Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ কামরুল ইসলাম > বব ডিলান এবং একটি বিস্ময় >> প্রবন্ধ

কামরুল ইসলাম > বব ডিলান এবং একটি বিস্ময় >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ June 20, 2018

কামরুল ইসলাম > বব ডিলান এবং একটি বিস্ময় >> প্রবন্ধ
0
0

কামরুল ইসলাম > বব ডিলান এবং একটি বিস্ময় >> প্রবন্ধ

 

তাঁর সময়ের অনেক কবির চেয়ে তিনি তাঁর লেখা গানের শক্তি ও অপার সম্ভাবনা দিযে শুধু তাঁর সময়কে নয় অনন্ত সময়কে স্পর্শ করেছেন। বলা যায় তাঁর গায়কী কিংবা গায়নভঙ্গি এবং তাঁর গীত-রচনা- উভয়ের যৌথশক্তি তাঁর লিরিকের কাব্যময়তাকে একটি বিশেষ উঁচু জায়গায় নিয়ে গেছে বলেই গানের এই মহান কবিকে নোবেল কমিটি বেছে নেওয়ায় আমাদের বিস্মিত হবার আর কোনো কারণ থাকে না। 

 

বিস্ময়ই বটে। কারণ মানুষের সাধারণ ধারণা হলো, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাবেন কোনো ঔপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার কিংবা ছোটগল্পকার্। এই ট্র্যাডিশন থেকে বেরিযে এসে রয্যাল সুইডিশ একাডেমি যে বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল ২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর, তাতে বিস্মিত হবার কারণ ছিল যথেষ্ট এবং আমি নিজেও সেভাবে ভাবিনি তখন। নোবেল কমিটি বলেছিলেন- বব ডিলান  আমেরিকান সংগীত-ঐতিহ্যে নতুন কাব্যিক অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এই সত্যকে যেমন আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না, তেমনি সংগীত ও কবিতার মেলবন্ধনকে আমাদের উপলব্ধিতে আনতেই হয়। সেইভাবে ভাবলে আর কোনো বিস্ময় হয়তো থাকে না, কিন্তু নোবেল পুরস্কারের বিষয়টি নিয়ে রাজনীতির নানান খেলা ও হিসেবের বিষয়গুলোও আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, যদিও সেসব বিষয়ে এখানে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই কিংবা আলোচনার প্রয়োজনও নেই।

আমেরিকান সংগীতশিল্পী ও গীত-রচয়িতা বব ডিলানকে সেবার সুইডিশ একাডেমি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়ায় সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল এবং হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল, যদিও কমিটির স্থাযী সচিব সারা দানিউস জোর দিয়ে বলেছিলেন, এবারের নির্বাচনে কোনো সমালোচনা হবে না। ১৮ সদস্যের সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব সারা দানিউস বব ডিলান সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন- তিনি ইংরেজি ভাষা-ঐতিহ্যের এক মহান কবি। প্রাইজ ঘোষণার পর তাঁকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, একজন সংগীত শিল্পীকে এই পুরস্কার দেওয়া এটাই বোঝায় কি না যে সাহিত্যের সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে। তিনি বেশ মজা করে বব ডিলানের নাম উল্লেখ করে উত্তরটা দিয়েছিলেন এভাবে-“The times they are a changing, perhaps,”

নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে আগে আর কোনো সংগীত শিল্পীকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়নি। উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতাঞ্জলি (সঙ অফারিংস-এর জন্য নোবেল পুরস্কার পয়েছিলেন। অবশ্য তিনি ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং আরো অনেক কিছু। রবীন্দ্রনাথের ‘সঙ অফারিংস’ ছিল প্রথমত উচ্চমার্গের কবিতা পরে সংগীত। বব ডিলানের লিরিককে অনেকে উচ্চমার্গের কবিতার সাথে তুলনা করেছেন। তাঁর লিরিকের সংকলন বের হলে অসংখ্য মানুষ তা কিনেছে। বব ডিলানের গদ্যকবিতার বই ‘টারানটুলা’ ছাড়াও সাহিত্য নিয়ে আরো অনেক নিরীক্ষাধর্মী কাজ রয়েছে তাঁর, যেগুলোর দিকেও আমাদের মনোনিবেশ করা দরকার।

সেবারের পুরস্কার ঘোষণায় অনেকেই আশাহত হয়েছিলেন এ কারণে যে বব ডিলান প্রথাগত ধারণায় কোনো সাহিত্যিক নন। অনেকেই যখন হারুকি মুরাকামি, মিলান কুন্দেরা, নগুগি কিংবা আরো অনেক সাহিত্যিকের নাম ভাবছিলেন, ঠিক সে-সময়ে এই ঘোষণা রীতিমত হোঁচট খাওয়ার মতোই হয়েছিল। তবে আমার মতে, এই পুরস্কার একজন কবিকেই দেওয়া হয়েছিল সেবার, যার সংগীত বিশ্বমানবিকতাকে স্পর্শ করেছে। এর আগে অনেকবার তার নাম শোনা গেলেও তিনি পুরস্কারটা পাননি। সাহিত্যে এ পুরস্কার পাওয়াটা তার জন্য বড় সম্মানের হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। একজন আমেরিকান হিসেবে টনি মরিসন(১৯৯৩)-এর পরে তিনি সাহিত্যে এই পুরস্কার পান।

গত শতকের ষাটের দশকে বব ডিলান সারা পৃথিবীতে এক ব্যতিক্রমী সংগীতশিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৫৯ সালে এক কফি হাউসে তার সংগীতজীবন শুরু হয়েছিল। ১৯৬১ সালে ডিলান তার পেশাদারী সংগীত-জীবন শুরু করেন এবং ১৯৬২ সালে তার প্রথম অ্যালবামের জন্য একটি রেকর্ড কোম্পানির প্রযোজক জন হ্যামন্ডের সাথে চুক্তি করেন। ২২ বছর বযসে তিনি জোয়ান বায়েজ-এর সাথে ‘হোয়েন দ্য শিপ কামস ইন’ এবং ‘ওনলি আ পন ইন দেযার গেইম’ গান দুটো গেযেছিলেন ঠিক কালো মানুষের অধিকার আদায়ের অবিসংবাদিত নেতা ডক্টর মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের বিখ্যাত ভাষণ “I Have a Dream” দেবার আগে সিভিল রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট মেডগার ইভারস হত্যার সময়ে।

অতঃপর ৫৬ বছর ধরে তিনি সংগীতের দাঁড় বেয়ে যে বিশাল সমুদ্রে এসে পৌঁছেছেন, তা অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই্। প্রতিনিয়ত নতুন করে নিজেকে যেমন সাজিয়েছেন, তেমনি তাঁর সৃজনপ্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন গান রচনায এবং গায়ন-ভঙ্গিতে। নোবেল কমিটি তাদের বক্তব্যে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী গানের মধ্যে নতুন ছন্দময়তা সৃষ্টির জন্য তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।’ এই পুরস্কার পাবার আগে তিনি বিশ্বজুড়ে নানা পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি গ্রামি অ্যাওয়ার্ড, গোল্ডেন গ্লোব ও অ্যাকাডেমি পুরস্কার জিতেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে সম্মানিত করেছেন সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘প্রেসিডেন্টশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ দিয়ে।

বাংলাদেশের মানুষ এই শিল্পীকে মনে রাখবে অনেককাল। আমরা জানি যে, ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সাহায্যার্থে পণ্ডিত রবিশঙ্কর, জজ হ্যারিসন, রিংগো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্যাটারসন ১ আগস্ট বিকেলে নিউইয়র্কের ম্যাসিডন স্কয়ার গার্ডেনে  আয়োজিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এ গেয়েছিলেন। সেখানে বব ডিলানও সংগীত পরিবেশন করেছিলেন এবং ঐ দিনের ঐ অনুষ্ঠানের তিনি ছিলেন সবচেযে উজ্জ্বল মুখ। ‘ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড’ এবং ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চেঞ্জিং’ ইত্যাদি গানের মধ্য দিযে তার যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বাংলাদেশে যখন গণহত্যা চলছে, তখন বাংলাদেশের মানুষের সাথে সংহতি প্রকাশ করে বব ডিলান গাইছেন- ‘দ্য আনসার মাই ফ্রেন্ড ইজ ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড’। ভিয়েতনাম যুদ্ধসহ সারা পৃথিবীর মানুষের অধিকারের আন্দোলনে তিনি সোচ্চার থেকেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আমেরিকা আমাদের পক্ষে না থাকলেও বব ডিলানকে আমরা পক্ষে পেয়েছি, পেযেছি সারা পৃথিবীর আরো অনেক মানবতাবাদী সংগীতশিল্পী, কবি-সাহিত্যিককে।

১৯৪১ সালেণ ২৪ মে মিনেসোটার এক ইহুদি পরিবারে বব ডিলানের জন্ম। মূল নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান। তাঁকে জিম নামে ডাকা হতো। ইংরেজ কবি ডিলান টমাস ছিলেন তাঁর অত্যন্ত প্রিয় এবং ডিলান শব্দটি তিনি নিয়েছেন তাঁর প্রিয় কবির নাম থেকে। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি পিয়ানো বাজানো শেখেন এবং সে-সময় থেকেই তার মধ্যে সংগীতের বিপুল সম্ভাবনা দেখা যায়। ১৯৬০ সালে বিশ্ববিদ্যালযে ভর্তি হলেও পরে অনেকটা গানের টানেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে নিউজার্সিতে চলে আসেন এবং জোরেসোরেই সংগীত নিয়ে মেতে ওঠেন।

সারা দানিউস ফিরে গিয়েছিলেন প্রাচীন গ্রিসের দিকে, বিশেষভাবে হোমার ও সাফোর সাথে তুলনা করেছিলেন বব ডিলানকে। তিনি বলেছেন, প্রাচীন গ্রিকের কবিরা তাদের গীতিকবিতা রচনা করতেন মানুষকে শোনানোর জন্য। তিনি বব ডিলানকে সেই হিসেবে এক মহান কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। প্রাচীন গ্রিক লেসবিয়ান কবি সাফো নেচে নেচে পরিবেশন করতেন তার কবিতা আর তা সংগীতের অপার অমেয় সুধা নিয়ে আবির্ভূত হতো মানুষের কানে কানে। অনেককাল পরে আমরা এই দ্বীপবাসিনী কবিকে আবার নতুন করে পাঠ করছি তাঁর কাব্যবাণীর নিভৃত সৌন্দর্যের ছোঁয়া পেতে।

দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায সালমান রুশদি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছিলেন – We live in a time of great lyricist-songwriters – Leonard Cohen, Paul Simon, Joni Mitchell, Tom Waits – but Dylan towers over everyone. His words have been an inspiration to me all my life ever since I first heard a Dylan album at school and I am delighted by his Nobel win. The frontiers of literature keep widening, and it’s exciting that the Nobel Prize recognises that. I intend to spend the day playing Mr Tambourine Man, Love Minus Zero – No Limit, Like a Rolling Stone, Idiot Wind, Jokerman, Tangled Up In Blue and It’s a Hard Rain’s Gonna Fa.

সাংবাদিক বিল ওয়েম্যান নিউইয়র্ক টাইমস-এ ২০১৩ সালে এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন- তার লিরিক খুবই চমৎকার। এর বিষয়বস্তুও অনন্তকালের; যে কোনো যুগের অল্পসংখ্যক কবিই তাদের কাজের মধ্য দিয়ে এরকম সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পেরেছে।

এক সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত সংগীত সমালোচক ডেভিড হাজডু বব ডিলানের এই পুরস্কার পাওয়া নিযে বলেছিলেন- এটি বব ডিলান যে ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন তারই আংশিক স্বীকৃতি। রবাট জনসন, হ্যাঙ্ক উইলিয়ামস, স্মকে রবিনসন এবং বিটলসদেরও আংশিকভাবে হলেও স্বীকৃতি এই পুরস্কার। তিনি আরো বলেন- অনেক আগেই এই বিষয়ে আরো আন্তরিক হবার দরকার ছিল।

বব ডিলানের অ্যালবামগুলোকে সুইডিশ একাডেমি এভাবেই দেখেছেন- “a tremendous impact on popular music,” তার অ্যালবামগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- “Bringing It All Back Home” and “Highway 61 Revisited” (1965), “Blonde On Blonde” (1966) and “Blood on the Tracks” (1975), “Oh Mercy” (1989), “Time Out Of Mind” (1997), “Love and Theft” (2001) and “Modern Times”। ২০০৪ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীর (তিন খণ্ড) প্রথম খণ্ডে তিনি স্বীকার করেছেন যে, তিনি গান লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন মার্কিন গায়ক রবাট লেরয় জনসনের গান শুনে।

বব ডিলান ফোক মিউজিক এবং একুয়াস্টিক গিটার দিয়ে তার সংগীত জীবনের সূচনা করেছিলেন। অতঃপর ফোক মিউজিক নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা করেছেন এবং আমেরিকার ফোক মিউজিকের ওপর তার প্রভাব অপরিসীম। তিনি প্রথা ভেঙেছেন, নতুনের দিকে হাত বাড়িয়েছেন নিয়ত। তাঁর সময়ের অনেক কবির চেয়ে তিনি তাঁর লেখা গানের শক্তি ও অপার সম্ভাবনা দিযে শুধু তাঁর সময়কে নয় অনন্ত সময়কে স্পর্শ করেছেন। বলা যায় তাঁর গায়কী কিংবা গায়নভঙ্গি এবং তাঁর গীত-রচনা- উভয়ের যৌথশক্তি তাঁর লিরিকের কাব্যময়তাকে একটি বিশেষ উঁচু জায়গায় নিয়ে গেছে বলেই গানের এই মহান কবিকে নোবেল কমিটি বেছে নেওয়ায় আমাদের বিস্মিত হবার আর কোনো কারণ থাকে না। আপনাকে অভিনন্দন, বব ডিলান!

How does it feel
How does it feel
To be on your own
With no direction home
Like a complete unknown
Like a rolling stone?

(From `Like A Rolling Stone/Bob Dylan)

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close