমন একজন ইসলামপন্থীকে নিয়ে লিখেছি যিনি বিয়ের আগেই যৌনকর্মে জড়িয়ে পড়েছিল। যৌনতাকে উপভোগ করেছিল। এটি ছিলো সাদামাটা একটা বিষয়। ইসলামপন্থীরা আমার ব্যাপারে সবসময়ই সন্ধেহপ্রবণ, কারণ আমি তাদের সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে উঠে আসিনি। তাছাড়া আমার ভাষা, আচরণ, চালচলন সবকিছু ছিলো পশ্চিমা সুবিধাভোগীদের মতো। তারা নিজেরাই তাদের নিজেদেরকে তুলে ধরার ব্যাপারে সমস্যায় আক্রান্ত হতো এবং প্রশ্ন তুলতো – আমি কীভাবে তাদের নিয়ে লিখি? আমি যেন কিছুই বুঝি না। এই বিষয়গুলিও আমি আমার বইয়ের বিভিন্ন অংশে উল্লেখ করেছি। আমি কখনো বাড়াবাড়ি করতে চাই না। আমি টিকে গিয়েছিলাম। তারা সবাই আমার বই পড়েছিলো। তারা হয়তো ক্ষুব্ধ হয়েছিলো আমার উপর, কিন্তু এটি ক্রমবর্ধমান উদারনীতির  একটি ভালো লক্ষণ যে তারা তাদের মতো করে আমাকে এবং আমার বইকে মেনে নিয়েছে। কার্সের লোকেরাও পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলো। কেউ কেউ বললো, হ্যাঁ, এভাবে লেখাটাই ঠিক আছে। অন্যরা, বিশেষ করে তুর্কি জাতিয়তাবাদীরা আর্মেনিয়ার কথা থাকায় বিচলিত হয়ে পড়েছিলো। সেই টিভি সমন্বয়কের কথা বলা যেতে পারে, আমার বইটিকে তিনি একটি প্রতিকী কালো ব্যাগে ঢুকিয়ে আমার কাছে পাঠালেন এবং একটা সংবাদ সম্মেলনে বললেন, আমি নাকি আর্মেনীয়দের হয়ে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছি। তার এই ধারণা অবশ্য একেবারেই ভ্রান্ত ছিলো। এরকম হচ্ছে আমাদের সংকীর্ণ জাতিয়তাবাদী সংস্কৃতি।

 

রুশদির বইয়ের মতো এই বইটি নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়েছিলো কি?

না, মোটেও হয়নি।

 

এটি তো চরম আনন্দহীন ও নৈরাশ্যবাদী উপন্যাস। এই উপন্যাসের একমাত্র ব্যক্তি- ‘ক’, যে সবার কথা শোনে এবং সবশেষে সে সবার অবজ্ঞার শিকার হয়।

তুরস্কে একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে আমি সম্ভবত আমার অবস্থান কিছুটা নাটকীয় করে ফেলেছি। যদিও ‘ক’ জানে সে সবার অবজ্ঞার শিকার হচ্ছে, তবু সে সবার সাথে কথোপকথন চালিয়ে যাওয়ার ব্যপারটা উপভোগ করে। তার টিকে থাকারও শক্তিশালী প্রবৃত্তি আছে। ‘ক’ সকলের অবজ্ঞার শিকার হয় কারণ সবার ধারণা, সে পশ্চিমের গুপ্তচর। এই ব্যাপারগুলোই মূলত বিভিন্ন সময়ে আমার বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। নিরানন্দ ব্যাপারটা নিয়ে আমি একমত। কিন্তু এতে হিউমারও আছে। লোকজন যখন একে নিরস একটা গ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত করে, আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করি, এতে কি ব্যঙ্গ নেই? হাস্যরস নেই? এটি তো হাস্যরসে ঠাসা। অন্তত সেটাই তো আমার উদ্দেশ্য- হাস্যরসের মধ্য দিয়ে মূল কথাটা বলা।

কথাসাহিত্যের প্রতি আপনার দায়বদ্ধতা আপনাকে অসুবিধায় ফেলেছে। চরম আবেগী যোগসূত্রের কথা বলছি, এটা সম্ভবত আপনার জন্য আরো সমস্যা তৈরি করবে। এর জন্যে আপনাকে হয়তো চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।

হ্যাঁ, কিন্তু এটি একটি চমৎকার ব্যাপারও। যখন আমি ভ্রমণে থাকি, এবং আমার ডেস্কে একাকী থাকি না, তখন কিছু সময় যেতেই আমি বিষণ্ণ হয়ে পড়ি। আমি যখন রুমে একা থাকি এবং কিছু আবিষ্কার করবো বলে ভাবি, চিন্তা করি, তখনই সুখী বোধ করি। শিল্পের প্রতি কিংবা শিল্পের কৌশলের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেও আমি একাকীত্বের প্রতি দায়বদ্ধ, আসক্ত। এই সূত্রটাকে একধরনের বিশ্বাস নিয়ে চালিয়ে যাই যে, আমি এখন যা করছি, তা একদিন আমার দিবাস্বপ্নকে নায্যতা দিয়ে বই হিসেবে প্রকাশিত হবেই। কিছু লোকের যেমন সুস্বাস্থ্যের জন্য ওষুধের দরকার হয়, আমারও তেমনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিঃসঙ্গ হয়ে ভালো কাগজ আর কলম নিয়ে ডেস্কে থাকা প্রয়োজন। এই বিষয়টার প্রতি আমি দায়বদ্ধ।

 

তাহলে আপনি কার জন্য লেখেন?

জীবন ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে, আর তাই এই প্রশ্নটি আপনি নিজেকে প্রায়ই করতে পারেন। আমি এখন অব্দি সাতটি উপন্যাস লিখেছি এবং মৃত্যুর আগে আরো সাতটি উপন্যাস লিখে যেতে চাই। কিন্তু তারপরেও, জীবন তো ছোট। এটিকে আরো বেশি কীভাবে উপভোগ করা যায়, তাও ভাবি? মাঝে মাঝে সত্যিই আমার নিজের উপর নিজের শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। ভাবি, আমি এসব কী করছি? এসবের অর্থ কী? আমি আগেই বলেছি, প্রথমত, আমার একা থাকার ইচ্ছেও একধরনের ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি। দ্বিতীয়ত, বাল্যকালের সেই প্রতিযোগিতার মতোই আমার আরো একটি ভালো বই লিখতে ইচ্ছে করে। আমি বিশ্বাস করি, লেখকদের স্থায়িত্ব খুব কম। দুশো বছর আগের লেখা বই এখন আমরা খুব একটা পড়ি না। সবকিছু এতো দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে যে, আজকের লেখা বই সম্ভবত একশো বছর পর হারিয়ে যাবে। পড়া হবে খুব কম। হয়তো দেখা যাবে দুশো বছর পর আজকের লেখা পাঁচটি বই বেঁচে থাকবে। আমি কি নিশ্চিত হতে পারি যে আমি সেরকম পাঁচটি বইয়ের একটাও লিখেছি? লেখার কি এটাই অর্থ? দু’শো বছর পরে আমার লেখা কেউ পড়বে কিনা, সেই জন্য কি আমি দুঃখবোধ করবো? আমার কি আরো বেশিকাল বেঁচে না থাকার জন্যে দুঃখিত হওয়া উচিত নয়? আমার কি এই সান্ত্বনার দরকার আছে যে আমি ভবিষ্যতে পঠিত হবো, সুতরাং এখন লিখে যাই? আমি এসব কথা ভাবি আর লিখেও যাচ্ছি। আমি জানি না, কেনো। কিন্তু আমি কখনোই হাল ছাড়িনি। যে কারও বই ভবিষ্যতেও কার্যকরভাবে টিকে থাকবে, এমন বিশ্বাসই আপনার জীবনে সুখী হওয়ার একমাত্র সান্ত্বনা বলে আপনি মনে করতে পারেন।

 

আপনি তুরস্কে একজন বেস্ট-সেলিং লেখক। কিন্তু বিদেশের তুলনায় আপনার দেশে বিক্রি হওয়া বইয়ের সংখ্যা নগন্য। আপনার বই চল্লিশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আপনি লেখালেখির সময় কী বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাঠকের কথা ও সংখ্যা মাথায় রাখেন? এখন কি আপনি ভিন্ন শ্রেণির পাঠকের জন্য লেখেন?

আমি এ ব্যপারে সচেতন যে, আমার পাঠকশ্রেণি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এমনকি আমি যখন লেখালেখি শুরু করি, তখন আমি এক বিশাল পাঠকশ্রেণির কাছে পৌঁছতে পেরেছিলাম। আমার বাবা তার কিছু তুর্কী বন্ধুদের অনুপস্থিতিতে বলতেন, এরা শুধু জাতীয় পাঠকদের কথা ভেবে লেখে।

পাঠকের কথা ভেবে লেখালেখি করার ক্ষেত্রে একটা সমস্যাও রয়েছে – তা জাতীয়ই হোক বা আন্তর্জাতিক। এই সমস্যাটি এখন আমি এড়াতে পারি না। আমার শেষ দুটি বইয়ের গড়-পাঠক প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক। আমি আমার পাঠকদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন – একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। অন্য দিকে, আমি কখনোই ভাবি না যে, আমি পাঠকদের সন্তুষ্টির জন্য লিখছি। আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, আমি যদি এরকম করে থাকি তবে আমার পাঠকরা তা ধরে ফেলবে। সেই শুরু থেকেই আমি একটি বিষয় আমার দায়িত্ব বলে মনে করেছি – আমার পাঠকেরা যা প্রত্যাশা করছে আমিও তা-ই যেন করে যাই। এটা মনে পড়লেই আমি আমার অন্য সব ভাবনা থেকে সরে আসি। এমনকি আমার লেখার বাক্যবিন্যাসেও – আমি পাঠকদের জন্য কিছু দেয়ার প্রস্তুতি নিই, এবং তাদের চমকে দিই। সম্ভবত, একারণেই আমি দীর্ঘ বাক্যে লিখতে পছন্দ করি।

 

তুর্কী নন এরকম অধিকাংশ পাঠকের মতে, আপনার লেখার মৌলিকত্ব হচ্ছে, তাতে তুর্কী পটভূমির আধিক্য দেখা যায়। এইরকম তুর্কী পরিবেশের মধ্য দিয়ে আপনি কিভাবে আপনার কাজের মৌলিকত্ব ফুটিয়ে তোলেন?

এক্ষেত্রে একটি সমস্যা থাকে। হ্যারল্ড ব্লুম একে প্রভাবিত হওয়ার উগ্বেগ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্য সব লেখকের মতো আমারও তরুণ বয়সে এই সমস্যাটা হতো। বয়স যখন ত্রিশের ঘরে, আমার মনে হতো আমি বোধহয় তলস্তয় অথবা টমাস মানের দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত হচ্ছি। আমি তাঁদের মতো মার্জিত, অভিজাত গদ্যে আমার প্রথম উপন্যাস লিখতে চেয়েছি, যদিও তখন আমার লেখার কৌশলে মৌলিকত্ব ছিলো না। আমার কাছে সেই সময়ে মনে হতো, আমি ইউরোপ থেকে দূরে পৃথিবীর একপ্রান্তে বসে লিখছি এবং ভিন্ন একটি সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারায় একটি ভিন্ন পাঠকগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছি। আর এটাই আমার লেখাকে মৌলিকত্ব দেবে, সহজভাবে কিছু লিখলেও। কিন্তু এটি একটি কঠিন কাজও, যেহেতু এই ধরনের কৌশল খুব সহজে অনুবাদ করে ছড়িয়েও দেয়া যায় না। মৌলিকতার সূত্র খুবই সাদামাটা – দুটি জিনিসকে একত্রে রেখে দাও যা পূর্বে একত্রিত ছিলো না। ইস্তাম্বুল গ্রন্থটির দিকে তাকাও – এটি এমন একটি উপন্যাস যেখানে শহর সম্পর্কে বলা রয়েছে; শহরকে ঘিরে ফ্লবেয়ার, নেরভাল, গঁতিয়ের ভাবনা আছে; তরুণ তুর্কি লেখকেরা তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এর সঙ্গে ইস্তাম্বুলের ভূভাগের নান্দনিক সৌন্দর্যের মিথস্ক্রিয়ায় রচিত একটি আত্মজীবনী হয়েছে। এর আগে আর কেউ এভাবে লেখেনি। ঝুঁকি নিলেই আপনি নতুন কিছু নিয়ে আসতে পারবেন। আমি ইস্তাম্বুল গ্রন্থটিকে একটি মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে সৃষ্টি করতে চেয়েছি, জানিনা কতটুকু সফল হয়েছি। ব্ল্যাক বুক-ও সেই ধরনের বই যেখানে একটি নস্টালজিক প্রুস্তীয় দুনিয়ার সঙ্গে ইসলামি রূপক, গল্প ও কৌশল – এই সবকিছু ইস্তাম্বুলে ব্যবহার করেছি। দেখতে চেয়েছি কী হয়।

 

ইস্তাম্বুল গ্রন্থটি থেকে একটি বিষয় উপলব্ধি করা যায়, আপনি সব সময়ই নিঃসঙ্গ ছিলেন। আজকের আধুনিক তুরস্কে একজন লেখক হিসেবে তো অবশ্যই নিঃসঙ্গ। আপনি এমন একটি পৃথিবীতে বেড়ে উঠলেন এবং বাস করছেন, যা থেকে আপনি একেবারেই বিচ্ছিন্ন।

যদিও আমি একটা বড় পরিবারে বেড়ে উঠি এবং আমাকে সাম্প্রদায়িক ভাবনা-চিন্তার মধ্যে থাকতে হয়েছে। পরে সেই চিন্তার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসার মতো একটা সামর্থ অর্জন করি। আমার আত্মবিধ্বংসী হওয়ার মতো অনেক কিছু ছিল। উত্তেজনা কিংবা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আমি এমন সব কাজ করে ফেলি যা আমাকে অন্যদের আনন্দদায়ক সঙ্গ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। জীবনের প্রথমেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম, সাম্প্রদায়িক শক্তি আমার কল্পনাশক্তিকে হত্যা করছে। স্বপ্নময় কর্ম সম্পাদন, অর্থাৎ লেখালেখির জন্য আমার প্রয়োজন বেদনাদায়ক একাকীত্ব। আর তাহলেই আমি সুখী হতে পারবো। কিন্তু আমি একজন তুর্কি হওয়ায় কিছু দিন পরেই তাদের আবেগকে প্রশমিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। মনে হতে থাকে আমি হয়তো এরই মধ্যে সেই আগেবটাকে ধ্বংস করে ফেলেছি। ইস্তাম্বুল বইটি লেখার কারণে আমার মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ককে ধ্বংস করে দেয়। আমরা আর পরস্পরকে দেখার সুযোগ পাইনি। অবশ্য আমার ভাইয়ের সাথেও আমার আর দেখা হয়নি। সেই সময়ে নানা কথাবার্তা বলবার কারণে সাধারণ মানুষের সাথেও আমার সম্পর্কটা দুরূহ হয়ে উঠেছে।

 

একজন তুর্কি হিসেবে তাহলে কেমন বোধ করেন?

প্রথমত, আমি জন্মগতভাবেই একজন তুর্কি। এবং এতেই আমি সুখী। প্রকৃতপক্ষে আমি যতোটা তুর্কী, আন্তর্জাতিকভাবে তার চেয়েও বেশি বলা হয়। আমি একজন তুর্কী লেখক হিসেবেই পরিচিত। প্রুস্ত যখন প্রেম নিয়ে লেখেন, তখন সেটাকে বৈশ্বিক হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে শুরুর দিকে যখন আমি প্রেম নিয়ে লিখতাম, লোকেরা বলতো, আমি তুর্কী প্রেম নিয়ে লিখছি। আমার লেখা যখন অনুবাদ হতে শুরু করলো, তুর্কীরা এটা নিয়ে খুব গর্ববোধ করতে লাগলো। তারা আমাকে তাদের লোক হিসেবে দাবি করতে শুরু করলো। আমি তাদের কাছে অনেক বেশি তুর্কি হয়ে উঠলাম। আসলে, আপনি একবার আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পেয়ে গেলে আপনার তুর্কী পরিচয় আন্তর্জাতিকতার নিচে চাপা পড়ে যাবেই। আবার আপনার তুর্কি পরিচয়ও হারিয়ে যাবে তুর্কীদের দ্বারা। আপনার জাতীয়তার বোধটুকু তখন এমন একটি বিষয়ে পরিণত হবে যা অন্যেরা নিয়ন্ত্রণ করবে। এটা আপনার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। আমার লেখালেখি নিয়ে তারা এখন যতটা না উদ্বিগ্ন, তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন তুরস্ককে আন্তর্জাতিক স্তরে কীভাবে প্রতিনিধিত্ব করছি তাই নিয়ে। এটি তুরস্কে আরো বড় সমস্যা সৃষ্টি করছে। জনপ্রিয় দৈনিকগুলোতে তুর্কীরা যা পড়ে তাই নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এই ভেবে যে, আমি আসলে তুরস্ককে নিয়ে বহির্বিশ্বে ঠিক ঠিক কিছু লিখছি কিনা। সাহিত্য তো আসলে ভালো-খারাপ, সুর-অসুর নিয়েই, অথচ তারা শুধু আমার অসুর দিকটি নিয়েই উদ্বিগ্ন থাকে।

[শেষ]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close