Home অনুবাদ কাজুও ইশিগুরো > পারিবারিক নৈশভোজ >> ছোটগল্প >>> রাজিয়া সুলতানা অনূদিত

কাজুও ইশিগুরো > পারিবারিক নৈশভোজ >> ছোটগল্প >>> রাজিয়া সুলতানা অনূদিত

প্রকাশঃ October 9, 2017

কাজুও ইশিগুরো > পারিবারিক নৈশভোজ >> ছোটগল্প >>> রাজিয়া সুলতানা অনূদিত
0
0

কাজুও ইশিগুরো > পারিবারিক নৈশভোজ >> ছোটগল্প >>> রাজিয়া সুলতানা অনূদিত

জাপানের প্রশান্ত উপকূলে ফুগু মাছ ধরা হয়। এই মাছ খেয়ে আমার মা যখন মারা যান তখন থেকেই এই মাছ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই মাছের বিষটা থাকে এর যৌনগ্রন্থির দুটো পলকা থলের ভেতরে। কাটার সময় খুব সাবধানে এই থলে দুটো অপসারণ করতে হয়, তা না হলে সামান্যতেই ফুটো হয়ে বিষ শিরা-উপশিরায় মিশে যায়। মুশকিল হলো যে তারপরও বলার উপায় নেই, কাজটা সাফল্যের সঙ্গে করা গেছে কি না। খেয়েই যেন তার প্রমাণ দিতে হয়।

ফুগুর বিষক্রিয়া মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক আর এরকম প্রায় সব ঘটনার ফলাফল হচ্ছে মৃত্যু। রাতে এ মাছ খেলে এর বিষক্রিয়ার শিকার যিনি হন, তিনি ঘুমের মধ্যে ব্যথায় কুঁকড়ে থাকেন। তীব্র যন্ত্রণায় কয়েক ঘণ্টা গড়াগড়ি দিতে দিতে সকালের দিকে তার মৃত্যু ঘটে। যুদ্ধের পর জাপানে এই মাছ ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। কঠোর আইন করে এই মাছ ধরা বন্ধ করার আগ পর্যন্ত কারো কারো রান্নাঘরে চলত এই বিপজ্জনক মাছের অন্ত্রের অপসারণ এবং তারপর প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবদের নিমন্ত্রণ করে গোল হয়ে চলতো ভোজের উন্মত্ততা।

আমার মায়ের মৃত্যুর সময় আমি ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকতাম। সেই সময়ে আমার বাবা, মা আর আমার মধ্যে সম্পর্কের একটা টানাপোড়েন চলছিল। সেজন্যে কী পরিস্থিতিতে মা’র মৃত্যু হয়েছিল, জানতে পারিনি।  দু’বছর পর টোকিওতে ফিরে এলে জানতে পারি। সঙ্গত কারণেই আমার মা ফুগু খেতে অস্বীকার করতেন। কিন্তু সেটা ছিল নির্দিষ্ট একটা উপলক্ষ। তার পুরনো এক স্কুলবন্ধু তাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন, বন্ধুকে তিনি অসন্তুষ্ট করতে চাননি। এয়ারপোর্ট থেকে কামাকুরা জেলায় বাবার বাসায় গাড়ি চালিয়ে যাবার সময় বাবার কাছে এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারি। শেষে যখন বাড়িতে পৌঁছুলাম, সেটা ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল এক হেমন্ত-দিনের পড়ন্ত বিকেল।

‘প্লেনে কিছু খেয়েছ?’ বাবা জিজ্ঞেস করলেন। বাবার টি-রুমের তাতামি মেঝের ওপর তখন আমরা বসে।

বললাম, ‘ওরা  আমাকে হালকা জলখাবার দিয়েছিল।‘

‘তোমার নিশ্চয়ই ক্ষিদে পেয়েছে। কিকুমো এসে পড়লেই আমরা খাবো।’ বাবা বললেন।

আমার বাবা দেখতে ছিলেন ভয়ংকর, বড় শক্ত চোয়াল আর ক্রুদ্ধ কালো ভ্রু ছিল তার। অতীতের দৃশ্য  চিন্তা করলে মনে হয় চৌ এন-লাইয়ের সঙ্গে বাবার অনেক মিল, যদিও এই তুলনাটা বাবার পছন্দ হবে না।  সামুরাই বংশের বিশুদ্ধ রক্ত তার শরীরে। বাবার সাধারণ উপস্থিতি আয়েশি কথাবার্তায় উৎসাহ দিত না  আবার এমন অদ্ভুতভাবে তিনি প্রত্যেকটা মন্তব্য করতেন- শুনে মনে হতো যেন সেই কথা দিয়েই তিনি তার কথা শেষ করবেন। আসলে যখন আমি বাবার মুখোমুখি বসেছিলাম, সেই বিকেলে কিশোর বয়সের একটা স্মৃতি মনে পড়ে গিয়েছিল। ‘বৃদ্ধ মহিলার মত বকবক’ করছিলাম বলে বাবা আমার মাথার আশেপাশে কয়েকবার আঘাত করেছিলেন।

এয়ারপোর্টে পৌঁছার পর থেকেই অবধারিতভাবে আমাদের কথাবার্তায় লম্বা ছেদ পড়ে।

‘ফার্মের কথা জেনে আমার দুঃখ হচ্ছে,’ আমি বললাম। মাঝখানে কিছুটা সময় আমাদের মধ্যে কথা থেমে থাকে। বাবা জোরে মাথা ঝাঁকান।

‘আসলে কাহিনির শেষ এখানেই নয়,’ তিনি বললেন। ‘ফার্ম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ওয়াটানাবে আত্মহত্যা করে। এই লজ্জা নিয়ে সে বেঁচে থাকতে চায়নি।’

‘বুঝতে পারছি।’

‘সতের বছর আমরা ব্যবসার পার্টনার ছিলাম। ন্যায়নীতি আর শ্রদ্ধা্র পাত্র ছিল সে। আমি তাকে খুবই  শ্রদ্ধা করতাম।’

‘আপনি কি আবার ব্যবসা করবেন?’ জিজ্ঞেস করলাম।

‘আমি অবসরে চলে গিয়েছি। নতুন কোনো উদ্যোগের জন্য আমি বেশ বৃদ্ধ এখন। আজকালকার ব্যবসাপাতির ধরন একেবারে অন্যরকম। বিদেশিদের সঙ্গে কারবার করতে হয়। ওদের মতো করে কাজ করতে হয়। আমি বুঝিনা কেমন করে এমন হলো। ওয়াটানাবেও বুঝতে পারেনি।’ তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘একজন ভালো  মানুষ, নীতিবান লোক ওটানাবে।’

টি-রুম থেকে বাগান দেখা যায়। যেখানটাতে বসে আছি সেখান থেকে প্রাচীন সেই কুয়োটাও দেখা যায়। ছোটকাল থেকেই আমি বিশ্বাস করে আসছি এই কুয়োটা ভুতুড়ে। ঘন বৃক্ষপত্রের ভেতর দিয়েও সেটা দেখা যাচ্ছে। সূর্য কেবল ডুবেছে। তাই বাগানের অনেকটাই ছায়ায় ঢেকে গেছে।

‘আমি আনন্দিত যে তুমি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছ,’ বাবা বললেন। ‘শুধু অল্পদিনের জন্য বেড়াতে আসোনি, আশা করি।’

‘আমার পরিকল্পনার এখনও ঠিক নেই।’

‘তবে আমি অতীতকে ভুলে যেতে চাই। তোমার মা-ও সবসময় প্রস্তুত ছিল যে আবার সে তোমাকে স্বাগত জানাবে যদিও সে তোমার আচরণে মর্মাহত হয়েছিল।’

‘আপনার সহানুভূতির প্রশংসা করি। কিন্তু এও ঠিক আমি এখনো নিশ্চিতভাবে জানিনা আমি কী করব।’

‘আমার মধ্যে এখন বিশ্বাস জন্মেছে যে আপনার মনে কোনও অশুভ উদ্দেশ্য ছিল না।’ বাবা বলেই চললেন। ‘তুমি কিছু একটার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছ- অনেকে যেমন হয়- তাদের মতই।

আমাদের বোধকরি তা ভুলেই যাওয়া উচিত, যেমনটা আপনি বলেছেন।’

‘সেটাই। আরও চা লাগবে?’

এই সময় বাসার ভেতরে একটা নারী-কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

‘অবশেষে।’ বাবা উঠে দাঁড়ালেন। ‘কিকুকো এসে গেছে।’

বয়সে কয়েক বৎসরের ব্যবধান সত্ত্বেও আমার বোন আর আমি সবসময়ই অনেক ঘনিষ্ঠ। আমাকে দেখে সে এতই উদ্বেল হলো যে কিছুক্ষণ সে খিলখিল করে হাসতেই থাকল। বাবা তাকে ওসাকা আর ইউনিভার্সিটির কথা জিজ্ঞেস করা শুরু করলে সে শান্ত হলো। সংক্ষিপ্ত বিধিবৎ জবাব দিল সে।

প্রত্যুত্তরে আমাকেও কিছু প্রশ্ন করল। সে এই ভয়ে দমে গেল যে, না-জানি তার প্রশ্নকে ঘিরে কোন নাজুক বিষয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে যায়। পরে একসময় কিকুকো আসার আগে যে রকম চলছিল, কথাবার্তা তার চেয়ে আরও বিক্ষিপ্তভাবে চলতে থাকল। বাবা দাঁড়িয়ে বললেন- ‘এখন খেতে যেতে হবে। দয়া করে আমাকে এইসব ভারী ভারী কথাবার্তা বলাটা বাদ দাও। কুকুকো তোমার দেখাশোনা করবে।’

বাবাকে উঠে যেতে দেখে আমার বোনকে নিরুদ্বেগ লাগলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে আমার সঙ্গে খোশগল্পে মেতে উঠল। ওসাকায় তার বন্ধুবান্ধবদের কথা, তার ইউনিভার্সিটির ক্লাস নিয়ে গল্প করল।  হঠাৎ সে সিদ্ধান্ত নিল আমাদের বাগানে যাওয়া দরকার। লম্বা লম্বা পা ফেলে সে বারান্দায় চলে গেল। আমরা বারান্দায় রেখে দেয়া ফিতেঅলা স্যান্ডেল পরে বাগানে গেলাম। দিনের আলো তখন নেই বললেই চলে।

‘আধাঘণ্টা ধরে আমি ধূমপান করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছি,’  সিগ্রেট ধরাতে ধরাতে সে বলল।

‘তাহলে করো নি কেন?’ ঘরের দিকে চুপিসারে একটা অঙ্গভঙ্গি করে মুখ টিপে সে দুষ্টুমির হাসি হাসল।

‘ওহ! আমি বুঝতে পারছি,’ আমি বললাম।

‘আন্দাজ করো দেখি? আমার একজন বয়ফ্রেন্ড জুটেছে।’

‘ও, তা-ই?’

‘শুধু বুঝতে পারছিনা কী করব। মনস্থির করিনি এখনও।’

‘খুব বুঝতে পারছি।’

‘দেখো, সে আমেরিকা যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। আমার পড়াশোনা শেষ হলেই ও চাচ্ছে আমি ওর সঙ্গে আমেরিকায় যাই।

‘বুঝতে পারছি। তুমিও যেতে চাও আমেরিকায়?’

‘যদি যাই-ই তাহলে আমরা হিচ-হাইকে যাবো। কিকুবো এই বলে তার হাতের বুড়ো আঙুল আমার মুখের সামনে নাড়লো। আর বলল– ‘লোকে বলে এই কাজটা বিপজ্জনক, কাউকে এইভাবে গাড়িতে ওঠানো। কিন্তু ওসাকায় আমি এটা করেছি। ব্যাপারটা দারুণ আসলে।’

‘বুঝলাম।‘ কোন ব্যাপারে তুমি অনিশ্চিত?’

আমরা ঝোঁপঝাড় লতাগুল্মের মধ্য দিয়ে সংকীর্ণ একটা পথে ধরে যাচ্ছিলাম- এইপথ কুয়োর কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে। আমরা হাঁটছি, কিকুকো অপ্রয়োজনীয়ভাবে নাটকীয় ভঙ্গিতে সিগ্রেট ফুঁকছে আর বলছে- ‘জানো, ওসাকায় এখন আমার অনেক বন্ধু। জায়গাটা আমার পছন্দ। এখনই আমি ওদেরকে ছেড়ে আসব কিনা জানি না। আর সূচিকে তো আমি পছন্দ করি। শুধু বলতে পারিনা ওর সঙ্গে কতটা সময় কাটাবো।

‘তুমি কি বুঝতে পারছ?’

বললাম, ‘একদম।‘

সে আবার চাপা হাসি হাসল। তারপর আমার সামন দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে কুয়োর কাছে গেল। আমি যখন তার কাছে হেঁটে এলাম সে বলল- ‘তোমার মনে আছে,’ তুমি বলতে এই কুয়োর ভেতরে ভূত আছে?’

‘হ্যাঁ, মনে আছে।’ আমরা দুজনেই এর পাশে এসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতাম।

‘মা বলতেন সবজি দোকানের সেই বুড়িকেই আমরা রাতে দেখতে পেতাম,’ সে বলল। ‘কিন্তু আমি কখনও  তার কথা বিশ্বাস করতাম না। এখানে একাও আসিনি কখনো।’

‘মা আমাকেও  একই কথা বলতেন। এমনকি এও বলতেন যে সেই বুড়ি ভূত হয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার  করেছিল। আসলে সে আমাদের বাগানের ভেতর দিয়ে সোজা, সংক্ষিপ্ত রাস্তাটা দিয়ে যেত। এই দেয়ালগুলোর ওপর দিয়ে যাওয়া তো সহজ নয়।’

কিকুকো খিলখিল করে হাসল। তারপর দেয়ালের দিকে পিঠ ঘুরিয়ে বাগানের দিকে নিচে তাকাল।

‘মা কখনো তোমাকে দোষ দেননি, জানো তো,’ নতুন স্বর যেন তার কণ্ঠে তখন। আমি নীরব রইলাম।

‘মা বলতেন তোমাকে ঠিকমত গড়ে তুলতে পারেননি উনি। বাবাও না-এটা তাদের দোষ। আরও বলতেন যে আমার দিকে তারা বেশি নজর দিয়েছেন, সতর্ক থেকেছেন বেশি আর একারণেই আমি ভালোভাবে বড় হয়েছি।’

সে ওপরর দিকে তাকালো। তার মুখে আবার সেই দুষ্ট হাসি।

বলল, ‘বেচারী মা।

‘তুমি কি ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে যাচ্ছ?’

বললাম, ‘জানি না। দেখা যাক।’

‘কী হয়েছিল তার? ভিকির?’

‘ওর সঙ্গে আমার সব শেষ হয়ে গেছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় আমার জন্য আর তেমন কিছু নেই।’

‘তোমার কি মনে হয় আমার সেখানে যাওয়া প্রয়োজন?’

‘কেন নয়? তবে আমি ঠিক বলতে পারবো না। সেখানে তোমার ভাল লাগতেও পারে।’ এই বলে আমি বাড়ির দিকে একনজর তাকালাম। বললাম- ‘আমাদের মনে হয় ভেতরে যাওয়া দরকার। রাতের খাবার তৈরি করছেন বাবা। সাহায্য লাগতেও পারে তার।’

কিন্তু আমার বোন আবার সেই কুয়োর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো আর কণ্ঠে সামান্য প্রতিধ্বনি তুলে বলল- ‘কোনো ভূত-টুত তো দেখতে পেলাম না।’

সে জিজ্ঞেস করলো- ‘ফার্মটা অচল হয়ে যাবার পর বাবা কি খুব মন খারাপ করেছিলেন?’

বললাম- ‘জানিনা। বাবার সম্পর্কে কিছুই ঠিক করে বলা যায় না।’ এরপর হঠাৎ করেই সে সোজা হয়ে আমার দিকে ঘুরে বলল– ‘ওয়াটানাবের সম্পর্কে বাবা তোমাকে কিছু বলেননি? সে কী করেছে সে সম্পর্কে?’

বললাম- ‘আমি শুনেছি সে আত্মহত্যা করেছে।’

‘শুধু তাই নয়। পুরো পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে করেছে- তার স্ত্রী, ছোট দুই মেয়েকে নিয়ে।’

‘ওহ, তাই?’

‘কী যে সুন্দর ছিলো সেই মেয়ে দুটো। ওরা ঘুমে থাকতে সে গ্যাস ছেড়ে দিয়ে মাংস কাটার ছুরি দিয়ে নিজের পেট কেটে ফেলেছিলো।’

‘এই কথা, বাবা তো একটু আগেই বলছিলেন কীরকম নীতিবান ছিল ওয়াটানাবে।’

‘অসুস্থ ছিল সে,’ এই কথা বলে বোন এবার কুয়োর দিকে ঘুরলো।

‘সাবধান। কুয়োয় পড়ে যাবে কিন্তু।;

‘কোনো ভূতই তো দেখতে পাচ্ছিনা।’ সে বলল। ‘আমাকে তুমি সেই কবে থেকে মিথ্যে বলে আসছ।’

‘আমি তো কখনও বলিনি ভূতটা কুয়োর ভেতরে নিচে থাকে।’

‘তাহলে কোথায় থাকে সে?’

আমরা উভয়ে গাছপালা আর লতাগুল্মের চারপাশটায় খুঁজলাম। বাগানের আলো তখন কমে আসছে। ঠিক তখনই আমি একটু দূরে প্রায় দশ গজ তফাতে ইশারায় ইঙ্গিত করলাম।

‘ওইখানে, ঠিক ওইখানে আমি দেখলাম ওকে।’

আমরা সেই জায়গায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম।

‘দেখতে কেমন ওটা?’ সে জিজ্ঞেস করলো।

‘আমি ভালো মতন দেখতে পাইনি। অন্ধকার তো।’

‘কিন্তু দেখেছ তো কিছু।‘

‘এক বুড়ি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছিল।’

আমরা সন্মোহিতের মত সেই জায়গাটার দিকে তাকিয়েই থাকলাম ।

‘তার পরনে সাদা রঙের কিমোনো,’ আমি বললাম।

‘তার কিছু চুল নষ্ট। চারিদিকে সামান্য উড়ছিল।’

কিকুকো ওর কনুই দিয়ে আমার হাতে গুঁতো দিল।

‘ওহ শান্ত হও তো। তুমি আমাকে আবার ভয় দেখাচ্ছ।’

সে সিগ্রেটের বাকি অংশটুকু পায়ের নিচে ফেলে দলে ফেলল। এরপর সামান্য সময়ের জন্য হতবিহবল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ছড়ানো কিছু পাইনের কাঁটায় লাথি দিতে দিতে হাসল আবার।

‘চলো দেখি, খাবার তৈরি কি না,’ সে বলল।

দেখলাম বাবা রান্নাঘরে। দ্রুত তিনি আমাদের দিকে একবার তাকালেন, তারপর আবার কাজে মন দিলেন।

কিকুকো একটা হাসি দিয়ে বলল- ‘বাবা তো ভালোই রাঁধুনি হয়েছেন। বাবা ঘুরে বোনের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকালেন।

‘আমি তো পারিই না, কিকুকো এসো তো সাহায্য করো।’ বাবা বললেন।

সঙ্গে সঙ্গে কিকুকো নড়লো না। পরে সে ড্রয়ারে ঝুলে থাকা অ্যাপ্রনটা নিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে গেল।

‘শুধু এই সবজিগুলো এখন রান্না করতে হবে,’ বাবা বললেন, ‘আর বাকিগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে।’

বাবা উপরের দিকে তাকিয়ে আমার দিকে স্থিরদৃষ্টি দিলেন। হাতের চপস্টিক নামিয়ে রেখে বললেন, ‘আমি চাই যে, ঘুরেফিরে বাসার চারদিকে একটু দেখ। অনেকদিন হয়েছে দেখনি।’

আমরা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। আমি কিকুকোর দিকে তাকিয়ে দেখি ও পিছন ফিরে আছে।

বাবা নরম সুরে বললেন, ‘ও তো ভাল একটা মেয়ে।’

একঘর থেকে অন্যঘরে আমি বাবাকে অনুসরণ করলাম। ভুলেই গিয়েছিলাম বাসাটা কত বড়। একটা স্লাইডিং প্যানেল গড়ালেই আরেকটা ঘর দেখা যায়। কিন্তু ঘরগুলো এতোটাই শূন্য আর ফাঁকা পড়ে আছে যা রীতিমত ভীতিপ্রদ। একটা ঘরে বাতি জ্বলল না। আমরা জানলা দিয়ে আসা ম্লান আলোয় শক্ত দেয়াল আর তাতামি মেঝের দিকে তাকালাম। বাবা বললেন, ‘একজন লোকের জন্য এই বাসা খুব বেশি বড়। বেশিরভাগ ঘরই পড়ে থাকে, ব্যবহার করা হয়না।’

এরপর-পরই বাবা কাগজপত্র আর বইপুস্তকে ভরা আরেকটা ঘরের দরোজা খুললেন। সেখানে ফুলদানিতে ফুল, দেয়ালে ছবি। ঘরের এক কোণে নিচু একটা টেবিলের ওপর আমার চোখ পড়ল। কাছে গিয়ে দেখলাম সেটা  প্লাস্টিকের একটা খেলনা- যুদ্ধ জাহাজের মডেল। বাচ্চারা যেগুলো বানিয়ে থাকে। কিছু সংবাদপত্রের কাগজের ওপর এটাকে রাখা হয়েছে; এর চারপাশে ধূসর রঙের প্লাস্টিকের নানারকম টুকরো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

বাবা একটা হাসি দিলেন।  টেবিলের কাছে এসে মডেলটা হাতে নিলেন।

‘ফার্মটা যেহেতু আর নেই আমার হাতে এখন সামান্য কিছু বেশি সময় থাকে।’ বলে তিনি আবার হাসলেন। অদ্ভুতভাবে। মুহূর্তের জন্য মনে হলো তার মুখটা নরম, শান্ত।

‘সামান্য কিছু বেশি সময়।’

‘এ তো অস্বাভাবিক,’ আমি বললাম। ‘আপনি সবসময়ই অনেক ব্যস্ত থাকতেন।’

সামান্য হাসি দিয়ে তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সম্ভবত একটু বেশিই ব্যস্ত থাকতাম।

সম্ভবত বাবা হিসেবে আরও মনোযোগী হতে পারতাম তা না হলে।’

আমি হাসলাম। বাবা নিবিষ্টচিত্তে জাহাজটা দেখছেন তখন। ওপরের দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘চাইনি তোমাকে বলতে, মনে হয় বলাই উত্তম। আমি বিশ্বাস করি যে তোমাদের মায়ের মৃত্যুটা কোনো দুর্ঘটনা ছিলো না। অনেক দুশ্চিন্তা ছিল তার, অনেক হতাশা ছিল তার মধ্যে।’

আমরা উভয়ে প্লাস্টিকের জাহাজটা মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম তখন।

আমি বললাম- ‘নিশ্চিত জানবেন, মা নিশ্চয়ই আশা করতেন না যে আমি এই বাড়িতেই চিরকাল আটকে থাকব।’

‘বুঝতে পারছি খুব, তুমি ব্যাপারটা ধরতে পারনি। বুঝতে পারছ না যে কোনো কোনো বাবা-মা এরকমই ভেবে থাকেন। শুধু যে তারা সন্তানদেরই হারান তা নয়, অনেক কিছু, অনেক বিষয় যা তারা বোঝেন না, সেগুলোতেও তারা সন্তানদের হারান।’

বাবা তখন জাহাজটাকে তার আঙুলের মধ্যে নিয়ে চক্রাকারে ঘোরাচ্ছেন। ‘তোমার কি মনে হচ্ছে না এই কামানবাহী ছোট জাহাজগুলো আঠা দিয়ে আরও সুন্দর করে লাগানো যেত?’

‘হয়তো-বা যেত। আমার তো মনে হচ্ছে ঠিকমতই লাগানো হয়েছে।’

‘যুদ্ধের সময় এইরকম একটা জাহাজে আমি সময় কাটিয়েছি। কিন্তু বিমান বাহিনীতে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা ছিল আমার। আমি এমনটাই ভেবেছিলাম। যুদ্ধে জাহাজ শত্রুর কবলে পড়লে পানিতে ওই এক রশির জন্য লড়াই ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। অথচ বিমানে শেষ হাতিয়ার একটা কিন্তু থাকে।’

তিনি মডেল জাহাজটা এইবার টেবিলের ওপরে রাখলেন আর বললেন. ‘আমার মনে হয় না তুমি যুদ্ধে বিশ্বাস করো।’

‘তা করি না।’

তিনি ঘরের চারদিকটা দেখলেন। ‘খাবার তৈরি হবার কথা এখন। তোমাদের নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।’  বাবা বললেন।

রান্নাঘরের পাশেই অন্য আরেক ঘরে অল্প আলোয় খাবার তৈরি তখন। ঘরের একমাত্র আলোর উৎস হচ্ছে  টেবিলের ওপর ঝুলিয়ে রাখা লণ্ঠন বাতিটা, চারিদিকে যা ছায়া করে রেখেছে। খাওয়া শুরু করার আগে আমরা একে অন্যের দিকে আনত হলাম।

সামান্য কথাবার্তা হলো। আমি খাবার সম্পর্কে বিনম্র কিছু মন্তব্য করলাম যা শুনে কিকুকো সামান্য হাসল। মনে হলো সেই ভয়টা আবার তার মধ্যে ফিরে এসেছে। কয়েক মিনিট নীরব থাকার পর বাবা অবশেষে বললেন :

‘নিশ্চয়ই জাপানে ফিরে অদ্ভুত, উদ্ভট একটা অনুভূতি হচ্ছে তোমার।’

‘হ্যাঁ, হচ্ছে, সামান্য।’

‘ইতোমধ্যেই কি আমেরিকা ছেড়ে আসার জন্য দুঃখ হচ্ছে?’

‘খুব বেশি না, সামান্য। কিছু শূন্য ঘর ছাড়া তেমন কিছু তো ফেলে আসিনি।’

‘তাই?’

আমি টেবিলের ওপাশে তাকালাম। আধো আলোয় বাবার মুখমণ্ডল তখন কঠিন, নির্দয় আর ভীতিপ্রদ দেখাচ্ছে। আমরা নিরবে খেতে থাকলাম।

ঘরের পেছনের দিকে কিছু একটায় আমার চোখ পড়ল। আমি প্রথমে খেয়েই যাচ্ছিলাম, এরপর আমার হাত স্থির হয়ে এল। অন্যরা তা খেয়াল করছে। বাবার ঘাড়ের পাশ দিয়ে আমি অন্ধকারে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।

‘ওইটা কে, ওই ছবিতে?’ বাবা আমার দৃষ্টি কোথায় তা দেখার জন্য সামান্য ঘুরলেন।

‘সবার নিচে যেটা। সাদা কিমোনো পরিহিত বৃদ্ধা।’

কয়েক সেকেন্ড কারও মুখে কোনো কথা নেই। কিকুকো উঠে দাঁড়াল। সে ছবিটা দেয়াল থেকে নামিয়ে টেবিলের কাছে এসে আমার হাতে দিল।

‘অনেক বয়স মনে হচ্ছে এনার,’ বললাম আমি।

বাবা বললেন, ‘তার মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে তোলা এই ছবি।’

‘সেই অন্ধকারে ভাল করে আমি তাকে দেখতে পারিনি।’

আমি ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখি বাবা হাত বাড়িয়ে আছেন। ছবিটা তাকে দিলাম। তিনি অভিনিবেশ সহকারে দেখলেন সেটা, কিকুকোর দিকে ধরলেন তারপর। আমার বাধ্যগত বোন দাঁড়িয়ে উঠে আবার দেয়ালে রেখে দিল ছবিটা।

টেবিলের মাঝখানের বড় একটা পাত্র তখনো খোলা হয়নি। কিকুকো আবার যখন এসে বসল, বাবা হাত বাড়িয়ে যখন সেই পাত্রের ঢাকনা খুললেন, ঘন বাষ্প কুণ্ডলীর মতো লণ্ঠনের দিকে উঠছিল তখন। তিনি পাত্রটা আমার দিকে কিছুটা ঠেলে দিলেন।

‘তোমার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে, তিনি বললেন। তার মুখের একটা দিক তখন ছায়ায় পড়েছে।’

‘ধন্যবাদ।’ আমি চপস্টিক নিয়ে তখন পাত্রের দিকে ঝুঁকেছি। বাষ্প তখনও এতো গরম যেন পুড়িয়ে ফেলবে।

‘এটা কী?’

‘মাছ।‘

খুব ভাল গন্ধ মাছটার।’

মাছের লম্বা  লম্বা টুকরো দিয়ে স্যুপ রাঁধা হয়েছে। বাটিতে নিলেই তা গোল হয়ে পাকিয়ে যাচ্ছে যেন। আমি একটা তুলে বাটিতে নিয়েছি।

‘নাও, নাও। যথেষ্ট পরিমাণে আছে।’

‘ধন্যবাদ।’ আমি আরেকটু নিয়ে পাত্রটা বাবার দিকে দিলাম। দেখলাম উনি কয়েক টুকরা বাটিতে তুলে  নিলেন। আমরা দুজন দেখলাম কিকুকোও নিয়ে খেলো।

বাবা সামান্য নিচু হয়ে আবারো বললেন. ‘তোমাদের নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।’ এরপর তিনি মাছ মুখে দিয়ে খেতে শুরু করলেন। আমিও একটুকরো পছন্দমত নিয়ে মুখে দিয়ে খেতে শুরু করলাম। জিহবায় কী যে নরম, মাংসল সেই মাছের স্বাদ অনুভূত হলো।

‘শুধু মাছ।’

‘এতো মজা খেতে।’

তিনজন নীরবে খেয়ে নিলাম। কয়েক মিনিট পার হল।

‘আরও আছে?’

‘যথেষ্ট পরিমাণে আছে তো?’

‘আমাদের সবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে আছে।’ বাবা আবার পাত্রের ঢাকনা ওঠালেন, আবার বাষ্প ওপরে উঠলো। আমরা আবার যার যার মত নিয়ে খেলাম।

‘এই নাও শেষের টুকরোটা তোমার।’ বাবাকে বললাম।

‘ধন্যবাদ’।

খাওয়া শেষ হলে বাবা দু’হাত ছড়িয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর দিয়ে হাই তুললেন।

বললেন, ‘কিকুকো, চা বানাও, প্লিজ।’

বোন বাবার দিকে তাকাল, কিছু না বলেই ঘর ছেড়ে চলে গেল তারপর। বাবা দাঁড়ালেন।

বললেন, ‘চল অন্য ঘরে যাই। এখানে গরম লাগছে।’

আমিও দাঁড়ালাম এবং টি-রুমের দিকে তাকে অনুসরণ করলাম। বড় বড় স্লাইডিং জানলা। খোলা সেই জানলা দিয়ে ঢুকছে বাগানের মৃদুমন্দ বাতাস। আমরা সেখানে বসে অনেকটা সময় কাটালাম।

শেষে বললাম, ‘বাবা।’

‘বলো।’

‘কিকুকো বললো ওয়াটানাবে-স্যান তার পুরো পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে মরেছে।’

বাবা চোখ নীচু করে মাথা নাড়লেন। কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকলেন। শেষে বললেন, ‘ওয়াটানাবে তার কাজের প্রতি ছিল নিবেদিত-প্রাণ। ফার্মটা যখন বন্ধ হয়ে গেল, সেটা ছিল তার জন্য বড় একটা আঘাত। আমার ভয় হয়েছিল, সেটাই তার বিচারবুদ্ধিকে হয়তো দুর্বল করে দিয়েছে।’

‘তোমার কি মনে হয় সে ভুল করেছে?’

‘কেন, অবশ্যই। তোমার কি মনে হয় অন্য কিছু?’

‘না, না। অবশ্যই অন্য কিছু নয়।’

‘কাজ ছাড়াও অন্য কোনো কারণ কি থাকতে পার।’

‘হ্যাঁ।’

আমরা আবার নীরব হয়ে গেলাম। বাগান থেকে তখন ভেসে আসছে পঙ্গপালের আওয়াজ। অন্ধকারে তাকিয়ে দেখি কুয়োটাকে দেখা যাচ্ছে না আর।

‘কী করবে বলে ভাবছো এখন? জাপানে কি কিছু সময়ের জন্য থেকে যেতে চাও?’

‘সত্যি বলতে কী অতদূর ভেবে দেখিনি এখনো।’

‘যদি এখানে থেকে যেতে চাও, অর্থাৎ এই বাড়িতে, তোমাকে স্বাগত জানাব মন থেকে। যদি তুমি একজন বৃদ্ধ লোকের সঙ্গে থাকতে পার।’

‘ধন্যবাদ। আমাকে ভেবে দেখতে হবে।’

আমি আবার অন্ধকারের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।

বাবা বললেন, ‘অবশ্যই। তবে এই বাড়িটা এতোটাই বিষন্ন যে তুমি খুব মনে হয় দ্রুতই আমেরিকা ফিরে যাবে। এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।’

‘আমি এখনও কিছু বলতে পারছিনা।’

‘সন্দেহ নেই, ফিরতে পারবে।’

বাবা কিছুক্ষণ তার হাতের পিঠে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ওপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

‘কিকুকোর পড়াশোনা পরের বসন্তে শেষ হবে। তখন বাড়ি আসার ইচ্ছে হতে পারে ওর। ও তো ভালো মেয়ে।’

‘হ্যাঁ, আসতেও পারে।’

‘ততদিনে অবস্থার উন্নতি হবে।’

‘ঠিক, আমি নিশ্চিত, অবশ্যই হবে।’

কিকুকোর চায়ের অপেক্ষায় আমরা আবার নীরব হয়ে গেলাম।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close