Home অনুবাদ কাজুও ইশিগুরো > কথার কোলাজ >> সাক্ষাৎকার >>> এমদাদ রহমান অনূদিত

কাজুও ইশিগুরো > কথার কোলাজ >> সাক্ষাৎকার >>> এমদাদ রহমান অনূদিত

প্রকাশঃ October 14, 2017

কাজুও ইশিগুরো > কথার কোলাজ >> সাক্ষাৎকার >>> এমদাদ রহমান অনূদিত
0
0

কাজুও ইশিগুরো > কথার কোলাজ >> সাক্ষাৎকার >>> এমদাদ রহমান অনূদিত

অনুবাদের সূত্রে যখনই আপনি নিজেকে বিশ্বের নানান জায়গায় দেখতে পাবেন, তখন কিন্তু আপনি যথার্থ অর্থেই সংস্কৃতিগতভাবে কখনওই যা অনুবাদ করা যায় না সে সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়বেন। মাঝে-মাঝে আপনি হয়তো চারদিন ব্যয় করে ফেলবেন একটি বইকে তার দেশজ সংস্কৃতি, তার ইতিহাস ও মূল্যবোধ, বইটির উৎসভূমি সম্পর্কে বলতে গিয়ে; কিন্তু অনুবাদকরা একটি বইকে কখনই তার ভৌগোলিক বিষয়গুলি মাথায় রেখে অনুবাদ করবে না। আপনি শুধু বিভিন্ন দেশের পাঠকদের জন্য লিখছেন না, আপনি লিখছেন বিভিন্ন যুগের জন্য।

ইশিগুরোর সন্ধানে

বৃহস্পতিবার! গ্রেট ওয়েস্টার্ন রেলওয়ে আমাকে নিয়ে চলল হেইজ এন্ড হারর্লিঙটন স্টেশন থেকে বেসিংস্টোকের দিকে, সেখানে ধরতে হবে লন্ডন ওয়াটারলু থেকে ছেড়ে আসা সাউথ ওয়েস্টার্ন ট্রেন। তিন ঘণ্টার পথ। এর মধ্যে একজন লেখক আত্মায় ঝড় তুলছিলেন- কাজুও ইশিগুরো। সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন তিনি!

বৃহস্পতিবার! আজ যাত্রা শুরু হয়েছিল ভোরে, হ্যাম্পশায়ারের এন্ডওভার থেকে ইলিং ব্রডওয়ে, হ্যান্সলো; তারপর কাজে ফেরার তাড়া। সাহিত্যে নোবেল-পাওয়া লেখকের নাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। গার্ডিয়ান-এর সংবাদটিই প্রথমে চোখে পড়ল, তারপর বিবিসি, টেলিগ্রাফ… ট্রেনে যেতে যেতে বুঝতে চাইছিলাম এই লেখককে। অ্যামাজন-এ দেখলাম তার প্রতিটি বইয়ের সঙ্গে ‘বেস্ট সেলার’ ট্যাগ লাগান!

বৃহস্পতিবার! মুঠোফোনে খুঁজে চলছিলাম ইশিগুরোকে। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ঠিক কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছেন, কোথায় লেখার শৈলী নিয়ে ভাবনার বিস্তার ঘটিয়েছেন- ইত্যাদি ছিল আমার অনুসন্ধানের বিষয়। খুঁজে পাওয়াও গেল। ট্রেন ছুটে চলেছে উইনচেস্টারের দিকে, আমি মুঠোফোনে ইশিগুরোকে পড়ে চলেছি। নেটে তাঁর একটি মূল্যবান কথা খুঁজে পেলাম- “সাধারণত আমার উপন্যাসে, বর্ণনাকারী গল্পটিকে এমনভাবে বলতে শুরু করে যেন সে স্মৃতিকথা বলছে। স্মৃতিগুলিকে তখন মনে হতে থাকবে তারা নানা রকমের ঘটনা দিয়ে নির্মিত হতে চলেছে। আর ঠিক এভাবেই আখ্যানভাগ বর্ণনাকারীর নিজের স্মৃতি ও ভাবনা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট আকার পেতে চায়।”

‘গার্ডিয়ান’ তাদের সম্পাদকীয়তে বলেছে- উপন্যাসগুলিতে তিনি অর্থময়তা ও নশ্বরতার এক দার্শনিক অনুসন্ধানে নেমেছেন। ব্যক্তিক স্মৃতি আর জাতিসমূহের বিস্মৃতিকেই তিনি তার দার্শনিক অভিপ্রায় হিসেবে গ্রহণ করেন।

অনুসন্ধান চলছিল পুরো সপ্তাহ জুড়ে। অ্যামাজন থেকে কিনে ফেললাম প্যারি রিভিউয়ের ২০০৮ সালে প্রকাশিত ১৮৪ নং সংখ্যাটি, যেখানে ইশিগুরো’র আর্ট অব ফিকশন শীর্ষক সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। পেয়ে গেলাম গোয়ের্নিকা নামের ওয়েবম্যাগ।

গোয়ের্নিকা’য় প্রখ্যাত সমালোচক রেবেকা রোকেসার লিখেছেন- “ইশিগুরো এমন এক লেখক যিনি মুখোমুখি হন অতীতে হারিয়ে যাওয়া দুঃখ কিংবা দূরত্বের বেদনার। সেই দূরত্ব শারীরিক। তার চরিত্রগুলি জীবনপ্রবাহে যাত্রা করে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্নতায় পতিত হয়, কিন্তু সে বিচ্ছিন্নতা ট্র্যাজিক নয়। আমাদের পরস্পরের মধ্যে যে-দূরত্ব, সময় বাহিত যে-অদেখা, যে-দূরত্ব সৃষ্টি হয় অবদমিত আকাঙ্ক্ষা থেকে; আর সেই দূরত্ব- আমাদের জীবনের নানামুখী ঘাতপ্রতিঘাত যা আমাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, পরস্পর থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে- ইশিগুরো সেকথাই লেখেন।

ইশিগুরো বলেন- স্মৃতি আমার কাছে সব সময়ই মূল্যবান। স্মৃতি হচ্ছে এমন এক ছাঁকনি- যার মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনটাকে একেবারে নিংড়ে গভীরে গিয়ে দেখতে পারি। স্মৃতি ঝাপসা, কুয়াশাচ্ছন্ন, অন্ধকারময়। এখানে আত্মপ্রতারণার সুযোগ রয়েছে।

“…সারা জীবনই আমি এই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি, কারণ, প্রথম দিকে যখন আমি উপন্যাস লিখতে শুরু করি, জাপানের পটভূমিতেই শুরু করেছিলাম; এটা করার পেছনে কিছু ব্যক্তিগত কারণও ছিল; আবেগের তাড়নায় আমি চাইতাম আমার নিজস্ব জাপানকে আমি আমার মতো করে নির্মাণ করব; এবং তাই করতে চেয়েছি।”

কথাগুলি ২০১৫ সালে, দ্য টেলিগ্রাফের গাবি উড-কে বলছিলেন ইশিগুরো। গাবি উড আমাদেরকে জানিয়ে দেন- ইশিগুরো জাপান ত্যাগ করেছিলেন মাত্র পাঁচ বছর বয়সে, মায়ের মুখে সামুরাইদের গল্প ও অন্যান্য জাপানি গল্প শুনে বেড়ে উঠেছেন তিনি ইংল্যান্ডে। এই দেশ সম্পর্কে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন- “বহুজাতি ও সংস্কৃতির এক মিলনস্থল হয়ে ওঠবার আগে থেকেই, বলতে পারেন নানাভাবে আমি এমন এক ইংল্যান্ডের জন্য নস্টালজিয়ায় কাতর হই যা এখন পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। আমার ছেলেবেলার ইংল্যান্ডকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইংল্যান্ড আমার কাছে এক মিথিক্যাল স্থান।”

ইশিগুরোকে আমি উদযাপন করতে চাইলাম। হ্যাম্পশায়ার লাইব্রেরিতে তার বই পাওয়া গেল- ‘নেভার লেট মি গো’, ‘হোয়েন উই ওয়্যার অরফ্যানস’। নেটে তাঁর সাক্ষাৎকারগুলি পড়তে লাগলাম। হ্যাঁ। পড়ার মতই লেখক তিনি। নোবেল কমিটিও তাকে যে পড়তে হবে তা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে।

প্যারি রিভিউ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি কিছু শব্দ উচ্চারণ করলেন যার সঙ্গে আমার আট বছরের বিলেতবাস নস্টালজিক হয়ে উঠল- ফিশ এন্ড চিপস, ক্যামডেন টাউন, ক্যান্টারবেরি, ওকিং কাউন্টি গ্রামার স্কুল, গিলফোর্ড স্টেশন, ইস্ট অ্যাংলিয়া, ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্ট, নর্থ লন্ডন, গোল্ডার্স গ্রিন, সাউদার্ন ইংল্যান্ড, সারি কাউন্টি!

ইংরেজি ভাষায় এমন কিছু অদ্ভুত সুন্দর ব্যাপার আছে যা আবার অন্য ভাষাতে প্রকৃত দ্যোতনা তৈরি করতে পারে না, আবেদন অনেকটােই হারিয়ে যায়। কারণ একটি ভাষা তার নিজস্ব হাস্যরস, তার বিশেষায়িত প্রতীক, সংস্কৃতিগত পরম্পরা- এইসব বিষয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। লেখা থেকে এসব বাদ পড়ে গেলে আমি এক ধরণের চাপ অনুভব করি। ব্যাপারটা আমার জন্য বিব্রতকর হয়ে ওঠে।

প্যারি রিভিউ‘র পক্ষ থেকে সুসান হ্যানয়েল ষাটটিরও বেশি প্রশ্নে ইশিগুরোর লেখার শৈলীটিকে তুলে আনেন; দীর্ঘ সেই সাক্ষাৎকারের অল্প কিছু এখানে-

সাক্ষাৎকারী > আপনার লেখালেখির কোনও রুটিন আছে?

ইশিগুরো > আমি সাধারণত দশটা থেকে শুরু করে সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত লিখি, তবে- ইমেইলগুলির উত্তর দেওয়া আর টেলিফোনে কথা বলা মোটামুটি চারটের পর থেকেই শুরু হয়।

সাক্ষাৎকারী > লেখালেখির কাজটা কি কম্পিউটারেই করেন?

ইশিগুরো > আমার দুটি ডেস্ক আছে। লেখালেখির সুবিধার্থে একটি ডেস্ক ঢালবিশিষ্ট, অন্য ডেস্কে থাকে কম্পিউটার। আমার কম্পিউটারটি ১৯৯৬ সালের। ইন্টারনেট সংযোগ নেই। ঢালবিশিষ্ট ডেস্কে প্রাথমিক খসড়াটিকে আমি কলম দিয়ে লিখতে পছন্দ করি। আমি চাই এই খসড়াটি কম-বেশি দুষ্পাঠ্য হয়ে উঠুক, শুধু যেন আমিই বুঝতে পারি। খসড়াটি দিনে দিনে তালগোল পাকানো কাগজের বড় এক তোড়া হয়ে ওঠে, তখন আমি কোনও লিখন-শৈলীর দিকে মনোযোগ দিই না। খসড়াটি খুব যে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে ওঠে- তা কিন্তু নয়। আমি শুধু মাথায় আসতে থাকা কথাগুলিকে যেকোনো উপায়ে কাগজে টুকে ফেলি। যদি লিখতে লিখতে হঠাৎ নতুন কোনও আইডিয়া পেয়ে যাই, লিখিত অংশের সঙ্গে যা হয়তো খাপ খাচ্ছে না বা যাচ্ছে না- তাকেও টুকে ফেলি। কিছুটা পেছনে গিয়ে নোট নিয়ে নিই। পরে সেই নোট অনুসারে আইডিয়াটিকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। তারপর পুরো লেখাটির একটা ছক বা বিন্যাস করতে শুরু করি। অধ্যায়গুলিকে নাম্বার দিয়ে চিহ্নিত করার পর আবার শুরু হয় পুনর্বিন্যাস। তখন দ্বিতীয় খসড়াটি লিখবার সময় এসে পড়ে। তখন আমি আসলে কী লিখতে চাচ্ছি তার একটা স্পষ্ট আইডিয়া পেয়ে যাই। এই পর্যায়ে আমি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লিখতে থাকি।

সাক্ষাৎকারী > খসড়া লেখাটা সাধারণত কয়বার লেখেন?

ইশিগুরো > তৃতীয় খসড়া আমি খুব কমই করেছি, আর যে কথাটি এখানে প্রাসঙ্গিক তা হচ্ছে- খসড়াগুলিতে এমন কিছু অনুচ্ছেদ থাকে, যে-অনুচ্ছেদ্গুলিকে আমি বারবার লিখি।

সাক্ষাৎকারী > আপনি তো দস্তয়েভ্‌স্কি’র অনুরাগী!

ইশিগুরো > হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই, এছাড়াও আছে ডিকেন্স, অস্টিন, জর্জ এলিয়ট, শার্লট ব্রন্টি, উইলকি কলিন্স- যাদের রচিত উনিশ শতকের পূর্ণগর্ভ উপন্যাসগুলিকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি।

সাক্ষাৎকারী > তাদের প্রতি আগ্রহ জন্মানোর কারণটি কী?

ইশিগুরো > তাদের সৃষ্টিগুলি এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবধর্মী- ফিকশনগুলি পাঠের মধ্য দিয়ে আমাদের ভেতর যে-জগতের সৃষ্টি হয়, তা কমবেশি আমরা বাস্তবে যে-জগতে বাস করছি তার অনুরূপ। আবার এই রচনাগুলির গভীরে পৌঁছে নিজেকে আপনি হারিয়েও ফেলতে পারবেন। এদের ন্যারেটিভে আছে একধরনের বিশেষ দৃঢ়তা। প্লট, বিন্যাস আর চরিত্রে চিরায়ত বৈশিষ্ট্যগুলিকে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে, আমি কিন্তু অবুঝ বালকের মত যা পেয়েছি তাই পড়িনি, নিজেকে তৈরি করার জন্য আমার একটা মজবুত ভিত্তি দরকার ছিল। শার্লট ব্রন্টি’র ‘ভিলেতে’ এবং ‘জেন আয়ার’, দস্তয়েভ্‌স্কি’র চারটি বড় উপন্যাস, চেখভের ছোটোগল্প, টলস্টয়ের ‘যুদ্ধ ও শান্তি’, ব্ল্যাক হাউজ; আর জেন অস্টিনের কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয়টি উপন্যাস- আপনি যদি পড়ে ফেলেন তাহলে মনে করবেন আপনার একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি হয়ে গেছে। আর আমি প্লাতো’র বিশেষ অনুরাগী।

সাক্ষাতকারী > কেন?

ইশিগুরো > তার মুখে বর্ণিত সক্রেতেসিও সংলাপগুলির বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয় কী, কিছু লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ভাবে যে তারা সবকিছু জানে, তখন সক্রেতিস তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ান, এবং যুক্তি দিয়ে তাদের নস্যাৎ করেন। ব্যাপারটিকে অবশ্যই বৈনাশিক মনে হয়, কিন্তু এভাবে উত্তম-প্রকৃতির যে ধারণার জন্ম হয়, যা কিছুকে আমরা উত্তম বলে মনে করি- সেই ধারণা কিন্তু যুক্তির পর যুক্তিতে বদলে যেতে থাকে। মাঝে-মাঝে আমাদের সমগ্র জীবন পরম নির্ভরতায় আঁকড়ে-ধরা একটি বিশ্বাসের ওপর ভর করে চলতে থাকে যা হয়তো ভুলও হতে পারে। একারণেই আমার প্রথম দিকের বইগুলি ছিল সেইসব লোকদের নিয়ে যারা ভাবে যে তারা সব জানে, কিন্তু তাদের মাঝে কোনও সক্রেতিস নেই, তারা নিজেরাই নিজেদের সক্রেতিস।

প্লাতোর সংলাপের এক জায়গায় সক্রেতিস বলছেন আদর্শবাদী লোকেরা প্রায় সময়ই মানবজাতির প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করে, যখন তারা দুই থেকে তিনবারের বেশি হতাশায় নিমজ্জিত হয়। এই অবস্থায় প্লাতোর পরামর্শ- উত্তমের মানে সম্পর্কে অনুসন্ধান করো। আপনি কখনওই মোহমুক্ত হতে পারবেন না যদি অনুসন্ধানে ব্যর্থ হন। শেষ ধাপে আপনি যা খুঁজে পাবেন, তা হল- এই অনুসন্ধান কঠিন। দুঃসাধ্য এক কাজ। তবে- আপনার সবসময়ের দায়িত্ব হবে অনুসন্ধানে ডুবে থাকা।

সাক্ষাতকারী > অনুবাদকের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কি কখনও কিছু ভেবেছেন?

ইশিগুরো > অনুবাদের সূত্রে যখনই আপনি নিজেকে বিশ্বের নানান জায়গায় দেখতে পাবেন, তখন কিন্তু আপনি যথার্থ অর্থেই সংস্কৃতিগতভাবে কখনওই যা অনুবাদ করা যায় না সে সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়বেন। মাঝে-মাঝে আপনি হয়তো চারদিন ব্যয় করে ফেলবেন একটি বইকে তার দেশজ সংস্কৃতি, তার ইতিহাস ও মূল্যবোধ, বইটির উৎসভূমি সম্পর্কে বলতে গিয়ে; কিন্তু অনুবাদকরা একটি বইকে কখনই তার ভৌগোলিক বিষয়গুলি মাথায় রেখে অনুবাদ করবে না। আপনি শুধু বিভিন্ন দেশের পাঠকদের জন্য লিখছেন না, আপনি লিখছেন বিভিন্ন যুগের জন্য।

আরো অনুসন্ধান

অনুসন্ধান, তারপর- পাঠ; চলছিল। মূল্যবান সাক্ষাৎকার পেয়ে গেলাম ‘স্পিগেল অনলাইন’-এ। মাইকেল স্কট মুর এবং মাইকেল সন্থেইমার ইশিগুরোর একটি ‘আর্ট অব ফিকশন’ ধর্মী সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন, জার্মান ভিত্তিক ‘স্পিগেল অনলাইন’-এ ২০০৫-এর ৫ই অক্টোবর সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেন তারা। ইশিগুরোর লেখালেখি সম্পর্কে তারা সেখানে বলেন-

তিনি লিখেছেন কিছু শান্ত আর কোমল ভাবনাবিশিষ্ট সূক্ষ্মদর্শী উপন্যাস, যার চরিত্রগুলি মাঝেমাঝে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পড়ে যায়, সেই পরস্থিতিকে তারা কাটিয়ে উঠতে চায় তাদের অতীত জীবনের স্মৃতি দিয়ে। ৫১ বছর বয়সী কাজুও ইশিগুরো’র সঙ্গে তারা কথা বলেন তার স্মৃতি, তার আত্মপরিচয় আর সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘নেভার লেট মি গো’ নিয়ে। এখানে তার কিছুটা-

সাক্ষাৎকারী > আন্তর্জাতিক লেখক হয়ে ওঠা- এই ব্যাপারটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ইশিগুরো > আমি যদি এখানে, এই জার্মানিতে কিছুদিন সময় কাটাই, কিংবা জার্মানি নয়- যে কোনও এক দেশে; আর বলতে থাকি- আমি কেন লেখালেখি করি; তারপর বাড়ি ফিরে পরবর্তী বইটি লিখতে শুরু করি, তখন আমার মনে খুব ছোট্ট হলেও এ ভাবনাটি উঁকি দেবে- আমি ভাষান্তরিত হতে চলেছি। ইংরেজি ভাষায় এমন কিছু অদ্ভুত সুন্দর ব্যাপার আছে যা আবার অন্য ভাষাতে প্রকৃত দ্যোতনা তৈরি করতে পারে না, আবেদন অনেকটাই হারিয়ে যায়। কারণ একটি ভাষা তার নিজস্ব হাস্যরস, তার বিশেষায়িত প্রতীক, সংস্কৃতিগত পরম্পরা- এইসব বিষয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। লেখা থেকে এসব বাদ পড়ে গেলে আমি এক ধরণের চাপ অনুভব করি। ব্যাপারটা আমার জন্য বিব্রতকর হয়ে ওঠে।

সাক্ষাৎকারী > কিন্তু আপনি কি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে-পড়া লেখক হতে চান না? আপনার জন্ম জাপানে আপনার পরিবার ইংল্যান্ডে চলে আসে আপনার পাঁচ বছর বয়সে আপনি কি এখনও জাপানি সংস্কৃতির সঙ্গে নৈকট্যের বন্ধনে জড়িত নন?

ইশিগুরো > এখন ইংল্যান্ডই আমার দেশ, কিন্তু আমার বাবা-মা এখনও বেঁচে আছেন, সুস্থ আছেন। আমি যখনই ফোনে তাদের সঙ্গে কথা বলি, আমার মুখে জাপানি কথা শুনলে মনে হবে সদ্য কথা বলতে শিখেছি। আর এটাই আমার একমাত্র ভাষা যা দিয়ে তাদের সঙ্গে আজও আমার সম্পর্কের যোগসূত্র রক্ষিত হচ্ছে। সব সময়ই ভেবে থাকি জাপানে ফিরে যাব। বাবা ছিলেন বিজ্ঞানী। ব্রিটিশ সরকারের কর্মচারী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করতেন তিনি। সেই কাজ ছাড়ারও ৪৫ বছর হয়ে গেছে। আমি প্রস্তুত হয়ে আছি জাপানে ফিরে যাবার জন্য। জাপানের লোকসমাজে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য।

সাক্ষাৎকারী > জনৈক আমেরিকান সাহিত্য সমালোচক আপনার ‘নেভার লেট মি গো’ উপন্যাসটিকে কাফকা এবং বেকেটের কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন

ইশিগুরো > এই প্রসঙ্গে আমি বলব- তিনি সম্ভবত এই ব্যাপারটি চিহ্নিত করতে চেয়েছেন- বিমূর্ততা; আমার লেখালেখির মধ্যে কাফকা ও বেকেটের মতো যে ব্যপক বিমূর্ততা আছে তা যেন কেউ এড়িয়ে না যায়। আর এক্ষেত্রে তিনি সঠিক তুলনাটিই টেনেছেন। আমার সারা জীবনের লেখালেখিকে পাঠকদেরকে আমি চূড়ান্ত রূপকের স্তর থেকে পড়তে বলেছি। রূপকের বাইরে গিয়ে আমি উপন্যাসের বিন্যাস ঠিক করতে পারি না, এরকম আরও লেখক আছেন, যেমন- সল বেলো। আমার কাছে বিন্যাস হচ্ছে উপন্যাস লিখবার কয়েকটি কৌশলের একটি। আমি শেষ পর্যন্ত বিন্যাসকেই বেছে নিই।

জাপানি লেখকদের কোনও প্রভাব আমার ওপর নেই। ১৯৫০-পরবর্তী জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের, যেমন- ইয়াসুজিরো ওযু, আকিরা কুরোসাওয়া- এদের ব্যাপক প্রভাব আমার ওপর পড়েছে। সেই তুলনায় জাপানি বইয়ের এতটুকু প্রভাবও নেই। আমি যখনই অনুবাদে জাপানি বইগুলি পড়ি তখন ধাঁধায় পড়ে যাই, হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি।

সাক্ষাৎকারী > চরিত্রের সঙ্গে লেখকের বোঝাপড়াটা কীভাবে সম্পাদিত হয়? 

ইশিগুরো > আমার লেখা শুরু হয় চরিত্রদের মধ্যকার সম্পর্ক থেকে কিংবা তাদের মনের গূঢ় প্রশ্নগুলি দিয়ে, অথবা আমার পরিকল্পিত থিম নিয়ে। শেষ দিকে আসে উপন্যাসের বিন্যাস। আমি যখনই একটি উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি গ্রহণ করি- তখন সব সময়ই আমি এইসব বড় ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে শুরু করি। পুরো গল্পটা প্রায় সময়ই মাথায় তৈরি হয়ে থাকে, আর তারপরই নিজেকে আমি ইতিহাসের বইগুলির ভেতর পটভূমির সন্ধানরত একজন লেখক হিসেবে দেখতে পাই আর ভাবতে থাকি- ঠিক আছে, কিউবা বিপ্লবের সময়টাকে যদি বেছে নিই তাহলে মন্দ হয় না! আমার প্রথম উপন্যাস শেষ হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর নাগাসাকিতে, কিন্তু লিখতে শুরু করার সময় জায়গাটি নাগাসাকি ছিল না, ছিল কর্নওয়েল।

সাক্ষাৎকারী > আপনার ওপর কোন কোন লেখকের প্রভাব সবচেযে বেশি পড়েছে?

ইশিগুরো > দস্তয়েভ্‌স্কি, টলস্টয় আর চেখভ- এই লেখকদের আমি তরুণ বয়সে পাঠ করেছি। কয়েকজন ইংরেজ লেখকেরও প্রভাব আছে আমার ওপর। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবটা পড়েছে। কিন্তু জাপানি লেখকদের কোনও প্রভাব আমার ওপর নেই। ১৯৫০-পরবর্তী জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের, যেমন- ইয়াসুজিরো ওযু, আকিরা কুরোসাওয়া- এদের ব্যাপক প্রভাব আমার ওপর পড়েছে। সেই তুলনায় জাপানি বইয়ের এতটুকু প্রভাবও নেই। আমি যখনই অনুবাদে জাপানি বইগুলি পড়ি তখন ধাঁধায় পড়ে যাই, হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। এখন একমাত্র হারুকি মুরাকামিকেই পড়তে পারি, যার মধ্যে জাপানের ফিকশনকে পাওয়া যায়, এমন এক জাপানি ফিকশন- যা আমি বুঝতে পারি; আপন করে নিতে পারি।

সাক্ষাৎকারী > জাপানের লোকজীবনের সঙ্গে হারুকি মুরাকামি আমেরিকা ও ব্রিটেনের পপ কালচারের সমন্বয় করেন

ইশিগুরো > তা তো অবশ্যই করেন। জাপান আসলে এরকমই। কুরোসাওয়া যে কথা ২০ বছর আগে বলেছিলেন, তিনিও সেই একই কাজ করছেন। কেউ একজন কুরোসাওয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- তুমি এখানে কেন শেক্সপীয়রকে প্রতিস্থাপন করেছেঅ? এটা কি তোমার বিশ্বজনীনতা? কুরোসাওয়া বলেছিলেন- না, এটা তো খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কুরোসাওয়া শেক্সপীয়র পড়ে বেড়ে উঠেছেন, ফরাসি লেখকদের পড়েছেন, রুশ লেখকদের পড়েছেন। তিনি বললেন- জাপানিরা তো এরকমই।

এখন তুমি যদি টোকিও’য় যাও- আমার বিশ্বাস তুমি খুব স্পষ্ট দেখতে পাবে লোকপ্রিয় সংস্কৃতি আর জাপানি লোকজ ঐতিহ্যে নগরীটি একাকার হয়ে আছে।

সাক্ষাৎকারী > আপনার উপন্যাসগুলি ব্যক্তির অতীত স্মৃতিকাতরতা দিয়ে পূর্ণ আপনি কি কখনও এই ধারা থেকে বের হতে কবিতা কিংবা নাটক লিখতে চেয়েছেন?

ইশিগুরো > আমি বেশ কয়েকটি চিত্রনাট্য লিখেছি যা ছিল আমার স্বভাবসুলভ ভঙ্গির একেবারে বাইরের ব্যাপার। চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে আমাকে নানা রকমের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে। আমার বিশ্বাস আমার দ্বিতীয় সত্তাটিই আমাকে দিয়ে এই কাজগুলি করিয়ে নিয়েছে যা ছিল আমার মানসিক ভার কমানোর একটা কৌশল। আমি স্মৃতির ঘোরে আচ্ছন্ন এক লেখক। পরবর্তীতে আমি যার মুখোমুখি হবো তা হচ্ছে একটি পুরো জাতি কীভাবে কোনও কিছুকে স্মরণ করে কিংবা বিস্মৃত হয়; কিংবা- কখন স্মরণ করা ভাল, কখন ভাল ভুলে যাওয়া!

সাক্ষাৎকারী > তেইশ বছরের লেখক জীবনে ‘নেভার লেট মি গো’ হচ্ছে আপনার ষষ্ঠ উপন্যাস আপনি কি খুব ধীর গতির লেখক? কী বলবেন?

ইশিগুরো > খুব দ্রুত লেখার প্রয়োজনীয়তা কোন দিনও অনুভব করিনি। কখনও ভাবিওনি- আমাকে অজস্র বই লিখতে হবে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো এমন একটা বই লেখা যা একেবারেই অন্যরকম। একেবারেই ভিন্নধর্মী।

এশিয়াটিক সোসাইটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকার

‘ইশিগুরো’র অন্তর্জগৎ’ এই শিরোনামে একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে এশিয়া সোসাইটি তাদের ওয়েবসাইটে, সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয় আমারিকার নিউ ইয়র্কে, সেখানকার নিউইয়র্কার-এর প্রতিনিধি জোয়ান একোসেলা কথা বলেন ইশগুরো’র সঙ্গে।

সাক্ষাৎকারী > আপনি কি মনে করেন উপন্যাস মানুষের সচেতন এবং গভীর মনোভূমি সম্পর্কে কিছু ব্যক্ত করবার একটি অদ্বিতীয় ফর্ম, বা তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি, অন্যান্য মাধ্যমগুলির তুলনায়?

ইশিগুরো > হ্যাঁ, আমিও তাই মনে করি। আমি তো সবসময়ই অনুভব করি- যখন আমি একটি উপন্যাস লিখতে থাকি, আমি তখন পাঠককে কিছু অভিজ্ঞতা নিবেদন করছি যা সিনেমা কিংবা টেলিভিশনের সামনে বসে তার পক্ষে সেই অভিজ্ঞতার প্রতিলিপি পাওয়া অসম্ভব। আমি প্রায়ই যেসব বই পড়ে থাকি, সেগুলিকে আমার কাছে পূর্ণাঙ্গ বলেই মনে হয়। কোথাও বইগুলির কোনও দুর্বলতা খুঁজে পাই না। আর আমি পাঁচ ছয় ঘণ্টা কোনও একটি উপন্যাস পাঠ করাকেও সমালোচনা করব না, এভাবে আমি যে অভিজ্ঞতা লাভ করছি, সেই একই অভিজ্ঞতা হয়তো কোনও একটি সুনির্মিত টিভি ধারাবাহিকের একটি পর্বে মাত্র ৪০ মিনিটে লাভ করব। ব্যাপারটিকে আমি খুব খারাপ অর্থে গ্রহণ করছি না। টেলিভিশন দেখাটা বইপাঠের চেয়ে সহজ। কিন্তু আমি বইকেই বেশি গুরুত্ব দিই, সে আমাকে নানা জায়গায় নিয়ে যায়, আমাকে দিয়ে এমন কিছু করায় যা আর কোনও মাধ্যমে ঘটবে না। আমি যখনই উপন্যাস লিখতে শুরু করি, আমিও তখন তা করতে শুরু করি। উপন্যাসের চেয়ে উত্তম আর কিছু আছে কি না আমার জানা নেই। আমার নিজের ক্ষেত্রে হয় কী, আমি যদি একই সঙ্গে সিনেমা নির্মাতাও হতাম, তবুও মানুষের অন্তর্জগৎ সম্পর্কে সহজে কিছু বলার জন্য ফিকশনকেই বেছে নিতাম। অবশ্য প্রতিভাবান নির্মাতারা আমাকে ভুল প্রমাণ করবেন- এব্যাপারেও আমি নিশ্চিত। তবে, যে-কোনও কারণেই হোক, আমি সহজাতভাবে চিন্তা করি যে- উপন্যাস মানুষের মনোজগতের যথাযথ প্রতিকৃতি উপস্থাপন করে থাকে।

সাক্ষাৎকারী > স্মৃতি আপনার লেখাপত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে এসেছে আপনার লেখার পাঠক হিসেবে আমি স্মৃতির একটি নির্দিষ্ট ফর্ম, যাকে আমরা নস্টালজিয়া বলি- তাকেই যেন খুব বেশি অনুভব করি নস্টালজিয়াকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?    

ইশিগুরো > স্মৃতির একটি ফর্ম হিসেবে আপনি যে নস্টালজিয়ার কথা বললেন আমি সত্যিই তার সম্পর্কে খুব একটা অবগত নই। আমি মনে করি নস্টালজিয়ার সবচেয়ে খাঁটি আর ব্যক্তিগত আবেগ হচ্ছে বালকবেলার স্মৃতি, কিংবা এমন একটা সময়, যে-সময়ে আমরা ভাবতে থাকি এই পৃথিবী মনোরম এক বাসভূমি ছিল উত্তরকালে যে-পৃথিবীকে আমরা খুঁড়েছি, গড়েছি, অভিবাদন জানিয়েছি।

নিরাপত্তা আর নিরাপদ আশ্রয় থেকে জীবনপথে পথিক আমাদের হতেই হবে, সেই যাত্রায় কিছু মানুষ প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পাবে, কিছু মানুষ একটু কম আঘাত পাবে, কিন্তু সম্ভবত আমরা পরস্পরের মধ্যে ভাবনার বিনিময় করব; ভাবনার বিস্তার অনেক বেশি কিংবা কম হোক- আমরা বিগত কালের দিকে ফিরে তাকাব, সেই সময়ে যখন আমরা ভাবতাম পৃথিবীটা অল্প হলেও মনোরম। আমি মনে করি এটাই হল নস্টালজিয়া বা স্মৃতির বিষণ্ণতার মূল ভিত্তি, কারও কারও জীবনে যার স্থান অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকে, যা মাঝে-মাঝেই মানবিক বিষয়ে পরিণত হয়। যুদ্ধফেরত বহু সৈনিক- শত শত সৈনিক, যুদ্ধের দিনগুলির শেষে, মাঝে-মাঝেই তারা বিভিন্ন গানের টুকরো, কিংবা এমন কিছু ক্ষুদ্র জিনিস খুঁজে পায় যা তাদেরকে সেই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কথা মনে পড়িয়ে দেয়, আচমকা; আর তারা হঠাৎ যেন হুহু কান্নায় ভেঙে পড়ে।

এই ধরনের নস্টালজিয়ার প্রতি আমি কৌতূহলী, কারণ কিছু উপায়ে কোনও আদর্শবাদ মনোজাগতিক বিষয় হয়ে ওঠে। আমার মনে হয় নস্টালজিয়া হল আবেগের সমষ্টি, এই আবেগ মূলত নিখুঁত এক পৃথিবীকে আমাদের দেখাতে চায়। কিন্তু অবশ্যই, আদর্শবাদের মতো, নস্টালজিয়া ধংসাত্মক কিছুও করে থাকে, ঠিক তেমনি ইতিবাচক কাজও করে; তবে আমার মতে- নস্টালজিয়া মানুষের মনের এক প্রবল শক্তি। আমার বইগুলোতে নস্টালজিয়া ভর করে আছে, শেষ বইটিতে, ‘হোয়েন উই ওয়্যার অরফ্যানস’-এ, একজন লোক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হতে থাকে; বিষণ্ণ হতে থাকে।

সাক্ষাৎকারী > উনিশ-শতকী কিংবা অতিসাম্প্রতিক; না কি এই উভয়ের সমন্বিত পাঠের ঝোঁক আছে আপনার?

ইশিগুরো > সত্যি বলতে কী- আমি খুব বেশি পড়ি না। আমি যখন কোনও একটি লেখা লিখতে শুরু করেছি, তখন আমি উপন্যাস পড়তে পছন্দ করি না, তখন ননফিকশন পড়ি। লেখার সময়ে আমি উপন্যাস পড়তে পছন্দ করি না তার কারণ- উপন্যাসের শৈলী, বিষয় আর বিস্তার সংক্রামক। আমি খুব সহজেই প্রভাবিত হয়ে পড়ি যখন আমি অন্যের লেখা পড়তে শুরু করি, আমি বুঝতে পারি পাঠের কারণে কিছু একটা আমার ভেতর ঢুকে পড়তে চাইছে! আগে বেশ কয়েকবার আমি এরকম বিপদে পড়েছি। লেখা মাথা থেকে উধাও হয়ে গেছে। আমি আবার লেখায় ফিরেও এসেছি; এসব খামখেয়ালি আমাকে উৎসাহও দিত; কারণ আমি হয়ত তখন কনরাড কিংবা এরকম কাউকে পড়তে শুরু করেছি; আর হঠাৎ করে লেখার হারিয়ে যাওয়া সুরটি ফিরে পেয়েছি। এসব কারণে আমি আসলে প্রচুর পড়তে পারি না। যদিও বহু লেখা এখনও পড়া হয়ে ওঠেনি। তারা সবাই আমার পছন্দের লেখক; আপনি যদি প্রভাব সম্পর্কে কথা বলেন, তাহলে বলি- প্রভাবের ব্যাপারে আমি খুব একটা সচেতন নই।

পুনশ্চ

“কোনও কিছু ঘটলে কী ঘটেছিল তার চেয়ে আমার বেশি আগ্রহ থাকে লোকেরা ঘটনাটি নিয়ে নিজেদের মধ্যে কীভাবে কথা বলছে”- ইশিগুরো অকপটে বলেন। এই লেখককে পড়া যায়। আজ ও আগামীর বিশ্বপাঠক ইশিগুরোকে খুঁজে খুঁজে পড়বে।

আমি এই মুহূর্তে প্যারি রিভিউ থেকে ইশিগুরোর সাক্ষাৎকারটি পুরোটাই অনুবাদে হাত দিয়েছি। তীরন্দাজেই প্রকাশিত হবে অবশিষ্ট অংশ। একটা কথা বলে শেষ করি, ইশিগুরোর সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটা দারুণ দারুণ কথায় ভরা, পরের অংশগুলি পড়বার তাই আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখছি। খুব শিগগির আসছি অবশিষ্ট অনুবাদ-অংশ নিয়ে।

লন্ডন ১৪ অক্টোবর ২০১৭

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close