Home অনুবাদ গল্পকাহিনির শিল্প নিয়ে ভি. এস. নাইপলের সাক্ষাৎকার

গল্পকাহিনির শিল্প নিয়ে ভি. এস. নাইপলের সাক্ষাৎকার

প্রকাশঃ December 26, 2016

গল্পকাহিনির শিল্প নিয়ে ভি. এস. নাইপলের সাক্ষাৎকার
0
1

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জোনাথান রোজেন ও তরুণ তেজপাল

অনুবাদ : খালেদ হামিদী

প্রশ্ন : পশ্চিমের বিস্তীর্ণ ইতিহাস আপনার আত্মজীবনীর এতোটা জুড়ে আছে দেখে আমরা থমকে যাই। আপনার কি এই বোধ কাজ করে যে নিজের সম্পর্কে লেখা মানে বৃহত্তর বিশ্ব নিয়েই লেখা? আপনি কি এই সম্পর্ক অর্জনের জন্যে কঠোরভাবে চেষ্টা করেছেন নাকি একে প্রাকৃতিকভাবেই প্রকাশিত দেখেছেন?
নাইপল : প্রাকৃতিকভাবেই তা প্রকাশিত হওয়ার ছিলো। কেননা ওটাই শেখা, নয় কি? তুমি যা শিখেছো তা অস্বীকার করতে পারো না, তোমার ভ্রমণগুলো তুমি অস্বীকার করতে পারো না, তোমার জীবনের প্রকৃতিকে তুমি অস্বীকার করতে পারো না। আমি একটা ছোট জায়গায় বেড়ে উঠি এবং সেই স্থান ত্যাগ করি যখন আমি তরুণ আর প্রবেশ করি বৃহত্তর বিশ্বে। এই অভিজ্ঞতা তোমাকে নিজের লেখায় ধারণ করতে হবে। আমি কি বলছি তুমি বুঝতে পারছো?
প্রশ্ন : আমি বুঝি না, কিন্তু, একটু ভিন্ন কিছু ব্যাপারে আমি অবাক হচ্ছিলাম।
নাইপল : আবার চেষ্টা কর। পুনরায় প্রকাশ কর। ওটাকে সহজ এবং সংহত করে তোলো যাতে আমরা আলাপ এগিয়ে নিতে পারি।
প্রশ্ন : আমার ধারণা, আপনি ছেড়ে যেতে চেয়েছিলেন এমন এক স্থান থেকেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তা ঘুরে ঘুরে আসে যত বেশি আপনি ওই ভূখণ্ডকে পাঠ করেন তত বেশি আর সেখানেই ফিরে যান, পশ্চিমের কাছে যার গুরুত্ব ঢের। আপনি ত্রিনিদাদকে ছোট জায়গা বলেন, কিন্তু আপনিই লিখেছেন কলম্বাস ভূভাগটি চেয়েছিলো, র‌্যালেইফ চেয়েছিলো…পশ্চিমের লালসার বস্তু ও বড় বিষয় ত্রিনিদাদ প্রসঙ্গে আপনি কখন সচেতন হয়ে ওঠেন?
নাইপল : আমি দীর্ঘকাল ধরে লিখছি। বেশির ভাগ সময়েই জনগণ আমার কাজের ব্যাপারে আগ্রহী থাকেনি। তাই আমার আবিষ্কারগুলো ব্যক্তিগত থেকে যায়। যদি তেমন ঠিক হয়েও থাকে, তা নিছক কাকতালীয়। আমি সে বিষয়ে সচেতন ছিলাম না। সেই সাথে এও লক্ষণীয় যে আমার সেই কাজ রাজনীতিক কিংবা বিতর্কিত ছিলো না। ১৯৫০-এর দশকে লেখা সেই বিষয় এখন মৃতই বলতে হয়। একটা পরিস্থিতির সত্যকে অবশ্যই সবসময় দেখার চেষ্টা করতে হবে, যে-পর্যবেক্ষণ কোনো বিষয়কে বৈশ্বিক করে তোলে।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন পৃথিবী এখন মনস্তাত্ত্বিক স্থানচ্যুতির দিক থেকে আগের তুলনায় অধিকতর সক্ষম?
নাইপল : এখন তো খোলামেলা অবস্থা। জনমণ্ডলীর মধ্যে এখনো বিযুক্ত সাংস্কৃতিক এককের ধারণা বিদ্যমান যা আসলে কখনোই ছিলো না। সব সংস্কৃতিই চিরকাল মিশ্রিত হয়ে পড়েছে। রোমের দিকে তাকাও, প্রাচীন দেশ এত্রুরিয়া সেখানে ছিলো এবং রোমের চারদিকে ছিলো শহর আর প্রদেশগুলো। অথবা দেখো ইস্ট ইন্ডিস, ভারতের মানুষ আরেক ভারতের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে, তারপর সেখানে মুসলিম প্রভাব…মানুষ এসেছে আর গিয়েছে সর্বকাল। পৃথিবী সবসময় এই চলাচলের মধ্যেই থেকেছে।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন আপনি সেই মিশ্রিত পৃথিবীর আদর্শ হয়ে উঠেছেন?
নাইপল : আমি তেমন মনে করি না। আমি সবসময় আমার বই নিয়েই ভাবছি। তুমি একটি বই লেখার জন্যেই লেখালেখি করছো, সেই প্রয়োজন পূরণের জন্যেই লিখছো, জীবন্ত থাকার জন্যে, লিখছো পরিচ্ছন্ন একটা রেকর্ড রেখে যেতে, তোমার বিবেচনায় অসম্পূর্ণ এমন কিছুকে বদলাতে এবং একে গুণান্বিত করতে। আমি কারুরই বক্তা নই। আমি মনে করি না যে যে-কেউ আমাকে চাইবে আর আমি গণবক্তা হয়ে উঠবো।
প্রশ্ন : বিশ্ব সম্পর্কিত প্রসারিত ধারণা নিয়ে কি আপনি বেড়ে উঠেছেন, ওয়র্ল্ড (বিশ্ব) শব্দের মধ্যে ধরা আছে যে ধারণা?
নাইপল : আমি সবসময় জানতাম, বিশাল পৃথিবী রয়েছে বাইরে। আমি যা-কিছুর মধ্যে বেড়ে উঠি, সেই কৃষিজীবী ও ঔপনিবেশিক সমাজকে গ্রহণ করতে পারিনি। তুমি দেখবে ভগ্নোদ্যম অথবা সীমাবদ্ধ কিছু বেশিদিন কেউ নিতে পারো না।
প্রশ্ন : লেখালেখি কেন সবসময় আপনার জীবনের কেন্দ্রীয় প্রয়োজন, বা প্রতিটি বিষয়ের অগ্রিম কৌশল হয়ে ওঠে?
নাইপল : লেখালেখিকেই আমি লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছি, অথবা, বরং আমি আমার বাবাকেই দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করি। তিনি একজন লেখক ছিলেন, একজন সাংবাদিক। কিন্তু তিনি গল্পও লেখেন। তাঁর লেখালেখির কাজটা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঠেকে। আমার বাবা তাঁর গল্পগুচ্ছে আমাদের হিন্দু পটভূমি তুলে ধরেন। এই পটভূমি খুবই নির্মম। তাঁর গল্প পড়ে আমিও বুঝতে পারি, তা ছিলো খুব নিষ্ঠুর এক পৃথিবী। তাই আমি এই ধারণা নিয়েই বেড়ে উঠি যে, নিজেদের অভ্যন্তরে দৃষ্টি দেয়া এবং বাইরের শত্রুকে সর্বদা দোষারোপ না করাই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আমাদের অবশ্যই নিজেদের এবং নিজস্ব দুর্বলতাগুলো পরীক্ষা করে দেখা দরকার। আমি এখনো তা বিশ্বাস করি।
প্রশ্ন : আপনার লেখার পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু বলেন?
নাইপল : আমি লিখি ধীরে।
প্রশ্ন : সবসময়?
নাইপল : তরুণ বয়সে দ্রুত লিখতাম, দৈনিক প্রায় এক হাজার শব্দ। এখন আর পারি না। আজকাল, একটা ভালো দিনে, আমি তিন শ (৩০০) শব্দের মতো লিখি, খুবই কম বলতে পার।
প্রশ্ন : কখনো লেখেন না, এমন কি হয়?
নাইপল : প্রায় সর্বদাই, বেশির ভাগ দিনই তো এমন হয়।
প্রশ্ন : লেখালেখিবিহীন দিনকে মৃত্যুর নিকটতর দিবস বলে উল্লেখ করেছিলেন হেমিংওয়ে।
নাইপল : আমি অতটা রোমান্টিক নই। আমি বরং রাগান্বিত বোধ করি। কিন্তু আমি এখন যথেষ্ট জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ, তাই
এটা বুঝতে পারি যে সব ঠিক হয়ে যাবে। লেখা যদি আমার মাথায় থাকে ক্রমান্বয়ে তা বেরিয়ে আসবেই। এটা প্রকাশের সঠিক পথ খোঁজে।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন ভাষাই একমাত্র বাহন হওয়া উচিত এবং তা, নৃত্য আর অত্যুজ্জ্বল আলোকে ঝলসে দেয়া, জন আপডাইক যেমন মনে করেন, ব্যাপারটা কি তাই?
নাইপল : বেশ, জনগণ যা চায় তাদের তা করতেই হয়। আমি চাই আমার গদ্য স্বচ্ছ হয়ে উঠবে। আমি চাই না পাঠক আমার ওপর পতিত হোক। শুধু চাই পাঠক দেখবেন কী বর্ণনা করার জন্যে আমি কী বলছি। আমি চাই না পাঠক বলুক, ওহ, কি যে ভালো, কতো যে সুলিখিত! কেননা তা হবে আমার ব্যর্থতা।
প্রশ্ন : তাহলে প্রকাশিত ধারণাগুলো জটিল হলেও গদ্য সুশৃৃঙ্খল?
নাইপল : হ্যাঁ, সরল। অর্থহীন বাক্য বা অপ্রচলিত শব্দে পূর্ণ বাক্যও অবশ্যই আমি ব্যবহার করবো না। তোমাদের চারিদিকে অর্থহীন বাক্য, দৈনিক পত্রিকায়, বন্ধুদের আড্ডায়, সর্বত্র। এবং, (এতে) লেখক হিসেবে তুমি খুব অলস হয়ে উঠতে পারো। তুমি অলসভাবে শব্দের ব্যবহার শুরু করতে পারো। আমি চাই না এমন হোক। শব্দ মূল্যবান, আমি মূল্যবান করে তা ব্যবহার করতে পছন্দ করি।
প্রশ্ন : ইংরেজি সাহিত্যের জন্যে কি আপনি হতাশা বোধ করেন?
নাইপল : না, আমি এর জন্যে হতাশ নই। অংশত এর এখন কোনো অস্তিত্ব নাই। কেননা আগে এর জন্য যত কাজ করা হয়েছে এখন তা করা খুবই কঠিন। ইংল্যান্ডে এর অবস্থা এখন খারাপ। এটা টিকে থাকার জন্যে শেষ হয়েছে। কিন্তু অতীতে টিকেছিলো বেশি। এতে দুঃখ করার বোধহয় কোনো কারণ নাই।
প্রশ্ন : ভারত থেকে প্রকাশিত লেখকদের অবস্থাটা কেমন? তাঁদের সম্পর্কেও কি আপনার একই অনুভূতি?
নাইপল : আমি এ-বিষয়ে গবেষণা করিনি। কিন্তু মনে হয়, ভারতে অনেক সাহিত্য রচিত হবে। অনেক শতাব্দী ধরে ভারতের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন ছিলো না। এর ছিলো ধর্মীয় আচারসর্বস্ব সমাজ, লেখার প্রয়োজন এর ছিলো না। কিন্তু এরকম বিশুদ্ধ আচারপ্রধান জীবন থেকে নির্গত সমাজ যখন শিল্প, অর্থনীতি ও শিক্ষায় বিকশিত হতে আরম্ভ করে, তখন জনগণের বুঝে ওঠার প্রয়োজন শুরু হয় যে কী ঘটছে। জনমণ্ডলী তখন লেখকদের দিকে ফেরে এই ভেবে যে লেখকেরা তাদের পথ দেখাতে, উৎসাহিত করতে ও কর্মোদ্দীপ্ত রাখতে সক্রিয় থাকবে। আমার ধারণা, ভারতে এখন বিপুল পরিমাণ সাহিত্য রচিত হতে থাকবে। ভারতের বর্তমান অবস্থাটাই এটা সম্ভব করে তুলবে।
প্রশ্ন : এখনো সবসময় আপনি ক্রোধের সরলীকরণকে প্রতিরোধ করে যাচ্ছেন, উপনিবেশবাদ অথবা কালো দাসেরা শাদা প্রভুদের দোষারোপ করে। আপনার জন্যে সহজ কোনো খলনায়ক নাই।
নাইপল : অবশ্যই তেমন স্বচ্ছন্দ খলনায়ক নাই। বলার নিরাপদ কিছু আছে। সেগুলো উপকারী নয়, যে-কোনো যুক্তি অথবা সিদ্ধান্তের সাথে যুক্ত হয় না। সেগুলো কেবলই পুনরাবৃত্তিময় স্তব বা গান। উপনিবেশবাদের ওপর দোষারোপ করা তেমনই খুবই নিরাপদ ধরনের গান। এই মানুষগুলো ঔপনিবেশিক দিনগুলোতে খুবই শান্ত হয়ে থেকেছে, অধীনস্তের জীবন যাপনের জন্যে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু এখন উপনিবেশবাদ নাই, ওরা খুবই নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। কিন্তু বহুকাল আগে অন্য আরেক জনমণ্ডলী নির্ভীক ছিলো।
প্রশ্ন : ভ্যালেরি কি বলেননি একটি বই সংরক্ষণের জন্যেই পৃথিবী অস্তিত্ববান হয়ে আছে? আপনি এ বিষয়ে একমত?
নাইপল : বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত হতে, ধ্যানস্থ হতেই ভ্যালেরি এমনটা বলেছিলেন। এরকম হলেই তুমি আনন্দ পাবে, এর একটা অর্থ দাঁড়াবে। নইলে তুমি একটা নীচু দাম্ভিক লোকের মতো বাঁচবে আর বলবে : উফ, উফ, আমার এখন খাবার দরকার, উফ, উফ!
প্রশ্ন : আপনার নতুন বই, বিশ্বাস ছাড়িয়ে (বিয়ন্ড বিলিফ), ইসলামের বিষয়টি ফিরে এসেছে যা আপনার বিশ্বাসীদের মধ্যে (এমাং দ্য বিলিভারস্) গ্রন্থেও উপস্থাপিত হয়েছে। এই বইয়ের প্রকাশনাহেতু ইসলাম প্রতিরক্ষকদের ধারালো খোঁচাজনিত গোলযোগ কি আপনি আগে অনুমান করতে পেরেছিলেন?
নাইপল : জনগণ আমার সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু একটি বিশ্বাস অথবা একটি বিশ্বাসের অনুচ্ছেদগুচ্ছের সমালোচনা কখনোই না করার বিষয়ে আমি খুবই সাবধানী। যেটা যেভাবে উচিত সেভাবে অবশ্যই সবার বই-ই সমালোচিত হয়। কিন্তু মনে রেখো, এটা কোনো মতাদর্শ বা আদর্শের বই নয়। এটা আমার আগের বইগুলোর মতোই সকলের কাজকে একত্রে দাঁড় করায়, যে-বইগুলো আবিষ্কারের জন্যে আমার ভ্রমণের কথা লিখেছি। আমি একটা বিশেষ ফর্মে কাজ করে চলেছি, যে-আঙ্গিকের মধ্যে একজন ভ্রমণবিদের চেয়েও যেসব মানুষের মধ্যে ভ্রমণ সম্পন্ন হয়, তারাই অধিক গুরুত্ব লাভ করে। আমি সেইসব মানুষ সম্পর্কেই লিখি যাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। আমি তাদের অভিজ্ঞতার কথা লিখি এবং সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট সভ্যতার ব্যাখ্যা হাজির করি। এটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বই। ফলে যেভাবে বললে সেভাবে এই বইকে দোষী সাব্যস্ত করা খুব কঠিন হবে। কেননা তুমি বলতে পারো না যে এই বই কোনো কিছুকে আঘাত করছে। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দিকে দৃষ্টিপাত করি এবং তৈরি করি একটা ছাঁচ। সেদিক থেকে তুমি সরলভাবে একে গল্পগ্রন্থ বলতে পারো। এটা একটা কাহিনিকিতাব।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

Comment(1)

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close