Home শ্রদ্ধাঞ্জলি গদ্যে পদ্যে কথাসাহিত্যে বেলাল চৌধুরী >> শামসুর রাহমান / শক্তি চট্টোপাধ্যায় / মনীন্দ্র গুপ্ত / তসলিমা নাসরিন / তুষার রায়

গদ্যে পদ্যে কথাসাহিত্যে বেলাল চৌধুরী >> শামসুর রাহমান / শক্তি চট্টোপাধ্যায় / মনীন্দ্র গুপ্ত / তসলিমা নাসরিন / তুষার রায়

প্রকাশঃ April 27, 2018

গদ্যে পদ্যে কথাসাহিত্যে বেলাল চৌধুরী  >> শামসুর রাহমান / শক্তি চট্টোপাধ্যায় / মনীন্দ্র গুপ্ত / তসলিমা নাসরিন / তুষার রায়
0
0

গদ্যে পদ্যে কথাসাহিত্যে বেলাল চৌধুরী  >>

যাঁদের লেখা প্রকাশিত হলো >> শামসুর রাহমান / শক্তি চট্টোপাধ্যায় / মনীন্দ্র গুপ্ত / তসলিমা নাসরিন / তুষার রায়

 

শামসুর রাহমান >> কবি বেলাল, ব্যক্তি বেলাল

তরুণ কবিকর্মী ও সংস্কৃতিসেবীদের মুখে মুখে ফেরে যে কবির নাম তিনি বেলাল চৌধুরী। আজ গার্হস্থ্যের তাঁবুতে আশ্রয় নিলেও একসময় প্রথাবিরােধী জীবনযাপনের মাধ্যমে তিনি এক কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। কলকাতা ও ঢাকার সাহিত্যিক আড্ডাতে তাে বটেই এমনকি একাধিক বাংলা উপন্যাসেও একটি স্থান দখল করে নিয়েছেন বেলাল চৌধুরী। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার আত্মপ্রকাশ উপন্যাসে একটি বিশিষ্ট চরিত্র হিসেবে বেলালকেই নির্বাচন করেছিলেন।
শুধু প্রথাছুট জীবনযাপনের জন্যেই খ্যাত নন তিনি, কৃত্তিবাসের মতাে একটি উজ্জ্বল চমক সৃষ্টিকারী পত্রিকার সম্পাদনা করে এবং সর্বোপরি কিছু উৎকৃষ্ট কবিতা লিখে তিনি জমা করে নিয়েছেন প্রচুর সুকৃতি। বেলাল চৌধুরী কখনাে খুব বেশি লেখেন না, কিন্তু যখনই লেখেন তখনই তিনি কাব্যানুরাগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি কখনাে কবিতার বাঁধা সড়কে হাঁটেন না, একটু অন্যরকম লিখতে চেষ্টা করেন তিনি এবং তাঁর কবিতায় কথ্যচ্ছলে ফুটে ওঠে স্বকালের বিচূর্ণিত রূপ, তার মর্মমূল-ছেড়া আর্তনাদ।

সূত্র : বেলাল চৌধুরীর জলবিষুবের পূর্ণিমা (বইঘর, ১৯৮৫) গ্রন্থের শেষ প্রচ্ছদ থেকে

 

 

শক্তি চট্টোপাধ্যায় >> প্রসঙ্গত
ভারতবর্ষ খুবই বড়াে।
বেলাল চৌধুরী-সুদ্দু বেলালের ভারতবর্ষে লুকিয়ে থাকার কোনও প্রয়ােজনই ছিল না। সে, নাকি, জাপানে ট্রলি-বােঝাই এ্লিগেটর নিয়ে আসছিল, সমুদ্রে ভাসিয়ে। তারপর, ভাসমান এ্লিগেটর জলে ভেসে গেছে। একাকী বেলাল আছে। সমুদ্রবেলায়, পড়ে!
সাধারণত, কলকাতায় বৃষ্টি শুরু হয় জুন ও জুলাই।
যাহােক-তাহােক করে বেলাল উঠেছে।
পুবের সূর্যের মতাে। অভিসন্ধি! কোনাে কিছু নেই।
বেলাল বালক শুধু হলুদ নদীর তীরে…
তারপর, বেলা গেছে। শাল সেগুনের ছায়া
বেলালকে নিয়েছে সর্বদা।

বেলা গেছে, খেলা গেছে, প্রখর বাতাস বেগে ব’হে
কেচেন্দা বাঁধের কাছে, আদিবাসী মহল্লায় নিয়ে গেছ
বেলালকে-আমাকে।

শান্তি, শান্তি, শান্তি বারােমাস—এভাবেই।

সূত্র : শক্তি চট্টোপাধ্যায় ॥ গদ্যসংগ্রহ ৪ ॥ দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।

 

মণীন্দ্র গুপ্ত >> ষাট-দশকের কবিতা, বেলাল চৌধুরীর কবিতা

 

খােলামেলা বেলাল চৌধুরীর আত্মপ্রাধান্য বা আত্মকরুণা কিছুই ছিল না। আত্মজীবন বলতে শুধু নিজের দিনগুলি। সেই দিনগুলিকেই বর্ণনা করেছেন বেলাল—সেই সময়স্ফোটের বাইরে কোনাে মর্মকথা, কোনাে নতুন কথা বা কোনাে বড় কথা বলেন নি। যাযাবর বেলালের যৌবনউজ্জ্বল, প্রীতিরঙিন দিনগুলাে ছড়িয়ে আছে জাপানে, কলকাতায়, অন্য নদীতীরে, অন্য সমুদ্রপারে কখনাে অগাস্ট চন্দ্রাতপের নীচে, সবুজ চা খেতে খেতে জাপানি আলাপের সৌগন্ধ্যে :

১৯৬৪-র শেষাশেষি টোকিওতে হবে অলিম্পিক
ওসাকাতে ইন্ডস্ট্রিয়াল ফেয়ার, নারাতে বিউটি কনটেস্ট
অটোমােবাইল রেস হবে, জুজুৎসু হবে কিয়ােতাে… তখন এসাে কিন্তু
সবুজ চা খেতে খেতে অগাস্ট চন্দ্রাতপের নীচে চা-ঘরে বসে
পথের ধারে আজো কি ফোটে ঘনলাল চেরিফুল
মার্চে হারিকিরি করে যুবকযুবতীরা…
পশ্চিমে বাঁশবনে কি সূর্য ডােবে…
প্রজাপতি উড়ে উড়ে বসে নাকি চার্চের ঘণ্টায়…

কখনাে অন্য দেশের কোনাে টেনিসকোর্টর চটুল অপরাহ্র :

সুন্দর ওই অপরাহে ঘাসের নিবিড় সবুজ লনে
মেতে উঠেছে অনিন্দ্যকান্তি কিছু যুবাপুরুষ
খেলছে টেনিস নিবিড় সবুজ ঘাসের কোর্টে
তাদের সুঠাম মাংসপেশীর
সমর্থ হিল্লোলে ক্রমাগত নেটের এপার-ওপার
করছে একটি চটুল রােমশ ছােট্ট বল
তাদের হাতের শানানাে র্যাকেটে বেজে ওঠে
টপাটপ শব্দের মঞ্জরী…

সূত্র : মণীন্দ্র গুপ্ত ॥ দ্রাক্ষাপুঞ্জ, শুড়ি ও মাতাল ॥ অবভাস, কলকাতা।

 

তসলিমা নাসরিন >> আনন্দধারা

বেলাল চৌধুরী ভারতীয় দূতাবাসে ভারত বিচিত্রা পত্রিকাটি সম্পাদনার কাজ করতেন। ভারত বিচিত্রায় আমার বেশ কিছু কবিতা তিনি ছেপেছেন। দেখা হলেই লেখা চান। দেখা প্রায়ই হয়, আরমানিটোলায় থাকাকালীন মাঝে মাঝে যখন করার কিছু থাকত না, তার অফিসে গিয়ে গল্প শুনে সময় কেটেছে আমার। শান্তিবাগে অশান্তির সময়গুলােতেও অনেক সময় গিয়েছি ভারত বিচিত্রায়। বেলাল চৌধুরী আড্ডা দিতে পছন্দ করেন। ঝুড়ি ঝুড়ি গল্প আছে তাঁর, পছন্দের কোনও শ্রোতা পেলে ঝুড়ি উপুড় করেন। পুরােনাে আমলের সাহিত্যজগতের কথা, কলকাতার সাহিত্যরথীদের ছােটখাটো ব্যক্তিগত গল্প খুব রসিয়ে-মজিয়ে পরিবেশন করেন। সুস্বাদু গল্প সব। দীর্ঘকাল কলকাতা ছিলেন বলে কলকাতার সাহিত্যিকদের সঙ্গে তার বেশ বন্ধুত্ব। কলকাতার কে কেমন, কে পাগল, কে ছাগল, কে উদার, কে উদাস জানতে জানতে, কলকাতার এ গলি ও গলির নানারকম গল্প শুনতে শুনতে মনে মনে কতবার যে কলকাতায় পৌঁছে গিয়েছি! বেলাল চৌধুরী কবিতা লেখেন কিন্তু তাঁর কবিতার চেয়ে বেশি ভালাে লাগে তার কথা। যে কোনাে আড্ডা। জমিয়ে তােলার অসম্ভব ক্ষমতা রাখেন তিনি। খুব একাকী মানুষ বেলাল চৌধুরী। খুব প্রাণখােলা। খুব আন্তরিক। খুব উদাসীন। খুব কবি। তিনি আমার দাদা-বন্ধু হয়ে গেছেন অল্প কদিনের মধ্যেই।।

সূত্র : তসলিমা নাসরিন ॥ ॥ চারদিক, ঢাকা ॥ ১৯৯৫।

 

কথাসাহিত্য চরিত্র > বেলাল চৌধুরী

তুষার রায় >> শেষ নৌকা

স্থানীয় জেলেদের কাছ থেকে প্রকাণ্ড একটা ক্যানাে বা নৌকা আমরা ভাড়া নিয়েছি। ন’শ বােতল মদ দিয়েছেন মহামান্য মটরুমিয়া তার নিজস্ব ডিস্টিলারির। লম্বা কাগজের লিস্টটার ওপর চোখ বােলাতে বােলাতে উপরােক্ত তথ্য জানালাে বেলাল চৌধুরী। বাংলাদেশের সাহিত্য-কবিতার রাখাল বা বাউল এই যুবকটি আরাে জানালাে যে দরকারি অন্যান্য আর সমস্ত কিটস যেমন খাদ্য ও ওষুধপত্র, মাছধরার সাজসরঞ্জাম, মুভি ক্যামেরা ইত্যাদি সবই পাওয়া বা জোগাড় করা গিয়েছে। এখন কেবল ভেসে পড়া। সম্মােহন শাকসেনা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে ঝুঁকে বললাে, আপনাদের এই অপূর্ব ও অচিন্ত্যনীয় প্রােগ্রামে আমরাও অংশগ্রহণ করতে চাই।
বেলাল টেবিলের ওপরে রাখা হুইস্কির বােতলটায় তীব্র একটা চোঁ মেরে মাথা ঝাঁকিয়ে বললাে- কিন্তু আমাদের কয়েকটা শর্ত আছে- সেগুলাে মানলে তবেই আপনি আসতে পারেন আমাদের সঙ্গে।
যেমন—সপ্রশ্ন সম্মােহনের রক্তাভ গালে গাঢ় উত্তেজনা।
প্রথমত আপনাকে একটা বন্ড সই করতে হবে, সিগারেটে লাইটার ছুঁইয়ে বলতে লাগলাে বেলাল চৌধুরী। আমাদের এই যাত্রা হচ্ছে শেষ—অন্তিম যাত্রা—এ পৃথিবীর শেষ শিল্প কবিতার শেষ অভিমান বা অভিযান। আমাদের দলে থাকছেন পাঁচজন মহারথী, বিজ্ঞান প্রযুক্তিশিল্প চারু ও কারুবিদ চিকিৎসক ও কবি সাহিত্যিকরা—আমাদের শেষ ‘ক্যানাে বা নৌকা যেন নােয়ার নৌকার মতাে— তবে হ্যাঁ যদি আপনারা স্বেচ্ছায় আমাদের সঙ্গে যেতে চান তাে আপত্তি নেই তবে ওই বন্ডটি সই করতে হবে। বেলাল চৌধুরী তার কথা শেষ করে তাকিয়ে রইলাে সম্মােহন আর রাজেশের দিকে।
বেশ আমরা রাজি—বলে স্থিরচোখে বেলালের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাে, যদি এই অভিযান সম্পর্কিত ব্যাপারে কিছু আর্থিক সাহায্যের প্রয়ােজন হয় তাহলে কিছু কনট্রিবিউটও করতে পারি।
বেশ, কাল সন্ধেবেলা আসুন এখানে। পাকাপাকি সেটল হয়ে যাবে তখন, বলে বেলাল চৌধুরী উঠে দাঁড়ালাে, বাসুদেব রবীন্দ্র আদি আর যারা বসেছিল তারাও উঠে দাঁড়ালাে।–সম্মােহনের দিকে তাকিয়ে বাসুদেব বললাে, চলুন তাহলে সম্মেলনের মণ্ডপে যাওয়া যাক প্রচণ্ড প্রােগ্রাম আছে আজকে।
সূত্র : তুষার রায় ॥ শেষ নৌকা ॥ প্রথম প্রকাশ- ১৯৭১, প্রতিভাস, কলকাতা।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close