Home অনুবাদ গাও শিনজিয়ান > ‘সোল মাউন্টেইন’ উপন্যাসের অংশবিশেষ >> ভাষান্তর : অভিজিৎ মুখার্জি

গাও শিনজিয়ান > ‘সোল মাউন্টেইন’ উপন্যাসের অংশবিশেষ >> ভাষান্তর : অভিজিৎ মুখার্জি

প্রকাশঃ September 21, 2018

গাও শিনজিয়ান > ‘সোল মাউন্টেইন’ উপন্যাসের অংশবিশেষ >> ভাষান্তর : অভিজিৎ মুখার্জি
0
0

গাও শিনজিয়ান > সোল মাউন্টেইন উপন্যাসের অংশবিশেষ >> ভাষান্তর : অভিজিৎ মুখার্জি

[সম্পাদকীয় নোট : চীনাভাষায় নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম লেখক গাও শিনজিয়ানকে নিয়ে তীরন্দাজ যে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করার পরিকল্পনা করেছিল, এটি হচ্ছে সেই বিশেষ সংখ্যার প্রথম লেখা। লেখাটি শিজিয়ানের সোল মাউন্টেন উপন্যাসের একটা অধ্যায়ের অনুবাদ। এর পর একে একে প্রকাশিত হবে তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার, ছোটগল্প এবং সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম নিয়ে একটি প্রবন্ধ।]

 

শেষ বিচারে, দর্শন হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তির এক খেলা। উচ্চতম সীমায় গিয়ে গণিত কিংবা পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক বিজ্ঞান আর এর নাগাল পায় না, কতরকম যে জটিল বিন্যাসের কাঠামো তৈরি করে! আর কাঠামোটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলেই খেল খতম। 

ভূমিকা

চীন থেকে সাহিত্যে প্রথম নোবেল প্রাপক লেখকের নাম গাও শিনজিয়ান। ইংরেজি তর্জমায় ওঁর একটি উপন্যাসের নাম সোল মাউন্টেইন। এর একাশিটি অধ্যায়ে তিনি তাঁর জীবনের একটা পর্যায়ের চিন্তা ও ঘটনাবলিকে প্রকাশ করেছেন। বইটির অভিনবত্ব হল, এর কোনও পরিচ্ছেদের সঙ্গে অন্য পরিচ্ছেদের তেমন সরল সংযোগ নেই, কী ঘটনাপ্রবাহের দিক থেকে, কী ভাবনার ধারাবাহিকতার দিক থেকে। বইটির একাশিটি অধ্যায়ের একটি অধ্যায়কে এখানে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

সোল মাউন্টেইন >> উপন্যাসের অংশবিশেষ

নেহাতই আমার একাকিত্বের কিঞ্চিৎ উপশমের জন্যই যে আমি নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলছি, সে আপনি জানেন। আপনি জানেন যে এই একাকিত্বের তেমন কোনও প্রতিকার নেই, কেউ আমাকে এর থেকে রক্ষা করতে পারবে না এবং এই কথোপকথনে আমি একমাত্র নিজেকেই পাব আমার সঙ্গী হিসেবে।
এই দীর্ঘ স্বগতোক্তিতে আমার বক্তব্য আপনাকে উদ্দেশ্য করে, যে আপনি আসলে সেই আমি, যিনি মন দিয়ে আমার কথা শোনেন—আপনি কেবলমাত্র আমার ছায়া।
নিজের এবং আপনার কথা শুনতে শুনতে, আমি আপনাকে দিয়ে একজন ‘সে’ (নারী) সৃষ্টি করিয়ে নিই, কেননা আপনি তো আমারই মতো এবং এই একাকিত্ব সহ্য করে উঠতে পারছেন না, আপনাকেও কথোপকথনের জন্য একজন সঙ্গী পেতে হবে।
অতএব আপনি সেই নারীর সঙ্গে কথা বলেন, আমি যেমন আপনার সঙ্গে কথা বলি।
এই ‘সে’-র জন্ম আপনার থেকেই, তবে কিনা সে আমার নিজের অস্তিত্বের আশ্বাসও বহন করছে।
আমার কথোপকথনের সঙ্গী হিসেবে আপনি আমার যাবতীয় অভিজ্ঞতা ও কল্পনাকে, ঐ নারীর সঙ্গে আপনার সম্পর্কে রূপান্তরিত করে নেন, আর কল্পনাকে অভিজ্ঞতা থেকে মুক্ত করে নেওয়া তো সম্ভবই নয়।
আমার স্মৃতি ও ধারণার মধ্যে কতটা যে অভিজ্ঞতা আর কতটা যে স্বপ্ন, এমনকি আমিই তার মধ্যে ফারাক করে উঠতে পারি না, সুতরাং আপনি কী করে পৃথক করবেন, কোনটা আমার অভিজ্ঞতা আর কোনটা নেহাতই আমার কল্পনা? আর সর্বোপরি, এভাবে আলাদা করার কি দরকার আছে? কোনও দিক দিয়েই এসবের তেমন কোনও তাৎপর্য নেই।
অভিজ্ঞতা ও কল্পনা থেকে সৃষ্ট এই ‘সে’ (নারী) নানা রূপ পরিগ্রহ করে এবং সেগুলো আপনাকে ইঙ্গিতে আহ্বান করে, প্রলুব্ধ ও উত্তেজিত করে। এর কারণ, আমার থেকে সৃষ্ট যে আপনি, সেই আপনিও ওকে প্রলুব্ধ করতে চান। আপনাদের কারুর কাছেই নিজেদের একাকিত্ব বাঞ্ছিত নয়।
আমি এখন একটা যাত্রার মধ্যে আছি—জীবন। ভালো হোক, মন্দ হোক, জীবন একটা যাত্রা, আর নিজের কল্পনায় মাতোয়ারা হয়ে আমি প্রবেশ করছি আমার আভ্যন্তরীণ মনের ভিতরে, আপনাকে সঙ্গে নিয়ে। আপনি আমার প্রতিবিম্ব। সেই চিরকালীন এবং একটু ধাঁধা লাগানো প্রশ্নটি, যে কোন জিনিসটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটাকেই একটু পালটে নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে, কোন জিনিসটা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সঠিক, এবং এই নিয়ে কখনো কখনো, যাকে বলে, বিতর্কও চলতে পারে। কিন্তু এসব নিয়ে অন্যেরা আলোচনা করুক, বিতর্ক করুক, আমাদের কাছে এর কোনও গুরুত্ব নেই, আমি মগ্ন হয়ে আছি আমার এই যাত্রায়, আর আপনি আপনার আধ্যাত্মিক যাত্রাটিতে।
আমার মতোই, আপনিও যখন যেখানে মন চায় ঘুরে বেড়ান। দূরত্ব বাড়তে থাকলে দু’জন একই অবস্থানের দিকে পৌঁছোতে থাকি, যতক্ষণ পর্যন্ত না অনিবার্যভাবে আমি এবং আপনি পরস্পরে সমাপতিত হই এবং অবিচ্ছেদ্য হয়ে পড়ি। ঠিক এই জায়গাটাতে এসে, এক’পা পিছিয়ে দাঁড়ানো প্রয়োজন, খানিকটা পরিসর তৈরি করার জন্য। এই পরিসরটাই হচ্ছে, ‘সে’ (পুরুষ)। এই ‘সে’ (পুরুষ) হচ্ছে আপনারই পিঠের দিকটা, আপনি যখন ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছিলেন।
না আমি, না আমার প্রতিবিম্ব, কেউই এর মুখ দেখতে পায় না। এটুকু জানলেই যথেষ্ট যে ‘সে’ (পুরুষ) হচ্ছে কারুর একটা পিঠের দিকটা।
আপনি আমার সৃষ্টি, আর আপনি সৃষ্টি করেছেন সেই নারীকে, স্বাভাবিক যে তার মুখটা কল্পনা করে নিতে হবে। কিন্তু সেই মুখের বর্ণনা কেন দিতে হবে? স্মৃতির অনুসঙ্গ হিসেবে তৈরি হওয়া একটা ঝাপসা ছবি সে, এবং সেজন্যই অনির্দিষ্ট। অতএব তাকে একটু অস্পষ্টই থাকতে দিন। তাছাড়া, তার রূপ তো নিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে।
আমার এবং আপনার কাছে, যে নারীরা মিলে হয় ‘তাহারা’, তারা তো ওই নারীরই বহুরকম রূপের সমন্বয়ে তৈরি।
যে পুরুষেরা মিলে ‘তাহারা’, তারাও একইভাবে ওই পুরুষ ‘সে’-র বহু অবয়বের সমন্বয়। অসীম, অনন্ত জগতে কত রকমের যে রহস্য আছে, যেগুলো সবই আমার ও আপনার কাছে বাহ্যিক। অন্যভাবে বলা যায়, সেগুলো আমার পিঠের দিকটারই বিভিন্ন তলে নানা প্রতিচ্ছবি। অথচ ওটাকে তো আমি ঝেড়ে ফেলতে পারব না। যদি ঝেড়ে ফেলতে না-ই পারি, চেষ্টা করে কী লাভ?
আপনি খেয়াল করেছেন কিনা জানি না, যখন আমি বলে যাচ্ছি আমার কথা, আপনার কথা, নারী ‘সে’ আর পুরুষ ‘সে’-র কথা, নারী ‘তাহারা’ এবং পুরুষ ‘তাহারা’ এইসব নিয়ে, একবারও কিন্তু ‘আমরা’ কিংবা ‘আমাদের’ নিয়ে কিছু বলছি না। আমার মনে হয়, একেবারে অর্থহীন ওই ‘আমরা’ নামক ধোঁকাটির চেয়ে অন্যগুলো অনেক বেশি সুস্পষ্টভাবে অনুভবযোগ্য।
যদি এমনও হয় যে এই আপনি, নারী ‘সে’, পুরুষ ‘সে’, নারী ‘তাহারা’ এবং পুরুষ ‘তাহারা’ ইত্যাদিরা নেহাতই কল্পনায় সৃষ্ট রূপ ধারণ করে আছে, আমার কাছে কিন্তু তাদের সারবত্তা অনেক বেশি, ওই যেটাকে বলা হয় ‘আমরা’, তার চেয়ে। যেইমাত্র বলছি ‘আমরা’, আমার কাছে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, ঠিক ক’জন আমির কথা বলা হচ্ছে? কিংবা ঠিক ক’জন আপনি, যে আপনি আমারই একটা প্রতিবিম্ব, অথবা কতজন ‘সে’, যে কিনা আমার আর আপনার পিঠের দিকটা। নতুবা ক’জন সেই নারী ‘সে’-র মায়া, যার জন্ম আমার আর আপনার থেকে, বা সেই সমন্বয়সাধিত ‘তাহারা’-র অবয়ব, নারীই হোক, পুরুষই হোক? ‘আমরা’ কথাটার চেয়ে ফাঁকি আর কিছুতে নেই।
ব্যক্তির সংখ্যা যখন বহু, তখন তাদের মুখোমুখি হয়ে আমি কিন্তু বহুবচনে ‘আপনারা’ বলতে পারি। আমি যখন কারুকে খুশি করার চেষ্টা করছি, কিংবা সমালোচনা করতে চাইছি, রেগে আছি, অথবা প্রীত হয়েছি, নতুবা ঘৃণা প্রকাশ করছি, আমার অবস্থানটা কিন্তু তখন খুব নির্দিষ্ট, এবং অন্যান্য সময়ের চেয়েও এই সময়ে আমার সারবত্তা তুলনায় অনেক বেশি। সেখানে, ‘আমরা’ বলতে কী বোঝায়, নেহাতই এক নিরাময়হীন ভান-সর্বস্বতা নয় কি? ফলত এই ‘আমরা নামক যে প্রকৃত প্রস্তাবে অস্তিত্বহীন একটি নেহাতই কথার কথা, সেই বাহুল্যটি আমি এড়িয়ে চলি। তবু যদি কখনো আমি এই ‘আমরা’ শব্দটা ব্যবহার করি, বুঝতে হবে যে আমি তখন ভয়ানক ভণ্ডামি করছি এবং সেই মুহূর্তে আমি একটি কাপুরুষ।
এই ক্রমিক ধারাটা আমি নিজের জন্য ঠিক করে নিয়েছি, এবং এটিকে একধরনের লজিক বা ‘কর্ম’ বলে ধরে নিতে হবে। এই বিশাল ও বিশৃঙ্খল পৃথিবীতে মানুষ নানা ক্রমিকতা, লজিক, ‘কর্ম’, এসব নির্দিষ্ট করে নেয় নিজের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিতে, সুতরাং আমিই বা নিজের মতো করে ক্রমিকতা, লজিক কিংবা ‘কর্ম’ উদ্ভাবন করে নেব না কেন? এধরনের ক্রমিকতা, লজিক কিংবা ‘কর্ম’-এর আশ্রয় নিয়ে আমি নিজের যাবতীয় কৃতকর্মের মধ্যে নিরাপদ বোধ করে মনে শান্তি পেতে পারি।
আমার নানা দুর্ভাগ্য সার্বিকভাবে আপনার মধ্যেও রয়ে গেছে, আপনি সেই দুর্ভাগা দানব যার কাছে আমার সমস্ত কিছু নিবেদন। আসলে, আপনি তো দুর্ভাগ্যের শিকার নন, কেননা আপনার যাবতীয় দুর্ভাগ্যই, এই আমি অর্পণ করেছি আপনাতে, এসবের উৎসই হচ্ছে আমার আত্মরতি—এই হতভাগা ‘আমি’টি কেবল নিজেকেই ভালোবাসে।
ঈশ্বর আর শয়তান বলে কেউ সত্যিই আছে কিনা জানি না, কিন্তু দুজনেরই শরণাপন্ন আপনি হয়েছিলেন, আমার সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য উভয়েরই মূর্ত প্রকাশ আপনাতে। আপনি উধাও হলেই, সেই মুহূর্তে ঈশ্বর এবং শয়তানও অন্তর্হিত হয়ে যাবে।
আপনার হাত থেকে রেহাই পেলে তবেই আমার নিজের হাত থেকে আমি রেহাই পাব। কিন্তু যেহেতু একবার আপনাকে টেনে এনেছি, আর রেহাই পাওয়ার উপায় নেই। একটা আইডিয়া এসেছে মাথায়। আচ্ছা, যদি আমি আর আপনি পরস্পরের স্থান বিনিময় করে নিই, তো কী হবে? অর্থাৎ কিনা, আমি হব আপনার প্রতিবিম্ব আর সেই জায়গায় আপনি হয়ে বসবেন এই সুস্পষ্ট আমিটি—মজার একটা খেলা হয়ে দাঁড়াবে কিন্তু। আমার জায়গায় গিয়ে, সেখান থেকে যদি আপনি মন দিয়ে আমার কথা শোনেন, আমি তাহলে হয়ে যাব আপনার বাসনার এক সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি, দারুন মজা হবে। দর্শনের অন্য একটা নতুন ধারাও হয়ে উঠবে এটা, এবং লেখালেখি জিনিসটা আবার একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে হবে।
শেষ বিচারে, দর্শন হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তির এক খেলা। উচ্চতম সীমায় গিয়ে গণিত কিংবা পর্যবেক্ষণভিত্তিক বিজ্ঞান আর এর নাগাল পায় না, কতরকম যে জটিল বিন্যাসের কাঠামো তৈরি করে! আর কাঠামোটা সম্পূর্ণ হয়ে গেলেই খেল খতম।
আখ্যান কিন্তু দর্শনের থেকে আলাদা, কেননা এর উদ্ভব ইন্দ্রিয়ানুভূতি থেকে। এক ব্যর্থ আত্মনির্মিত সিগনিফায়ার যদি কামনার দ্রবণে চূড়ান্ত মাত্রায় দ্রবীভূত হয়ে, কোনও এক সময়ে একটি জীবন্ত কোষে রূপান্তরিত হতে পারে, যা সংখ্যায় ও আয়তনে বাড়তে পারে, তবে কিন্তু সেটি হবে বুদ্ধিবৃত্তির খেলার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহোদ্দীপক। বলে রাখি, সেটাই জীবন এবং এর কোনও অন্তিম লক্ষ্য বলে কিছু হয় না।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close