Home কবিতা কামরুল ইসলাম >> ১০টি নতুন কবিতা
0

কামরুল ইসলাম >> ১০টি নতুন কবিতা

প্রকাশঃ October 31, 2017

কামরুল ইসলাম >> ১০টি নতুন কবিতা
0
0

কামরুল ইসলাম >> ১০টি নতুন কবিতা

[সম্পাদকীয় নোট : আজ ১ নভেম্বর, কবি কামরুল ইসলামের জন্মদিন। কামরুলের জন্মদিন উপলক্ষে তীরন্দাজের শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ প্রকাশ করা হলো তাঁর ১০টি নতুন কবিতা।]

মধুরিমা নামে যে বন ছিল

কোথাও কোনো কাকতালে ভোর হয়- নান্দীপাঠ শেষ হয়
পাখির ডাকে- বেলা আর অবেলার পার্থক্য ঘুচে গেলে
বাড়ি ফেরা হয় না আর- শরণার্থীর মন নিয়ে তখন গড়ি এক
আহত নদীর প্রতিমা- তার কোমল ছায়ায় লেখা হয়ে যায়-
উই আর গোইং থ্রু হার্ড টাইমস ফ্রম দ্য বিগিনিং-
এবং আমাদের কলাগাছগুলো মরে যেতে যেতে
গান গায়- আমাদের গরুগুলো প্রতিটি হাম্বায় দীর্ঘ করে
বাকপ্রতিমার কলস্বর- কোথাও কোনো কাকতালে ভোর হয়
আর দ্যাখো মশাদের গোপন গানের হাত ধরে নেমে আসে
পাদটীকার ছদ্মবেশে গাভীন কুয়াশা- আমরা নেমে যাই
দুগ্ধফেননিভ শুভ্র আঁধারে-; তোমার নীল ডানা প্রসারিত হলে
মধুরিমা নামে যে বন ছিল তার কান্নায় ভিজে শরতের মেঘ
রাতের শেষ প্রহরের সার্কাসের ক্লাউনের ক্লান্তি নিয়ে
পড়ে থাকে নিবিড় সেজদায়…

 

কবি তার ফলের বাগানে খুন হতে থাকে

আন্দালুসিয়ার বাতাস এসে দাঁড়ায়
আমাদের জাম্বুরা তলায়
পুরনো ধুলোর পাদটীকায়
ভেসে ওঠে- মা রাব্বুকা ওয়া দ্বীনুকা-

পাঠ করি সহমরণ, অনাগত শীতের গান
আমি যেন বংশহীন বরফের চাঁই
রাতের চামড়া গায়ে ভেসে যেতে থাকি
সমুদ্রের বহুভুজ জলের মায়ায়

ক্লিন ইমেজের অক্টোপাস
জিমনেশিয়াম ভরে যায় সান্ধ্যকুঠারের
ত্রিভুজ ডানায়; জলপাত্র ভেসে গেলে
কবি তার ফলের বাগানে খুন হতে থাকে
সেই নিয়ে গল্প চলে চাঁদমরা রাতে

 

একদিন ঠিকই উঠে যাবো আকাশে

একদিন অন্ধকার বেয়ে উঠে যাবো আকাশে, দেখো হে-
সবটুকু আদর জোছনার জলে ভাসিয়ে দিয়ে
রাতের পাঁজরে পড়ে থাকা আহত হরিণের ঘুম সাথে
দেখো এবার সড়সড় উঠে যাবো নিয়তির চুঁড়োয়-
এবার আমি নারকেল পাতার হৃদয়ে ঢুকে আড়বাঁশি
বাজাবো, আর মেষের গল্পের ভেতর ঝাল-নুন দিয়ে
তৈরি করবো এমন এক ডেজার্ট যার রূপের গন্ধে
তুমি ঠিক সন্ধ্যা হয়ে যাওয়া ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়েও
শস্যের তন্দ্রাটুকু বুঝে উঠতে পারবে না আর-
এমনি এক সময়ে আমার চোখের ভেতরে আরেকটি
চোখ এসে দেখে যাবে উপমার কোজাগরী রাত
আমি এসবের বিশেষ শূন্যতায় ভর দিয়ে, তোমার নাম
জপে জপে একদিন ঠিকই উঠে যাবো আকাশে…

 

কড়ইতলের আঁধারে

পথের কিনারে বসে আছে ক’জন অন্ধ কিশোরী- ওদের চোখে-মুখে
অগ্নিদগ্ধ বরফের কুচি- ওরা পড়ে যাচ্ছে আয়েতাল কুরছি
আর তাদের পিঠে-বুকে মাছ-ভাতের আঙ্গিকে নেমে আসছে
শরতের সন্ধ্যাবেলাকার পাগলা শিশির- অন্ধ কিশোরীরা
কাশফুলের পদ্য নিয়ে খোঁপায় মাখাচ্ছে- অদূরে এক বর্ষীয়ান কবি
কচ্ছপের খোলসে ভরে আয়ুর জিলাপি রাঙিয়ে যায় পথ- অন্ধত্ব
কেটে গেলে কিশোরীরা দ্যাখে- তাদের অনাগত সন্তানেরা নীল নীল
শার্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে কড়ইতলের আঁধারে…

 

সুর বেঁধে ঘুমিয়ে থাকা শকুনির গ্রামে

গাছের সাথে শকুনের প্রতিভা ধাক্কা খেলে
পাতারা বিয়োতে থাকে চাঁদে পাওয়া ক্লোরোফিল-
এক যাদুকর কবি ঝোলা থেকে বের করলেন
কিছু কবিতার অধরা কঙ্কাল
এই কঙ্কালেরা অন্ধকারের ভাষায় জাগিয়ে তুললো
ক্লোরোফিলদের দুঃখ-মোড়ানো গান
সেই গানের কিনারে মাঠ
সেই মাঠের শূন্যে শকুনেরা ওড়ে
শকুনের ওড়াউড়ি দেখে গাছেরা কাঁদে
এমনি এক দুপুরে আমাদের যাত্রা হয়েছিল
সুর বেঁধে ঘুমিয়ে থাকা শকুনির গ্রামে
সেই গ্রামে মানুষ নেই আছে শুধু অদ্ভুতুড়ে দীঘি
আমরা এক দীঘির জলে কবিতার কঙ্কাল ছুঁড়ে
শুনতে চেয়েছিলাম প্রাণভোমরার গান
কে জানে কবেই এ গ্রামের সব গান, সব সুর
শকুনের প্রতিভার আলোয় নিভে গেছে
দিঘির জলে শুধু ভেসে বেড়ায় নীল নীল অজস্র
ছায়া, মায়ায় আচ্ছন্ন এ গ্রামখানি শকুনিদের
কলিজার ঘামে জেগে থাকে রাত ও দিনের সমস্ত প্রহর
অসুখের ছায়াগুলো

সোমলতায় আচ্ছন্ন তার দেহ, নেশার আদলে
ধীরে ধীরে পার হয় কয়েক-পাখি জমি, যখন
দেহবাস ছেড়ে একটি সলিলকির প্রেতাত্মা
আলো থেকে সরে যেতে যেতে
লাউফুলের উপমিত হবার সম্ভাবনার
জলসাঘরে ফাঁদ পেতে
একটি রোলিং স্টোনের কাহিনির থিমটুকু নিয়ে
সেমিটিক আয়নার মুখস্থবিদ্যায় আনন্দ শেখে-
দূরের পথে নেশা নেশা ঘাস, দেহে তার
ঢেউ ঢেউ ক্ষুধার নকশা
চরৈবেতি…হাসপাতালের ছাদ বেয়ে অসুখের ছায়াগুলো
নেমে আসে নিচে, মাতালের দিন যায় সোমরসে সুখে ও অসুখে…

 

হরগঙ্গা তীরে

শেয়ালপাড়ার কাছাকাছি হরগঙ্গা নদী
এই নদীর পাড়েই আমাদের দেখা হয়েছিল

আশ্বিনের কোন এক সন্ধ্যা-
আমরা হরগঙ্গার জলের দিকে তাকিয়ে
ভুলে যাচ্ছিলাম গাধা ও ঘোড়ার পার্থক্য, আমরা
ভুলে যাচ্ছিলাম জলপ্রবাহের তন্দ্রামাখা সুর
আর শাদা শাদা মেঘের কফিনে ভাসমান
হৈমন্তী ফুলের লাজনম্র মুখ…
আমাদের ভুলে যাওয়া নিয়ে ব্যাকুল পাখিরা
চাঁদের সেলেব্রিটি আলোয় স্নান সেরে
হরগঙ্গার আদি গল্পের দিকে ডানা ওড়ালেই
আমাদের চোখে পড়ে আশ্চর্য ধীর গতির চর
আমরা নিশিভ্রমে ভেঙে যায় রাতের ইস্পাত
অতঃপর করোটির মটিফ নিয়ে নদীজল ঘিরে
বানাই জলগীত হরগঙ্গা তীরে…

 

ঈশপের বাড়িতে

মনমরা রিদম নিয়ে উড়ে যাচ্ছে চড়ুই
দেয়ালে টাঙানো কফিনের নাচ,
মৃত মানুষটি হারানো আত্মার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়-
আত্মার চারপাশে তখন কাকতাড়ুয়ার কনসার্ট
আমরা বহুগামী শব্দের কাছে কান পাতি, যেন কোনো
ঈশপের বাড়িতে আজ ছেঁড়া রুমাল উড়িয়ে
এক আনাড়ি বাজপাখি সুরের শাকভাতে
ছড়িয়ে দেবে চড়ুইয়ের নাচ, কৈবল্যের বিষ…

 

মৃদুমন্দ বিশ্বাসের স্মৃতি

ভোর তার জঙ্গলসহ
একটি একাকী ডাহুকের পাঠাগার-
উড়ে যাচ্ছে পাখিবই প্রাকৃত প্রচ্ছদে
দিনশেষে-
আমার ভেতরে-বাহিরে পালকদিনের
মেঘ জমে আছে-
কড়াইয়ে ফুটছে জোনাকির সন্ধ্যাবেলাকার
সংসার- আধো আধো ঘুম-
বড়শিটা ফাতনাসহ ভেসে যাচ্ছে গভীর জলে
অতলে মৃদুমন্দ বিশ্বাসের স্মৃতি-

 

রূপের টোটেম
ঝোপের আড়ালে পড়ে আছে রূপের টোটেম
ডালে ডালে ঘাম ঝরে শুকনো পাতার, আর তুমি
ছায়াবিষ পথে ফেলে মেখে নাও বকুলের ঘ্রাণ

দূরে, বাতাসের স্মৃতি আমলকির ডালে এসে বসে-
উৎসব ভুলে যারা উঠছে পাহাড়ে
তারা কি জানে কীরকম সাঁতার হলে দিগন্ত কাঁপে
দিঘির চারপাশে নেমে আসে মৌসুমী ঝড়?

উৎরানো সন্ধ্যায়
রূপের কাহারবায় গাছে গাছে বেজে ওঠে পাখি
জ্বলে ওঠে কিশোরী কোকিলের সঙ্গম ও স্বর-

কামরুল ইসলাম : জন্ম ১ নভেম্বর, ১৯৬৪ সালে কুষ্টিয়ার ফিলিপ নগর
গ্রামের গোলাবাড়ী পাড়ায়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে কবিতার জগতে প্রবেশ। পেশা : সরকারি কলেজে অধ্যাপনা। বর্তমানে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের (পাবনা) ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : দ্বিধান্বিত সুখে আছি যমজ পিরিতে (১৯৯৯), ঘাসবেলাকার কথা (২০০১), যৌথ খামারের গালগল্প (২০০৬), সেইসব ঝড়ের মন্দিরা (২০০৮), চারদিকে শব্দের লীলা (২০১০), অবগাহনের নতুন কৌশল(২০১১), মন্ত্রপড়া সুতোর দিকে হাওয়া (২০১৪) দীর্ঘশ্বাসের সারগাম(২০১৬, বিহঙ্গখচিত লণ্ঠন (২০১৭)। প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার বিনির্মাণ ও অন্যান্য(২০০৯), রবীন্দ্রনাথ : বিচিত্রের দূত (২০১৩), কবিতার স্বদেশ ও বিশ্ব (২০১৫)।

Edited book:
Green Fogs: A Collection of Contemporary Bangla Poetry (2017)

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close