Home অনুবাদ ওরহান পামুক / “সৃষ্টিশীলতার জন্য বেদনাবহ একাকীত্ব প্রয়োজন…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

ওরহান পামুক / “সৃষ্টিশীলতার জন্য বেদনাবহ একাকীত্ব প্রয়োজন…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

প্রকাশঃ March 9, 2017

ওরহান পামুক / “সৃষ্টিশীলতার জন্য বেদনাবহ একাকীত্ব প্রয়োজন…” > প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম
0
0

সাক্ষাৎকার

ওরহান পামুক

“সৃষ্টিশীলতার জন্য বেদনাবহ একাকীত্ব প্রয়োজন…”

প্যারি রিভিউ থেকে ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম

[প্রথম পর্ব]

ওরহান পামুকের জন্ম ১৯৫২ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে; আর সেখানেই তিনি নিয়মিত বসবাস করে আসছেন। তুরস্কে  প্রজাতন্ত্র চালু হলে ব্যাপক উন্নতি ঘটে দেশটির। এইসময়ে তাঁর পরিবার রেলওয়ে সড়কের নির্মাণকাজে জড়িত থাকায় তাঁদের ভাগ্যের অনেক পরিবর্তন ঘটে। পামুক রবার্ট কলেজে ভর্তি হন যেখানে শহরের সুবিধাভোগী অভিজাত ব্যক্তিবর্গের সন্তানেরা সেক্যুলার ও পশ্চিমা ভাবাদর্শের শিক্ষাগ্রহণ করতো। জীবনের প্রথম দিকটায় পামুক চিত্রকলার প্রতি আসক্ত হন। প্রথম জীবনে চিত্রশিল্পী হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও কলেজে স্থাপত্যবিদ্যায় ভর্তি হওয়ার পর লেখালেখির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি তুরস্কের সর্বাধিক পঠিত লেখক। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সেভডেট বে অ্যান্ড হিজ সন্স’ ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়। পরের বছর প্রকাশিত হয় তাঁর ‘দ্য সাইলেন্ট হাউজ’ বইটি। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস ‘হোয়াইট ক্যাসল’, যা ১৯৯১ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘দ্য ব্ল্যাক বুক’ উপন্যাসটি এবং সেটি ১৯৯৪ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হয়। ‘দ্য নিউ লাইফ’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে এবং ১৯৯৭ সালে এটিও অনূদিত হয়। ১৯৯৮ সালে লেখা ‘মাই নেম ইজ রেড’ বইটির জন্যে পামুক আন্তর্জাতিক ইমপ্যাক ডাবলিন সাহিত্য পুরস্কার পান। এই বইটিতে পামুক বহুব্যক্তির কণ্ঠে ষোড়শ শতকে ইস্তাম্বুলে সংঘটিত একটি রহস্যময় খুনের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এই উপন্যাসটিতে তাঁর কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে – দেশীয় ব্যক্তিত্ববাদের গোলকধাঁধা সংক্রান্ত ভাবনা, যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ফারাক তৈরে করে বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া পারিবারিক সংঘাত, দ্বৈতসত্ত্বার অস্তিত্ব, সৌন্দর্য ও মৌলিকত্বের গুরুত্ব এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে এই বইটিতে। ‘স্নো’ উপন্যাসটি ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়। এতে উঠে আসে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংস্কারের বিষয়। এটিই তাঁর প্রথম উপন্যাস যেখানে তিনি সমকালীন তুর্কি রাজনীতির চরমপন্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। এর জের ধরেই তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হন এবং দেশে তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে জনমত গড়ে ওঠে। ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘ইস্তাম্বুল : মেমোরিজ অ্যান্ড দ্য সিটি’। এতে পাওয়া যাবে দুই ধরনের চিত্র – তাঁর জন্মস্থান এবং তাঁর শৈশব ও তারুণ্যের স্মৃতিবিজড়িত স্থানের কথা।

ওরহান পামুকের এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে দুটি প্রাণবন্ত সেশনে। ২০০৪ সালের মে মাসে লন্ডনে ‘স্নো’ উপন্যাসটির ইংরেজিতে ভাষান্তরিত প্রকাশনা উৎসবে প্রথমবার এই আলাপচারিতা সম্পন্ন হয়। তার সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ কক্ষ ভাড়া করে সেই হোটেলে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। হোটেল কক্ষটি ফ্লুরোসেন্ট বাতিতে সজ্জিত করা ছিল, আকারেও ছিলো সুবিশাল, ছিল খোলামেলা আর উন্নত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। পামুক ঢিলেঢালা নীল শার্টের সাথে লম্বা কালো জ্যাকেট পরে সাক্ষাৎকারে আসেন। চারদিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করে বলেন – ‘আমরা এখানে মরে গেলে কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না।’ সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী লিখেছেন, আমরা হোটেল লবির এক কোণের দিকে এগিয়ে গেলাম এবং সেখানেই কফি ও চিকেন স্যান্ডউইচ খাওয়া আর বিরতির সময়টুকু বাদ দিয়ে টানা প্রায় তিনঘণ্টা কথা বলি। ২০০৫ সালের এপ্রিলে পামুক তাঁর ইস্তাম্বুল গ্রন্থটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আবার আসেন লন্ডনে এবং আমরা আবারো সেই একই হোটেলের একই লবিতে আরো দুই ঘণ্টা কাটাই। প্রথমে তিনি সাক্ষাৎকার দিতে কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন এবং সেটি যুক্তিযুক্ত কারণেই। এর ঠিক মাস দুয়েক আগে তিনি একটি সুইস পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তুরস্ক সম্পর্কে বলেছিলেন,  “এই দেশে ত্রিশ হাজার কুর্দি এবং দশ লক্ষ আরমেনীয় নিহত হয়েছিলো, অথচ এ ব্যাপারে আমি ছাড়া আর কেউই কোনো কথা বলেনি।” তুরস্কের জাতীয় দৈনিকগুলো তাঁর এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে বিরামহীন বিরুদ্ধ প্রচারণা চালায়। তুর্কি সরকার তাঁদের ১৯১৫ সালের গণহত্যার কথা স্বীকার না করে চলমান কুর্দি সংঘাতের উপর কথা বলাকে নিষিদ্ধ করে। বিষয়টি দ্রুত ঝিমিয়ে পড়ার  আশায় পামুক এই বিতর্ক নিয়ে সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানান। সুইস পত্রিকার সেই বিবৃতির জের ধরে তুর্কি সরকার পেনাল কোড অনুযায়ী পামুককে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। ম্যাগাজিনটি যখন ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে ছাপা হয়, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিক্ষুব্ধ প্রচারণা ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিবাদ সত্ত্বেও পামুককে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। যাই হোক শেষ অব্দি প্যারি রিভিউকে তিনি সাক্ষাৎকার দেন এবং পরে সেটি প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন অ্যাঞ্জেল গুরা কুইনতানা। যথেষ্ট পড়াশোনা আর প্রস্তুতি নিয়ে যে তিনি সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন, এর সবটা পড়লেই সেটা বোঝা যাবে। প্রায় সাড়ে সাত হাজার শব্দে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন মাইনুল ইসলাম। আমরা কয়েকটি পর্বে সেটি তীরন্দাজে প্রকাশ করবেো। আজ প্রকাশিত হল প্রথম পর্ব

এই যে নানা সময়ে আপনি সাক্ষাৎকার দেন, তো আপনার সাক্ষাৎকার দেয়ার অনুভূতিটা কেমন হয়, মানে কেমন লাগে?

আমি মাঝে-মাঝে খুব বিচলিত হয়ে পড়ি, কারণ আমি অর্থহীন প্রশ্নের আগোছালো উত্তর দিয়ে ফেলি। ইংরেজি এবং তুর্কী উভয় ভাষাতেই এমনটি হয়ে থাকে। আমি ত্রুটিপূর্ণ তুর্কী ভাষায় এবং আগোছালো বাক্যে কথা বলে ফেলি। আমি আমার বইয়ের চাইতেও সাক্ষাৎকারের জন্যে তুরস্কে অসংখ্যবার আক্রমণের শিকার হয়েছি। সেখানকার রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীগণ এবং কলামিস্টর উপন্যাস পড়েন না।

 

ইউরোপ এবং আমেরিকায় তো আপনার বইয়ের ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন। তুরস্কে কীধরনের সাড়া পাচ্ছেন?

সুন্দরতম সেই বছরগুলো এখন আর নেই। আমি যখন আমার প্রথম বই প্রকাশ করেছিলাম, তখন পূর্বপ্রজন্মের তুর্কি লেখকগণ ম্রিয়মান হয়ে পড়ছিলেন। তাই নতুন লেখক হিসেবে আমাকে স্বাগত জানানো হয়।

পূর্বপ্রজন্ম বলতে আপনি কাদের বোঝাতে চাচ্ছেন?

যেসব লেখক সামাজিক দায়বোধ নিয়ে লেখেন, যারা সাহিত্যকে নৈতিকতা ও রাজনীতির জন্যে ব্যবহারের প্রয়োজনবোধ করেন। তারা নিরেট বাস্তববাদী, নিরীক্ষাধর্মী নন। দরিদ্র দেশের লেখকগণের মতো তারা তাদের মেধাকে দেশসেবার নিমিত্তে অপচয় করেন। আমি সেরকমটা হতে চাই না, কারণ আমি তরুণ বয়সেই ফকনার, ভার্জিনিয়া উলফ, প্রুস্ত পড়েছি – গোর্কি, স্টেইনব্যাকদের মতো সমাজ-বাস্তববাদীদের ভাবধারায় প্রভাবিত হইনি। তাছাড়া ষাট ও সত্তরের দশকের সাহিত্য সেকেলে হয়ে পড়ছিলো এবং এজন্যই আমি নতুন প্রজন্মের লেখক হিসেবে অভিনন্দিত হয়েছিলাম।

নব্বই দশকের মাঝামাঝি যখন আমার বইগুলো বেশ বিক্রি হতে থাকে, তুরস্কের কেউ সেটা স্বপ্নেও ভাবেননি; তখনই গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের সাথে আমার মধুচন্দ্রিমার বছরগুলি ফুরিয়ে যায়। তখন থেকেই আমার বইয়ের বিষয়বস্তুর পরিবর্তে সমালোচনা চলতে থাকে প্রচারণা ও বই বিক্রি নিয়ে। এখন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমি আমার রাজনৈতিক বিবৃতির জন্য কুখ্যাত – এসব বিবৃতির অধিকাংশই তুলে আনা হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার হতে এবং কিছু তুর্কী জাতীয় সাংবাদিক নির্লজ্জভাবে সেগুলোকে নিজেদের মনের মতো করে সাজিয়ে সেগুলি প্রচার করছে। আমি প্রকৃতপক্ষে যতোটা গোঁড়া আর রাজনৈতিকভাবে সচেতন, তার চেয়ে অনেক বেশি  করে সেসব প্রচার করা হয়।

 

তাহলে আপনার জনপ্রিয়তার প্রতি বিরোধপূর্ণ প্রতিক্রিয়া রয়েছে?

আমার জোরালো মতামত হচ্ছে, এটা আমার বইয়ের বিক্রির পরিমান ও রাজনৈতিক বিবৃতির শাস্তি। আমি এটি অব্যাহতভাবে বলে যেতে চাই না, কারণ আমি আত্মরক্ষামূলক কথা বলছি। আমি সম্ভবত সম্পূর্ণ চিত্রটির ভুল ব্যাখ্যা করছি।

 

আপনি কোন সময়ে লেখেন?

আমার সবসময়ই মনে হয়েছে যে, আপনি যেখানে ঘুমান অথবা আপনার সঙ্গীনীর সাথে যে স্থানে থাকেন; লেখালেখির স্থানটি সেখান হতে আলাদা হওয়া উচিত। এসব পারিবারিক রীতি ও অভ্যাস কোনো না কোনোভাবে কল্পনাশক্তিকে বিনষ্ট করে দেয়। এরা আমার ভেতরের দেবতাকে মেরে ফেলে। এই প্রতিদিনের সাংসারিক, ঘরপোষা রুটিন লেখালেখির পৃথিবীর জন্যে অপেক্ষাকে দীর্ঘায়িত করে দেয়, যে পৃথিবী পরিচালনার জন্য কল্পনাশক্তির প্রয়োজন হয়। ক্রমশ তা বিলীন হয়ে যায়। তাই বিগত বছরগুলোতে আমার কাজের প্রয়োজনে বাসার বাইরে অফিস বা ছোট একটি স্থান থাকতো। আমার সবসময়ই ভিন্ন ভিন্ন ফ্ল্যাট ছিলো। কিন্তু একবার আমাকে যুক্তরাষ্ট্রে অর্ধ-সেমিস্টারের মতো একটা সময় কাটাতে হয়েছিলো, যখন আমার প্রাক্তন স্ত্রী কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছিলো। বিবাহিত শিক্ষার্থীদের অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে হয়েছিলো আমাদের। সেখানে খালি কোনো জায়গা ছিলো না, তাই বাধ্য হয়েই আমাকে ঘুমানোর স্থানেই লেখালেখি করতে হয়েছিলো। চারপাশের সবকিছুতেই সাংসারিক জীবনের আবহ ছিলো স্পষ্ট। এটা আমার জন্য হতাশাজনক ছিলো। যে কারো অফিসে যাওয়ার মতো করে আমি প্রতিটি সকালে আমার স্ত্রীকে বিদায় জানিয়ে বের হতাম। আমি বাড়ি ত্যাগ করতাম এবং আশেপাশের কয়েকটি ব্লক ঘুরে অফিস ফেরত যে কারো মতোই ফিরে আসতাম। দশ বছর আগে আমি একটি ফ্ল্যাট পেয়েছিলাম যেখান থেকে বসফরাস প্রণালী ও প্রাচীন নগরীর দৃশ্য দেখা যেত। এটি সম্ভবত ইস্তাম্বুলের সর্বাপেক্ষা সুন্দরতম দৃশ্য ছিলো। এটি আমার বাসস্থান থেকে পঁচিশ মিনিটের হাঁটার দূরত্বে ছিলো। জায়গাটা বইয়ের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিলো এবং আমার টেবিল থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা যেত। প্রতিদিন আমি গড়ে প্রায় দশঘণ্টা সেখানে কাটাতাম।

 

দৈনিক দশ ঘণ্টা?

হ্যাঁ, আমি কঠোর পরিশ্রম করা একজন মানুষ। আমি এটি উপভোগ করি। লোকজন আমাকে উচ্চাভিলাষী বলে থাকেন এবং সেটি হয়তো সত্যও হতে পারে। কিন্তু আমি যা করি, তা ভালোবেসেই করি। শিশুরা যেভাবে খেলতে ভালোবাসে, আমিও সেভাবেই আমার ডেস্কে বসাটা উপভোগ করি। এটি অপরিহার্যভাবেই একটি কাজ এবং একই সময়ে এটি কৌতুক আর একধরনের খেলাও বটে।

 

ওরহান, আপনার নামের সাথে ‘স্নো’ উপন্যাসে বর্ণনা করা নায়কের নামের মিল রয়েছে, যে নিজেকে একজন ক্লার্ক হিসেবে বর্ণনা করে এবং প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডেস্কে বসে থাকে। লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনিও কি একই ধরণের শৃঙ্খলা রক্ষা করে চলেন?

আমি ঔপন্যাসিকদের কেরাণীগিরিটাই তুলে ধরতে চেয়েছিলাম যা কবিদের ক্ষেত্রে একেবারেই বিপরীত। তুরস্কে তো কবিদের মর্যাদাপূর্ণ ঐতিহ্য রয়েছে। কবি হওয়া এখানে তুমুল জনপ্রিয়তা ও শ্রদ্ধার বিষয়। অধিকাংশ অটোম্যান সম্রাট এবং রাষ্ট্রপ্রধানগণ কবি ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে কবি বলতে আমরা যেমন বুঝি, সেরকমটা নয়। শতশত বছর ধরে নিজেকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একটি পথ ছিলো। লোকেরা তাদের কবিতার পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে রাজদরবারে নিয়ে যেত যা ডিভান নামে পরিচিত ছিলো। মূলত অটোম্যান দরবারের কবিতাকেই ডিভান বলা হতো। অটোম্যান সাম্রাজ্যের অর্ধেকেরও বেশি সভাসদ ছিলেন কবি। এটি ছিলো লেখালেখির পরিশীলিত ও জ্ঞানমূলক পথ, বহুবিধ নিয়ম ও প্রথার সমন্বয়ে গতানুগতিক ও পুনরুক্তিময়। অপর দিকে একজন ঔপন্যাসিক হচ্ছেন অপরিহার্যভাবে এমন একজন ব্যক্তি যিনি পিঁপড়ার মতো ধীরে ধীরে ধৈর্য্য নিয়ে দূরত্ব ঘুচিয়ে দেন। একজন ঔপন্যাসিক আমাদেরকে তার দৈবক্ষমতা কিংবা ভাবপ্রবণতা দিয়ে নয়, বরং তার স্থৈর্য দিয়ে আকৃষ্ট করেন।

 

আপনি কখনো কবিতা লিখেছেন?

এই প্রশ্নটা আমাকে প্রায়ই করা হয়। আঠারো বছর বয়সে আমি কিছু কবিতা লিখেছিলাম এবং সেগুলো তুরস্কে প্রকাশিতও হয়েছিলো। তারপর ছেড়ে দিই। আমার ব্যাখ্যাটা এমন যে, আমি অনুভব করেছিলাম স্রষ্টা স্বয়ং কবিতার মধ্য দিয়ে কথা বলেন। আপনাকে কবিতা হয়ে উঠতে হবে। আমি সেইসময় কবিতায় মনোনিবেশ করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কিছু সময় পরে অনুভব করলাম, স্রষ্টা আমার সাথে কথা বলেন না। ব্যপারটা আমার মর্মপীড়ার কারণ হয়েছিল এবং আমি কল্পনা করার চেষ্টা করতাম যে, স্রষ্টা যদি আমার মধ্য দিয়ে কথা বলতেন, তবে কী কী তিনি বলতেন। আমি খুব নিঁখুতভাবে, খুব ধীরে, এটা বোঝার চেষ্টা করলাম। এর পর থেকেই আমার গদ্য লেখা, কথাসাহিত্য লেখা। আমি একজন কেরানির মতোই কাজ করতে থাকলাম। কিছু কিছু লেখক এই অনুভূতিকে অপমানজনক বিবেচনা করেন। কিন্তু আমি এটা মেনে নিয়েছি। আমি একজন কেরানির মতোই কাজ করি।

 

আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, গদ্য লেখাটা আপনার জন্যে রাতারাতি সহজতর হয়ে উঠেছে?

দুর্ভাগ্যবশত, সেটা হয়ে ওঠেনি। মাঝে-মাঝে আমি অনুভব করি, উপন্যাসের চরিত্রকে একটি কক্ষে প্রবেশ করানো উচিৎ কিন্তু তখনো আমি জানিনা সেটা কীভাবে সম্ভব। আমার হয়তো অধিকতর আত্মবিশ্বাস থাকতে পারে আর তা হয়তো মাঝে-মাঝে কাজেও আসতে পারে। কারণ, আপনি তখন কলমের ডগায় যা আসছে তা শুধু লিখেই যাচ্ছেন, নিরীক্ষাধর্মী কিছু করছেন না। গত ত্রিশ বছর ধরে আমি কথাসাহিত্য করে যাচ্ছি, সুতরাং আমার মনে করা উচিৎ যে, আমি কিছুটা উন্নতি তো করেছিই। এখনো মাঝে মধ্যে আমি খরায় পড়ে যাই এবং মনে হয় একটিও রাখতে পারবো না। একটা চরিত্রকেও কক্ষে প্রবেশ করাতে পারছি না, এবং আমিও বুঝতে পারছি না আমার কী করা উচিত; এই ত্রিশ বছর পরেও।

বইয়ের অধ্যায়-বিন্যাসটা আমার চিন্তার জন্যে খুব প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ সময়ে আগে থেকেই গল্পের বিন্যাসটা জানা থাকে, সেগুলোকে ভাগ করে নিই। তারপর ডিটেইলে ভাবি কোনটায় কী করবো। সবসময় ধারা মেনে চ্যাপ্টারগুলো লেখা হয় না। ব্লক হয়ে যাওয়া আমার জন্যে খুব কষ্টকর কিছু না, কারণ তখন যা মনে হয় তা-ই লিখি। এক নাম্বার চ্যাপ্টার থেকে পাঁচ নাম্বার চ্যাপ্টার পর্যন্ত লেখার পর যদি দেখি ভালো লাগতেছে না, তখন স্কিপ করে পনেরো নাম্বার চ্যাপ্টারে গিয়ে সেখান থেকে লেখা শুরু করি।

 

তার মানে, আগে থেকেই পুরো বইয়ের একটি ছক কষে রাখেন?

সবকিছুই। উদাহরণ হিসেবে, ‘মাই নেম ইজ রেড’-এর কথা বলা যেতে পারে। এটিতে বেশ কিছু চরিত্র ছিলো, এবং প্রতিটি চরিত্রের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক অধ্যায় রচনা করেছি। আমি যখন লিখতাম, মাঝে-মাঝে কোনো একটি চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করতাম, এবং সেটিকে একটানা চালিয়ে নিতাম। সুতরাং আমি যখন শেকুরের কোনো একটা অধ্যায় লেখা শেষ করলাম, সম্ভবত সেটি সপ্তম অধ্যায়, তারপর মাঝের অধ্যায়গুলো ফেলে রেখে আমি এগারোতম অধ্যায়ে চলে গেলাম যেখানে শেকুর ছিলো। আমি শেকুরের মতো হতে চেয়েছিলাম। একটি চরিত্র থেকে আরেকটি চরিত্রে অনুপ্রবেশ কিংবা আরেকটি চরিত্র হয়ে ওঠা হতাশাজনক। কিন্তু সর্বশেষ অধ্যায়টি আমি একেবারে শেষেই লিখতাম। এটা সুনির্দিষ্ট ছিলো। আমি আমার নিজেকে জ্বালাতন করতাম, জিজ্ঞেস করতাম সমাপ্তিটা কী হওয়া উচিৎ। সমাপ্তিটা আমি একবারই করে থাকি। শেষের দিকে আসতে আসতে সমাপ্তি টানার আগেই আমি থেমে যাই এবং আগের অধিকাংশ অধ্যায়গুলো পুনর্লিখন করি।

 

লেখালেখির সময়ে আপনার কাছে কোনো পাঠক থাকে কি?

আমার জীবনসঙ্গীনীকে আমি লেখাগুলো পাঠ করে শোনাই। সে যদি বলে-  আরে কী করেছো দেখাও,  অথবা যদি বলে- আজ কী করলে, দেখাও ; আমি তার প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞ হই। এটি তো শুধু প্রয়োজনীয় চাপপ্রয়োগ নয়, এটি একজন মা অথবা বাবা থাকার মতো, যে পিঠ চাপড়ে বলবে- বেশ ভালো লিখেছো তুমি। মাঝে-মাঝে হয়তো এই ব্যক্তি বলবেন, দুঃখিত আমি এটা নিতে পারলাম না। যেটা ভালো, আমি সেটিই গ্রহণ করি। আমার বাবা একসময় আমাকে একটি গল্প বলেছিলেন- টমাস মানের। এই গল্পটি সবসময়ই আমার মনে পড়ে। টমাস আমার আদর্শ। সে তার পরিবারের ছয় সন্তান এবং স্ত্রীকে একত্রে নিয়ে বসতো এবং সবাইকে একত্রে লেখা পাঠ করে শোনাতো।

[চলবে]

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close