Home অনূদিত কবিতা কামরুল ইসলাম > আতুকেই ওকাই : কবি পরিচিতি ও একগুচ্ছ কবিতা >> আফ্রিকা অমনিবাস

কামরুল ইসলাম > আতুকেই ওকাই : কবি পরিচিতি ও একগুচ্ছ কবিতা >> আফ্রিকা অমনিবাস

প্রকাশঃ February 11, 2018

কামরুল ইসলাম > আতুকেই ওকাই : কবি পরিচিতি ও একগুচ্ছ কবিতা >> আফ্রিকা অমনিবাস
0
0

কামরুল ইসলাম > আতুকেই ওকাই : কবি পরিচিতি ও একগুচ্ছ কবিতা >> আফ্রিকা অমনিবাস

আধুনিক আফ্রিকান কবিতার জগতে আতুকেই ওকাই একটি উজ্জলতর নাম। আফ্রিকান কবিতা সব সময়ই আফ্রিকান ঐতিহ্যকে ধারণ করেছে সাবলিলভাবে। একালের কবি সেই ঐতিহ্যকে আরো স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছেন, বহুমাত্রিক পথে বিকশিত করেছেন যা ইউরো-আমেরিকা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

আফ্রিকার কবিতার উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর শক্তিশালী বিট। বিভিন্ন নাচ, শস্যভাঙার শব্দ, বৈঠা-দাঁড়ের শব্দ অথবা মাছধরার জালের সমন্বিত শব্দের মতো প্রাকটিক্যাল বিষয় জায়গা পেয়েছে কবিতার ছন্দে। সাধারণ মানুষের কাছে আধুনিক আফ্রিকান কবিতার একটি জোরালো আবেদন সব সময়ই রয়েছে। নৃত্য ও সংগীত থেকে বিচ্ছিন্ন লিরিকাল কবিতা আধুনিক আফ্রিকান কবিতায় খুব কমই দেখা যায়। আর এক্ষেত্রে আধুনিক আফ্রিকান কবিতার মূলসুরটা ওকাই-এর কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায়। আফ্রিকান আধুনিক কবিতার প্রাণপুরুষ সেনেগালের কবি লিওপোল্ড সেডার সেঙ্ঘোর(১৯০৬-২০০১)-এর ভাষায়- ‘নেগ্রিটুড আন্দোলন এবং তার বিবর্তিত রূপই ওকাই-এর কবিতার মৌল দিগন্তকে প্রসারিত করেছে।’ একটি স্বতন্ত্র ও সাবলিল আফ্রিকাকেই মূর্ত করেছেন ওকাই তাঁর কবিতায়, আর যে কারণে তিনি আজ সমকালীন আফ্রিকান কবিদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য নাম।

সমগ্র ইউরোপে আধুনিক কবিতার আন্দোলনের শুরুটা মোড় নিয়েছিল বুদ্ধিমত্তার দিকে যা ছিলো more intellectual than emotional; আমরা এলিয়টের কথা যদি ধরি তাহলে দেখা যাবে যে একজন সাধারণ পাঠক তার বৌদ্ধিক যুক্তিকে ঝুঝতে কতখানি অক্ষম। অনেক পাঠকই তার তীক্ষ্ণ হিউমার ও আইরনির জটিল বিষয়গুলোতে বরাবরই হোঁচট খেয়েছে। সেই সময়ের ইউরোপের যে কাব্যান্দোলন তাঁর লক্ষ্য ছিলো জীবনের একটি ফিলোসফি তৈরি এবং অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের একটি বুদ্ধিগত ব্যাখ্যা, একটি বিষয়কে অন্য একটি বিষয়ের উপর দাঁড় করিয়ে তার স্বরূপ উদঘাটন। তাই এইসব কবির পাঠকদের ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয় যে এরা সবাই-ই শিল্পরুচিতে বোদ্ধা এবং অগ্রসর । এইসব কবির কবিতা সাধারণ মানুষের কাছে খুব বেশি আবেদন সৃষ্টি করেনি। তারপরও বলতে হয় সেই কবিরাই বিশ্বকবিতার আধুনিক পর্বের বাতাবরন তৈরি করেছিলেন, যদিও তারা বহুল পঠিত বা পাঠক নন্দিত ছিলেন না বরং obscurity-র অনন্য দ্যুতির মধ্যেই আধুনিকতার মূলসুরটি বেজে উঠেছিল।
আধুনিক আফ্রিকান কবিতায় গোত্র বা সম্প্রদায়ভিত্তিক মানসচেতনা কাজ করেছে সাবলিলভাবে। ইউরোপিয়ান কবিতা যতটা বৈশ্বিক আফ্রিকান কবিতা ততটাই সম্প্রদায়দায়গত।আফ্রিকান কবিতার কবি কোনো নি:সঙ্গ ব্যক্তি নন অথবা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নও নন। আফ্রিকান কবিতা সব সময়েই তার নিজস্ব ইতিহ্যে ভর করে এগিয়ে চলেছে। বিচ্ছিন্নতার চেয়ে বরং সম্প্রদায়গত ঐক্যের বাণী আফ্রিকান কবিতাকে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর করেছে; পূর্বপুরুষদের সাথে বর্তমান জীবিত গোষ্ঠীর সম্পর্ক ও ঐশ্বর্যকে সম্পর্কিত করেছে। আফ্রিকান কবিতার একধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এর গতি ও শক্তি পাশ্চাত্য কবিতাকে অতিক্রম করেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে । আর এই গতি ও শক্তির আধার হলো শাণিত চিত্রকল্প ও প্রতীক। এব্যাপারে সেঙ্ঘরের বক্তব্য-

The African image is not then an image by equation but an image by analogy, a surrealist image. Africans do not like straight lines and mots justes. Two and Two do not make four but five, as Aime Cesaire has told us. The object does not mean what it represents but it what suggests, what it creates. The Elephant is strength, the Spider is prudence; Horns are the Moon and the Moon is Fecundity .Every representation is an image…

আফ্রিকান কবিতার চিত্রকল্প জটিল প্রতীকের হাত ধরে এগিয়েছে, কেবল সহজতর বোধগোম্য বর্ণনার ব্যাপার আফ্রিকান আধুনিক কবিতায় প্রায়ই অনুপস্থিত,বলা যায় দ্রাষ্টান্তিক নয়, প্রতীকী। তবে একথা ঠিক যে আফ্রিকায় অন্য ধরনের পপুলার কবিতারও অবস্থান রয়েছে পাশাপাশি যেখানে উপমার পর উপমা সাজিয়ে কোনো সুন্দর বস্তু অথবা রমণীকে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব কবিতারও প্রচুর পাঠক রয়েছে এবং সেইসব পাঠকের ধারণা কবিতা সৌন্দর্যের পূজারী। এইসব কবিতায় বস্তুর অন্তরাত্মায় আলো পড়েনা কেবল বাহ্যিকতাকেই উচ্চকিত করা হয় আর ইংরেজিতে লেখা ঘানার অনেক কবিতায়-ই সেই সস্তা কাজটি করা হয়েছে। আতুকেই ওকাই-এর অবস্থান সেই সস্তা পপুলার কবিতার বিপরীতে বলেই তিনি আফ্রিকান কবিতার অন্যতম আধুনিক রূপকার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

সেঙ্ঘরের ভাষায় আফ্রিকান কবিতায় প্রতীকের ব্যবহার পাশ্চাত্যের মতো নয় : The image should be both sensuous and intelligent, archytypal and specific and above all surrealistic. গতানুগতিক উপমার ব্যবহার আধুনিক আফ্রিকান কবিতায় একেবারেই নেই বললেই চলে। “as fair as lily” এরকম স্টেরিওটাইপড্ কাব্যিক উপমার কদাচিৎই দেখা মিলে, বলা যায়, উপমা ও প্রতীকের ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান কবিতা থেকে আফ্রিকান কবিতা আলাদা এবং স্বতন্ত্র।

ঘানার কবিতার ক্ষেত্রে ওকাই-এর গুরুত্ব অপরিসীম। ওকাই আফ্রিকান কবিতার ঐতিহ্যিক গতিকে পরিপূর্ণভাবে যে শুধু বোঝেন তাই-ই নয় এর স্বতন্ত্র বাকবিন্যাস ও কাব্যময়তার উৎকর্ষের ব্যাপারেও সজাগ। তাঁর কবিতার উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কবিতার নিয়ে তাঁর উপলব্ধি। তার মতে, কবিতা মননজাত প্রক্রিয়াকে আলোকিত করে বাহ্যিক দিকের চেয়ে। তাঁর কবিতার কোথাও দেখা যাবে না যে নিছক তিনি বস্তুর বাহ্যিক বর্ণনায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তার কাছে বস্তু নয়, মুখ্য হল বস্তুর পিছনের ধারণা ।

আতুকেই ওকাই তাঁর কবিতায় নিজের জন্যে একটি জুতসই মতবাদ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন, যার মাধ্যমে সামাজিক সমস্যাবলীর ব্যাখ্যা সম্ভব। তবে এ দাবী নিশ্চিত অযৌক্তিক হবে যে তিনি কোনো র‌্যাশনাল থিওরি দিচ্ছেন। এব্যাপারে ওকাই-এর দুষ্টিভঙ্গি কখনো কখনো বরং নৈরাশ্যবাদী । আর এই নৈরাশ্যবাদের আবহ আমরা লক্ষ করি তাঁর আদিকালদো তাফ্লাতমি, চেইন গ্যাঙ, সোল অটোপসি ইত্যাদি কবিতায়। কবি মনে করেন সমাজ এতটাই অনৈতিক যে পুণ্যের পুরস্কারের চেয়ে তা ধ্বংসে সে উদগ্রীব। সর্বত্র তিনি দেখতে পান নিরর্থক ধবংসের লীলাখেলা।

ওকাই-এর কবিতার আরো উল্লেখযোগ্য দিক হলো যে তা সাদৃশ্য বহন করে আমাদের ফেটিশ ধর্মযাজক এবং গতানুগতিক ধর্মীয় আলেমদের সাথে। উপাস্যের সাথে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে এইসব যাজকেরা একধরনের মোহান্ধাবস্থায় নিজেদের নিয়ে যান। এই সব আচার তারা শুরু করেন অদ্ভুত ভঙ্গিতে কখনো অবোধ্য ভাষায় অথবা ইঙ্গিতে। ওকাই তাঁর কবিতায় একই ধরনের ব্যাপার ঘটান। যখন তিনি স্বপ্নাবিষ্ট অবস্থায় কথা বলেন তখন ভাষা হয়ে ওঠে গভীর মেজাজী এবং চিত্রকল্প হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলে একের পর এক।

তাঁর কবিতা নিয়ে জোরালো আপত্তি হলো যে তা কখনো কখনো কোনো অর্থ করে না। অবশ্য কবিতার ক্ষেত্রে অর্থই যে অনর্থের মূল সেটা আমরা জাঁ পল সার্ত্রের কাছ থেকে আগেই জেনেছি। প্রকৃত কবিতা আড়াল চায় – কবিতার নৈঃশব্দ্যে লুকিয়ে থাকে অপার রহস্য আর এই রহস্যই কবিতার সৌন্দর্য; তাই হয়তো মালার্মে বলেছেন: Mystery and obscurity are the protection of poetry from the idle curiosity of the masses.’ তবে এসবের বাইরেও বলা যায় যে, যা অর্থ করে না তার অনেক রকম অর্থই হতে পারে।আর আমরা এও জানি যে, কবিতা বোঝার আগে তা প্রাণিত করবে।ওকাই-এর সব কবিতা-ই যে জটিল কিংবা দুর্বোধ্য, সেটি ঢালাওভাবে বলা যাবে না।সহজে মুগ্ধ করার মতোও তাঁর অনেক কবিতা রযেছে। ওকাই-এর কবিতার কৃতিত্ব লক্ষ করি আমরা তাঁর ব্যবহৃত শব্দের ধ্বনিবৈচিত্র্যের অর্পুব সৃষ্টিযোজনায়। তাঁর ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয়, তাঁর কবিতার অন্তর্মুদ্রাবাদী শব্দ ব্যবহারের নৈপুণ্য ও কৌশল কবিতাকে যেমন সংযত করেছে, তেমনি কবিতার স্থায়ী চমৎকারিত্বের কার্যকারণকে বিবর্তিত করেছে সময়ের মাত্রায় । তাঁর কবিতায় কখনো কখনো দেখা যায় যে ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক নেই; এই সম্পর্ক রক্ষিত হয় শুধু ধ্বনিপ্রবাহ এবং কখনো কখনো অন্তর্মিলের মধ্যে। একটি উদাহরণ – ‘Sorcerers death mask…rain makers cloths/ Flyhisk…boomerang…elephant task/ Toll bridge…suspension bridge…toe / Prints / Primroses…pussy / Willows…catkins…/Blue sky…/ white…clouds…Mountain down’ আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে ওকাই শুধু শব্দের পর শব্দ বসিয়েছেন উদ্দেশ্যবিহীন। তিনি মূলত জুতসই শব্দ ধ্বনির সমন্ময়ে ছবি এঁকেছেন অবিরাম যা কবিতার কাব্যসত্তার লজিকাল সার্বভৌমত্বকে নিশ্চিত করেছে। তিনি মূলত চিত্রের মাধ্যমে কথা বলতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তে আসা যাবে যে তিনি আফ্রিকার আধুনিক সেইসব কবির থেকে ভিন্ন নন যাদের কবিতা যতটা বুদ্ধিজাত তার চেয়ে বেশি চিত্ররূপময়।
তাঁর কবিতার অন্তর্শক্তি মূলত নৃত্যবৈচিত্র্যের সমধর্মীতায় আচ্ছন্ন। কবিতা লেখার সময়ে ওকাই সেইসব শব্দই খোঁজেন যা একটি পরিপূর্ণ সাঙ্গীতীক আবহের সৃষ্টি করে, যতক্ষণ তা না হয় ততক্ষণ চলে তার শব্দযুদ্ধ, নির্মম আচরণে তিনি রক্তাক্ত হন, তবু ধৈর্যের সাথে বসে থাকেন সুবোধ ধীবরের মতো।
নৃত্য, সংগীত ও উৎসবের বহুভঙ্গিম কলরবের মধ্যে তিনি খুঁজে ফেরেন শব্দ। এই ধারাটি আসলে সেঙ্ঘরের তৈরি এবং যে পথের শেকড়ে-বাকলে বিকশিত আফ্রিকান কবিতার মূলধারা। উভয় কবিই (সেঙ্ঘর ও ওকাই) দাবি করেন যে তাঁদের কবিতার উৎকর্ষ সংগীত ও ড্রাম-পেটানোর সাথে মেলবন্ধনে উদগ্রীব। আফ্রিকান কবিতার এই টেকনিকটি নতুন নয়। আফ্রিকান কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো তা একক কোন ব্যাক্তির আবৃত্তির জন্য নয়। আফ্রিকার অধিকাংশ কবিতার আবৃত্তি হয় মিউজিক, ড্রাম, নৃত্য, তালি অথবা এধরনের কোনো তালের সাথে মিলিয়ে সমন্বিতভাবে। আফ্রিকান কবিতা দলীয় পারফর্মেন্সের ব্যাপার হয়েও তা ব্যক্তির নিজেকে প্রকাশ করারও জুতসই মাধ্যম। আর এসব কারণে এসব কবিতাকে দ্বৈত-প্রকৃতির কবিতা বলা হয়- ব্যক্তির হয়েও সমষ্টির। আর এই দ্বৈত-সাত্তিক কবিতাকে সাংগীতিক প্রক্রিয়ায় আরো উজ্জীবিত করেছেন ওকাই। ওকাই তাঁর কবিতায় কেবল নিজের আবেগকেই নয়, তিনি তাঁর সগোত্রীয় প্রত্যয়কেও প্রাধান্য দিয়েছেন সংযত উচ্ছ্বাসে। নাইজেরিয়ার সাহিত্য সমালোচক প্রফেসর ফেমি ওসোফিসান লিখেছেন-

Okai was the first to try to take African poetry back to one of its primal origins, in percussion, by deliberately violating the syntax and lexicon of English, creating his own rhythms through startling phonetic innovations.

খুব সাধারণ পাঠকের পক্ষেও এ অনুধাবন সহজতর যে তিনি প্রচুর আঞ্চলিক (local) শব্দ ব্যবহার করেছেন কবিতায়। অধিকংশ আফ্রিকান কবিতা-ই নিজস্ব গোষ্ঠীর বা অঞ্চলের পরিচিত বস্তু যন্ত্রাদি যেমন বর্শা তীর-ধনুক ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে ওকাই একধাপ এগিয়ে আছেন। তিনি শুধু লোকাল শব্দই নয় লোকাল থিমও ব্যবহার করেছেন। এইসব লোকাল নাম ও বিষয় তার কবিতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
১৯৪১ সালে ঘানার আক্রাতে জন্মগ্রহণ করেন আতুকেই ওকাই। ঘানার বিভিন্ন স্কুল কলেজের লেখা-পড়া শেষে রাশিয়ার গোর্কী লিটারেরি ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৬৭ সালে সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি নেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ফিরে তিনি ঘানাতে-ই একবছর আবস্থান করেছেন এবং ঘানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্টগ্র্যাজুয়েট বৃত্তি নিয়ে পুনরায় লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং এমফিল ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৭১-এ। ১৯৬৮-তে তিনি ইউকে-র রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টস-এর ফেলো নির্বাচিত হন। ইংল্যান্ডে থাকাবস্থায় ১৯৬৯ সালে তিনি ঘানা এসোসিয়েশন অব রাইর্টাস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং দেশে ফিরে ১৯৭১ সালে ঐ এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সে-বছরেই তিনি ঘানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভাষা বিভাগে রাশিয়ান ভাষার লেকচারার নিযুক্ত হন। একই সাথে তিনি তখন দ্য ইনস্টিটিউট অব আফ্রিকান স্ট্যডিজ ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্স-এ কবিতার উপর বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। ১৯৭২-এ তিনি নাইজেরিযার ইবাদান বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিয়ান সাহিত্যের এক্সটারনাল একজামিনার নিযুক্ত হন। জার্মান ও রাশান ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। পৃথিবীর অনেকগুলো বিখ্যাত জার্নাল ও সংকলনে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি ঘানা তথা আফ্রিকার একজন শক্তিশালী আধুনিক কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।১৯৭৩ সালে তিনি ঘানার প্রতিনিধিত্বশালী কবি হিসেবে যুগোশ্লাভিয়ায় কবিতা উৎসবে যোগ দেন।১৯৮৯ সালে তিনি প্যান আফ্রিকান রাইটার্স এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি-জেনারেল নির্বাচিত হন এবং সেই পদেই এখনও সম্মানের সাথে অবস্থান করছেন।ওকাই-এর প্রথম কবিতার বই ‘ ফ্লাওয়ারফল ’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে ( লন্ডনের রাইটার্স ফোরাম কর্তৃক)। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ-
Flowerfall. London: Writers’ Forum. London, 1969
Oath of the Fontonfrom and Other Poems. New York: Simon & Schuster, 1971
Lorgorligi: Logarithms and Other Poems. Ghana Publishing Corporation, 1974
Freedom Symphony: Selected and New Love Poems. Ghana Publishing Company, 2008
Mandela the Spear and Other Poems. Johannesburg: African Perspectives, 2013
ঘানা ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব আফ্রিকান স্টাডিজের অধ্যাপক কফি আসারী ওপোকো ওকাই-এর কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে একটি প্রসঙ্গ এনেছেন। ষাটের দশকে জনৈক আমেরিকান তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল whose horse Africa would ride: the Eastern or the Western horse যখন পূর্ব-পশ্চিমের দ্বন্দ্ব বেশ তুঙ্গে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন এভাবে যে, প্রশ্নকর্তা জানে না আফিকার নিজস্ব ঘোড়া রয়েছে এবং সে তাতে চড়েই এগিয়ে যাবে সামনে এবং তিনি সেই লেখায় আফ্রিকার তরুণ লেখকদের আহবান জানিয়েছিলেন নিজস্ব ঐতিহ্যের পিঠে সওয়ার হয়ে আফ্রিকার সুদূর মুক্তির দিকে এগিয়ে যেতে। একথা বাংলাদেশের তরুণ লেখকদেরও মনে রাখা দরকার।
ওকাই অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন : The label Centenary Commemorative Gold Medal, The International Lotus prize (and Gold Medal), and The C. Marconi Gold Medal ছাড়াও ২০০৭ সালে তিনি রাষ্ট্র কর্তৃক The National Award of Member of The Order of The Volta পেয়েছেন।
তীরন্দাজের পাঠকদের জন্য ওকাই-এর Gi Lorgorligi: Lorgarithms and Other Poems কাব্যগ্রন্থ থেকে কয়েকটি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করা হলো।

অক্রফোর্ড
(O.M এবং D.M কে)

কোমল শরৎ…
গাছে গাছে শরৎ সম্ভার…

এখন আমি আমার প্রেমিকার জন্যে কী করতে পারি
যার আদেশ আমাকে এমন স্বপ্নরাজ্যে পাঠিয়ে দেয়
যার সবুজ লনগুলো আমার ভালোবাসার রঙে স্বর্ণাভ হয়
আর যা কখনো নীল ফুলের সমারোহ দূরে ঠেলে দেয় না
সবুজ ও সাদা গোলাপের সবুজ ধমনী থেকে আমাদের
দুটি হৃদয়ের সত্যকে ধারণ করে যা আমোদের সমুদ্র সমান
স্বপ্নের অনুভব-

বাসনাগুলো ভরে যায় ঢাকের শব্দে কারণ, বীণাগুলো
এখন নরম ছন্দে মগ্ন আর বাঁশিগুলো এখন মৃত্যুসংগীতে আচ্ছন্ন
জাইলোফনের প্রবল শব্দ আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে
আর পরিপক্ক সকাল এবং প্রলম্বিত গোধূলি এবং জল
রক্তের ঘনত্বকে কমিয়ে দেয় যা ঈশ্বরের মঙ্গল-জলের চেয়ে
ঘনতর হবার কথা যা এসে শেষ হবে আমাদের সন্তান-সন্তানির
রক্ত-প্রবাহে-

যেহেতু শরৎ চিরকাল কোমল
যেহেতু শরৎ কোন কোন সময়…

গাছে গাছে ।

 

তাজমহল

তারা ক্রূর ষডযন্ত্রের নিচে মাথা রাখে
যেখানে স্থগিত রাখে না স্বপ্ন ও সত্য
তারা ক্যানাল খুঁড়ছে (এবং সূর্যাস্তকে
ধ্বংস করছে ধ্বংস করছে শক্তির উৎস)

একটি তর্জন-গর্জনকারী শৃগাল ধারালো
দাঁতে কেটে চলেছে পাথর-খুঁটি ও জল
উদ্দেশ্য- সে আক্রমণ করবে তাজমহল-

সমস্ত মলিন অলীক কল্পনা ভুলে যাও
সমস্ত স্বপ্নকে বাতিল করো
এখন উঁচু বেড়াগুলো নিচু করার সময়

তোমার পঞ্চমেন্দ্রীয় ছুঁড়ে দাও জলে
তোমার সমস্ত চিৎকার চাপা দাও এখন
ওই পুরনো চটিজুড়া সরিয়ে রাখো দুরে-
ধারালো দাঁতের ওই গর্জনকারী শৃগাল
ষাঁড় ও হাঙ্গরকে হার মানায়ে খুঁজছে এখন
আমাদের হৃদয় বিজড়িত ভালোবাসার প্রতীক
পবিত্র তাজমহল-

মার্বেলের সুদূর স্পন্দনে গাঁথা আছে জয়
ভালোবাসার অন্ধ কুঠার জেগে আছে শোনো
ওই গর্জনকারী শৃগালের বিরুদ্ধে চিরকাল
আমাদের তাজমহল বিশাাল এক প্রতিবাদ–

 

অ্যানথজ

( এন. বিভোনাকে)

(ক)

আমি এবং আমার সবজান্তা ঈশ্বরের মধ্যে
কখনো আদিপিতা আদমের স্থান ছিলোনা
ছিলো না হাওয়া বিবির অনন্ত বৈভব

(খ)

গড়িয়ে পড়া পাথর এখন মটরসুঁটির
খোসাগুলো ছাড়াবে
জলবিন্দুরা সুউচ্চ বাঁধের পত্তন ঘটাবে
আর পাথর-বন্যা আত্নার গলিত শব
বহন করবে দ্ধিধাহীন
যে-রকম নিশ্চিত করে বলা যায়
আদম অথবা ঈভের
কোনো আস্তিত্বই ছিলো না কখনো

(গ)

এখন পরের বাগানে তুমি কুড়াচ্ছো ফুল
তুমি তীর ছুঁড়ছো সেইদিকে এখন যেদিকে
সবাই বর্মহীন আর তুমি এসব করছো
সেখানে যেখানে আমার স্বপ্নগুলো এখনো
কৈশোরের জানালায় হাঁটি হাঁটি পা পা-
আমার স্বপ্নের স্রোতে ভাসমান বৃক্ষদের উপড়ে ফেল না
আমার অঙ্কুরিত স্বপ্নকে চিৎকার করে নষ্ট করো না

নৈশ সংগীত
রাত চমৎকার
কিন্তু তার ধুলোগুলো
পিচ্ছিল
সে জানে না কীভাবে আমি তার
বসন ধরে টানছি
যা তার স্বচ্ছ জলের
খাড়ির আচ্ছাদন
যেখানে
মানুষের
সাহস ঝুর ঝুর
খসে পড়ে
আত্নার
দাসত্বের ছোয়ালে;

রাত চমৎকার
কিন্তু তার ধুলোগুলো
পিচ্ছিল
আমি
তোমার
চুলের ঝুঁটি ধরি
আর তখনই কোথাও
বেজে ওঠে অশুভ ঘন্টধ্বনি
আমি
তোমার
নাকের ডগায় যখন ঠোঁট রাখি
তখন জমিনে তোমার
এক সজীব গোলাপ বিচুর্ণ হচ্ছে;

আমি
তোমার দৃষ্টিকে শুষে নিই
এবং আমার হাড়গুলো
তোমার আঘাতে
মাংস থেকে আলাদা হয়ে যায়
আমি
তোমার
বৃদ্ধাঙ্গুষ্টি স্পর্শ করি
এবং আমার মনস্তাপ বেড়ে
যায় আমার অপকর্মে;

রাত চমৎকার
কিন্তু তার ধুলোগুলো
পিচ্ছিল
সে
জানে না
আমি তার বসন ধরে টানছি
যা তার স্বচ্ছ জলের
খাড়ির আচ্ছাদন
যেখানে মানুষের
পৌরুষ ঝুর ঝুর খসে পড়ে
আত্নার দাসত্বের
চোয়ালে;

রাত চমৎকার
কিন্তু তার ধুলোগুলো পিচ্ছিল।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close