Home অনূদিত ছোটগল্প গুলজার > আধেক রুপি >> ফজল হাসান অনূদিত ছোটগল্প

গুলজার > আধেক রুপি >> ফজল হাসান অনূদিত ছোটগল্প

প্রকাশঃ September 10, 2018

গুলজার > আধেক রুপি >> ফজল হাসান অনূদিত ছোটগল্প
0
0

গুলজার > আধেক রুপি >> ফজল হাসান অনূদিত ছোটগল্প

 

 

তারপর একদিন বাংলোর ভেতর ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। মন্ত্রী সাহেব অফিসে ছিলেন। আঁতকে উঠে তিনি চেয়ার থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক পরের মুহূ্র্তে চান্দু তাঁর পায়ের কাছে নিজেকে আবিষ্কার করে। তার পেছনেই একজন দক্ষ বন্দুকধারীর হাতে একে-৪৭।

 

 

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করার সময় পালিয়ে যাওয়ার পর যখন সে দম ছাড়ার জন্য থামে, তখন সে বোম্বে পৌঁছে গেছে। এটা সম্পূর্ণ আলাদা গল্প যে, সে এখন মন্ত্রীর বাংলোয় কাজ করে। কিন্তু এখনও প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় তার মনে পড়ে।
সে একটানা তিন দিন এবং তিন রাত জেগেছিল। অবশেষে সে বাইকুল্লার ফুটপাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। মাঝ রাতে হাবিলদার এসে তাকে লাথি দিয়ে জাগিয়ে তুলে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘এই যে ভাই, ইউপি-র কোন জায়গা থেকে এসেছ?’
‘ফয়জাবাদ।’
‘আচ্ছা … আট্টানি [আট আনি] দাও … পয়সা ছাড়া এই ফুটপাতে ঘুমানো যায় না … বুঝলে?’
চান্দু এক মুহূর্তের জন্য ভাবলো, সে কয়েকটি সিনেমায় তাকে দেখেছে। তারা শুধু সিনেমায় সেই ভাষায় কথা বলে।
‘আমার কাছে কোন টাকা-পয়সা নেই … যদি থাকতো, তাহলে আমি শহরে আসতাম না।’
‘এটা শহর না। এটা হলো মুম্বাই – বুঝলে? এটা মহানগর। কী হলো, আট্টানি দাও।’
ঝুমরু তার পাশে ঘুমিয়েছিল। জেগে উঠে সে বললো, ‘শুনুন দেবা, ছেলেটিকে বিরক্ত করছেন কেন? এই যে আট্টানি, নিন এবং আমাদের ঘুমাতে দিন।’
বালিশের নিচে এক গাদা খুচরো পয়সা থেকে ঝুমরু একটা আধুলি বের করে এবং হাবিলদারের দিকে ছুঁড়ে মারে। দেবা খপ করে ধরে এবং বলে, ‘শালা কিপ্টা, ওর জন্য পয়সা দিচ্ছ – ও কী তোমার আপনজন, নাকি অন্য কেউ?’ সে হাতের মুঠোয় আট্টানির রিনঝিন শব্দ তুলে এগিয়ে যায়।
চান্দু ভেবে পায় না এটা কেমন ধরনের শহর – তোমাকে লাথি দিবে, আবার দেখভালও করবে। সেই রাতে তার চোখে ঘুম আর আসেনি।
পরদিন সকালে ঝুমরুর সঙ্গে পুনরায় তার কথা হয়।
‘তাহলে … সরাসরি গ্রাম থেকে আসা হয়েছে? তেল চপচপ করা মাথার চুল নিয়ে নায়ক হবার খায়েশ হয়েছে?’
‘না, ইয়ার … আমার …’
তৎক্ষণাৎ ঝুমরুর চোখেমুখে প্রচণ্ড রাগের চিহ্ন ফুটে ওঠে। রাগান্বিত গলায় সে বললো, ‘বেশ্যাদের ইয়ার থাকে। আমাকে চাচা ডাকবে। এখানে সবাই আমাকে চাচা – ঝুমরু চাচা ডাকে।’
ভয় পেয়ে চান্দু মুখের থুতু গিলে ফেলে। চকিতে সে ভাবলো চুপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। ঝুমরু বললো, ‘দেবা আবার আসবে। তোমাকে এখানে ঘুমাতে দেবার জন্য সে টাকা নিবে … এক সপ্তাহের জন্য এক আট্টানি।’
চান্দুর মুখমণ্ডল থেকে ভয়ের চিহ্ন মুছে গেছে। কিন্তু তখনও তার মুখে খানিকটা হলুদ ভাব রয়ে গেছে, যেন জন্ডিসের মুখ।
‘তুমি এই শহরে বাস করতে চাও – তাহলে হলুদ হলে চলবে না, হতে হবে মরিচ, প্রচণ্ড ঝাল মরিচ।’
একটু থেমে ঝুমরু পুনরায় বললো, ‘চৌপাট্টিতে আসছো? বড় নেতা, বড় বক্তৃতা … আমরা পাঁচ রুপি পাবো।’
‘পাঁচ রুপি? পাঁচ রুপি আয় করার জন্য আমাদের কী করতে হবে?’
‘নেতার বক্তৃতা শুনবে। হাততালি দিবে এবং চিৎকার করে বলবে ‘জয় হো!’ আর কিছু না।’
চান্দু হাসতে হাসতে বললো, ‘এর জন্য পাঁচ রুপি।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু অর্ধেকটা আমার। শোন, পল্টিরা দেবাকে দশ রুপি দেয়। সে পাঁচ রুপি নেয় এবং আমাকে পাঁচ রুপি দেয়। আমাদের এই ফুটপাথ থেকে সে পঞ্চাশ জন পিচ্চিকে নেবার চুক্তি পায়। আমি সব ব্যবস্থা করি। বুঝছো?’
চান্দু মাথা নাড়ায়। ‘হো।’ প্রথম মারাঠি শব্দ সে শিখেছে।
চান্দু পুনরায় ভাবতে থাকে : কেমন ধরনের শহর – খাওয়াবে, আবার মারবেও।
ঝুমরো বললো, ‘আমরা সবাই কমরির মতো।’
‘কমরি কী।’’
‘কমরির অর্থ হলো মুরগি। এই শহর শস্যদানা ছিটায়। আমরা মুরগির মতো টুক-টুক শব্দ করে সেগুলো কুড়িয়ে খাই। সেই খাবার খেয়ে যখন মোটা তাজা এবং নাদুসনুদুস হবো, তখন ওরা আমাদের কতল করবে।’
‘কে আমাদের কতল করবে?’
‘অনুভূতিহীন মহারাজারা।’
‘তারা কারা?’
‘এই শহরে অনুভূতিহীন মহারাজারা দু’ধরনের। প্রথমত – পল্টি মানুষ। তারা কথার ফুলঝুড়ি ছড়ায়। বক্তৃতা দেয়। মালপানি ঢালে। ভোট নেয়। এবং দ্বিতীয়ত – অস্ত্র-ছোরাবাজ। টাকাকড়ি নেয়। জীবন নেয় না। কিন্তু অনেক সময় জীবন নেয়, টাকা দেয়।’
‘এরা কী গুণ্ডাবাহিনী?’
‘উভয় দলই গুণ্ডা। শুধু পার্থক্য হলো তাদের ধরনধারণে।’
মহানগরের হালচাল বুঝতে চান্দুর বেশি সময় লাগেনি।
পরের বার দেবার সঙ্গে পার্টির একজন এসেছিল। সে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘নেতাজি যখন বলবে, “মুম্বাই কোনাচি” – মুম্বাই কার – তখন তোমরা কী বলবে?’
একসঙ্গে সবাই চিৎকার করে, “মুম্বাই আমাচি” – মুম্বাই আমার।’
‘এই মাদ্রাজি, মারাঠিতে বলো। ঠিক আছে, তামিলে না। তোমরা কী বলবে?’
‘মুম্বাই আমাচি।’
‘ভালো!’
লোকটি চলে যাবার পর চান্দু দেবাকে বললো, ‘ভাউ!’ সে শুনেছে লোকজন তাকে দেবা ‘ভাউ’ – বড় ভাই – সম্বোধন করে। দেবার মুখের অভিব্যক্তি নরম হয়। ‘পার্টিওয়ালা একজনের জন্য কত দেয়?’
দেবার মুখ পুনরায় কঠিন হয়। ‘তা দিয়ে তোর কী দরকার? তুই কী তোর পাঁচ আট্টানি পাস, নাকি পাস না?’
‘পাঁচ আট্টানি তেমন কিছুই না, ভাউ।’
‘পাঁচ সপ্তাহ ঘুমানোর জায়গার ভাড়ার জন্য যথেষ্ট, নাকি যথেষ্ট নয়?’
‘শুধু ঘুমানোর জন্য ঠিক আছে। কিন্তু একজন যদি পেট চালাতে চায়, ভাউ।’
‘আমি কী এখানে আসতে বলেছি? ইউপি-র কোন জায়গা থেকে এসেছিস – বল, বল আমাকে।’
‘ফয়জাবাদ।’
‘ফয়জাবাদে কে তোকে খাওয়াতো? কে? বল, বল আমাকে।’
চান্দু মিথ্যার এমন বিশাল গল্প ফাঁদে, যার জন্য ভয়ে সে নিজেই রীতিমত কাঁপতে থাকে। সে তোতলাতে শুরু করে, ‘আমাদের – আমাদের কৃষিজমি আছে। এক–এক পরিবারের লোকজন দিনমজুরির কাজ করে, ভাউ। অকস্মাৎ সন্ত্রাসীরা আমাদের উপর হামলা করে এবং টুস-টুস-টুস-টুস শব্দে তারা আমার পুরো পরিবারকে গুলি করে হত্যা করে – ভাই, বোন, বাবা, মা … প্রত্যেককে।’
চান্দু বেশি কিছু আর ভাবতে পারেনি। সে যেন তূণ ছুঁড়েছে। দেবার মুখের অভিব্যক্তি নরম হয়। সে ভাবে, চান্দু তাকে সত্যি কথাই বলেছে।
‘দেখি, কী করতে পারি। পরে তোর জন্য কোন কাজ খুঁজে দিব। তুই কী পড়তে-লিখতে পারিস?’
‘হ্যাঁ, আমি পারি। আমি যখন গ্রামের ইশকুল থেকে পালিয়েছি, তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তাম।’
‘তোর নাম লিখতে পারিস?’
‘হো।’
‘এবং আমার নাম – পারবি?’
‘হো।’
‘ঠিক আছে, তারপর! আগামীকাল থেকে তুই আমার সঙ্গে কাজ করবি। সারা সপ্তাহের জন্য আমি ডাইরি তৈরি করি। আমার হিন্দি খুব বেশি ভালো না। জাতীয় ভাষা, না? এই একটা ভাষায় লেখার জন্য সরকারের অনুমতি আছে। চাকুরি পাওয়ার জন্য আমি বলেছি, আমি জানি। কিন্তু অই শালা ছাড়া কেউ এক সপ্তাহে একবার ডায়েরি লেখার জন্য চার আট্টানি নেয় না। এই মহানগরে বিনা পয়সায় কেউ কোন কাজ করে না, করে কী?’
চান্দুর কাজ হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরেও সে জিজ্ঞাসা করে, ‘ভাউ, আপনি সব সময় সবকিছু আট্টানি দিয়ে গোণেন কেন?’
ভাউ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। মাঝপথে থেমে সে বললো, ‘কারণ আমাদের মতো “সাধারণ মানুষ” সবকিছুর শুধু আধেকটা পায় – অর্ধেক থালা খাওয়া, অর্ধেক রাত ঘুম, অর্ধেক হাসি, অর্ধেক কান্না, অর্ধেক বাঁচা এবং অর্ধেক মরা। তাই আধেক রুপি কখনই পুরু রুপি হয় না।’ বলেই সে কয়েক মুহূর্তের জন্য থামে। পুনরায় সে বলতে শুরু করে, ‘উচুঁ শ্রেণির লোকজন ভাবে, নাকি ভাবে না?’ তারপর সে গলার স্বর নামিয়ে যোগ করে, ‘কথাটা একজন নকশাল আমাকে বলেছে।’
চান্দু সাংবাদিকের মতো ভাউকে অনুসরণ করা শুরু করে। সে যাই করুক না কেন, চান্দুকে লিখে রাখার জন্য বলে। চান্দু ভাউয়ের সঙ্গে একই ছোট্ট ঘরে থাকে। কখনও সে খাবার রান্না করে এবং ভাউ যেখানে কাজে থাকে, সেখানে খাবার নিয়ে যায়।
বাইকুল্লার সামান্য দক্ষিণ দিকে, সারভি হোটেলের পাশে, একটা ছোট্ট এবং সরু রাস্তা আছে। সেই রাস্তার মাথায় এক লোকের কাছে রয়েছে বিক্রির পণ্যসামগ্রীর ঝুড়ি। তাকে দেখে মনে হয়েছে সে উর্দুভাষী। তার কোন লাইসেন্স ছিল না। একদিন ভাউ তাকে খুঁজে পায়। সে ডায়েরি বের করে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি কি বিক্রি করো?’
লোকটি লৌক্ষ্ণর ভাষায় উচ্চারণ করে, ‘খামিরে কি গুলগান্ডিয়া।’
ভাউ আঁতকে ওঠে, ‘কী?’
‘ফার্মেন্টেড গুলগান্ড।’
‘কিন্তু ওটা কী?’
‘গোলাপ-পাঁপড়ি … খেয়ে দেখুন।’
‘হুঁ,’ বলেই সে প্রস্তাব লুফে নেয়। তারপর জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার নাম কী?’
‘ইশাকুল রহমান সিদ্দিকী।’
ভাউ কণ্ঠস্বর একটু উপরে তুলে পুনরায় জিজ্ঞাসা করে, ‘হিন্দিতে বলো … বুঝতে পারছো … হিন্দিতে তোমার নাম বলো।’
লোকটি আবারো সম্পূর্ণ নাম বলে, ‘ইশাকুল রহমান সিদ্দিকী।’
ভাউ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তারপর ডায়েরির পাতা খুলে পেন্সিল দিয়ে লেখার সময় জিজ্ঞাসা করে, ‘হ্রস্ব-ই, নাকি দীর্ঘ-ঈ।’
‘সে-কী, সাহেব?’ তার উর্দু এবং ভাউয়ের হিন্দির চাপে পড়ে আসল ঘটনাই হারিয়ে গেছে।
ভাউ ঠাস করে ডাইরি বন্ধ করে বললো, ‘দেখ … এবার আমি তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু আজকের কথা রিপোর্টে লেখা থাকবে না। আমার রিপোর্টে লেখা থাকবে তোমার নাম বাবু এবং তুমি আলু বিক্রি করো। ঠিক আছে?’
সেই সময় চান্দু এসে হাজির হয়। চান্দুকে ডাইরি এবং পেনসিল দিয়ে ভাউ বললো, ‘লেখ, নাম – বাবু। ব্যবসা – আলু বিক্রি। চান্দু, তার কাছ থেকে চার আট্টানি নিস।’ এই বলে ভাউ সেখান থেকে চলে যায়।
অন্য আরেক সময় একই ধরনের ঘটনা ঘটে। সেদিন চান্দুর ভীষণ জ্বর ছিল। তাই সে ভউয়ের সঙ্গে যেতে পারেনি। ভাউ ফিরে এসে তাকে গল্প করেছে।
‘তুই কী বিনায়ক রাও রোড চিনিস?’
এটা ছিল সেই সময়ের ঘটনা, দেবা যখন ওয়ার্ডেন রোডে বদলি হয়েছিল। এখন সে ওয়র্লির ছোট্ট এক কামড়ার ঘরে বাস করে।
চান্দু তাকে প্ররোচিত করে, ‘তাহলে বিনায়ক রাও রোডে কী ঘটেছিল?’ সে এখন মহানগরের রাস্তাঘাট সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে।
‘গরু মারা গিয়েছিল।’
‘কার গরু?’
‘কোন ধারণা নেই। গরুর মাস্তানদের কেউ হবে। তারা রাস্তায় গরু-বাছুর ছেড়ে রাখে। রাস্তার অনেক কঠিন নাম – বিনায়ক রাও পাটওয়ার্ধন রোড। পুরোটা কে লিখতে যাবে? এবং তা-ও হিন্দিতে?’
চান্দু অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।
‘তারপর আপনি কী করলেন?’
‘দু’ঘণ্টা সময় লেগেছে। গরুর লেজ ধরে টানাহেঁচড়া করেছি। আমার নিঃশ্বাস প্রায় ফুরিয়ে আসছিল। কিন্তু অবশেষে মরা গরু অন্য রাস্তায় টেনে নিয়ে যেতে সফল হয়েছি। পুরো দু’ঘণ্টা লেগেছে।’
‘অন্য রাস্তায় টেনে নিয়ে গিয়েছেন কেন?’
‘পরের রাস্তার নাম বাপু রোড। লিখতে সহজ।’
‘আট্টানি কে দিয়েছিল?’
‘যার বাড়ির সম্মুখে গরু মারা গিয়েছিল, সে-ই দিয়েছে।’
ইতিমধ্যে চান্দু এবং ভাউয়ের বন্ধুত্ব কয়েক বছরের পুরনো হয়েছে। এই সময়ে ভাউ তাকে অনেক ধরনের কাজ দিয়েছে এবং সেসব কাজ থেকে ছাঁটাইও করেছে। তারপর শেষপর্যন্ত সে একজন পার্টির নেতার সুবাদে মন্ত্রীর বাংলোয় প্রহরীর কাজ পেয়েছে।
ইতিমধ্যে চান্দু পুরোপুরি মুম্বাইয়া হয়ে গেছে। তার উপর মন্ত্রী সাহেবের অগাধ বিশ্বাস। তাই তিনি ব্যক্তিগত অনেক কাজের দায়িত্ব দিয়ে চান্দুকে পাঠিয়েছেন। এখন চান্দুর মূল কাজ হলো মন্ত্রী সাহেবের ব্রিফকেস আনা-নেয়া করা। আট্টানি গণনার কাজ সে পেছনে ফেলে এসেছে। তবে এখনও মাঝে মাঝে সে আট্টানি দেয়া-নেয়ার কাজটা করে।
তারপর একদিন বাংলোর ভেতর ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
মন্ত্রী সাহেব অফিসে ছিলেন। আঁতকে উঠে তিনি চেয়ার থেকে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন। ঠিক পরের মুহূ্র্তে চান্দু তাঁর পায়ের কাছে নিজেকে আবিষ্কার করে। তার পেছনেই একজন দক্ষ বন্দুকধারীর হাতে একে-৪৭।
‘কী? এটার অর্থ কী?’ চান্দুকে দেখার জন্য তিনি ঘোরেন এবং জিজ্ঞাসা করেন, ‘কেন – কেন এই লোকটাকে ঢুকতে দিয়েছিস, চান্দু?’
‘আমি – আমি দিইনি। সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঢুকে পড়েছে।’ বন্দুকের নলের সামনে বিচলিত চান্দুর পা কাঁপতে থাকে।
‘তুমি কে, ভাই?’ ইতিমধ্যে অনুপ্রবেশকারীর হাতের অস্ত্র মন্ত্রী সাহেবের নজরে পড়েছে এবং তাঁর কণ্ঠস্বর সামান্য মোলায়েম হয়েছে।
‘আপনার কী মনে হয়, আমি কে?’
‘সন্ত্রাসী – আমার মনে হয়।’
সন্ত্রাসীর ঠোঁটের ফাঁকে হাসি ফুটে ওঠে। মন্ত্রী সাহেবরও।
‘ওকে ধরে রেখেছ কেন?’ চান্দুকে ইঙ্গিত করে মন্ত্রী সাহেব জিজ্ঞাসা করেন।
‘ও আমার জিম্মি।’
‘আমারও,’ মন্ত্রী সাহেব উপহাসের ভঙ্গিতে বললেন।
‘সত্যি? আপনার জিম্মি? তাহলে সে কেন বাইরে খোলামেলা ভাবে ঘোরাফেরা করে?’
‘আমার হাতে বন্দুক নেই যে, কাউকে আমি তোমার মতো জিম্মি করে রাখবো।’
‘তাহলে আপনি কেমন করে ওদের বশে রাখেন?’
‘প্রথমে নোট দিয়ে, তারপর ভোটে। আমি ওদের পাঁচ বছরের জন্য জিম্মি করে রাখি।’
‘এবং তরপর?’
‘নবায়ন। প্রতি পাঁচ বছর পর আমরা আরেক পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন করি।’
সন্ত্রাসী অবস্থান পরিবর্তন করে এবং অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে বললো, ‘এখন থেকে এই বিত্ত এবং অনুমতিপত্র কাজ করবে না।’
‘তাহলে কী করবে?’
‘ওকে জিজ্ঞাসা করেন না কেন? আপনার এবং আমার মাঝে ও-ই সাধারণ। সাধারণ মানুষ!’
মন্ত্রী সাহেব চান্দুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমাকে বল, তোর কী পছন্দ – গুলিতে মরবি, একবারই মারা যাবি এবং চিরদিনের জন্য … অথবা –’
সন্ত্রাসী এককদম এগিয়ে আসে, ‘অথবা প্রতিদিন একটু করে মরবি … তিলে তিলে … প্রতি পাঁচ বছরে মরবি।’
চান্দু একপলকের জন্য থামে এবং দুজনের দিকে চোরা চাহনিতে তাকায়। তারপর সে পকেটের ভেতর হাত ঢোকায়।
সন্ত্রাসী তাকে ভয় দেখিয়ে বলে, ‘পকেটে কী আছে?’
চান্দুর তাড়াহুড়া নেই। সহজিয়া ভঙ্গিতে সে বললো, ‘কিছু না … শুধু একটা আট্টানি … উত্তর খোঁজার জন্য আমি টস করতে চাই।’
বলেই সে এককদম এগিয়ে যায়। যেইমাত্র সে মুদ্রাটি উপরের দিকে ছোড়ে, তখনই একসঙ্গে দুজনে চিৎকার করে ওঠে, ‘হেডস্।’
ভাগ্য ভালো, আট্টানি নিচের দিকে ফেরত আসেনি, অথবা কোথাও … উভয় দিক থেকে এটা হতো চান্দুর মাথা।

 

গল্পসূত্র

 

‘আধেক রুপি’ গল্পটি গুলজারের ইংরেজিতে অনূদিত ‘হাফ এ রুপি’ গল্পের অনুবাদ। হিন্দি থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন সঞ্জয় শেখর। গল্পটি লেখকের ‘হাফ এ রুপি স্টোরিজ’ ছোটগল্প সংকলন থেকে নেয়া।

 

লেখক পরিচিতি

ভারতের প্রথিতযশা গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, কবি, ছোটগল্প লেখক এবং ঔপন্যাসিক গুলজার। তাঁর আসল নাম সাম্পুরাণ সিং কারলা। তৎকালীন অখণ্ড ভারতের পাঞ্জাব (বর্তমানে পাকিস্তানে) প্রদেশের ঝিলাম জেলার দিনা শহরে তিনি ১৯৩৪ সালের ১৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। মূলত হিন্দি, উর্দু এবং পাঞ্জাবি ভাষায় সাহিত্য রচনা করলেও ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় লেখালেখি করে থাকেন। ‘টু’ তাঁর একমাত্র উপন্যাস, যা ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পরে শরণার্থীদের করুণ কাহিনি নিয়ে রচিত। তিনি তিনটি কাব্যগ্রন্থ এবং দুটি ছোটগল্প সংকলন রচনা করেন। ‘রাভি পার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ (১৯৯৭) এবং ‘হাফ এ রুপি স্টোরিজ’ (২০১৩) ইংরেজিতে প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন। তবে ‘রাভি পার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ থেকে চারটি গল্প নিয়ে ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘সীমা অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’। কাব্যিক ভাষায় চরিত্র-চিত্রণের, বিশেষ করে শব্দপ্রয়োগের, জন্য তাঁকে ‘মাস্টার ওয়ার্ডস্মীথ’ বা ‘শব্দ কারিগর’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। গুলজারের কর্মজীবন শুরু হয়েছে সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে। পরবর্তীতে তিনি গীতিকার, চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছেন। গীতিকার হিসাবে তিনি ২০০৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’ এবং ২০০২ সালে ‘সাহিত্য অ্যাকাডেমি’ পুরস্কার অর্জন করেছেন। এছাড়া তিনি ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারসহ একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। হলিউডের বিখ্যাত ‘স্লামডগ মিলিনিয়র’ চলচ্চিত্রের গান ‘জয় হো’ সঙ্গীত রচনার জন্য তিনি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড এবং গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেছেন।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close