Home অগ্রন্থিত কলিম শরাফী >> দেবব্রত বিশ্বাস : মানুষ ও শিল্পী >> সংগীত

কলিম শরাফী >> দেবব্রত বিশ্বাস : মানুষ ও শিল্পী >> সংগীত

প্রকাশঃ August 24, 2018

কলিম শরাফী >> দেবব্রত বিশ্বাস : মানুষ ও শিল্পী >> সংগীত
0
0

কলিম শরাফী >> দেবব্রত বিশ্বাস : মানুষ ও শিল্পী >> সংগীত

 

 

[সম্পাদকীয় নোট : স্বনামধন্য ‘বাঙাল’ রবীন্দ্রসংগীত গায়ক ও শিক্ষক দেবব্রত বিশ্বাস, যাঁকে সবাই জর্জ-জর্জদা বলে ডাকতেন, ২২ আগস্ট তাঁর জন্মদিন আর মৃত্যুদিন ১৮ আগস্ট। তিনি ছিলেন ভারতের গণনাট্য আন্দোলনেরও অন্যতম পুরোধাপুরুষ ও একজন বিখ্যাত গণসঙ্গীত গায়ক। রাজা পঞ্চম জর্জের দিল্লি দরবারের অব্যবহিত পূর্বে জন্ম বলে তাঁর ডাকনাম রাখা হয় জর্জ। আদি বাড়ি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। কোনো দিন শেকড়ের কথা ভুলতে পারেননি তিনি। এই লেখাটিতে সে কথাই লিখেছেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কলিম শরাফী। কলকাতা থাকা কালে দেবব্রত বিশ্বাসকে খুব কাছে থেকে দেখেছিলেন তিনি। পেয়েছেন স্নেহস্পর্শ ও সাহচর্য। লেখাটি ১৯৮০ সালে দেবব্রত বিশ্বাসের মৃত্যুর পর। লেখাটি এখনও অগ্রন্থিত রয়েছে।]

 

আজো মনে পড়ে জর্জদাকে, দেবব্রত বিশ্বাসকে আমরা এই নামেই জানতাম। প্রথম দেখার দিনটির কথা। বৌবাজার ও সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের সংযোগস্থলে ভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের দপ্তর- সেখানেই গণনাট্য সংঘ আয়োজিত অনুষ্ঠান। আইপিটিএ বা ভারতীয় গণনাট্য সংঘের একজন জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে আমিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছি। একক কণ্ঠে ঘর কাঁপিয়ে দেবব্রত বিশ্বাস গাইলেন হারীন চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গান- নভো মে পতাকা নাচেতা হ্যায়। অবাক হয়ে শুনছিলাম গান, তাকিয়ে ছিলাম এই শিল্পীর দিকে। আইপিটিএ তে আমার সহকর্মী সুবপতি নন্দীই পরিচয় করিয়ে দিলো। স্বভাবসুলভ কিশোরগঞ্জী টোনে জর্জদা বললেন, এটা ক্যাডা? যেমন মজা করে কথা বলেন তিনি সচরাচর, তেমনি আমার নামটি নিয়ে গোলমাল করে উচ্চারণ করে খেলা করলেন বারকতক, তারপর বললেন, বাসায় লইয়া আইবা অরে।

রাসবিহারী এভিনিউতে একতলা-দোতলা মিলিয়ে চার কামরার এক ফ্ল্যাটবাড়িতে তিনি থাকেন। তারপর কতদিন কত সময় যে আমাদের সেখানে কেটেছে, সে হিশেব করাও কঠিন। উপর তলায় থাকতেন তার মা। আমাদের মাসিমা এবং বুড়িদি (ললিতা বিশ্বাস)। নিচের তলায় এককামরায় তিনি থাকতেন – একটা তক্তপোশ পাতা ছিল ঘরে, আর জানালায় থাকতো জর্দা, পান ইত্যাদি। অন্য কামরায় সংগীত চর্চার যন্ত্রপাতি।
তিনি কথা বলতেন আর আমরা তার মুগ্ধ শ্রোতা। কখনো হয়তো সকালে যেতাম, কথা ফুরোতো না। অফিসে রওনা দেয়ার আগে বলতেন, বিকালে আইবা।
বিকেলে তাঁর গান শুনতাম, গান তুলতাম। গণনাট্য সংঘের অনুষ্ঠানের নানা টুকরো অংশের রিহার্সেলও হয়ে যেত সেখানে।
আইপিটিএ-র অনুষ্ঠানে কলকাতায় মফস্বলে গ্রামে কত জায়গায় যে ঘুরে বেরিয়েছেন জর্জদা। বুড়িদিও গণনাট্যে অভিনয় করেছেন। পারলে জর্জদা মাসিমাকেও টেনে নিতেন। মনে হয় বয়সের কারণেই তা সম্ভব হয়নি।
আমাদের গণনাট্য সংঘের তখন জমজমাট অবস্থা। গান গাইতে উঠতেন বিনয়দা (বিনয় রায়), বটুকদা (জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র) এবং জর্জদা। তিনজনের উদাত্ত কণ্ঠে সম্মিলিত গানে মনে হতো যেন কয়েকশো লোক গাইছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্রও তখন নানা আসরে যোগ দিতো।
শুধু আইপিটিএ নয়, আরো নানা কাজে জড়িত ছিলেন জর্জদা। শ্রমিক আন্দোলন ও ছাত্র আন্দোলনে যখন যেভাবে পেরেছেন সহায়তা করেছেন। নিজের চাকুরীস্থল হিন্দুস্থান ইন্স্যুরেন্সের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে সর্বদা অংশ নিয়েছেন। মনে আছে একবার ইন্স্যুরেন্সে আন্দোলন চলছে। মধ্যবয়সী এক কর্মচারি বলছিলেন, দেবব্রত বাবু, আপনি এসবের মধ্যে ঢুকে গোলমাল করছেন কেন? জর্জদা ধমক দিয়ে বললেন, “শাট আপ ইউ মিডল ক্লাস।”
গণনাট্য সংঘের অফিস ইতিমধ্যে স্থানান্তরিত হয়ে উত্তর কলকাতার জোড়াবাগান লেনে ঠাঁই করলো। সুধী প্রধান, খালেদ চৌধুরী, আমি ও অন্যান্যরা এই অফিসেই থাকতাম। সেখান থেকেও জর্জদার বাড়িতে আমরা গান তুলতে যেতাম। গল্পে-গানে রাত করে তাঁর বাড়িতে খাওয়া সেরে ফিরতাম। যেমন আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি, তার একটা পরিচয় মেলে ঘরের তক্তপোশ সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি ছড়িয়ে বসে গল্প করার সুবিধার জন্য। অ্যাজমার রোগী বলে মাটিতে শুতে পারেন না, তাই কোথা থেকে যেন সংগ্রহ করেছিলেন পাটের দড়ির হ্যামক, জানালার সঙ্গে ঝুলিয়ে নিয়ে ঘুমাতেন।
শুদ্ধ উচ্চারণে পরিশীলিত ভঙ্গিতে রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছেন জর্জদা। কিন্তু কথা বলেছেন আজীবন তাঁর স্বভাবসুলভ কিশোরগঞ্জীয় ভঙ্গিতে। নিজের শেকড় তিনি কখনো ভোলেন নি। মনে পড়ে, ১৯৫৬ সালে কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি হঠাৎ ঢাকায় এসে উপস্থিত হলেন। বাবু (জাহেদুর রহিম) এসে খবর দিলো, উনি ঢাকায় এসেছেন কিন্তু আপনার বাড়ি খুঁজে পাননি। আমি পরে মনু কবীরের বাড়ি নিয়ে তুলেছি। আহমেদুল কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানলাম, তিনি কিশোরগঞ্জ গিয়েছেন দেশের বাড়ি দেখতে।
ফিরে এসে তিনি আমার শান্তিনগরের বাসায় উঠেছিলেন এবং সেবার আমরা পুরানা পল্টনে আশরাফ আলী চৌধুরীর বাসায় একটি ঘরোয়া আসরের আয়োজন করেছিলাম। এছাড়া ফজলুল হক হলেও একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল।
দেশের বাড়িটি কোন সৎ-কাজে ব্যবহার করা যায় কিনা, সে ব্যবস্থা করতেই তিনি সেবার কিশোরগঞ্জ গিয়েছিলেন। তাঁর সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি। কেননা বাড়িটি ছিল এক প্রতাপশালী মুসলমান ভদ্রলোকের দখলে।
বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অন্তরের টান কখনো ছিন্ন হয়নি। যখনই ডাক পড়েছে ছুটে এসেছেন এখানে। ‘৫৭ সালে বাফার সম্মেলনে যেমন যোগ দিয়েছিলেন, আবার দীর্ঘকাল পর ’৭২ সালে ছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনেও এসেছিলেন।
আমার মনে হয় গানের ক্ষেত্রে জর্জদা এবং এই সঙ্গে সুচিত্রা মিত্রের নামও উল্লেখ করতে হয়- এঁদের সবচেয়ে বড় অবদান হলো এককালে বড়ো ন্যাকামি করে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হতো, এটা ভেঙেছেন এই দুজন। শান্তিদেব ঘোষ যেমন বলেন, রবীন্দ্রনাথ গানে মেয়েলিপনা পছন্দ করতেন না, সেটা তাঁরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। প্রথাবদ্ধভাবে কারো কাছে গান শেখেননি তিনি। জর্জদাকে আমরা জিজ্ঞাসা করতাম, আপনি গান শিখেছেন কার কাছ থেকে। হেসে তিনি জবাব দিতেন, দীনুদার কাছে। বলে, দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর-কৃত স্বরলিপি গ্রন্থ দেখাতেন।
শিল্পীদের মধ্যে যে সংকীর্ণতা রয়েছে তার শিকার হয়েছেন জর্জদা। রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপির শুদ্ধতা বজায় রেখে গাইলেই হলো- গানে অর্কেস্ট্রা থাকবে কি থাকবে না, এই প্রশ্ন কেউ তুলতে পারে না। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, শিল্পী হিসেবে তো জর্জদা বড় ছিলেন, কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন আরও বড়। যাকে আমরা মানবতাবাদী বলি, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন তিনি।
১৯৪৬-এর প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসকে কেন্দ্র করে সংঘটিত দাঙ্গার কথা আমি কখনো ভুলবো না। সাম্প্রদায়িকতার সেই উন্মত্ত দিনগুলোতে অনেক বড় বড় বুদ্ধিজীবীকে দেখেছি উগ্রতা অন্ধতা দ্বারা আচ্ছন্ন হতে। সাম্প্রদায়িকতার বিন্দুমাত্র প্রকাশ জর্জদার মধ্যে দেখিনি। বরং তিনি সর্বদা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। আমার জীবনরক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর সহযোগিতা লাভের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি তাঁর গ্রন্থেও সে ঘটনার উল্লেখ করেছেন।
১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসকে কেন্দ্র করে কলকাতায় শুরু হয় ভয়াবহ দাঙ্গা। কুকুর-বিড়ালের মতো মারা হয় মানুষ- হিন্দু পাড়ায় মুসলমান এবং মুসলমান পাড়ায় হিন্দু। আমি তখন থাকতাম এক হিন্দু বন্ধুর বাড়িতে, বাড়িটি মুসলমান এলাকায় হলেও যেতে হতো বালিগঞ্জ স্টেশন হয়ে। ১৬ আগস্ট ঘটনাক্রমে হাওড়ার রামরাজা তলায় থাকায় বুঝতে পারিনি রায়ট নামে কি ভয়াবহ ঘটনা কলকাতায় ঘটেছে।
১৮ তারিখ ট্রেনে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে অবস্থাটা অনুমান করতে পারি। নিয়মিত বাস সার্ভিস বন্ধ, কেবল রিলিফ কমিটির বাস চলছে। তাতে করে বালিগঞ্জ স্টেশনে যাবো ভেবেছিলাম। এক সরদারজি বললো, এসো আমার সঙ্গে। রাস্তায় অনেক নারকীয় তাণ্ডব চোখে পড়ছিল। ভবানীপুরে বাস থামতেই আমার এক শিল্পীবন্ধু সমরেশ রায় আমাকে দেখেতো হতবাক। অস্থির হয়ে সে বারবার বলতে লাগলো, তুই এখান থেকে পালিয়ে যা, পালা। সে এমন উত্তেজিত হয়ে উঠছিল যে আমি তাকে বললাম, তুই একটু স্থির হ, আমি যাচ্ছি।
সোজা রাসবিহারী মোড়ে নেমে আমি হাঁটতে শুরু করি। কোনো কিছু না পেয়ে আমি জর্জদার বাড়িতে ঢুকে পড়ি। আমার সৌভাগ্য সে সময় আমাকে কেউ দেখতে পায়নি। জর্জদা দেখেই চিৎকার করে উঠলেন, শম্ভু, হারামজাদা আইছে। শম্ভু মিত্র তৃপ্তিকে বিয়ে করে বোম্বে থেকে কলকাতা ফিরেছেন, থাকতেন জর্জদার সঙ্গেই। তাঁর ঘরে আমাকে তক্ষুণি খাটের নিচে ঢোকানো হলো। সেখানেই আমার লুকিয়ে থাকার ব্যবস্থা। সাতদিন আমি ওই অবস্থায় ছিলাম। বাড়ির চাকরটিও ব্যাপারটি জানতে পারেনি, কারণ সে আমায় চিনতো। কোনো এক ভলেন্টিয়ার এখানে খাওয়া-দাওয়া করবে, এই বলে আমার জন্য খাবার রাখা হতো। রাত 12টায় আমাকে তুলতেন জর্জদা, তখনই কেবল মুখ-হাত ধোওয়া ও খাওয়া হতো। ২৪ কি ২৫ তারিখ, বালিগঞ্জ থেকে কেবলমাত্র এসপ্লানেড অবধি পৌঁছানোর কৌশল তাঁরা আটলেন। শম্ভুদার দায়িত্ব বাস থামানো, জর্জদা আমাকে নিয়ে গলি থেকে দৌঁড়ে বাসে তুললেন। ধুতি, পাঞ্জাবি ও গান্ধীটুপি আমার পরনে। সেইভাবে এসপ্লানেড গিয়ে ডেকার্স লেনে কাকাবাবু, অর্থাৎ কমরেড মুজাফফর আহমদের কাছে আমাকে পৌঁছে দিলেন জর্জদা।
পরে জেনেছি, আমাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য তাঁর প্রতিবেশীদের কাছে তাঁকে অনেক লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়েছিল। এর মধ্যে সমরেশের মুখে বাসে আমাকে দেখার খবর শুনে হন্তদন্ত হয়ে হেমন্ত (মুখোপাধ্যায়) এসেছিল জর্জদার কাছে কলিমের খবর নিতে। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জর্জদা বলেছিলেন, আর কি হইবো। হারামজাদা নিশ্চয় মারা গেছে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close