Home অনুবাদ কাজুও ইশিগুরো > আমাকে কখনও যেতে দিও না >> উপন্যাস >>> মাসুদুজ্জামান অনূদিত

কাজুও ইশিগুরো > আমাকে কখনও যেতে দিও না >> উপন্যাস >>> মাসুদুজ্জামান অনূদিত

প্রকাশঃ October 5, 2017

কাজুও ইশিগুরো > আমাকে কখনও যেতে দিও না >> উপন্যাস >>> মাসুদুজ্জামান অনূদিত
0
0

কাজু্ও ইশিগুরো > আমাকে কখনও যেতে দিও না >> উপন্যাস >>> মাসুদুজ্জামান অনূদিত

ইংল্যান্ড, ১৯৯০ সালের শেষ দিক

প্রথম অংশ

প্রথম অধ্যায়

আমার নাম ক্যাথি এইচ। বয়স একত্রিশ বছর। প্রায় এগারো বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি পরিচারিকার কাজ করছি। সময়টা শুনতে দীর্ঘই মনে হবে, আমি জানি। কিন্তু আসলে কী- তারা চায় আমি আরও আট মাস কাজ করি, এই বছরের শেষ অব্দি। তাহলে আমার কাজ করবার সীমাটা দাঁড়াবে ঠিক বারো বছরের মতো। আমি জানি আমার সত্তার মধ্যে এই ব্যাপারটাই ঢুকে পড়েছে। দীর্ঘকাল ধরে আমি একজন পরিচারিকার কাজ করছি। এখন সেইভাবে আর কিছু বলবারও নেই যে তারা জানেন, আমি যে কাজটা করি সেটা কত সুন্দরভাবে করি। দারুণ দারুণ সব পরিচারিকারা এসেছিল কাজ করতে, কিন্তু দু-তিন বছর কাজ করার পর তাদের ছাটাই করা হয়েছে। আমি অন্তত এমন একজন পরিচারিকার কথা জানি, যিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে চৌদ্দ বছর কাজ করেছেন। ফলে আমি আমার কাজ নিয়ে গর্ব করার মতো কিছু বলি না। কিন্তু আমি এরপরও জানি তারা আমার কাজ নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট আর কম-বেশি আমি নিজেও আমার নিজের কাজে খুশি। আমার অন্নদাতারা আমি যখন যা চেয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি-বেশি করেছেন। তাদের সেরে ওঠার সময়টাও ছিল দারুণ; এমনকি আমাকে যখন চতুর্থবারের মতো টাকাপয়সা দিয়ে রাখা হয়, তখনও তার আগে কেউ আামর কাজে সেইভাবে বিরক্ত বা ক্ষুণ্ন হয়েছিল বলা যাবে না।যা-ই হোক আমি মনে হয় এরই মধ্যে নিজেকে বড় করে দেখাবার চেষ্টা করছি। কিন্তু যা-ই বলি না কেন, এটা আমার কাছে বিশাল একটা ব্যাপার। আমাকে এসবই ভালোভাবে কাজ করবার অনুপ্রেরণা দেয়। বিশেষ করে আমার নিয়োগদাতারা যখন “শান্ত” থাকে, তখন আমার ভালো লাগে। আমি আমার নিয়োগদাতাদের সঙ্গে একধরনের গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছি। আমি জানি কখন কীভাবে তাদের সঙ্গে যুক্ত থেকে তাদের স্বস্তি দিতে হবে, কখন তাদেরকে স্বাধীনতা দিতে হবে, কখন সব কথা শুনতে হবে, কখন কাঁধ নাড়িয়ে সায় দিতে হবে আর কখনই-বা সরে আসতে হবে।

যাই হোক, আমি আমার নিজের সম্পর্কে খুব কিছু যে বলছি তা নয়, আমি জানি পরিচারিকার কাজটা কীভাবে করতে হয়, করছিও সেটা, কে আসলে ভালো কাজ করে, আর করলে তার নিশ্চয়ই অর্ধেক প্রসংশা প্রাপ্য হতে পারে না। তুমি যদি তাঁদের কেউ হও, তাহলে আমার এক-রুমের এই ছোট্ট বাসা, গাড়ি, বিশেষ করে যাদের দেখাশোনা আমি করি তাদের কথা ভেবে তুমি বিরক্ত বোধ করবে না। আমি একইসঙ্গে আবার হেইলশামের ছাত্রীও। এটাও যে কাউকে জাতে তোলার জন্য যথেষ্ট। ক্যাথি এইচ., ওরা বলে, বলে মেয়েটিকে পছন্দ করা যায়, কাজের জন্য বেছেও নেওয়া যায়, আর সে নিজে যা পছন্দ করে তা-ই করে : হেইলশামের লোকেদের, অথবা এরকম কেউ কেউ কাজ আর অন্য ব্যাপারে প্রাধান্য পায়। অবাক হওয়ার কিছু নেই, বলে, মেয়েটির কাজ-কর্ম-পড়াশোনার রেকর্ডটাও ভালো। এরকম যে কত কথা বলা হয়, আমি সেসব শুনেছি। ফলে, আমি নিশ্চিত, তুমিও এর চেয়েও অনেক বেশি শুনেছো, আর হয়তো সেসব কথার সারবস্তু হয়তো কিছু আছে। কিন্তু আমিই প্রথম নই যাকে এখানে কাজ করবার বা থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে, মনে রাখতে হবে, আমি বারো বছর কাটিয়ে দিয়েছি। আর আমি কী করবো সেটা বেছে নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে ওই বারো বছরের ছয় বছর কেটে যাওয়ার পর।

আর কেনই-বা সেটা তাঁরা দেবেনা? পরিচারিকা তো আর যন্ত্র না। তোমাকে মনোযোগ দিয়ে চাকরিদাতার জন্যে সর্বোচ্চটা দিতে হবে, দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু সব শেষে, দেখা যাবে, তুমি সেই তলানিতেই রয়ে গেছ। তোমার, দেখবে, সেই অসীম ধৈর্য আর শক্তি নেই। ফলে, যখন তুমি নিজের মতো করে বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে, সন্দেহ নেই, তুমি অবশ্যই নিজের মতো করে বেছে নেবে। এটাই স্বাভাবিক। যতক্ষণ অব্দি আমি আমার অন্নদাতাদের সম্পর্কে ধারণা করতে পারছিলাম, ততক্ষণ পর্যন্ত আমার সামনে কোনকিছু করার কোনো পথ খোলা ছিল না। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ দেখেই কী করবো, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। যা-ই হোক, আমি যদি বেছে নেওয়ার কাজটা শুরু না করতাম, তাহলে এতগুলি বছরের পর রুথ আর টমির সঙ্গে যে সম্পর্কের ইতি টেনেছিলাম, সেটা কি করে করতাম?

কিন্তু তখন সেই দিনগুলোতে, চাকরিদাতাদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছিল। ফলে, মনে পড়ছে, নিজের মতো করে কাজ বেছে নেওয়ার খুব একটা সুযোগ ছিল না। যেমনটা বললাম, চাকরিদাতার সঙ্গে যদি তোমার গভীর গভীরতর সম্পর্ক না থাকে, তাহলে কাজ পাওয়া সত্যি কঠিন। আমি আবার যেহেতু পরিচারিকার কাজটা মিস করবো, তাই বছরের শেষ দিকে অনিশ্চয়তার ব্যাপারটা দূর করাও দরকার হয়ে পড়েছিল।

রুথ কাকতালভাবে, আমার কেবল তৃতীয় বা চতুর্থ নিয়োগকর্ত্রী ছিল যাকে আমি পছন্দ করেছিলাম। সে ওই সময়ে আমার আগেই তার কাজ করে দেওয়ার মতো আরেকজন পরিচারিকা রেখেছিল। মনে পড়ছে, এই ঘটনাটা আমার জন্য স্নায়ুক্ষয়ী একটা ব্যাপার হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শেষে আমি সব ম্যানেজ করে ফেলেছিলাম। আবার তার সঙ্গে নানা বিষয়ে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, যে-পার্থক্য কখনও ঘুচবার নয়, ডোভারের নিরাময় কেন্দ্রে দেখা হয়ে যায়। পার্থক্য থাকলো কী থাকলো না, তাও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। ঘটনাটা হলো, আমরা দুজনে হ্যালিশামে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি, আমরা দু’জনেই এমনসব কথা জানি, মনেও রেখেছিলাম যেসব কথা, যা অন্যেরা জানতো না। এর পর থেকে, আমার যা হয়েছিল সেটা হলো অতীতে যারা আমাকে কাজ দিয়েছিল, কাজ পাওয়ার জন্যে তাদেরকে খুঁজতে থাকি। আর যখনই আমি সেটা করেছি, হেইলশামের লোকদেরকেই বেছে নিয়েছি।

একটা সময় ছিল যখন বছরের পর বছর আমি হেইলশাম ছেড়ে আসার চেষ্টা করেছি। তখনিই আমি নিজেকে বলতাম, পিছুটান আমার জন্যে নয়। কিন্তু একসময় সেই মুহূর্তটি এলো যখন আমি আর নিজেকে সামাল দিতে পারলাম না। সেটা হচ্ছে এই বিশেষ নিয়োগকর্তা, যার কাজ আমি আগে একবার করেছিলাম, তখন আমার পরিচারিকা জীবনের তৃতীয় বছর চলছে। আমি হেইলশামের মানুষ কথাটা শুনেই তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ছিলেন। তৃতীয় বারের মতো তিনি একজনকে কাজে নিয়েছিলেন। কিন্তু  তাকে দিয়ে কাজ হচ্ছিল না। তিনি ভাবছিলেন যেভাবে চলছে তাতে হবে না। নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিতে তার খুব কষ্ট হতো। কিন্তু তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হেইলশাম। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, জায়গাটা সত্যি দারুণ।” আর ঠিক পরদিন সকালে, আমি যখন তার মন ভালো করার জন্য এটা-সেটা বলছি, জানতে চাইলাম কোথায় তার জন্ম আর বেড়ে ওঠা, তিনি ডোরসেটের কোনো একটা জায়গার কথা বললেন আর দেখলাম ওই কথাটা বলবার সময় তাঁর মুখশ্রী একেবারে নতুন একটা রূপ ধারণ করলো। কী-যে বিষণ্নতা সেই মুখে! বুঝতে পারলাম, তিনি মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন যাতে পুরানো অতীতকে স্মরণ করতে না হয়। সেই স্মৃতির বদলে তিনি শুনতে চাইলেন হেইলশামের কথা।

ফলে, পরবর্তী পাঁচ-ছটা দিন, তিনি যা যা শুনতে চাইছিলেন বলে গেলাম। তিনি শোয়া অবস্থায় সব শুনলেন। পরিস্থিতি অনেকটা সহজ হয়ে এলো, তার মুখে ফুটলো শান্ত হাসির রেখা। তিনি বড় বড় এবং ছোটখাট অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন। আমাদের অভিভাবকদের সম্পর্কে জানতে চাইলেন। কি করে বিছানার তলায় আগলে রাখি যত সঞ্চয়-সংগ্রহ, ফুটবল, দৌড়ঝাপ, ছোট সেই রাস্তা যে রাস্তা ধরে মূল ভবন ছেড়ে বাইরে আসতে হয়, সব আনাচকানাচ, হাঁসের কেলি করা পুকুর, খাবারদাবার, কুয়াশায় আচ্ছন্ন মাঠের ওপারে আর্ট রুমটি তাকিয়ে দেখা- এইসব। কখনও কখনও একবার নয় অনেকবার আমাকে বলতে হলো একই কথা। ঠিক আগের দিন যে কথাটা বলেছি, তিনি শোনেননি বলে আবার সেই কথাগুলিই বলতে বললেন। “তোমাদের কি কোনো স্পোর্টস্ প্যাভিলিয়ন ছিল?” “কোন অভিভাবককে তুমি বেশি পছন্দ করতে?” প্রথম প্রথম আমার মনে হতো, এসব হয়তো ওধুধের প্রতিক্রিয়ামাত্র, কিন্ত পরে বুঝলাম, তার মনটা খুবই পরিস্কার, তিনি সবকিছু সজ্ঞানেই জানতে চাইছেন। ব্যাপারটা শুধু এমন নয় যে তিনি হেইলশামের কথা শুনতে চাইতেন, তিনি চাইছিলেন পুরানো দিনের কথা মনে করতে। ঠিক কেমন ছিল তার নিজের শৈশব। তিনি জানতেন যে তার দিন ফুরিয়ে আসছে, আর তাই ওইসব কথা মনে করার চেষ্টা করছিলেন। আমাকে বলছিলেন সবকিছু বর্ণনা করতে। তিনি চাইছিলেন সেই স্মৃতির অতলে ডুবে যেতে, যাতে যেসব নিদ্রাহীন রাত তিনি নানান ‍ওষুধপত্তর আর ব্যথা বয়ে নিয়ে কাটাচ্ছিলেন, অস্থিরতা, কেমন ছিল তার শৈশব আর কেমন ছিল আমার শৈশব- এই দুই শৈশবের মধ্যে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল ঝাপসা হয়ে যাওয়া নিঃসীম ভেদরেখা। আর তখনই আমি প্রথম উপলব্ধি করতে পারি, হায়, কতটা ভাগ্যবান ছিলাম- টমি, রুথ, আমি আর অন্য সবাই।

[প্রথম অধ্যায়ের প্রথম অংশ]

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close