Home অনুবাদ ওরহান পামুক-এর সাক্ষাৎকার [তৃতীয় পর্ব] / “উপন্যাসের শৈল্পিক কাঠামো এমন যে তা একজন লেখককে আউটসাইডার বানিয়ে ফেলে…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

ওরহান পামুক-এর সাক্ষাৎকার [তৃতীয় পর্ব] / “উপন্যাসের শৈল্পিক কাঠামো এমন যে তা একজন লেখককে আউটসাইডার বানিয়ে ফেলে…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

প্রকাশঃ April 1, 2017

ওরহান পামুক-এর সাক্ষাৎকার [তৃতীয় পর্ব] / “উপন্যাসের শৈল্পিক কাঠামো এমন যে তা একজন লেখককে আউটসাইডার বানিয়ে ফেলে…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম
0
1

তৃতীয় পর্ব

 আপনি কি কখনো সাহিত্যের মাধ্যমে সামাজিক মতামত প্রকাশে আগ্রহী ছিলেন?

না, আমি পূর্ববর্তী প্রজন্মের বিশেষ করে আশির দশকের ঔপন্যাসিকদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলাম। আমি তাদের প্রতি যথাযথ সন্মান রেখেই বলছি, তাদের লেখার বিষয়বস্তু সংকীর্ণ এবং তাতে গভীর বিস্তৃতি ছিল না।

 

ব্ল্যাক বুকের আগে ফিরে যাই। কোন বিষয়টি আপনাকে হোয়াইট ক্যাসল লেখার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলো? এটিই আপনার সেই প্রথম বই যার বিষয়বস্তু ঘুরে-ফিরে আপনার অন্যান্য উপন্যাসেও চলে এসেছে নানা ভঙ্গিতে। আপনি কেন আপনার উপন্যাসে প্রায়ই অন্য একজন হয়ে গিয়ে আকস্মিকভাবে আবির্ভুত হবার ধারণাকে প্রতিষ্ঠা দেন?

এটি খুবই ব্যক্তিগত বিষয়। আমার চেয়ে আঠারো মাসের বড় একজন প্রতিদ্বন্দ্বী ভাই ছিলো আমার। একদিক থেকে বলতে গেলে – তিনিই আমার বাবা, ফ্রয়েডীয় সূত্রে বাবা। তিনিই ছিলেন আমার পরিবর্তনের নিয়ামক, আমার অভিভাবক প্রতিনিধি।

আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও ভাতৃত্বসুলভ সম্পর্ক ছিলো। এটি ছিলো এক জটিল সম্পর্ক। এটা নিয়ে ইস্তাম্বুল গ্রন্থে আমি বিস্তারিত লিখেছি। আমি ছিলাম আদর্শবান তুর্কি বালক, ফুটবলের তুখোড় খেলোয়ার ছিলাম আর সবধরনের খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতায় ছিলাম প্রচণ্ড উৎসাহী। আর ওই ভাইটি ছিলেন স্কুলের পড়াশোনায় দারুণ সফল, আমার চেয়েও। আমি তার প্রতি ঈর্ষাবোধ করতাম এবং তিনিও আমার প্রতি ঈর্ষাবোধ করতেন। তিনি ছিলেন আসলেই একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি – আমাদের বড়রা এটাই বলতেন। আমি যখন খেলাধুলায় মন দিতাম, তিনি তখন মন দিতেন শৃঙ্খলায়। আমরা সারাক্ষণই প্রতিযোগিতা করতাম। আমিও তার মতো, তার অন্য সবকিছুর মতো হওয়ার কল্পনা করতাম। এটি আমার অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে উঠেছিল। হিংসা, ঈর্ষা – এগুলো আমার অন্তর্গত বিষয় হয়ে উঠলো। আমি মাঝে-মাঝে এই ভেবে হতাশ হতাম যে, ভাইয়ের শক্তি ও সাফল্য কতটা আমাকে প্রভাবিত করছে। এটি আমার স্পৃহার একটি অপরিহার্য অংশ ছিলো। আমি এ ব্যপারে সচেতন ছিলাম এবং একারণেই আমি এইরকম আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছিলাম। আমি জানতাম এগুলো ভালো নয়, তাই আমি একজন সভ্য মানুষের মতো প্রতিজ্ঞা করলাম এগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করবো। আমি বলছি না যে আমি ঈর্ষার শিকার নই। কিন্তু এটি ছিলো শিরা-উপশিরার সঙ্গে যুক্ত হৃৎপিণ্ড, যার সঙ্গে আমি সর্বক্ষণ জড়িয়ে থাকতে চাইতাম। অবশেষে, এটাই আমার সব গল্পের মূল কাহিনি হয়ে উঠলো। বলা যেতে পারে, দ্য হোয়াইট ক্যাসলের প্রধান দুটি চরিত্রের মধ্যে যে সুসম্পর্ক আপনি দেখবেন, তা আমাদের দুই ভাইয়ের সম্পর্ককে উৎস হিসেবে গ্রহণ করেই লেখা।

অন্যদিকে, তুর্কিরা যখন পশ্চিমা সংস্কৃতির মুখোমুখি হয়, অন্য চরিত্রে প্রবেশের পর তাদের মধ্যে ভঙ্গুরতার উপলব্ধি ঘটে। দ্য হোয়াইট ক্যাসল লেখার পর আমি এই ঈর্ষাটা উপলব্ধিতে আনতে পেরেছিলাম। অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উদ্বিগ্ন আর ঈর্ষাবোধ করাটা তুর্কিদের সঙ্গে পশ্চিমা দুনিয়ার সম্পর্কের মতো একটা ব্যাপার বলা যেতে পারে। আপনি জানেন, ব্যপারটা এরকম, পশ্চিমা হওয়ার চেষ্টা করা এবং খাঁটি পশ্চিমা হতে না পারলে বিপন্নতার বোধ জেগে ওঠে। ইউরোপের মূল অনুষঙ্গকে বা আত্মাকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করা এবং এরপর অনুকরণের জন্যে অপরাধবোধ করার ধারণাটা মূলত দুই ভাইয়ের প্রতিযোগিতাপূর্ণ সম্পর্কেরই স্মৃতিচারণ বলতে পারেন।

 

তুরস্কে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের যে পারস্পরিক বিরোধ বিদ্যমান, তা কি খুব শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হবে বলে বিশ্বাস করেন?

আমি আশাবাদী। দুই সংস্কৃতির দুই ধরনের চেতনা আত্মস্থ করা নিয়ে তুরস্কের বিচলিত হওয়া উচিত নয়। সিজোফ্রেনিয়ার সংকটই আপনাকে বুদ্ধিমান করে তুলবে। বাস্তবতার সঙ্গে হয়তো আপনার সম্পর্কচ্যুতি ঘটবে না; আমি যেহেতু কথাসাহিত্যিক, আমি এটিকে বাজেভাবে নিইনি। সিজোফ্রেনিয়া বা মানসিক টানাপোড়েন নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছুই নেই।  আপনি যদি মনে করেন যে, আপনার একটি অংশ আরেকটি অংশকে মেরে ফেলছে, আপনাকে একটা ধারণা নিয়েই থাকতে হবে- তাহলে সেটা হবে রুগ্ন হয়ে ওঠার চেয়েও খারাপ। এটি আমার মত। এই ভাবনাটি আমি তুরস্কের রাজনীতিতে ছড়িয়ে দিতে চাই – ছড়িয়ে দিতে চাই ওই রাজনীতিবিদদের মধ্যে যারা দাবি করেন যে দেশের ‘একক’ সুদৃঢ় একটা আত্মা থাকবে – সেটা প্রাচ্যের, পাশ্চাত্যের কিংবা জাতীয়তাবাদ যারই হোক না কেন। এই ধরনের একত্ববাদী ধারণার বিরোধী আমি।

 

তুরস্কের মানুষ আপনার এই ধারণাকে কিভাবে নিচ্ছে?

একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন তুরস্ক প্রতিষ্ঠার পথে যতো বেশি অগ্রসর হবো,  এই ধারণাটি তত গ্রহণযোগ্যতা পাবে। তুরস্ক শুধু এই লক্ষ্য নিয়েই ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে পারে। এটি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি পথ। তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াইয়ের একটি পথ।

 

আপনার ইস্তাম্বুল গ্রন্থে আপনি এই শহরকে নিয়ে যে ধরনের ভাবালুতা প্রদর্শন করেছেন, তাতে মনে হয় অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতনে আপনি শোকাহত?

আমি অটোম্যান সাম্রাজ্যের জন্য শোকাহত নই। আমি পাশ্চাত্যবাদী। আমি সন্তুষ্ট যে এখানে পশ্চিমীকরণ হয়েছে। আমি শুধুমাত্র সেই সংকীর্ণতার সমালোচনা করছি – যে ধারণাটা এলিট আমলা আর নব্য-ধনিক শ্রেণির পশ্চিমীকরণকৃত ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। নিজস্ব প্রতীক, উপমা ও রীতিনীতি দিয়ে একটি সমৃদ্ধ জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য এদের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তারা এমন কোনো ইস্তাম্বুলীয় সংস্কৃতি তৈরির প্রচেষ্টা চালায়নি যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংমিশ্রণকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। তারা শুধু প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে পাশাপাশি রেখেছে মাত্র। একসময় এখানে যে শক্তিশালী অটোম্যান সংস্কৃতি চালু ছিলো, তা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সংস্কৃতিকে তারা বহমান রাখতে পারতো, কিন্তু তারা সম্ভবত সেটা যথাযথভাবে করতে পারেনি। এটা প্রাচ্যের অতীত এবং পাশ্চাত্যের বর্তমান না হয়ে উভয়ের সংমিশ্রণে একটি স্থানীয় সংস্কৃতি তৈরি করতে পারতো। এই জিনিসটিই আমি আমার বইয়ে করার চেষ্টা করেছি। সম্ভবত তরুণরা আগামীতে এটাই করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করাটাও তুরস্কের নিজস্বতার জন্য হুমকি হবে না বরং এটিকে আরো বিকশিত করবে, একটি নতুন তুর্কি সংস্কৃতি উদ্ভাবন করার জন্য আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতা পাবো। দাসের মতো পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কিংবা মৃতপ্রায় অটোম্যান সংস্কৃতির অনুকরণ- এর কোনোটাই সমাধান নয়। এগুলো দিয়ে আপনাকে নতুন কিছু করতে হবে এবং কোনো একটির আধিক্য ঘটলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

 

আপনার ইস্তাম্বুল গ্রন্থটি পড়লে মনে হয় আপনি পশ্চিমা ভীনদেশী দৃষ্টিতে আপনার শহরকে অবলোকন করছেন।

আমি কিন্তু এটাও ব্যাখ্যা করেছি-  একজন পাশ্চাত্য ভাবধারার তুর্কি বুদ্ধিজীবী কেন পাশ্চাত্যের দৃষ্টি দিয়ে দেখে থাকে। ইস্তাম্বুলকে গড়ে তোলার কাজটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা পাশ্চাত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বৈপরীত্য সবসময়ই থাকে এবং আপনি প্রাচ্যের ক্রোধের জায়গা থেকেও তা দেখতে পাবেন। প্রায় সবাই মাঝে-মাঝে পাশ্চাত্যের ভাববাদী আবার মাঝে-মধ্যে প্রাচ্যের ভাববাদী হয়ে ওঠে – এরা মূলত দুয়েরই আপেক্ষিক সংমিশ্রণ। এডওয়ার্ড সাঈদের প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিটা ভালো লাগে আমার। তুরস্ক কখনো উপনিবেশ ছিলো না, তাই এটিকে ভাবালুতার দ্বারা ব্যাখ্যা করা তুর্কিদের পক্ষে কঠিন কাজ নয়। পশ্চিমারা ইন্ডিয়ান বা আরবদের যেভাবে অবজ্ঞা করেছে সেটি তুরস্কের ক্ষেত্রে পারেনি। তুরস্ক মাত্র দু’বছরের জন্য অধিকৃত হয়েছিলো এবং শত্রুরা তাদের জাহাজ নিয়ে যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই ফিরে গিয়েছিলো। তাই জাতীয় চেতনায় তেমন কোনো ক্ষত তারা তৈরি করতে পারেনি। যেটুকু ক্ষত রেখে গেছে তা ছিলো অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতন সংক্রান্ত। সুতরাং আমি তেমন একটা উদ্বিগ্ন নই, পশ্চিমারা যে কারণে আমাদেরকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাকায়। যদিও প্রজাতন্ত্র গঠনের পর একধরনের ভয় ছিলো, কারণ তুর্কিরা পাশ্চাত্য ভাবধারায় প্রবেশ করতে চেয়েছিলো, কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেনি। ফলে, সংস্কৃতির হীনন্মন্যভাব থেকে যায় যা মাঝে-মাঝে আমার মধ্যেও দেখা যাবে।

তাছাড়া, অন্য জাতিগোষ্ঠী যারা সাম্রাজ্যবাদের কবলে দুইশো বছর কাটিয়েছে তাদের তুলনায় এই ক্ষত ততটা গভীর নয়। পশ্চিমা পরাশক্তির দ্বারা তুরস্ক কখনো অত্যাচারের শিকার হয়নি। তুর্কিরা যে অত্যাচারের শিকার হয়েছে তা তাদের নিজেদের সৃষ্ট। আমরা আমাদের নিজেদের ইতিহাস মুছে দিয়েছি, কারণ তা ছিলো প্রকট বাস্তবতা। এই অত্যাচারের ছিলো অসম্পূর্ণ বোধ। কিন্তু স্ব-আরোপিত পাশ্চাত্য ভাবধারাও বিচ্ছিন্নতা নিয়ে আসে। ভারতীয়রা তাদের অত্যাচারীদের সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছে। তুর্কিরা যে পাশ্চাত্যের অনুকরণ করেছিলো, তা থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ১৯৫০ বা ১৯৬০-এর দিকে যখন কোনো বিদেশী ইস্তাম্বুল হিলটনে আসতো, এটি সব পত্রিকায় ছাপা হতো।

 

আপনি কি বিশ্বাস করেন, এখানে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে এরকম কোনো ক্লাসিক গ্রন্থ আছে, অথবা এর অস্তিত্ব থাকা উচিত? আমরা পশ্চিমা ক্যানন বা অনন্য রচনার কথা শুনেছি; এরকম অপশ্চিমা কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মতো গ্রন্থ আছে কি?

হ্যাঁ, আরেকটি ক্যানন আছে। এর অনুসন্ধান ও মানোন্নয়ন করা উচিত, অংশীদারিত্ব ও সমালোচনা হওয়া উচিত, এটিকে সাদরে গ্রহণ করা উচিত। ঠিক এইমুহূর্তে প্রাচ্যের তথাকথিত ক্যানন ধ্বসের মুখে। গৌরবময় টেক্সটগুলো চারপাশে ছড়িয়ে আছে, কিন্তু এগুলোকে তুলে এনে একত্রিত করার কোনো উদ্যোগ নেই। ফারসি ক্লাসিক রচনা থেকে শুরু করে ইন্ডিয়ান, চাইনিজ, জাপানিজ- সমস্ত টেক্সট তুলে এনে এদের গভীর মূল্যায়ন হওয়া উচিত। কিন্তু এখন এই রচনাগুলোর সবই পশ্চিমা স্কলারদের হাতে এবং তারাই এখন যোগাযোগ ও বিতরণের কেন্দ্র স্থাপন করেছে।

 

উপন্যাস তো পশ্চিমাদেরই চূড়ান্ত সাংস্কৃতিক একটা ফর্ম বা প্রকরণ। প্রাচ্য-ঐতিহ্যে কী এর কোনো স্থান আছে?

মহাকাব্য থেকে ক্রমান্বয়ে আলাদা হয়ে বেরিয়ে আসা একটি প্রকরণ হলো উপন্যাস এবং এটি অপরিহার্যভাবেই প্রাচ্যের নয়। ঔপন্যাসিক কোনো সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নন, তিনি কোনো সম্প্রদায়ের মৌলিক প্রবৃত্তি তুলে ধরেন না, এবং তিনি যাদের দেখেন তাদের বাইরের আলাদা যে সংস্কৃতি আছে, তাই নিয়ে ভাবেন আর বিচার-বিবেচনা করে দেখেন। একবার ঔপন্যাসিকের ভাবনাটা নিজস্ব সম্প্রদায়ের বাইরে প্রক্ষেপিত হলেই তিনি একা হয়ে যান, অনাকাঙ্ক্ষিত বোধ করেন। তার টেক্সটগুলোর সমৃদ্ধিও ঘটে তার সেই একাকিত্বের গভীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আপনি যখনই পৃথিবীকে দেখার এই অভ্যাসটি আয়ত্ব করবেন, এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লিখবেন, তখনই আপনি সমাজ থেকে নিজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবেন। স্নো উপন্যাসটিতে আমি এই মডেলটি নিয়েই ভাবছিলাম।

 

এ পর্যন্ত প্রকাশিত আপনার উপন্যাসগুলোর মধ্যে স্নো উপন্যাসটিই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক। এই ভাবনাটি আপনার মাথায় কিভাবে এলো?

নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমি যখন খ্যাতিমান হয়ে উঠতে থাকি, ওই একই সময়ে কুর্দী গেরিলাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী লড়াই সংঘটিত হয়, প্রবীন বামপন্থী লেখকেরা এবং নব্য-আধুনিক স্বাধীনচেতা লেখকেরা আমার সাহায্য চাইলো, তারা চাইলো আমি যাতে এই নির্য়াতনের বিরুদ্ধে প্রচারিত বিবৃতিতে স্বাক্ষর করি, আর আমাকে তারা এমন কোনো রাজনৈতিক কাজ করার জন্যে অনুরোধ জানালো যা আমার লেখালেখির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

খুব দ্রুতই দেখলাম, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলি চরিত্র হনন প্রচারণার মধ্য দিয়ে আমাকে পাল্টা আক্রমণ করে বসলো। তারা আমাকে বিভিন্ন বাজে নামে ডাকতো। এতে আমি খুব ক্ষুব্ধ হলাম। কিছুদিন পরে আমি নিজেই অবাক হয়ে ভাবলাম, কেমন হয় যদি একটা রাজনৈতিক উপন্যাস লিখে ফেলি, যেখানে উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের পরিসর থেকে এই সমস্যার আত্মিক সংকটগুলো অনুসন্ধান করা যাবে এবং যাদের কোনো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নেই তাদের প্রতি দায়বদ্ধ হওয়া যাবে। উপন্যাসের নান্দনিকতার প্রতি আমার আস্থা ছিলো। উপন্যাসের শৈল্পিক কাঠামো এমন যে তা একজন লেখককে আউটসাইডার বানিয়ে ফেলে, এটা আসলে এক অদ্ভূত জিনিস। মাই নেম ইজ রেড শেষ হওয়ার পরই আমি এই রাজনীতি-স্পৃষ্ট উপন্যাসটি লিখতে শুরু করি।

 

উপন্যাসটির পটভূমির জন্যে আপনি কার্সের মতো ছোট্ট শহরটিকে বেছে নিলেন কেন?

এই শহরটি ঠাণ্ডা আবহাওয়ার জন্যে তুরস্কে সবচেয়ে কুখ্যাত স্থান, সেইসঙ্গে অন্যতম দরিদ্র শহরও বটে। আশির দশকের শুরুতে একটি বিখ্যাত সংবাদপত্রের প্রথম পাতার পুরোটা জুড়ে কার্সের দারিদ্র্যের কথা ছাপা হয়েছিলো। কেউ একজন হিসেব করে  দেখিয়েছিল, পুরো শহরটি মাত্র এক মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কেনা সম্ভব ছিল। আমি যখন সেখানে যেতে চাইলাম, তখন সেখানকার রাজনৈতিক আবহাওয়া ভালো ছিলো না। শহরের পাশ্ববর্তী অঞ্চলে ছিলো কুর্দীদের বসবাস এবং মূল শহরের কেন্দ্রে বাস করতো কুর্দি, আজারবাইজান, তুর্কি এবং অন্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষজন। এদের মধ্যে জার্মান ও রাশানও ছিলো। সেখানে শিয়া-সুন্নীর ধর্মীয় বৈপরীত্যও দৃশ্যমান ছিলো। সরকার কুর্দী গেরিলাদের বিরুদ্ধে এতোটাই হিংস্রতার সঙ্গে লড়াই করছিলো যে সেখানে ট্যুরিস্ট হিসেবে যাওয়াটাও অসম্ভব ছিলো। আমি জানতাম, ঔপন্যাসিক হিসেবে খুব সহজেই সেখানে আমি যেতে পারবো না। সুতরাং জায়গাটা ভিজিট করার জন্য একজন পত্রিকার সম্পাদকের শরণাপন্ন হই এবং তার কাছ থেকে পত্রিকার পাস নিতে চাই। তিনি ছিলেন খুব প্রভাবশালী একজন সম্পাদক। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে মেয়র এবং পুলিশ প্রধানকে আমার আগমনবার্তা জানালেন। যেই আমি সেখানে পৌঁছালা, আমি মেয়র ও পুলিশ প্রধানের সঙ্গে করমর্দন করলাম এইজন্য যে, তারা যাতে রাস্তা থেকে আমাকে তুলে না নেয়। মূলত কিছু পুলিশ, যারা আমার পরিচয় জানতো না,  সম্ভবত নির্যাতনের উদ্দেশ্যে তারা আমাকে তুলে নিয়ে যায়। কালবিলম্ব না করে আমি তাদের আমার পরিচয় দিলাম, বললাম, মেয়রকে চিনি, পুলিশ প্রধানও আমার চেনা…তবু আমি সন্দেহভাজন আগন্তুক হিসেবেই থেকে গেলাম ওদের কাছে। কারণ তুরস্ক যদিও তখন অব্দি কাগজে-কলমে স্বাধীন ছিলো, ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত কোনো বিদেশী সেখানে গেলে সন্ধেহভাজন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। আশার কথা সেই পরিস্থিতি এখন অনেকটাই সহজ হয়েছে। বইয়ের অধিকাংশ ব্যক্তি ও স্থান হুবহু বাস্তব। যেমন ধরুন, স্থানীয় সংবাদপত্রটি বাস্তবেই ২৫২ কপি বিক্রি হয়। আমি কার্সে একটি ক্যামেরা এবং একটি ভিডিও রেকর্ডার নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি সবকিছুই ধারণ করে রাখছিলাম এবং ইস্তাবুলে ফিরে গিয়ে বন্ধুদের সেসব দেখাই। সবাই ভাবে আমি পাগলামি ধরনের কিছু একটা করে এসেছি। তবে সেখানে মূলত আরো কিছু ব্যপার ঘটেছিলো। এই আলাপচারিতায় আমি সেই ছোট পত্রিকার সম্পাদকের কথা বলছি, যিনি কি করে সব গোপন খবর পেয়েছিলেন, জিজ্ঞেস করলে বলেছিলেন, পুলিশের ওয়াকিটকিতে সব শুনতে পেরেছিলেন। পুলিশ ওই সময় নাকি তার উপর নজরদারি করেছিলো। পুলিশ আমাকেও অনুসরণ করছিলো।

স্থানীয় সমন্বয়কারী আমাকে টিভির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি এই ধারণা দিয়েছিলে যে, আমাদের এই বিখ্যাত লেখক একটি জাতীয় দৈনিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিবন্ধ লিখবেন। পৌরসভার নির্বাচন ছিলো তখন আসন্ন, সাধারণ মানুষ তাই তাদের দরজা আমার জন্য উন্মুক্ত করে দিলো। তারা সবাই জাতীয় দৈনিকের জন্যে কিছু বলতে চাইলো, জানাতে চাইলো তাদের দারিদ্র্যের কথা। কিন্তু তারা জানতো না আমার উপন্যাসে আমি তাদেরই রাখতে যাচ্ছি। তারা ভেবেছিলো, আমি আমার নিবন্ধে তাদের নিয়ে লিখবো। আমি স্বীকার করছি এটি একটি গর্হিত ও নিষ্ঠুর কাজ ছিলো, যদিও আমি এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ লেখার কথা ভাবছিলাম। এরপর চার বছর কেটে যায়। আমি সামনে এগুতে থাকলাম। একটা ছোট্ট কফিশফে আমি মাঝে-মাঝে লিখতে বসতাম এবং নোট নিতাম। আমার এক ফটোগ্রাফার বন্ধু ছিলো, যাকে আমি সঙ্গে নেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম এজন্য যে, যখন কার্সে তুষারপাত হয় তখন এটি নান্দনিক হয়ে ওঠে। এই বন্ধুটি ছোট্ট সেই কফিশফে একটা কথা শুনতে পায়, যখন আমি নোট লিখছিলাম, লোকেরা নাকি বলাবলি করছিলো- কী এমন নিবন্ধ তিনি লিখছেন? এভাবে প্রায় তিন বছর কেটে গিয়েছিলো এবং একটি উপন্যাস লেখার জন্য এটা যথেষ্ট ছিলো বলে আমার মনে হয়।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

  1. নিজস্ব প্রতীক, উপমা ও রীতিনীতি দিয়ে একটি সমৃদ্ধ জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য এদের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তারা এমন কোনো ইস্তাম্বুলীয় সংস্কৃতি তৈরির প্রচেষ্টা চালায়নি যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংমিশ্রণকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। তারা শুধু প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে পাশাপাশি রেখেছে মাত্র। একসময় এখানে যে শক্তিশালী অটোম্যান সংস্কৃতি চালু ছিলো, তা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সংস্কৃতিকে তারা বহমান রাখতে পারতো, কিন্তু তারা সম্ভবত সেটা যথাযথভাবে করতে পারেনি। এটা প্রাচ্যের অতীত এবং পাশ্চাত্যের বর্তমান না হয়ে উভয়ের সংমিশ্রণে একটি স্থানীয় সংস্কৃতি তৈরি করতে পারতো। এই জিনিসটিই আমি আমার বইয়ে করার চেষ্টা করেছি। সম্ভবত তরুণরা আগামীতে এটাই করবে। ”

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close