Home পঠন-পাঠন খালিকুজ্জামান ইলিয়াস > ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডের পঞ্চাশ বছর >> প্রবন্ধ

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস > ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডের পঞ্চাশ বছর >> প্রবন্ধ

প্রকাশঃ January 10, 2018

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস > ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডের পঞ্চাশ বছর >> প্রবন্ধ
0
0

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস > ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডের পঞ্চাশ বছর >> প্রবন্ধ

 

যে বইটি সম্পর্কে মার্কেস ভাবতেই পারেননি যে তা এতো জনপ্রিয় হবে, এতোগুলো ভাষায় অনূদিত হবে এবং তাঁর জন্য এনে দেবে সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার, তার উদ্দেশ্য কিন্তু ছিল নেহায়েতই আত্মজীবনীমূলক। মার্কেস চেয়েছিলেন আরাকাটাকায় তাঁর শৈশবের জগতকে আঁকতে; যে একান্নবর্তী পরিবারে তিনি মানুষ হয়েছেন ছেলেবেলায় তারই বিচিত্র লোকদের একটা সাহিত্যিক চিত্র আঁকতে। সেই পরিবারে থাকতো তাঁর এক বোন যার অভ্যাস ছিল সুযোগ পেলেই মাটি খাওয়া, ছিলেন তাঁর মাতামহী যিনি ভবিষ্যদ্বাণী করতেন, আর মৃত আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বাতচিত করতেন, ছিল অসংখ্য চাকরবাকর যারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল নানা কেচ্ছাকাহিনি; আর এসবই তার শৈশবের মানস গঠনে সাহায্য করে। নানীর গল্প বলার ধরন মার্কেস গ্রহণ করেন তাঁর এই ভুবনবিখ্যাত বইয়ে। তার মাতামহ ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাপতি এবং গৃহযুদ্ধের দিনগুলির মাঝেই ছিল তাঁর বসবাস- তো ওই মাতামহের হাত ধরেই বালক গ্যাবো যেত বিভিন্ন জায়গায়, কলাকোম্পানির আধুনিক পল্লিতে, কখনো পাহাড়ে ঝর্ণার ধারে। নানার কাছেই তাঁর হাতেখড়ি হয় জীবনের প্রাথমিক পাঠে। ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউডে তিনি মূলত ওইসব কাহিনিই প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন এবং কৈশোরে তিনি অন্দর মহল নামে একটি উপন্যাসও লিখতে শুরু করেন। সেই অঙ্কুর লেখারই পুষ্পেপর্ণে পরিণত রূপ নিয়ে প্রকাশিত হয় আলোচ্য এই বই। তখন তাঁর বয়স আটত্রিশ। কর্ণেল যুদ্ধ করেন উদারনৈতিক জেনারেল রাফায়েল ইউরাইব ইউরাইবের অধীনে। এই জেনারেলেরই অনেকটা প্রতিচ্ছবি দেখা যায় বক্ষমান উপন্যাসের কর্ণেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার চরিত্রে।

যে কোনো বড় লেখকের মতো মার্কেসও ছিলেন তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল। বস্তুত মার্কেস তার বন্ধু উপন্যাসিক মেন্দোজাকে বলেছেন যে ছেলেবেলায় সহানুভূতির বা সমমমির্তার একটি গভীর প্রকাশ তার লেখাকে অবিরাম জুগিয়েছে প্রেরণা, উদ্দীপনা। সেসময় মায়ের সঙ্গে তিনি গিয়েছিলেন আকাপুলকোতে তাঁর নানাবাড়ি বিক্রি করতে। সেই অতীতদিনের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই দেখে মা -ছেলে দুজনেই যখন আফসোস করছিলেন তখন এক অন্ধকার ঘরে সেলাই মেশিনের ওপর ঝুঁকে কাজ করা এক বৃদ্ধার খোঁজ পান তারা। ওই বৃদ্ধা মার্কেসের মায়ের তরুণ বয়সের বন্ধু। প্রথম দর্শনে দুজন দুজনার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে হয়তো তাঁদের শীর্ণকায় চেহারার ওপারে লাস্যময়ী কোনো তরুণীকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিলেন। এরপর মায়ের বন্ধু সেলাই ছেড়ে উঠে খুব ঘনিষ্ঠ নামে ডেকে তাকে জড়িয়ে ধরেন এবং দুজনেই হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মার্কেস বলেন তার প্রথম উপন্যাসের জন্ম ওই দুই সইয়ের পূনমির্লনীর মধ্যে। এই পূনমির্লনই হলো সমমর্মিতা বা ভালোবাসা। ভালোবাসা যত গভীর এর বেদনাও তত গভীর এবং শিল্পসৃষ্টিতে এর অবদানও তত শক্তিশালী। ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউডের এতগুলো চরিত্র- সব কটির প্রতিই মার্কেসের দরদ অপরিসীম। দরদ না থাকলে কিছু সৃষ্টি করা যায় না- এমন কথাই মার্কেস বিশ্বাস করতেন এবং উপন্যাসটিতে বুয়েন্দিয়া পরিবারের লোকজনের ভেতর যে অপার নি:সঙ্গতাবোধ তা এই ভালোবাসার অভাবেই সৃষ্ট বলে মার্কেসের বিশ্বাস।

বইটা লেখা শুরু করতেই মার্কেস সময় নেন বহু বছর। ছাড়া ছাড়া কিছু গল্প লিখে প্রকাশ করেন, কিন্তু বৃহত্তর কাহিনির মেজাজটা ধরতে পারছিলেন না। এভাবে বেশ কয়েক বছর পেরনোর পর একবার আরাকাটাকা যাওয়ার পথে হঠাৎ তার মনে হয় শুরু করবেন এক নানা তার নাতির হাত ধরে খর রোদের দুপুরে বরফ দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে- এমন একটি দৃশ্য দিয়ে। যেই না মনে হওয়া তখনই অর্ধেক রাস্তা থেকে গাড়ি ফিরিয়ে এনে লিখতে বসেন। এবং লেখেন উপন্যাসের প্রথম বাক্যটি : “বহুবছর পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে কর্ণেল বুয়েন্দিয়ার হঠাৎ মনে পড়ে এক খাঁ খাঁ করা রোদেলা দুপুর। ওই দিন তার বাবা তাকে হাতে ধরে বরফ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল” আসলে মার্কেসের নানা কর্ণেল মার্কেস শিশু গ্যাবোর আবদার রাখতে সার্কাস পার্টির উট আর কলা কোম্পানির বসতিতে বরফ দেওয়া মাছের বাক্সে রাখা বরফ দেখাতে এবং হাত দিয়ে সেই বরফ স্পর্শ করাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ছেলেবেলার এই অভিজ্ঞতাই সামান্য পরিবর্তিত আকারে চিত্রকল্প হয়ে প্রকাশ পেল এক অসাধারণ উপন্যাসের প্রথম বাক্যে। সেদিন মার্কেসদের আর আরাকাটাকা যাওয়া হয়নি। অর্ধেক রাস্তা থেকে ফিরে তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন। মার্কেস বিশ্বাস করতেন যে প্রথম বাক্যই উপন্যাসের ব্যাপ্তি, গঠন আর সম্ভাবনার অঙ্কুর ধারণ করে, এবং পুরো কাহিনির মেজাজ অনেকটাই নির্ধারণ করে দেয়। এজন্যই কখনো কখনো গল্প লেখা শুরু করতে যতটা সময় তিনি নিতেন তার চেয়ে কম সময়েই লেখা শেষ করতেন। এরপর প্রতিদিন ছ’ঘণ্টা করে এক নাগাড়ে লিখে আঠারো মাসে শেষ করেন উপন্যাসটি। এক বছর এভাবে লিখে হিসেব করে দেখেন যে আর ছমাস প্রতিদিন সকালবেলা এরকম গতিতে লিখতে পারলে তিনি উপন্যাসটি শেষ করতে পারবেন। সেসময় মার্কেসের এক পয়সাও উপার্জন ছিলো না। আবার, লেখার ব্যাপারে মার্কেস ছিলেন খুঁৎখুতে এবং যত্নবান। টাইপরাইটারে লিখতে গিয়ে ভাষা, ব্যাকরণ ইত্যাদিতে সামান্য ভুল করলেও তিনি পুরো কাগজই নষ্ট করে ঝুড়িতে ফেলতেন। পরবর্তীকালে আক্ষেপ করে বলেছেন যে এসব ভুলও যে সৃজনশীল হতে পারে তা তিনি জানতেন না। এজন্য লিখতে বসলে তাঁকে সবসময় শ পাঁচেক তা’ কাগজ মজুত রাখতে হতো। কপর্দকহীন অবস্থায় এটাও একটি বাড়তি চাপ।

গাড়ি কিনেছিলেন- সেটা বন্ধক দিয়ে ছ’মাসের টাকা গচ্ছিত রেখেছিলেন স্ত্রীর কাছে। স্ত্রী মার্সেদেসই ওই টাকায় সংসার চালান এবং এরপরও বছরখানের বাকিতে এবং ধারদেনা করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন। উচ্চহারে সুদে দেনা করতে চাননি বলে স্ত্রীর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া গয়নাগাটি বন্ধক দিতে যান। জহুরি খুব পাকা সার্জেনের মত পরীক্ষনিরীক্ষার পর হিরামতিপান্না বসানো গয়নাগুলি এই বলে ফেরত দেয় যে ওগুলো সব মেকি, কাঁচের জিনিস। বাড়িঅলাকে বলে ছমাসের ভাড়া বাকী রাখেন। ছমাসে প্রচুর টাকা জমে যাবে বলে বাড়িঅলা সাবধানও করে দেয়; কিন্তু মার্সেদেস কেন যেন বইটার সাফল্যের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন এবং বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই তিনি পুরোটাই শোধ করবেন বলে জানিয়ে দেন। এই বইটি প্রকাশনা সংস্থা এডিটোরিয়াল সুদামেরিকানার কাছে পাঠানোর সময়ও ঘটে মজার ঘটনা। মেহিকো সিটির পোস্ট অফিসে ৫৯০ পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপিটি পাঠাতে গিয়ে দেখা গেল খরচ পড়ছে বিরাশি পেসো। মার্সেদেসের হাতের ব্যাগে রাখা নোট, খুচরো পয়সা সব মিলিয়ে হল তেপ্পান্ন পেসো। তখন মার্কেস দম্পতি পান্ডুলিপির প্যাকেট খুলে দুভাগে ভাগ করে দুটো প্যাকেট করেন; এবং একটি প্যাকেট ডাকে পাঠান এই ভেবে যে পয়সা জোগাড় হলে বাকিটা পাঠাবেন। কিন্তু দেখা গেল ভুল করে তারা পাণ্ডুলিপির দ্বিতীয় অর্ধাংশ পাঠিয়েছেন। যা হোক, প্রকাশক ছিলেন সদয় এবং দারুণ উৎসাহী। তিনি প্রথম অর্ধাংশ চেয়ে পাঠান, সঙ্গে পাঠিয়ে দেন ডাক খরচের টাকা। মার্কেস বলেন, “এভাবেই আমরা আজকের জীবনে পুনর্জন্ম লাভ করলাম।”  অর্থাৎ বইটি তাদের ভাগ্য খুলে দিলো।

নিজের তৈরি চরিত্রগুলো কখনো কখনো মার্কেসের পরিকল্পনা মত বড় হয়, কিন্তু অনেক সময়েই তারা জ্যান্ত মানুষের মত অবাধ্য হয়ে নিজেরাই তাদের স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বেড়ে ওঠে। সম্ভবত এজন্যই, অর্থাৎ চরিত্ররা স্বতন্ত্র মানুষ হয়ে গড়ে ওঠায় মার্কেস অন্য যে কোনো বড় লেখকের মতো তাঁর চরিত্রগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা বোধ করেন, তাদের দুঃখ দুর্দশা, আনন্দানুভূতি অনুভব করেন নিকট আত্মীয়র মতই। কর্ণেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে মেরে ফেলার ভয়ে মার্কেস সব সময়ই ছিলেন ভীত। তো বৃদ্ধ কর্ণেলের মৃত্যু হলে মার্কেস সোজা চলে যান বাড়ির দো-তলায় তাঁর স্ত্রীর কাছে। এরপর বিছানায় শুয়ে দুঘণ্টা ধরে কেঁদেছিলেন বলেও তিনি জানান বন্ধু মেন্দোজার সঙ্গে কথোপকথনে।

লেখা শেষ হলে পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করার জন্য তা তিনি পেশাদার টাইপিস্ট এসপেরেনসা আরাইসা পেরাকে দেন। এই ভদ্রমহিলা কার্লোস ফুয়েন্তেস, হুয়ান রুলফো প্রমুখের উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিও টাইপ করেছেন। তো এঁকে পাণ্ডুলিপির চূড়ান্ত কপি প্রস্তুত করতে দেওয়ার সময় জিনিসটার অবস্থা মোটামুটি খারাপই ছিল। কালো কালিতে লেখা কেটে লাল কালিতে সংশোধন করা হয়েছিল যেন কোনোরকম ধন্দ না থাকে। এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে পেরা বাসে করে যাচ্ছিলেন। সেদিন খুব ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিলো। তো গন্তব্যে পৌঁছে বাস থেকে নামতে গিয়ে তিনি পা পিছলে পড়ে যান এবং পাণ্ডুলিপির কাগজপত্র সব ছড়িয়ে পড়ে রাস্তার কাদাজলে ভাসতে থাকে। অন্য যাত্রীদের সাহায্যে যা হোক কোনোরকমে সেসব উঠিয়ে তিনি বাসায় নিয়ে পৃষ্ঠাকে-পৃষ্ঠা ইস্ত্রি করে শুকান। অনেক জায়গায় কালি লেপ্টে লেখা দুর্বোধ্যও  হয়ে যায়। কিন্তু একজন ঝানু পেশাজীবী টাইপিস্ট এবং প্রুফ রিডারের জন্য ব্যাপারটা তেমন উদ্বেগের নয়।

উপন্যাসটির অভাবিত সাফল্য সম্পর্কে মার্কেস প্রথমে ভাবতেই পারেননি। একটি পরিবারের কাহিনি যে এভাবে লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসের আয়না হয়ে উঠবে এমন সম্ভাবনা আসলেই ছিল মার্কেসের কল্পনাতীত। তবে প্রকাশকরা যে পাণ্ডুলিপি পছন্দ করবেন সে বিষয়ে তিনি আশাম্বিত ছিলেন। এরপর প্রকাশিত হওয়ার দুসপ্তাহের মধ্যেই প্রথম মুদ্রণ শেষ হয়ে যায়। এমনও হয়েছে যে এক সংস্করণে দশ লক্ষ কপিও ছাপা হয়েছে। মার্কেস নিজেই বিস্মিত হয়ে বলছেন যে নির্জন ঘরে বসে রাতজাগা এক লোক স্প্যানিশ বর্ণমালার আটাশটি অক্ষর নিয়ে নেড়েচেড়ে দু আঙুলে টিপে একটা বই লিখলো আর লাখ দশেক মানুষ ঠিক করলো যে তারা সেটা পড়বে। ব্যাপারটা তার কাছে পাগলামি বলেই মনে হয়েছে। বস্তুত পাগলামিই, কারণ মার্কেস এক রুশ পাঠিকার কথা বলেছেন যিনি নাকি ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড পুরোটাই হাতে লিখেছিলেন এটাই দেখতে কে বেশি পাগল- বইয়ের লেখক না তিনি। এই মহিলাকেই মার্কেস তার এই বইয়ের শ্রেষ্ঠ পাঠক বলে মনে করেছেন। আজ পাঁচ কোটিরও বেশি লোক পড়েছে এই বই। মার্কেস বিস্মিত হয়ে বলেন যে এই পাঁচ কোটি লোককে একটি ভূখন্ডে রাখলে তা বিশ্বের জনবহুল বিশটি দেশের একটি হতে পারতো।

এই উপন্যাসে জাদু বাস্তবতার বহুল ব্যবহার থাকলেও মার্কেস বিষয়টিকে স্বতন্ত্র কোনো বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখতে রাজি নন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সর্বত্রই ম্যাজিকাল রিয়ালিজম বিরাজমান। এজন্য তিনি মনেই করতেন না যে এই বাস্তবতা আনতে তাকে সচেতনভাবে কোনোরকম চেষ্টা করতে হয়েছে। তার এই বইটির জনপ্রিয়তার এটাও একটা কারণ যে সমাজের সব শ্রেণির মানুষই এর বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের স্বাভাবিক সম্পৃক্ততা অনুভব করেছেন। তাদের কাছে বাস্তবতা দিনকে দিনের স্টকমার্কেটের হিসেব কিংবা বাজারদরে সীমিত নয় বরং বাস্তবতা অসাধারণ সব উপকরণ দিয়ে ভরা। একজন মার্কিন পরিব্রাজকের উদ্ধৃতি দিয়ে মার্কেস বলেন যে সেই পরিব্রাজক কঙ্গোর গভীর জঙ্গলে এক ফুটন্ত জলধারা দেখতে পেরেছিলেন এবং এমন একটা জায়গার সন্ধান পান যেখানে কথা বললে সেই আওয়াজে হাওয়া থেকে জলবিন্দু সিঞ্চিত হতো। এছাড়াও প্রকৃতিতে এমন অনেক কিছুই ঘটে যা কাকতাল এবং অসাধারণ। মানুষ এসব কিছুর সঙ্গেই পরিচিত এবং সাহিত্যে এদের প্রকাশ সেজন্য তেমন বিভ্রম আনে না কিংবা অপরিচিতের দূরত্বও বহন করে না। এই উপন্যাস পড়ে সাধারণ পাঠকও কোনো রকম অসাধারণ অভিজ্ঞতা লাভ করেননি বলে মার্কেস আমাদের জানান। আলোচ্য উপন্যাসে রেমেদিউসের স্বর্গারোহণ কিংবা মরিসিনো ব্যাবিলনিয়ার চারপাশে হলুদ প্রজাপতির উড়ে বেড়ানো ইত্যাদি ঘটনা বাস্তব দৃশ্যকল্পের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। স্বর্গারোহনের ব্যাপারটি সম্পর্কে মার্কেস দুটো ঘটনার উল্লেখ করে বলেন যে উপন্যাসটি লেখাকালীন এক মহিলার নাতনি বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলে মহিলা বলে বেড়াতে থাকে যে তার নাতনি স্বর্গে উড়ে গেছে। এর পরপরই মার্কেস একদিন দেখেন যে প্রতিবেশি মোটাসোটা এক কৃষাঙ্গ মহিলা সাদা চাদর শুকোতে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন কিন্তু প্রচণ্ড বাতাসে চাদর যেন ডানা মেলে বারবার উড়ে যাচ্ছে। তো এই দুটি ঘটনা এক করে মার্কেস রেমেদিউসের স্বর্গারোহন বাস্তব করে তোলেন। আসলে মানুষের অভিজ্ঞতায় যা কিছুই ঘটে সবই বাস্তব। কিছুটা অসাধারণ অভিজ্ঞতাগুলোই হয়তো কুহকী কিছু বলে মনে হয়, কিন্তু তারাও বাস্তব। এমন ধারণা আত্মীকরন করেই মার্কেস রচনা করেন তার ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড।

টি.এস. এলিয়ট মনে করতেন সাহিত্য ভাণ্ডারে এক একটি নতুন সংযোজন ভাণ্ডারের সব বইয়েরই পঠনপাঠনে পরিবর্তন আনে; সব বই-ই যেন নতুনকে একটু জায়গা করে দিতে নড়েচড়ে বসে। মার্কেসের পঞ্চাশ বছর বয়সী এই বইও বিশ্বসাহিত্য সভায় এক শক্তিশালী নতুন আগন্তুক। এর আগমনে অতীত, বর্তমান- এমনকি ভবিষ্যতের সৃষ্টিও প্রভাবিত হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। অতীতের সৃষ্টির নতুন পঠন ও বিশ্লেষণে তারা যেমন প্রভাবিত হয়, তেমনি বর্তমান ও ভবিষ্যতের সৃষ্টিও প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হয়ে, নতুন শিল্প সৃষ্টির দিশা পেয়ে বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধতর করে। যে কোনো উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম সম্পর্কে একথা যেমন সত্য, তেমনি সত্য ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড সম্পর্কেও।

মার্কেস যদি অন্যান্য উপন্যাস ও ছোটগল্প না লিখে কেবল এই একটিমাত্র বই লিখতেন, তাহলেও হয়তো তিনি বিশ্বসাহিত্যে একটি স্থায়ী আসন অর্জন করতেন। কিন্তু না, সেটা কী করে সম্ভব? একজন লেখকের সৃষ্টিকর্ম তো পরস্পরে বাঁধা। একটা একটা করে ধাপ পেরিয়েই তো শিল্পী পৌঁছান তার সেরা ধাপটিতে- এরপর আবার ধীরে ধীরে নেমেও আসেন। আসলে একজন লেখকের সব লেখাই পরস্পরে যুক্ত। সিঁড়ির একটি দুটি ধাপকে অবহেলা করে বাদ দিলে লেখককে একটা সামগ্রিকতায় ধরতে কিছুটা অসুবিধাই হয়। এজন্য ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডকে বুঝতে মার্কেসের পূর্বাপর উপন্যাস পাঠেরও প্রয়োজনীয়তা আছে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close