Home গদ্যসমগ্র প্রবন্ধ খালেদ হামিদী / ফরিদ কবিরের কবিতা : একটি ব্যক্তিগত সমীক্ষণ 

খালেদ হামিদী / ফরিদ কবিরের কবিতা : একটি ব্যক্তিগত সমীক্ষণ 

প্রকাশঃ January 22, 2017

খালেদ হামিদী / ফরিদ কবিরের কবিতা : একটি ব্যক্তিগত সমীক্ষণ 
0
0

কবিতার আকালে কাব্যের সন্ধানে সচেতন পাঠকদের অনেকেই যখন প্রায় হতোদ্যম, তখনই ২০১১ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় কবি ফরিদ কবিরের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ওঁ প্রকৃতি ওঁ প্রেম (আগামী প্রকাশনী)। এর আগে ২০০৩ ও ২০০৭-এ বেরোয় ফরিদ কবিরের নির্বাচিত কবিতা এবং ২০০৯-এ প্রেমের কবিতা। তবে একক কাব্যগ্রন্থ হিসেবে পঞ্চমটি আগ্রহী পাঠকের হাতে আসে চতুর্থ বইয়ের ১২ বছর পরে। এই অস্বাভাবিক দীর্ঘ বিরতিকে কবির স্বেচ্ছাগৃহীত অবসর কিংবা নিঃশেষিত অবস্থা বলে মনে হওয়ার ভ্রম, অনেকটা আশাতীতরূপেই, ভেঙে দেয় আলোচ্য গ্রন্থখানি। কিন্তু কিভাবে?

প্রথমত দেখার বিষয়, ফরিদ কবিরের এই কাব্য তাঁর পূর্ববর্তী বইগুলো থেকে কোনোভাবে পৃথক কিনা। তা কবির জীবন ও কাব্যোপলব্ধির গভীরতা ও বিস্তৃতির প্রশ্নেও বিচার্য হতে পারে। দ্বিতীয়ত লক্ষণীয়, কবির অভিব্যক্তি আগের চেয়ে বেশি আড়ালময় নাকি সহজ। ‘সহজ’ মানে, বলা বাহুল্য, ‘সরল’ নয়, সাবলীল ভাষায় ওজস্বী কথা বলার বিশেষ পারঙ্গমতা। স্মর্তব্য যে, গেলো শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় চল্লিশ বছর ধরে চর্চিত বিবরণধর্মী এলানো কবিতার কবল থেকে, প্রায় একাই, নিজেকে মুক্ত করার সংগ্রাম ফরিদ কবির শুরু করেন তাঁর দ্বিতীয় কাব্য ওড়ে ঘুম ওড়ে গাঙচিল (১৯৮৮) থেকে। কাব্যভাষাকে বাহুল্যমুক্ত করে তোলার প্রথম এই পদক্ষেপে কবিতার আকৃতি অপেক্ষাকৃত ছোট হয়ে আসার সাথে সাথে কবির ভাষা হয়ে ওঠে চিত্রকল্প, রূপক ও প্রতীকখচিত। দ্বিতীয় প্রকারের এই অলংকারময়তা অধিকতর পরিণতি লাভ করে যথাক্রমে ৩য় ও ৪র্থ কাব্য অনন্ত দরোজাগুচ্ছ (১৯৯১) এবং মন্ত্র (১৯৯৯)-এ। ফরিদের প্রেরণায় আশির দশকের অন্য কয়েকজন কবির কবিতাও দৃশ্যত তৈরি করে ভাষিক আড়াল, তাঁদের পূর্ববর্তী ও সমকালীন জনপ্রিয় কাব্যধারাকে তোয়াক্কা না করেই। তাই বলে আশির, এবং, আমাদের আলোচ্য কবির কবিতাও কি অরাজনীতিক হয়ে পড়ে? মানুষ মাত্রই রাজনীতিক জীব বিধায় নিছক নন্দনতাত্ত্বিক চর্চায় পর্যাবসান মানেন নি আশির অন্য অনেক কবির মতো ফরিদ কবিরও। স্বৈরাচারবিরোধিতা এবং এমনকি সাম্যবাদের প্রতি সূক্ষ্ম উন্মুখতাও সাংকেতিকতা লাভ করে তাঁর কবিতায়। আলোচ্য কবিতাকিতাবে, যা বিশেষভাবে লক্ষযোগ্য, ফরিদ কবির নিরীক্ষা কিংবা পরিকল্পিত প্রয়োগ অথবা মেদ প্রভৃতি সমালোচনার যোগ্য সম্ভাব্য উপাদান থেকে প্রায় সম্পূর্ণ মুক্ত রূপেই উন্মীলিত হন। ধনতন্ত্র যে একই সঙ্গে মানুষকে প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন ও প্রেমশূন্য করে এবং বিনষ্ট করে প্রেম ও প্রকৃতিকে, ওঁ প্রকৃতি ওঁ প্রেম এই নির্মম বাস্তবতার মর্মছোঁয়া কাব্যরূপ ও ভাষাশিল্প হয়ে ওঠে। প্রথমেই আমরা নদী সিরিজের কাব্যপ্রবাহে অবগাহনের প্রয়াস পেতে পারি :

(১) নদী-কোলাহল স্তব্ধ করে/বেঁচে আছো তুমি মৎস্যহীন, মানে মৃত/আর, রাজপথে যদি স্থির সূর্য, ডেকো-/আমি তবে রাস্তাকেই নদী করে দেবো (নদী; ওঁ প্রকৃতি ওঁ প্রেম)

(২) নদীর বাতাস নেই, আছে দীর্ঘনিঃশ্বাসের ঢেউ/আর, সেই ঢেউ এসে ধাক্কা খায় প্রধান সড়কে/যে-কোনো রাস্তায় কান পাতলে তুমিও শুনতে পাবে/নদীর ক্রন্দন (নদী-২; প্রাগুক্ত)

(৩) লুণ্ঠনের পর শান্ত হয় দস্যুরাও/তুমি বড় বেপরোয়া, ধর্ষণ শেষেও ক্লান্তিহীন/গিলে ফেলো নদীকুল/পানিতে ভেসে থাকা অমাবশ্যার চাঁদও (নদী-৩; প্রাগুক্ত)

(৪) যে আঙুলে স্পর্শমাত্র শুরু হতো ঢেউয়ের কম্পন/কিছু নেই আজ/নদীকে কবর দিয়ে চলে গেছে সারি সারি রাস্তা/আর, পালতোলা নাও নদী ছেড়ে তোমার শো-কেসে! (নদী-৫; প্রাগুক্ত)

সামন্তীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির অবশেষ-আকীর্ণ এই জনপদে ধনতন্ত্রের বিকাশমানতাও বেমানান। পৃথিবীর অন্য পুঁজিবাদী দেশ-রাষ্ট্র যা করে নি বাংলাদেশের নবীন-প্রবীণ ধনীশ্রেণী তা-ই সম্পন্ন করে। নদী দূষিত, ভরাট ও বেদখল করে। এতৎজনিত বেদনা ভাষিক সাবলীলতায় পাঠকের মর্ম স্পর্শ করে উপর্যুক্ত কবিতাসিরিজের সুবাদে। বিশেষ করে, ওপরের তৃতীয় উদ্ধৃতিটি পাঠে চোখ ভিজে আসে। এ প্রসঙ্গে সমুদ্র কবিতাটি অবশ্য-উল্লেখ্য হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় :

(৫) যদিও তোমাকে ছেড়ে ধীরে ধীরে সকল তরঙ্গ/সরে যাচ্ছে দক্ষিণের দিকে/আর, তুমি ছোবলের প্রকৃত/কৌশল শিখে নিয়ে/ঘাসে ঘাসে আতংক ছড়াও/প্রকাশ্যে বলছি আজ, সমুদ্রই ঠিকানা তোমার/জন্মেছো সমুদ্রগর্ভে-এই কথা লেখা আছে রক্তের লবণে/ওপরে অশান্ত যদি, ডুব দিয়ে দেখো-/সমুদ্র-হৃদয় আজ মানবিক, তোমার চেয়েও (সমুদ্র; প্রাগুক্ত)

মনুষ্যত্ব থেকে খসে-পড়া সভ্যতার স্থপতিদের, কবিতাটির শুরুতেই, কবি ‘ছিলে মাছ, সরীসৃপ হয়েছো এখন’ বলে সম্বোধন করেন। ধনবাদী সভ্যতা মানুষকে তার আদি জন্মস্থল সমুদ্র বা আদি জননীর প্রতিও অকৃতজ্ঞ করে তোলে। এ সুযোগে বলতেই হয়, সমুদ্রর মতো এরকম শতভাগ কবিত্বময় পূর্ণাঙ্গ কবিতা পড়ার সৌভাগ্য অকবিতার জঞ্জাল-ঘেঁষা নিরাশ পাঠককে আশার ঝিলিক উপহার দেয়। মানুষের সার্বিক ঊনতা শনাক্তকরণে, আলোচ্যমান গ্রন্থভুক্ত অন্যান্য কবিতায়ও, ফরিদ কবির, বলতে দ্বিধা নেই, তীব্ররূপে সফল। এই সাফল্য উত্তরোত্তর শক্তিমান হতে থাকে গ্রন্থের ওঁ প্রকৃতি শীর্ষক প্রথমাংশ জুড়ে :

(১) দু’একটি লাল-নীল বৃষ্টির ফোঁটা ফুটে আছে জানালার শিকে/ফোঁটাগুলি এমন জীবন্ত/আসল বর্ষণ, নাকি জানালায় বর্ষণের ছবি/বুঝতে পারো না (বৃষ্টি; প্রাগুক্ত)

(২) বৃক্ষকুল কিছুই ভোলে না/কবে তুমি নদীগর্ভে পিছলে পড়েছো/তোমাকে উল্লেখ করে গোল দুঃখ এঁকে রাখে মনে (গাছ; প্রাগুক্ত)

(৩) কবে তুমি লিপ্ত হয়েছিলে/মনুষ্যবিরোধী যুদ্ধে-সব কথা লেখা আছে/গাছের হৃদয়ে/যে কারণে অমসৃণ বৃক্ষের বাকল (গাছ-২; প্রাগুক্ত)

(৪) তোমার চাইতে উঁচু নয় কোনো গর্বিত পাহাড়ও/তুমি ছোট হতে হতে তাকে এই উচ্চতা দিয়েছো (পাহাড়; প্রাগুক্ত)

(৫) মানুষেরা কীটের সমষ্টি/মরে গেলে তারা সব জ্যান্ত হয়ে ওঠে (পোকা; প্রাগুক্ত)

(৬) বলি আজ শোনো-ঘুণপোকারাই অধিক মানুষ/তাদের দাঁতের নিচে নিরাপদে নিদ্রা যায় অপর ঘুণেরা। (ঘুণপোকা;প্রাগুক্ত)

(৭) তবে, মানো আজ/এই বনে ঘাসেরাই প্রকৃত শাসক/আকাশ-পাতাল আজ পূর্ণ হোক তাদের শাসনে (ঘাস; প্রাগুক্ত)

(৮) বলছি তোমাকে শোনো, পিঁপড়ারা প্রকৃত মানুষ/আর, তুমি স্বভাব বদলে আজ হয়ে গেছো চিল (পিঁপড়া; প্রাগুক্ত)

(৯) আজ বলি, তোমার চাইতে তুচ্ছ নয় কোনো কাকও/তুমিই বরং দিন দিন কালো হয়ে যাচ্ছো…(কাক; প্রাগুক্ত)

(১০)    পাতায় পাতায় দেখো লেখা আছে কাকের কাহিনী/কা কা স্বরে ডেকে যাচ্ছে নিসর্গ পর্যন্ত/তোমাদের জন্য আজ হাহাকার করছে কাকেরাও! (কাক-২; প্রাগুক্ত)

(১১) মানুষের ঠোঁট আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে যাচ্ছে…/খিদে পেলে মনুষ্যমাংসেও তারা কামড় বসায় (শকুন; প্রাগুক্ত)

(১২) মানুষ তো সামান্য অভাবও সহ্য করতে পারে না/সহ্য কম পোশাকেরও, নিচে পড়ে থাকে এলোমেলা/দীর্ঘশ্বাসে পূর্ণ হয় কাঠের দেরাজ (মানুষ; প্রাগুক্ত)

উপর্যুক্ত ৪ এবং ৬ থেকে ৯ সংখ্যক কবিতাংশসমূহে, এমনকি দশম উদ্ধৃতিতেও, কবির প্রায় অভিন্ন বাগভঙ্গি পুনরুক্তি মনে হলেও দুঃখ-কাতর চিত্তে মসৃণ অথচ প্রখররূপে, নৈসর্গিক প্রেক্ষাপটে, মানুষের নানা মাত্রিক বামনত্ব চিহ্নিতকরণের এমন দৃষ্টান্ত আমাদের কবিতায় দুর্লভ। কেবল তাই নয়, কৃপণ হয়ে বললেও, এ অনস্বীকার্য যে, প্রথম, তৃতীয় ও দ্বাদশ রচনাংশগুলোর কাব্যিকতার তুলনা বহুকাল যাবৎ বাংলাদেশের কবিতায় মেলে না। এভাবে, বলা যায়, কবির ওই নীরবতার একযুগ তাঁর জীবন ও কাব্যানুধাবনকে দান করে নবতর বিস্তৃতি। নির্বিশেষের প্রতি তাঁর আগের কম-বেশি ঝোঁক বদলে যায় বিশেষ কিছু এলাকায় সক্রিয় বিচরণের, পূর্বাপেক্ষা স্পষ্টতর, অঙ্গীকৃত প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গের প্রশ্নে, কাব্যিকতায়। তাঁর অনুভব-উপলব্ধির গভীরতাও প্রাগুক্ত নৈঃশব্দ্যহেতু কমে না।

এবার আমরা আলোচ্যমান গ্রন্থের অপর ভাগ ওঁ প্রেম-এও ফরিদ কবিরের অক্ষুণ্ন ও ত্বরান্বিত কবিত্বের নমুনা যাচাই করে নিতে পারি :

১. […]তোমার রঙিন ঘ্রাণ টের পায় এতো দূরে গাছের পাতাও/আজ বুঝি-রূপে নয়, ঘ্রাণে আছে সকল রহস্য/এর টানে ফুলের কাছেই/বারবার ফিরে যায় সকল মৌমাছি/নিজেকেও মৌমাছি বলেই মনে হচ্ছে আজ/ঘ্রাণ থেকে খুলে নিচ্ছি অসামান্য মধু…(ঘ্রাণ; প্রাগুক্ত)

২. সকলেই চায়, স্বপ্ন হোক তার চেয়ে কিছুটা বড়/আমি চাই না/আমার ওপর কেউ প্রভুত্ব করুক (স্বপ্ন; প্রাগুক্ত)

৩. তোমাকে ছিনিয়ে নিতে এখন তৎপর/ভয়ংকর আলপিন, ঘাতক ছুরিও…/গোপনে তোমাকে বলি-/তোমার একটা ফোঁটাও আমি কাউকে দেবো না! (খুন; প্রাগুক্ত)

উপর্যুক্ত প্রথম কবিতাংশে কবির নিজেকে ‘অসামান্য মধু’গ্রাহী মৌমাছি ঘোষণার মধ্যে নতুনত্ব বা বৈচিত্র্য কোনোটিই নেই। তবে শুরুতে প্রিয়ার ‘রঙিন ঘ্রাণ’ গাছের পাতাও টের পায় মর্মে সংবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই কবির নিজস্ব দৃষ্টিকোণের অভিনবত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তাই ‘আজ বুঝি-রূপে নয়, ঘ্রাণে আছে সকল রহস্য’ ফরিদ কবিরীয় এই বাগভঙ্গির (তৃতীয় কাব্য থেকে তাঁর এমন প্রবাদপ্রতিম দৃপ্তকণ্ঠ কাব্যোচ্চারণ পরিলক্ষিত) পুনরাবৃত্তি সত্ত্বেও ঘ্রাণেই সকল রহস্য ধৃত- এ সত্য জানামাত্রই নারীর দেহ আর মুখ্য হয়ে ওঠে না। শীর্ষে চলে আসে তার মানবিক সৌরভ। অব্যবহিত পরের স্তবকে কবি মৌমাছি হিসেবে সক্রিয় হয়ে উঠলেও নারীকে কামস্বার্থের ঊর্ধ্বে আগেই প্রতিষ্ঠিত করে দেন। তবে তাই বলে তাঁর প্রেম আবার অবাস্তব থাকে না মোটেও। বৃক্ষকুলকেও প্রিয়ার সৌগন্ধের গ্রাহকত্ব! দেয়ার মধ্য দিয়ে কবি তাঁর প্রেমকে নিসর্গ অব্দি পরিব্যাপ্ত করে একে প্রকৃতির ধরনেই অনিবার্য করে তোলেন। প্রেমে ও প্রকৃতিতে কোনো ভেদরেখা টানেন না কবি। পুঁজিবাদের কয়েকটি সহায়ক শক্তির মধ্যে একটি হচ্ছে বিস্ময়কর প্রযুক্তি যার জোরে এই বিষম অর্থব্যবস্থা টিকে আছে। এই প্রযুক্তির আধিপত্যে শহুরে মানুষ এখন প্রকৃতি বা নিসর্গবিচ্ছিন্ন। আর, নাগরিক ও গ্রামীণ সকল জনমনিষ্যিই উল্লিখিত বৈষম্যহেতু প্রেমহীন পণ্যপ্রায়। এই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ে যাঁর কাব্যে মানবজীবনকে ভাষা দেয় প্রকৃতি আর নিসর্গকে বাক্সময় করে মনুষ্যজীবন। ফরিদ কবির এই পারস্পরিকতার ক্ষতবিক্ষত রূপটি আঁকেন মানুষের প্রাগুক্ত বিযুক্তি, নির্মমতা ও ক্ষুদ্রত্বের বিপ্রতীপ কোণগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে, মৌলিক মমতা, বেদনা ও সৌন্দর্যচেতনায়। এ ছাড়াও, তিনি প্রকৃতি ও প্রেমকে ‘ওঁ’ বলে স্মরণ করেন কেন? প্রকৃতির তুলনায় মানুষের  বামনত্বের অর্থ কি তাহলে এই যে, প্রেমের শক্তিতে মহীয়ান মনুষ্যজাতির চেয়েও প্রকৃতি বা নিসর্গ ঢের মহত্তর? এবং, মানুষের যে ভালোবাসা জননীপ্রকৃতি/নিসর্গের প্রতি সক্রিয় নয় সেই কাঙ্ক্ষিত প্রেমও এই জননীর মতোই আরাধ্য?

প্রার্থনার এই ভাষাও কবির চিন্তার ভিন্নতা, বলতেই হয়, প্রমাণ করে। এ জন্যেও হয়তো, মানুষের চেয়ে স্বপ্নের বড়ত্ব তিনি মানতে অপারগ। ওপরের দ্বিতীয় উদ্ধৃতিতে, সামাজিক বিষমাবস্থাহেতুই, ওই ‘বড় স্বপ্নের’ সম্ভাব্য ‘প্রভুত্ব’ বিষয়ে নিজের অসমর্থন প্রকাশ করেন। এই প্রতীতীও নতুন। মানুষের ওপর প্রভুত্ববিস্তারী ‘বড় স্বপ্ন’ও তাই অপ্রত্যাশিত। এই না-চাওয়া রাজনীতিকও বটে। কেননা  প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইয়োরোপের করুণ পরিণতির স্মৃতি এতে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে, সেই আশির দশক পর্যন্ত তীব্রভাবে সমাজতন্ত্রের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলো এমন পাঠকের স্মৃতিতে, ঝিলিক দিয়ে ওঠে। কবির আশ্চর্য মানব-মানবীপ্রেম, বলা বাহুল্য, সেইসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে প্রেম ও প্রকৃতিকে একাকার ভাবার একেবারে নতুন দৃষ্টান্ত, বোধ করি, ফরিদ কবিরের ওঁ প্রকৃতি ওঁ প্রেম গ্রন্থের শেষ কবিতা খুন। কবিতাটির শুরুতেই তিনি বলেন : করো চলাফেরা ধমনীতে, উপশিরায়, শিরায়…/এই স্রোত চলুক নির্জনে/আমাকে রঞ্জিত করে আপাদমস্তক তুমি বয়ে চলো। প্রেমের মানবীকে কবিমানবের নিজের জৈবপ্রকৃতির রক্তরূপ বিস্ময়কর অংশ জ্ঞানের এই উদাহরণ, যতদূর জানি, বাংলা কবিতায় নেই। ভয়ঙ্কর আলপিন ও ঘাতক ছুরি এই প্রেম ছিনিয়ে নিতে উদ্যত, তাও কবি আমাদের জানান। কিন্তু পরিশেষে পাঠককে কোনো তুলনা-প্রতিতুলনার সুযোগ না দিয়েই বলেন : তোমার একটা ফোঁটাও আমি কাউকে দেবো না! এমন দুর্মর প্রেম এতো সচ্ছন্দে, বিরল উচ্চারণে প্রকাশের জন্যেই কি তিনি বারোটি বছর কাটিয়ে দেন অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যে?

এ ছাড়াও, শব্দের অর্থোত্তর ব্যঞ্জনা তিনি প্রবাহিত-সঞ্চারিত করেন অনন্ত অবধি, যখন, বইয়ের শুরুতেই, উৎসর্গ পত্রে/কাব্যে তিনি আমাদের বিস্মিত-চমকিত করে অসামান্যরূপে জানিয়ে রাখেন : বৃষ্টিকেও আমার মানুষ বলেই মনে হচ্ছে, সে যখন ঝরে/মনে হয়, মাটি নয়; ভিজে যাচ্ছি আমিই, তোমার ফোঁটায়, স্পর্শে…।

 

 

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close