Home কবিতা কামরুল ইসলামের ৩০টি কবিতা ও কবিতা ভাবনা > প্রবন্ধ / মাসুদুজ্জামান

কামরুল ইসলামের ৩০টি কবিতা ও কবিতা ভাবনা > প্রবন্ধ / মাসুদুজ্জামান

প্রকাশঃ April 25, 2017

কামরুল ইসলামের ৩০টি কবিতা ও কবিতা ভাবনা > প্রবন্ধ / মাসুদুজ্জামান
0
0

কামরুল ইসলাম-এর ৩০টি কবিতা ও কবিতাভাবনা

স্বনির্বাচিত ৩০টি কবিতা

অবৈতনিক  নিমপাতার সংগীত

জন্মদিনে ঢুকে যায় বাসন্তী অপেরার ছুকরিদের

পেইন্টেড অবয়ব কিংবা তাদের ফেলে যাওয়া

সামান্য  অপেক্ষা– বজ্রপাতের নিচে লিয়রের হাড়ের কম্পন

কিংবা মরচে-ধরা গেরাপির ফলায় ফলায়

জমে থাকা জলপাখির বহুমাত্রিক মলমূত্র, ক্রীড়া–

 

জীবনের ডালপালা উঁচিয়ে যেটুকু দেখা যায়

সবটুকুই টানাটানির দিন, তার তলে

চিকিৎসাশাস্ত্রের  অনিদ্র জঙ্গল

দহনে,  দ্বিধায়-

 

কিছু কিছু অচিকিৎস্য সন-তারিখের খাঁচায়

শীতের বিকেলের সরল দো-তারা বেজে উঠলে

অসুখের গোপন জানালায় ঘাসফড়িংয়ের ডানা থেকে

নেমে আসে অবৈতনিক  নিমপাতার সংগীত–

 

ধূসর কাঁকড়াদিন

কাঁকড়া ভরা ছোট এক বিলের ছায়া হৃদয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যায়

আর তুমি দূর থেকে দেখে দেখে হাসো…

ঘাসপাখির চরম দুর্দিনের ইমোজি-চরের রোদে ফুটে থাকা কত সব ন্যাংটো ফুল

এরই মধ্যে কাঁকড়ার খোলস ভরা বালির মমতায বেড়ে ওঠা ঘাসের মধ্যে

প্রাচীন সমুদ্রের ঢেউ-

 

অতঃপর মেঘ জমে দক্ষিণে-বামে- নির্জন বিলের ছায়ায় ঝড় ওঠে

কাঁকড়া তার গর্তের ভেতরে গড়ে তোলে স্বরাজ (একাকী মানুষের আকাশ)

জলজ আঁধারে ঘুমোয়, প্রজাদের চিঠি লেখে, নেশায় চুর হযে কখনো

গোপন রাস্তায টাঙিয়ে রাখে অশেষ ক্যাারিশমায় ভরা কঠিন সময়ের নীরবতা —

 

এইসব ধূসর কাঁকড়াদিন গাছে গাছে ওড়ে- জলে জলে ভেসে যায় উন্মাদ

শ্রাবণের ভেলা-

 

যাও পাখি বলো তারে

 

আহা সেই নলিনীর ঘর যেন কলাপাতায় জাগ্রত ঈশ্বর

শাকান্নের নিথর উজানে। এঁকে যায় কারবালা হৃদয়

কে এক মৎস্যশিকারী মেঘের ফাতনায়, দুধভোরে;

যেখানে গাছের ছায়ায় আমারই কফিন ছাইরঙে হাসে-

তবু, এই রক্তেভেজা বিপন্ন জগতের কিনার ঘেঁসে

সান্ধ্য বাতাসে ভেসে যায়- যাও পাখি বলো তারে…

 

সীমাহীন বর্ষার রাতে

 

সংগীতের উপোল তেপায়ায় দুলছে রাত

গৃহিণীর চোখে-মুখে উদ্বাস্তু হাওয়ার ঝাপটা

গাছেরা কিছু মায়া তুলে ডাকছে দূরে-

 

জঙ্গলের সন্দেহ চোখে বাড়ি ফিরছে ক্লান্ত কোকিলের

পুরনো কুহু–

সহস্র লতার শুভেচ্ছা মাখা এই সংগীতের নিচে দাঁড়িয়ে

আমরা দেখতে থাকি হাড়মিস্ত্রির সান্ধ্য কবর–

 

পথ তুমি কেবলই ইশারা- একথা মনে রেখে

আমার উনুনে আমি লুকিয়ে রাখি আমারই ডানা

একদিন সীমাহীন বর্ষার রাতে দেখবো তা খুলে –

 

 বিদূষী পাখির কেরাত

চারপাশে যখন ধানের মতো ঢেউ খেলে যায়

জঙ্গলে আটকে যাওয়া দু-একটি বিকেল

বাতাসের চিবুক চুঁইয়ে মর্সিয়া গায়, যখন তালগাছে

লেগে থাকা গত বছরের বৃষ্টির মহড়া

সামান্য হাসির দিনে ফিরে না আর, যখন বাবুইযের

ঠোঁট থেকে ঝরে পড়ে আকণ্ঠ শিল্প-আঁচড়

 

তখন কোনো বিদূষী পাখির কেরাতের দিকে

নবান্নের গান ভেসে আসে, আর পাড়ায় পাড়ায়

হেমন্ত সন্ধ্যায় পাখিদের খুঁটে খাওয়া দৃশ্যের কথা

ভাবতে থাকে সান্ধ্য মানুষের ডোরাকাটা মুখ-

 

সন্ধ্যা এখন লেবুপাতার প্রশ্রয়ে জোছনা ও তুষারের যৌথ মহড়া…

 

এইসব ছায়ারূপ

হে ললিতকলা, ডুবে যাচ্ছো পুরনো স্নানঘরে- ডুবে যাও ;

ডুবতে ডুবতে একদিন যদি ভেসে ওঠো জনান্তিকে, বেলতলায় এসো

বেলফুলের গোপন বেলায় আবার দেখা হবে আমাদের…

আমাদের পথের হাওয়ায় শালিকের নিঃসঙ্গতা ধরে

নেচে উঠবে খড়বোনার পরানসখারা

জোনাকির মরণদৃশ্যের পাঠাগারে ভুলভাল কিছু ঘটে যাবে

হে ললিতকলা, ডুবে যাও বিরহ নদীর আরণ্যক জলে–

এইসব ছায়ারূপ খেলায় তরঙ্গ লিখলে

ভাটিয়ালি মরে যাবে উজানে উজানে

বেলগাছের কাঁটায় লেখা আছে ডুবতে ডুবতে ভেসে ওঠা জীবনের মানে…

 

সেই ট্রেনটি

সেই ট্রেনটি আর আসবে না জেনেও তুমি দাঁড়িযে আছো প্লাটফর্মে, একা।

তোমার মন চলে গেছে বহু বছর আগের ঝিকঝিকে-

শুঁয়োপোকার হার্টবিট ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সময় লাল নীল প্রদীপ জ্বালিয়ে।

 

কুয়োর জলে জানালার ছায়া, জাফরি-কাটা চোখের দিকে শালবন

সেখানে একটি মুখ জলের প্রচ্ছদে ঘুমিয়ে আছে পথ হারানো মনে

এভাবেই আকাশের নিচে জন্ম হয় জল-বেদনার মায়া সংগীত-

 

দূরে সব ভাসমান শূন্য শূন্য দিন, ভেঙে যাওয়া স্মৃতির দ্বৈরথ ঢেকে দেয়

ডাহুক-কন্যার রক্ত-কণ্ঠের সুখ। মানুষ ও তার রহস্য নিয়ে একটি ঘড়ির জীবন

ঘাসফুলের জরায়ুর দিকে উড়িয়ে দিচ্ছে ক’টি বুনো কবুতর… আহা, এ জীবন

মন্বন্তরে ভেসে যাওযা খড়কুটো , লেবুফুল ঝরে পড়া দুপুরের খাঁ খাঁ বারান্দা!

 

সেই ট্রেনটি আর আসবে না জেনেও তুমি ঘন কুয়াশায় উড়িয়ে দিচ্ছো

কুড়িয়ে পাওয়া অরণ্যের সংলাপ- জলধোয়া  মেঠোপথ- নীলপরী দুপুর-

 

পাসওয়ার্ড

আমাদের পাড়ার জঙ্গলে একটি মরখেটে বরই গাছতলে

আমি কুড়িয়ে পাই একটি লাল কাঠের ফ্রেমে বাঁধা ছোট্ট আয়না

আয়নাটির ভেতরে তাকালে আমি আমাকে দেখি না, দেখি-

হাওয়াই-মিঠের বাকশো, ফ্রক-পরা রেহেনা খাতুন আর

প্রুফকের ছায়া ছায়া মুখ-

আমি আমাকে দেখি না কেন, বলতেই আয়নাটি অন্ধকার হয়ে যায়

সেই অন্ধকারে একটি গাংচিল অসমাপ্ত সঙ্গম নিযে উড়ে যাচ্ছে দূরে

আর আমার মনে পড়ে যায়-

একদিন বাদ-মাগরিব একটি মক্তবের পাশের কড়ইতলে আমি

দিল-খোলা পাসওয়ার্ড হারিয়ে পুরনো ইঁদারার ভেতর মাথা ঢুকিযে

চিৎকার করে বলেছি-

মন তুমি পুঁটিমাছ, খেয়াঘাটের মর্মরধ্বনির দিকে তোমার কান!

 

জঙ্গল ও আয়নার মাঝে সমুদ্র সমুদ্র খেলা- মেঘলা সফেন

ভিজে উঠছে প্রবালের গান, সান্ধ্য প্যারাাবন-

 

আমার মনে হয়- আমি কড়ইফলের ঝনঝন ধ্বনি মাত্র প্রেতায়িত হাওয়ায়…

 

 

ঘরোয়া তিতির

মেঘেরা সংকেত দিলে জেগে ওঠে সামান্য জোয়ার

অনিদ্রার পথে পথে চোখে পড়ে সেগুনের ঘুম-

 

কাজের গভীরে ঢুকে যখনই পাখির মতো ছুটি

তোমার শরীরে দেখি ফুটে আছে কফিনের ছায়া

 

সামান্য অতিথি হতে কলাপাতা ভিজে হলো সারা

ঘরোয়া তিতির তুমি উড়ে যাও কোন মন্ত্র বলে-

 

লাল মাটির কবিতা

লাল মাটির কবিতা তোমার পছন্দ ছিল-

তুমি জানতে আলোর ভেতরে কীরকম যন্ত্রণা

ঢেউ খেলে লাল ইস্পাতের বল হয়ে যায়, আর

বুড়ো কচ্ছপের সাঁতার নিযে কীভাবে জলজ কেতাবের

পৃষ্ঠাগুলো নিজেদের গুঁটিয়ে নিতে থাকে-

 

তুমি বৃষ্টিতে ধুয়ে দিতে চেয়েছিলে মৃত্যু ও কফিনের

যৌথ সংসার, আর পাড়ার কিন্নরতলায় গান কুড়োতে কুড়োতে

জেনে গেলে বিরামহীন দৃশ্য লঙ্ঘনের ইতিহাস-

 

লাল মাটির কবিতা তোমার পছন্দ ছিল-

লাল ভাতের গদ্যের ভেতরে সাঁতার কেটে কেটে

একদিন তুমি জেনে গেলে লালপেড়ে শাড়ির আঁচলে

আলোরা কীভাবে অন্ধকারে ডুবে ডুবে জল খায়, আর

পাশের বাড়ির অন্ধ লোকটি আধখানা মেঘ কাঁধে

ভেঙে যায় সবগুলো পুরনো দেয়াল-

 

ব্যক্তিগত জমানো মন্ত্রপুস্তিকার পাতাগুলো

ব্যক্তিগত ওড়াউড়ি নিয়ে আমরা ঢুকে পড়ি শহরের শেষ মাথার উড়ন্ত পানশালায়

সেখানে এক অন্ধ কসাই আর এক বেহালাবাদক ওয়াইন ও অন্ধকার গিলছে সমানে

আর চারদিকে মাংস-হারানো গরু-মহিষের দল গোল্লাছুটের মহড়ায় যে যার মতো

শান-দেওয়া ছুরির দিকে প্রণত-

পানশালার দেয়ালে টাঙানো বিখ্যাত মাতালদের ছবির ভেতর আমাদের ব্যক্তিগত

জমানো মন্ত্রপুস্তিকার পাতাগুলো বেলফুলের গন্ধসহ ঢুকে যায়, আমরা তখন

বেহালাবাদকের শেষরাতের ঘুমের ছায়ায় বেলগাছের নিজস্ব সংগীত

বিছিয়ে মনে করতে থাকি তুমুল বৃষ্টির ভেতর হেঁটে যাওয়া মন-বালিকার জল-ধোয়া মুখ…

 

রূপের টোটেম

ঝোঁপের আড়ালে পড়ে আছে রূপের টোটেম

ডালে ডালে ঘাম ঝরে শুকনো পাতার, আর তুমি

ছায়াবিষ পথে ফেলে মেখে নাও বকুলের ঘ্রাণ

 

দূরে, বাতাসের স্মৃতি আমলকির ডালে এসে বসে-

উৎসব ভুলে যারা উঠছে পাহাড়ে

তারা কি জানে কীরকম সাঁতার হলে দিগন্ত কাঁপে

দিঘির চারপাশে নেমে আসে মৌসুমী ঝড়?

 

উৎরানো সন্ধ্যায়

রূপের কাহারবায় গাছে গাছে বেজে ওঠে পাখি

জ্বলে ওঠে কিশোরী কোকিলের সঙ্গম ও স্বর-

 

মান্দার গাছ

মান্দার গাছ একটি রূপকের আড়ালে, কাঁটা ও ফুলে-

এই দেখে আমরা  সংসারী হতে থাকলে

ভেঙে যায় রূপকের ডানা।

তখন সেই নীরব কাঁটাগুলো নিজ নিজ প্রতিবিম্বে

ঢোকে আর ফুলগুলো মন্দিরের পথে-

মান্দার গাছ অনার্য হেতু পায়ে পায়ে অনিবার্য উড়াল

পরিণয়ের লতা-গুল্ম জড়িয়ে

অলক্ষ্যে তারে নিয়ে যায় যে দিকে উড়ে শুধু শ্মশানের ছাই

 

পড়ে থাকে রূপকের বহুরঙ ডানা

আর কাঁটাগুলোর প্রতিবিম্বের ছায়ায়

পুকুরঘাটের থমথমে সন্ধ্যা এসে শুনিয়ে যায়

পুরনো দিনের মৎস্য শিকারের কাহিনি।

 

মান্দার গাছ  হাওয়ার শৃংখলে আটকে যাওয়ার পরও

সংসারের কিনারে ঝুলে থাকে নিজস্ব ছায়ায়-

 

আমাদের গোলাবাড়ী গ্রাম

নিঃসঙ্গ দুপুর কিংবা চৈতি হাওয়া আমার চৈতন্যের শিরায় শিরায় জাগিয়ে তোলে বিমূর্ত সন্ধ্যার আঁধার; নদী ভাঙনের দৃশ্যাবলি- প্রতœবেলার বৈচিত্র্যে খেলা করে বাউল কবির জ্বলন্ত নিউরনে। অনেক পরিচিত গাছগাছালির ভেষজ মমতায় আমার চোখে আজ নতুন কোনো ঈশ্বরের বৈরিতা ভেসে ওঠে- আমি স্থির বিন্দু ছেড়ে যাই- জলের কোন্দল থেকে সহসাই উঠে আসি ঝোপঝাড়ে নিজস্ব আড়ালে, বিষাদের জ্যামিতি চষে অন্তর্লোকে খুঁজে পাই বালকের হৈচৈ স্নান দেখি কত নিভে যাওয়া ভাসমান মুখ, অসম জীবনযুদ্ধ, মানুষের একাকিত্বের বিদ্যা ও দর্শন

আমি তর্জমা করি নিঃস্ব কৃষকের ঘেরাটোপ- দ্রোহনীল চোখে দেখি কমিউন ওড়াউড়ি আবদ্ধ মনীষায়, তর্জমাহীন, নিঃস্ব; দুঃখনদী জ্বলন্ত ক্ষুধায় গ্রাস করে আমাদের গোলাবাড়ী গ্রাম- রক্তহীন নিস্পন্দ আমি যেতে থাকি- যেতে যেতে পাড়ি দিই অনেক ভোর, দুপুর ও বিকেল পড়ে থাকা ভিটেমাটি ভাঙা চেয়ার, বিপন্ন তেলের শিশি, পুরনো স্যুটকেস পার হয়ে দেখি কত ভগ্ন-হৃদয় অপেক্ষার ঢেউ ভেঙে জ্বলে উঠছে অপার শূন্যে

আহত সরালির চোখের সারল্যে ভেজা আলোগুলো রঙিন বয়েমে আজ বসন্তের ঘুম, এদিকে যখন নগর বাউলেরা সদ্য তৈরি সোলারিয়ামে দেহ কসরতে ব্যস্ত আমি দেখতে পাই মন্দিরা বাজিয়ে রামু গায়েন আমতলায় জড়ো করছে বাউল পাখিদের আর তার একতারা নিয়ে উড়ে যাচ্ছে একঝাঁক হরিয়াল (তখন লালন ফকির মেঘের আড়াল হইতে আমাদের বিভঙ্গ মুখম-লে একবার উঁকি মারিল আমরা বুঝিলাম জীবনের আরো অনেকানেক পরিখা খনন করিতে হইবে) জানা নেই অন্য কোনো ভাষা- হাল-চষা চাষী এক মেতে আছি বাতাসের উলঙ্গ চিৎকার কিংবা তাপদগ্ধ জমিনের একাট্টা পিরিতে; ধ্যানবতী জলকন্যার মৎস্যগন্ধী জালে আটকে আছে আমাদের পূর্বপুরুষের শ্বাস-প্রশ্বাস, কড়ির ঝোলা আর পবিত্র নুনুফল- চৈত্রধুলো জানে সেই কথা

চরের বাউড়ি কিংবা নতুন ঘাসের চৈতন্য ছুঁয়ে উড়ে আসা হারানো শৈশব ঈশ্বরের দোচালায় বসে হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে অন্ধকার আর কুপির আলোয় ভাসা ভাসা শোকের আদলে তৈরি হচ্ছে গ্রাম-নিধনের কথিকা; জিওল কিংবা মাগুর মাছের থৈথৈ ক্যানালের জলে ডুবে ডুবে জল খাওয়া কিশোরীর ভাসমান চুলের মতো মনে পড়ে একদিন এই গ্রামে এসেছিল সার্কাসের হাতি- জীবনতলার অন্ধকারে দেখি কজন কিশোরীর ফুলমুখে জমে আছে আহত মেঘ; লগেন ভুঁইয়ার লাল বাড়ি কিংবা পাকা ইঁদারার পাশের মাদারের লাল ফুল পড়ে থাকা পথে আজ মহাস্রোত- ভেসে যাচ্ছে কত সব বিপন্ন মানুষের কামনার স্মৃতি

ছনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে হু হু করে ধেয়ে আসা উত্তরের ঠা-া হাওয়ায় শুষ্ক যৌবনে আজো কেউ দুধভাতের স্বপ্নটুকু জিইয়ে রেখেছে বুকের গভীরে; কোমলে কঠোরে বেড়ে ওঠা ইতিহাসের ছেঁড়াখোড়া পাতায় হেঁটে যাচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা- পাশাপাশি রহস্য ছায়ার চোখে দোভাষি অন্ধকার- এরকম দৃশ্যের মধ্যে বেজে ওঠে কুয়াশার ঘড়ি অন্য কোনো নেতির পাঠশালে আর গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে শকুন ও শুয়োর ত্রি-মাত্রিক দৃষ্টির ভারে, আমরা জলমহালের ওপর থেকে মুছে যেতে দেখি জেলেদের পৌরাণিক ছায়া; লাল বাড়ির সামন্ত আঁধারে প্রোজ্বল হ্যাজাকের আলোয় ষোড়শী যাত্রাভিনেত্রীর চুলের কৌলিন্যে আটকে আছে আমাদের সূর্যক্লান্ত মন, আমাদের শিরদাঁড়ায় জমে আছে ছাবের লাঠিয়াল কিংবা তার শ্যামল সাহস বংশপরম্পরায়

অনচ্ছ অন্ধকার কিংবা স্রোতের গর্জনে হারানো তীর্থের গৃহায়ণ থেকে আমার রাখালি মন কুপির আলোয় দেখতে পায় ত্রিকালজ্ঞ বুড়ো নিমগাছ- চৈত্রের দুপুরে গামছা পেতে ঘুমিয়ে থাকা রাখালের পাশে আমিও ঘুমিয়ে পড়ি কখনই- আমার বুকের ওপর অজস্র পাকা নিমফল জমে আছে মেঘ হয়ে- আমি সে মেঘের বারান্দা থেকে কুলুঙ্গির অন্ধকার কিংবা জলচৌকির গল্পগুলো তুলে আনি কৌশলে, আমি শুনতে পাই আমার পিতাজান ধীরে ধীরে কাছে এসে মৃদু স্বরে ডাকছেন- ‘বাপ, ওঠো, এখন অনেক বেলা’ স্নেহের এই বৃষ্টির গানে আমি জেগে উঠি- দেখি কোনো গ্রাম নেই- চাঁদেলা রাত- একটি ছোট্ট ডিঙিতে আমি ভেসে যাচ্ছি অচেনা জলে আর আমাদের গোলাবাড়ী গ্রাম উত্তরের আকাশে এক নক্ষত্র পল্লী, যেন বহু যুগের অন্ধকার শেষে গাভিন সূর্য দিয়েছে ছেড়ে আলোর নহবত; আমার পিতামহ উঠে আসেন অঢেল নির্জনতা ভেঙে তখন ঝরাপাতা উড়ে যায় অসুস্থ জন্মজল ছুঁয়ে আর আমাদের বাড়িটি আমার কৈশোর ও শৈশবের স্মৃতিগুলো পোটলায় বেঁধে ডাকছে আমাকে সস্নেহে-

তখন নিয়তির পাড়ে খসে পড়ে বেলা-অবেলার দরদি বৃষ্টি- প্রাণের ভেতরে বেজে ওঠে নিজস্ব মানবীর নিরস্ত্র বেহালা- রক্তের উত্তাল স্রোতে জীবনের দাঁড় ভেঙে গেলে আমি শুনতে পাই রসিক মিস্ত্রীর বটতলায় বেহুলার ভাসান- ‘বিষের এমন জ্বালা, ও প্রাণ গেল রে …’ অতঃপর আমার ডিঙিটি ভেসে চলে অসংখ্য রক্তময় নদী যার জলের চঞ্চলতা ভেঙে কোনো এক পরিশ্রান্ত ইউলিসিস ফিরতে চায় ইথাকায়- আমার অস্তিত্বের মোহনায় জেগে ওঠে লাল নীল সমুদ্রের স্মৃতি- তখন নিভু নিভু প্রদীপের আলোয় আমার শিয়রে যেমুখ ঘোমটার তলে ঢেউ-এ ঢেউ-এ খোলে ভেজা চুল, তার কথা লিখে যায় পুরনো বিষাদে, ধূূসর কষ্টে-

 

পথিকবৃত্তির নাকানিচোবানি

বীজ বপনের ছন্দ ও মুদ্রা কিংবা ঘেমে-ওঠা মনের

গুচ্ছ গুচ্ছ মেটাফর- মোষবাথানের লোকজ আঁধার

জাল ও জলের গল্প নিয়ে নেমে পড়ি

সাকিনের খোঁজে

এই বেলা ফুরালো কিছু গান বাঁশবনের দুষ্ট হাওয়ায়

হারানো ধুলোপথ ধরে আছে কিশোরীর বেণী

বরফ মাখানো উষ্ণতায়

সেই পথে দাঁড়িয়ে আছে নির্জন দুপুর মহতী উৎসবে

 

ধানক্ষেতের  আল ধরে হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত ছেলেবেলা

ঘুমিয়ে আছে বটের পাতায়

রহস্যময় ঝোপের আড়ালে প্যাগান চাঁদের উন্মাতাল

অভিসার- প্রকৃতির ভেষজ চিঠিগুলো

যেটুকু বাড়তি হাওয়ায় সেটুকুই  ছায়ার দুলুনি

পথিকবৃত্তির নাকানিচোবানি

 

চেতনার শিশিরে-তন্দ্রায়  ঢেউ-আঁকা স্বপ্ননদীর বেহালা

কাশফুলে ছাওয়া

বাজে গো বাজে আমার কাঠের যৌবন নিয়তির পাড়ে

শাদা-কালো ছন্দে

যেখানে পূর্ণিমা পুরনো ঢেউ-এ,  জলে ও পুরাণে-

 

মনে পড়ে যে-হাওয়ায় দোলে মন

 

… a lot of deaths I have crossed

in the black and white dreams

 

কফিন থেকে বেরিয়ে যাওয়া শবটি

দাঁড়িযে রইল কদম গাছের তলায়

মনে পড়ে যে-হাওয়ায় দোলে মন

অতঃপর শিশিরপ্রান্তের কড়িকাঠ হয়ে

লিখে দিলাম ছেঁড়া পাতার জবানবন্দী

 

অনেক মৃত্যুর অগ্নিগোলক দিয়ে বেরিয়ে

যাওয়া সার্কাসের কৌশলে শুকিয়ে গেল খাল-বিল

আজ দুপুরে চৈতন্যের গলিতে একটি শবের দিকে

হাত বাড়ালো হাওয়ার কুণ্ডলী

আর পাখিরা কিচির-মিচির শব্দে

প্রকৃতির অণ্ডকোষে ঢুকে গেল নিঃসঙ্গ সত্তায়

 

জলবায়ু-শরণার্থীর ছায়ায় ঘুমিয়ে থাকা

পলাতক ঝিনুকেরা স্বপ্নের পালকগুলো বিছিয়ে

দেয় আয়ুর অতলে আর ভবানীপুরের

ঝাউপাতা মেয়েরা জেনে যায় :

প্রতিটি ভাঙনের তীরে জেগে থাকে আরোগ্যের চিঠি

 

আমাদের কিছু ঘাস ছিল

আমাদের উঠোনের কোণে কিছু ঘাস ছিল

আমাদের নিঃশ্বাসে ছিল নির্ভার নদীর কলতান;

ঘরে ঘরে ঘোড়াদের কাল শেষে ফিরে আসে আস্তাবল

তাদের স্মরণে আসে অন্ধকার- স্মৃতির ঘাসে নূপুর বাজে শোন :

আমাদের কিছু ঘাস ছিল- ঘোড়ারা ঘাস খেত

ঘোড়ারা ঘাসহীন দলে দলে

ঘাসের পরানে বাজে শূন্যতা

ও ঘাস, ও শূন্যতা, তোমরা আমাদের উঠোনে আজো

বিবিধ তৈজস-

 

র‌্যাশনাল গরুকাবেলায় কালেভদ্রে আমরা ঘুমোই

অতঃপর পান্থজনে বিড়ি টানে

নুনে-ভাতে নিকোটিনে কাটে দিন

আমাদের উঠোনের কোণে কিছু ঘাস ছিল

সতেজ সবুজ ঘাসে ফড়িংয়ের গল্পগুলো ঘুমের স্রোতে-

 

অন্ধকারে জ্বলে ওঠে বিষ

অন্ধকারে জ্বলে ওঠে বিষ, আমি নিজের ভেতরে টের পাই কালো বেড়ালের চোখ অতঃপর ঝিনুক-হৃদয়ের গান বাজে হাওয়ায়… লুণ্ঠিত হৃদয়-কুলে জাগরণ, ভাদ্রের প্রখর রোদে খুদে জেসাসের চোখে জ্বলে ওঠে ক্রুশ, অনেক রক্তে ডিঙা বায় মাছের দেবতা আয়ুহীন জলে যখন বিষ তার উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে দেয় শস্যভ্রƒণে। মাঝরাতে হারানো চাঁদ ফিরে আসে মাতৃজঠরে আর সুকান্তদেহী সন্ধাতারারা নেমে আসে আমলকি বনে, ঘাসে ঘাসে উড়তে থাকে তারাদের জেলিফিশ মন। বিষের উজ্জ্বলতা ধরে কতশত ভাবুক প্রেমিক সাঁকোর ওপারে হেঁটে যায়- যেতে যেতে  জেনে ফেলে সন্ধ্যাতারারা অন্ধকারে ঘুম থেকে জাগে আর বিবেকের আস্তাবলে ঘুমোয় অঘোরে…  বিষের হাওয়ায় বিষ বড়ো শূন্যতা বোঝে- হৃৎপি-ে, বৃক্কে ও যকৃতে বিষের কার্নিভাল। আমরা যারা অনেক রোদসী নদী পাড়ি দিয়ে মিশে গেছি জলের  কল্লোলে তাদের নিউরনে জমাকৃত নীলকন্ঠ মৃত্যুরা বিষজালে খুঁজে পায় অধিক মরণ- তখন পাপের মূর্তিগুলো সিঁড়ি ভাঙে জল পতনের দৃশ্যে- আলোয় বিয়ানো শব এসে দুলিয়ে যায় মন-

 

সাঁতার না-শেখা হাতগুলো নিভে নিভে নকটার্ন

ভাঙা পাড়ে খেলা করে উচ্ছ্বাস-ভরা সওদাগরী ছায়া যখন

জলের দারিদ্র বুঝে কতিপয় জল-পাখি উঠে আসে ডাঙায়

আর বৈকালিক মাঝিরা চলে যায় প্রাণায়ামে জীবনের ভারে

শ্রেণী আর শত্রু নিয়ে শেষ হলো অভিনব শাস্ত্র ঘাঁটাঘাঁটি

গণিতের মর্মকথা ভুলে যায় বর্ষাবৃত্ত মন;

মাত্রা-ভাঙা সময় থেকে আবারো উড্ডীন হারানো সাকিনে

পাতা ঝরলেই বুদ্ধের চোখে আটকে যায় বায়োডাইভার্সিটি

২.

পুরনো আকাশ  কিংবা কোনো অশীতিপর মেঘ  আজো

দাঁড়িয়ে থাকে লটকনের ডালে- ভিটামিন সি-এর জন্য

বুনো বাতাসের আহাজারি, চৌকাঠে সার্কাস ও ডামি কিছু

ঘাস- ভেঙে যাওয়া প্রার্থনা উড়ে স্বৈরতন্ত্রের গুহায় আর

অধরা সংবেদে ভিজে যায় প্রতিমার স্বধর্ম প্রগতি দ্বৈরথে-

মর্মার্থে বোঝা যায় কবির জানাযায় থাকে না শব, কফিনের

শেকড়ে-বাকলে উলঙ্গ ডানায় উড়ে অর্ধমৃত কাপালিক বক

৩.

বারান্দায় মোষের হুঙ্কার, সৃষ্টিজনিত উড়াল, ছদ্মনামের বৃষ্টি

বিভ্রমে উড়ে কত মদ্যপ ঘুড়ি লাল নীল সুতোর থাবায়

চোখের রেটিনায় নবকুমার কিংবা জাদুবাস্তবতা

হাত ঘুরে ঘুরে ভীমসেন যোশি… অমরত্বে যাও হে শ্রাবণ-

অন্ধকারে বসে আছেন কনফুসিয়াস জলের কিনারে আর

সাঁতার না-শেখা হাতগুলো নিভে নিভে নকটার্ন

একটি আনন্দ-রাত ডেকে আনে ফুল্লরার সাদাকালো শৈশব

 

চারদিকে শব্দের লীলা

এই যে শব্দগুলো নিঃশব্দে এসে দাঁড়াচ্ছে পাশে  অগুনতি মুখোশে

হাওয়া-বণিক জানে তার অর্থ? চারদিকে শব্দের লীলা

চপল বৃষ্টির সুনসান; ঘুমের কুরুঙ্গি থেকে জেগে ওঠে দ্বৈরথ :

শব্দেরা ওড়াই কিছু মেধাবী মিথ উদ্বায়ু জলজ আড়ালে

শব্দের ভরাট গাঙে কিশোরী বেহুলার ব্যাকুল নিয়তি

মোমের মান্দাসে ভাসে কিছু মুখস্থ শোক আলুথালু কেশে

 

ছায়ায় দাঁড়ানো অচেনা লোকটি তুড়ি মেরে থামিয়ে দিচ্ছে

পথের উৎসব আর আমাদের গাছগুলো ডুবে আছে হাইব্রিড ধ্যানে

ইচ্ছার পল্লবিত ডানায় ভেসে ওঠে অচেনা উপকূল

মরমি গানের ঘাটে  মৃতদের গোছলের হিড়িক- এসবই মৌলিক

 

এপারে দাঁড়িয়ে আছি- এ এক আলাদা আলকেমি :

রক্তের সুড়ঙ্গ হয়ে মস্তিষ্কের জানালায় শব্দ আসে পঞ্জরাস্থির

কানকোয় চড়ে ব্রাত্য উজানে- শব্দেরা বিবিধ লীলায়

ঘরামির নৈঃসঙ্গ হয়ে ফুটপথে- শব্দেরা ঘুমুতে ঘুমুতে

খুনির পোশাকে বেয়ে যায় হাল, শব্দেরা ফ্লরা ও ফণা- পাতাঝরা দিন

 

আমাদের বীজ বপনের আদিম কৌশল পাশে এসে বসে আর

আমাদের বাহুগুলো ঢিল-ভাঙা শব্দের ভেতর নবীন দোতারা

বেজে ওঠে বাবলা পাতার শৈশব দাঁড়ভাঙা  রোদের খোলসে

শব্দের বিবিধ লীলায় উজানে ডিঙা বায় অচিন সাধুরা ভজনে, সাধনে-

 

নিষ্প্রাণ ডাবের ভাসান

একটি নিঃশেষ ডাবের ছবি এঁকে মেয়েটি তা ভাসালো নদীতে

তখন মেঘে মেঘে ঘনালো শ্রাবণ, জন্মজালে আটকে গেল বৃষ্টিরা-

মেয়েটি কেন সতেজ সবুজ ডাবগাছের মাথায় ঝুলন্ত

কচি কচি ডাবের দৃশ্য আঁকেনি, সেকথা কেউ ভাবতেই পারে

 

ঐ নিঃশেষ , নিষ্প্রাণ ডাবের ভাসানে ঝুলে ছিল মেয়েটির

অদৃষ্টের পালক কিংবা মাতৃত্বের অবাধ সখ্য; একটি মৃত ডাব

কিংবা নদীর চিত্র আমাদের জীবনের তীরে ভেসে যাওয়া

ফুলঝুরি গ্রামের পতনোন্মুখ বাতাসের সেইসব ধ্বনি-প্রতিধ্বনি

যেখানে মিশে আছে রজনীর ক্লান্ত পথিকেরা হাওড়ের কান্নার

মতো কামনার বিষে। একটি ভুল ছন্দের নৌকো এসে মেয়েটির

ঢেউ তোলা চুলের ভেতর ছেড়ে দেয় লাল নীল

কুয়াশার ফালি আর সময়ের সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকে

ডাবকথার পরের কথারা অতঃপর শিশ্নবাজ মাঝির চোখে

জাল ও জলের গল্প বিনির্মিত পিতৃত্বের তলে ডুবে যায়

 

ডাবচিত্রের পুনর্জন্মে বিশ্বাস রেখে জন্মজালে আটকে যাওয়া

বৃষ্টিরা জানিয়ে গেল- নির্জন দুপুরের নিমফলের উচ্ছ্বাস-ভরা বেদনার

স্মৃতি হয়ে যে-ভাসান নীলজলে শুনে যায় আদিগন্ত

প্রেমের কাহিনী, তাকে মৃত ভেবে সান্ধ্য পথিকেরা ফন্দি-ফিকিরে

জাল পেতে তুলেছে কত শিলা ও ছন্দ

 

অবনত আমিষের মুখ

মিস্ত্রিবাড়ির আলোগুলো  দর্শন ও গৃহবীজ

তুমি খোঁজ লালনের রূপ-মৎস্যের স্মৃতি-

 

যে আলোয় রঙ নইে, রঙের খেলা নেই

সে আলোর স্নানের গভীরে তুমি ঢুকে পড় শীতের প্রভাতে

 

হাতুড়ি কি অফুরন্ত জ্বর নিয়ে ফাঁকা বারান্দায়

লিখে গেছে আকাশ-পড়–য়া পেরেকের দু-চারটি জোকস ?

 

মাছের কান্নার শুদ্ধ উচ্চারণে বৃষ্টি নামলে

কেঁপে ওঠে মেহগিনির চাঁদবেনে বুক

 

তুমি সেই মাছেদের কথা জানো, যারা গভীর জলের অন্ধকারে

টর্চ জ্বেলে বুনে যায় অবনত আমিষের মুখ

 

মাংসের মাল্টিপল গন্ধ

চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর রেসিপিতে বেড়ে যায় মরিচের ঝাঁঝ

শীতের চিলেকোঠায় হলুদের মাতলামি আর

পার হতে পারে না দুঃস্বপ্নের  ঝোল-মাংস, পিঁয়াজের  গান

 

এদিকে আহত বনের কশাইদের উলুধ্বনিতে

স্লটারহাউসের প্রকম্পিত মাংসের শোবিজসহ

সবকিছুই ঢুকে যাচ্ছে কোনো-না-কোনো সুরের মহলে-

চতুর্দিকের বিভাজন মাতালের কণ্ঠে গীত হবার আগেই

এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের দেয়ালে টাঙানো হয:

বিদ্যুতের নর্মস থেকে তোমাদের বিছানার দূরত্ব সরে যাচ্ছে

তালগাছের মাথায় উঠে দেখ-

তেল ও গ্যাসের শৈশবের গলিতে  এখন অন্ধকার

মাংসের মাল্টিপল গন্ধ শুধু জ্বলে উঠছে জলের কিনারে

 

গাছেদের কানকথা

একটি ক্লোন শালিখের সংসার ঝুলে আছে শীতসমৃদ্ধ সেগুনের পাতায়

ক্ষীণ, রতিময় জঙ্গলের ভেতর থেকে উঠে আসা ভয়ংকর মানচিত্রের

কঙ্কাল জাগিয়ে তুলছে লতাগুল্মের স্বয়ংক্রিয় পঠন-পাঠনের পাঠশালা

আমরা গাছেদের কানকথা নিয়ে ঘুমুতে যাচ্ছি মৃদুমন্দ পাতার কুটিরে…

 

সাঁতার

জীবন চুঁইয়ে ঝরে পড়া এমত সাঁতারই

রেইনট্রির বর্ষসেরা র‌্যাম্পিং-

যে ঘুম ঘুমানো হয়নি, তার দিকে নড়ে উঠছে পুরনো সাঁকো

দূর থেকে কে যেন বলছে, আঁকো, এঁকে যাও সামান্য আদর

লাল পেড়ে শাড়ির আঁচলে, হৃদব্রাশে ভাসাও আকাশ-

 

অতঃপর সাঁকো-ভাঙা জলে তন্তুর বেজে ওঠার সময়

আমি কিংবা আমরা বুনো তরঙ্গের মানচিত্র ধরে

বসন্তের জঙ্গল চষে, ইথারে ইথারে হারানো পাখ-পাখালির

গানের ধ্বনির দিকে হাত বাড়াচ্ছি ,আর পাতালের

পিচ্ছিল ভূগোলে দেখে যাচ্ছি আদি সাম্যের ক্যাট-ওয়াক

 

সিডিউল চেঞ্জ হওযার পর

ধর্মকলের খুব কাছাকাছি তোমাদের গ্রাম

তোমাদের গ্রাম্য খামারে রচিত হয়- মায়াযোগ

পালক মেশানো গদ্যের বুননে; পিঁপড়াদের ভাতঘুম

বেয়ে পাহাড়ে উঠছে লড়াকু কষ্টের ঠাটগুলো

প্রজন্মের বোদ্ধা লাঠিয়ালরা কুড়োতে থাকে

ঘুম ও স্বপ্নের মধ্যরর্তী  জলের ভাসমান সাহস-

 

সিডিউল চেঞ্জ হলে আমাদের সৌভাগ্যের চাঁদ-তারা

বুঝে উঠতে পারে না জল-হাওয়ার গোপন সিঁড়িটি

আর এভাবে স্থির হয়ে যায় হাটের কোলাহল

কোনো সকালই আর দুপুরের দিকে হাঁটে না

হাতঘড়ির অন্ধকারে বাসা বাঁধে চতুর ভাইরাস-

 

আমাদের এই ধর্মরাজ্যে তখন ধূর্ত চিলেরাই

কাব্য-কলায় হাত পাকাতে অদৃশ্য স্নানঘরে ঢোকে

 

গন্ধ-পতনের দিন

রাত্রি তার জাগরণ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুক,

এখন পান-বরজের পাশের পথ দিয়ে

হেঁটে যাওয়া রহস্যদের মুখে যে কুলফি-বরফের রোদ উঠছে

তার দিকে হেমাঙ্গ বিশ্বাস জানালা খুলে তাকিয়ে আছেন-

তোমার মাটির ঘরে গোবরের ঘ্রাণ

আমার চোখের বয়েমে জমা হচ্ছে

বাবলা গাছের পুরনো দিনের ছায়া

 

অগোছাল ঘরে সম্ভোগ ও চিতাবাঘ

দলীয় পতাকা উড়িয়ে হাইকিংয়ে-

গন্ধ-পতনের দিন আসছে চা-পাতার আড়ালে

 

সেই মাতাল দরজা

চুড়ি-ভাঙা পথ দেখে মনে হলো, বাড়ি ফিরছি-

আতাগাছের ছায়ায় তুমি ফেলে গেছ ভার্জিনিটি,

লজ্জার ভেতরে চাঁদ উঠছে পাতিলেবুর আখ্যান নিয়ে,

উড়ে যাওয়া ঘুঘুগণ আলোদের নিভে যাওয়া সংসারে

পড়ে যাচ্ছে বাঁশপাতার শীতল ব্যালাড,বাবলা তলার পুরনো শোক-

 

তুমি সেই মাতাল দরজা পেরিয়ে যাচ্ছো

যার মাথার ওপরে লেখা আছে সন্ধ্যা নামার ঠিকুজি, আর তরুণ

কাঁকড়াদের যৌন-সন্ত্রাসমাখা নতুন বিধি

 

সবকিছু নিভে যাবার আগে ভিজে যাবে সান্ধ্য ব্যাকরণ

আর সব সখের কুশলাদি রাজদণ্ডের  অপেক্ষায়

ভেঙে দেবে সবুজ মিতালি-এসবই আমাদের লালভাত

ভেজানো চন্দ্রিমা, অকালে ঝরে পড়া গায়নের রীতি-

 

ছেঁড়া পিরিনের কলকব্জা

গাছেদেরও  লতানো গালগল্প থাকে ,অন্ধকারে গাছেদেরও হাইমেন ছিঁড়ে

সেইসব আদিম কান্নার দিকে যোগ দেয় মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিরা-

 

হার্বাল চিকিৎসার সামান্য আড়ালে, খাল পারে

লতাপাতার আবছায়া ঘরের কাঠামো ধরে

ভরাট পুকুরের ক্ষুদে তরঙ্গ পার হয়

সুপুরিবাগানের ছায়া। আহা, সেই পরিশ্রান্ত পথের

ধারে ধারে বেচাবিক্রির সান্ধ্য আয়োজন

আমাদের জানিয়ে দেয়, মৃত্যুই জীবনের শেষ প্রণোদনা-

 

এর মধ্যেই ছেঁড়া পিরিনের কলকব্জার আলোয়

বুড়ো মাঝিরা দ্যাখে :

সেই ছায়ার চাতাল জুড়ে কেঁদে যাচ্ছে

মেঠোপথে গড়িয়ে যাওয়া ক’টি নীরিহ মার্বেল-

সংগীত ও কাঁচপাত্রের বিকল্প নিয়ে ক্লান্ত পকেটের

উড়াল চিঠিটি এবার সবজিগ্রাম পেরিয়ে

কিছুটা সবুজ  হৃদয় নিয়ে নেমে আসছে ডাকঘরের বারান্দায়

 

বেদনা-তরঙ্গের বিশদ

পাটকাঠির বেড়ার ফাঁক দিয়ে হুহু করে

ঢুকে পড়ছে দূর গ্রামের কান্নার ধ্বনি

 

এদিকে আমি সদ্য খোলস ছাড়ানো

বুড়ো গোখরোর ভয়ংকর আলসেমির মধ্যে

সাঁতরাতে সাঁতরাতে পেইন-কিলারের দিকে

হাত বাড়াচ্ছি, আর বেদনা-তরঙ্গের

বিশদ নিয়ে এঁকে যাচ্ছি গ্রাম নিধনের প্রচ্ছদ

 

কবিতাভাবনা

 

কবিতা কখন হয়ে ওঠে, আদৌ হয়ে ওঠে কিনা, কতটুকু হয়ে ওঠে, কিভাবে হয়ে ওঠে – এসবের মধ্যে কবির সচেতন প্রয়াস কতটুকু , কতটুকু কবি নিজেও বোঝেন না – এ নিয়ে বিতর্ক ও ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তবে যেটুকু সত্য তা হলো, কবিকে রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্যে জেগে থাকতে হয়। ইতিহাসের সুদীর্ঘ সড়কে, বিশ্বাসে-অবিশ্বাসে, সংস্কারে কিংবা কুসংস্কারে, ধর্মে কিংবা অধর্মে, যুদ্ধে কিংবা শান্তিতে কবিকে খুঁজতে হয় কবিতার জলাহার। কবি তার অজস্র মৃত্যুর মধ্যে নিজেকে হারিয়ে হারিয়ে খুঁজে পান, কখনো কখনো তিনি মৃত্যুর ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নক্ষত্র হয়ে ওঠেন, আবার কখনো  নিবিড় মৃত্যুর গহনে হারিয়ে যান চিরতরে- সে ইতিহাসও আমাদের অজানা নয়। কবি তার আলম্ব অহংকার দিয়ে , আত্মদহনের শীৎকারে , অনাবিল মরণের ঘায়ে কবিতার কাছাকাছি যেতে পারেন। কবির ভেতরের জ্বলন্ত সমুদ্র শুষে নেয় তার মৌলিক অধিকার , জেগে ওঠে প্রবালখচিত দ্বীপ, এই দ্বীপের অনাবিল সৌন্দর্যে খুঁজে পাওয়া যাবে কবির বিহঙ্গসত্তার গান। কবির ভেতরের জ্বলন্ত সমুদ্র পৃথিবীর অনেক কিছুকেই গ্রাস করে ফেলে, সে সর্বভুক। পরিশেষে সে গ্রাস করে কবিকে এবং একই সাথে ঘটে কবির পুনর্জন্মও। কবিতার সমুদ্র থাকে ভাষার ঢেউয়ে আকীর্ণ। কবি মাত্রই একই সাথে ভাষার কাছে প্রভু ও দাস।

সত্যিকারের কবিতা লেখা তখনই সম্ভব যখন কোনো কবি বিশ্বচেতনাকে অন্তরে ধারণ করতে সমর্থ। কবিতার আসমুদ্রহিমাচলকে স্পর্শ করা কোনো ডোমিস্টিকেটেড মানুষের কাজ নয়। সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক বিশ্বের হাওয়ায় যে কবি অসহায়, সে বিশ্বনন্দিত কবিতা লিখতে অপারগ। কবিতা আসলে ঝিনুক-হৃদয়ের গান ; কষ্টের কোরকে যার জন্ম। সমস্ত জীবন দিয়ে শুষে নিতে হয় কবিতার রক্তমাংসমেদ।

কবিতা নিয়ে আমার ভাবনাগুলো এসবের মধ্যেই ঘুরপাক খায় আর আমি এসব ভাবনার অদূরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি জীবনের অন্যপ্রান্তের রঙ ও রেখা, যা আমাকে নিয়ত তাড়িত করে, ঠেলে দেয় নিভৃতের বারান্দায়।

 

প্রবন্ধ

কামরুল ইসলামের কবিতা : ‘শব্দ আসে পঞ্জরাস্থির’

মাসুদুজ্জামান

 

গ্রামীণ অনুষঙ্গ, গ্রামীণ মানুষের প্রতি তীব্র মমত্ববোধ, স্মৃতিকাতরতা এবং সূক্ষ্ম রাজনৈতিক অনুষঙ্গের পটে রচিত কামরুল ইসলামের কবিতা আমাদের পৌঁছে দেয় সেই বোধে, যেখানে মানবিক শব্দটিই পেয়ে যায় নতুন অভিজ্ঞান। নন্দনস্বভাবেও তিনি নব্বইয়ের সমীপবর্তী। তার ভাষাও মনোজাগতিক, অবচেতনের গূঢ় গহন থেকে উঠে আসে, কিন্তু তা শুধুই বিমূর্ত প্রতিভাস হয়ে থাকে না। নিজের বলা বিষয়কে তিনি চমৎকারভাবে আভাসিত করে দেন। ফলে অবিরল কথা বলে যাওয়ার দিকেই তার ঝোঁক। গ্রামনিধন থেকে শুরু করে বহুজাতিক আগ্রাসন কীভাবে এই ভূখণ্ডের, বিশেষ করে উপনিবেশ কবলিত গ্রামীণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের অভিঘাতে পিষ্ট হচ্ছে মানুষ, সে-সবের মর্মভেদী ছবি পাওয়া যায় তার কবিতায়।

গ্রামীণ প্রকৃতির শান্তশ্রী রূপই কামরুলের কবিতা উৎস। তাঁর প্রায় প্রতিটি কবিতাই গ্রামীণ অনুষঙ্গে রচিত। ইকোপোয়েট্রি বললেও এতটুকু ভুল হবে না। নব্বই দশকের অধিকাংশ কবির কবিতার কেন্দ্রে যেখানে শহরের অবস্থান, নাগরিক নৈঃসঙ্গ্য, বিষাদ ভর করে, কামরুলের কবিতা সেখানে গ্রামীণ দৃশ্যপটকে তুলে আনে চমৎকারভাবে।  প্রথম কবিতার শিরোনামটিই লক্ষ করুন- ‘অবৈতনিক নিমপাতার সংগীত’।  কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবকের শুরুতেই এরকম পঙক্তি : জীবনের ডালপালা উঁচিযে যেটুকু দেখা যায় / সবটুকুই টানাটানির দিন…। শেষে লিখলেন : অসুখের গোপন জানালায় ঘাসফড়িংয়ের ডানা থেকে / নেমে আসে অবৈতনিক  নিমপাতার সংগীত-। পুরো কবিতাটিই নিমপাতার গানে গানে প্রশান্তি নিয়ে আসে। পরের কবিতাটির শিরোনামটিও লক্ষণীয় ‘ধূসর কাঁকড়াদিন’। শুরুটাও কী হৃদয়স্পর্শী। কিন্তু ছবিটা প্রাকৃতিক : কাঁকড়া ভরা ছোট এক বিলের ছায়া হৃদয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যায় / আর তুমি দূর থেকে দেখে দেখে হাসো…।  পরের কবিতাটা তো পাখিময়। শুধু কী কাঁকড়া, পাখি? ঋতুসিক্ত হবার ঝোকও কামরুলের। তাই সীমাহীন বর্ষার রাত তাকে ভিজিয়ে দেয়। এখানেও সেই সংগীত। তবে এবার আর নিমপাতার নয়, লতার : সহস্র লতার শুভেচ্ছা মাখা এই সংগীতের নিচে দাঁড়িয়ে / আমরা দেখতে থাকি হাড়মিস্ত্রির সান্ধ্য কবর-। প্রকৃতির এরকম অজস্র অনুষঙ্গে ঋদ্ধ কামরুলের কবিতা। কবিতা নয় যেন প্রকৃতির ইজেল, যেখানে শব্দ-তুলির এক-একটা আঁচড়ে কামরুল বাংলাদেশের গ্রামকেই তুলে আনেন নিবিড় হার্দ্রিক অনুভবে।  নিচের স্তবকটি তুলে দিলেই কামরুলের কবিতাকে অনুভব করা যাবে সহজেই :

চারপাশে যখন ধানের মতো ঢেউ খেলে যায়

জঙ্গলে আটকে যাওয়া দু-একটি বিকেল

বাতাসের চিবুক চুঁইয়ে মর্সিয়া গায়, যখন তালগাছে

লেগে থাকা গত বছরের বৃষ্টির মহড়া

সামান্য হাসির দিনে ফিরে না আর, যখন বাবুইযের

ঠোঁট থেকে ঝরে পড়ে আকণ্ঠ শিল্প-আঁচড়।

ইকোপোয়েট্রির এরকম ঝলমলে আবহ নব্বইয়ের আর কারো কবিতায় আমি খুঁজে পাইনি। এদিক থেকে কামরুল অনন্য।  কীট-পতঙ্গ-পাখি এরকম নানা প্রসঙ্গে কবিতা রচনার চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন উৎপলকুমার বসু। কামরুলকেও দেখছি, সেরকম কবিতা রচনার প্রতি ঝোক। কিন্তু তিনি কতটা আধুনিক, ‘পাসওয়ার্ড’ কবিতাটি পড়লে তা বোঝা যায়। পাড়ার জঙ্গলে কুড়িয়ে পাওয়া আয়নায় তিনি যেমন দেখেন হাওয়াই-মিঠের বাকশো, ফ্রক-পরা রেহেনা খাতুনকে, তেমনি দেখেন প্রুফকের ছায়া ছায়া মুখ। দূর বঙ্গদেশ কীভাবে এলিয়টীয় প্রুফকের মধ্যে আভাসিত হলো, তার কারণ কামরুলের পাঠ-অভিজ্ঞতা।  কিন্তু বঙ্গদেশের এই কবির মন পোড়োজমির ভেতরে বিচরণ করে না, মন এখানে পুটিমাছ, খেয়াঘাটের মর্মর ধ্বনির দিকে তোমার কান! বিবর্ণ নগর নয়, ‘লাল মাটির কবিতা’ রচনা করেন কামরুল। শহরের পানশালা তাকে টানে না। তিনি লেখেন, শহরের শেষ মাথার উড়ন্ত পানশালায় / সেখানে এক অন্ধ কসাই আর এক বেহালাবাদক ওয়াইন ও অন্ধকার গিলছে সমানে / আর চারদিকে মাংস-হারানো গরু-মহিষের দল গোল্লাছুটের মহড়ায় যে যার মতো / শান-দেওয়া ছুরির দিকে প্রণত-।  এসব এড়িয়ে তাই দেখা গেল, ‘তুমুল বৃষ্টির ভেতর হেঁটে যাওয়া মন-বালিকার জল-ধোয়া মুখ…।’

কামরুলের কবিতা এই প্রথম নয়, আগেও পড়েছি এবং বিস্মিত হয়েছি এই ভেবে যে, কী চমৎকার কবিতাই-না লেখেন তিনি। ‘বিষাদের জ্যামিতি চষে’ তিনি লক্ষ্ করেছেন “কত নিভে যাওয়া ভাসমান মুখ, অসম জীবনযুদ্ধ, মানুষের একাকিত্বের বিদ্যা ও দর্শন।” এই কথাগুলোকেই আরেকটু বিস্তৃত করে লেখেন :

আমি তর্জমা করি নিঃস্ব কৃষকের ঘেরাটোপ- দ্রোহনীল চোখে দেখি কমিউন ওড়াউড়ি আবদ্ধ মনীষায়, তর্জমাহীন, নিঃস্ব; দুঃখনদী- জ্বলন্ত ক্ষুধায় গ্রাস করে আমাদের গোলাবাড়ী গ্রাম- রক্তহীন নিস্পন্দ আমি যেতে থাকি- যেতে যেতে পাড়ি দিই অনেক ভোর, দুপুর ও বিকেল পড়ে থাকা ভিটেমাটি ভাঙা চেয়ার, বিপন্ন তেলের শিশি, পুরনো স্যুটকেস পার হয়ে দেখি কত ভগ্ন-হৃদয় অপেক্ষার ঢেউ ভেঙে জ্বলে উঠছে অপার শূন্যে (আমাদের গোলাবাড়ী গ্রাম)।

স্বপ্নভঙ্গের এই বিস্রস্ত ছবির পাশাপাশি এরই সঙ্গে এসে মিশে গেছে গ্রামজীবনের সপ্রাণ বিষণ্ন স্মৃতি। কেন এই বিষণ্নতা? গ্রামনিধন হচ্ছে, কমিউনের যে স্বপ্ন ছিল তা আজ অপসৃত, ফলে স্মৃতির প্রতি কবির নির্ভরতা :

চরের বাউড়ি কিংবা নতুন ঘাসের চৈতন্য ছুঁয়ে উড়ে আসা হারানো শৈশব ঈশ্বরের দোচালায় বসে হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে অন্ধকার আর কুপির আলোয় ভাসা ভাসা শোকের আদলে তৈরি হচ্ছে গ্রাম-নিধনের কথিকা; জিওল কিংবা মাগুর মাছের থৈথৈ ক্যানালের জলে ডুবে ডুবে জল খাওয়া কিশোরীর ভাসমান চুলের মতো মনে পড়ে একদিন এই গ্রামে এসেছিল সার্কাসের হাতি- জীবনতলার অন্ধকারে দেখি কজন কিশোরীর ফুলমুখে জমে আছে আহত মেঘ; লগেন ভুঁইয়ার লাল বাড়ি কিংবা পাকা ইঁদারার পাশের মাদারের লাল ফুল পড়ে থাকা পথে আজ মহাস্রোত- ভেসে যাচ্ছে কত সব বিপন্ন মানুষের কামনার স্মৃতি (আমাদের গোলাবাড়ী গ্রাম)।

অস্তিত্বের অন্বেষা তাকেও পেয়ে বসে, আত্মপরিচয়ের খোঁজে নেমে আসেন গ্রামীণ জনপদে, প্রকৃতির কাছে :

বীজ বপনের ছন্দ ও মুদ্রা কিংবা ঘেমে-ওঠা মনের

গুচ্ছ গুচ্ছ মেটাফর- মোষবাথানের লোকজ আঁধার

জাল ও জলের গল্প নিয়ে নেমে পড়ি

সাকিনের খোঁজে (পথিকবৃত্তির নাকানিচোবানি)।

‘মেটাফর’ শব্দটির কী চমৎকার দ্যুতিময় ব্যবহারই না ঘটলো এখানে। শব্দ ও বাকপ্রতিমার এরকম অনায়াস ব্যবহারই বুঝিয়ে দেয় তার সৃজনীপ্রতিভা :

আমাদের উঠোনের কোণে কিছু ঘাস ছিল

আমাদের নিঃশ্বাসে ছিল নির্ভার নদীর কলতান;

ঘরে ঘরে ঘোড়াদের কাল শেষে ফিরে আসে আস্তাবল

তাদের স্মরণে আসে অন্ধকার- স্মৃতির ঘাসে নূপুর বাজে শোন :

আমাদের কিছু ঘাস ছিল- ঘোড়ারা ঘাস খেত

ঘোড়ারা ঘাসহীন দলে দলে

ঘাসের পরানে বাজে শূন্যতা

ও ঘাস, ও শূন্যতা, তোমরা আমাদের উঠোনে আজো

বিবিধ তৈজস – (আমাদের কিছু ঘাস ছিল)।

গ্রামজীবনের অন্তরঙ্গ ছবি, যাকে আমি শুরুতেই ইকোপোয়েট্রি বলেছি, ঘাসের সূত্রে জীবনানন্দের কথাও মনে পড়বে, কিন্তু এই ভাষা ও দৃশ্যকল্প কামরুলের নিজস্ব। কামরুলের কবিতা উদ্গত হয় ভেতর থেকে, কিন্তু পরিপার্শ্বকে ছুঁয়ে জ্বলে ওঠে :

এই যে শব্দগুলো নিঃশব্দে এসে দাঁড়াচ্ছে পাশে অগুনতি মুখোশে

হাওয়া-বণিক জানে তার অর্থ? চারদিকে শব্দের লীলা

চপল বৃষ্টির সুনসান; ঘুমের কুরুঙ্গি থেকে জেগে ওঠে দ্বৈরথ :

শব্দেরা ওড়াই কিছু মেধাবী মিথ উদ্বায়ু জলজ আড়ালে (চারিদিকে শব্দের লীলা)।

কিন্তু শব্দ বা ভাষার এই লীলাখেলাই কী কবির নিয়তি- যেমনটা মনে করেন নব্বইয়ের অনেক কবি? কামরুলের কবিতা পড়ে কিন্তু মনে হয় না তিনি এই ফাঁদে পা দিয়েছেন আর কবিতাকে বিমূর্ত থেকে আরও বিমূর্ততার দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। এজন্যে ওই কবিতার পরবর্তী স্তবকে দেখি :

ছায়ায় দাঁড়ানো অচেনা লোকটি তুড়ি মেরে থামিয়ে দিচ্ছে

পথের উৎসব আর আমাদের গাছগুলো ডুবে আছে হাইব্রিড ধ্যানে

কিন্তু কী করে কবি এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন? এ জন্যে আবার তাকে সেই শব্দব্রহ্মের আশ্রয় নিতে হয়, শব্দই হয়ে ওঠে তার শত্রুহননের মারণাস্ত্র :

রক্তের সুড়ঙ্গ হয়ে মস্তিষ্কের জানালায় শব্দ আসে পঞ্জরাস্থির

কানকোয় চড়ে ব্রাত্য উজানে- শব্দেরা বিবিধ লীলায়

ঘরামির নৈঃসঙ্গ হয়ে ফুটপথে- শব্দেরা ঘুমুতে ঘুমুতে

খুনির পোশাকে বেয়ে যায় হাল, শব্দেরা ফ্লরা ও ফণা- পাতাঝরা দিন

শব্দের নন্দন থেকে কবি এবার সরে আসেন দ্রোহে; লক্ষ করেন এসিডবৃষ্টি, “মৌলবাদ পথে পথে প্রগতির চোখে- ভাঙে জল মৃত্তিকা তল- ঘুম নেই স্বজাাতির ঘরে।” কীভাবে পরিচিত জনপদ আর মানুষ বদলে গেছে, মূর্ত-অমূর্ততার যুগলবন্দি ও বিরোধাভাসে আভাসিত হয় সেই প্রসঙ্গ :

জিঘাংসায় মুক্তি নেই ভেবে আমি আমার জামার আস্তিনে লুকিয়ে রাখি রাত জেগে জমানো কিছু শোক- জানি খুনির আস্তানায়ও ঘাসফুল ফোটে, পরিচিত মানুষেরা খুনির পোশাকে রঙিন পাথর ছুড়ে মারছে আকাশে- পাখিরা পাথর হয়ে ফিরে আসছে ওদের হাতের মুঠোয় আর নিকারি কিশোরী বাঁশতলে পুঁতে রাখে রতিক্লান্ত মন; গ্লোবাল ওয়ার্মিং কিংবা অস্থির গ্লেসিয়ার হয়ে ফিরে যাচ্ছে অভিন্ন ধর্ষকেরা প্রভাতের জগিং-এ। এদিকে কাদায় আটকানো গরুর গাড়ির বিনীত ছায়ায় আমাদের পুরনো পোশাকগুলো মুখস্থ করে বিবিধ স্রোতের গল্প… অসংখ্য শ্যাডোলাইন ধরে পরিণত বীরগণ আজো সব রমণীয় ঝুলন্ত পথে… (নিষিদ্ধ মন্ত্রের গুপ্ত নির্মাণ)।

কামরুলের কবিতাপাঠের অভিজ্ঞতাই অন্যরকম, অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। সমকালীন কবিতার শিল্পশৈলী মান্য করে, অর্থাৎ নব্বইয়ের নন্দনরীতিকে মেনে নিয়ে কীভাবে সূক্ষ্ম রাজনৈতিক অনুষঙ্গ, ব্যক্তিগত বিষাদ, আকাঙ্ক্ষাকে উপজীব্য করা যায়, নাগরিকতা বা তথাকথিত কিছু স্মার্ট পঙক্তি রচনাই যে কবিতা নয়, কবিতা যে মন ও মননকে ছুঁয়ে দেয়, কামরুলের কবিতা তার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

 

কামরুল ইসলাম

জন্ম : ১ নভেম্বর ১৯৬৪

জন্মস্থান : ফিলিপ নগর, কুষ্টিয়া

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

দ্বিধান্বিত সুখে আছি যমজ পিরিতে (কাব্যগ্রন্থ, ১৯৯৯)

ঘাসবেলাকার কথা (কাব্যগ্রন্থ, ২০০১)

যৌথ খামারের গালগল্প (কাব্যগ্রন্থ, ২০০৬)

সেইসব ঝড়ের মন্দিরা (কাব্যগ্রন্থ, ২০০৮)

চারদিকে শব্দের লীলা (কাব্যগ্রন্থ, ২০১০)

কবিতার বিনির্মাণ ও অন্যান্য (প্রবন্ধগ্রন্থ, ২০০৯)

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close