Home অনুবাদ গুন্টার গ্রাস > “নোবেল পুরস্কার কখনও আমার লেখালেখিকে প্রভাবিত করেনি…” >> মাইনুল ইসলাম মানিক অনূদিত শেষ সাক্ষাৎকার

গুন্টার গ্রাস > “নোবেল পুরস্কার কখনও আমার লেখালেখিকে প্রভাবিত করেনি…” >> মাইনুল ইসলাম মানিক অনূদিত শেষ সাক্ষাৎকার

প্রকাশঃ May 20, 2018

গুন্টার গ্রাস > “নোবেল পুরস্কার কখনও আমার লেখালেখিকে প্রভাবিত করেনি…” >> মাইনুল ইসলাম মানিক অনূদিত শেষ সাক্ষাৎকার
0
0

গুন্টার গ্রাস > “নোবেল পুরস্কার কখনও আমার লেখালেখিকে প্রভাবিত করেনি…” >> মাইনুল ইসলাম মানিক অনূদিত শেষ সাক্ষাৎকার

[সম্পাদকীয় নোট : গত ১৮ মে বেলাল চৌধুরীর একটা গদ্য লেখা দিয়ে শুরু হয়েছিল গুন্টার গ্রাসকে নিয়ে এই আয়োজন। পরে গুন্টার গ্রাসের একগুচ্ছ কবিতা এবং আরও একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। আজ প্রকাশিত হলো এই আয়োজনের সর্বশেষ লেখা গুন্টার গ্রাসের শেষ সাক্ষাৎকার। বলা প্রয়োজন, গুন্টার গ্রাসের সামগ্রিক পরিচয় পাঠকদের কাছে তুলে ধরাই হচ্ছে এই আয়োজনের লক্ষ্য। আয়োজনটি কেমন লাগছে আমাদের জানাবার জন্যে অনুরোধ থাকলো।]

৮৮তম জন্মদিনে জার্মানির জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন স্পিগেলে  দেয়া গুন্টার গ্রাসের শেষ সাক্ষাৎকার এটি । স্পিগেলের পক্ষে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ভকার হেজ ও কাতজা তিম। এখানে সেই সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।

 

“নোবেল পুরস্কার আমার লেখালেখিকে কখনও প্রভাবিত করেনি। বাধাও সৃষ্টি করেনি। সম্ভবত পরিণত বয়সে নোবেল পাওয়ার কারণেও এটি হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৫৮ সালে ‘গ্রুপ্পে ৪৭’ পুরস্কারটি আমার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ চার্চের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইঁদুরের মতো আমিও হতদরিদ্র ছিলাম। তাছাড়া পুরস্কারটি পেয়েছিলাম সতীর্থ লেখকদের কাছ থেকে।”

মিস্টার গ্রাস, আপনার নতুন বইয়ের নামকরণ করেছেন ‘গ্রীমস ওয়ার্ডস : অ্যা ডিক্লারেশন অব লাভ’। তো এই যে জার্মান ভাষাতত্ত্ববিদ গ্রিম ভাইদ্বয় যারা কিনা উনিশ শতকের বিখ্যাত রূপকথার গল্পগুলো সবার সামনে নিয়ে এসেছিলেন, তাদের প্রতি আপনার ভালোবাসার সূত্রপাত হলো কীভাবে?

ভিলহেম ও জ্যাকব গ্রিমের সাথে আমার সম্পর্ক অনেক পেছনে ফেলে আসা শৈশবের সঙ্গে যুক্ত। আমি গ্রিম ভাইদের রূপকথার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠি। একবার আমার মা আমাকে একটা থিয়েটার দেখাতে নিয়ে যায়। টম থাম্বের সেই থিয়েটারটি ডানজিগ স্টেট থিয়েটারের শুরুর দিকের দিনগুলোতে প্রদর্শিত হয়েছিল। এই থিয়েটারটি দেখার পর থেকেই মূলত আমার পরবর্তী সৃষ্টিশীল লেখালেখিতে গ্রিম ভাইয়েরা প্রভাবিত করে আসছে।

তারা আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল?

বেশ, টম থাম্ব, তারপর ‘দ্য টিন ড্রাম’-এর অস্কারে এসে পৌঁছাই। জ্যাকব ও ভিলহেম আমার অনেকগুলো পাণ্ডুলিপিতে ভূমিকা রেখেছে। যেমন ধরুন, ‘দ্য র‌্যাট’-এ তাদেরকেই মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দেখানো হয়েছে যারা কিনা এসিডবৃষ্টি হতে বনভূমিকে বাঁচাতে চাইছে।

গ্রিম ভাইদ্বয়ের কোন বিষয়গুলো তাদের প্রতি আপনাকে আকৃষ্ট করে?

সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে তাদের অনমনীয় স্বভাব। ১৮৩৭ সালে যখন হ্যানোভার রাজ্যের সংবিধান বিলোপ করা হলো, তারা তখন গতিনজেনে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এই প্রতিবাদ ছিল রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে। গতিনজেন সেভেন নামক গ্রুপটির অন্যান্য অধ্যাপকদের মতো তারাও তাদের পদপদবী ও সামাজিক অবস্থান হারাতে হয়েছিল। এরপর যে কাজটিতে তারা হাত দেন সেটি পুরোদস্তুর অসম্ভব ছিল। কাজটি ছিল এমন একটি জার্মান শব্দকোষ তৈরি করা যেটি প্রশ্ন ও নমুনা বাক্যের দ্বারা বর্ণক্রম অনুসারে সাজানো থাকবে। তারা বর্ণমালার ষষ্ঠ বর্ণ পর্যন্ত কাজ করতে পেরেছিল। পরে অন্যেরা শব্দকোষটি সম্পন্ন করে।

সেটি তো ১২০ বছরেরও বেশি সময় পর সম্পন্ন হয়েছিল?

এই দীর্ঘ সময়টিও আমাকে বিমোহিত করে রেখেছে। গত পনের বছর ধরে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির শিক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দল এটি নিয়ে কাজ করেছে। শীতল যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় ছিল তখন। তারা পূর্ব বার্লিন ও গতিনজেনে তাদের ডেস্কে বসে নিভৃতে কাজ করে গিয়েছেন। একটি প্যান-জার্মান শব্দকোষ তৈরির জন্য তারা পাদটীকা সংগ্রহ করেছিলেন। এটি মূলত জার্মান ইতিহাসেরও প্রতিচ্ছবি, যা আমি ‘গ্রিম্‌স্ ওয়ার্ডস’-এ বলেছি।

আপনার ব্যক্তিগত জীবনের যে ইতিহাস রয়েছে সেটাও তো আপনার দেশ নিয়ে লেখালেখিতে ভূমিকা রেখেছে? 

আমার পারিবারিক বন্ধন ও জটিলতা নিয়ে লিখেছিলাম বক্স (দ্য বক্স)। বইটি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে লেখা। গ্রিমদের জীবনী লেখালেখির যেসব উপকরণ আমাকে দিয়েছিল, আমি শুধু সেসবই গ্রহণ করেছি। এমন একটা সময় ওরা অতিবাহিত করছিলেন যে সময়টাকে আমূল বদলে যাওয়া একটা সময় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

আপনি তো দুই ভাইকে ‘শব্দসন্ধানী’ বলেছিলেন। ওরা প্রতিটি একক শব্দ নিয়েও চিন্তামগ্ন থাকতেন। আপনি এটাও লিখেছিলেন, ‘একদিকে শব্দরা বোধ তৈরি করে, অপরদিকে, তারা বোধহীনতা তৈরিতেও পারঙ্গম। তারা যেমনটা সুবিধাজনক তেমনটা প্রতিক্রিয়াশীলও। বিচিত্র রকমের নিরাভরণ শব্দ কীভাবে আপনার জীবনকে গুছিয়ে দিল?

আমি যেসব শব্দ পেয়েছিলাম সেগুলোয় উদ্দীপনা ও সম্মোহনী প্রাণচাঞ্চল্য ছিল। কিন্তু এগুলো প্রতিক্রিয়া তৈরিতে অযথার্থ ছিল। এডলফ হিটলারের ‘ডু ইউ ওয়ান্ট টোটাল ওয়ার?’ এই ভাবনার একটি উদাহরণ হতে পারে। ‘হিন্দুকুশেও আমাদের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়ে আসছে।’ বাক্যটিতেও একই বিষয় প্রয়োগ করা হয়েছে। [অনুবাদকের নোট : এই বিখ্যাত উক্তিটি সাবেক জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার স্ট্রাক জার্মান সামরিক বাহিনীর আফগানিস্তান মিশন পরিদর্শনের সময় বলেছিলেন।] এই ধরনের বাক্যগুলো শক্তিশালী ভাবার্থ বহন করে, শক্তিশালী ভাবার্থকে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়। কারণ, এরা হরহামেশা প্রশ্নের মুখোমুখী হয় না। আমি প্রতিক্রিয়াশীল এসব শব্দ শুনে ভাবনার দিক থেকে পূর্ণতা অর্জন করেছি। আমি মনে করি আমার মতো  অনেক নাগরিক আছেন যারা দেশীয় অনাচারকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেন। বিশেষ করে তাদের ‘ডু-গুডার্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করাটা হবে গুরুতর একটা ব্যাপার। এই ধরনের একটা মাত্র শব্দবন্ধ ব্যবহার করে একটা বিতর্ককে থামিয়ে দেয়া যেতে পারে।

 কোন ধরনের সুবিধাজনক শব্দগুলোর কথা আপনার মনে পড়ে?

সত্যিকারের সুন্দর শব্দগুলো আমার শৈশবের সাথে সম্পর্কিত। সারস পাখির আরেকটি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘আদেবার’। এটি আমার স্মৃতির জগতকে পুনর্জাগরিত করে। এরকম আরেকটি শব্দ হচ্ছে ‘লবসাল’, মানে জলখাবার। এটি স্মৃতি থেকে হারিয়েই গেছে প্রায়। ‘অ্যা’-এর দীর্ঘ পূনরাবৃত্তির শব্দ শুনতেও ভালোবাসি আমি। গ্রিম ভাতৃদ্বয়ও একে সম্মোহনী শব্দ হিসেবে ধারণ করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বরবর্ণের সাথে ছিল তাদের মৌখিক মৈথুন। ‘লবসাল’ শুনলেও অনেকটা স্বস্তি পাই। এসব শব্দ আপনাকে ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতা দেওয়ার পর নিরাপদে বাড়ি ফেরার ভাবনা জোগাবে।

শুনে মনে হচ্ছে, ভাষা-শৈলী আপনাকে নিরাপত্তা ও গৃহের অনুভূতি দেয়?

সত্যি কথাটাই বলেছেন। আমি আমার ‘টিন ড্রাম’ উপন্যাসটা প্যারিতে বসে লিখেছিলাম। সেখানে আমার ‘ডগ ইয়ার্স’ উপন্যাসটির কাজও শুরু করেছিলাম। কিন্তু চার বছর পর আমি খেয়াল করলাম একটি বিদেশী ভাষার দ্বারা চারদিক থেকে আবদ্ধ হয়ে আমার মধ্যে অন্য একটা অনুভূতি জেগে উঠছে। আমার মনে হতে থাকে, আমি আমার নিজের ভাষাকে হারিয়ে ফেলছি। ফলে আমি দেশে ফিরে এলাম, ফিরে এলাম জার্মান ভাষাভাষী অঞ্চলে।  নাৎসি শাসনের সময় আরো অনেক লেখক যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। আমার অনুভূতিও তাদের মতোই হলো। দেশ একজন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদের কেউ কেউ এটাকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে পারল। তাই তাদের নিজেদেরকে এমনকি অন্যদেরও এটা অনুধাবন করা দরকার যে ভাষার প্রয়োজনীয় দিকটা লক্ষ করতে হবে। এতে ঘাটতি থাকলে হবে না।

নিজের দেশে থেকেও তো এরকম অভিজ্ঞতার অনুভূতি হতে পারে। যদিও তা ততটা মারাত্মক কিছু হবে না। সংস্কৃতির ভাষায় তারুণ্যের ভিন্ন রকম নিজস্বতা রয়েছে। আপনি কি সবসময় আপনার নাতি-নাতনীদের ভাষা বুঝতে পারেন?

অবশ্যই, আমি মনে করি ওদের ভাষার নিজস্বতা আমার কাছে চমৎকার প্রাপ্তি। নাতি-নাতনীদের সাহায্যে আমি এই চলমান অপভাষাগুলো সম্পর্কে জেনে যাই। ফলে, বার্লিনের পুরাতন শব্দ ‘ক্নোর্কে’র (স্ফীত হওয়া) মতো শব্দগুলোর ব্যবহার আর দরকার হয় না।

এই শব্দগুলো হারিয়ে গেলে ব্যথিত হন?

ভাগ্যক্রমে ‘ক্নোর্কে’র মতো একটি শব্দ এখনো সাহিত্যে টিকে আছে। সাধারণত আমিও জ্যাকব গ্রিমের সাথে একটি বিষয়ে একমত পোষণ করি এবং অনুভবও করি। ভাষার পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত পরিবর্ধনকে আমাদের অনুমোদন দেওয়া উচিত। এমনকি যদি তা ব্যাপকভাবে নতুন শব্দের বিকাশে হুমকি সৃষ্টি করে, তবুও প্রতিনিয়ত ভাষার নবায়িত হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। ফ্রান্সে অ্যাকাডেমির মতামতের ভিত্তিতে ভাষাগত নীতিনির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, ভাষাকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করা হলে তা আরো বেশি প্রথাগত ও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে।

গ্রিমস ওয়ার্ডস’-এ আপনি লিখেছেন, এমনকি নিজের নাম পরিবর্তন করতে হলে তাতেও আপনার আপত্তি নেই।

আমি গ্রাস লেখার ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতাটুকু নিই। এক্ষেত্রে আমি দুইটি ‘S’ অথবা একটি ‘ß’ ব্যবহার করে থাকি। [অনুবাদকের নোট : ‘ß’ হচ্ছে একটি জার্মান বর্ণ যা দুটি ‘S’-এর সমান।) জার্মান বানান প্রমিতকরণের পূর্বে `Hass’ (hate) শব্দটি ‘ß’ ব্যবহার করে লেখা হতো। আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বাক্ষর করার সময় ‘ß’ লিখতে পছন্দ করি। এরকম আরও কিছু বিষয় আছে যা আমার পছন্দ। যেমন ধরুন বিভিন্ন ফন্ট বা বই-মুদ্রণের কাগজের মানের বিষয়ে আমি বেশ উদ্বিগ্ন থাকি। সৌভাগ্যবশত আমি আমার প্রকাশক গেরহাডকে পেয়েছি। সে বই তৈরিতে খুবই আন্তরিক। সে তার কাগজ ও ছাপাখানার মেশিনের ব্যাপারে খুব যত্নশীল।

যে কয়েকজন লেখক নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করে থাকেন, আপনি তাঁদের একজন। আপনি আপনার সব বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। এটি আপনার কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেন?

একে বলতে পারেন, তুলির শেষ আঁচড়। এটা যেকোনো লেখার প্রথম বাক্যের মতই বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। লেখালেখির মতই এক্ষেত্রেও সমান যত্নশীল থাকা প্রয়োজন।

একটি ভালো প্রচ্ছদের বৈশিষ্ট্য কী বলে মনে করেন?

এটি প্রতীকচিহ্নের মতো। একটা প্রচ্ছদ লেখার বিষয়বস্তুকে সংক্ষেপে ও সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরে। ‘ডগ ইয়ার্স’-এর প্রচ্ছদে আমি একটি কুকুরের মস্তক এঁকেছিলাম। এটি দেখলে মনে হবে, আড়াল থেকে ধরা কারো হাতের পুতুল। ‘লোকাল এনেসথেটিক’ বইয়ের প্রচ্ছদে আমি আঙুলে-ধরা একটি লাইটারের ছবি এঁকেছিলাম। এবার এঁকেছি শুধু বর্ণমালা দিয়ে। ব্রাদার্স গ্রীম-এর ক্ষেত্রে দ্বৈতচিত্রের কারণে সেই প্রচ্ছদটি যথার্থ বোধ তৈরি করতে পারেনি। কারণ, এটি খণ্ডিত অর্থ দিয়েছে। লিখে শেষ করা বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরির আগে, বইটি প্রথমে কিছুদিন আমার কাছে রেখে দিই। ভাবি। প্রতিটি প্রচ্ছদ করার অভিজ্ঞতা আমার কাছে দারুণ এক অভিজ্ঞতা।

আপনি নিশ্চয়ই বইয়ের আধুনিক মার্কেটিং প্রক্রিয়া নিয়ে হতাশ। যুক্তরাষ্ট্রে তো বেশ দ্রুতই ইবুক বিক্রি বাড়ছে।

এতে ছাপা বইয়ের চাহিদা ফুরিয়ে যাবে এমনটা আমি বিশ্বাস করি না। ইবুক ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে মাত্র।  বিক্রিতেও হয়ত কিছুটা ভাটা পড়বে। তবে ছাপা বইয়ের বাজার আবার তার স্বরূপে ফিরে আসবে। আমরা আমাদের বইকে আমাদের সন্তানদের কাছে সম্পদ হিসেবে রেখে যেতে পারব।

আপনি কী ভাবতে পারেন, আপনার গ্রিমস ওয়ার্ডস কারো আই-প্যাডে থাকবে?

মোটেই না। আমি অবশ্য আমার প্রকাশকের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছি, যতদিন পর্যন্ত লেখকের মেধাস্বত্ত্ব আইন কার্যকর না হয়, ততদিন যেন আমার কোনো বই খোলাবাজারে ছাড়া না হয়। আমি শুধু প্রত্যেক লেখককে বলতে পারি, প্রকাশকের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে আত্মবিশ্বাস বাড়ান।

আপনি কী প্রতিবাদের আহ্বান জানাচ্ছেন?

কম্পিউটারে বই পড়ার এই যে অভ্যুত্থান, আমি চাই তা বন্ধ হোক। কিন্তু আমার মনে হয় না কেউই সেটা করবে। তাছাড়াও এই ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়াতে কিছু অসুবিধাও লক্ষ করছি। বিশেষত, পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে। অধিকাংশ তরুণ লেখকই সরাসরি কম্পিউটারে লেখেন। তাদের লেখা সম্পাদনা ও অন্যান্য কাজও কম্পিউটারেই করে থাকেন। অন্যদিকে, আমার লেখালেখির কয়েকটি প্রাথমিক ধাপ থাকে। প্রথমে হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি তৈরি করি, দ্বিতীয় ধাপে আমি আমার অলিভেট্টি টাইপরাইটারে তা টাইপ করি। শেষধাপে আমার সেক্রেটারি কম্পিউটারে সেটির কয়েকটি কপি প্রিন্ট করে দেয়। সেই প্রিন্ট কপিতে আমি আবার হাতে-কলমে সংশোধন করি। কিন্তু আপনি যখন শুধু কম্পিউটারে লিখবেন, তখন এই সুযোগগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।

অলিভেট্টিতে টাইপ করাটা কি আপনার কাছে সেকেলে ব্যাপার মনে হয় না?

না। কম্পিউটারে একটা টেক্সট লিখতে গেলে সবসময়ই সেটি শেষ হয়ে গেছে মনে হয়। কিন্তু তখনও মূলত সেটা সমাপ্তি থেকে অনেক দূরে থেকে যায়। এটা সত্যিই লোভনীয় একটা ব্যাপার। আমি সচরাচর প্রথমে পুরোটা হাতে লিখে শেষ করি। আর যা আমি অপছন্দ করি, সেরকম কিছু থেকে গেলে একটা ফাঁকা জায়গা রেখে দিই। অলিভেট্টিতে টাইপ করার সময় আমি সেই ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ করি এবং লেখার সমগ্রতার কারণে এই ফাঁকা স্পেসটা অনেকটা জায়গা দখল করে থাকে। পরের ধাপে আমি প্রথম ধাপের মৌলিকত্বের সাথে মিল রেখে দ্বিতীয় ধাপের কাজগুলির সমন্বয় সাধন করি। এই ধীর পর্যবেক্ষণে ও কাজে মেদবহুল ও অপ্রাসঙ্গিক কিছু ঢুকে পড়ার ঝুঁকি থাকে না।

দশকের পর দশক লেখালেখির পরও কি আপনার ভাষাশৈলীতে কোনো পরিবর্তন এসেছে?

প্রথম দিকে আমি আমার লেখায় সব ধরনের বিরাম চিহ্ন বাদ দেওয়ার চেষ্টা করতাম। আমি যখন ‘দ্য টিন ড্রাম’, ‘ক্যাট অ্যান্ড মাউস’ এবং ‘ডগ ইয়ার্স’ লিখলাম, তখন অনেক প্রবীন লেখকই মত দিয়েছিলেন যে জার্মান ভাষার ক্ষেত্রে এতটা বাড়াবাড়ি অনুমোদন করা যায় না।

এসব প্রবীন লেখক বলতে আপনি কি তাদেরকে বুঝাতে চাচ্ছেন যারা বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের তথাকথিত ‘স্পষ্টবাদী সাহিত্য’-র প্রতিনিধি ছিলেন? মানে, যারা তাদের সাদামাটা ও সরাসরি বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য পরিচিত ছিলেন?

হ্যাঁ, এবং সেই সব সাহিত্যিকের এরকম পরিণামদর্শী হবার বেশকিছু কারণও ছিল। মূলত নাৎসি শাসনকালেই জার্মান ভাষার সর্বনাশ ঘটে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা যারা তরুণ লেখক ছিলাম, যেমন ধরুন মার্টিন ওয়েলসার ও হ্যানস মাগনুস এতসেন্‌স্ বার্গার- আমরা শৃঙ্খলিত থাকতে চাইতাম না। আমরা ভাষার কোনো কিছুকে পুরোপুরি অব্যবহার্য বলতে কুণ্ঠাবোধ করতাম। ফলে, প্রসারিত ভাষাগত সুবিধা নিয়ে সবকিছু তুলে ধরার অনুভূতি থেকে আমার লেখালেখি চলতে থাকে। এখন বৃদ্ধ বয়সে আমার অভিজ্ঞতাও এরই অংশ হয়ে উঠেছে। সেজন্যই আমি আত্মচেতনভাবে লিখে যেতে পারছি।

আপনি আসলে কী বোঝাতে চাচ্ছেন একটু খুলে বলবেন?

ব্যাপক অর্থে যদি বলি, এ আমার জীবনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা। এসব অভিজ্ঞতার কথা আমি ১৯৬১ সালে আমার ‘গ্রিমস ওয়ার্ডস’-এ বলেছি। আমি প্রথমবার উইলি ব্রান্টের প্রচারাভিযানের অনুগামী একজন ছিলাম [অনুবাদকের নোট : উইলি ব্রান্ট পশ্চিম বার্লিনের মেয়র ছিলেন এবং ১৯৬১ সালে জার্মান চ্যান্সেলরের অফিস পরিচালনা করেছিলেন। পরে তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর হয়েছিলেন।] বার্লিন দেয়ালের নির্মাণও আমার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অন্যতম অভিজ্ঞতা। ১৯৮৯-৯৯’তে জার্মানির একীভূত হওয়ার ঘটনাও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। এরও আগে পূর্ব জার্মানিতে অসংখ্যবার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে আমার।

কোন বিষয়টি আপনাকে সেখানে যেতে উদ্দীপ্ত করেছিল? 

‘সমন্বিত সাংস্কৃতিক জাতিগোষ্ঠী’ সংক্রান্ত ধারণার একজন একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলাম আমি। এর অংশ হিসেবে আমরা- পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানির লেখকগণ পূর্ব বার্লিনে একজনের ব্যক্তিগত অ্যাপার্টমেন্টে একত্রিত হতাম। আমরা আমাদের পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠ করতাম। আজ সন্দেহ করি, পূর্ব জার্মানির গোয়েন্দা পুলিশের সংবাদদাতারা আমার পরিচয় আঁচ করতে পেরেছিল। তারা এটা বুঝতে পারেননি যে, যে কোনো মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দুই পক্ষেরই সমালোচক হতে পারে। অন্তত আমি গোয়েন্দা পুলিশের নথি পড়ার সময় তাদের এই কর্মকাণ্ডটি লক্ষ করেছি।

“আমি অতীতে যেমন বিশ্বাস করতাম, এখনো তেমনি বিশ্বাস করি। আমাদের অতটা দ্রুত প্রক্রিয়ায় দুই জার্মানিকে সংযুক্ত করা উচিত হয়নি। এটা খুব বোকামির কাজ হয়েছে। আমরা বিরাট সুযোগ নষ্ট করেছি। দুই-দুটি স্বৈরশাসন বিদায় নেয়ার পর চারটি শব্দ- ‘উই আর দ্য পিপল’-এর মধ্য দিয়ে যখন মানুষ গণতান্ত্রিকবোধে আত্মসচেতন হয়ে উঠছিলেন, তখন তাদের কণ্ঠরোধ করা আমাদের উচিত হয়নি।”

আপনি যখন সেই সব রিপোর্ট পড়ছিলেন, তখন আপনার কেমন লাগছিল?

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিরক্তিকর মনে হয়েছে। অনেক দিন ধরে আমি ওই রিপোর্টগুলি পড়বো না বলে ঠিক করেছিলাম। আমি একবারের জন্যও পড়ার আবেদন করিনি। রিপোর্টগুলির পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল প্রায় হাজার দুইয়ের মতো। শেষে মিস বার্থলার (তৎকালীন জার্মান গোয়েন্দা পুলিশের ফেডারেল কমিশনার) সেগুলো আমার হাতে তুলে দেন। কিন্তু আমি বললাম, যেসব পৃষ্ঠায় প্রতিবেদকের নাম আছে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হোক। আমার উপর যিনি নজরদারি করেছেন আমি তার নাম জানতে চাই না। দুই জার্মানি একীভূত হওয়ার বিশ বছর পর এখন আর এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।

একীভূত হওয়াকে আপনি তো তীব্রভাবে বিরোধিতা করেছিলেন। এখন, এই সময়ে এসে, এটা নিয়ে আপনার অভিমত কী?

আমি অতীতে যেমন বিশ্বাস করতাম, এখনো তেমনি বিশ্বাস করি। আমাদের অতটা দ্রুত প্রক্রিয়ায় দুই জার্মানিকে সংযুক্ত করা উচিত হয়নি। এটা খুব বোকামির কাজ হয়েছে। আমরা বিরাট সুযোগ নষ্ট করেছি। দুই-দুটি স্বৈরশাসন বিদায় নেয়ার পর চারটি শব্দ- ‘উই আর দ্য পিপল’-এর মধ্য দিয়ে যখন মানুষ গণতান্ত্রিকবোধে আত্মসচেতন হয়ে উঠছিলেন, তখন তাদের কণ্ঠরোধ করা আমাদের উচিত হয়নি [অনুবাদকের নোট : বার্লিনের দেয়ালের পতনের পূর্বে গণতন্ত্র প্রত্যাশী মানুষের শ্লোগান ছিল এটা : ‘উই আর দ্য পিপল’]। এর অনেক আগেই আমরা অবশ্য দেখেছি, পূর্ব জার্মানি তার কলকারখানাগুলো গুটিয়ে নিয়েছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্পদগুলো অনর্থক বিক্রি করে দিয়েছে। যুদ্ধোত্তর সময়ের সব জার্মানকে পূর্ব জার্মানি ১৭ মিলিয়ন লোককে টানতে হয়েছিল।

এ ক্ষেত্রে আপনি হলে কী করতেন?

আমি আয়করের বাড়িয়ে দিতাম। ঋণজর্জর তহবিল নিয়ে কখনোই একীভূত হওয়ার জন্য ছুটতাম না। একীভূত হওয়ার বিশতম বছর উদযাপনেও জার্মান জাতির মধ্যে এ নিয়ে বেশ কিছুটা আত্মপ্রবঞ্চনার ভাব দেখা গেছে। আমরা আমাদের নিজেদেরকে অভিনন্দিত করছি এই ভেবে যে, কত চমকারভাবেই না সবকিছু সম্পন্ন হলো। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ছিল : বেকারত্ব ব্যাপক হারে বেড়েছে, অনেক অঞ্চল জনশূন্য হয়ে পড়েছে। তবে যে-কথাটি লোকজন সবসময়ই বলে সেটা হলো- ‘দেয়াল বা ব্যবধান এখনও আমাদের মনে’ বিরাজমান। স্যোসালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি যে প্রক্রিয়ায় ব্যাপারটি সমাধান করেছে, সেই সমাধান প্রক্রিয়াই এই মানসিকতা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। এই দলটি শুধু প্রশংসা ও জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভেসেছে। এর যদিও কারণ ছিল, জার্মানির সম্মিলিত সমাজবাদী দলের একমাত্র উত্তরাধিকার হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব জার্মানিরকে কোনোরকম জবাবদিহি করতে হয়নি। মূলত, এর মাধ্যমে স্যোসালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টিকে মুক্তভাবে অনেক কিছু করার অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু এই ধরনের পদক্ষেপ স্যোসালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

স্যোসালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টির এই ক্ষতি কি আপনাকে বিড়ম্বনায় ফেলেনি? ঐতিহ্যগতভাবে জার্মান বামপন্থী দলের একটি দীর্ঘ ও সম্মানজনক ইতিহাস রয়েছে। তবে গেরহার্ড শাসনের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে এবং জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করে।

বেশ, স্যোসালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি ধারাবাহিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। একারণেই আমি এর সান্নিধ্যে থাকি। জার্মানিতে আমাদের অনেক কিছুতেই প্রায় ধারাবাহিকতা নেই বললেই চলে। কিন্তু স্যোসালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি তাদের বয়স ১৫০ বছর অতিক্রম করেছে। দলটি অনেক ভুল করেছে এবং অনেক ভুলের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এর সামাজিক মূলনীতিগুলি ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রমিক আন্দোলনের উৎস থেকে উত্থিত। আমাদের দেশে এর মৌলিক গুরুত্ব ছিল এবং এখনো আছে, যদিও অনেক তরুণই সমাজবাদী দলের ইতিহাস থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। এটিও হয়তো স্যোসালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি কাটিয়ে উঠতে পারবে।

‘গ্রিম্‌স্‌ ওয়ার্ডস’-এ আপনার নিজের রাজনৈতিক মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু সেখানে আপনার মতামতের মধ্যে সম্ভাব্য কোনো ভুলের কথা নেই। আপনি কি তাহলে ভাবতে গিয়ে কখনোই কোনো ভুল করেননি?

দুই জার্মানি একীভূত হওয়ার পর আমি একটি ব্যাপারে ভীত ছিলাম। আমার ভয় হচ্ছিল, ধীরে ধীরে ক্ষমতা বার্লিনে কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠবে কিনা। বার্লিনকেন্দ্রিক এক বৃহত্তর জামানিতে হয়তো পরিণত হবে পুরো দেশ।। কিন্তু সৌভাগ্যবশত, জার্মান ফেডারেলিজম এই ভারসাম্য রক্ষায় যথেষ্ট সক্ষম ছিল। এটা সাধারণত খুবই গোলমেলে একটা ব্যাপার। তবে আমার বিশ্বাস, সবশেষে দুই অংশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাটাই জার্মানির জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ হতে পারে।

আপনার জীবনের আর কোনো ভুলের কথা কি মনে করতে পারেন? মানে, আর কোনো ভুলের কথা মনে পড়ছে কি এই মুহূর্তে?

আমার ক্ষেত্রে একটি বিষয় সম্পর্কে সবাই অবগত যে, আমি আমার তরুণ বয়সে হিটলারের তারুণ্যে বিমুগ্ধ ছিলাম। আমি সবিস্তারে সেকথা আমার ‘পিলিং দ্য ওনিয়ন’ বইতে লিখেছি। আমি মনে করি, আমি সেই ভুল থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক মতাদর্শকে গ্রহণ করতে পেরেছি।

জার্মানীর ইতিহাসের সাথে তো আপনার শেকড় চারিয়ে আছে। কিন্তু আপনি সবসময়ই সবধরণের জাতীয়তাবাদী ধারণা সম্পর্কে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। ফুটবল বিশ্বকাপের সময় আমরা একটি নতুনতর জাতীয়তাবাদের উদ্দীপনা দেখেছিলাম। দেশপ্রেমের নতুন এই উদ্দীপনাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আমি সবসময় বিশ্বাস করে এসেছি, জাতীয়তাবাদকে সবকিছু ডানপন্থীদের উপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। আমরা যদি জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে গিয়ে আমাদের জাতীয় পরিচয়কে কার্যকরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিতে পারি, তাহলে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবো। বিশ্বকাপের সময় লোকজনকে যেসব ছোট-ছোট পতাকা ওড়াতে দেখেছি, সেগুলোতে খেলার বিনোদনের অংশ ছিল। নারীদের দেখেছি তাদের সন্তানদের মুখে কালো, লাল এবং সোনালি রেখা এঁকে দিতে। এই ধরনের ব্যাপারগুলো উদ্দীপনামূলক অনুভূতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে।

আপনার প্রজন্মের আরো অনেক লেখকই বারবার রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তরুণ প্রজন্মের লেখকদের মধ্যে কি আপনি সেরকম স্পৃহার অভাব দেখছেন?

তরুণ প্রজন্মের লেখকেরা যদি এই ঐতিহ্য থেকে শিক্ষাগ্রহণ না করে, তবে আমি সেটিকে অনুশোচনার বিষয় বলেই মনে করবো। তরুণ লেখকদের ভেইমার রিপাবলিকের মতো ভুলের পুনরাবৃত্তি করা উচিত হবে না। তাদের নিজের ব্যক্তিগত পৃথিবীতে নিমগ্ন থাকাটাও অনুচিত। একসময় দুর্বল গণতন্ত্র থেকে উত্তরণের জন্য পশ্চিম জার্মানির বুদ্ধিজীবীগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু সেই অবদান ম্রিয়মান হয়ে আসার বেশকিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক দুরাবস্থা, দরিদ্রপীড়িত শিশু, অবৈধ অভিবাসীদের দ্বীপান্তর, ধনী-দরিদ্রের মধ্যবর্তী ক্রমবর্ধমান পার্থক্য : এসব ইস্যুতে তরুণ লেখকেরা তাদের মতামত প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে জনমত গড়ে তুলতে পারে।

“ইরাক যুদ্ধে জাতিসংঘের ম্যান্ডেট ছিল। সেখানে অংশগ্রহণ করা আমাদের ভুল হয়েছে। কিন্তু তার দায় এড়ানোটা আমাদের পক্ষে কঠিন ছিল। যুক্তরাষ্ট্র যথাযথভাবে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকতে পারেনি। আমেরিকানদের আফগান যুদ্ধ হতেও পিছপা হওয়ার সুযোগ নেই। তবে তারা ভিয়েতনামের ব্যর্থতার মতোই আবার ব্যর্থ হতে চলেছে। আর তাদের সঙ্গে আমাদেরও সেখানে পতন হতে চলেছে।”

আপনি একটা সময় রাজনীতির সাথে খুব বেশি সম্পৃক্ত ছিলেন। এখন আবার কম সক্রিয়। আপনার সমকালীন লেখক মার্টিন ভেলসার চ্যান্সেলরকে একটি খোলা চিঠি দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি আফগান যুদ্ধ থেকে জার্মানিকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আফগান যুদ্ধ নিয়ে আপনার কোনো মতামত আছে?

অবশ্যই আছে। তবে আফগান যুদ্ধকে অন্য সব যুদ্ধের মতো সাদামাটাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি ইরাক যুদ্ধের মতো নয়। ইরাক যুদ্ধে জাতিসংঘের ম্যান্ডেট ছিল। সেখানে অংশগ্রহণ করা আমাদের ভুল হয়েছে। কিন্তু তার দায় এড়ানোটা আমাদের পক্ষে কঠিন ছিল। যুক্তরাষ্ট্র যথাযথভাবে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকতে পারেনি। আমেরিকানদের আফগান যুদ্ধ হতেও পিছপা হওয়ার সুযোগ নেই। তবে তারা ভিয়েতনামের ব্যর্থতার মতোই আবার ব্যর্থ হতে চলেছে। আর তাদের সঙ্গে আমাদেরও সেখানে পতন হতে চলেছে।

একজন নোবেলজয়ী লেখক হিসেবে আপনার বক্তব্য অতীতের যে-কোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। আপনি পিছু হটছেন কেন?

আমি যা করছি তার বাইরে কোনো প্রভাব বিস্তার করার ইচ্ছে আমার নেই। তাছাড়া আমি একজন নোবেলজয়ী লেখক, এরকম কিছু ভেবে দিন কাটাই না। এটি মাঝেমধ্যে আমার মনে পড়ে যখন দুটো পয়সা রোজগার হয়। কিন্তু যখন লিখি, তখন এটা আমাকে কোনোভাবেই সাহায্য করে না, কোনোরকম ব্যাঘাতও ঘটায় না।

এই নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিটা আপনাকে চাপের মধ্যে রাখে না?

নোবেল পুরস্কার আমার লেখালেখিকে কখনও প্রভাবিত করেনি। বাধাও সৃষ্টি করেনি। সম্ভবত পরিণত বয়সে নোবেল পাওয়ার কারণেও এটি হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৫৮ সালে ‘গ্রুপ্পে ৪৭’ পুরস্কারটি আমার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল [অনুবাদকের নোট : ‘গ্রুপ্পে ৪৭’ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জার্মান লেখকদের একটি সংগঠন]। গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ চার্চের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইঁদুরের মতো আমিও হতদরিদ্র ছিলাম। তাছাড়া পুরস্কারটি পেয়েছিলাম সতীর্থ লেখকদের কাছ থেকে। তাই সেটার ভিন্ন গুরুত্ব আছে। আমি বলছি না যে নোবেল পুরস্কার ছোট গুরুত্বহীন কিছু, কিন্তু আমার উপর এর তেমন কোনো প্রভাব নেই।

এখন সত্যি করে বলুন তো, আপনি কি দীর্ঘ সময় ধরে নোবেল পাওয়ার আশা করেন নি?

মোটেও না। অন্তত শেষের দিকে মোটেও নোবেলের আশা করিনি। আমার জীবনের বিশটি বছর কেটেছে প্রায় একইভাবে : প্রতিটি শরতে সাংবাদিকরা আমাকে ফোন করে জানাতেন, আমি নোবেল পুরস্কারের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা নোবেল প্রাপ্তির পর আমার প্রথম সাক্ষাৎকার নেয়ার বিষয়টি আগেভাগেই পাকাপাকি করে রাখতে চাইতেন। তারপর পুরস্কার ঘোষণা হলে বরাবরের মতো বিষয়গুলো চাপা পড়ে যেত।

১৯৭২ সালে জার্মান লেখক হাইরিশ বোল যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন, আপনি কি বিরক্ত হননি?

না, আমি মোটেও বিরক্ত হইনি। আপনি যদি বিশ্বাস নাও করেন, তবু এটাই সত্য। তখন আমি স্যোসালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রচারাভিযানের মধ্যে ছিলাম। আমি সম্ভবত রাইনল্যান্ড-পালাতিনেতের কোনো একটি বাজারের চত্বরে বা বাসে বসে প্রচারাভিযান চালাচ্ছিলাম। আমরা স্বপ্রণোদিত হয়ে এরকম বেশকিছু ছোট শহরে প্রচারাভিযান চালাই। আমি মাইক্রোফোনে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিচ্ছিলাম। কেউ একজন আমাকে একটি চিরকুট দিয়ে জানায় হাইরিশ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আমি তখন খবরটা প্রচারাভিযানে থাকা সবাইকে জানিয়ে দিলাম। আমরা দুজন তো একই রাজনৈতিক মতাদর্শের ছিলাম।

আপনার নতুন বইতে উপসংহার টেনেছেন এরকমভাবে : ‘জীবনে কর্মপ্রবণতা কখনো নিঃশেষ হয় না। এমনকি ঐতিহ্যগত উপকথাগুলোও নতুনভাবে বলা যেতে পারে। প্রতিটি সমাপ্তির পর আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি, আমার আরো অনেক কিছু করার আছে।’ এরপর আপনি আর কীধরণের কাজ করতে চান?

অনেক বছর ধরে লেখালেখি করছি বলে এখন মনে হয় আমার লেখার বিষয়আশয় ও শৈলীতে পরিবর্তন আনতে হবে। ‘ডগ ইয়ার্স’-এর পঞ্চাশতম প্রকাশনা-বার্ষিকীতে আমি লেখালেখির একটি নতুন কাঠামো তৈরি করতে চেয়েছিলাম। ‘গ্রিম্‌স্‌ ওয়ার্ডস’ দিয়েই আমার আত্মজীবনীর পরিসমাপ্তি ঘটবে। আমার সমবয়সী যে কেউ পরবর্তী বসন্ত পর্যন্ত বেঁচে থাকলেই অবাক হবেন আপনি। আর আমি এটাও জানি, মহাকাব্যিক বিষয়বস্তু নিয়ে একটি বই লিখতে গেলে কতটা সময় লাগে।

জীবন ফুরিয়ে এসেছে বলে কি আপনি শঙ্কিত?

না, আমি সেটা উপলব্ধি করি আর সেজন্যে আমি প্রস্তুত হয়েই আছি। তবে আমি এটাও উপলব্ধি করি, আমার ভেতরে এখনো অনেক কিছু সম্পর্কে যথেষ্ট কৌতূহল রয়ে গেছে। আমার নাতি-নাতনীদের পরিণতি কী হবে? সপ্তাহান্তে ফুটবল খেলাগুলোর ফলাফল কী হবে? এখনো এমন কিছু তুচ্ছ বিষয় রয়েছে যেগুলো থেকে আমি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাই। বার্ধক্য নিয়ে জ্যাকব গ্রিম একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন, যেটি আমি তার একটি বইতে পেয়েছি, সেটা হলো তাঁর ভাষায় বার্ধক্য হচ্ছে ‘গোলায় থাকা শেষ শস্যকণা।’ তার এই কথাটি আমাকে ছুঁয়ে গেছে, আমি আমার নিজের মধ্যে এর প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। এমনটা ভাবি বলেই হয়ত নিজের মধ্যে আগাম কোনো মৃত্যুভীতি খুঁজে পাচ্ছি না।

মিস্টার গ্রাস, এই সাক্ষাৎকারটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

এই আয়োজনের আগের লেখাগুলি পড়ার জন্য নিচের লিংকগুলোতে ক্লিক করুন

গুন্টার গ্রাস > কবিতাগুচ্ছ >> অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত / হায়াৎ মামুদ / মাসুদুজ্জামান / শেহাবউদ্দীন আহমেদ অনূদিত

বেলাল চৌধুরী > গুন্টার গ্রাসের তিক্ত-মধুর নোবেল প্রাপ্তি >> প্রবন্ধ

গৌতম গুহ রায় > গুন্টার গ্রাস : ঘৃণা, বিষাদ ও ক্ষুদ্ধ সময়ের ভাষ্যকার >> প্রবন্ধ

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close