Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ কামরুল ইসলাম / ডেরেক ওয়ালকট বিশ্বকবিতার মহান যাদুকর

কামরুল ইসলাম / ডেরেক ওয়ালকট বিশ্বকবিতার মহান যাদুকর

প্রকাশঃ March 18, 2017

কামরুল ইসলাম /  ডেরেক ওয়ালকট  বিশ্বকবিতার মহান যাদুকর
0
0

 

[সম্পাদকীয় নোট : নোবেল পুরস্কারজয়ী সেন্ট লুসিয়ার বিশ্বখ্যাত কারিবীয় কবি ডেরেক ওয়ালকট আর আমাদের মাঝে নেই। গত ১৭ মার্চ ৮৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্বকবিতার এই যাদুকরের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাভিভূত। তাঁর স্মরণে তীরন্দাজের শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে প্রকাশিত হল এই লেখাটি।]

ডেরেক ওয়ালকট : বিশ্বকবিতার মহান যাদুকর

তাঁর কবিতার ঐন্দ্রজালিক আবহ আমাদের কাব্যপিপাসু মনকে নিবিড়ভাবে ছুঁয়ে যায়, নিয়ে যায় অচিন জগতের সৌন্দর্যলীলায়। কবি ডেরেক ওয়ালকট একজন মৌলিক বহুমাত্রিক কবি, জীবন ও শিল্পের আন্তরসম্পর্কের মৌল দিগন্তের সন্ধান পেয়েছিলেন বাল্যে ও কৈশোরে। জীবনকে তিনি কতভাবেই না চিনতেন! এই চিনতে পারার ক্ষমতা সব শিল্পীর সমান থাকে না। বড় মাপের শিল্পী হতে হলে ঘাসের ডগা থেকে কৃষ্ণগহ্বরের অতল গভীরতা পর্যন্ত দেখতে পারার ক্ষমতা থাকতে হবে। ডেরেক ওয়ালকটের চোখ দুটো ছিল বিস্তৃর্ণ সমুদ্রের মতো অতলান্তিক। একজন শিল্পী যে-সব গুণের কারণে স্পর্শ করেন আকাশের নীল কিংবা চারপাশের অনন্ত তিমির,সেসব গুণের অধিকারী ওয়ালকটের কবিতায় দেখা যায় বিশ্ববীক্ষণের বহুবর্ণিল গুঞ্জন। সময়কে ধারণ করে অনন্ত সময়ের দিকে ধাবমান তার কবিতাবিহঙ্গ। এই শব্দকারিগর শব্দ ও বাক্যের নতুন সম্ভাবনাকে নানাভাবে নিরীক্ষা করেছেন।সময় ও শব্দ কখনো কখনো এক হয়ে জেগে ওঠে তার কবিতা কিংবা নাটকে। বাংলা কবিতার মহান কারিগর জীবনানন্দ দাশ যেমন নক্ষত্রশাসিত কবি ছিলেন, ডেরেক ওয়ালকট ছিলেন সমুদ্রশাসিত।

ক্যারিবীয় এই কবি ও নাট্যকার ডেরেক অলটন ওয়ালকট জন্মেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটি ছোট্র দ্বীপ সেন্ট লুসিয়ার ক্যাস্ট্রিজ শহরে, ২৩ জানুয়ারি ১৯৩০ সালে। তার আফ্রিকান এবং ইংলিশ বংশসূত্রের উল্লেখ করে তিনি তার বাল্যকালকে ‘সিজোফ্রেনিক’ হিসেবে বিশেষায়িত করেছেন। তিনি একালের সবচেয়ে সম্মানিত লেখক যাঁর কবিতা ও নাটকে উপনিবেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঐতিহ্যের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী আফ্রিকান ও ইউরোপিয়ান কালচার-বিরোধী মনোভাব ফুটে উঠেছে। যখন তিনি ইংল্যান্ডের সাহিত্য-রীতি মেনে চলছেন তখনও তিনি প্রায়শই ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের ক্যারিবীয় সংস্কৃতির গ্রাসকে নিন্দা করেছেন। তার কবিতার ভাষায় ইংরেজির সাথে সেইন্ট লুসিয়া দ্বীপের আদিবাসীদের বিচিত্র ডায়েলেক্টের উপস্থিতিও লক্ষ করা যায়। তাঁর বিখ্যাত কবিতা A far cry from Africa-তে তিনি তার অনিশ্চিত আইডেনটিটির কথা তুলে ধরেছেন যা তার কবিতার একটি অন্যতম সুর। I who am poisoned with the blood of both/ where shall I turn,divided to the vein? তার মা ছিলেন মেথোডিস্ট স্কুলের একজন  শিক্ষিকা। তিনি ভালো কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং মায়ের কবিতা আবৃত্তির সৌন্দর্যে বালক বয়সেই ওয়ালকট মুগ্ধ হয়েছিলেন। একটি স্থানীয় থিয়েটারের সাথে ছিল তার মায়ের সম্পৃক্ততা। ওয়ালকটের হয়ে ওঠায় তার মা ও বাবা উভয়েরই অবদান ছিল অপরিসীম। তাঁর বাবা কবিতা লিখতেন এবং ছবি আঁকতেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন তার পিতার প্রভাবের কথা এবং এও বলেছেন যে পিতার শিল্পর্কম তাঁর জন্যে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে এবং তার কাজ সেই কাজেরই বিস্তৃতি। ওয়ালকটের বাল্যকালের ইচ্ছে ছিলো আঁকিয়ে হবার। তার আত্মজীবনীমূলক কবিতা Another Life (১৯৭৩)-এ তিনি ও তাঁর বন্ধু দাস্তান সেইন্ট ওমের প্রতিজ্ঞা করছেন যে, শিল্পের মধ্য দিয়ে তাঁরা তুলে ধরবেন সমস্ত ক্যারিবীয় অঞ্চলের দৃশ্যাবলী।

মাত্র ৩১ বছর বয়সে তার বাবা যখন মারা যান তখন ওয়ালকট এবং তার যমজ ভাই রডরিকের পৃথিবীর আলো দেখা হয়নি। তার পরিবার ছিল ক্ষুদ্র মেথোডিস্ট সম্প্রদায়ভুক্ত। ওয়ালকটের লেখার মধ্যে মেথোডিজম এবং স্পিরিচুয়ালিজম-এর প্রভাব রয়েছে। তিনি কবিতা লেখার কাজকে প্রার্থনার সাথে তুলনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন, এটি একটি পবিত্র কাজ, অনেকটা ধর্মীয় উপাসনার মতো। লেখকের দায়িত্ব-কর্তব্য বিষয়ে তিনি প্রথম থেকেই সচেতন ছিলেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি ইউরোপ-আমেরিকার আধুনিক কবিতার সাথে পরিচিত হন।

মাত্র আট বছর বয়সেই তিনি লেখা শুরু করেন। স্কুলে পড়াকালেই ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। কবিতা লেখার প্রারম্ভে তিনি ডব্লু এইচ অডেন, টি.এস. এলিয়েট এবং ডিলান টমাসকে অনুকরণ করেন। চৌদ্দ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতা The Voice of St. Lucia প্রকাশিত হয়।  আঠারো বছর বয়সে বের হয় তাঁর প্রথম কবিতার বই 25 Poems (1948) (১৯৪৮) এবং পরের বছরে Epitaph for the Young: XII Cantos (১৯৪৯)। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন ওয়ালকট এভাবে : ‘একদিন আমি আমার মাকে আমার কবিতার বই প্রকাশের কথা বললাম এবং আরো বললাম যে, এতে প্রায় দু’শ ডলার খরচ হবে। আমার মা তখন  সেলাই ও স্কুলশিক্ষকতার আয় দিয়ে সংসার চালাচ্ছিলেন। মা এতে খুশিই হয়েছিলেন এবং অনেক কষ্ট করে আমাকে বই প্রকাশের টাকা যোগাড় করে দিয়েছিলেন।  সেই টাকায়  ত্রিনিদাদ থেকে বইটি মুদ্রিত হয়ে আসলে আমি আমার বন্ধুদের কাছে বিক্রি করে খরচের টাকা ফিরে এনেছিলাম।’ মায়ের সেদিনের সেই উৎসাহ-ই ওয়ালকটকে কবিতার দীর্ঘ সড়কে অবিচলভাবে হাঁটার প্রণোদনা যুগিয়েছিল। প্রকৃত কবিকে দীর্ঘ পথের পথিক হতে হয়; ওয়ালকট সেই পথিক যাঁর পরিব্রাজক-মন ছুঁয়ে গেছে বিশ্বসভ্যতার আলো ও অন্ধকার, বিচিত্র প্রান্তর ও কাল-মহাকালের অজস্র সংগীতমালা যাকে ঘিরে তাঁর শিল্পচৈতন্যের নির্ভার আনন্দের মধ্যে আবর্তন।

সেইন্ট লুসিয়ার সেইন্ট মেরী কলেজে এবং জ্যামাইকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি আরও দুটি কাব্য সংকলন সম্পন্ন করেছিলেন এবং এ সময়ে কবিতাকারে লেখা ঐতিহাসিক নাটক Henri Christope (১৯৫০) রচনা করেন। পরের নাটক Drums and colours (১৯৫৮) লেখার পর ওয়ালকটের প্রতি সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয় এবং সে-সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশুনার জন্য রকফেলার ফেলোশিপ পান। যুক্তরাষ্ট্রে পড়ালেখা শেষ করে তিনি ক্যারিবিয়ায় ফিরে আসেন এবং ত্রিনিদাদ থিয়েটার ওয়ার্কশপ নিয়ে কাজ আরম্ভ করেন। উল্লেখ্য, সে-সময়ে ৫০ ও ৬০ এর দশকে তিনি বেশকিছু ভালো নাটক উপহার দেন।

১৯৬২ সালে In a Green Night কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলে কবি হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত লিখিত কবিতাগুলোই এই কাব্যগ্রন্থে স্থান পায়। ক্যারিবীয় ভূদৃশ্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে তাঁর সৃজনীপ্রতিভার মৌলিকত্ব প্রতিভাত হয়।তাঁর সমসাময়িক কবি, যাঁরা তার বন্ধুও বটে, কবি রবার্ট লাওয়েল এবং এলিজাবেথ বিশপের প্রভাব ছিল তাঁর কবিতায়- একথা বলতে তিনি কোনো দ্বিধা করেননি। বড় মাপের কবি কিংবা শিল্পী যা নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, মিডিওকাররা তা পারেন না, মিডিওকারদের সেই সাহস থাকে না বলেই তাঁরা মিডিওকার। তার ওপর কবি এজরা পাউন্ডের কবিতার প্রভাবের কথাও অনেকে বলেছেন। তবে এতসব সত্ত্বেও এক অভাবনীয় ভাষাসত্তার ভেতরে তিনি তাঁর কবিতার স্বর এমনভাবে বেঁধেছেন যে, তাঁকে আলাদাভাবে চেনা যায়, তাঁর মৌলিকত্বকে সহজেই সনাক্ত করা যায়। কবিতা ও ভাষার এক ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে তিনি যে বাস্তবতা তৈরি করেন, তা শিল্পের অসীমতাকে স্পর্শ করে।

গত শতকের সত্তরের দশক থেকে তিনি সময়কে ভাগ করে নিয়েছেন- কখনো ওয়েস্ট ইন্ডিজ কখনো যুক্তরাষ্ট্রে চলে তাঁর বিচরণ। তাঁর শিল্পকর্মে ঘুরেফিরে এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটি-ছোঁয়া মানুষ, সংস্কৃতি ও সমূহ জীবনবোধ। তাঁর অনেক নাটকেই, যেগুলোকে ‘লোকনাট্য’ বলা যায়, রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাধারণ মানুষের জীবন ও ভাষা এবং মূর্ত হয়েছে ক্যারিবীয় আঞ্চলিক ভাষা এবং উপকথা।

তার নাটক Ti- Jean and His Brother (১৯৫৮) -এ তিনি আফ্রিকান গল্প বলার টেকনিক ব্যবহার করেছেন। ওয়ালকটের সবচেয়ে সার্থক নাট্যকর্ম Dream on Monkey Mountain (১৯৬৭); এ নাটকের জন্য তিনি ওবাই পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৭১-এ। এটি তাঁর একটি রূপক নাট্যকর্ম। সমালোচকরা বলেছেন যে, এই নাটকে তিনি নিম্নবর্গীয় (সাবঅলর্টান) মানুষের ঔপনিবেশিক চেতনাকে ম্যামক-এর হ্যালুসিনেশনের মধ্য দিয়ে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় রূপায়িত করেছেন। এই নাটকের প্রধান চরিত্র ম্যামাক-কে বর্ণনা করতে গিয়ে ওয়ালকট বলেছেন, ‘ম্যামাক উঠে এসেছে আমার বাল্যস্মৃতি থেকে। একজন মাতাল, যে শনিবারে, যখন হাতে টাকা পেত, রাস্তায় এমনভাবে চিৎকার করতো যে তা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ভীত-সন্ত্রস্ত করতো; এরকম মানুষের ছবি আমি আজও দেখি, যে ছিলো একজন অধোপতিত মানুষ, তবে তার মধ্যে কিছু প্রকৃতিদত্ত শক্তি ছিলো যা এখনো ভীতিপ্রদ, হয়ত অন্য সোসাইটিতে সে একজন যোদ্ধাও হতে পারতো।’

অনেক সমালোচকই ওয়ালকটের ক্যারিবীয় চিত্রাঙ্কনকে একটি অনিশ্চিত ঐতিহ্যের সমাজ- A New World হিসেব চিহ্নিত করেছেন। তার আত্মজীবনীমূলক দীর্ঘ কবিতা Another Life-এ একজন শিল্পীর সুযোগ্য অভিনিবেশে তৈরী এক অস্পষ্ট সংস্কৃতি-ভাবনার রূপায়ণ লক্ষ করা যায়। ওয়ালকটের কবিতায় এভাবেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিচিত্র আত্মপরিচয়ের চমৎকার সম্ভাবনার সূত্রগুলো উজ্জ্বলভাবে দৃশ্যমান, যেখানে একটি ভয়ের

দিকও আছে; হয়ত এই দ্বীপ-সংস্কৃতি ব্রিটিশ আধিপত্য এবং পর্যটকদের ঘনঘন আগমনে ম্লান হয়ে যাবে। তাঁর কবিতায় আমরা দেখি ক্যারিবীয় আদি ভাষাগুলোর জন্যে তীব্র আকুতি। ওয়ালকটের পরবর্তীকালের অনেক কবিতায় দেখা যায়, তিনি নিজেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সম্প্রদায় থেকে- এমনকি ইউরো-আফ্রিকান উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন একজন শিল্পী হিসেবে ভাবছেন। The light of the world  কবিতায় সেই বিচ্ছন্নতা ও নৈঃসঙ্গ্যবোধের অনুরণন শোনা যায় : There was nothing they wanted, nothing I could give/ but this thing I have called ‘The Light of the World’। কলোনিয়াল সময়ের অন্যায়-অত্যচার, অসংগতি এবং তা থেকে উদ্ভূত ক্ষোভ, ঘৃণা ও বিরক্তি ওয়ালকটের কবিতার অন্যতম ‘মটিফ’। সমালোচকরা তাঁর The Schooner Flight  কবিতার উচ্চ প্রশংসা করেছেন, যেখানে সেবাইন, একজন শংকর জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, একইসাথে একজন চোরাকারবারি নাবিক। কবি এখানে তাঁর নিজের অতীতের আলোকে নিজেকে একজন নির্বাসিত মানুষ ভেবেছেন এবং এই কবিতায় সেবাইনের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ও ভাসমান অস্তিত্বের অস্থির আলো-ছায়া আমাদের মনোলোকেও আছড়ে।

ক্যারিবীয় আইডেনটিটি নিরুপণের জন্য ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ভূমিকা বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘অনেকটা পথ হেঁটে এবং অনেক সমালোচনার আলোকে আমি যেটা বলতে চাই সেটা হলো ঐতিহাসিক ভাবালুতার মধ্যে রয়েছে বড়ো রকমের বিপদ…ক্যারিবীয় সমস্ত কিছুর মধ্যে রয়েছে একধরনের অবৈধতা। যদি আমরা প্রথম থেকেই স্বীকার করে নিই যে এই ঐতিহাসিক জারজতার মধ্যে কোন লজ্জা নাই, তাহলে ঠিক আছে, কিন্তু যদি আমরা সর্বদাই দাসপ্রভুর কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য সব তর্জনী উঁচিয়ে দেখাতেই ব্যস্ত থাকি তাহলে আমরা কখনোই সাবালক হতে পারবো না।’

ওয়ালকটের সবচেয়ে প্রশংসিত এপিকধর্মী কবিতা Omeros (১৯৯০)। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির প্রাক্কালে সুইডিস একাডেমি উল্লেখ করেছিলো, এটি মূলত ওয়েস্ট ইন্ডীয় ইতিহাসের মধ্যে পরিভ্রমণ, একধরনের তীর্থযাত্রা। হোমারের ওডেসির সমান্তরালে ক্ল্যাসিক্যাল চরিত্র এচিলিস, হেলেন এবং হেক্টরের বিপরীতে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান জেলে, বেশ্যা এবং জমিদারদের চরিত্র হাজির করেছেন। ওয়ালকট মূলত সারা পৃথিবীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আবিষ্কারে ব্রতী ছিলেন এবং বর্তমান ক্যারিবীয় জনগণের আইডেনটিটিতে এদের কতখানি প্রভাব রয়েছে তা সন্ধান করেছেন। তাঁর কবিতা বিষয়ে অলিভার তাপলিনের মন্তব্য : ‘কবিতার সর্বাঙ্গ ঘিরে রয়েছে ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর পুনঃপুন অনুরণন যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চরিত্রগুলোর জীবন গড়নে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এচিলির আফ্রিকান পূর্বপুরুষদের ওপর কৃতদাসদের পাশবিক আক্রমণ, নেটিভ আমিরিকানদের ওপর ইউরোপীয়দের আক্রমণ, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের যুদ্ধজাহাজ এবং বাতাস প্রবাহের দিকের দ্বীপগুলোতে প্রথম উপনিবেশ স্থাপন…কিন্তু মিঃ ওয়ালকট এইসব মৃত্যু ও দুর্ভোগের দৃশ্যাবলী একজন হোমারের বস্তুনিষ্ঠ সহানুভুতির আলোকে স্মরণ করেছেন, যিনি বলেছেন কী ঘটেছিলো ট্রোজান এবং গ্রিকে।’

ক্রিটিকরা দীর্ঘদিন ধরেই ওয়ালকটকে ‘ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান পোয়েট’ অথবা ‘আ ব্ল্যাক পোয়েট ফ্রম দ্য ক্যারিবিয়ান’- এইভাবে অভিহিত করেছেন। রাশিয়ায় জন্মগ্রহণকারী নোবেল বিজয়ী আমেরিকান কবি, ওয়ালকটের ব্যক্তিগত বন্ধু, ব্রডস্কি ওয়ালকটের এইসব খণ্ডিত পরিচয়কে সমালোচকদের দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, ওয়ালকটকে ইংরেজি ভাষার একজন বিখ্যাত কবি হিসেবে দেখা উচিৎ, আঞ্চলিক কবি হিসেবে নয়।

সমুদ্র  তাঁর ভাষা ও কবিতাকে প্রভাবিত করেছে ঐতিহাসিকভাবে। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের মতো তাঁর ইংরেজি ভাষার সাবলীল শক্তিমত্তা তাকে বহুমাত্রিক কাব্যবলয়ের উত্তুঙ্গ শিখরে আরোহণ করিয়েছে। ভাষা ও সমুদ্র মিশে গেছে অসীম কালপরিক্রমায়। তাঁর কবিতার বিবর্তনিক ছায়ায় জড়িয়ে আছে আটলান্টিকের উত্তাল ঢেউ এবং ইংরেজি ভাষার মহাসড়ক। তাঁর কবিতার গতি ও বৈভব, বিশালত্ব এবং প্রসারণ সবই সমুদ্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান। ওয়ালকটের শিল্পকর্মকে ক্যারিবীয় দ্বীপ, সমুদ্র এবং এই অঞ্চলের জনগণের অনুভুতি এবং তার সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে দেখতে হবে। ব্রডস্কি আরো বলেছেন, তিনি যা কিছু স্পর্শ করেছেন সবই চৌম্বকীয় তরঙ্গের মতো প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

কেউ মানুক না মানুক এ কথা সত্য যে, কলোনিয়াল ঐতিহ্যের এক সম্মোহনী উপস্থিতি ওয়েস্ট ইন্ডিজের আকাশে বাতাসে বহমান। ওয়ালকট এই কুহকী বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, ভাষা তার প্রভু অথবা চাকরদের চেয়ে বড়ো। কবিতা সেই মোক্ষম  অস্ত্র যার মাধ্যমে শ্রেণি, জাতি এবং অহমের চৌহদ্দি পেরিয়ে লাভ করা সম্ভব নিজস্ব পরিচয়। একইভাবে তিনি ক্যারিবীয় জনগণের একটি নিজস্ব আইডেনটিটির খোঁজে বিশ্বসংস্কৃতির মহাস্রোতে নিজেকে অন্বিষ্ট রেখেছেন প্রতিভার ঔদ্ধত্যে। তাঁকে একজন ট্রাডিশনালিস্ট, মর্ডানিস্ট অথবা কোনো ইজম-এ বাঁধা যাবে না। কোনো স্কুলের বা গোষ্ঠীর নন তিনি। তাকে বলা যেতে পারে ন্যাচারালিস্টিক, এক্সপ্রেশনিস্টিক, সুররিয়ালিস্টিক, ইমেজিস্টিক, হারমেটিক অথবা কনফেশনাল কবি। কেউ কেউ তাকে মেটাফিজিকাল রিয়ালিস্টও বলে থাকেন।

শেমাস হিনি ওয়ালকটের ‘…deep and sonorous possession of the English language’-এর বকথা যেমন বলেছেন, তেমনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ইংরেজভাষী কবিদের পাশাপাশি তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকেও তুলে ধরেছেন। রবার্ট গ্রেভস লিখেছেন, তাঁর সমসাময়িকদের তুলনায় ওয়ালকট একটু বেশিই ইংরেজি ভাষাকে তাঁর ভেতরের সৌন্দর্যের সুক্ষ্ণতাকে অনুধাবন করে ব্যবহার করেছিলেন। ইংরেজি ভাষার ক্যারিশমা এবং তাঁর ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতার রহস্য তিনি সুচারুভাইে বুঝতেন বলে অনেকের ধারণা। প্রকৃতপক্ষেই তাঁকে তাঁদের ভাষায় বলা যায়, Ôan elated, exuberant poet madly in love with English.Õ

ত্রিনিদাদ থিয়েটার ওয়ার্কশপ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে একদা শিক্ষকতার জন্য তিনি আমেরিকার পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ১৯৮১ সাল থেকে তিনি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এর ওপর পড়াতেন এবং মাঝে মাঝে মন খারাপ হলে ছুটে আসেন ক্যারিবিয়ায়। তাঁর সেই সময়ের কবিতার মধ্যে যাকে বলে একধরনের ‘দ্বৈততা’ দেখা যায়; যে কারণে তাকে তখন ‘নর্থ’ এবং ‘সাউথ’-এর কবি বলা হতো। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত The Fortunate Traveller এবং ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত The Arkansas Testament গ্রন্থে এই সময়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিচয় মেলে। তাঁর The Fortunate Traveller কাব্যের The Spoilers Return কবিতাটি কেবল তার ‘ত্রিনিদাদ ক্যালিপসো  কালচার’-এর বর্ণনার নৈপুণ্যের জন্য শুধু নয়, এর উৎকর্ষ ফুটে ওঠে তাঁর আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের শক্তিমত্তায়। তাঁর Schooner Flight কবিতাকে শেমাস হিনি শুধু epoch making বলেই ক্ষান্ত হননি এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, Walcot has discovered a language woven out of dialect and literature neither folksy nor condescending…evolved out of one man’s inherited divisions and obsessions.’

১৯৯২ সালে তাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। নোবেল কমিটি তাকে এই পুরস্কার দিয়েছিল ‘…for a poetic oeuvre of great luminosity, sustained by a historical vision, the outcome of a multicultural commitment.’ তাঁর পরবর্তী সময়ের কাব্যগ্রন্থগুলো হলো Tiepolo’sHound (2000), The Prodigal (2004), Ges White Egrets (2010); শেষের এই কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি ২০১১ সালে T.S. Eliot Prize এবং OCM Bocas Prize পান। ২০০৮ সালে ইসেক্স ইউনিভার্সিটি তাকে অনারেরি ডক্টোরেট প্রদান করে। ২০০৯ সালে ওয়ালকট আলবের্তা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছরের জন্যে আবাসিক অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্তি পান এবং ২০১০ সালে এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতার অধ্যাপক পদে অভিষিক্ত হন। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতার অধ্যাপক পদের প্রার্থিতা তিনি স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, কারণ সেই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে যৌন-হয়রানির মিথ্যে মামলাসহ মিডিয়াগুলোতে বেশ লেখালেখি হয়েছিল। তাঁর এই দু:সময়ে তাঁর খুব কাছের বন্ধু শেমাস হিনিসহ অনেক বিখ্যাত কবিই পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাঁর পক্ষে লেখালেখিও করেছিলেন। এই সময় তাঁর প্রতিপক্ষ প্রার্থী রুথ প্যাডেল ঐ পদে নির্বাচিত হলে কয়েকদিনের মধ্যেই ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এ একটি প্রতিবেদন ছাপানো হয় এই মর্মে যে, রুথ প্যাডেল সাংবাদিকদের প্ররোচিত করে ওয়ালকটকে ওই ধরনের মানহানিকর মামলায় জড়িয়েছিলেন। পরে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মিডিয়া ও অ্যাকাডেমিক চাপের মুখে রুথ প্যাডেল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কবিতার অধ্যাপক পদ থেকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য হন। পৃথিবীর সভ্য দেশেও যে এরকম ঘটনা ঘটে থাকে; আর এতে অবাক হবারও কিছু নেই।

ক্যারিবিয়া, তার জনগণ এবং তাদের পরিচয়, সমুদ্র ও দ্বীপের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য- এসবের মৌলিক পরিচয় তুলে ধরেছেন ওয়ালকট তাঁর ব্যাপক সৃষ্টিকর্মে। শেকড়সন্ধানী এই কবি ক্যারিবীয়দের মধ্যেই নিজের অস্তিত্বের সন্ধান করেছেন। ক্যারিবীয়দের জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারি। ইংরেজ শাসক তথা উপনিবেশবাদীদের তিনি ঘৃণার চোখে দেখতেন। ওয়ালকট What the Twilight Says: An Overture (১৯৭০) প্রবন্ধে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঔপনিবেশিক অবস্থার আলোচনা করতে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছেন, একজন শিল্পীর সংকট ঘনীভূত হয় তখনই যখন তার জাতীয় পরিচয়ের সঙ্কট ঘটে। তিনি লিখেছেন: Ô We are all strangers here… Our bodies think in one language and move in anotherÕ.। বিচ্ছিন্ন ক্যারিবীয় দ্বীপের আলোহীন অবহেলিত নির্যাতিত মানুষের তলানি থেকে তিনি খুঁজেছেন শিল্পের আকর। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর চরম দুর্বলতা তাঁকে ইউরোপীয় কিংবা মার্কিনী করে তোলেনি, তিনি তাঁর কবিতায়ও বলেছেন এই দ্বীপ ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না। উপনিবেশবাদীর ভাষায় সাহিত্য করে তিনি  শাসকদের বিকৃত অবয়বকে চিত্রিত করেছেন। তিনি বলেছেন যে, ‘আমার ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি নিয়ে যেসব আলোচনা-সমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে তার সবই অমূলক। অনেক সংকীর্ণ, একপেশে সমালোচনার মধ্যে আমাকে পড়তে হয়েছে। ক্যারিবীয় ক্রিটিকরা বলতে পারেন, আমি হয়ত ইংরেজ হয়ে যাচ্ছি। আবার ইংরেজ ক্রিটিকরা বলতে পারেন- আমাদের দলে আপনাকে সাদর আমন্ত্রণ। এধরনের একপেশে সমালোচনা বা মন্তব্যের কোনো মূল্যই নেই আমার কাছে। ইংরেজি ভাষায় লেখা মানেই ইংরেজ হবার কোনো প্রচেষ্টা নয়। আমি স্পষ্টতই একজন ক্যারিবীয় কবি।’ ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের শ্বাসনালীতে শক্তি যুগিয়ে তিনি তাকে বিশ্বপরিমণ্ডলে দাঁড় করিয়েছেন স্বমহিমায়। তাই জোসেফ ব্রডস্কির সাথে এব্যাপারে আমরাও একমত যে, কলম্বাস ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবিষ্কার করেছিল, আমেরিকা গড়েছিল উপনিবেশ আর একে অমরত্ব দিয়েছেন, এর আইডেনটিটির ব্যাপকতা দিয়েছেন ওয়ালকট। কবিতা ও নাটক উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর শ্রমের স্বাক্ষর ও সফলতা তাকে আলাদা সম্মানের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। যাঁর কবিতা নির্মাণের কৃৎকৌশল এবং অপার সৌন্দর্য আমাদের টেনে নেয় অন্য এক ভালো লাগার জগতে।তিনি যাঁর কবিতা নির্মাণের কৃৎকৌশল এবং অপার সৌন্দর্য আমাদের টেনে নেয় অন্য এক ভালো লাগার জগতে। সমালোচকরা বলছেন- ‘…by combining the grammar of vision with the freedom of metaphor, Walcott produces a beautiful style that is also a philosophical style. People perceive the world on dual channels, Walcott’s verse suggests, through the senses and through the mind, and each is constantly seeping into the other. The result is a state of perpetual magical thinking, a kind of Alice in Wonderland world where concepts have bodies and landscapes are always liable to get up and start talking.’

বিশ্বকবিতার এই অনন্য রূপকার আজ আর আমাদের মাঝে নেই। ছোট্ট একটা দ্বীপদেশ থেকে শুধুমাত্র সৃষ্টিশীল প্রতিভার গুনে তিনি উঠে এসেছিলেন বিশ্বকবিতার জগতে। আমরা আজ এই লেখার মধ্য দিয়ে সদ্যপ্রয়াত এই মহান কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close