Home অনুবাদ গুলজার >> কবিতাগুচ্ছ ভাষান্তর করেছেন ভাস্বতী গোস্বামী এবং তাঁর উপর প্রবন্ধ লিখেছেন ফজল হাসান

গুলজার >> কবিতাগুচ্ছ ভাষান্তর করেছেন ভাস্বতী গোস্বামী এবং তাঁর উপর প্রবন্ধ লিখেছেন ফজল হাসান

প্রকাশঃ August 18, 2018

গুলজার >> কবিতাগুচ্ছ ভাষান্তর করেছেন ভাস্বতী গোস্বামী এবং তাঁর উপর প্রবন্ধ লিখেছেন ফজল হাসান
0
0

গুলজার >> কবিতাগুচ্ছ

মূল হিন্দি থেকে ভাষান্তর : ভাস্বতী গোস্বামী

 

[সম্পাদকীয় নোট : আজ কবি, চলচ্চিত্রকার, গীতিকার, গল্পকার- এরকম বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী উর্দু লেখক গুলজারের ৮৪তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে এখানে প্রথমে প্রকাশিত হলো তাঁর একগুচ্ছ কবিতা এবং শেষে তাঁকে নিয়ে লেখা একটি প্রবন্ধ। সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত কবিতাগুলি মূল হিন্দি থেকে অনুবাদ করেছেন কবি-অভিনেত্রী ভাস্বতী গোস্বামী আর প্রবন্ধটি লিখেছেন ফজল হাসান।]

 

[এক]

এই চোখের উছলে ওঠা সৌরভ আমি দেখতে পাই
হাতের ছোঁয়ায় একে সম্পর্কে নামিয়ে এনো না
এই অনুভবটুকু কেবল অন্তর দিয়ে বুঝে নাও
ভালোবাসা, ভালোবাসাই থাক
কোনো নামে ডাকতে চেও না
প্রেম শব্দ নয়, কোনো কোলাহল নয়
সে তার নীরব ভাষায় কত কী বলে যায়, শুনিয়ে যায়
না থামিয়ে দেয়- না নিভিয়ে, নিঃশব্দে বয়ে চলে
যেন কত অনন্ত সময় ধরে চলেছে ভালোবাসার আলোকণাগুলো
এ শুধু অনুভবের, হৃদয় দিয়ে স্পর্শ করো
ভালোবাসাকে, ভালোবাসা হয়েই থাকতে দাও
কোনো নাম দিও না
হাল্কা হাসির মতো চোখের তারায় ভালোবাসা খেলা করে
ঠোঁট থেকে না বেরোনো শব্দগুলো শিহর তুলতে থাকে ঠোঁটেই
সেই নীরবতায় না বলা কত গল্প রয়ে যায়
সমস্ত সত্তা দিয়ে ছুঁয়ে দ্যাখো সেই গল্পের প্রবাহ
ভালোবাসা, ভালোবাসাই থাক
তাকে আর কোনো নামে ডাকতে চেও না
[দুই]
তুমি ডাক পাঠাও
তোমারই অপেক্ষায় রয়েছি
তুমি ডাক পাঠাও
রাত চঞ্চল হয়ে উঠছে, স্বপ্নরা মুহূর্ত গুনছে
আমি তোমারই অপেক্ষায়
এ সময় তোমার ডাক আসুক

হৃদয়ের অনুক্ত কথাদের দু’হাতের অঞ্জলিতে নিয়ে
আর কত রাত জাগবো আমি?
ছোট কিন্তু গভীর এক কথা আছে, শোনো
তোমারই উদ্দেশে এ প্রেম
তোমার জন্যেই এই অপেক্ষা
একবার ডেকে দ্যাখো
সীমাহীন এ ভালোবাসা
তোমার অন্তরের সাথে আমার অন্তর এক হয়ে গেছে
রাতের অগম্যতা আমাকে অধৈর্য করে তুলেছে
এখন তোমার অপেক্ষা
তুমি ডাক পাঠাও
[তিন]

আমরা সেই চেনা পথ ফেলে চলে এসেছি
যেখানে তোমার পায়ে পায়ে পদ্ম ফুটে থাকতো
তুমি হেসে উঠলে, দ ‘গালে ভ্রমর উড়ে বসতো
তোমার কোমরের ঢালে নদী বাঁক নিত
আর হাসির আওয়াজে ফসল পেকে উঠতো
যেখানে তোমার পায়ের পাতায় ডানা মেলতো সোনালি রোদ্দুর
আজ শুনতে পাই, সেই চৌকাঠে নিথর রাত থমকে থাকে
উচ্ছ্বলিত চুলের রাশিতে জড়ানো সেইসব রাত
কখনো-সখনো তার দু’ একটা লেগে থাকে বালিশের গায়ে
ব্যথায় ক্ষতবিক্ষত এ মন, আজ পাথর হয়ে গেছে
এক অন্ধ কুয়ো বা কানাগলির মতো লাগে
জানি এ সময় ক্ষণস্থায়ী, তবু অন্তহীন বলে মনে হয়
লক্ষবার পোড়ালেও এ ছাই হয় না

[চার]

তোমার কাছে আমার কিছু জিনিস রয়ে গেল
শ্রাবণের কিছু ভেজা দিন
আর এক চিঠিতে জড়ানো রাত
ওদের ছাইচাপা আগুনটুকু নিভিয়ে দাও, আমার ওই জিনিসগুলো ফিরিয়ে দাও
কিছু পাতা ঝরে গেল, না?
পাতাঝরায় কিছু পাতার মৃদু খসখসানি
কানে তরঙ্গ তুলে আবার ফিরে এল
ঝরাপাতার ওই শাখা এখনো অল্প অল্প দুলছে
ওই ডালটা ভেঙে ফ্যালো, ফিরিয়ে দাও আমার সমস্ত জিনিস
এক একলা ছাতার নীচে, যখন আধাআধি ভিজছিলাম
আধেক শুকনো, আধেক ভিজে
শুকনো তো আমি সাথে করে নিয়ে এসেছি
ভিজে যাওয়া মনটা বোধহয় বিছানার পাশে রয়ে গেল
ওটা পাঠিয়ে দাও, আমার জিনিস ফিরিয়ে দাও

একশো ষোলোটা জ্যোৎস্না রাত আর তোমার কাঁধের তিল
ভিজে মেহেদির মিষ্টি গন্ধ, কিছু খুনসুটি-ভরা নালিশ
সব পাঠিয়ে দাও, আমার জিনিস আমাকে ফিরিয়ে দাও
শুধু এই অনুমতি দিয়ে যেও
যখন এগুলো মাটিচাপা দেব
আমিও তার পাশে শুয়ে পড়ব
আমিও তার পাশেই…

অনুবাদক : ভাস্বতী গোস্বামী

ভাস্বতী গোস্বামী দিল্লি প্রবাসী। পঁচিশ বছরের প্রবাস জীবনে, তিনি একজন বাংলা নাট্যকর্মী, মঞ্চশিল্পী ও কবি। কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি অনুবাদের কাজও করে থাকেন। তাঁর দ্বিভাষিক কবিতার বই ‘ভাবনা কলেজ’ ও ‘মুন ইন দ্য ব্লক’ ২০১৫ সালে ‘নতুন কবিতা’ থেকে কলকাতা বইমেলায় প্রকাশ পায়। এ ছাড়া সে বছর কলকাতা বইমেলায় দীপ প্রকাশনী থেকে তাঁর অনুবাদ গ্রন্থ ‘২৪ আকবর রোড’ (লেখক রশিদ কিদওয়াই) প্রকাশিত হয়। লেখা ছাড়া তিনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করেছেন। বাংলাদেশেও অভিনয় করার সুযোগ হয়েছে তাঁর।

 

 

ফজল হাসান > বহুমুখী গুলজার >> প্রবন্ধ

 

দিনটি ছিল শনিবার, ১৮ আগস্ট, ১৯৩৪। ব্রিটিশ-ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝিলাম জেলার (বর্তমানে পাকিস্তানে) দিনা এলাকায় মাখন সিং কালরা এবং সুজান কাউরের সংসার আলোকিত করে জন্ম নিল এক পুত্র। বাবা-মা আদর করে নাম রাখলেন সাম্পুরান সিং কালরা। সেদিনের সেই শিশু সাম্পুরানই আজ ভারতীয় শিল্প-সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনের পরিচিত, সমাদৃত এবং স্বনামধন্য গুলজার।

গুলজার আপাদমস্তক একজন কবি এবং গীতিকার হলেও আসলে তিনি একের ভেতর অনেক। শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় তাঁর পদচারণা রীতিমত ঈর্ষণীয় এবং তিনি আপন মহিমায় উজ্জ্বল। গুলজার একাধারে কবি, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক, গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্য রচয়িতা, অঙ্কনশিল্পী ও অধ্যাপক। রীজনীতির সঙ্গেও দেখা গেছে তাঁর সখ্য। তরুণ বয়সে তিনি ‘প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স এসোসিয়েশন আইপিটিএ’-এর মতো সংগঠনের সান্নিধ্যে এসেছিলেন এবং বামপন্থী সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তবে কোনদিনও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি।

গুলজারের শৈশব খুব একটা চমকপ্রদ ছিল না। অল্প বয়সে তিনি জন্মদাত্রীকে হারিয়েছেন। তাঁর শৈশব কেটেছে বৈমাত্রেয় ভাই-বোনের সঙ্গে, আদরে-অনাদরে। সাতচল্লিশের ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির সময় ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য পরিবারের তালিকায় তাঁদের পরিবারও ছিল। পরিবারের সবাই ভারতের অমৃতসরে থিতু হন, কিন্তু কিশোর গুলজার পরিবারের সঙ্গে অমৃতসরে না গিয়ে ভাগ্যান্বেষণে মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বে) শহরে গমন করেন। সেখানে তিনি দুমুঠো খাবার সংগ্রহ করার জন্য গাড়ির মেকানিক হিসাবে কাজ করেছেন এবং অবসর সময়ে কবিতা লেখায় নিমগ্ন থেকেছেন। বলা বাহুল্য, স্কুলে পড়াশোনা করার সময়ে কবিতার প্রতি তাঁর প্রবল অনুরাগ দেখা গেছে। তবে আলো ঝলমল বোম্বেতে আসা অন্যান্য কিশোরের মতো সিনেমার রঙিন জগতে অনুপ্রবেশের স্বপ্নপোকা তাঁরও মস্তিস্কের ভেতর ওড়াউড়ি করতো। বোম্বেতে কলেজে পড়াশোনা করার সময় তিনি সঙ্গীতের প্রতি ঝুকে পড়েন এবং নিয়মিত গানের আসরে উপস্থিত হতেন। সেসব সঙ্গীতানুষ্ঠানের মধ্যমনি থাকতেন হয়তো কখনো রবিশংকর কখনো আলী আকবর খান। এই সময়েই গুলজার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায় ইস্তফা দেন।

লেখক হওয়া প্রসঙ্গে গুলজার নিজেই বলেছেন, দেশভাগ পরবর্তী সময়ের তীব্র বেকারত্ব এবং ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলন তাঁকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছিল। সেই সময় তিনি সলিল চৌধুরী, শৈলেন্দ্র, সৈয়দ জাফরী এবং বলরাজ সাহানীর মতো স্বনামধন্য মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছেন। মূলত তারাই তাঁকে লেখক হবার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। যা-ই হোক, শুরুতে তাঁর বাবা তাঁকে লেখক হবার জন্য উৎসাহিত করেননি। তিনি তাই তাঁর প্রকৃত নাম বদলে ছদ্মনাম রাখেন গুলজার দীনভি। পরবর্তীকালে পরিচিত হয়ে ওঠেন শুধুই গুলজার নামে। এই নামটি তাঁর ভীষণ পছন্দের। উল্লেখ্য, একবার কোনো এক ঘরোয়া আলাপের সময় তিনি সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘শোনো, আমার নাম লিখবে গুলজার। শুধু গুলজার। আগে পরে কিচ্ছু বসবে না।’ তাই আজ গুলজার নামের আড়ালে হারিয়ে গেছে বাবা-মায়ের দেয়া ‘সাম্পুরান সিং কালরা’ নামটি।

মানুষ হিসাবে গুলজার একজন নিপাট ভদ্রলোক। নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘কবি হিসাবে আমি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে লিখি, কিন্তু আমি আঁতেল নই।’ কাউকে উদ্দেশ্য করে তিনি কখনই কোনো খারাপ শব্দ উচ্চারণ করেননি, এমনকি পরম শত্রুকেও গালমন্দ করেননি। তিনি ১৯৭৩ সালে বলিউডের বিখ্যাত নায়িকা রাখীর সঙ্গে ‘সাত পাকে বাঁধা’ পড়েন। মেঘনা গুলজার তাঁদের একমাত্র মেয়ে। চলচ্চিত্র জগতে মেঘনা নিজেও সুপরিচিত। বাবার আত্মজীবনী লিখে লেখক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

গুলজারের কর্মজীবন শুরু হয়েছে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে। পরবর্তীকালে তিনি গীতিকার, চিত্রনাট্য রচয়িতা এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেন। গীতিকার হিসাবে তিনি ২০০৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’ (মর্যাদা এবং সম্মানের দিক থেকে ভারতের তৃতীয় অসামরিক পুরস্কার) এবং সুদীর্ঘ কবি-জীবনে অনন্য অবদানের জন্য ২০০২ সালে ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারসহ তিনি একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তিনি ২০১৩ সালের এপ্রিলে আসাম ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলার নিযুক্ত হন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী গুলজার একজন বহু ভাষাবিদ। তিনি জন্মের পর পাঞ্জাবি ভাষায় কথা বলা শিখেছেন, কিন্তু পড়াশোনা এবং সাহিত্য রচনা করেছেন উর্দুতে। তিনি হিন্দী, ইংরেজি এবং বাংলা ভাষায়ও পারঙ্গম। তবে বাংলা ভাষা শেখার পেছনে লুকিয়ে আছে ছোট্ট একটা কাহিনি। স্কুল-জীবনে তিনি রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়তে শুরু করেন। তাঁর ভাষায়, ‘রবীন্দ্রনাথ পড়বো বলেই আমি বাংলা শিখতে শুরু করেছিলাম।’ কেননা ক্লাশ সেভেনে পড়ার সময় একদিন স্কুলের লাইব্রেরি থেকে তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘দ্য গার্ডেনার’-এর উর্দু অনুবাদ নিয়ে আসেন এবং বইটি পড়ার পর রীতিমত চমকে ওঠেন। পরে তিনি স্বীকার করেছেন, রবীন্দ্রনাথই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রতি দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছেন। তাঁর পড়াশোনা শুধু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্র এবং শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের সঙ্গেও পরিচিতি ঘটে। তিনি বেশ সহজেই স্বীকার করেছেন, বাঙালি প্রেমিকাকে (রাখী, পরবর্তীতে স্ত্রী) বাংলায় চিঠি লেখার জন্য বাংলা লেখা শিখেছেন।

একসময় চলচ্চিত্র জগতে গুলজার প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক বিমল রায়, হৃষিকেশ মুখার্জী এবং হেমন্ত কুমারের সহকারী হিসাবে কাজ শুরু করেন। তিনি বিমল রায়ের সার্বক্ষণিক সহকারীর পদে কাজ করেন। পরে হৃষিকেশ মুখার্জী এবং অসিত সেনের জন্য সিনেমার কাহিনি লিখেছেন। এসব সিনেমার মধ্যে হৃষিকেশ মুখার্জী পরিচালিত ‘আনন্দ’ (১৯৭০), ‘গুড্ডি’ (১৯৭১), ‘বাওয়ার্চি’ (১৯৭২) ও ‘নিমক হারাম’ (১৯৭৩) এবং অসিত সেন পরিচালিত ‘দো দুনি চার’ (১৯৬৮), ‘খামোশী’ (১৯৬৯) ও ‘সফর’ (১৯৭০) উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৯৭১ সালে ‘মেরে আপনে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, এই সিনেমাটি ছিল তপন সিনহার বাংলা চলচ্চিত্র ‘আপনজন’-এর রিমেক। তারপর তিনি পরিচালনা করেন ‘পরিচয়’ (১৯৭২) এবং ‘কোশিশ’ (১৯৭২)। এই ‘কোশিশ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন সঞ্জীব কুমার এবং জয়া ভাদুরী। পরে সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং দুজনে মিলে দর্শকদের উপহার দেন ‘আঁধি’ (১৯৭৫), ‘মৌসুম’ (১৯৭৫), ‘আঙুর’ (১৯৮১) এবং ‘নামকীন’ (১৯৮২)। এসব সিনেমার ভেতর দিয়ে তিনি মানুষের নানান সম্পর্ককে সামাজিক ও পারিবারিক পটভূমিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনি সব সিনেমায়, দেখা গেছে, ব্যবহার করেছেন ফ্লাশব্যাক। কেননা তিনি বিশ্বাস করেন, অতীতকে টেনে নিয়ে না এলে বর্তমান কখনই পূর্ণতা পায় না। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর নির্মিত সিনেমাগুলো ব্যবসায়িক সফলতা পায়নি এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে আশি ও নব্বই দশকে তাঁর সুনাম ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। তবুও সেই মন্দার দিনে তিনি ‘লেকিন’ (১৯৯০), ‘মাচিস’ (১৯৯৬) এবং সর্বশেষ ছবি ‘হু তু তু’ (১৯৯৯) নির্মাণ করেন।

এরপর চলচ্চিত্র-জগত থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে টেলিভিশনের জন্য তৈরি করেন মহাকবি গালিবের জীবনকাহিনি নিয়ে ধারাবাহিক ‘মির্জা গালিব’, যা ভারতীয় টেলিভিশনের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মির্জা গালিব চরিত্রে অভিনয় করেন নাসিরুদ্দীন শাহ। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে তাঁর আক্ষেপ, তিনি তাঁর ছবিতে রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন, এমনকি নিজের স্ত্রী রাখীকেও নির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ পাননি।

গীতিকার হিসাবে গুলজারের অভিষেক হয় বিমল রায় নির্মিত এবং শচীনদেব বর্মনের সঙ্গীত পরিচালনায় ‘বন্দিনী’ (১৯৬৩) চলচ্চিত্রের ‘মোরা গোরা আঙ লাই লে’ গানের মাধ্যমে। গান লেখার জন্য বিমল রায় তাঁকে উৎসাহিত করেছেন। গীতিকার হিসাবে শুরুর দিকে তিনি তেমন পরিচিতি পাননি। তবে ১৯৬৯ সালের ছবি ‘খামোশি’ ছবির গান ‘হামনে দেখি হ্যাঁয় উঁ আখোঁ কি মেহেক্তি খুশবো’ [‘আমি অই চোখের সুরভি দেখেছি’] ভীষণ জনপ্রিয় হয় এবং তাঁকে সুখ্যাতি এনে দেয়। পরবর্তী কালে ‘গুড্ডি’ (১৯৭১) সিনেমার ‘হামকো মান কি শক্তি দেনা’ গানটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আরাধনার সঙ্গীত হিসাবে এই গানটি এখনো ভারতের অনেক স্কুলে গাওয়া হয়। তাঁর অনেক জনপ্রিয় গানে কণ্ঠ দিয়েছেন কিশোর কুমার, লতা মুঙ্গেস্কর এবং আশা ভোঁসলে। এসব গানের মধ্যে ‘পরিচয়’ সিনেমার ‘মুসাফির হুঁ’, ‘আঁধি’ ছবির ‘তেরে বিনা জিন্দেগি সে কুঁই, শিকওয়া, তুঁ নেহি’ এবং ‘ইজ্জত’ চলচ্চিত্রের ‘মেরে কুচ সামন’ উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সুরকার এ.আর. রহমানের সুরে ‘দিল সে’ ছবির ‘ছাইয়া ছাইয়া’ এবং ‘স্লামডগ মিলিনিয়র’ চলচ্চিত্রের ‘জয় হো’ গান দুটির সৃষ্টি তো তাঁরই। দুটি গানই দর্শকমহলে ভূঁয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ‘জয় হো’ সঙ্গীত রচনার জন্য তিনি একাডেমি অ্যাওয়ার্ড এবং গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। ‘মাসুম’ (১৯৮৩) চলচ্চিত্রের ‘তুঝছে নারাজ নেহি জিন্দাগি’ থেকে শুরু করে ‘ওমকারা’ (২০০৬) সিনেমার ‘নামাক ইশক্ কা’ গান অগণিত দর্শক এবং শ্রোতার মনকে দারুণ ভাবে নাড়া দিয়েছে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের অধিক সময়ের সাহিত্য ও চলচ্চিত্র-জীবনে তিনি ছয় শ’য়ের উপর গান রচনা করেন। তার মধ্যে তিরিশ থেকে চল্লিশটির মতো গান রয়েছে শিশুদের জন্য রচিত। চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত শিশুতোষ গানের মধ্যে বহুল সমাদৃত ‘হাম কো মান কি শক্তি দেনা’ (‘গুড্ডি’, ১৯৭১), ‘মাস্টারজি কি আ গি চিঠ্ঠি’ (‘কিতাব’, ১৯৭৭) এবং ‘লাকড়ি কি কাঠ্ঠি’ (‘মাসুম’, ১৯৮৩) উল্লেখযোগ্য।

গুলজার মূলত হিন্দি, উর্দু এবং পাঞ্জাবি ভাষায় সাহিত্য রচনা করলেও ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় লেখালেখি করেন। হিন্দিতে লেখা অনেক কবিতায় তিনি বিশেষ ধরনের আঞ্চলিক ভাষা বা বাচভঙ্গি ব্যবহার করেছেন। একাধিক কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা গুলজার। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘রাত প্যাশমীনে কি’, ‘ত্রিবেনী’, ‘চান্দ পুকরাজ কা’ এবং ‘জনম’। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অণুকবিতা নিয়ে উর্দু থেকে ইংরেজিতে অনূদিত (অনুবাদক নিরুপমা দত্ত) কাব্যগ্রন্থ ‘প্লুটো’। প্লুটো গ্রহের মতো ক্ষুদ্র এসব কবিতা মানুষের জীবনের কোন একটা বিশেষ মুহূর্ত, ঘটনা বা আবেগ নিয়ে লেখা। গ্রন্থের মলাটে লেখা, ‘গুলজারের লেখায় অন্ধকার মুহূর্তগুলো আলোয় পরিপূর্ণ এবং আশা কখনই দুশ্চিন্তাকে পথ ছেড়ে দেয় না।’ তাঁর ভাষায় কবিতা হলো : ‘যদি রক্ত ঝরে, তবে সে-টা ক্ষত, অন্যথায় প্রতিটি আঘাতই কবিতা।’ যা-ই হোক, প্রকৃতিকে তিনি কবিতায় নানান ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। উদাহরণ হিসাবে উদ্ধৃতি দেওয়া যায়, ‘মুকুলের বন্ধ ঠোঁটের উপর আলতো করে ঝরে পড়ে শিশির।’ সমালোচক এবং বোদ্ধা পাঠক তাঁকে ‘পয়েট অফ অল সিজন’, অর্থাৎ ‘সর্বঋতুর কবি’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।

কবি এবং গীতিকার হিসাবে স্বনামধন্য হলেও কথাসাহিত্যে গুলজারের মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। সাবলীল ভাষা, শব্দের নিপুণ ব্যবহার, কাহিনিবিন্যাস, জটিল অনুভূতির সহজিয়া প্রকাশ এবং উপস্থাপনা ছোটগল্পকে করে তুলেছে অনন্য, অসাধারণ। বাক্যের বুনন, শব্দের যথাযথ ব্যবহার এবং পাঠককে সম্মোহিত করে রাখার অলৌকিক দক্ষতার জন্য অনেকে তাঁকে ‘শব্দের মোজার্ট’ খেতাব দিয়েছেন। এছাড়া কাব্যিক ভাষায় চরিত্র চিত্রণের, বিশেষ করে শব্দ প্রয়োগের জন্য তাঁকে ‘মাস্টার ওয়ার্ডস্মীথ’ বা ‘শব্দ-কারিগর’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।

ইংরেজিতে অনূদিত গুলজারের গল্প নিয়ে ‘রাভি পার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ (১৯৯৭) এবং ‘হাফ এ রুপি স্টোরিজ’ (২০১৩) শিরোনামে দুটি ছোটগল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তবে ‘রাভি পার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ থেকে চারটি গল্প নিয়ে ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘সীমা অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’। ‘যুগল’ [‘টু’] তাঁর একমাত্র উপন্যাস।  এছাড়া শিশুদের জন্য তিনি রচনা করেছেন গল্পের বই, যা ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর এডুকেশন, রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং’ সংস্থা থেকে অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

গুলজারের অনেক গল্পের পটভূমি পাক-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা, অন্যদিকে অনেক গল্প মুম্বাইকে ঘিরে। এছাড়া তিনি গল্পের কাহিনির পটভূমি হিসাবে কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ এবং আফগানিস্তানকে ব্যবহার করেছেন। তবে গল্পের আখ্যান যেখানেই হোক না কেন, তাঁর গল্পের মূল বিষয় সহানুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা, আবেগ, বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্বসুলভ সম্পর্ক এবং অতীতের স্মৃতি-বিস্মৃতি। এছাড়া বিভিন্ন স্বনামধন্য মানুষের বাস্তব জীবনের সম্পর্ক নিয়ে তিনি একাধিক গল্প লিখেছেন। গুলজার নিজেই এটা বলেছেন। তিনি মনে করেন, জীবনের পথে চলতে গেলে সবাইকেই ব্যক্তিগত এবং সামাজিক দিক থেকে বিভিন্ন পরিবেশ এবং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেই পথে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এবং আলাপ-পরিচয় ঘটে। তিনি লেখালেখির মধ্য দিয়ে মাত্র অল্প কয়েকজনের কাহিনিকে স্পর্শ করেছেন বলে মনে করেন।

সাতচল্লিশের দেশভাগের অভিজ্ঞতা, মানসিক চাপ এবং বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে গুলজার রচনা করেছেন একাধিক ছোটগল্প, কবিতা এবং নিবন্ধ। ছোটগল্পের মধ্যে রয়েছে ‘রাভি পার’ [‘রাভি নদী পেরিয়ে’], ‘স্মৌক’ [‘ধোঁয়া’] এবং ‘এলওসি’ (লাইন অব কমান্ড)-র মতো অসাধারণ ছোটগল্প। ‘রাভি নদী পেরিয়ে’ গল্পটিতে তিনি দেশভাগের সময় উদ্বাস্তু এক শিখ পরিবারের করুণ জীবনকাহিনি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ‘ধোঁয়া’ গল্পটি ধর্মীয় নিয়ম-কানুনের ব্যবধান এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সংঘর্ষ নিয়ে লেখা। দেশভাগের কারণে পাক-ভারত সীমান্তে পারিবারিক বন্ধুত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মর্মদন্তু কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে ‘এলওসি’ গল্পে। এছাড়া দেশভাগের উপর লেখা তাঁর কবিতা, ছোটগল্প এবং বিভিন্ন ধরনের নিবন্ধ নিয়ে ২০১৭ সালে ইংরেজিতে অনূদিত [অনুবাদক : রাখসান্দা জলিল] লেখাগুলি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘ফুটপ্রিন্টস্ অন জিরো লাইন : রাইটিংস্ অন দ্য পার্টিশান’ শীর্ষক গ্রন্থ।

প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে লেখা বিভিন্ন গল্পে গুলজার একজন তুখোড় লেখকের পরিচয় দিয়েছেন, যেমন ‘গুড্ডু’, ‘ঘুঘু ও জামুনি’, ‘কাগজের টুপি’, ‘ইলিশ’ এবং ‘হাত রাঙিয়ে দাও হলুদে’। তবে এসব গল্পের মধ্যে ‘ঘুঘু ও জামুনি’ গল্পটি নর-নারীর ভালোবাসার পরিবর্তে রঙিন ঘুড়ির প্রতি পাখির অলৌকিক ভালোবাসার কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে বিখ্যাত মানুষের বাস্তব জীবনের সম্পর্ক নিয়ে লেখা ‘কুলদীপ নায়ার এবং পীর সাহিব’ এবং ‘সাহির এবং যদু’ [বলিউডের দুই কিংবদন্তী সাহির লুধিয়ানভি এবং জাবেদ আখতার (ডাকনাম যদু)] গল্প দুটি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি বিখ্যাত মানুষদের জীবনের কোনো কোনো বিশেষ ঘটনাকে গল্পের মাধ্যমে সাবলীল ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এ প্রসঙ্গে ‘মাইকেলেঞ্জেলো’ এবং ‘বিমলদা’ গল্পের উদাহরণ দেওয়া যায়। বৃদ্ধ বয়সের আবেগকে পুঁজি করি তিনি লিখেছেন একাধিক গল্প। এগুলোর মধ্যে ‘গোধূলি’, ‘দাদাজি’ এবং ‘দ্য অ্যাডজাস্টমেন্ট’ উল্লেখযোগ্য।

গুলজারের সবেধন নীলমনি উপন্যাস ‘টু’ [‘যুগল’]। উর্দুতে লেখা হলেও ‘টু’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজিতে। এতে দেশভাগের ও পরবর্তীকালের শরণার্থীদের দুঃসহ ও অনিশ্চিত জীবনকাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। উপন্যাসের মলাটে পুরো কাহিনির মূলকথাগুলো এরকম : ‘উই ও্যয়্যার টু। ওয়ান পার্টেড। নাউ উই আর টু’ [‘আমরা ছিলাম দুটি অভিন্ন হৃদয়। একজন বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এখন আমরা দুজন’]।

সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়ও গুলজার সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইংরেজিতে অনূদিত ‘দ্য গার্ডেনার’ বইটি হিন্দী ভাষায় অনুবাদ করেন। এছাড়া ‘পান্তাভাতে’ গ্রন্থে গুলজারের সঙ্গে বাংলা ভাষাভাষি বিভিন্ন গুণীজনদের আলাপচারিতা এবং স্মৃতিকথা স্থান পেয়েছে। গুণীজনদের মধ্যে রয়েছেন সত্যজিৎ রায়, কিশোর কুমার, রাহুল দেব বর্মন, সুচিত্রা সেন, উত্তম কুমার এবং মহাশ্বেতা দেবী। গ্রন্থটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায় এবং ২০১৭ সালে এটি প্রকাশ করেছে দে’জ পাবলিশিং।

পরিশেষে বলা যায়, যাঁর পদচারণায় ভারতীয় শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃত এবং চলচ্চিত্র-জগৎ হয়েছে নানাভাবে সমৃদ্ধ এবং যিনি কবিতায়, গানে, গল্প-উপন্যাসে ও চলচ্চিত্রে রেখেছেন আপন প্রতিভার স্বাক্ষর, যে প্রতিভা বহুমুখী এবং যিনি নানান গুণে গুণান্বিত, সেই গুলজার সম্পর্কে বলায় যায়, তিনি একক কেউ নন, বরং একের ভেতর বহুজন।

 

অনুবাদক : ফজল হাসান

অস্ট্রেলিয়াবাসী বিশিষ্ট বাঙালি অনুবাদক। বিশ্বসাহিত্যের প্রায় সব প্রধান লেখকের ছোটগল্প অনুবাদ করেছেন তিনি। তীরন্দাজে নিয়মিত তাঁর অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অনুবাদের পাশাপাশি সাহিত্য ও লেখকদের ওপরও প্রবন্ধ লিখে থাকেন।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন

লেখাগুলো সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করুনঃ

LEAVE YOUR COMMENT

Your email address will not be published. Required fields are marked *

hijal
Close