Home ছোটগল্প কাজী রাফি > মেঘে ঢাকা শশী >> ছোটগল্প

কাজী রাফি > মেঘে ঢাকা শশী >> ছোটগল্প

প্রকাশঃ November 22, 2017

কাজী রাফি > মেঘে ঢাকা শশী >> ছোটগল্প
0
0

[সম্পাদকীয় নোট : আজ কথাসাহিত্যিক কাজী রাফির জন্মদিন। রাফির জন্মদিনে তার প্রতি তীরন্দাজের শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ প্রকাশিত হলো রাফির একটা ছোটগল্প।]

কাজী রাফি > মেঘে ঢাকা শশী >> ছোটগল্প

 

দক্ষিণ বঙ্গের ভ্যাপসা গরমে সরকারি ভূমি জরিপ কাজে মাঠে এসে অনিমের প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে বিসিএস পরীক্ষা আর ভালো একটা চাকরির খোঁজে কেটে গেল এক বছর। হাসপাতালে শয্যাশায়ী বাবা আর ডায়াবেটিকে আক্রান্ত মাকে একটু স্বস্তি দিতেই সে অবশেষে ভূমি জরিপ অফিসে একজন কর্তার পদে পরীক্ষা দিয়ে চাকরিটা পেয়ে গেল।

কিন্তু ভূমি অফিসের এমনকি সামান্য কেরানির দৌরাত্ম্য এবং অন্যসব কর্তাদের মুখের দুইপাটি দাঁতের মাঝে লাল পান যেভাবে সে চর্বিত হতে দেখল তাতে তার মনে হলো এই দপ্তরে কর্মরতদের ‘স্বপ্ন’ তাদের মনে, হৃদয়ে অথবা মাথায় বাস করে না, ভূমি দপ্তরে কর্মরতদের স্বপ্ন বাস করে চর্বিতচর্বণে। পানের রস-স্বাদে জিহ্বা আর দুই ঠোঁটের ওঠানামা তাদের অক্ষিগোলককে এতটাই কুঁতকুঁতে করে তোলে যেন মনে হয় তাদের চোখে কোনো স্বপ্ন নয় বরং সেখানে বাস করে ঝকঝকে টাকার প্রতিবিম্ব। কান দুটো তাদের সেইসব ঝকঝকে টাকার কচকচে শব্দ শোনার নেশায় এত মশগুল যে, তাদের শ্রবণেন্দ্রিয় মানুষের কথা শোনার চেয়ে কাগজের পাতার শব্দে লুকানো অনিয়ম শোনার জন্য উদগ্রিব। অনিয়মকে ‘নিয়ম’ করে দিলে উপরি উপার্জন বেশি হয় কি না!

মধ্যবিত্ত ঘরে জন্মেও অনিম মূল্যের জন্য নয় বরং জীবনের অর্থবহতার জন্য সবসময় স্বপ্ন দেখেছে। শিক্ষক বাবার কাছ থেকে সে শিখেছে, মানুষের প্রাথমিক জীবনটা তার আত্মার অনুশাসনে নির্মিত স্বপ্নভূমিতে বিচরণ করে। বাস্তবতা মানুষ প্রাণীকে এত নির্মমতার দিকে ঠেলে যে, একসময় তারা টাকা উপার্জনকেই স্বপ্ন মনে করে। কী জানি, দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে বাঁচতে চাওয়াটা হয়তো তাদের কাছে আর অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না। কিন্তু যাদের অনেক কিছু আছে তারা শুধু স্বপ্ন নয় আত্মাটাকেও কেন বিক্রি করে দেয়? এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর অনিম খুঁজে পায় না।

শহরের শেষপ্রান্তে দুই কামরার ছোট্ট এক টিন-শেড বাসা ভাড়া করেছিল অনিম। তার বাসাটার দক্ষিণে একটা ডোবা, উত্তরে বাঁশবাগান আর ঘন গাছের সারি। পূবদিকে এক মনোরম বাগানবাড়ি। অনিম বোঝে, এটা কোনো ধনীর বাগানবাড়ি। তার শুধু মনে হয়, শশীর হয়তো এমনই কোনো সম্ভ্রান্ত ঘরে বিয়ে হয়েছে। নিজের ঘরে এসে প্রচণ্ড এই গরমে সে এসব আর ভাবতে চায় না। মা-বাবার চিকিৎসার জন্য, শহরের প্রান্তের বাড়িটা মেরামতের জন্য তার নিজেরও এই স্বপ্ন-বিক্রেতাদের দলে মিশে যাওয়ার কথা অথচ সে কি না উলটা ন্যায়-নীতির প্রশ্ন তোলায় নিজের ভাগ্যে বদলি জোটাল! তা-ও একেবারে দেশের শেষপ্রান্তে। তবু, না পারল সে তাদের দলে মিশতে, না পারল নিজের মতো থাকতে। টাকার লোভ তাকে যে মাঝে মাঝে লোভাতুর করেনি তা নয়। বরং সে জীবনের সব সমস্যা সমাধানের দ্রুত পথ হিসেবে এই পথে পা বাড়ানোর দ্বিধান্বিত চিন্তায় নিজের হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে তুলেছে। কিন্তু বাবা-মায়ের সরল মুখচ্ছবি আর শশীর কথা মনে হওয়ামাত্র নিজেকে সে শুধরে নিয়েছে।

ভালোবাসা হয়তো ততদিন বেঁচে থাকে যতদিন তা মানুষকে তার বোধের কাছে স্বচ্ছ রাখে। প্রচুর অর্থ-বিত্তের মালিকের সন্তান নয় বলে যে শশীকে সে হারিয়েছে সেই অর্থকে সে এমন পন্থায় পেতে চায় না যা শশীর ভালোবাসাকে ছোট করে দেয়। কারণ শশী অর্থ নয়, তাকেই ভালোবেসেছিল। অনিমের মনে পড়ল, বই পড়ার প্রতি শশীর প্রবল আগ্রহের জন্য শশীর বাবা একদিন অনিমের বাবা নেহাল আহমেদকে গিয়ে বললেন,

আমার বইপাগল কন্যার জন্য আপনার লাইব্রেরিটা ব্যবহারের অনুমতি দিলে আমি খুব খুশি হই। আপনার লাইব্রেরিতে নাকি সেরা সব বই আছে।

নেহাল আহমেদের জীবনে খাওয়া-পড়া আর প্রয়োজনীয় খরচ ব্যতিত যা সঞ্চয় তার সবই গেছে এই গ্রন্থাগারের বই কিনতে। তিনি ভেবেছিলেন, আশপাশের ছেলে-মেয়ে, ছাত্র-ছাত্রী আর সব বয়সি মানুষ তার গ্রন্থাগার ব্যবহার করে মননশীল হয়ে উঠবে। কিন্তু সামান্য কয়েকজন ছাড়া কেউ-ই তার গ্রন্থাগারে আসে না বলে তিনি মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে ওঠেন। আজ শহরের এক ধনী আর সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে তার এই গ্রান্থাগারে পড়তে চাইছে ভেবে তিনি এত আনন্দমুখর হয়ে উঠলেন যেন তার জীবনের সব স্বপ্ন সার্থক হতে চলেছে।

শশী নামের মেয়েটিকে তিনি শুধু গ্রন্থাগার ব্যবহারের অনুমতিই দিলেন না, বেছে বেছে পড়ার জন্য তিনি শশীর বই নির্বাচন করে দিলেন। হ্যান্স অ্যান্ডারসনের গল্প দিয়ে শুরু করে একসময় শশী শেক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মানিক, জীবনানন্দ, মার্কেস- সবাইকে পড়া শুরু করল। জ্ঞানপিপাসু শশীকে নেহাল আহমেদ এতটাই ভালোবাসলেন যে, সন্ধ্যাবেলায় তিনি তাকে পড়ানো শুরু করিয়ে দিলেন। তিনি পবিত্র কোরান শরীফের আয়াতগুলোর প্রতিটি শব্দের গভীরতর অর্থ শশীর কাছে ব্যখ্যা করলেন, বেদ-গীতা, মহাভারত-উপনিষদ আর বাইবেল হয়ে অনেক মহৎ উপন্যাস পাঠে শশীর মানস-গঠন হয়ে উঠল সবার চেয়ে আলাদা। ভিঞ্চির আঁকা ‘দ্য লাস্ট স্যাপার’ চিত্রকর্মের মাঝে লুকানো গোপন এক ইতিহাস নেহাল আহমেদ যে ঝড়ের রাতে তাকে বুঝিয়ে বলল, শশী এত মগ্নতায় তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করল যে, রাতে বেঘোর ঘুমে সে স্বপ্ন দেখল, সে যীশুর পাশে একটু কাত হয়ে বসে মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছে। যিশুও এমন ভঙ্গিতে কাত হয়ে তার কানের পাশে এমন অবয়ব তৈরি করে ফিসফিস করছেন যে তাদের দেখলে মনে হবে, দুজনের শরীর একটা উল্টা ইংরেজির ‘এম’ অক্ষর যা ঘুরিয়ে দিলে ‘ডব্লিউ’ হয়ে যায়। তবু যিশু যেন এক আয়নার ভেতরে শশীরই শরীরের উলটা প্রতিবিম্বমাত্র। কিন্তু যিশুর পেছনে তার ডানের লোকটি তালুহীন এক হাতে লুকিয়ে রাখা চাকুকে শক্ত করে ধরে ইংরেজিতে ফিসফিস করে বলছে,

ইউ ক্যান নেভার হাইড ইয়োরসেলফ।  উই নো ইউ আর অ্যা উওম্যান, ইউ আর ম্যারি মাগদালিন! ইউ উইল বি কিলড সুন…

স্বপ্নের ভাব-গাম্ভীর্যে ডুব দেয়ার সামর্থ শশীর ছিল না। সে ভয়ে চিৎকার করে উঠল। পর দিন শশীর কাছে তার স্বপ্নের কথা শুনে মানস-কারিগর নেহাল আহমেদ স্মিত হাসলেন এবং নস্ত্রাদামুর ভবিষ্যতবাণী নিয়ে লম্বা এক গল্প শোনানোর পর শশীর মাথায় হাত রেখে বললেন,

মা, আমি তোমাকে আমার পুত্রবধু করে পেলে খুব খুশি হব, যদি তোমার কোনো আপত্তি না থাকে।

শশী এখানে যাতায়াত করতে করতে নেহাল আহমেদের একমাত্র নীরিহ ছেলে অনিমকে  কখন ভালোবেসে ফেলেছিল। ভালোবেসে ফেলেছিল আড়ম্বরহীন, সাদামাটা অথচ প্রজ্ঞার আড়ালে লুকিয়ে রাখা এই পরিবারের মানুষের জীবনবোধকে। শশী ভালোবেসেছিল তার শিক্ষক নেহাল আহমেদের চোখের কোণে জেগে-থাকা নিষ্পাপ এক চাউনিকে যিনি ঘুরে-ফিরে বারবার একই পোশাক পড়েও কখনো তা খেয়াল করতে শেখেননি। এই পরিবারের সংস্পর্শে এসে শশী উপলব্ধি করতে শিখেছে যে, অর্থ ছাড়াই মানুষের জীবন কত সমৃদ্ধ হতে পারে…

নেহাল আহমেদের প্রস্তাবে একরাশ লজ্জা এসে শশীকে ভাষাহীন খুশিতে আরক্তিম করে তুলল এবং সে পালিয়ে গেল। শশীর বাবার কাছে নেহাল আহমেদের এই প্রস্তাব পৌঁছানোমাত্র সেটাই অনিমের সামনে হয়ে শশীর শেষবারের জন্য তাদের বাসা থেকে পালিয়ে আসা হয়ে গেল। তিনি নেহাল আহমেদের বাসায় শশীর যাওয়া শুধু বন্ধই করলেন না, তাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করলেন,

দরিদ্রদের এই এক সমস্যা। সামান্য বিদ্যার বিনিময়ে তারা ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখে! বাবার কথায় শশী ফুঁসে উঠল,

বাবা, তাঁকে নিয়ে কোনো বাজে কথা বলবে না, তিনি আমার শিক্ষক। তার মতো জ্ঞানী আর তার সমকক্ষ মানুষ এই শহরে একজনও নেই। তার যা আছে, তা আমাদের সমস্ত সম্পদ দিয়ে কেনা যায় না!

মেয়ের কথায় শশীর বাবা এতটাই ক্ষিপ্ত হলেন যে, তিনি তার লেখাপড়া বন্ধ করে তার বিয়ের বন্দোবস্তে উঠে-পড়ে লাগলেন। একদিন তিনি শশীর মাকে বললেন,

দেখলে তো, বই পড়ায় তোমার মেয়ের কত উন্নতি! তোমাকে বলেছিলাম, যত বই লাগে আমি কিনে দিচ্ছি। না, নেহাল মাস্টারের লাইব্রেরি দরকার। নেহাল আহমেদ তোমার মেয়ের পাখা গজিয়ে দিয়েছে। আর সব নষ্টের গোড়া আসলে তুমি। কারণ তুমি সেটা অনুমোদনকারী। শশীর মা আমতা আমতা করলেন,

অনিম তো খারাপ ছেলে নয়…

চুপ! আর একবার যদি ছেলেটার নাম তোমাদের মুখ দিয়ে বের হয়, তাহলে অনিমকে আমি পৃথিবী থেকে বিদায় করে দেব। ভিক্ষুকের ঘরে মেয়ের বিয়ে দেবে এই শহরের এক ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্ট! কী শুরু হয়েছে এসব? এখনকার মেয়েরা আধুনিক হচ্ছে, তারা ল্যাপটপ, ট্যাব, ফেসবুক ব্যবহার করছে আর আমার মেয়ে ঐ উঁইপোকায় ধরা বই পড়ে মাথায় উঁইপোকা ঢুকিয়েছে! তার কাপড়-চোপড় দেখেছ? ব্যাক ডেটেট… আমার এখন মনে হচ্ছে ঐ বাড়িতে যাতায়াত করতে করতে…

শশী বাবা-মায়ের বেডরুমের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে বলল,

বাবা, অনিমের সাথে আমার বিয়ে তোমাকে দিতে হবে না। যেখানে ইচ্ছা সেখানে তুমি আমার বিয়ে দাও। কিন্তু প্লিজ, এসব নিয়ে মাকে আর কিছু বলো না, অনিমদের পরিবারকেও ছোট করে কথা বলো না।

হুম, তোর যে বেশবাস, কোন আধুনিকমনা ছেলে তোকে বিয়ে করবে! থাকিস তো নানিদের আমলের কাপড়-চোপড় পড়ে…

বাবা শোনো, যারা খুব আধুনিক ছেলে তারা আজকাল পোশাক ছাড়া মেয়েদের দেখে অভ্যস্ত। উইপোকায় ধরা বইয়ের চেয়ে ল্যাপটপ আর ইন্টারনেটে ঐ মেয়েদের দিকে তাদের প্রবল আকর্ষণ বলে আমি এইসব ছেলেদের চোখে দ্রষ্টব্য হওয়ার জন্য সংক্ষিপ্ত কাপড় পরি না। ধনাঢ্য আর সম্ভ্রান্ত শব্দের এইসব তরুণদের ‘পৌরুষ’ ইয়াবা অথবা ভায়াগ্রা গোলাপি-মেরুনবর্ণ ছাড়া আজকাল আর জাগে না– কথাগুলো আমার নয়, খুবই আধুনিক এইসব তরুণদের বিয়ে করা আমার বান্ধবীদের কথা এগুলো।

বাবা-মেয়ের চোখাচোখিতে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। শশীই আবার বলল,

আমার শিক্ষক আর উইপোকায় ধরা বইগুলোই আমাকে শিখিয়েছে, নিজের আত্মাকে উইপোকার হাত থেকে কীভাবে বাঁচাতে হয়। আমি যেসব বাঙালি পোশাক পড়ি তা সব অত্যাধুনিকা মেয়েদের নোংরা কাউবয়-জিন্সের চেয়ে পরিস্কার। তুমি যাকে ভিক্ষুক বললে তার আত্মার আলো এত উজ্জ্বল যে, আমার কোনোদিন মনে হয়নি তিনি অনেক বছর ধরে একই পোশাক পড়ে আছেন। তার গায়ের জামাটি তার আত্মার মতোই শুভ্র, পবিত্র। তার গায়ের জামা তার মনের আনন্দের রঙে নিত্যনতুন রঙিন…।

মেয়ের গালে কষে এক থাপ্পড় দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হলেন না। শশীর বিয়ে দেবেন এমন সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করলেন। অনেক গুণে গুণান্বিতা শশীকে পাবার জন্য অত্যাধুনিক পরিবারের মায়েরা কেন এত মরিয়া হয়ে উঠলেন তা বোধগম্য নয়।

এসব ভাবতে গেলে অনিমের ভেতরটা কেমন হুহু করে ওঠে। বাবা-মায়ের কাছে থাকাটা তার জরুরি ছিল। কিন্তু ‘মূল্যমানের জন্য জীবন নয়, জীবনকে ব্যয় করতে হয় অর্থবহতার জন্য’– বাবার  এমন শিক্ষার জন্য তাকে এখন চরম মূল্যই দিতে হচ্ছে। নেহাল আহমেদ জানেন না, এই সমাজ কী দারুণভাবে বদলে গেছে! এই সমাজের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজের প্রচার-প্রচারণায় এত ব্যস্ত আর সরব যে, অন্যের মানবিক আর্তি শোনার জন্য কারো সময় নেই। এই সমাজের পণ্য হয়ে ওঠা মানুষগুলো ঝিঁঝি পোকার মতো নিজেদের  প্রচারণার কলতানে এমন এক মুখরিত জনপদ সৃষ্টি করেছে- যেখানে বাবার শেখানো ‘অর্থবহ-জীবনবোধের’ চেয়ে আর্থিক অথবা বৈষয়িক মূল্য নিয়ে ধ্বস্তাধস্তিরত মানুষগুলোর কাছে গভীর হৃদয়ের মননশীল মানুষগুলোর সংজ্ঞা এখন ‘পরিত্যক্ত’ শব্দে সীমাবদ্ধ হতে চলেছে। বাংলা অভিধান থেকে কিছুদিনের মধ্যে ‘আনচান’ শব্দও হয়তো পরিত্যক্ত হবে কেননা, আগামী দিনের ব্যস্ত মানুষগুলোর মন কারো জন্য অমন প্রাচীন অনুভূতিতে আক্রান্ত হবে না। এসব শুনলে তবু বাবা তাকে বলবে,

বাবা, মানুষের জন্য হতাশা শব্দ প্রযোজ্য নয়। পরিশেষে মানুষকে তার আত্মিক ভূমির কাছেই ফিরে আসতে হবে। মানুষের যাত্রা সবসময় আলোর দিকে, জ্ঞানের পথে। জ্ঞানের পথেই মানুষ ধাবিত হবে-সেজন্যই স্রষ্টা মানুষকেই শুধু জ্ঞান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন।

এ বছর জৈষ্ঠ্য শেষ হতে না হতেই বর্ষা প্রবল হয়ে উঠল। আকাশের ডামাডোল আর যেন কোনোদিন থামবে না আর অনিমেরও হয়তো কখনো এই অঞ্চলের ভূমি জরিপ করা শেষ হবে না। মেঘের আঁধার-ঢাকা এক নিঃসঙ্গ পৃথিবীতে অনিমের আজ শশীকে খুব মনে পড়ছে। প্রতিটি বজ্রের আলোর সাথে শশীর মুখটা ভেসে উঠেই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। মনের ভার কমাতে সে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাস দিল,

‘এমন নিঃসঙ্গতার অনুভবে ভরিয়ে তুলতে বৃষ্টির যেন জুড়ি নেই, সত্যিই এমন বৃষ্টি দেখিনি কোনোদিন! এ যেন অতুল স্নেহভরা ভাদ্রের জোয়ার। আহ! বৃষ্টি, তুমি এমন করে একা করে দাও, এমন করে তুমি জীবনের না পাওয়া স্বপ্নের ভেতর, এমন করে নিজের ভেতর আর হারিয়ে ফেলা কোনো দুটি মায়াবী দৃষ্টির ভেতর ডুবিয়ে নিয়ে অনন্য অনুভবের মায়ায় পরিশেষে ভালোবাসতে শেখাও… আমার মতো নগন্য মানুষের জীবনকে!’

সেই রাতে আকাশে প্রতি সেকেন্ডে এগারোটি করে তীব্র আলোর ভয়ংকর বজ্রপাত আর তার এগারোটি প্রান্তর থেকে প্রতি সেকেন্ডে এগারোটি ভয়াবহ নিনাদ অনিমকে কেমন ভয় পাইয়ে দিল। বিজলি আর মেঘের গর্জন কিছুতেই থামছে না। আকাশের পরতে পরতে এখন মানুষের বুদ্ধিমত্তা ছড়ানো। স্যাটালাইট, মোবাইল ফোনের ট্রিলিয়ন ফ্রিকোয়েন্সি, অযুত দূরদর্শন যন্ত্রের যন্ত্রনার পাখনায় ভর করে বজ্রের আলো হয়তো নিজের ফ্রিকোয়েন্সি হারিয়ে মানুষের সৃষ্ট সকল ফ্রিকোয়েন্সির ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে। মনে পড়ল, কৈশোরের কোনো এক সন্ধ্যায় বাবা তাকে বলেছিল,

মানুষের বুদ্ধিমত্তা একদিন পৃথিবীর ধ্বংস ডেকে আনবে সেজন্যই তাদের জ্ঞানী হওয়া প্রয়োজন। বুদ্ধি আর জ্ঞানের মাঝে পার্থক্য বুঝতে না শেখা অনিম তাঁর মুখের দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকতেই তিনি আবার বললেন,

যখন পৃথিবীর মানুষগুলো দেখবে যে, শেষ রাতের আকাশে বিজলি আর মেঘের গর্জন কিছুতেই থামছে না, ভয়ংকর বজ্রপাতে যে রাতের আকাশ দিনের আলোর মতো আলোকিত হবে, আর মেঘের নিনাদ কোনোভাবেই থামতে চাইবে না, সেদিন বুঝে নিতে হবে ‘বিজ্ঞান’ নামক বুদ্ধিমত্তার চর্চায় বিকারগ্রস্ত এবং ব্যবসায়িক মনোভাবসম্পন্ন মানুষগুলো প্রকৃতির সর্বনাশ করেছে। সেদিন বৃক্ষের সেইসব ফল যা মানব শরীরের জন্য খুব প্রয়োজনীয় লবণ এবং রস ধারণ করে সেগুলোর ভেতরটা শুষ্ক হয়ে যাবে। মাটিতে লবণ ভক্ষণকারী পরজীবী কীট আর চোখে দেখা যায় না এমন ক্ষুদ্র পোকার খাদ্য হবে ফলবান বৃক্ষ। জ্ঞান আর বুদ্ধি এক নয় বাবা। বুদ্ধি মানব সমাজকে যতটা সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে দেয়, পুনরায় নিচের দিকে পতনকে ডেকে আনে, জ্ঞান আর প্রজ্ঞা ততটাই মসৃণ পথে তাদের পথচলাকে নিশ্চিত করতে চায়, পাহাড়ে ওঠার আনন্দটাকেই জ্ঞান বড় করে দেখে বলে সে চূড়ায় আরোহন করে সব চাওয়া-পাওয়া শেষ হয়েছে ভেবে আত্মহনন করতে চায় না।

‘বাবার মতো কেউ ভাবেন না’ –নিজকে নিজেই কথাগুলো বলতেই তার কেমন একধরনের বিষণ্নতা পেয়ে বসে। বাবার ভাবনাগুলো হয়তো শশী আর তার কাছেই এমনভাবে ভাষা পেত, যার হয়তো কোনো অর্থই নেই অথচ বাবা তা বলতেন শশী এবং তার মননের পরিধি বাড়ানোর জন্য। অনেকক্ষণ এক ঘোরের মাঝে অনিম চুপ করে বসে থাকে। তারপর কয়েকদিন শুধু বারান্দায় বসে বসে বৃষ্টি দেখা আর কাথার মধ্যে শুয়ে শুয়ে সে একটার পর একটা বই পড়া শুরু করে।

কিন্তু, এমনি বাদল নিনাদিত এক মধ্যাহ্নে একজন মধ্যবয়সী মহিলা এসে, অনিমের দরজায় কড়া নাড়ল। অনিম দরজা খুলতেই তিনি একটা টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি হটপট অনিমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,

আফায় পাডাইচে। ও মনু, হোনেন, আইজ থ্যাইক্যা আপনার খাবার মুই নিয়া আনিম। আফা আপনারে বৃষ্টিতে ভিজা ভিজা চাতালের দোকানডায় গিয়া খাইতে নিষেদ করছেন।

অনিমের মাথায় যেন বাজ পড়ল। দক্ষিণাঞ্চলে তার চৌদ্দগোষ্ঠির কেউ কোনোদিন বাস করেছে বলে সে শোনে নি। সে চিন্তিত হয়ে মহিলাকে প্রশ্ন করল,

আমি তো কাউকেই এখানে চিনি না। কোন আপা?

তা না চিননেরই কতা, আপা কইচে, আপনার মাথায় গণ্ডগোল আছে। সবকিছু ভোলনের রোগও আছে। বলে হাসতে হাসতে মহিলা চলে গেলেন। হটপট হাতে নিয়ে হতভম্ব হয়ে অনিম তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।

ঝর-ঝর-ঝরা বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের মাঝেই অনিম হটপট থেকে টিফিন ক্যারিয়ার বের করে একে একে ঢাকনা খুলল আর অবাক হলো। তার কি আসলেই স্মৃতিভ্রমের রোগ হয়েছে? পটলের সাথে বুট মিশিয়ে ভাজি, টাকিমাছ ভর্তা, দেশি মাগুর মাছের ঝোল আর সব তারই পছন্দের খাবার। আগ্রহভরে  প্লেটে দ্রুত খাবারগুলো নিয়ে সে টেবিলে বসল। তার জিহবাকে এই খাবারের স্বাদে বেশিক্ষণ রহস্য খুজতে হলো না বরং অনিমের চারপাশে এক রহস্য ঘনীভূত হয়ে এল। খাবারের প্রতিটি গ্রাসে সে শশীর অস্তিত্ব টের পেল! না কি খুব ক্ষুধার্ত মানুষের ভালো খাবার পেলে তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় কিছুর অস্তিত্ব সে টের পায়?

দুই দিন এভাবেই খাবার এল। আর আনমনা অনিম আরো আনমনা ভঙ্গিতে খাবারগুলো খেতে গিয়ে ভেজা ভেজা আবেগ নিয়ে মা-বাবা আর শশীর কথা মনে করে প্লেটে খাবার রেখে ঝর-ঝর-ঝরা বৃষ্টির পানে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকল। তৃতীয় দিনে মহিলা আবার খাবার আনলে অনিম তা প্রত্যাখান করল। মহিলা খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

হোনেন, আমি বুইচ্ছি ক্যা। গণ্ডগোল আপনার নয়, হের মাথাতেই। আমারে কয়, খাবার না নিতে চাইলে হেই আইস্যা আপনেরে গুলি কইর‍্যা দেবে…

কিন্তু, তিনি কোথায় থাকেন? আমাকে চেনেন কীভাবে? আমি প্রতিদিন তার খাবার কেন খাব?

আল্লারে! ক্যামনে কই, শুদু চেনা! হেই তো আপনেরে পাগলের মতন ভালোবাসে।

সেদিন রাতের খাবার হটপটের ভেতর থেকে অনিম আর বের করে না। কি এক ঘোরের মধ্যে ডুবে গিয়ে আবোল-তাবোল ভাবতে ভাবতে পাশের ডোবা থেকে ভেসে আসা কোলাব্যাঙের আর্তস্বরের মাঝে হঠাৎ তার মনে হয়, সে তার বাসার কদম গাছটার পাশে তার ঘরেই শুয়ে আছে। টুকরা টুকরা স্মৃতিগুলো তাকে আনমনা করেই চলে। কারো সম্পর্কে না জেনেই তাদের পাঠানো খাবার খাওয়া মোটেই ভালো কাজ হয়নি– ভাবনাটা মাথায় আসামাত্র তার ভেতরে অপরাধবোধ তীব্রতর হয়ে ওঠে। আকাশের বজ্র তার তালে নিনাদিত। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তার ঘর হতে বাইরের সমগ্র চরাচর হয়ে আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত এক অন্ধকার সবকিছুকে গ্রাস করে আছে। এই অন্ধকারেই শুয়ে শুয়ে এলোমেলো ভাবনায় তলিয়ে যেতে থাকে অনিম। বিছানা থেকে উঠে মোম অথবা হারিকেন কিছুই জ্বালাতে তার ইচ্ছা করে না। বাতাস ক্রমশ তীব্র হয়। এই বাতাস তার বুকের ভেতর জমাটবাঁধা প্রেমহীনতার বিষণ্নতাকে যেন আরো উসকে দিচ্ছে। এই বিষণ্নতা শোঁ শোঁ শব্দের ডানা ধরে অনিমের কাছে ‘শ…শী’, ‘শ…শী’ হয়ে যাচ্ছে।

মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে অবাক হয়ে স্পষ্ট অনুভব করে, তার মাথার কাছে কে যেন বসে আছে। আলতো করে তার চুলের মাঝে বিনুনি কাটছে। ‘মা এলো কোত্থেকে?’ এমন ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেলেও সে তবু বিস্ময়ভরা কন্ঠে বলল,

শশী! তুমি? ছায়ামূর্তি কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল,

আমি একটা চাকু নিয়ে এসেছি।

চাকু?

হ্যাঁ, তোমাকে খুন করব বলে। বলো, রাতের খাবার কেন খাওনি?

আসলে, কখন যে  ঘু…মি…য়ে পড়ে…ছিলাম। কিন্তু… তুমি!

শশীকে এই অন্ধকার রাতে কাছে পাওয়াটা স্বপ্নঘোর বলেই তার মনে হলো। সেই অনুভূতি থেকে বাঁচতে এবং শশী সত্যি সত্যি আজ তার এত কাছে– তা স্পষ্টভাবে বুঝতেই যেন অনিম লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠতে চাইল। কিন্তু কী এক অসাড়তা তাকে চিরদিনের জন্য যেন বিছানায় লেপটে দিয়েছে। অন্ধকারে শশীর দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তার চুল-ত্বক হতে চিরচেনা এক গন্ধে আকুল হতে হতে সে সব ভাষা হারিয়ে চুপ করে বসে থাকল। শশী জানে, অনিম কখনোই সীমানা অতিক্রম করে তার হাতটা ধরবে না। অনিম দিনের আলোতে যেমন আঁধারেও তেমন। অনিমের মায়াকাড়া নিরীহ এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই শশীর এত ভালোবাসা কেড়েছিল যে অনিম ছাড়া আর কাউকেই সে গ্রহণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। অনিম তাকে প্রশ্ন করল,

কিন্তু শশী তুমি কীভাবে জানলে যে, আমি এখানে? ফেসবুকের স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে? না, না… তা তো হওয়ার নয়। আমি জানি, তুমি ফেসবুক ব্যবহার করো না। অনিমের মাথার মধ্যে কী এক ঘোর এসে ভর করেছে যে, নৈঃশব্দ্যের মাঝেই শশীর গল্পটা শুনতে থাকে। চলচ্চিত্রের কোনো এক চিত্রনাট্যের মতো শোনায় সেই গল্প-

শশীর বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্নের পর সে এক বান্ধবীর সহায়তায় পালিয়ে প্রথম এসেছিল এই দক্ষিণাঞ্চলে, অনিমের ভাড়া করা ছোট্ট বাড়িটার সামনে যে প্রাসাদপোম বাড়ি, বান্ধবীদের সেই বাগানবাড়িতেই কেটেছে তার পলাতক জীবনের কয়েক দিন। এখান থেকে শশীর বাবা মেয়েকে এই শর্তে ফেরাতে পেরেছিলেন যে, তিনি আর কোনোদিন শশীর কোনো বিষয়ে জোর খাটাবেন না। শশীর জীবনের এই বাঁকগুলো নিভৃতচারি নেহাল আহমেদ যেমন জানতে পারেননি তেমনি জানতে চায়নি অনিম। যেন জানতে চাওয়াটা এক ধরনের ধৃষ্টতা।

আর শশী ইচ্ছা করেই অনিমের সাথে যোগাযোগ করেনি। ভালোবাসার প্রতি নিজেদের আত্মবিশ্বাসটুকু যাচাই করে নেওয়ার জন্য। অনিমের পূর্বের অফিস থেকে জোগাড় করা ঠিকানা ধরে শশী আবার এসে আশ্রয় নিয়েছিল পাশের প্রাসাদপোম বান্ধবীর বাসায়।

শশী বাকরুদ্ধ অনিমের কাঁধে থুতনি রেখে তার কানে ফিসফিস স্বরে বলল,

তুমিও তাদের মতো…অনেক পচা তুমি…

অনিম সন্তর্পণে এই প্রথম শশীর পিঠে এমন করে হাত রাখল যেন মর্ত্যের এক মানুষ স্বর্গের এক দেবীকে স্পর্শ করার অধিকার পেয়েও দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু সেই দেবী মানবের স্পর্শে যখন তার দুই বাহুর ভেতর নিবিড় আশ্রয় খুঁজল, অনিম তখন তার জন্য উজার মেলে দেয়া উষ্ণতায় তার কানে ফিসফিস করে বলল,

কাদের মতো?

উইপোকা যেসব মানুষের আত্মাকে গিলে খেয়েছে, তাদের মতো। উইপোকা এখনকার মানুষের শুধু মননে নয় শরীরেও বাস করে। স্রষ্টা এই পৃথিবীতে যে মানব পাঠিয়েছিল তারা সেই মানব নয়, তারা মানুষ প্রাণিদের ছায়ামাত্র। তারা ভার্চুয়াল! তাদের আত্মার গহবরে আধুনিকতা নামের পচা ঘাস…

আমি তাদের মতো! কাদের কথা বলছ?

ঐ যে যাদের আমার বাবার মতো মানুষগুলো ‘আধুনিক’ শব্দে সংজ্ঞায়িত করেন।  স্মার্টফোনে স্মার্ট হওয়ার কৌশল হিসেবে অনবরত মিথ্যা বলার প্রবণতা এদের মাঝে তরুণ বয়সেই রোগ হিসাবে বাসা বাঁধে। মগ্নতা ছাড়া ভালোবাসা, সাধনা ছাড়া সফলতা, পরিশ্রম ছাড়া অর্থ উপার্জন, বই ছাড়া আত্মার পরিশুদ্ধি যে হয় না,  তা এদের কে বুঝাবে? সারাক্ষণ চোখের সামনে টিভি, ফেসবুক নামের দূরবর্তী এক জীবনের রঙিন অংশটুকু, বিলবোর্ড, ল্যাপটপ সর্বত্র রঙিন জীবন দেখে অভ্যস্ত এরা ভুলেই গেছে; জীবনটা আসলে সাদা-কালো। প্রকৃতির সবুজে, রিমঝিম বৃষ্টির ছন্দে, সাঁঝের আলো-আঁধারিতে এমনকি প্রেমিকার মায়াস্পর্শে এদের সত্তা আর মায়ালোক খুঁজে পায় না। মরা গাঙে কি আর জোয়ার আসে! তোমার আত্মায় জোয়ার থাকলে তুমি তোমার শশীকে ঠিকই খুঁজতে।

আমি সারাদিন জোয়ারের বানে ভেসে যাওয়া আত্মার মাঝে আমার শশীকেই খুঁজে বেড়াই বলে তাদের মতো করে তোমাকে পেতে চাইনি। মনে মনে যার জন্য এত আরাধনা তাকে চাওয়ার অধিকার আর পাওয়ার সামর্থ স্রষ্টা দেননি বলে এই আষাঢ়ের রাতে জলে ডুবে যাওয়া পাশের ডোবার ব্যাঙের আর্তনাদকে নিজের আর্তনাদ ভেবে, তোমার হাতের রান্নার স্বাদের নস্টালজিয়ায় তোমাকে ভাবতে ভাবতে আর কোলাব্যাঙের স্বরে তোমাকে ডাকতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! শশী, তোমাকে ছাড়া আমি পৃথিবীতে আসলে কাউকেই এবং কিছুই পেতে চাইনি…

শশী এবার শক্ত করে অনিমকে জড়িয়ে ধরল। বাইরে অন্ধকারের ঝরঝর বৃষ্টি-নিনাদ ছাপিয়ে অনিমের ঢিপ ঢিপ শব্দের গতিময় হৃৎস্পন্দনে নিজের স্পন্দন মিলিয়ে নিয়ে বলল,

ওঠো। সব গুছিয়ে নাও। নিচে গাড়ি অপেক্ষা করছে।

এখনই…

হুম, এখনই। বাবা অসুস্থ।

বাবা?

হ্যাঁ, আমাদের বাবা। যার আত্মার আলো এত উজ্জ্বল যে, কোনোদিন মনে হয় না, তিনি অনেক বছর ধরে একই পোশাক পড়ে আছেন। যাঁর গায়ের জামাটি তাঁর আত্মার মতোই শুভ্র, পবিত্র যা তাঁর মনের আনন্দের রঙে নিত্যনতুন রঙিন… তিনি ভালো না থাকলে এই সমাজ জীবন্মৃত হয়ে যায়।

ঠিক সে সময় কড় কড় ক্বড়াৎ শব্দের জগত বিদীর্ণকারী বজ্রপাতে অনিমের ঘুম ভেঙে যায়। তার অবশ শরীরকে টেনে সে বিছানায় বসে নিঃসীম অন্ধকারে শশীকে খুঁজে ফেরে। একটা ছায়া অবয়ব স্পষ্ট হয়েই বজ্রের আলোর সাথে তা আবার আঁধারে মিলিয়ে যায়। আশ্চর্য, এতক্ষণ ধরে তার মাথায় বিনুনি কাটা শশী আর কোথাও নেই! শশী-ঘোর থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে ঝিম মেরে বসে থাকে অনিম। কতক্ষণ ওভাবে কেটে যায় সে আঁচ করতে পারে না। বৃষ্টি-ঝড়ের এই রাতে বজ্রের তীব্র আলোয় মাঝে মাঝে নিজের অবয়ব স্পষ্ট হওয়ামাত্র তার মনে হয়, তারই প্রতিচ্ছায়া তাকে যেন ভেংচি কাটছে। অনিম নিজের অশ্রুসজল দুচোখ দেখতে না পেলেও বুঝতে পারল, আষাঢ়ের মধ্যরাত পুরুষের আবেগ নিয়ে খেলতে পারঙ্গম। অনিম আষাঢ়ের এই রাতে আধো-ঘুম আর আধো-জাগরণে, স্বপ্ন আর কল্পলোকে অতীতের প্রিয় স্মৃতি খুঁজেই ফিরছে আকুল মগ্নতায়।

বাতাসের ‘শোঁ’ ‘শোঁ’ শব্দ তার আত্মায় ‘শ…শী’, ‘শ…শী’ হয়ে প্রবাহিত হতেই থাকে। আরো একবার বজ্রের তীব্র আলোয় সে ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখে, খাবারের টিফিন ক্যারিয়ারটা কোথাও নেই। এতক্ষণ পর তার মনে পড়ে, অফিসে যাওয়ার পথে চাতালের হোটেলে সকালের নাস্তা ছাড়া গত দুদিন সে কিছুই খায়নি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close