Home কবিতা কবিতা কোরাস >> অনন্ত সুজন / কামরুল ইসলাম / খলিল মজিদ / মোস্তফা হামেদী / রোকসানা আফরীন ও সুদীপ চট্টোপাধ্যায়-এর কবিতা

কবিতা কোরাস >> অনন্ত সুজন / কামরুল ইসলাম / খলিল মজিদ / মোস্তফা হামেদী / রোকসানা আফরীন ও সুদীপ চট্টোপাধ্যায়-এর কবিতা

প্রকাশঃ May 25, 2017

কবিতা কোরাস >> অনন্ত সুজন / কামরুল ইসলাম / খলিল মজিদ / মোস্তফা হামেদী / রোকসানা আফরীন ও সুদীপ চট্টোপাধ্যায়-এর কবিতা
0
0

বিশ্বজুড়ে কেমন কবিতা লিখছেন এইসময়ের বাঙালি কবিরা? তীরন্দাজের নিয়মিত বিভাগ ‘কবিতা কোরাস’-এ এবার পড়ুন সমকালের ছয় কবি (বর্ণানুক্রমিকভাবে)- অনন্ত সুজন, কামরুল ইসলাম, খলিল মজিদ, মোস্তফা হামেদী, রোকসানা আফরীন ও সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা। তীরন্দাজের ‘কবিতা কোরাস’ এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে সমকালীন কবিদের কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে।

 

অনন্ত সুজন

জেল সিরিজ

৪৮

স্তব্ধতার নিজস্ব মিতবাক গন্ধ আছে

উদ্দেশ্যহীন অনিদ্রাগঞ্জের দিকে যাত্রা করলে-

নিঃসঙ্গ কয়েদীর দেহভাণ্ড হতে বিস্তার ঘটে।

রাতের তৃতীয় প্রহরে সিথানের কম্বলে

মরুভূমি কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও-

জলধি নামের প্রেমিকা হতে চায়।

 

দীর্ঘশ্বাসের প্রকৃত রঙ কালচে-নীল

এ আমার জানা ছিল না- দুঃস্বপ্নের ভেতর

সংখ্যাতীত অশ্বখুর, বজ্রদ্রোহ আর রক্তের

অসম সিম্ফনি! পাহাড়ের চেয়ে পর্বত বড়-

হয়তো বিষাদের তুলনা এমনই তির্যক!

 

ব্যথাযাপনে শুধুই অসাম্য! রয়েছি হাঁটুজলে-

ওদিকে স্নান সেরে ফিরছে হাড়ের জ্যোৎস্না!

 

৪৯

বাইরে বাতাস নাকি প্রকাণ্ড ঝড় হয়ে

খবর করে গেছে! বারান্দার রোদ্দুরে

সপ্রভিত বাহারি ব্রাগুলোর একটিও নেই!

 

দুপুরের গায়ে হেলান দিয়ে বলাবলি করছে-

সরকারি পোশাকে জেল তন্দ্রালু যারা।

 

সংকটকাল তখন, পাজর-প্রোথিত

ফুসফুসে হাহাকার, কবন্ধ সেলভয়

সামান্য শ্বাস নেবো বলে ফেরি করছি-

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বাজি রাখছি প্রাণ!

৫০

তুমুল বইছে বৃষ্টি, কফির মগে ফেনায়িত

বিরহ বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে নিরুদ্দেশ

দৃশ্যটি কেবল নিঃসঙ্গ মানুষের।

 

নিজস্ব অবয়ব ও অনুভব আছে যার

ভাববিদ্যুৎ বিতরণ করে, রোমন্থনে যায়

বাক্য বিনিময়ে নক্ষত্র নামিয়ে আনে!

 

অথচ, এইখানে কোন এক নগণ্য ছায়া মাত্র।

 

৫১

সে আসে ধীর, বধির

উঁচুর অনেক নিরাপদ থেকে

ডানার ছায়া ঢেলে দেয়।

 

ইচ্ছে মতো রাঙায় বিরতিহীন

আবার আচম্বিতে উধাও-

বেহালায় বিরহ উছলায়।

 

শিহরণ-সলতে জ্বলতে থাকে

হাড়ের উপরিভাগে দুর্বা গজায়!

৫২

ইতিহাসের সব সম্রাট হেরেমে যেতো

সভ্যতার সমান পিপাসায়!

 

এতো যে ঋতুর অবিচার, পরিবেদনার

প্রলেপে সুরক্ষিত- তবুও বিচ্ছুরিত

স্পর্শউল্কা মহিলা লকাপের ছাদ বেয়ে

ছুটে যায় গন্তব্যগহীন রতিদানা!

 

বন-উপবন কেঁপে উঠে, নাচে মহাকাশ

 

নাভির নন্দনে তোমার গোপন পানশালা

যেখানে পান না করেও অসম্ভব মাতাল

হওয়া যায়- ঘ্রাণের অনির্ণেয় গৌরবে!

 

সাঁঝবাতি

কামরুল ইসলাম

 

ভোরের বাতাসে নিমতলী গ্রামের সরল নৌকোটি

একদিন তোমার ফাংগাসে ভরা জানালার কাঠে

রেখে গেছে মাস্তুলের  ছন্দবিভ্রাট

 

তোমার তৃতীয় নয়ন মেঘের বরফ-কুচি দৃষ্টিতে মেখে

জটিল অঙ্কের ঘোলাজলে শ্যামপাখি ওড়ায়-

 

একটি হাত কুশলাদিসহ ধানচাষের মন্ত্র আওড়াতে

জলের তোড়ে ভেসে যাওয়া মাছেদের দিকভুল দ্যাখে

 

তুমি ঘুম থেকে জানালার দিকে পাশ ফিরলে

পানাপুকুরের টলমলে জল উঠে আসে তোমার অপ্রস্তুত যোনিতে

শব্দশিকারীর টেন্ডনে ঘাঁই মারে জঙ্গী বাতাসের টোটেম-

 

তখন তোমার নার্ভাস বনে আগুনে আগুনে পুড়ে যায়

লতা-পাতার বিস্তারিত শৈলী কিংবা পখপখালির ছায়া,

বৃষ্টিঘুমের কুণ্ডলিনী মেখে তুমি স্বপ্নটিলার চুড়োয় উঠে

নিজেকে ভাঙিয়ে খুচরো করে ফেল, আর সেই

খুচরো দেহ-মাংস নারদ নদে ভাসিয়ে দিয়ে

ঢুকে পড় আবহমান ধূলির ভেতর, যেখানে আলো নেই

শুধু রুমাল উড়িয়ে একদল ডাকিনী শ্রাবণের অন্ধকারে

বাগান বাড়ির চারপাশে সাঁঝবাতি জ্বালে

 

খলিল মজিদ

রূপকথার বৃক্ষ

 

রূপকথার বৃক্ষ, সে শেকড় মেলে অশ্রুমান রাতের নাভিতে

রূপকথার বৃক্ষ, সে ভিজিয়ে দেয় সব রাতজাগা খাতাদের শুকনো কবিতা

রূপকথার বৃক্ষ, না-শুকোতেই ডেকে আনে আরো একটি ভেজা কাকের মতো রাত

রূপকথার বৃক্ষ, রাতভর বৃষ্টিমাথায় সে কথা বলে কচ্ছপের সাথে

রূপকথার বৃক্ষ, সে জাগিয়ে তোলে ঘুমন্ত কচ্ছপের ডানা

রূপকথার বৃক্ষ, সেই কচ্ছপেরা যারা গার্হস্থ্য ছেড়েছিল গেলাপাগোসে

রূপকথার বৃক্ষ, সে দেখে ডাহুক আর বৃষ্টিবালকের নাচ

রূপকথার বৃক্ষ, পহেলা আষাঢ়ে সে আজ্ঞা করে বৃষ্টিভেজা কদমসম্মতি

রূপকথার বৃক্ষ, পাতার প্রহরে সে বুঝে পায় তার জাদুশিশুকে

রূপকথার বৃক্ষ, সে শোনে রূপের বেহালা

রূপকথার বৃক্ষ, সে অন্ধ হয় রূপের দর্শনে

রূপকথার বৃক্ষ, সে চিঠি লেখে চাঁদের করুণা দিয়ে

রূপকথার বৃক্ষ, সে প্রতিদিন চিঠি লেখে বজ্রমুখো এক জাদুশিশুকে

রূপকথার বৃক্ষ, শিশুটির কান্নার প্রতিটি ফোঁটার নিচে সে পেতে রাখে তার হাত

রূপকথার বৃক্ষ, সে তার জাদুশিশুর জন্য পাঠিয়ে দেয় হলদে কবুতর

রূপকথার বৃক্ষ, সে চিঠি লেখে আর চিঠি লেখে

রূপকথার বৃক্ষ, সে অক্ষর বৃত্তি দেয় অন্ধদের ইস্কুলে

রূপকথার বৃক্ষ, সে লংঘন করে শ্রেণির চৌকাঠ, পান করে রোদের করুণা

রূপকথার বৃক্ষ, সে শিরায় শিরায় লিখে রাখে নদীর দিনলিপি

রূপকথার বৃক্ষ, উদ্বাস্তু অহল্যার মতো চুলখোলা মেয়েদের মনে সে গোমতীর তীর

রূপকথার বৃক্ষ, সে মুছে দেয় মুমূর্ষূ বালুকণাদের চোখের জল

রূপকথার বৃক্ষ, সে অভিমান পরাহত নীল মুক্তার দানা

রূপকথার বৃক্ষ, সে বাতাস দেয় প্রাজ্ঞ পরিষদে

রূপকথার বৃক্ষ, সে সুন্দরের অভিজ্ঞান ব্যক্ত করে সবুজ চুম্বনে

রূপকথার বৃক্ষ, তাকে স্বপ্নে পায় এক চন্দ্রাহত যুবক

রূপকথার বৃক্ষ, তার মন পড়ে থাকে এক বুনো পরীক্ষিতের পানে

রূপকথার বৃক্ষ, পরীক্ষিত কোথায় থাকে জানো, সমুদ্রের ঐ-পাড়ে

রূপকথার বৃক্ষ, তার ডালে কুঁড়ি মেলে আঁকিবুকি লালাবোলা চাঁদ

রূপকথার বৃক্ষ, তার পাতায় বাতাস নেয় সাধুপুত্র সওদাগর

রূপকথার বৃক্ষ, কিন্তু কেউ তাকে চিনতে পারে না

রূপকথার বৃক্ষ, তাকে চেনে এক বৃষ্টিবালক ডাহুকপ্রহরে

রূপকথার বৃক্ষ, সে তাকে শোনায় তাদের পুরাজন্মের কাহিনী।

 

 

মোস্তফা হামেদী

তালাশ

 

তোমাকে তালাশ করি

হে রূপ

দেহের কোন বিভায়

গুপ্ত হয়ে আছ

 

কাদার তরল তলে

ডুবে থাকা নাম

মাছের পুচ্ছে জ্বলে

যেন তার বর্ণ সুষমা

 

এই হাওয়ায় পাক খায়

স্বপ্নদুপুর, স্নানের আওয়াজ

চিহ্নের রহস্য খুলে

নেচে ওঠে মনচাবি

 

আমার পরান্মুখ দেহে

ধার করা রং

ঢেকে গেছে যেন নখ

চকমকি পালিশে

 

খুঁটে খুঁটে তুলি আজ

সেসব বাকল

ছিপছিপে কাণ্ড এক

যাতে আড়াল হয়েছে।

 

রোকসানা আফরীন

চুম্বক পরিধি

 

যদি এভাবেই ছিন্ন-পাতার আগুনে পোড়াও পৃথিবী

যদি এভাবেই আততায়ী সময়

নিয়ে যায় নক্ষত্র-মদির রাতে

যদি কখনো ফিরে আসি আবারো

তোমার আঙিনায়, যমুনা নদী তীরে

তবে তোমাকেও হতে হবে শব্দ-জুয়াড়ি

খেলোয়াড় অথবা খিলাড়ি।

 

অজস্র জন্ম শুধু পথে পথে বিফলে কেটেছে

অজস্র জন্ম শুধু ক্লান্তিহীন হেঁটে গেছি পৃথিবীর পথে

ঈশ্বরের বাগানে আমি এসেছি বারবার

ফিরে গেছি বারবার কুসুম ফোটার দিনে

বসন্ত বাতাস আমাকে উড়িয়েছে

অন্ধ-ঘূর্ণির স্রোতে, জলজ আগুনে…

 

আমি কার, কে আমার

এই কথা কারে বলি, কে আছে আর শোনার

এই তরঙ্গিত-উন্মাদ-চুম্বক-পরিধিতে

 

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়

গুরুচণ্ডালি

 

তুমি হেঁটে চলেছ মাংসের পুবদিকে। তুমি হেঁটে চলেছ আপামর

যদিও দুদিকে কোনও শরীর নেই আর সামনে রঙের গহ্বর

 

হাতেটানা রিকশার ওপর কলস

যখন কোমর অব্দি যমুনা আর বৃক্ষ অব্দি বলকল

 

এখানে আরও একটা গল্প আসবে, দক্ষিণ ভেঙে ধারালো হবে আস্তিন

তবু চেয়ার ছেড়ে উঠে যেও না, চেয়ার তেমন বর্ণ নয়

 

হাত ও পায়ের ভেতর কোবরা, জিভের নীচে সার্কাস

মাংসের পুবদিকে অধস্তন, আর ভাণ্ডে ভাণ্ডে জরায়ু

 

আয়ু খাচ্ছ আয়ু মাখছ আয়ু নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ— পুষ্প

বেশ-তো, শঙ্খে শঙ্খে উন্মাদ, এতে গন্ধে কালনাগ

 

তোমাকে শেখাব উদ্‌গার, যার ছন্দে ছন্দে ছারখার

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close